স্মৃতির প্রহরী
মঙ্গলদা আমাদের ইস্কুলে ঘণ্টা বাজাত। ক্লাস শেষ হলে মঙ্গলদা হেডমাস্টারের অফিসের সামনে ঝোলানো ঘণ্টায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে জানিয়ে দিত ইস্কুল শুরু। দ্বারবাসিনী ‘কুমার রাজেন্দ্র হায়ার সেকেন্ডারী স্কুল’ এই রুটিনে চলে আসছে অনেক বছর। ঘণ্টা বাজাত বলে মঙ্গলদার নাম ছিল ‘মঙ্গলঘণ্টা’। শুনে মঙ্গলদা রাগ করত না, উলটে বলত, আমার ঘণ্টা যদি কারও মঙ্গল করে তো বেশ। দোহারা চেহারা, দু-গাল বসা, ছোট চুল আর এক হাতে ছ’টা আঙুলের মঙ্গলদা খুব মিশুকে স্বভাবের। ঘণ্টা বাজানো ছাড়া তার আর একটি কাজ থাকত। হেডস্যারের ফাইল বয়ে এখান-সেখান নিয়ে যাওয়া। মাস্টারদের কাছে নোটিশ দেখাতে টিচার্স রুমে নিয়ে যাওয়া। মঙ্গলদাকে কেউ কোনও দিন রাগতে দেখেনি। তবে তার একটা দোষ ছিল। সে মাঝে মাঝেই দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে দাঁত খুঁটত। অনেকে তাকে বারণ করেছিল। শোনেনি। একদিন হেডস্যার দেখতে পেয়ে খুব বকেছিলেন। সেই থেকে লুকিয়ে এই কাজটি করত। লোকের চোখের আড়ালে।
ইস্কুলটি তখন ছিল লম্বা দোতলা বাড়ি। একতলা ও দোতলা মিলিয়ে ক্লাস। সামনে ফাঁকা মাঠ। পুব দিকে একটি পূজামণ্ডপ। সেখানে পুজো, নাটক, অনুষ্ঠান হত যখন যেমন। দুর্গাপুজো ও সরস্বতী পুজোতে হত জাঁকজমক। সারা বাড়ির গায়ে শ্যাওলার পুরু স্তর। তাতেই যেন প্রাচীন দেখাত ইস্কুলকে।
মঙ্গলদার কাজ ছিল ঠিক দশটায় ইস্কুল শুরুর ঘণ্টা বাজানো। কাঁসার ঘণ্টার ওপর ছোট্ট হাতুড়ির আঘাতে ঢং ঢং ঢং করে তিন বার বাজালে প্রাণচঞ্চল ইস্কুলটা হঠাৎই ঝপ করে বদলে যেত। ছাত্রছাত্রীরা চলে যেত ক্লাসে। চারিদিক শুনশান। পঁয়তাল্লিশ মিনিট অন্তত অন্তর সে ঘণ্টা বাজাত। আমরা ক্লাস শেষের ঘণ্টার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকতাম।
মঙ্গলদারকে পিছন থেকে দেখলে মনে হত এক পা মাটিতে পড়ে আর এক পা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে যায়। এক পা সামান্য ছোট ছিল মঙ্গলদার। বাঁ দিকের পা-টা একটু টেনে টেনে হাঁটে। তাতে তার হাঁটার একটা ছন্দ চোখে পড়ত। ধুতির ওপর ফুল শার্ট ছিল শীত বর্ষা গ্রীষ্মের পোশাক।
মঙ্গলদাকে নিয়ে অনেক গল্প ছিল। রোগাপটকা দেখতে হলে কী হবে, একবার সে নাকি এক ভাল্লুকের সঙ্গে লড়াই করে ভাল্লুককে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল। আমাদের গ্রামে এক ভাল্লুকওয়ালা এসেছিল শহর থেকে খেলা দেখাতে। বড়সড় ভাল্লুক। সারা গায়ে লোম, মাথা নিচু করে সে তার মনিবের সঙ্গে খেলা দেখিয়ে বেড়ায়। ইস্কুল থেকে কিছুটা দূরে হাটতলায় গরমের সময় ভাল্লুক নিয়ে খেলা দেখাতে বসেছে। মালিকের আদেশে ভাল্লুকটা নানান খেলা দেখায়। এক-একটি খেলা দেখানোর পর মালিক হাত পেতে বকশিশ নিচ্ছে। বেশ জমে গেছিল খেলা। গোল হয়ে বসে দাঁড়িয়ে লোকজন। এক সময় খেলা থামিয়ে মালিক হাত পেতে পয়সা নিতে মঙ্গলদার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গল হাত নেড়ে বলল, দেবে না। হঠাৎ ভাল্লুকটা এগিয়ে এসে মঙ্গলদার মুখের ওপর সোজা দাঁড়িয়ে উঠেছে। ভয়ে নার্ভাস হয়ে, কী করবে ঠিক না করতে পেরে মঙ্গলদা ভাল্লুকের গালে ঠাসিয়ে এক চড়। ভাল্লুকটা হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল এক মিনিট। এমন চড় খাবার অভিজ্ঞতা তার কোনও কালেই নেই। আর এই ফাঁকে মঙ্গলদা পকেটে হাত ঢুকিয়েছে। পকেটে ছিল হাতুড়ি। এবার ভাল্লুকটা আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ল মঙ্গলদার ওপর। মঙ্গলদা এক সেকেন্ড দেরি না করে ঘণ্টা বাজানোর হাতুড়ি দিয়ে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করল ভাল্লুকের ওপরের পাটির দাঁতের গোড়ায়। তিন তিনটি দাঁত উপড়ে ছিটকে গেল এদিক-ওদিক। গলগল করে রক্ত। সেই থেকে আর আমাদের গ্রামে ভাল্লুকের খেলা দেখাতে আসত না। পাশের গ্রামে খেলা দেখিয়ে চলে যেত। আমাদের মনখারাপ হত। ভাল্লুকের খেলা দেখতে পেতাম না। মঙ্গলদার তাতে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। সে হাতুড়ির গুণগান করে বেড়াত সুযোগ পেলেই।
আমাদের ইস্কুলের শেষ বর্ষে ঠিক করেছিলাম ‘সাজাহান’ নাটক হবে। প্রতিবছরই ইস্কুল থেকে বেরিয়ে যাওয়া ছাত্ররা কিছু না কিছু করে। আমাদের নাটক হবে শুনে মঙ্গলদা এসে বলল, তোদের সঙ্গে নাটক করব। আমাকে একটা রোল দে।
ঘটনাটা নতুন। প্রথাগতভাবে ছেলেরাই অভিনয় করে। আবার হঠাৎ মঙ্গলদা ঢুকে গেলে একজন ছেলের রোল মারা যাবে। আমরা সবাই চুপচাপ। অবস্থা বুঝতে পেরে মঙ্গলদা বলল, সেপাইয়ের রোল হলেও চলবে। আমার কোনও আপত্তি নেই। সংলাপ না থাকলেও কোনও ক্ষতি নেই।
সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। আমি সেনাপতি। আমার এক সৈনিকের রোলে মঙ্গলদাকে নিয়ে নেওয়া হল। যদিও এই রোলটা নাটকের বইতে নেই। সেটা আর মঙ্গলদাকে বললাম না। খুব খুশি হয়ে মঙ্গলদা বাড়ি ফিরে গেল। যেহেতু তার রোল নেই, মঙ্গলদার রোজ রোজ রিহার্সালে না এলেও চলবে। সেটা সে প্রথম দিনই বুঝে গিয়েছিল। একদিন আমাকে ডেকে বলল, নাটকে কি আমায় কোনও সংলাপ দেওয়া যাবে না?
তুমি তো সেপাই। তুমি আর কী সংলাপ বলবে?
দেখ না। দু-একটা শব্দ দেওয়া যায়?
আমি অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করলাম, সাজাহান যখন আমাকে কোনও আদেশ দিচ্ছে, তখন সে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলতে পারে, জাঁহাপনার কথা ভাল করে শুনে নিন।
সকলে বলল, বলতেই পারে, বিশ্বস্ত সেপাই বলতেই পারে। বলুক না। মনটাও ভাল হয়ে যাবে। তাই ঠিক হল। প্রতি দৃশ্যে সে আমার পাশে থাকবে।
আমাদের ক্লাসের মোটা জহর সেজেছে সাজাহান। তাকে মানিয়েছেও বেশ। এমনিতে গোলগাল মুখ, তার ওপর কাঁচা-পাকা দাড়ি। মুখটা বেশ লম্বাটে, গড়নে কুঁজো। তাকে একেবারেই এই রোলে মানিয়ে গেছে। আগে খেয়াল করিনি, মঙ্গলদা আমার থেকে উচ্চতায় একটু বড়। সেনাপতির থেকে সেপাই বড়, কেমন বেমানান লাগছে। কথাটা বলতে মঙ্গলদা বলল, সে আর কী এমন কথা। সাইকেলের চাকার টিউব কোমর থেকে কাঁধে পরে কিছু বেঁটে হয়ে যাব। মাথায় মাথায় হয়ে যাবে, চিন্তা করিস না। সেইমতো মঙ্গলদা সাইলেলের টিউব পরে মেকআপ রুমে তৈরি হয়ে এল। ঠিকই, আমার মাথায় মাথায়। একটি দৃশ্যে সে আমার পাশে দাঁড়িয়ে। সাজাহান আদেশ করেছে। সে আমার সঙ্গে জি জাঁহাপনা বলতে গিয়ে হঠাৎ ফট্ করে একটা শব্দ বেরিয়ে এল শরীরের পিছন থেকে। আর সঙ্গে সঙ্গে সে আমার থেকে লম্বা হয়ে উঠল। ঘাড় থেকে কোমরে যে টিউবটি টানা ছিল সেটা ছিঁড়ে গেছে। পুরনো টিউব। আর তার ধাক্কা সামলাতে না পেরে সে হাতের লাঠিটি আমার পায়ের কড়ে আঙুলের ওপর সজোরে বসিয়ে দিয়েছে। যেটা মাটিতে ঠোকার কথা ছিল।
চোখে আমার সর্ষে ফুল। যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে পায়ের পাতা। কড়ে আঙুলটা বোধ হয় গুঁড়িয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কড়ে আঙুলে কোনও সাড় নেই। অবশ। আমি বাবারে বাবারে বলে মঞ্চেই বসে পড়েছি। দর্শকরা বিভ্রান্ত। দূর থেকে তো কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তারা অবাক হয়ে দেখছে সেনাপতি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে মাটিতে বসে পড়েছে। সাজাহানের সংলাপ কী এমন ছিল যে, আমায় মাটিতে বসে পড়তে হল? সাজাহান তখন সংলাপ ছেড়ে চিৎকার করছে, জল নিয়ে এসো, বরফ নিয়ে এসো ওষুধের দোকান থেকে। আমি এক সময় পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি আমার পায়ের কাপড়ের জুতোর ওপর মঙ্গলদার লাঠি কড়ে আঙুলটাকে থেঁতলে দিয়েছে। রক্তে মোজা ভিজে গেছে। কাপড়ের জুতো, জুতোর ওপর রক্তের দাগ। খুব দুঃখ প্রকাশ করেছিল মঙ্গলদা। পরে আমায় বলেছিল, আমার দ্বারা আর নাটক হবে না। আমার জীবনে ঘণ্টা বাজানো ছাড়া আর কোনও কাজই হবে না।
দীর্ঘ ত্রিশ বছর পর আবার গ্রামে গেছি। জীবনজীবিকা সামলে আর যেতে পারিনি। প্রবাসে অনেক বছর। একদিন চলে এসেছি আমাদের গ্রামে। ইচ্ছে হয়েছে সেই সব চেনা মানুষ ও স্থান একবার দেখে আসব। ইস্কুল বাড়িটার বয়স হয়েছে। একদিকের দেওয়াল ভেঙে পড়েছিল, মেরামত হয়েছে। রং হয়নি। দোতলার পিছনে আমাদের ফিজিক্স ক্লাসের ঘরের বাইরে দেওয়াল ফাটিয়ে অশ্বত্থ গাছ। এই ঘরের জনালা দিয়ে পিছনের কদম গাছের ফুল এসে ঢুকত আমাদের ক্লাসে। সেই কদম গাছটা আর নেই। মণ্ডপটাও নোংরা, অপরিচ্ছন্ন পড়ে আছে এক দিকে। সেখানে এসেই আমার মঙ্গলদার কথা মনে পড়ল। শুনলাম, মঙ্গলদা একদিন ঘণ্টা বাজাতে বাজাতেই হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। অনেক দিন। সে বিয়ে করেনি। এক ভাই দেশ ছেড়ে চলে গেছে, কেউ জানে না। হেডস্যারে ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখি, সেই ছিপছিপে মঙ্গলদা ঘণ্টাটা ধরে দাঁড়িয়ে। এবার ঘণ্টায় পড়বে আঘাত। ক্লাস শুরুর ঘণ্টা। কী অদ্ভুত, মঙ্গলদার কথা মনে হতেই ইস্কুলের ঘণ্টার ধ্বনি কানে বাজছে। তাই বোধ হয়, মানুষ কোনও না কোনও জিনিস আগলে, অবলম্বন করেই চিরকাল বেঁচে থাকে। যেমন মঙ্গলদার ঘণ্টা!
জয়দেব বলল, ইস্কুলের নতুন বিল্ডিং হয়েছে। চল দেখিয়ে দি। আবার কবে আসবি। তখন বোধহয় সবই ধ্বংসস্তূপ দেখবি।
ইস্কুলের মাঠের পাশের যে প্লটটা পরিত্যক্ত ছিল, সেখানেই নতুন ইস্কুল। বিশাল তিনতলা বাড়ি। লম্বা করিডরে পাশাপাশি ক্লাসরুম। জয়দেব বলল, ইস্কুলটা বদলে গেছে। এখন আর এখানের কাছাকাছির কোনও মাস্টার নেই। সবাই দূর দূর থেকে গাড়ি চালিয়ে আসে। কেউ চুঁচুড়া, কেউ চন্দননগর। কেউ কলকাতা থেকে ডেলি প্যাসেঞ্জার। আমি অবাক হয়ে বলি, তাই নাকি?
জয়দেব বলল, ইস্কুল নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। ছাত্ররাও বদলে গেছে। চল, তোকে ইস্কুলের হেডমাস্টারের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।
আমরা দুজন একটা ঘরে ঢুকলাম। দেখলাম এক ভদ্রলোক বসে আছেন। খুব চিন্তিত মুখ। কোনও বিপদের মধ্যে আছেন। জয়দেব গ্রামপঞ্চায়েতের উপপ্রধান। সে বলল, আপনার সঙ্গে আলাপ করাতে এলাম। আমাদের ইস্কুলের শেষ হায়ার সেকেন্ডারি ব্যাচের বেস্ট স্টুডেন্ট।
ভদ্রলোক ইশারায় বললেন, বসুন। তিনি একটা কাগজের ওপর চোখ বোলাচ্ছিলেন। একসময়ে মুখ তুলে বললেন, তা এতদিন পর কী মনে করে?
জয়দেব বলল, নিজের ইস্কুলকে দেখতে। আমরা পুরনো ইস্কুলে গিয়েছিলাম। এখানেও নিয়ে এলাম।
ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন, কী দেখলেন?
আমি বললাম, কী আর দেখব? সবই তো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
তিনি একবার আমার আর জয়দেবের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। আর ঠিক সময় সারা ইস্কুল জুড়ে কর্কশ শব্দে বেল বেজে উঠল। প্রতিটি ফ্লোরে। একটা বিশাল হুল্লোড়ের শব্দ শোনা গেল বাইরে। ছোটাছুটির শব্দ কানে এল। দিনের পরবর্তী অংশের সূচনা পর্ব শুরু হল। পাশের শিক্ষকদের ঘর থেকে একে একে শিক্ষকদের ক্লাসের দিকে যাত্রা চোখে পড়ল। তীব্র ঘণ্টার শব্দে আমি কেমন চমকে উঠলাম।
হেডমাস্টার আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, নতুন এই শব্দটা কানে লাগল না আপনাদের?
আমি বললাম, ভীষণ কানে লাগল।
উনি রুমালে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, মঙ্গলঘণ্টা শুনতে পেলেন না তো?
আমি বললাম, ঠিক বলেছেন। এখনও কানে লেগে আছে।
ভদ্রলোক বললেন,আমারও। আমি যখন আসি, মঙ্গল তখনও বেঁচে। সেই ঘণ্টার কী মিষ্টি শব্দ? সেই শব্দে ছিল সকলের মিষ্টি আহ্বান। তার চলে যাবার পর আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম। এই ইস্কুলে পিতলের মঙ্গলঘণ্টা বাজাতে, কেউ করতে দিল না জানেন? তার বদলে এই ছ্যাড়ছেড়ে রিং।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কে বাধা দিল? আপনি তো সবার উপরে!
হেডমাস্টার হাসলেন, কিছুটা অসহায় মনে হল তাকে। আমরা দুই বন্ধু বেরিয়ে এলাম ইস্কুল থেকে। তখনও মঙ্গলঘণ্টার শব্দ কানে বাজছে আমার।
চিত্রণ: বিজন সাহা






