Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

মার্কিন প্রবন্ধ ।। অনুবাদ: গৌতম চক্রবর্তী

সমাপ্তির অস্বীকৃতি

লিন হেজিনিয়ান

গৌ ত ম  চ ক্র ব র্তী

ভূমিকা

লিন হেজিনিয়ান একজন কবি, অনুবাদক এবং প্রাবন্ধিক। তিনি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পরিচিত ল্যাঙ্গুয়েজ পোয়েট্রি আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তি হিসেবে। সাতের দশকে ক্যালিফোর্নিয়ার বে এলাকায় একদল লেখক ও কবি এই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। ল্যাঙ্গুয়েজ পোয়েট্রি সাধারণত আখ্যানবিহীন সাহিত্যরূপ এবং সহযোগিতামূলক চর্চাকে সমর্থন করত, এবং এই দু’টি বিষয়কেই তারা প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করেছিল। এই গোষ্ঠীর লেখকেরা ভাষার বস্তুগত বৈশিষ্ট্য এবং সামাজিক দিক— উভয়কেই গুরুত্ব দিতেন। নতুন বাক্যের মতো বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে এই আন্দোলনের লেখকরা পাঠকদের নতুনভাবে সম্পৃক্ত করতে চেয়েছিলেন। এর ফলে পাঠক কেবল গ্রহণকারী না থেকে পাঠ ও অর্থ-নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠবেন। এই আন্দোলনের অন্য লেখকদের মতোই, হেজিনিয়ানের নিজের লেখালেখিতেও দর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব এবং পরীক্ষামূলক গীতিময়তার মিশ্রণ দেখা যায়। কাব্যতত্ত্ব নিয়ে লিনের প্রবন্ধসমূহ তাঁর সাহিত্যকর্ম এবং সামগ্রিকভাবে আন্দোলনের উদ্দেশ্য বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হেজিনিয়ানের কাব্যতত্ত্ব বিষয়ক প্রবন্ধ ‘সমাপ্তির অস্বীকৃতি’ ১৯৮৩ সালে প্রথমে একটি বক্তৃতা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল। ল্যাঙ্গুয়েজ পোয়েট্রি সম্প্রদায়ে তখন ভাষা, লিঙ্গ এবং ক্ষমতা নিয়ে যে আলোচনা চলছিল, আংশিকভাবে তার প্রতিক্রিয়া হিসেবেও বক্তৃতাটি লেখা হয়। প্রবন্ধটিতে কিছু নারীবাদী সমালোচনার উল্লেখ থাকলেও মূলত এটি ভাষা, অর্থ এবং রূপ নিয়ে আলোচনা করে। এই প্রবন্ধে হেজিনিয়ান দুই ধরনের পাঠের কথা বলেন: ‘বদ্ধ’ এবং ‘মুক্ত’। তাঁর মতে, ‘বদ্ধ পাঠ’ হল সেই ধরনের লেখা, যা পাঠককে একটি নির্দিষ্ট বা একক ব্যাখ্যার দিকে নিয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে তিনি সমসাময়িক কিছু গীতিকবিতা এবং গোয়েন্দাকাহিনির কথা উল্লেখ করেন। অন্য দিকে, ‘মুক্ত পাঠে’ রচনার সব উপাদান সর্বাধিক সক্রিয় থাকে এবং সেখানে একাধিক পাঠ বা ব্যাখ্যার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এরপর হেজিনিয়ান এমন কিছু কৌশলের কথা বলেন, যা একটি পাঠকে ‘মুক্ত’ করে তোলে। এর মধ্যে আছে বিন্যাস ও পুনর্বিন্যাস, পুনরাবৃত্তি, এবং এমন রচনাশৈলী, যা লেখার মধ্যে কিছু ‘ফাঁক’ তৈরি করে— যা পাঠককে অবশ্যই পূরণ করতে হয়। পাঠকের ভূমিকাকে গুরুত্ব দেওয়া, লেখাকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা, এবং এই দুইয়ের রাজনৈতিক তাৎপর্য তুলে ধরার মাধ্যমে হেজিনিয়ানের প্রবন্ধটি ল্যাঙ্গুয়েজ পোয়েট্রি আন্দোলনের অনেক প্রধান লক্ষ্য ও উদ্বেগকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।
‘সমাপ্তির অস্বীকৃতি’ প্রবন্ধটি যত এগোতে থাকে, হেজিনিয়ান রূপ বা আঙ্গিকের ভূমিকাকে একটি সংগঠক নীতি হিসেবে বিশ্লেষণ করেন এবং ভাষার সেই সীমাবদ্ধতার কথা আলোচনা করেন, যার কারণে ভাষা আমাদের বিশ্বের অভিজ্ঞতার ‘বিশালতা ও অনিশ্চয়তা’ পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে না। শেষে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছন যে, প্রকৃত মুক্ত পাঠ আসলে অসম্ভব। কিন্তু শব্দ ও বাস্তব জগতের এই অমিলই আমাদেরকে আমাদের ধারণা এবং নিজেদেরকে পৃথিবী থেকে আলাদা করে চিনতে সাহায্য করে। কবিতা, ভাষাতত্ত্ব, দর্শন ও তত্ত্বের এক চমৎকার সমন্বয় হিসেবে ‘সমাপ্তির অস্বীকৃতি’ কোনওভাবেই শুধু একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়; এর প্রভাব আজও সমকালীন কবিতা ও কাব্যতত্ত্বে গভীরভাবে অনুভূত হয়।

‘সমাপ্তির অস্বীকৃতি’ মূলত একটি বক্তৃতা হিসেবে লেখা হয়েছিল এবং ১৯৮৩ সালের ১৭ এপ্রিল, সান ফ্রান্সিসকোর ৫৪৪ নাটোমা স্ট্রিটে প্রথম উপস্থাপিত হয়। এর কয়েক সপ্তাহ আগে ‘কে বলছেন?’ শীর্ষক বিশেষজ্ঞদের একটি আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ‘পোয়েটিকস’ জার্নাল-এর ‘কবিতা ও দর্শন’ সংখ্যা (৩য় খণ্ড) তখন প্রকাশের মুখে। ব্যারেট ওয়াটেন এবং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, এই জার্নাল-এর চতুর্থ খণ্ডের উপজীব্য হবে ‘নারী ও ভাষা’। লেখকসমাজের মধ্যে তখন লিঙ্গভিত্তিক প্রশ্ন নিয়ে খুবই ঘন ঘন আলোচনা হচ্ছিল। এই আলোচনা একদিকে যেমন দৃশ্যমান বাস্তব সমস্যাগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করছিল— অন্যায়ের এমন সব উদাহরণ, যা মানুষের কাজ ও জীবনে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলছিল— অন্য দিকে, তেমনই ক্ষমতার দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন আর বিশেষ করে অর্থের নৈতিকতা নিয়েও চিন্তা করছিল।
একই বছরে (১৯৮৩) কার্লা হ্যারিম্যানের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘দ্য মিডল’ প্রকাশিত হয়। এটিও প্রথমে একটি বক্তৃতা হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছিল। সাংগঠনিকভাবে উজ্জ্বল এই রচনা প্রচলিত (পিতৃতান্ত্রিক) ক্ষমতা-কাঠামোর বিরুদ্ধে এক তীব্র সমালোচনা— এমনকী একে ভেঙেচুরে দেওয়ার প্রচেষ্টা বললেও ভুল হবে না। ‘দ্য মিডল’-এ কর্তৃত্বের ক্ষমতা জায়গা ছেড়ে দেয় উদ্ভাবনের ক্ষমতাকে— বহুস্তরীয় মনোযোগের প্রাচুর্য ও সম্পাদনের শক্তি সহকারে। এখানে বিষয়গত অবস্থানটি ‘মাঝখানে’— এক অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতি, যা নিজেই অর্থ সৃষ্টি করে।
‘সমাপ্তির অস্বীকৃতি’ বক্তৃতায় আমি ‘বদ্ধ’ পাঠের কোনও উদাহরণ দিইনি। তবে এখন কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সমসাময়িক কিছু গীতিকবিতায় দেখা যায় এক ধরনের জবরদস্তিমূলক উদ্ঘাটনের প্রয়াস— যেখানে সর্বজনীন সত্যের দাবিতে এক আত্মতুষ্ট ভান থাকে, এবং কবিকে ‘সত্যের রক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অন্য দিকে, গোয়েন্দা কাহিনি হতে পারে ‘বদ্ধ’ পাঠের একটি ইতিবাচক উদাহরণ, কারণ তা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকে স্থিতিশীল, শান্ত এবং আশ্বাসদায়ক (এবং মূলত কোনও আকস্মিক উদ্ঘাটনবিহীন) রূপে তুলে ধরে। তবে, এর প্রভাব যতই আনন্দদায়ক হোক না কেন, ‘বদ্ধতা’ বা সমাপ্তির এই ধারণা আসলে এক ধরনের কল্পনা— মিথ্যা ও কল্পনা যে আরামদায়ক সুবিধাগুলো দেয়, তার মধ্যে একটি।
কিন্তু যদি ‘বদ্ধতার’ ইতিবাচক ও নেতিবাচক— উভয় ধরনের মডেলই থাকে, তবে একে প্রত্যাখ্যান করা কেন? পৃথিবীর এমন কি কোনও বৈশিষ্ট্য আছে, যা উন্মুক্ততাকে দাবি করে? ভাষার ভেতরেই কি এমন কিছু রয়েছে, যা সমাপ্তির প্রত্যাখ্যান বা অস্বীকৃতিকে বাধ্যতামূলক করে তোলে এবং বাস্তবায়িত করে?
আমি কেবল পরে থেকেই শুরু করতে পারি— বিশ্বকে বিশাল ও দুর্বহ হিসেবে অনুভব করে; প্রতিটি মুহূর্ত যেন উল্লম্ব ও অনুভূমিক দিক থেকে বিপুল তথ্যের চাপে দাঁড়িয়ে আছে— অস্পষ্টতা ও অর্থময়তায় পরিপূর্ণ, অনির্দিষ্ট, এবং নিশ্চিতভাবে অসম্পূর্ণ। এই সবকিছুকে এক বিশাল অবিভক্ত তথ্য ও পরিস্থিতির স্তূপে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করে, তা হল মানুষের পৃথক করার ক্ষমতা। ‘মুক্ত পাঠ’ এমন এক রচনা, যা একই সঙ্গে বিশ্বের বিশালতাকে স্বীকার করে এবং গঠনগতভাবে ভেদরেখা তৈরি করে। এই গঠন বা আঙ্গিকই উন্মোচনের পথ তৈরি করে। —লিন হেজিনিয়ান

‘দু’টি বিপদ কখনওই পৃথিবীকে তাড়া করা বন্ধ করে না: শৃঙ্খলা এবং বিশৃঙ্খলা।’ —পল ভ্যালেরি, সাহিত্যের টুকিটাকি (অ্যানালেক্টস)

