Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

দেবদাস রজকের একগুচ্ছ কবিতা

ধ্বংস

এ পাড়ায় প্রবল শব্দ হচ্ছে ক’দিন থেকে
কাকেরা ডাকছে, দিনভর ডাকছে
বাড়ির ছাদ ভাঙে, পুকুর ভরাট, গাছের পোড়াগন্ধ
ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় কটু চিৎকার,
ওই মাঠে দিগন্তে নীলঘুড়ি কেটে যায়,
ওরা কাঁদছে, বাড়ি ফিরে আসে…
সন্ধ্যা ঘনিয়ে তারপর
কত ধূমকেতু তারাদের আওয়াজ
রক্তের স্রোতে মিশে যায়
আজ হেমন্ত। শীতের রোদ্দুর এল না উঠোনে
বাতায়নে বসে মানুষের শব্দ খুঁজি কান পেতে

 

দ্বিতীয় জন্ম নয়

প্রথম জন্মেই
পাহাড় দেখার সাধে পাথর চাপালাম বুকে
মসৃণ নয় এই উলুখাগড়ার জীবন,
দুপা এগিয়ে চারপা পিছিয়ে
আবার দশপা হাঁটা,
সাঁতরে উঠেছি ডাঙায়
হাবুডুবুর নেশায় ঘর করি
সে ঘর ভাঙি, আরশির ভেতর ঢুকে যাই

প্রথম জন্মের ব্যর্থতা দেখেও
প্রথম জন্মেই
এসে বাঁচি

 

বাঁশ পাতায় নৌকা

উৎসবের কলকাতা থেকে দূরে
পাড়াগাঁর নীলচে জঙ্গলে
রাতবিরেতে শিয়াল… ঝিঁঝি… জোনাকি…
শুকনো পাতার খস্ খস্ অথবা কান পেতে
ট্রেনের শব্দ কত কী!

কত কী বাকি থেকে গেল, দেওয়াল বেয়ে জল,
সাঁতরে গিয়ে পদ্মপাতা
অথবা ওপারে দৌড়ে বাঁশ পাতায় নৌকা!

বারো মাস। তেরো মাস।
কত দুপুর কত ভোর মাসের পর মাস
চৌহদ্দির শ্যাওলায় কাটছে জীবন
চার দেওয়াল। ঘুলঘুলির মত মন!

সতেরো তলার জানালায় বসে মাপছি শহর
বয়স বাড়ছে। স্পিড পোস্ট এসে গ্যাছে দরজায়।
রোজ সন্ধ্যায়! চামচিকেরা আসে শরীর হামলায়!

কত কী বাকি থেকে গেল
অপার নিষিদ্ধের মত মাখছি ধুলো
বইছি… গন্ধ খাচ্ছি কলকাতার!
এবার
দশমীর জলে সাঁতরে যাই দিঘল নদীর ওই পার

 

পুরনো চাতাল

এসো! বেঁধে নিই হাত
কখন থাকি না থাকি

এসো! একটু সন্তানের সঙ্গে খেলি
মুঠোয় মুঠোয় ধরে থাকি হৃদয় আর গলার স্বর

উড়ে আসছে ওই দ্যাখো বাতাস…

বুকে ভরে নাও পৃথিবী, পৃথিবীর এই মানুষকে,
এই পুরনো কত পুরনো চাতাল

ক্রমশ একটা সুদীর্ঘ বাগান
এত গাছ এত গুল্ম এত দুর্বা
রাতের ছায়ায় ঘুমাতে যাবে এবার
দীঘল রাত্রির অনল দুর্বার…

পুড়ে তো বেঁচে উঠে শিখেছ অনেক!

এসো! বেঁধে নিই হাত
কখন থাকি না থাকি
মুঠোয় মুঠোয় ধরে থাকি হৃদয় আর গলার স্বর

 

শালিক

জানালার কাচে একটি শালিক এল ভোর ভোর

দেখছি
দেখছি
ছোট্ট আদর ঠোঁট কীভাবে! আহা কীভাবে!
নিজের গায়ে টোকা মারল ভালবেসে
ঠোঁট চুঁয়ে বুকের বাঁশি বাজল প্রচুর

ভাবছি
ভাবছি
এভাবে আরও একবার টোকা মারি নিজের গায়ে
কাচ হয়ে যাই আমি, তুমি বন্য অচিন
অপার বৃষ্টি আসুক দিনভর এখানে
‘ভালবাসি ভালবাসার ধারা
বলো তো নিভিয়েছি কি কোনওদিন’!

চলো!
ভোর ভোর শালিক হয়ে যাই দুজনে, এই জানালায়
এইখানে…

চিত্রণ : বিভাবসু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 5 =

Recent Posts

গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »