Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রাম ঠাট্টা

অনেক দিন ভেবেছি রামকে কেন আমার তেমন দেবতা-টেবতা মনে হয় না! আসলে, এটা হয়তো আমার বাংলায় জন্মানোর কুফল। ছোট থেকে এক ম্যা-ম্যা ডাকের প্রজাতির লিঙ্গ নির্বিশেষে বিশেষণ হল ওই রাম। সেটি ছাড়াও আরও কয়েকটি মনুষ্যেতর প্রজাতিও আছে এই রাম বিশেষণযুক্ত দলে। কী করে এতে আমার ভক্তিভাব জন্মাবে!

স্কুলে কিংবা বাড়িতে যখনই কিছু ভুল হল অমনি ওই রামবিশিষ্ট প্রাণীগুলি আমার ডাকনাম হয়ে যেত। কাহাঁতক ভাল লাগে। এমনই একদিন রামবাঁদরে ভূষিত হয়ে মনখারাপ করে সাদা ইরেসারের পেটের ঠিক মাঝখানে পেন্সিলের সিস দিয়ে প্রবল আক্রোশে ফুটো করার আপ্রাণ চেষ্টা করছি, তখনি ঠাম্মি বলল, যা তো খোকা ভাঁড়ার থেকে রামদাটা আন তো!

‘রামদা’! এ আবার নতুন কোন দাদা এল আবার। আমার বিহ্বল মূর্তি দেখে হয়তো ঠাম্মির হুঁশ এল। বলল, ওরে ও খোকা, যা না বাবা, কাটারির মত বড়সড় দা-টা নিয়ে আয় শিগ্গির। সাবধানে আনিস; নিজের পা-টা আবার থেঁতো করিসনি। আমি নিশ্চিত জানতাম ঠাম্মির জায়গায় অন্য যে কেউ হলে, এমন সব ক্ষেত্রে, আমার একাধিক রাম বিশেষণ জুটত!

কিন্তু ঠাম্মি আমাকে কখনও কোনও আপত্তিকর ডাকনামে ডাকেনি। আমি চিরকালই খোকা। অবশ্য অবাক হয়ে দেখতাম ঠাম্মির কাছে অবলীলায় আমার বাবাও খোকা, দাদাও খোকা আবার আমিও খোকা। ঠাম্মি যখন ‘খোকা খোকা’ বলে হিমালয় অক্টেভে হাঁক দিত, আমি কিছুতেই বুঝতাম না কার জন্য সেই হাঁকডাক! বেশিরভাগ সময়েই আমার ভাগ্যে জুটত, কী রে হাঁদারাম, শুনতে পাচ্ছিস না, ঠাম্মি ডাকছে! তখন থেকেই আমি জানি রামের অর্থ ‘খুব বড়’ কিছু কিংবা ‘অতিশয়’ এমন সব।
নিশ্চিত হলাম ওই অমর যেদিন ক্লাসে— ন’ উনিশং কত— লিখতে গিয়ে নামতা ভুলে খাতার পাশে রাফে গুণ করে ১৭১ বের করে মুছেও দিয়েছিল; কিন্তু অঙ্কের স্যার সোমনাথবাবু ঠিক ধরে ফেললেন; ব্যাটা, তুমি রামচালাক হয়েছ! বলে এমন ডাস্টার দিয়ে ঠকাঠক ঠকাঠক যে অমর সেদিনই মরে আর কী! আর জেনেছিলাম বেচারা চালাকি করলে হয়তো প্রাণে বাঁচত কিন্তু রামচালাকির খেলায় তার এমন মৃত্যুদণ্ড!