লেখার প্রাথমিক অবস্থা, তার সূচনাবিন্দু, প্রায়ই লেখকের ভেতরের পরস্পরবিরোধী প্রবণতাগুলোর দ্বারা চিহ্নিত হয়। ভাষা যে এক ধরনের দোটানা সৃষ্টি করে, তা সমাধান করা যায় না। লেখক একদিকে সীমাবদ্ধতা, ধারণক্ষমতা ও সংহতির চাহিদা পূরণ করতে চান; অন্য দিকে, একই সঙ্গে এই পৃথিবীতে মুক্ত, অবাধ প্রবেশ ও মুক্ত প্রতিক্রিয়ার আকাঙ্ক্ষাও অনুভব করেন। মজার বিষয়, অন্তর্ভুক্তিমূলকতা শব্দটি দুই ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যদিও তার অর্থগত প্রাবল্য আলাদা। সীমাবদ্ধতার আকাঙ্ক্ষা চায় একটি সীমানা, আর সেই সীমানা টানতে গেলে ‘ভিতর’ ও ‘বাহির’, ‘প্রাসঙ্গিক’ ও ‘অপ্রাসঙ্গিক’, ‘অর্থপূর্ণ’ ও ‘অর্থহীন’-এর মধ্যে পার্থক্য করতে হয়। বিপরীতে, পৃথিবীতে অবাধ প্রবেশ ও সাড়া দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা (এক ধরনের আভিধানিক অভিঘাত) কিছুই বাদ দিতে চায় না। এখানে মূল প্রশ্নটি লেখকের বিষয়গত অবস্থানকে ঘিরে।
অন্য দিকে, ভাষার যে অচলাবস্থা অর্থাৎ একই সঙ্গে তার সৃজনশীল অবস্থা ও সমস্যা— তা হল শব্দ ও অর্থের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা। কিন্তু এটি কোনও বিমূর্ত স্তরে নয়; বরং এমন এক বস্তুগত স্তরে, যেখানে লেখককে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়— যেমন, লেখার জন্য উপযুক্ত কাঠামো তৈরি করা, তার সীমাবদ্ধতা কল্পনা করা ইত্যাদি— এবং তা করতে হয় ভাষার অফুরন্ত সম্ভাবনা ও অসীম সংমিশ্রণের মধ্যে দাঁড়িয়ে। লেখার আঙ্গিক কেবল আকৃতি নয়, শক্তিও বটে; আনুষ্ঠানিক প্রশ্নগুলো আসলে গতিশীলতার প্রশ্ন— লেখা কীভাবে, কোথায়, কেন অগ্রসর হয়; তার প্রকৃতি, দিক, সংখ্যা ও গতিবেগ কী। এই বস্তুগত দ্বন্দ্ব কবিতাকে ধারণা ও ভাষার প্রেক্ষাপটে একটি স্বতন্ত্র বস্তু হিসেবে দাঁড় করায়।
এই দ্বন্দ্বগুলো পরিচ্ছন্নভাবে সমান্তরাল নয়। আঙ্গিক সবসময় সমাপ্তি আনে না, যেমন অপরিবর্তিত পার্থিবতা সবসময় উন্মুক্ততা দেয় না। বরং আঙ্গিক ও চরম উন্মুক্ততার মিলনই হয়তো সেই ‘স্বর্গের’ এক রূপ, যার জন্য লেখা আকুল হয়ে থাকে— একটি স্বতন্ত্র অসীমতা প্রস্ফুটিত হয়।
স্পষ্টতার জন্য, ‘মুক্ত’ ও ‘বদ্ধ’ শব্দদু’টির একটি প্রাথমিক ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। ‘বদ্ধ পাঠ’ হল সেই লেখা, যেখানে সমস্ত উপাদান একটি নির্দিষ্ট পাঠের দিকে পরিচালিত হয়। প্রতিটি উপাদান সেই পাঠকেই নিশ্চিত করে এবং লেখাকে সম্ভাব্য দ্ব্যর্থতা থেকে মুক্ত করে। অন্য দিকে, ‘মুক্ত পাঠে’ সমস্ত উপাদান সর্বাধিক সক্রিয় অবস্থায় থাকে; এখানে ধারণা ও বস্তু যুক্তির সীমা অতিক্রম করেও (তাকে পরিত্যাগ না করে) লেখার মাত্রার মধ্যে প্রবেশ করে।
বিভিন্ন লেখায় ভিন্নভাবে হলেও, এমন কিছু গঠনগত কৌশল খুঁজে পাওয়া কঠিন নয় যা একটি কবিতার লেখাকে ‘মুক্ত’ করতে পারে। এর একটি প্রধান দিক হল বিন্যাস এবং পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া। ‘মুক্ত পাঠ’ সংজ্ঞাগতভাবেই পৃথিবী ও বিশেষত পাঠকের জন্য উন্মুক্ত। এটি পাঠকের অংশগ্রহণকে আমন্ত্রণ জানায়, লেখকের কর্তৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করে এবং সেই সূত্রে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শ্রেণিবিন্যাসে নিহিত কর্তৃত্বকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি এমন এক ধরনের লেখার পক্ষে কথা বলে যা নির্দেশমূলক নয়, বরং সৃষ্টিশীল ও উৎপাদনক্ষম। লেখক পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেন এবং কর্তৃত্ব-কে নীতি হিসেবে ও নিয়ন্ত্রণ-কে প্রেরণা হিসেবে মোকাবিলা করেন। ‘মুক্ত পাঠ’ প্রায়ই প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেয় বা তা পুরোভূমিতে রাখে— হয় মূল রচনার প্রক্রিয়া, নয়তো পাঠকের পরবর্তী নির্মাণের প্রক্রিয়া। ফলে এটি সেই সাংস্কৃতিক প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, যা লেখাকে চিহ্নিত ও স্থির করে পণ্যে পরিণত করতে চায়; অর্থাৎ এটি হ্রাস ও পণ্যায়ন-এর বিরোধিতা করে। লুস ইরিগারে যেমন, নারীবাচক ভাষ্যক্ষেত্রে এই প্রবণতাকে স্থাপন করে বলেন: ‘এটি আসলে এমন এক ভিন্ন অর্থনীতির প্রশ্ন, যা কোনও প্রকল্পের সরলরৈখিকতাকে ভেঙে দেয়, আকাঙ্ক্ষার লক্ষ্যবস্তুকে দুর্বল করে, আকাঙ্ক্ষাকে একক আনন্দে কেন্দ্রীভূত হওয়া থেকে বিস্ফোরিত করে এবং একমাত্রিক বয়ানের প্রতি আনুগত্যকে বিঘ্নিত করে।
‘ক্ষেত্র কর্ম’, হলে শব্দ ও পঙক্তিগুলো পৃষ্ঠা জুড়ে অনিয়মিতভাবে ছড়িয়ে থাকে। যেমন, রবার্ট গ্রেনিয়ার-এর পোস্টার/মানচিত্রধর্মী রচনা কেমব্রিজ মাস। ব্রুস অ্যানড্রুজ-এর ‘লাভ সং ৪১’ (এটিও প্রথমে পোস্টার আকারে প্রকাশিত হয়েছিল)। এই সব এমন কাজের স্পষ্ট উদাহরণ যেখানে পাঠের ক্রম আগে থেকে নির্ধারিত নয়। এই ধরনের রচনার প্রতিটি পাঠই একধরনের তাৎক্ষণিক সৃজন বা ইম্প্রোভাইজেশন; পাঠক সরলরেখায় এগোন না, বরং বক্ররেখা, ঘূর্ণি ও সংযোগস্থল পেরিয়ে সেই শব্দগুলোর দিকে যান, যেগুলো চোখে পড়ে বা বারবার মনোযোগ আকর্ষণ করে।
সাধারণত পুনরাবৃত্তি কোনও লেখাকে ঐক্যবদ্ধ করতে বা তার বিভিন্ন অংশে সুরমিল ঘটাতে ব্যবহৃত হয়— যেন সুর আবার মূল স্বরে ফিরে আসে। কিন্তু এই সব রচনায়, এবং কিছুটা ভিন্নভাবে আমার ‘মাই লাইফ’ গ্রন্থেও, পুনরাবৃত্তি আমাদের সেই প্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ করে। সেখানে আমরা কোনও ঘটনার (একটি বাক্য বা পঙক্তি) অর্থকে আলাদা, নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ করতে চাই। এখানে কিছু বাক্যাংশ পুনরায় ফিরে আসে, তবে নতুন প্রেক্ষাপটে নতুন গুরুত্ব নিয়ে; ফলে পুনরাবৃত্তি প্রথমে যে অর্থের কাঠামো স্পষ্ট মনে হয়েছিল, তাকে ভেঙে দেয়। প্রথম পাঠের অর্থ তখন বদলে যায়; অর্থ চলমান হয়ে ওঠে, সংশোধিত ও বিস্তৃত হয়, আর পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে যে পুনর্লিখন ঘটে, তা চিন্তার সমাপ্তিকে অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে দেয়।
তবে পাশাপাশি স্থাপনের জটিলতর রূপও আছে। পরবর্তী রচনা ‘রেসিসট্যান্স’-এ আমার উদ্দেশ্য ছিল একটি দীর্ঘ আকারের গীতিকবিতা লেখা। সেই কবিতায় সর্বাধিক উল্লম্ব তীব্রতা (যে একক মুহূর্তে ভাবনা হঠাৎ এসে পড়ে) এবং সর্বাধিক আনুভূমিক বিস্তার (যেখানে ভাবনাগুলো ভূদৃশ্য পেরিয়ে দিগন্ত ও আবহাওয়ায় পরিণত হয়) অর্জন করা। তবে আমি সফল হয়েছি, এমন কোনও দাবি করছি না।
আমি নিজের কাছে অনুচ্ছেদকে এমন একটি একক হিসেবে কল্পনা করেছিলাম, যা সময়ের একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত, মনের একটি নির্দিষ্ট অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে; সেই অনুচ্ছেদের মধ্যে সেই মুহূর্তে একসাথে সক্রিয় থাকবে মনের সব চিন্তা, চিন্তার খণ্ডাংশ, অনুভূতি, তাড়না— সব বিচিত্র, বিশেষ ও পরস্পরবিরোধী উপাদান। সেই মুহূর্তে, লেখকের কাছে, কবিতাটিই যেন একটি মন।
কাজটিকে যাতে বিচ্ছিন্ন অংশে ভেঙে গিয়ে এলোমেলো বাক্য-ধ্বংসাবশেষে পরিণত না হতে হয়, সেজন্য আমি বিভিন্ন বাক্যগঠনগত কৌশল ব্যবহার করেছি, যাতে ভাবনাগুলোর মধ্যে সংযোগ স্পষ্টভাবে নির্মিত হয়। বিভিন্ন বক্তব্য ব্যাকরণগত সামঞ্জস্যের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে; ভিন্ন জিনিস, ব্যাকরণগতভাবে একই রকম করে তোলার ফলে, একসঙ্গে অর্থবহ হয়ে ওঠে। ‘রেসিসট্যান্স’ শুরু হয়েছিল এভাবে:
ধৈর্য যেন কাগজের ওপর ছড়িয়ে রাখা। এর দৃশ্যাবলি লাভজনক এবং সমানভাবে বর্গাকার। দুই ডজন জেট রাতের আকাশে উড়ে যায়। বাইরে একটি গাড়ি ধীর, আরামদায়ক গিয়ারে পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠছে। চিন্তার প্রবাহ— অসম্ভব! এগুলোই পরিচিত জিনিসকে অচেনা করে তোলার সেই কৌশল, যার সঙ্গে আমরা এত পরিচিত।
এখানে ছয়টি বাক্য আছে, যার মধ্যে প্রথমটি দিয়ে শুরু হওয়া তিনটি বাক্য একই গঠনে নির্মিত: সাবজেক্ট–ভার্ব–প্রিপজিশনাল ফ্রেস। তিনটি প্রিপজিশন হল অন, ইনটু এবং ইন। আলাদা করে দেখলে এগুলো একই ধরনের মনে হয়, কিন্তু এখানে ব্যবহারে তাদের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
● অন স্থান নির্দেশ করছে: ‘অন মাই পেপারস’
● ইনটু রূপকধর্মী ও আবহময়: ‘ইনটু দ্য নাইট’
● ইন আবহ ও গুণগত অবস্থা বোঝাচ্ছে: ‘ইন আ জিনিয়াল লো গিয়ার’
এখানে এক ধরনের ওলটপালট ঘটেছে: যেগুলো আলাদা, সেগুলোকে বাক্যগঠনে একরকম করা হয়েছে; আর যেগুলো দেখতে একই, সেগুলো অর্থের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
‘পেশেন্স’ হয়তো কোনও সৎ, কর্মনিষ্ঠ চরিত্রের গুণ— ‘আমার কাগজের ওপর তা ছড়িয়ে আছে।’ আবার এটি সলিটেয়ার নামের তাস খেলাও হতে পারে, যা কোনও অলস ব্যক্তি কাজ এড়ানোর জন্য খেলছে। দুই ডজন জেট কেবল সামরিক বিন্যাসেই একসঙ্গে উড্ডয়ন করতে পারে; তারা যেন রাতের আকাশে ‘বিছিয়ে’ আছে। একটি গাড়িও পাহাড় বেয়ে ওপরে ওঠে; তার ঊর্ধ্বমুখী গতি জেটগুলোর গতির সমান্তরাল। কিন্তু যেখানে জেটগুলোর বিন্যাস সামরিক, সেখানে একক গাড়িটি অনেক বেশি গৃহস্থালি, বন্ধুসুলভ এবং নিরীহ।
প্রথম দুই বাক্যের চিত্র অনুভূমিক। পরের দুই বাক্যের ঊর্ধ্বমুখী গতি একটি উল্লম্ব সমতল তৈরি করে, যা অনুভূমিক সমতলকে ছেদ করছে বা তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ‘চিন্তার প্রবাহ’ সেই উল্লম্ব রেখা বেয়ে নেমে এসে থেমে যায়— ‘অসম্ভব!’
এই রচনাটি অনুভূমিক ও উল্লম্ব দৃশ্যপটের মধ্যে চলাচল করে, এবং প্রতিটি বাক্য— নিজস্ব সমতলে নির্মিত বিশদ নিয়ে— স্বতন্ত্র অর্থক্ষেত্র তৈরি করে। (আসলে, আমি চাই প্রতিটি পৃথক বাক্য যেন প্রায় একটি সম্পূর্ণ কবিতার মতো হয়ে ওঠে।)
এই ধরনের রচনাশৈলীর একটি ফল হল, বিচ্ছিন্ন অর্থক্ষেত্র দিয়ে কাজ নির্মাণ করার ফলে বাক্যগুলোর মধ্যে বড় ফাঁক তৈরি হয়। এই বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড অতিক্রম করতে পাঠককে (এবং লেখককেও) দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ অতিক্রম করে পরের বাক্যে পৌঁছাতে হয়। এদিকে, সেই ফাঁকগুলোর মধ্যে যা থেকে যায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ ও তথ্যবহুল। পাঠের একটি অংশ ঘটে সেই অনুপস্থিত তথ্য পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে (পেছনে ফিরে দেখা), এবং নতুনভাবে গঠিত ধারণা আবিষ্কারের মাধ্যমে (সামনে এগিয়ে যাওয়া)।
‘মাই লাইফ’ এবং ‘রেসিসট্যান্স’— উভয় ক্ষেত্রেই গঠনগত একক (মোটামুটি বলতে গেলে অনুচ্ছেদ) এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে তা চিন্তার একটি স্থান ও সময়— দু’টিকেই অনুকরণ করে। কিছুটা ভিন্ন অর্থে, সময়ই বারনাডেট মেয়ার-এর ‘মিড উইন্টার ডে’ গ্রন্থটির রূপ নির্ধারণ করে। কাজটি শুরু হয় যখন সময় গণনা শুরু হয় (২২ ডিসেম্বর ১৯৭৮-এর ভোরে) এবং শেষ হয় যখন নির্ধারিত সময় ফুরিয়ে যায় (সেই একই দিনের গভীর রাতে)।
মেয়ার বলেছেন: ‘এটা সত্যি, আমি সব ধরনের প্রকল্পই ভালবাসি— ধরা যাক পাতা আলাদা করে সাজানো, বা যেকোনও কিছু যা প্রকল্পে পরিণত হয়। আর কবিতায় আমি বিশেষভাবে ভালবাসি যখন সময় নিজেই গঠন হয়ে ওঠে। আমার কাছে মনে হয় এতে গঠন বা রূপ নিজেকেই অতিক্রম করতে পারে, কারণ তখন কোনও কিছুর সত্যিকারের শুরু বা শেষ থাকার দরকার হয় না।’
রূপ যদি সময়গত সীমাবদ্ধতা কিংবা অন্য কোনও বাহ্যিক কাঠামোগত উপাদান দ্বারা নির্ধারিত হয়— যেমন আগে থেকেই ঠিক করা হয়েছে যে লেখায় নির্দিষ্ট সংখ্যক বাক্য, অনুচ্ছেদ, স্তবক, জোর বা পঙক্তি থাকবে— তা হলে কাজটি থেকে এমন ধারণা পাওয়া যায় যে এর শুরু ও শেষ একেবারেই আকস্মিক; যেন এর কোনও আবশ্যিক সূচনা বা সমাপ্তি নেই, কোনও ‘প্রথম’ বা ‘শেষ’ মুহূর্ত নেই। এর ইঙ্গিত (যা সঠিকও) হল শব্দ ও ভাবনা— চিন্তা, উপলব্ধি ইত্যাদি— লেখার বাইরে গিয়েও চলতে থাকে। লেখক কেবল থেমে গেছেন কারণ নির্ধারিত একক বা সময় শেষ হয়েছে; কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে বলে নয়, কিংবা ‘সবকিছু’ বলে ফেলা হয়েছে বলেও নয়।
রূপ, বা ‘গঠনমূলক নীতি’, এবং লেখার উপাদানগুলোর (বিষয়বস্তু, ভাবগত ভর, এমনকি শব্দগুলোর সঙ্গেও) সম্পর্ক— এই প্রশ্নটাই ‘মুক্ত পাঠ’-এর প্রথম সমস্যা। প্রতিটি নতুন লেখার ক্ষেত্রেই এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। রূপ কি প্রাথমিক বিশৃঙ্খলাকে— অগোছালো উপাদান, অপরিকল্পিত তাড়না ও তথ্য, অনিশ্চয়তা, অসম্পূর্ণতা, বিশালতা— এই সব বিষয়কে স্পষ্ট ও প্রকাশযোগ্য করতে পারে এমনভাবে যাতে তার ব্যাপক প্রাণশক্তি ও সৃষ্টিশীল ক্ষমতা নষ্ট না হয়? রূপ কি আরও এক ধাপ এগিয়ে সেই শক্তিকেই সৃষ্টি করতে পারে— অনিশ্চয়তাকে কৌতূহলে, অসম্পূর্ণতাকে কল্পনায়, আর বিশালতাকে প্রাচুর্যে রূপান্তরিত করতে পারে? আমার মতে, হ্যাঁ; শিল্পে রূপের কাজই আসলে সেটি। রূপ কোনও স্থির বস্তু নয়, বরং একটি সক্রিয় প্রক্রিয়া।
‘রিদম অ্যাজ দ্য কনস্ট্রাকটিভ ফ্যাক্টর অফ ভার্স’ শীর্ষক প্রবন্ধে রুশ ফরমালিস্ট লেখক য়ুরি তিনিয়ানভ লিখেছেন:
‘আমরা খুব সম্প্রতি সেই পরিচিত উপমা থেকে বেরিয়ে এসেছি: রূপের সঙ্গে বিষয়বস্তুর সম্পর্ক যেমন গ্লাসের সঙ্গে মদের সম্পর্ক… আমি বলতে সাহস পাই যে দশটির মধ্যে নয়টি ক্ষেত্রেই ‘গঠন’ শব্দটি গোপনে রূপকে একটি স্থির বস্তু হিসেবে বিবেচনা করে। ‘কাব্যিক পঙ্ক্তি’ বা ‘স্তবক’-এর ধারণা অদৃশ্যভাবে গতিশীলতার শ্রেণি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পুনরাবৃত্তিকে আর বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্নমাত্রার শক্তিসম্পন্ন একটি ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না। ফলে ‘গঠনগত উপাদানের সমতা’ নামের বিপজ্জনক ধারণা তৈরি হয়— বিপজ্জনক, কারণ যেখানে তীব্রতা বা শক্তিবৃদ্ধি রয়েছে, সেখানে আমরা সমতার কথা বলতে পারি না।’
গেরট্রুড স্টেইন-এর ‘পোর্ট্রেটস অ্যান্ড রিপিটিসনস’-এ করা অনুরূপ মন্তব্যগুলির কথা মনে পড়ে যায়: ‘একটি জিনিস যা দেখতে ঠিক একই রকম বলে মনে হয়, সেটিকে পুনরাবৃত্তি বলে মনে হতে পারে, কিন্তু তা কি সত্যিই তাই?’
‘আসলে কি পুনরাবৃত্তি বলে কিছু আছে, নাকি আছে জেদ? আমি এই বিশ্বাসে প্রবণ যে, পুনরাবৃত্তি বলে কিছু নেই। আর সত্যিই, তা কীভাবে সম্ভব?’
‘কোনও কিছুকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি হতে পারে না, কারণ সেই প্রকাশের সারমর্মই হল; আর যদি তুমি জেদ করো, তবে প্রতিবারই আলাদা জোর ব্যবহার করতেই হবে। আর জোর যদি আলাদা হয়, তবে জীবিত অবস্থায় কারও পক্ষে ঠিক একই জোর দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা সম্ভব নয়।’
তিনিয়ানভ আরও বলেন: ‘কোনও রচনার ঐক্য কোনও বন্ধ, সমমিত পূর্ণতা নয়; বরং তা এক উন্মোচিত, গতিশীল সমগ্রতা।… এই পরিস্থিতিতে রূপের অনুভূতি সবসময়ই প্রবাহের অনুভূতি (এবং তাই পরিবর্তনেরও অনুভূতি)… শিল্প অস্তিত্ব লাভ করে এই পারস্পরিক ক্রিয়া বা সংগ্রামের মধ্য দিয়েই।’
ভাষা এমন কিছু আবিষ্কার করে, যা হয়তো কেউ জানতে পারে; কিন্তু সেটি সবসময়ই ভাষা যা বলতে পারে তার চেয়ে কম। আমরা শৈশবেই এই সম্পর্কের কিছু সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হই। সীমাবদ্ধতা আছে এমন যেকোনও কিছুকেই অন্য বস্তুর— বল, নদী ইত্যাদির— সঙ্গে তুলনা করে (সঠিক বা ভুলভাবে) বস্তু হিসেবে কল্পনা করা যায়। শিশুরা ভাষাকে বস্তুতে পরিণত করে, যখন তারা তাকে খেলনার মতো ব্যবহার করে— ঠাট্টা, শব্দখেলা, ধাঁধা, কিংবা অর্থহীন ছড়া ও সুরে। তারা আবিষ্কার করে যে শব্দ মানেই পৃথিবী নয়; বস্তু (ঘটনা, ধারণা, জিনিস) এবং বস্তু নির্দেশকারী শব্দের মধ্যে এক ধরনের ব্যবধান বিদ্যমান— যে বিচ্যুতি একটি ফাঁক তৈরি করে।
সবচেয়ে প্রচলিত ও দীর্ঘস্থায়ী কৌতুকের ধরনগুলির একটি হল সেইসব কৌতুক, যা শব্দ ও পৃথিবীর ভ্রান্ত তুলনাকে কাজে লাগায় এবং সেই অমিল থেকে সৃষ্ট দ্ব্যর্থকতায় আনন্দ পায়:
—বোকাটা খড় খেল কেন?
—তার কর্কশ গলাকে খাওয়ানোর জন্য।

—হাতি থেকে নীচে নামবে কীভাবে?
—নামবে না, কারণ তুমি হাঁসের পিঠ থেকে নামবে।

—আজ সকালে কি তুমি বদমেজাজি হয়ে উঠেছিলে?
—না, আমি তাকে ঘুমোতে দিয়েছিলাম।

ভাষা থাকার কারণেই আমরা নিজেদেরকে বস্তু, ঘটনা ও পরিস্থিতির সঙ্গে এক বিশেষ ও অদ্ভুত সম্পর্কে আবিষ্কার করি— যেগুলো মিলে আমরা পৃথিবী সম্পর্কে যা কল্পনা করি তা গঠিত হয়। ভাষা মানব-মনস্তত্ত্ব ও আত্মিক অবস্থার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তৈরি করে। বরং বলা যায়, সেটাই প্রায় আমাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা।
এই মনস্তত্ত্ব জন্ম নেয় ভাষা ও ভাষা যে জিনিসকে চিত্রিত বা প্রকাশ করার দাবি করে, তাদের মধ্যকার সংগ্রাম থেকে; পৃথিবীর বিশালতা ও অনিশ্চয়তা সংক্রান্ত আমাদের গভীর অভিজ্ঞতা থেকে; এবং সেই পৃথিবীকে জানতে চেয়ে কল্পনার যে সীমাবদ্ধতা প্রায়ই অনুভূত হয়, তা থেকে। আরও বেশি করে, কবির জন্য, সেই ভাষার সীমাবদ্ধতা থেকেও— যে ভাষা পৃথিবীকে বর্ণনা, আলোচনা বা উন্মোচন করতে চায়। এই মনস্তত্ত্ব কবিতার মধ্যেই আকাঙ্ক্ষাকে স্থাপন করে, অথবা আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, কাব্যভাষার মধ্যেই; ফলে কবিতার প্রেরণাও যেন ভাষারই হয়ে ওঠে।
ভাষা হল আমাদের কৌতূহলের অন্যতম প্রধান রূপ। এটি আমাদের অস্থির করে তোলে। ফ্রান্সিস পোঁজে যেমন বলেছেন, ‘মানুষ এক অদ্ভুত দেহ, যার ভারকেন্দ্র তার নিজের মধ্যে নয়।’ বরং সেই ভারকেন্দ্র যেন ভাষার মধ্যেই অবস্থিত, যার সাহায্যে আমরা আমাদের মানসিকতা ও পৃথিবীর সঙ্গে সমঝোতা করি; ভারসাম্যহীন, মুখের দিকে ভারী বলে সামনের দিকে টান পড়ে আমাদের।
আমি রোদে ঘুরতে বেরোই, আর উপরে নীলের গভীরতা আরও বাড়তে থাকে। জলের শঙ্কুর উপর একটি কাগজের টুপি।… কিন্তু, ইতিমধ্যেই, শব্দ… সে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, এক চোখ বন্ধ করে, আঙুল দিয়ে পরিষ্কার করা রাস্তায় একটি খেলনা ট্রাক চালাচ্ছে।’
ভাষা নিজেই কখনও স্থির অবস্থায় থাকে না। এর বাক্যগঠন চিন্তার মতোই জটিল হতে পারে। আর এটিকে ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা— যার মধ্যে কথ্য বা লেখ্য ভাষাকে বোঝার অভিজ্ঞতাও অন্তর্ভুক্ত— অবশ্যম্ভাবীভাবে সক্রিয়; বুদ্ধিবৃত্তি এবং আবেগ উভয় দিক থেকেই। একটি পঙক্তি বা বাক্যের, কিংবা একাধিক পঙক্তি ও বাক্যের ধারাবাহিকতার অগ্রগতির মধ্যে যেমন সময়গত বৈশিষ্ট্য আছে, তেমনই স্থানগত বৈশিষ্ট্যও আছে। কোনও বাক্যে একটি শব্দের অর্থ নির্ভর করে একদিকে তার পার্শ্ববর্তী শব্দগুলোর সঙ্গে সংযোগের ওপর, আর অন্যদিকে পাঠ্যের বাইরে বাস্তব জগতে তার প্রসারণের উপর— তার সমসাময়িক ও ঐতিহাসিক উল্লেখের ক্ষেত্র পর্যন্ত। ‘উল্লেখ’ এই ধারণাটিই আসলে স্থানগত: এখানে শব্দ, সেখানে বস্তু— আর শব্দটি যেন তার দিকে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রেমের তীর ছুড়ছে। একটি বাক্যের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পৌঁছানো হল সরল গতি; কিন্তু তার ইঙ্গিতপূর্ণ গলিপথ ধরে চলা— যাকে উমবের্তো একো ‘তথ্যভিত্তিক অর্থানুমান’ বলেছেন— তা হল জটিল বা যৌগিক গতি।
এই ধরনের ‘ফ্রেম’ বা অর্থের কাঠামো শনাক্ত করতে পাঠককে যেন লেখার বাইরে ‘হেঁটে’ যেতে হয়— অর্থাৎ অন্য লেখা, পরিচিত থিম, মোটিফ বা মিল খুঁজে এনে টেক্সটকে বুঝতে হয়। লেখক এই প্রক্রিয়াকে বলেন ‘তথ্যভিত্তিক অর্থানুমান’। এগুলো পাঠকের খেয়ালি ব্যাখ্যা নয়; বরং লেখার গঠন নিজেই পাঠককে এমন ব্যাখ্যার পথে চালিত করে। অর্থ তৈরির জন্য এই পদক্ষেপগুলো অপরিহার্য।
আরেক অর্থে ভাষা সক্রিয় বা উৎপাদনশীল— এ কথা যে কেউ জানে, যারা শব্দকে অর্থের দিকে আকর্ষণকারী, চুম্বকের মতো টান সৃষ্টি করতে দেখেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কিছু রচনা এলোমেলো বা পড়ে পাওয়া শব্দভাণ্ডার ব্যবহার করে নির্মিত হয়। যেমন, জ্যাকসন ম্যাক ল-এর কিছু কাজ। সেখানে এই বৈশিষ্ট্যটি প্রথমেই চোখে পড়ে। কিছু অন্যান্য মাপকাঠি অনুযায়ী সীমাবদ্ধ শব্দভাণ্ডার থেকে (যার সঙ্গে অর্থের সরাসরি সম্পর্ক নেই) রচনার উদাহরণ অ্যালান ডেভিস-এর ‘এ অ্যান এভি ইএস’। এই দীর্ঘ কবিতায় ঊর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী অংশবিশিষ্ট অক্ষরের কোনও শব্দ নেই; ফরাসিরা যাকে বলে ‘বন্দিদের সম্মেলন’। হয়তো এতে অক্ষরের ওপরের বা নীচের রেখাগুলো বাদ দেওয়ার ফলে কাগজের সাশ্রয় হয়। আসলে, এমন কোনও শব্দশ্রেণি বা শব্দগুচ্ছ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব যা সম্ভাব্য বর্ণনামূলক বা মনস্তাত্ত্বিক বিষয়বস্তু থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
তদুপরি, এ ধরনের রচনার ‘গল্প’ এবং ‘সুর’ বিভিন্ন পাঠক ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন, কিন্তু সেই ব্যাখ্যাগুলোরও নির্দিষ্ট সীমা থাকে। শব্দসমষ্টি অনেক সম্ভাবনার সুযোগ দিলেও, তা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল স্বাধীনতা দেয় না।
লেখালেখি এমন এমন বিষয়কে বিকশিত করে, যার অর্থ আমরা শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করি।
এমনকী অভিধানে সংরক্ষিত শব্দগুলোকেও যেন অত্যন্ত সক্রিয় মনে হয়; কারণ প্রতিটি শব্দ তার সংজ্ঞা, উদাহরণ এবং ব্যাখ্যার মাধ্যমে অন্য শব্দকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। যেমন, অভিধান এলোমেলোভাবে খুললে ‘ম্যাস্টয়েড’ শব্দটি আমাদের নিয়ে যায় নিপললাইক, টেম্পোরাল, বোন, ইয়ার এবং বিহাইন্ড শব্দগুলোর দিকে। আবার ‘টেম্পোরাল’ শব্দের সংজ্ঞায় পাওয়া যায় টাইম, স্পেস, লাইফ, ওয়ার্ল্ড, ট্রানসিটরি, এবং নিয়ার দ্য টেম্পলস ইত্যাদি শব্দ— কিন্তু লক্ষণীয়ভাবে ‘ম্যাস্টয়েড’ নয়।
‘নিপললাইক’ শব্দটি আলাদাভাবে অভিধানে রাখা হয়নি। কিন্তু ‘নিপল’ শব্দের সংজ্ঞা আমাদের নিয়ে আসে প্রটিউবারেন্স, ব্রেস্ট, আডার, দ্য ফিমেল, মিল্ক, ডিসচার্জ, মাউথপিস, এবং নার্সিং বটল-এর দিকে; কিন্তু আবারও ‘ম্যাস্টয়েড’, ‘টেম্পোরাল’, ‘টাইম’, ‘বোন’, ‘ইয়ার’, ‘স্পেস’, বা ‘ওয়ার্ড’ নেই। এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, এই আদান-প্রদানগুলো অসম্পূর্ণভাবে পারস্পরিক।
নীচে লেখা এই অংশটি মূলত ভাষা, চেতনা, শিশুমন, আর অর্থ খোঁজার অস্থিরতা নিয়ে লেখা এক ধরনের পরীক্ষামূলক গদ্য কবিতা।
কীভাবে এটা ঘটল এক বাক্যাংশের মতো
ধূসর সমুদ্রের বুকে ভাসমান
একটি শ্বেত চতুষ্কোণ নৌকাকে দিয়ে সূচনা…
দূর থেকে ভেসে আসে আর এক বার্তার
টুং-টাং ধ্বনি
শৈশবের মতো
উদ্ধারে এগিয়ে আসে বসন্ত…
অক্ষরের এক বিপুল কপাটের ভিতরে,
আঘাতপ্রাপ্ত দৃষ্টি যেন…
উৎসারিত পরম আনন্দের পথে
মুহূর্তমধ্যে তাকে ভেবে ফেলা যায়
ইতিমধ্যে—
স্খলন চিনে নেয় এলোমেলো বিন্যাস,
আকাঙ্ক্ষার
ভিতর দিয়ে
যেমন আমি লোভকে কামনা করি,
তেমনি অহংকেও
গড়িয়ে-পড়া নকশাগুলি
ইচ্ছার ওপর বিস্তৃত হতে থাকে।
জানার ‘উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষা’ হল সেই অস্থিরতার এক প্রকাশ, যা ভাষার দ্বারা বিপন্ন। শেষে গ্যেটে-র ফাউস্ট থেকে মেফিস্টোফিলিস-এর উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক বলছেন— ‘যতক্ষণ মানুষ শব্দ শুনতে থাকে, সে বিশ্বাস করবে কোথাও না কোথাও একটা অর্থ আছেই।’
ভাষার স্বভাবই মানুষকে এমন ফাউস্টীয় আকাঙ্ক্ষার দিকে উৎসাহিত করে এবং আংশিকভাবে সেই আকাঙ্ক্ষাকে ন্যায্য বলেও প্রতিপন্ন করে। ভাষা যে জ্ঞান অর্জনের উপায় ও মাধ্যম, এবং সেইসঙ্গে ক্ষমতা লাভেরও পথ— এই ধারণা অবশ্যই বহু পুরনো। ভাষা আমাদের যে জ্ঞানের দিকে চালিত করে, বা যে জ্ঞানার্জনের প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই জ্ঞান একই সঙ্গে পবিত্র ও জাগতিক, মুক্তিদায়ক ও তৃপ্তিদায়ক। ‘নমিনা সিন্ট নিউমিনা’ এই মতবাদটি (অর্থাৎ নাম ও বস্তুর মধ্যে এক মৌলিক ঐক্য আছে; কোনও বস্তুর প্রকৃত স্বরূপ তার নামের মধ্যেই নিহিত ও উপস্থিত; বিশেষ্যপদগুলির মধ্যে এক ধরনের ঐশ্বরিকতা রয়েছে) এই ইঙ্গিত দেয় যে, এমন একটি ভাষা খুঁজে পাওয়া সম্ভব, যা তার বস্তুর সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মিলে যাবে। যদি তা সত্যি হত, তবে কথা বলা বা লেখার মাধ্যমে আমরা মহাবিশ্বের সঙ্গে— অন্তত তার পৃথক সত্তাগুলির সঙ্গে— একাত্মতা অর্জন করতে পারতাম; আর সেই অবস্থাই হতো সম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণ জ্ঞানের অবস্থা।
কিন্তু ইডেন উদ্যানের কাহিনিতে যদি আমরা প্রাণীদের নামকরণের মাধ্যমে তাদের সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে থাকি, তবে তা নামের মধ্যে কোনও অলৌকিক উপস্থিতির কারণে নয়; বরং একারণে যে আদম ছিলেন একজন শ্রেণিবিন্যাসকারী। তিনি প্রাণীগুলিকে আলাদা করে শ্রেণি বা বিভাগের ধারণা আবিষ্কার করেছিলেন। পরে বিভিন্ন প্রজাতিকে তাদের ভিন্ন ভিন্ন কার্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক অনুযায়ী সংগঠিত করেছিলেন। ‘নামকরণ’ যা প্রদান করে, তা হল কাঠামো বা বিন্যাস; ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য নয়।
যেমন বেঞ্জামিন লি ওয়ার্ফ দেখিয়েছেন, ‘প্রতিটি ভাষা একটি বিশাল নকশা-ব্যবস্থা, যা অন্যগুলোর থেকে ভিন্ন। সেখানে সাংস্কৃতিকভাবে নির্ধারিত হয় রূপ ও শ্রেণি। তার মাধ্যমে ব্যক্তি শুধু যোগাযোগই করে না, বরং প্রকৃতিকে বিশ্লেষণ করে, সম্পর্ক ও ঘটনাবলির ধরন লক্ষ্য করে বা উপেক্ষা করে, নিজের যুক্তিকে একটি নির্দিষ্ট পথে পরিচালিত করে, এবং নিজস্ব চেতনার গৃহ নির্মাণ করে।’ এই একই প্রবন্ধে, সম্ভবত ১৯৪১ সালে, ‘ল্যাঙ্গোয়েজ, মাইন্ড, রিয়েলিটি’ এই শিরোনামে লেখা তাঁর শেষ রচনায়, ওয়ার্ফ এমন কিছু ভাব প্রকাশ করেন যা ধর্মীয় প্রেরণার মতো মনে হয়: ‘আমি যাকে প্যাটার্ন বলেছি, তা এক গভীর অর্থে মহাজাগতিক ভিত্তির।’ সেখানে ‘ভাষার মধ্যে এক ধরনের পূর্বাভাস আছে, এক অজানা বৃহত্তর বিশ্বের।’ এই ধারণাটি এতটাই মৌলিক যে, একে একটি সহজ বাক্যাংশে বন্দি করা যায় না। আমি বরং এটিকে নামহীনই রাখতে চাই। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে এমন এক বাস্তবগুণ-রহিত বিশ্ব আছে— হাইপারস্পেসের, উচ্চতর মাত্রার এক বিশ্ব— যা সব বিজ্ঞান [যার মধ্যে ভাষাবিজ্ঞানও অন্তর্ভুক্ত] দ্বারা আবিষ্কৃত হয়ে একত্রিত ও সমন্বিত হবে। এটি প্রথমে আবিষ্কৃত হবে এমন এক ‘নকশাময় সম্পর্কের জগৎ’ হিসেবে, যা অকল্পনীয়ভাবে বহুবিধ হলেও ভাষার সমৃদ্ধ ও সুসংগঠিত রূপের সঙ্গে এক ধরনের স্বীকৃত সাদৃশ্য বহন করবে।
এটা যেন এমন যে, আমি যাকে গ্যেটে-র ফাউস্ট থেকে ‘জ্ঞানার্জনের উন্মত্ততা’ বলেছি, যা কিছু দিক থেকে এক ধরনের কামনামূলক (libidinous) প্রবৃত্তিও বটে। সেটি ভাষা থেকে এক মুক্তিদায়ক মূল্যও খুঁজে পেতে চায়। এই দুই প্রবণতাই ফাউস্টীয় কিংবদন্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব থেকে, বিশেষ করে ফ্রান্সে, এমন এক নারীবাদী চিন্তার ধারা এসেছে, যা ভাষাকে আরও স্পষ্টভাবে ক্ষমতা ও জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করে— যে ক্ষমতা ও জ্ঞান রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং নান্দনিক— এবং যা বিশেষভাবে আকাঙ্ক্ষার একটি ক্ষেত্র। এই ফরাসি নারীবাদী লেখকদের প্রকল্প হল তাঁদের মনোযোগ ভাষা ও অবচেতন মনকে আলাদা সত্তা হিসেবে নয়, বরং এমনভাবে দেখা যাতে ভাষা হয় অবচেতনে পৌঁছানোর একমাত্র পথ। এই ভাষা দমিত এবং তা প্রকাশ পেলে বিদ্যমান প্রতীকী শৃঙ্খলা, অর্থাৎ জ্যাক লাকাঁ যাকে ‘ল অফ দ্য ফাদার’ বলেছেন, তাকে বিঘ্নিত করবে।
যদি বিদ্যমান প্রতীকী শৃঙ্খলা হয় ‘পিতার আইন’, এবং তা যদি শুধু দমনমূলকই নয় বরং বিকৃত ও মিথ্যা হয়, হয় পক্ষপাতের অযৌক্তিকতায় বিকৃত, তা হলে নতুন প্রতীকী শৃঙ্খলা হবে এক ‘নারীর ভাষা’, যা নারীর আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
লুস ইরিগারে লিখেছেন: ‘নারীর যৌনাঙ্গ প্রায় সর্বত্রই আছে। সে প্রায় সর্বত্রই আনন্দ অনুভব করে। তার সমগ্র দেহের হিস্টিরিয় নিয়ে কথা না বললেও বলা যায়, তার আনন্দের ভূগোল অনেক বেশি বিচিত্র, বহুমাত্রিক, জটিল, সূক্ষ্ম— যা সাধারণভাবে কল্পনা করা হয় তার চেয়ে অনেক বেশি… ‘সে’ নিজের মধ্যেই অসীমভাবে অন্য। সম্ভবত এই কারণেই তাকে বলা হয় মেজাজি, অদ্ভুত, অস্থির, খামখেয়ালী— তার ভাষা-সহ, যেখানে ‘সে’ সবদিকে ছড়িয়ে পড়ে।’
হেলেন সিক্সুর ভাষায়, ‘একটি নারীবাচক পাঠ্যাংশ চেনা যায় এই কারণে যে তা সর্বদা অনন্ত, কোনও শেষ নেই। এতে কোনও বন্ধন নেই, এটি যতিহীন।’
এই লেখকদের কেউ কেউ ইচ্ছাকে কেবল যৌনতার সঙ্গে সীমিত করে এবং নারীর ভাষাকে দেহগত/যৌন মডেলের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেন। এর ফলে সমস্যা হতে পারে। ভাষা থেকে যে আকাঙ্ক্ষা জাগে, তা আরও গভীরভাবে ভাষার মধ্যেই অবস্থান করে— কিছু বলার আকাঙ্ক্ষা হিসেবে, বলার মাধ্যমে বিষয় তৈরি করার আকাঙ্ক্ষা হিসেবে, এবং এমন এক সর্বব্যাপী সংশয় হিসেবে যা এই আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণ না হওয়ার অক্ষমতা থেকে জন্ম নেয়। এই আকাঙ্ক্ষা অনেকটা ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘আন্ডারথার্স্ট/অফ ভিগোর সেলডম আটারলি অ্যালেড’-এর মতো।
কার্লা হ্যারিমানের ‘রিয়াওলিজম’-এ একথা স্পষ্ট:
‘আমি যখন এটা খাচ্ছি, তখন আমার খাবার চাই… আমি-র বিস্তার ঘটে। ব্যক্তি এক গ্রাসকারী যন্ত্রে ধরা পড়ে। কিন্তু সে দিগন্তে একা তারার মতো জ্বলে ওঠে যখন আমরা তার চিন্তায় প্রবেশ করি। যখন সে তার অবস্থার বিশালতা ব্যাখ্যা করে— সেই সমস্যা প্রকৃতিকে আকর্ষণ করে।’
ভাষা যদি বোঝাপড়া, সম্পূর্ণ ও নিখুঁত প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা জাগায়, তবে একই সঙ্গে তা সেই পূর্ণতাকেও প্রতিরোধ করে। তাই ফাউস্ট-এর অভিযোগ:
লিখিত আছে: ‘আদিতে ছিল শব্দ!
ইতিমধ্যেই আমাকে থামতে হচ্ছে! কে আমাকে এগিয়ে নেবে?
শব্দে এমন বিশ্বাস রাখা অসম্ভব!’
এটি গীতধর্মী লেখার পুনরাবৃত্ত এক উপাদান: ‘আহা, আমার অনুপ্রেরণার দারিদ্র্য কত…’; ‘আমি আগে যে লাইন লিখেছিলাম, তা মিথ্যা কথা বলে…’; ‘আমাদের চোখ আছে বিস্ময়ের জন্য, কিন্তু প্রশংসার জন্য ভাষা নেই…।’
যা কেউ বলতে চায় (বা যা বলার মতো আছে বলে কেউ অনুভব করে) এবং যা সত্যিই বলা যায়— এই দুইয়ের ব্যবধানে ভাষা একসঙ্গে সহযোগিতা ও অসহযোগিতা করে। আমরা ভাষার উপকরণের সঙ্গে আমাদের ইন্দ্রিয়গত সম্পৃক্ততায় আনন্দ পাই, আমরা শব্দ ও জগৎকে যুক্ত করতে চাই— নিজেদের ও বস্তুর মধ্যেকার ব্যবধান মুছে ফেলতে চাই— এবং একই সঙ্গে আমরা উদ্বেগ ও সংশয়ে ভুগি, কারণ আমরা তা করতে অক্ষম।
তবুও ভাষার এই অক্ষমতাই আমাদেরকে আমাদের ধারণা ও নিজস্ব সত্তাকে জগৎ থেকে আলাদা করতে দেয়। আর জগতের নানান জিনিসকে একে অন্যের থেকে। অবিভক্ত জগৎ এক বিশাল একক রূপ, আর বিভক্ত জগৎ বহু রূপ। (অকল্পনীয়) সম্পূর্ণ পাঠ, যা সবকিছু ধারণ করে, আসলে হবে এক বদ্ধ পাঠ। এটি হবে সহ্যাতীত।
কাব্যিক ভাষার একটি কেন্দ্রীয় কাজ হল রূপগত। রূপ নির্মাণের মাধ্যমে, এটি ভিন্নতা, বহুত্ব ও সম্ভাবনাকে স্পষ্ট করে। জগতের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা ব্যর্থ হলেও, আমরা কাঠামো, পার্থক্য, এবং বস্তুর স্বাতন্ত্র্য আবিষ্কার করি। যেমন বব পেরেলম্যান লেখেন:
‘আমার কণ্ঠের শব্দ পেয়ে
আমি বললাম এবং, তাড়িত হয়ে
এই বৈষম্যে, বাকি কথা
কবিতা হিসেবে লিখে ফেললাম।’

°°°

চিত্রণ: রাজ রায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × one =

Recent Posts

অরিজিৎ চক্রবর্তী

অরিজিৎ চক্রবর্তীর ছোটগল্প

ট্রমা-চিহ্নিত সেলফিগুলি অ রি জি ৎ  চ ক্র ব র্তী অজ্ঞাত পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধারকৃত দু’টি টীকা (লেখকের নাম অনুপস্থিত। পাণ্ডুলিপির শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা বহু আগেই

Read More »
পিয়াস মজিদ

পিয়াস মজিদের কবিতা

পি য়া স  ম জি দ অনিমিখ তোমার ভেতর যত ময়ূরতা, কেকা; আমি বন থেকে তার দিকে লক্ষ করে আছি। আমার চোখের সবুজ লোকালয়ের বাকি

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

স্বপনকুমার মণ্ডলের ছোটগল্প

জিতকা স্ব প ন কু মা র  ম ণ্ড ল ১ হাটবারে বিদ্যাখাড়ির পাড়ে রাস্তা জুড়ে জমাটি ভিড়। মোরগ লড়াই চলছে। কাঁতিদার লড়াইয়ের তাগদ দেখে

Read More »
সুদীপ্ত মাজি

সুদীপ্ত মাজির কবিতা

সু দী প্ত  মা জি মেঘ জংলা হাওয়ার গন্ধে জাগা নেশার মতো উড়িয়ে দিচ্ছ ওড়না তোমার, দিদিমণি এখন কি আর তেমন সবুজ বয়স আছে কুড়িয়ে

Read More »
চম্পা রায়

চম্পা রায়ের ছোটগল্প

ডিঙি চ ম্পা  রা য় ‘ও যদু… জাল নিয়া এগাও।’ মাঝ-নদীতে কারেন্ট জাল পাতছিল কালিচরণ। যদুকে ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাঁক দিল। যদিও কালিচরণ জানে,

Read More »
হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়

হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতাগুচ্ছ

হৈ ম ন্তী  ব ন্দ্যো পা ধ্যা য় মোহনার দিকে লুম্পেন হয়েছে রাত, রাহাজানি করে নিয়ে গেছে মন জ্যোৎস্নার গভীরদেশে ঘরবাড়ি তার গাঢ় হলুদের মতো

Read More »