বাইনোকুলারের ওপারে যে রহস্যময়ী
স্কুল ছুটি হওয়ার আগের পিরিয়ডে সুনীল আমাকে বলল, আজ আমাদের বাড়ি বাইনোকুলার আসবে। তুই যাবি দেখতে?
আকাশে তখন বাদল মেঘেরা ঘোঁট পাকাচ্ছে। মাঝে মাঝেই হাঁক পাড়ছে মেঘের দল। সুনীলের কথাটা শেষ হয়েছে কী হয়নি অমনি মেঘ গর্জায়। আমি শুনলাম মেঘ বলছে, খবরদার যাসনি। আজ বানভাসি করে দেব। বাড়ি ফিরতে পারবি না।
মেঘের কথা মিথ্যে হয় না। আমাদের ক্লাসরুমের আলোগুলো জ্বেলে ক্লাস নিচ্ছেন সুধীরঞ্জনবাবু। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস। কী রে, যাবি তো নাকি? সুনীল আমার উত্তর চাইছে।
ওকে না করাটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কেননা ওর বাড়ির প্রতি আমার একটা দুর্লভ টান ছিল। সেকালের মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের ছবি যেমন হত, সুনীলদের পরিবারটা ছিল তা থেকে উত্তর-দক্ষিণ আলাদা। ওদের বাড়ির ভেতরকার গন্ধটা আমাকে একটা ঝিমঝিমে মৌতাত ধরাত। আর ছিল ওদের অবহেলায় পড়ে থাকা উপচে ওঠা বৈভব।
আকাশের ধমকানি গায়ে মাখলাম না। বললাম, তোকে কোনওদিন কি না বলেছি? শুধু ভাবছিলাম বৃষ্টির কথা। রাস্তায় জল জমে গেলে কেলো হবে। আমাদের বাড়ির সামনে কোমর জল দাঁড়িয়ে যায় তা তো তুই জানিস। সুনীল আমার পাশে একটু ঝুঁকে পড়ে যেই না বলেছে, তোদের বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ি ২০০ মিটার… অমনি সুধীরঞ্জনবাবু বললেন, ওহে তোমাদের প্রেমালাপটা থামালে বড়ু চণ্ডীদাসের ক্লাসরুমে ঢোকার সুবিধা হয়। ক্লাসে একটা হালকা হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়ল, পুকুরে ঢিল ছুড়লে যেমনটা হয়।
সেইদিনকার মেঘের দল ছিল বোধহয় ফুটো মস্তান। নইলে পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগেই তারা আকাশ থেকে কেটে পড়ে? তখনও কনে-দেখা আলোর মানে বুঝিনি কিন্তু এক অপরূপ আলোর ছটায় স্কুল বিল্ডিং, সবুজ মাঠ, গোলপোস্ট, বাগানের গাছপালা আনন্দে একেবারে টইটুম্বুর। সেই আলো দেখে স্যার হঠাৎ পড়া থামিয়ে বলেছিলেন, ‘মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়/ আড়ালে তার সূর্য হাসে।’ তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কার লেখা রে? কেউ হাত তুলল না দেখে স্যার নিজেই বলে যান, ‘হারা শশীর হারা হাসি/ অন্ধকারেই ফিরে আসে।’ তারপর বলেছিলেন, না রবীন্দ্রনাথ নন। ছন্দের জাদুকর– সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।
সুনীলের বাড়িতে যখন ঢুকছি তখন শেষবেলার রোদ বেশ চড়া। সেটা ছিল শ্রাবণের শেষ। তখনও কলকাতার মানুষ কোনও বহুতল দেখেনি। আমাদের ভবানীপুরে তখন গরিব, মধ্যবিত্ত আর বড়লোক বাঙালিতে ভরপুর। ওদের বাড়িতে ঢুকতে গেলে ডানদিকে তাকালে আমাদের বাড়ি দেখা যায়। দেখলাম, দোতলার বারান্দায় কেউ নেই। ওর বাড়িতে সেদিন যে মোগলাই পরোটা আর কষা মাংসের গন্ধ পেয়েছিলাম, তা আজও মনে আছে।