ছেলেবেলায় সহজ পাঠে সবে বাংলা বর্ণ চিনে প্রথম পাঠের ‘দীননাথ রাঁধে ভাত। গুরুদাস করে চাষ’ শেষ করে যেই দ্বিতীয় পাঠে জীবনের প্রথম পড়া গদ্যে ঢুকেছি অমনি, ‘রাম বনে ফুল পাড়ে। গায়ে তার লাল শাল। হাতে তার সাজি।… ফুল তুলে রাম বাড়ি চলে।’ এ তো আমার চেনা ছবি।

শীতের ছুটিতে মামার বাড়ি গেলে দেখতাম ঠিক অমন পোশাকেই ‘গল্পদাদু’ ভোরে বাগানে ফুল তুলতে আসতেন। ফুল তোলা হলে লাল শালের নিচে সাজিটি ধরে কত রকম সব গল্প বলতেন। সেই গল্পের লোভে আমরা ছোটরা শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়তে কোনওই আপত্তি করিনি কখনও। আর সেই গল্প, লাল শাল, সাজি, ফুলের সঙ্গে মিলেমিশে রামচন্দ্রও কখন যেন গল্পদাদুর মত বন্ধু হয়ে গেল।

বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগের দশম পাঠে, ‘রাম, তুমি হাসিতেছ কেন। নবীন কেন বসিয়া আছে’ পড়ার পর থেকেই রাম আমার স্কুলের বেঞ্চে পাশে বসা ছেলেটি, যাকে ওই বইটির ষোড়শ পাঠে স্যার ধমকে বলতে পারেন, ‘দেখ রাম, কাল তুমি পড়িবার সময় বড় গোল করিয়াছিলে।’

এরপর বাংলা রিডিং পড়ায় সড়গড় হতেই হাতে এল যোগীন সরকারের ‘ছোটদের রামায়ণ’; সেই পাতলা চটি ছোটখাটো বইটির আশি পাতার মধ্যেই সাতকাণ্ড রামায়ণ। তারপরেই হাতে পেলাম উপেন্দ্রকিশোরের ‘ছেলেদের রামায়ণ’ আর এসব কৃশকায় বইগুলোই আমায় রামরাজাকে চেনাল। হাওড়ার ব্যাঁটরার ছেলে; তদ্দিনে পাবলিক লাইব্রেরির স্কুলে ক্লাস থ্রি। ব্রজর বাড়ি রামরাজাতলা। নির্ঘাত তার বাড়ি অযোধ্যার ধারেপাশে; এমন গর্বের বন্ধু পেয়ে আমার চেতনা ছাপ্পান্ন ইঞ্চি। তবে বৃত্তি পরীক্ষার গণ্ডি পেরোতেই উপহার পেলুম লীলা মজুমদারের ‘লঙ্কাদহন পালা’। উঃ, সে কী নাটক রে ভাই। সেই বইটিই আমায় শিখিয়েছে ‘ঠাট্টার সময়ে ইয়ার্কি’ করতে নেই। আর জানলাম সেই গুরুবাক্য, ‘রামায়ণে বাহাদুর রামচন্দ্র নয়/ কহ বাহু তুলে বদন খুলে/ হল্লুমানের জয়।।’ তাই বলি, কেন ইতিউতি সিঁদুরমাখা কমলা রঙের পেল্লাই হল্লুমান মূর্তি বসানো আছে! এরপর যখন দশ ক্লাসের বাংলা বইয়ে মধুসূদন দত্ত, ‘রাবণ শ্বশুর মম, মেঘনাদ স্বামী, আমি কি ডরাই, সখি, … …?’ তখন রামচন্দ্র একেবারে পথে বসল। এইজন্যই বাংলার মোড়ে মোড়ে শনিমন্দির আছে, কিন্তু রামমন্দির কই!

আম বাঙালির ঠাকুরঘরে তাই কেষ্ট ঠাকুর, নারায়ণ কিংবা লক্ষ্মী, কালী, শিব সব আছে। রাম দেবতাটি কদাচ। সেই ইস্কুলবেলা থেকেই রাম আমার বনে ফুল পাড়া, পড়া না করা বন্ধুটিই রয়ে গেল। দেবতা তার আর হয়ে ওঠা হল না।

চিত্রণ : চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

One Response

  1. দারুন আ- রাম পেলাম এই বি- রাম হীন রম্য স্মৃতিচারণ পড়ে। তবে এর মধ্যে বাঙালির রাম ভক্তির একটি বিশেষ বস্তু, “বৃদ্ধ সন্যাসী ” সম্পর্কে কোন উল্লেখ নেই কেন? আর একটা প্রশ্ন আছে, “হে রাম” আর “হারাম” এর মধ্যে রাম এক সেই একই?

    ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three + five =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »