Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বাংলা নিয়ে হাহুতাশে যতটা আবেগ, ততটা তথ্য ও যুক্তি নেই

বইয়ের ভূমিকাতেই লেখক জানান, “বইটি বাঙলা ভাষার ইতিহাস নয়। গত কয়েক’শ বছরে তার রূপ কী ছিল আর কী হয়েছে— তার পরিচয় এখানে ধরা হয়নি। আমার কৌতূহল ছিল ‘বাঙলা ভাষা’ এই নামটি নিয়ে। হালে চারধারে বাঙলা নিয়ে অনেক হাহুতাশ শোনা যাচ্ছে। তার পেছনে যতটা আবেগ আছে ততটা তথ্য ও যুক্তি নেই। তার পাশাপাশি কেউ কেউ আবার বলছেন: বাঙালি নাকি নিজেকে বাঙালি হিসেবে চিনতে শিখেছে মাত্র দেড়’শ-দু’শ বছর আগে।
এইসব ভুল ধারণা কাটানোর জন্যেই এই বই। বাঙলা ভাষা ও তার নিজস্ব লিপিকে আশ্রয় করেই বাঙালির একটি আত্মপরিচয় গড়ে উঠেছিল তার বহু আগে। …নানা উপভাষায় কথা বললেও সকলেই যে একই ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ— কয়েক’শ বছর আগে থেকেই এই বোধ তাঁদের ছিল।”

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য-র ‘বাঙলা ভাষার ভূত-ভবিষ্যৎ ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ মাত্র আশি পাতার একটি ছোট বই। কিন্তু বিষয়ের দিক থেকে বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগীও বটে। নিজের ভাষা ও নিজের জাতি সম্বন্ধে একটি স্বচ্ছ ধারণা পেতে এই বই প্রত্যেক বাঙালির কাছে দিশারী হয়ে উঠতে পারে। বাংলা ভাষার নিয়মিত লেখক এবং পাঠকরাও এই বইতে অনেক কাজের কথা পাবেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গর চক্রান্তের সঙ্গে বাংলা ভাষাকেও চারটে আলাদা উপভাষায় ভাগ করার চক্রান্ত করেছিল লর্ড কার্জনের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ। তৎকালীন শিক্ষিত বাঙালিদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে বঙ্গভঙ্গর মত বাংলা ভাষা ভাগের পরিকল্পনা থেকেও পিছিয়ে আসতে হয়েছিল ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদকে। এই বইতে একটি বড় পাওনা হল সেই ভাষা ভাগের চক্রান্ত ও তার বিরুদ্ধে আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে একটি আলোচনা, যাতে এসেছে মৈমনসিং প্রাদেশিক সম্মেলন নিয়েও অনেক কথা।

অনেক ভাষাতত্ত্ববিদই মনে করেন, আঠেরো-উনিশ শতক থেকেই বাংলা নামের ভাষা নিজের পরিচয় পেয়েছে। ১৮৩৩ সালের রামমোহন রায়ের ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ বইটি এক্ষেত্রে প্রামাণ্য হিসেবে ধরেন। রামকৃষ্ণবাবু কিন্তু দেখিয়েছেন, তারও ৫০০ বছর আগে ১৩১৭ সালে আমির খসরুর লেখায় বঙ্গাল আর গৌড়ী ভাষার উল্লেখ আছে। পরবর্তীতে আবুল ফজল (১৫৫১-১৬০২)-এর লেখাতেও বাংলা ভাষার কথা আছে। ফার্সিতে ‘জবান-এ-বঙ্গালহ’ বা হিন্দুস্থানিতে ‘বঙ্গালী জবান’ থেকেই সম্ভবত ইংরেজিতে Bengalee/-li ও বাংলায় বাঙালি ভাষা নামটি এসেছে বলে লেখক মনে করেন। আধুনিক যুগে হুতোমেরও আগে কলকাতায় প্রসেনিয়াম থিয়েটারের প্রবর্তক গেরাসিম লেবেডফ-এর ১৭৯৬ সালের একটি নাটকের বিজ্ঞাপনে বাঙ্গালি শব্দটি আছে। বাংলা ভাষার ভূত, মানে অতীত নিয়ে একটি অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা এই বইতে আছে।

ভূতের পরেই এসেছে ভবিষ্যতের প্রসঙ্গ। বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই নিরাশ। কথ্য ভাষায় ইংরেজি শব্দর বোলবোলায় তাঁরা অত্যন্ত চিন্তিত। রামকৃষ্ণবাবু কিন্তু এমন নিরাশার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খুঁজে পান না। সারা পৃথিবীতে প্রায় পঁচিশ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। সেই ভাষাকে নিয়ে গেল গেল রব তোলা অর্থহীন। সরকারি কাজকর্ম যে-ভাষায় হবে, উচ্চতর শিক্ষা যে-ভাষায় হবে সে-ভাষার কিছু শব্দ তো বাংলাতে ঢুকবেই। আগে ফার্সি ঢুকেছিল, এখন ঢুকেছে ইংরেজি। যে ভাষা অন্যভাষা থেকে গ্রহণ করতে পারে সে ভাষা আসলে আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। তাই বাংলা নিয়ে মড়াকান্নার মত বিলাপ করা লোকজনদের নিয়ে রামকৃষ্ণবাবুর মন্তব্য অত্যন্ত তির্যক:

“আজ যাঁরা বাঙলা ভাষাকে বাঁচানোর জন্যে রোজকার কথাবার্তা থেকে প্রতিটি ইংরেজি শব্দ ছেঁটে ফেলতে চেষ্টা করেন (ও পদে পদে বিফল হন), টেলিফোনকে দূরভাষ বলেন, অঙ্কচিহ্ন লেখেন 1, 2, 3…-এর বদলে ১, ২, ৩…, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মত নিষ্ঠাভরে আজ এ-দিবস কাল ও-দিবস ‘উদযাপন’ বা ‘পালন’ করেন, তাঁরা আসলে পুতুলখেলায় ব্যস্ত।”

অবশ্য এমন ভাববিলাস নতুন নয়। রাজনারায়ণ বসু প্রমুখও একসময় এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সুপ্রভাত আর সুরজনী বললে যে বাংলা ভাষার কোন উপগারটা হয় তা বোধের অতীত। এই বইতে ইংরেজি শব্দ ও বাগধারার এমন মাছিমারা বাংলা অনুবাদের বেশ ক’টি মজার নমুনা আছে।

শুধু ইংরেজি-শিক্ষিতদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। রামকৃষ্ণবাবু লিখছেন, “একটু ঠাওর করলে দেখা যায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত লোকের চেয়ে একজন মোটর মেকানিক ও ইলেকট্রিক-মিস্তিরি কম ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন না। চাষিদেরও কিছু কিছু ইংরেজি শব্দ বলতেই হয়— ক্যানাল, মোটর, শ্যালো ইত্যাদি।
আপত্তি উঠতে পারে এসব ক্ষেত্রে তো অন্য উপায় নেই। কিন্তু উপায় থাকতেও অযথা ইংরেজি শব্দ বলা কেন? এটাও ঠিক কথা নয়। ‘ক্যানাল’-এর বদলে ‘খাল’, ‘শ্যালো’-র বদলে ‘অগভীর’— এসব তো মজুত আছে। তবু গ্রামের লোকেও সেগুলো বলেন না কেন? ভাষাতত্ত্ব-বিশারদরা সে নিয়ে একটু খোঁজখবর করুন। কিন্তু দু’শ বছরের চেষ্টা সত্ত্বেও এক বিশেষ গোষ্ঠীর মধ্যে বাঙলা-ইংরেজি মেশানোর ঝোঁক যদি না-কেটে থাকে, তবে বুঝতে হবে: ব্যাপারটার মূল আরও গভীরে। শুধু ইংরেজি-প্রীতি বা বাঙলা-অভক্তি নয়, ইংরেজি পড়া-শোনা-বলা-লেখার এমন একটা পরিবেশে তাঁরা বাস করেন যেখানে অনবরত ইংরেজি শব্দ আসবেই।”

সারকথাটি বলেছিলেন প্রমথ চৌধুরী: “বাঙালির মুখ থেকে বিলেতি কথা কেউ খসাতে পারবেন না, অতএব সে চেষ্টা কেউ করেনও আমরা চাই শুধু লিখিত ভাষায় বিদেশি শব্দ বয়কট করতে। কিন্তু আমাদের এই সাতশ বছরের বর্ণসংকর ভাষাকে যদি আবার আর্য করতে হয়, তাহলে ভাষার আর্যসমাজীদের আগে সে ভাষাকে শুদ্ধ করতে হবে, তার পরে তার পৈতে দিতে হবে।”

অবশ্য রামকৃষ্ণবাবু জানিয়েছেন, বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মত কিছু না হলেও বাংলা সাহিত্য তথা বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে বৈকি। বইটিতে ‘সাক্ষরতার অপচয়’ প্রবন্ধটি এখানে উল্লেখযোগ্য। সাক্ষরতার হার পশ্চিমবঙ্গে অনেক বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় বই বিক্রি, লাইব্রেরির পাঠক কি বেড়েছে?

১৯৩৩ সালে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “গল্প কবিতা নাটক নিয়ে বাংলাসাহিত্যের পনেরো-আনা প্রয়োজন। অর্থাৎ ভোজের আয়োজন, শক্তির আয়োজন নয়।”

শক্তির আয়োজন বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যাকে বলে নন-ফিকশন সাহিত্যের কথা। যা আসলে কোনও জাতির মননের উন্নতিতে সহায়ক হয়। রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে রামকৃষ্ণবাবু লিখছেন, “ধর্মের নামে ‘উচ্ছৃঙ্খল ইন্দ্রিয়চর্চা’ আমাদের দেশের শহরে গ্রামে অবাধে চলে। তারও প্রধান কারণ এই যে, ‘আমাদের সাহিত্যে সমাজে সেই সমস্ত উপাদানের অভাব যাতে বড় বড় চিন্তাকে, বুদ্ধির সাধনাকে আশ্রয় করে কঠিন গবেষণার দিকে মনের ঔৎসুক্য জাগিয়ে রাখতে পারে।’”

অবস্থা কি এতবছর পরেও ভাল হয়েছে না খারাপ? নন-ফিকশন বাংলা বইয়ের প্রিন্ট অর্ডার নামতে নামতে এখন তিনশোয় পৌঁছেছে। বইমেলায় যে কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি হচ্ছে তার কত শতাংশ নন-ফিকশন সাহিত্য?

বাংলা সাহিত্যের স্বঘোষিত ইজারাদার বড় বড় প্রকাশনা সংস্থা আর মিডিয়া হাউসগুলো ভাড়াটে সাহিত্যিকদের নিয়ে বাংলা সাহিত্যকে কতটা এগোতে পারলেন? টাকার জোরে ‘সাহিত্য-ফাহিত্য কিনে নেওয়া’ যদি এতই সহজ হত তবে রামকৃষ্ণবাবুর মতে প্রতিবছর শারদীয় সংখ্যাগুলোতে একটা করে ‘গোরা’ কিংবা ‘কপালকুণ্ডলা’-র মানের উপন্যাস ছাপা হত। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অগ্রগতির কাজটা আসলে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বেশ কয়েকজন লেখক, অনেকগুলি ছোট পত্রিকা আর প্রকাশক।

রামকৃষ্ণবাবু দ্বিধাহীন ভাষায় জানান: “কোনও মুরুব্বি (সরকারি বা বেসরকারি) ছাড়াই, রামমোহন-ঈশ্বর গুপ্ত থেকে শুরু করে এখনকার দূর শহরতলি ও গ্রামের ছোটখাটো পত্র-পত্রিকার সম্পাদকরা যে-কৃতিত্ব দেখিয়েছেন— অসঙ্কোচে তার তারিফ করতে হয়। ক’জন পড়ছেন তার ঠিক নেই, পড়ে কী ভাবলেন তা জানার কোনও উপায় নেই (এখানে এক অদ্ভুত ‘নীরবতার সংস্কৃতি’ কাজ করে)— তবু অকুতোভয়ে বেরিয়ে চলেছে ছোট-বড় হালকা-ভারী পত্র-পত্রিকা। কিছু প্রকাশকও তাদের সঙ্গী। কবি ও সাহিত্যিকের ঘাটতি নেই। সাক্ষরতার হার অবশ্যই বেড়েছে (যদিও সিরিঅস পাঠকের সংখ্যা সে-অনুপাতে বাড়েনি)। মাতৃভাষার প্রতি মমতায়, বিনা দক্ষিণায় যাঁরা অর্থনীতি, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি নিয়ে লিখে চলেন— তাঁরাই তো বাঙলার ভবিষ্যৎ। বাজারি খবরের কাগজ আর ব্যবসাদার পত্র-পত্রিকাই বরং বাঙলা ভাষা ও বাঙালি সমাজের পক্ষে, হুতোমের ভাষায় ‘প্রকৃত জোলাপ’। সব বাধা সত্ত্বেও বাঙলা ভাষাকে গত দু’শ বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছেন কিছু ক্ষমতাবান লেখক ও বক্তা, কিছু উদ্যোগী প্রকাশক আর ছোট পত্রিকার সম্পাদক। এত দুর্দশার মধ্যেও বাঙলা ভাষা যদি বহাল তবিয়তে বেঁচেবর্তে থাকে, তার জন্যে যাবতীয় সাধুবাদ এঁদেরই পাওনা।”

কথাগুলো বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের ভালভাবে বোঝা দরকার। আর বুঝতে হবে কতিপয় লেখককে। ‘কী লিখব?’ সেটা তো জরুরি বটেই, ‘কোথায় লিখব?’— সেটাও কম জরুরি নয়। প্রতিষ্ঠান-বিরোধী পত্র-পত্রিকায় লিখে যাঁদের লেখক পরিচিতি ঘটে, ওই পত্রিকার পাঠকরা যাঁদের লেখার কথা প্রচার করেন তাঁদের কয়েকজনের কথা বলছি। সামান্য পরিচিতি পাওয়ার পরেই এই লেখকেরা দশ বছরে একবার বাজারি পত্রিকার কয়েক বর্গ সেন্টিমিটার জায়গায় লেখার আহ্বান পেলে যেভাবে হেদিয়ে পড়েন তা দেখলে ভারী তাজ্জব বনে যেতে হয়।

এবার আসা যাক ১৯০৫ সালে বাংলা ভাষা ভাগের ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী চেষ্টার প্রসঙ্গে। যখন “বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আস্তে আস্তে জনমত গড়ে উঠছে শহরে-গ্রামে এই সময়ে সরকারের একটি কমিটি একটি সুপারিশ করল: প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রচলিত লিখিত বাঙলার বদলে বিভিন্ন স্থানীয় উপভাষা [ডায়ালেক্ট] ব্যবহার করা হোক। …কমিটির যুক্তি ছিল বাঙলা পাঠ্যপুস্তকের ভাষায় সংস্কৃতর ভাগ বেশি। চাষির ছেলেদের তা বুঝতে অসুবিধে হয়।”

লিখিত বাংলাকে চারটি উপভাষায় ভাগ করার কথা বলা হয়। এই খবর বেরনো মাত্র বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রবল আপত্তি ওঠে। যে কোনও ভাষারই অনেক ক’টি উপভাষা বা ডায়লেক্ট থাকে। চল্লিশ-পঞ্চাশ কিলোমিটার অন্তর অন্তরই কথ্যভাষার রূপ পাল্টে যায়। কিন্তু লিখিত ভাষা একটাই থাকে। ইংল্যান্ডেও তাই হয়। চাষির ছেলেদের বোঝার সুবিধের অজুহাতে এই ভাষাভাগের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন এখনকার স্কটিশ চার্চ কলেজে, নাম ‘সফলতার সদুপায়’। সেখানে তিনি বলেন,

“ইংরেজের দেশেও চাষা যথেষ্ট আছে এবং সেখানে যে ভাষায় পাঠ্যগ্রন্থ লেখা হয় তাহা সকল চাষার মধ্যে প্রচলিত নহে। ল্যাঙ্কাশিয়রের উপভাষায় ল্যাঙ্কাশিয়রের চাষীদের বিশেষ উপকারের জন্যে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন হইতেছে না। স্পষ্টই দেখা যাইতেছে ইংল্যাণ্ডে চাষীদের শিক্ষা সুগম করা যদিও নিশ্চয়ই matter of great importance, তথাপি ইংল্যাণ্ডের সর্বত্র ইংরেজিভাষার ঐক্যরক্ষা করা matter of great importance … সুতরাং সেখানে ভাষাকে চারটুকরা করিয়া চাষীদের কিঞ্চিৎ ক্লেশলাঘব করার কল্পনামাত্রও কোনো পাঁচজন বুদ্ধিমানের একত্র সম্মিলিত মাথার মধ্যে উদয় হইতেই পারে না।”

আসলে বাংলায় উনিশ শতকে এক নবজাগরণ ঘটেছিল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখের নেতৃত্বে। সেই ধারাতেই আসেন রবীন্দ্রনাথও। শিক্ষিত হিন্দু সমাজে এই নবজাগরণ ঘটলেও এর বিরাট প্রভাব পড়ে জাত-ধর্ম নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালি জাতির মধ্যে। অবশ্য চোখে ঠুলি পড়ে যে কোনও বিরাট জিনিস সম্বন্ধে ধারণা করতে গেলে ‘অন্ধের হস্তিদর্শনের’ মত সেই বিরাটকে খুবই সীমাবদ্ধ বলে মনে হয়। এখন যেমন কিছু অতি প্রগতিশীলদের বাংলার নবজাগরণ নিয়ে এমনই হস্তিদর্শন হচ্ছে। এই নবজাগরণের প্রাণপুরুষরা কেবল সতীদাহ উচ্ছেদ কিংবা বিধবা বিবাহ প্রবর্তনেই থেমে ছিলেন না। এঁদের কলমেই আধুনিক বাংলা গদ্য গড়ে ওঠে, এঁরাই বাংলায় জ্ঞান ও বিজ্ঞানের নানান বিষয়ে লিখতে আরম্ভ করেন, এঁরাই সেই উনিশ শতকে সেকুলার শিশুপাঠ্য লেখার ক্ষমতা ধরতেন, নারীশিক্ষার প্রবর্তন থেকে স্বাধীনতার মহামন্ত্রর উচ্চারণ— সবেতেই এঁদের অবদান। এমনকি প্রাচীন ভারতের বস্তুবাদচর্চার দরজাও এঁদের হাতেই খুলেছিল, এঁরাই দাবি করেছিলেন অসার ভাববাদী হিন্দু দর্শনের বদলে আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনকে পাঠ্য করার। এঁদের উদ্যোগে প্রভাবিত হয়ে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে বাঙালির এক নতুন আত্মপরিচয় গড়ে উঠেছিল। ভারতের আর কোথাও এমনটা হয়নি। আর এর প্রভাব এসে পড়েছিল সমাজের সবক্ষেত্রেই। সেই আত্মপরিচয়ের প্রমাণ মেলে ভারতের একমাত্র সফল স্বাধীনতার সংগ্রাম, বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে, পূর্ব পাকিস্তান ও বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষার জন্যে প্রাণদানকারী আন্দোলনে। লর্ড কার্জন সেটা অনেক আগেই বুঝেছিলেন। বাঙালির এই আত্মপরিচয় যে ইংরেজ শাসনের পক্ষে মোটেই সুবিধেজনক নয় সেটা তিনি আঁচ করেছিলেন। তাই বঙ্গভঙ্গ ও বাংলা ভাষাভাগের চেষ্টা। যদিও প্রতিবাদ প্রতিরোধের চাপে সেই বিভাজন থেকে সরে আসতে হয়েছিল।

তবে লর্ড কার্জনের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব হালে কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় কাঁধে নিয়েছেন। একদল তো প্রতিক্রিয়াশীল, আর একদল আবার অতিপ্রগতিশীল। বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিকে ভাঙার কার্জনীয় নীতি আবার নতুন বোতলে আমদানি করা হচ্ছে। চাষার ছেলের অজুহাতের বদলে এখন দেওয়া হচ্ছে সাব-অলটার্নদের অজুহাত। গরিব মেহনতি মানুষদের আর্থিক অবস্থা আর দাবিদাওয়াকে লঘু করে একদল পড়েছেন তাঁদের ভাষা আর সংস্কৃতি নিয়ে। যে যেমন আছে তাঁরা তেমনই থাক— সাব-অলটার্নপ্রেমীদের এ হেন অনৈতিহাসিক চিন্তা বেশ হাসির খোরাক যোগায়। কেউ লিখিত বাংলা ভাষাকে নানান উপভাষায় ভাঙতে চান। কারও মতে আবার, লিখিত বাংলা নাকি দরবারি ভাষা, সংস্কৃত বা ইংরেজির মত। এ তথ্য তাঁরা কোথায় পেয়েছেন সেটা অবশ্য খুলে বলেন না। কেউ কেউ আবার বাঙালি সংস্কৃতি বলতে যা বোঝায় তা কখনওই বাংলার সাব-অলটার্নদের সংস্কৃতি নয় বলে দাবি করেন। সংস্কৃতি বললে শুধু গান, বাজনা, নাটক বুঝলে যা যা কেচ্ছাকেলেঙ্কারি হতে পারে, তার সবই এইসব কথায় হচ্ছে। আসলে বোঝা যায়, বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে বাঙালির যে আত্মপরিচয় তাকে শুধু ইংরেজরাই অপছন্দ করত তা নয়, এখনও বেশ কিছু দিশি সাহেবের কাছে তা না-পসন্দ। এই প্রেক্ষিতে রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যর ‘বাঙলা ভাষার ভূত-ভবিষ্যৎ ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ একটি সময়োযোগী বই। অবশ্যই সংগ্রহযোগ্য।

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য ।। বাঙলা ভাষার ভূত-ভবিষ্যৎ ও অন্যান্য প্রবন্ধ ।। অবভাস 

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »