Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রোমেল রহমানের ছোটগল্প

আম্রিকান গর্ত

ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে বুদ্ধিজীবীরা কোনদিকে যাবে সেটা নিয়ে ঠেলাঠেলির এক পর্যায়ে যে যেদিকে পারল সেদিকে মিশে গেল। তুমুল মারামারি আর গোলাগুলি শুরু হলে আবার উরাধুরা দৌড় শুরু হয়। একজন লুঙ্গি পরা সিনিয়র বুদ্ধিজীবী মাঠের মধ্যে বাঁশ-পোতা গর্তে পা ঢুকে গিয়ে আছড়ে পড়লেন আর ‘ওরে বাবারে’ বলেই বললেন, আম্রিকার গর্তে পড়ছি রে!
প্রথমে লোকেরা ভাবল বৃদ্ধ বুদ্ধিজীবী একজন কমিউনিস্ট! যার আম্রিকা-জ্বর আছে। কিন্তু দৌড়ের মধ্যে যখন পিছন ফিরে সবাই দেখল লুঙ্গিপরা অগ্রজ গুরুস্থানীয় বিখ্যাত মানুষটি তাদের ভীষণ আপনজন, তখন কেউ কেউ ফিক করে হেসে ফেললেন। কেউ বিরক্তি নিয়ে বলেই ফেললেন, এদ্দিন পর সত্য বাইর হইল পা মচকায়া?
একজন বলল, উনি নিজে কোন কোম্পানির লুঙ্গি পিন্দেন সেইটা একবার জিগান! উনি যদি আইজ এমনসব কথাবার্তা বলেন, তাইলে আমাদের গোয়াটা মারলেন ক্যান এত বচ্ছর পাঠচক্র কইরা?
ঠিক এই সময়ে আরও কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর পা মাঠে ঘাসের আড়ালে থাকা বাঁশ-পোতা গর্তে ঢুকে মচকে গেল। ফলে প্রতিপক্ষ তাদের ধরে আচ্ছামতো পিটিয়ে ফিরে আসতে গিয়ে তাদেরও কেউ কেউ ওইসব আম্রিকান ফুটায় বা গর্তে পা ঢুকে আহত হল। ফলে সবাই মোটামুটি নিশ্চিত হল, লড়াইয়ের মাঝখানে মাঠে ছোট ছোট বাঁশ-পোতা গর্ত আম্রিকা খুঁড়ে রেখেছে, যাতে দৌড়ের মধ্যে আপনাআপনিই আহত হয় লড়াকুরা।
কিন্তু আম্রিকা এই গর্ত করল কবে এবং কাদের দিয়ে? এবং আসল উদ্দেশ্য কী গর্ত বা ফুটা করার?
একদল বলল, আমাদের লড়াইটা সাইজে রাখার জন্য তারা এই কাজ করছে। মানে দুই পক্ষ যেন মাপের মধ্যে থাকে।
একজন বলল, আমরা কি গলফের বল যে, ফুটায় গিয়া পড়ব আর সেই ফুটা কাইটা রাখতে হবে আম্রিকার?
আরেক দল বলল, এটা তাদের গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ, তারা গর্ত খুড়ছে যাতে আমরা তার মধ্যে পা দিয়ে আছাড় খায়া প্রতিপক্ষের হাতে ধরা খায়া বেশি বেশি ঠাপ খাই। আমাদের নিজেদের মইধ্যে গেঞ্জাম, রক্তপাত বাড়ানোর জন্য তারা এই কাম বানাইছে!
আরেক দল বলল, কিন্তু গর্তটা কাদের দিয়া করাইছে সেইটা জানা জরুরি।
ফলে একজন বলে ওঠে, যার মাথায়— ‘এইগুলান আম্রিকার গর্ত’ প্রথম আইছে সে-ই করছে এইটা! নাইলে ভারত পাকিস্তান রাশিয়া চীন থুইয়া আম্রিকা কইল ক্যা? সবাই মাথা নাড়ল।
অন্য একজন বল্ল, আম্রিকা কইতেই পারে, কারণ আম্রিকাই সারা দুনিয়ার পাছায় আঙুল দিয়া বেড়ায়। সবাই আবার মাথা নেড়ে বলল, তাও ঠিক!