সুনীলদের ছোট বাড়ি কিন্তু অনেক মানুষ। যাকে বলে গিজগিজে ভিড়। ওদের বৈঠকখানায় বসার অনুমতি ছিল না। কেননা ওই ঘরটা ছিল ওদের বাবার জন্য শুধুমাত্র নির্দিষ্ট। ওর বাবা ছিলেন থানার দারোগা। কলকাতার নানা থানায় পোস্টিং হলেও তিনি বাড়ি থেকেই যাতায়াত করতেন। কদাচিৎ ছুটি মিললে ওই ঘরে বসত সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা। তখন ওদের বাড়ি থেকে ভেসে আসত ভুরভুরে বিদেশি তামাকের ধোঁয়া। যার সঙ্গে মিশে থাকত কেমন একটা কুলের আচারের গন্ধ। সেই সময় ঘরে বেজে উঠত কাচের গ্লাসের গা ছোঁয়াছু্ঁয়ির শব্দ। কী আশ্চর্য, আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কিছুতেই প্রশ্ন করতে দেয়নি সুনীলকে, ঘরে ওটা কীসের গন্ধ রে? পরিণত বয়সে যেদিন প্রথম কুলের আচারের গন্ধ-উৎসের সঙ্গে মুখোমুখি হই, সেদিন বুঝি মদিরার গন্ধটা ওইরকম টোকো ধরনেরই হয়।
সুনীল ছিল আমার অত্যন্ত অন্তরঙ্গ সুহৃদ। বাড়ির অনেক কথা সে এমন অবলীলায় বলে দিত যে, আমি অবাক হতাম। আসলে ও বিশ্বাস করত, ওর আর আমার মধ্যে যেসব কথাবার্তা হয়, তা কোনওদিন তিন কান হবে না। সেদিন যেমন সে বাইনোকুলার দেখাতে ডেকেছিল, তেমনই ডাক আরও কয়েকবার পেয়েছিলাম। তার মাস তিনেক আগে ও বলেছিল, আজ আমাদের বাড়ি এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা আসবে। দাম পড়েছে পাঁচ হাজার টাকা। সে আমলের পাঁচ হাজারে একটা বড় ক্লাবের দুর্গাপুজো হয়ে যেত। খুব ইচ্ছে করত ওকে জিজ্ঞাসা করতে, এত টাকার জিনিস এমন ঘনঘন আসে কীভাবে ওদের বাড়িতে? কিন্তু ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ফের বাকরোধ করেছিল একেবারে ঠিক মুহূর্তে। তবে একই পাড়ায় বাড়ি হওয়ায় এর-তার মুখ থেকে ওর বাবার সম্বন্ধে বিস্তর খবরাখবর পেতাম। আর সেই সব খবরে সত্যের আধিক্য থাকত বলেই সুনীল সব সময় বলত, আজ আমাদের বাড়ি এটা কিংবা ওটা আসবে। কে সেটা আনছেন কিনে কিংবা কেউ উপহার হিসেবে দিচ্ছেন কি না তা সব সময়ই সে উহ্য রাখত।
স্কুল থেকে ফিরেছি বলে প্রচুর খাওয়ালেন ওর মা। মোগলাই পরোটা, কষা মাংস আর আমের কুচি দেওয়া ক্ষীর। মাসিমা আমাকে ভালবাসতেন খুব। বললেন, খেয়েদেয়ে নতুন জিনিসটা দেখে যাস। সানি কিছু বলেনি তোকে? আমি বললাম, মাসিমা, সেই জন্যই তো এলাম আজ। মাসিমা বললেন, ওটা সানির ঘরেই আছে।
বাইনোকুলারটা একটা প্যাকেটের মধ্যে ছিল। সেটাকে মুক্ত করতেই ঘরে একটা বিদেশি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। ও সেটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বলল, এটা রাশিয়ায় তৈরি, টেন্ট কোম্পানির। চল, ছাদে না গেলে এর পাওয়ার বোঝা যাবে না।
ছাদে উঠে দেখি, আকাশের রং ডিমের কুসুমের মতো হয়ে আছে। আর আকাশ জুড়ে নরম একটা আলোর মাখামাখি। সুনীল তখন আকাশে পাখি কিংবা এরোপ্লেন দেখার চেষ্টা করছে। আমি ঠিক ওর পিছনে। অপেক্ষায় আছি কখন ও বাইনোকুলারটা হাতে দেবে। সুনীল একটু পর বাইনোকুলারটা নিচে নামিয়ে দেখছিল আশপাশের বাড়ির ছাদ, বারান্দা এবং শেষ পর্যন্ত বাড়ির সামনের রাস্তা। দেখতে দেখতেই সে মন্তব্য করছিল নানা রকম। যেমন, খুব পাওয়ারফুল বাইনোকুলার। কিংবা দত্তবাবুর কপালের আঁচিলটা পর্যন্ত বিরাট করে দেখা যাচ্ছে। বাড়ির কার্নিশে একটা পায়রা ডিম পেড়েছিল। সেটা ভাল করে দেখতে গিয়েই হল চিত্তির। তা দিতে বসা মা পায়রা উড়ে এসে সুনীলের সামনে ঝটাপটি লাগিয়ে দিল। ওকে কাটিয়ে নিচের রাস্তার দিকে বহুক্ষণ মন দিয়ে কী যেন দেখছিল ও। আমি অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কীরে এতক্ষণ সময় নিয়ে কী দেখছিস? একটু পরেই ও যন্ত্রটা আমার হাতে দিয়ে বলল, চ্যাটার্জিদের বাড়ির রকটা ঝপ করে দেখে নে। বাইনোকুলারটা সে যখন আমাকে দিল, দেখি ওর মুখটা লাল হয়ে আছে।
বাইনোকুলার তো আর মানুষের বা নিজের চোখ নয় যে, ইচ্ছে মাত্রই ফোকাসিং করে অবজেক্ট দেখে নেওয়া যাবে। ভারী বস্তুটাকে সাবধানে হাতে ধরে ধাতস্থ হতেই সময় লাগল খানিকটা। তারপর চাটুজ্জেদের রকে পৌঁছবার আগে বাইনোকুলার আমার সামনে নিয়ে এল মস্ত একটা টেকো মাথা (বাচ্চুর বাবা), গোটা চারেক নেড়ি, ফুটপাতে বসা বিড়িওয়ালা এবং এবং। প্রথমটা দেখে চিনতেই পারিনি। একেবারে অন্যরকম। আর এত কাছে যে, আমি ভয় পেয়ে যন্ত্রটা চোখ থেকে নামিয়ে ছাদের মাঝখানে চলে আসি। সুনীল বলল কী হল? আমি বললাম, ওরে ও তো পিন্টুর বড়দি। সুনীল বলল, ওর একটা নামও আছে। তা বুঝি তুই জানিস না যেন! আমি বললাম, জানব না কেন? নন্দিনী। ভাল নাম রাজনন্দিনী। সুনীল বলে, ইয়েস। এবার ওকে স্রেফ নন্দিনী হিসেবে ভাল করে দেখ। একটা অদ্ভুত ফিলিং হবে কিন্তু। একটু আগে আমারও হচ্ছিল। অতএব ফের পাঁচিলের সামনে যাই এবং সাবধানে নন্দিনীকে ফোকাস করি। হ্যাঁরে, বাইনোকুলার কি মানুষকে সুন্দর করে তোলে? আমি ফিসফিস করে জানতে চাইলাম। সুনীল বলল, আগে দেখ। এবং আমি ফের দেখি। আজন্ম চেনা পিন্টুর বড়দি নন্দিনী যেন নতুন হয়ে আমার চোখে ধরা দেয়। উজ্জ্বল সোনালি আলোর ছটা তখন আর নেই। তবু সেই নরম কমলা আলোয় নন্দিনী যেন পোটোপাড়ার লক্ষ্মী ঠাকুর। একটা আটপৌরে শাড়ি, তাও তখন কী ঝলমলে। আমি দেখতে থাকি নন্দিনীকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। তার চোখের এত ঘন গভীর কালো পাতা কখনও চোখেই পড়েনি আমার। ওর পায়ের পাতাটা দেখে আমি মূর্ছা যাই আর কী। ওর মুখমণ্ডল, কানের লতি, বাহুমূল, শরীরের উপর থেকে নিচ প্রতি ইঞ্চি দেখি আর ভাবি, নন্দিনীর চেয়ে সুন্দরী বুঝি ভূভারতে নেই। সুনীল একটু পরে যন্ত্রটা আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলল, নে নে খুব হয়েছে। আর অত মেয়ে দেখতে হবে না। চল, নিচে গিয়ে বাইনোকুলারের মেকানিজমটা পড়ি ভাল করে।
আমি বলেছিলাম, আমি ফিজিক্স পড়তে চাই না। সুনীল অবাক হল একটু। তারপর বলল, কেন? আমি বললাম, ফিজিক্স বাইনোকুলারের আদ্যোপান্ত বোঝাবে বটে কিন্তু পিন্টুর বড়দি কী করে আমাদের দম বন্ধ করে দিচ্ছিল, তা বোঝাতে পারবে কি? এখানেই বিজ্ঞানের হার। সুনীল বলল, সে কারণটা থাকতেও তো পারে। বললাম, আমি নন্দিনীর অপরূপা হয়ে ওঠার রহস্য সমাধান করতে চাই না। না। কিছুতেই না।
চিত্রণ: মুনির হোসেন