তখন অন্য কেউ বলল, তা বইলা সবগুলা গর্ত আম্রিকার? হইতে তো পারে আম্রিকা চায়না রাশিয়া মিলামিশা গর্তগুলান বানাইছে?
এই কথা শুনেও সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
তখন একদল লাফিয়ে উঠে বলল, চীন থাকতে পারে আম্রিকার সাথে, তয় রাশিয়া নাই।
আরেকদল খেঁকিয়ে উঠে বলল, চীনের বালে কানতেছে ফুটা খুঁড়তে আম্রিকার সাথে!
এবার দেখা গেল এই দুই দেশের পক্ষের লোকেরা হাতাহাতিতে নেমে গেল। মাঝখানে যারা হাসি হাসি মুখে হাতাহাতি দেখছিল, তারা মনে মনে ভাবতে লাগল তারা নিজেরা কি তাইলে আম্রিকা? এরমধ্যে একজন চিৎকার দিয়ে বলল, নিজেরা পুন্দাপুন্দি না কইরা আগে খুঁইজা বাইর করো ফুটাগুলা যে করছে, সেই লোকটা কে? সেই এজেন্ট কেডা যে, আম্রিকার ফুটা খুঁড়তেছে এইখানে? সবাই মাথা নেড়ে পরস্পরের দিকে তাকায়৷
ঠিক তখন সেই লুঙ্গিওয়ালা বলে ওঠে, আচ্ছা যেই মাঠে ফুটা করছে আম্রিকা, সেই মাঠটা কার?
সবাই বলে, আমাদের! পাবলিকের মাঠ।
লুঙ্গিওয়ালা বলে, সে তো দেশটাই আমাদের। কিন্তু দেখভাল করার একজন তো আছে মানে যিনি রাখাল, তিনি কে? সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। লুঙ্গিওয়ালা বলে, ডিসির মাঠ বইলা চিনে সবাই। তার মানে ডিসি এইটা পাবলিকের পক্ষে দেখভাল করে। তাইলে ওই ডিসিরে আগে জিজ্ঞাস করো, মাঠে শত শত ফুটা করল কে?
দল ধরে সবাই ডিসি অফিসের দিকে গিয়ে তাকে ঘেরাও করল।
একদল স্লোগান তুলল, ‘বাংলা থুইয়া ফরেন মাল, আম্রিকার দালাল।’
কিন্তু ডিসি বুদ্ধিমান প্রাণী। তিনি বিস্তারিত শুনে বললেন, কয়দিন আগে কনসার্ট আয়োজন হইসিল ডিসির মাঠে, সঙ্গে তিনদিনের মেলা। এইগুলা ওই প্যান্ডেল, স্টলের জন্য পোঁতা বাঁশের গর্ত। কিন্তু আপনারা যে এই মাঠেই রণক্ষেত্র করবেন, সেইটা জানলে ফুটাগুলা বুজায় দিতাম।
তখন সেই লুঙ্গিপরা বুদ্ধিজীবী বলল, দেখো অবস্থা! আম্রিকার খেল দেখো। আমার দেশের ডিসিরে দিয়া আমাদের মারার গর্ত খোঁড়ায়। কনসার্ট, মেলা ইত্যাদির ফাঁদ পাইতা। এখন দেখতে হবে এই কনসার্ট বা মেলার বাজেট আসল কই থিকা? এইটা কি পাব্লিকের পয়সা বাকি মার্কিন চালান?
হতভম্ব ডিসি বুঝে ফেলল গর্তে তাকে ঠেলে ফেলা হচ্ছে। ফলে মুহূর্তের মধ্যে সে বলে উঠল, স্যার আপনি তো আম্রিকায় পড়াশোনা করে এসেছেন। লোকে যদি বলে আপনি তাদের এজেন্ট, এইটা কি অবিশ্বাস করার সুযোগ আছে?
উপস্থিত সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল এবং পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মিচকি হাসি চেপে রাখল।

চিত্রণ: মনিকা সাহা (রাশিয়া)

Advertisement

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × 5 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »