Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

স্বাগতা চৌধুরীর ছোটগল্প

পছন্দসই

স্বা গ তা  চৌ ধু রী

কিছু টাকাপয়সা হাতে এসেছিল অফিস থেকে। ঠিক হাতে নয়, অফিস থেকে নির্দিষ্ট হয়েছিল একটা অ্যালাওয়েন্স, যেটা কর্মীরা আসবাবপত্র কিনতে খরচ করতে পারে। জিষ্ণু বলল, কেনার দরকার নেই। একটা বিল বানিয়ে তুলে নাও। মিলি ঠোঁট ওল্টাল। কিছু কেনার থেকে মিছে বিল বানানো আরও কঠিন তার পক্ষে। তার কেবলই ভয় হয়, কেউ যদি ধরে ফেলে? অ্যাকাউন্টসের শুভম যা সেয়ানা! ঝুটা বিল সন্দেহ করলে নাকালের একশেষ করবে। আর তাছাড়া তার সেরকম পরিচিত কেউই নেই, যে তাকে জিএসটি বিল বানিয়ে দেবে। জিএসটি বিল না হলে জিএসটির টাকাটাও পাবে না আর শুভম তো সন্দেহ করবেই। পান খাওয়া দাঁত বের করে বলবে, কী শর্মিলি? ঝেড়ে দিলে তো? হি হি হি…।
মিলির গা জ্বালা করে। জিষ্ণু বলে, তোমার বেশি বেশি। দেশসুদ্ধ লোকজন বিল বানিয়ে লাখ লাখ ঝেড়ে দিল, তোমার খালি এ কী ভাববে, ও কী ভাববে!
মিলি চায় না, শুভম তাকে বাকিদের মতোই ভাবুক। তার একটা বেশ স্বচ্ছ, সহজ ইমেজ আছে। সে অন্যদের মতো ধান্দাবাজ না। এটা মেইনটেইন করা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বেশ একটা স্বাভাবিক দূরত্ব থাকে লোকের সঙ্গে। মিলি নিজের মতো থাকতে ভালবাসে।
জিষ্ণু বলল, তার হাতে লোক নেই এখন বিল বানানোর। মিলি নিজে যা পারে করে নিক। আর বাড়িতে এখন কোনও নতুন আসবাবের দরকার নেই।
মিলির চিন্তাচক্র শুরু হয়ে গেল এইখান থেকে। দরকার নেই? কার দরকার নেই? আচ্ছা দরকার নাই থাক, শখও কি নেই? মিলির নিজের পয়সায় দরকার না থাকলেও শখ তো হতেই পারে। অনেক ভেবেচিন্তে মিলি দেখল, তার নিজের একটা এলিয়ে বসার জায়গা দরকার। প্রথমে ভেবেছিল, শ্বশুরকে একটা আরামকেদারা কিনে দেবে। শ্বশুর সেই প্রস্তাব হাত নেড়ে এবং ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন।
এইসব আমার কিছুর দরকার নেই।
শাশুড়িকে বলল মিলি, একটা ডিজাইনার টুল কিনে দেই মা আপনাকে? বেশ পা মেলে বসতে পারবেন, ভিতরে জিনিসপত্রও রাখা যাবে। সুন্দর দেখতে হবে।
শাশুড়ি মুখ গম্ভীর করে বললেন, না না বাবা, খামখা জায়গা জুড়ে থাকবে। এই এত জিনিসপত্র সামলানোই দায়। তুমি তো নিজে কিছু করবে না। করাতে হবে লোক দিয়ে সেই আমাকেই। জিনিস কিনলেই হল না, রাখতে, মেইনটেইন করতে হয়। তার চেয়ে বাবু যা বলছে করো, টাকা নিয়ে নাও। ওই টাকায় একটা ভাল শাড়ি কিংবা গয়না কিনে নাও।
মিলি অন্তরালে গিয়ে মুখ ভেটকালো। এই মহিলা মিলিকে না ঠুকে জলগ্রহণ করেন না। ভাল কথা বলতে গেল, দেখো, অমনি বলে দিল, মিলি কিছু করে না বাড়িতে। আর করবেটা কী? তুমি করতে দাও! যক্ষীর মতো রান্নাঘর, আর সম্পত্তি আগলে বসে আছ। নিজে থেকে কিছু করতে গেলেই ঘাড়ের ওপর এসে পিটিরপিটির। কিছুই পছন্দ না। বিয়ের পর পর মিলি চেষ্টা করেছে, রান্নাবান্না করে ঘর গুছিয়ে শ্বশুরবাড়ির মন জয় করার। কোথায় কী? খালি খুঁত ধরার বাই। মাঝে মাঝে মনে হত, লোকগুলোর মন নেই। আর পাঁচ বছর পর এখন মনে হয়, মন আছে, কিন্তু সেই মনের দরজা মিলির জন্য অবারিত নয়। প্রচুর ধাক্কা দিয়ে, ঠেলেঠুলে ঢুকতে হয়। অত পরিশ্রম প্রতিবার প্রতিবিষয়ে মিলির পক্ষে করা সম্ভব নয়।
মিলি দেখল, দোকানে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জিনিস কেনা বা বানানো অসম্ভব। প্রচুর খাটনি। তার অভিজ্ঞতাও নেই। অলস ছুটির দুপুরে সে বিভিন্ন কমার্শিয়াল সাইটে স্ক্রোল করে চলে। চেয়ার, টেবিল, খাট, আলমারি। কিছুই লাগবে না। বেশিরভাগ পছন্দের জিনিস বাজেটে আসবে না। এর আগেও এইসব অফিস থেকে পাওয়া টাকাপয়সায় সে মায়ের ফ্ল্যাটের জন্য খাট, আলমারি কিনে দিয়েছে। নিজের বিয়েতে ফার্নিচার কিনেছে নিজেরই টাকায়। শ্বশুরবাড়ির জন্যও দরকারমতো কিনেছে ওয়াশিং মেশিন, ফ্রিজ ইত্যাদি। জিষ্ণু তখন বেঙ্গালুরু থাকত, তখন ওর ভাড়ার ফ্ল্যাটের জন্য কিনে দিয়েছে। কিন্তু তখন এদের দরকার ছিল। এরা নিজেরাই ব্যবস্থা করেছে। মিলি শুধু বিল জমা করে টাকা তুলেছে অফিসে। এখন কারও আর কিছু দরকার নেই। কারও শখও নেই। শুধুই মিলির শখ।
আগের ফার্নিচার, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন কেনার সময়, যাদের দরকার তারা তাদের শখ মিটিয়েছে। মিলিকে এমনকী কেউ পছন্দটাও জিজ্ঞেস করেনি। শাশুড়ির সংসার, তাঁর পছন্দের রঙের ডাবল ডোর ফ্রিজ এসেছে। টপ লোডিং ওয়াশিং মেশিন। মা, ছেলের পছন্দের ব্র্যান্ড। মিলির মতামত কেউ চায়ওনি, মিলি দেয়ওনি। শেষ পর্যন্ত কাজ হবার পর, শাশুড়ি ঠিক সুর তুলে বলেছেন, তুমি তো কিছুই দেখলে না… সব আমরাই করে দিলাম।
মিলি চুপ থেকেছে। সে জানত, সে মতামত দিলে সেটা নেওয়াও হত না। উল্টে জিষ্ণু আর শাশুড়ি মিলে, তার পছন্দটা যে নিতান্তই খারাপ, তার যে কোনও বুদ্ধি নেই, বাজার সম্পর্কে ধারণাও নেই, এইটে বেশ করে বুঝিয়ে দিত। কে আর সেধে হিউমিলিয়েটেড হতে চায়? মিলি তাই আগাগোড়া চুপ। শাশুড়ি সম্ভবত উদাত্ত জ্ঞান দেবার এই স্বর্ণসম্ভাবনা হাতছাড়া হওয়াতেই হতাশ। তাই প্রতিটি কেনাকাটার পরে বলে গেছেন, কী যে তুমি করবে? কিছুই শিখছ না, কিছুই জানছ না… ইত্যাদি প্রভৃতি। মিলি কানে তুলো দিয়ে রাখে। সাইটে আঙুল বুলিয়ে নামতে নামতে দেখে, সুন্দর সুন্দর টেবিল, ল্যাম্পশেড, হাতে কারুকাজ করা আলমারি। ইস্, মিলির ঘরের আলমারি শাশুড়ির ডিজাইনের, সেই প্রাচীন কালের ঢাউস পাল্লা। এখন কী সুন্দর সুন্দর, স্লিক, রাট্টান ফিনিশের, কাঠের ফ্রেমের আলমারির দরজা। এরকম করালেই হত। বলতে যাও। আগাপাশতলা ঝেড়ে দেবেন মা জননী। এইসব টেঁকে না, মিলির বুদ্ধি নেই, বাস্তবজ্ঞান নেই ইত্যাদি দিয়ে শুরু হবে, মাঝখানে ওনার বাবার, ঠাকুর্দার মেহগনির পালঙ্ক, আলমারি, বাতিস্তম্ভ, ঘোড়ায় চড়ে জমিদারি দর্শন, বনেদিয়ানায় চলে যাবে, তারপর আবার ঘুরে এসে, মিলির অপরিণামদর্শিতা এবং অকর্মণ্যতায় শেষ হবে। অত কথায় কাজ নেই। মিলি অন্য সাইটে স্ক্রোল করতে চলে যায়।
নিরন্তর দু’চারদিন স্ক্রোল করার পর চোখে ঠেকে যায় একখানা চমৎকার হেলান দেয়ার বিছানা। ছবির গায়ে নাম লেখা আছে, সোফা কাম বেড। আসলে, এইটা ঠিক সোফা নয়। বরং একটু লো সিঙ্গেল বেডই বলা চলে। মাটি থেকে সামান্য উপরে, মাথার দিকটা একটু উঁচু করা। ফাইভ স্টার হোটেলের সুইমিং পুলের ধারে রোদ পোহানোর জন্য যে বেডগুলো দেখা যায়, সেইরকম। একজন পাঁচ ফুট উচ্চতার মানুষ টান টান হয়ে শুতে পারে। মিলির ভারি পছন্দ হল। এইটাতে বসে সে ল্যাপটপ নিয়ে কাজও করতে পারবে। দরকারে পা মেলে শুয়েও পড়তে পারবে। একেবারে নিজস্ব বিছানা। একটা রেডিমেড গদিও আছে সঙ্গে। একটা কুশন আর হ্যান্ডলুমের চাদর কিনলেই হবে। মিলিদের শোবার ঘরে, কুইন বেডে টানটান চাদর থাকে। বিছানায় গড়ালেই চাদরের ভাঁজ নষ্ট হবে, শাশুড়ি টিকটিক করতে চলে আসবেন, এই ভয়ে মিলি পারতপক্ষে রাতে ঘুমানোর আগে বিছানায় বসে না। আর একটা টেবিল-চেয়ার-কম্পিউটার সেটআপ আছে, সেটা জিষ্ণু ওয়ার্ক ফ্রম হোমের নামে সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনই দখল করে বসে থাকে দিবারাত্রি। অগত্যা মিলি বাড়িতে থাকলে এঘর-ওঘর করে কাটায়।
বসার ঘরে গিয়ে বসলে, হয় শ্বশুর নয় শাশুড়ি ঘুরঘুর করছেন। নয় গাঁক গাঁক টিভি চলছে। না হলে কাজের লোক, রান্নার লোকের গল্প চলছে। একতলার ঘরে ঠাকুমাশাশুড়ি থাকেন। তিনি দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী। ইনি শিগগির স্বর্গবাসিনী হবেন এই আশঙ্কায় মিলি বিয়ের আগে কোর্টশিপের বেশি সুযোগ পায়নি। দেখাসাক্ষাৎ হবার এক মাসের মধ্যেই বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেছিল। ইনি অবশ্য গত পাঁচ বছর একই রকম আছেন। একটি চব্বিশ ঘণ্টার মহিলা আছে দেখভালের, তাকে এবং মিলির শাশুড়িকে জ্বালিয়ে খাচ্ছেন। সারাদিন এটা চাই, ওটা চাই, এই হল না, ওই হল না করে অস্থির। সবকিছু তাঁর মর্জিমাফিক কেন হচ্ছে না, সেইটেই তাঁর প্রধান অভিযোগ। ভাবগতিক বলছে, আরও অনেক দিন জ্বালাবেন। মিলি বিনা প্রয়োজনে এদিকে ঘেঁষে না। শাশুড়ি পছন্দ করেন না।
তা হলে মিলির নিজের জায়গা কই? সে মনে মনে ঠিক করে নিল, এই বেডটা তার নিজের জায়গা হবে। দোতলায় শোবার ঘরের লাগোয়া বারান্দার দরজার কাছে কোনার দিকে রাখবে। ওখানে বসে সুন্দর বারান্দার গাছপালা, আকাশ, সূর্যের আলো দেখা যাবে। জিষ্ণু একটু ট্যাঁ ট্যাঁ করবে ঠিক, ও পাত্তা না দিলেই হবে। আর একবার বুক করে বাড়ি এনে ফেললে কী আর হবে, ফেলে তো আর দিতে পারবে না।
সেইমতো অনলাইন বুক করেই এক রবিবারে দুপুরবেলা বাড়িতে পেল্লায় এক বাক্স এল। শাশুড়ি ও জিষ্ণুর স্তম্ভিত চোখের সামনে দিয়েই লোক এসে মিলির শোবার ঘরে সুন্দর করে ফিট করে দিয়ে গেল। একটা সিঙ্গল হেলানো নিচু চেয়ার, যার একটা ব্যাকরেস্ট আছে, আর ব্যাকরেস্ট থেকে বাকিটা লম্বাটে মানুষপ্রমাণ বেড। মিলি পিঠে কুশন ফেলে পা টান করে শুয়ে দেখল, চমৎকার লাগছে। একটু এদিক-ওদিক গড়িয়ে নিল। তারপর বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকল খানিকক্ষণ। আহ্, কী আরাম।
বিয়ের আগে মায়ের দু’কামরার ফ্ল্যাটে মায়ের বিছানায় শুত মিলি। সেইখানে শুয়ে থাকলে এইরকম লাগত। বালিশে জেসমিন নারকোল তেলের আর মায়ের উষ্ণতার গন্ধ থাকত। সেইটা তো আর পাবে না। এখন ওখানে গিয়ে থাকাও হয় না। কাছাকাছি বাপের বাড়ি হলে যা হয়। যায়, দেখা করে, চলে আসে। বৌদির ছোট বাচ্চা। ছোট ফ্ল্যাট। মিলি গিয়ে থাকলে সত্যিই ওদের অসুবিধা হয় । আর এখান থেকে একদিন ছেড়ে দু’দিন বাইরে থাকলে শাশুড়িরও মুখভার হয়। নির্বিবাদে ফাইফরমাস খাটার এবং জ্ঞান দেবার লোকের অভাবে তাঁর প্রাণ আইঢাই করে। সেটা অবশ্য তিনি বলেন না। যেটা ঘুরিয়ে বলেন, সেটা হচ্ছে, মিলি বাপের বাড়ি গিয়ে একরাত্রি থাকলেই ঠাকুমাশাশুড়ি শ্মশানযাত্রা করেন। পাঁচ বছরে কতবার যে মিলি মানিকতলা থেকে সল্টলেক আসার পথে যমকে শুধু হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। নিজের সাধের বিছানার দিকে তাকিয়ে মিলি মিটিমিটি হেসে বলে, এই আমার মায়ের বাড়ি, এই আমার নিজের। ব্যস।
যদিও তেমন কিছু কেউ বলে না, তবু এক সপ্তাহ মিলির মনে হয়, কেমন একটা থমথমে ভাব। বিশেষ করে শাশুড়ির। ভাবখানা হচ্ছে, তাঁর বাড়িতে, তাঁর সংসারে, তাঁর পছন্দ ছাড়া একটা বিজাতীয় জিনিস ঢুকে পড়েছে। তিনি যথারীতি বলেছেনও এসব ফালতু কাঠের, টেঁকসই না, বেকার দাম, টাকা নষ্ট, জায়গা নষ্ট ইত্যাদি। মিলি কানের অদৃশ্য তুলোটা টাইট করেছে খালি। জিষ্ণু বলেছে, বেকার জায়গা জুড়ে আছে, কী দরকার ছিল এটার? মিলি এটার উত্তর দিয়েছে। বলেছে, দরকার নয়, আমার শখ। আমার ব্যক্তিগত শখ। আমি কিনেছি। হয়েছে? এই টাকায় তুমি দু’বোতল স্কচ খেয়েছ, তোমার শখ। আমি কিছু বলেছি? এটাও আমার শখ।
তারপর ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও, আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি’ বলে গুনগুন করতে করতে বাথরুমে চলে গেছে। ওফ্, অনুপম রায় একখানা মোক্ষম গান লিখেছিল। সংসারে শান্তিপ্রতিষ্ঠা করতে এর জুড়ি নেই।
এরপর অফিসের বিলটিল উদ্ধার হয়ে গেছে। একমাস মিলি সেই সিঙ্গল বেডে গুছিয়ে শুয়েছে, ঘুমিয়েছে, বই পড়েছে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখেছে, রবিবার বিকেলে কুশনে হেলান দিয়ে বারান্দায় সূর্যাস্ত দেখেছে। তার মন ফুরফুরে হয়ে আছে। এতদিনে জিষ্ণুর বাড়িতে তার নিজের কিছু একখানা হয়েছে। কোনওদিন যদি এই বাড়ি থেকে শাশুড়ি বেরিয়ে যেতে বলেন, তা হলে অবশ্যই সে এই বেডখানা নিয়েই যাবে। সিনেমার মতো একবস্ত্রে, একটা স্যুটকেস নিয়ে যাবে না। অবশ্য শাশুড়ি তাকে বেরিয়ে যেতে বলবেন, এই সম্ভাবনা শূন্য বললেই চলে। এরকম মুখ বুজে থাকা, বাধ্য, উপার্জনশীলা হয়েও টাকাপয়সা সব বরের হাতে তুলে দেওয়া, শান্ত, সুশীলা বউমা তিনি কোথাও পাবেন না। তিনি নিজেও বেশ জানেন সেটা।
বেরিয়ে যাবার তেমন জায়গাও নেই অবশ্য। মিলির ছোটবেলায় বাবা মারা গিয়েছেন। মা একা হাতে, তাকে আর দাদাকে বড় করেছেন সমস্ত প্রতিকূলতা সামলে। মিলি আর দাদা সুখে সংসার করছে, এইটেই দেখে চলে যাওয়া মায়ের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা।
সবসময়ই তিনি বলেন, মিলি, মানিয়ে চলো। তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন ভাল, মারছে না, ধরছে না, খাওয়াপরার কষ্ট নেই, খারাপ কথা বলছে না, আর কী চাই! কতশত মেয়ের এইটুকুও জোটে না। টুকিটাকি মনোমালিন্য সব সংসারে হয়। ওইটে নিয়েই টিকে থাকতে, টিকিয়ে রাখতে হয়। না হলে সমাজে মেয়েদেরই কলঙ্ক। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, চাহিদা একটু সামলে চলো। না হলে লোকে লোভী বলবে।
তা মিলি আগাগোড়া সামলেই আছে।
কখনওই সে মুখফুটে বলে না কী চাই। কারণ আগের অভিজ্ঞতায় দেখেছে, চাইলে এ-বাড়িতে পাওয়া যায় না। আর পেলাম না আক্ষেপ করলে, উত্তর আসে, এত আছে, তবু শখ মেটে না? আরও চাই? সত্যি তার আলমারিজোড়া শাড়ি, গয়না। সব শাশুড়ির তত্ত্বাবধানে থাকে। চাইলেই সে পরতে পারে। কিন্তু চাইতে হবে ভেবে সে চায় না, পরেও না। আর ও-সব একটাও তার নিজস্ব নয়, সবই শ্বশুরবাড়ির টাকায়, তাদের পছন্দে কেনা। তাদের জিনিস, তারা রেখেছে। সে চাইবেই বা কেন?
বিয়ের আগে মিলির জন্মদিন, আর পুজো দুটোই পড়েছিল পরপর। তখন জিষ্ণুর সঙ্গে আঠালো রোমান্স। জিষ্ণু দু’বারই তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, কী উপহার চাই। মিলি জন্মদিনে একটা টমি হিলফায়ারের ঘড়ি আর পুজোয় একটা পার্পল বালুচরী চেয়েছিল। জন্মদিনে এসেছিল, ফরাসি পারফিউম আর পুজোয় সবুজ কাঞ্জীভরম। দুটোই শাশুড়ি বলে পাঠিয়েছিলেন, তাঁর অপূর্ব পছন্দে কেনা, এখন খুলে কাজ নেই। পুজোর দু’মাস পরেই যেহেতু বিয়ে, তখন তত্ত্বে সাজিয়ে দিলেই হবে। মিলি আর বৌদি গিফটের প্যাকেট হাতে, নির্দেশ শুনে চোখাচোখি করেছিল। ওই পর্যন্তই ব্যাপারটা।
মিলির মা ব্যস্ত হয়েই ফোনে বলে দিয়েছিলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি যেমন চাইছেন, তেমনই হবে বেয়ান। আর সত্যি খুব সুন্দর পছন্দ আপনার। ফোন রেখে, মিলির মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, একটু মানিয়ে নে। ওদের সঙ্গে বাকি জীবন থাকবি, ওদের ভাবগতিক বুঝেই তো চলতে হবে। আর খারাপ তো কিছু বলছে না। একটু দেখনাই করতে চাইছে। করতে দে। পরে কত ঘড়ি কিনবি! বালুচরী আমিই তোকে কিনে দিচ্ছি।
মিলি নিশ্বাস ফেলে উঠে গেছিল। ব্যাপারটা ঘড়ি কিংবা বালুচরীর না, ব্যাপারটা পছন্দের। তার পছন্দের এবং মতামতের কোনও গুরুত্ব নেই। এইটাই ব্যাপার।
এরপর অনেকবার জিষ্ণু তাকে কী চাই জিজ্ঞেস করেছে, শখের আলাপের সময়। মিলি প্রতিবার মিষ্টি হেসে, নরম নিচু গলায় বলেছে, কিছু চাই না। জিষ্ণু এখন আর জিজ্ঞেস করে না। এনিভার্সরি, পুজো, জন্মদিন ইত্যাদিতে কখনও ভুলে যায়, কখনও কিছু একটা নিয়ে আসে, নয় তাকে টাকা দিয়ে দেয়। পাঁচ বছর সংসার করেও জিষ্ণু জানে না, এই হাতে টাকা দেওয়াটা মিলির সবচেয়ে অপছন্দ। পছন্দের জিনিসটি হাতে করে না এনে এই মূল্য ধরে দেওয়ার অর্থ, তোমার পছন্দের, চাওয়ার, তুমি মানুষটার গুরুত্ব নেই। করতে হয়, দিতে হয় তাই দেওয়া, অনেকটা উৎসবে, পার্বণে ধনীলোকের কাঙালিভোজন দেওয়া টাইপ।
সেই টমি হিলফায়ারের ঘড়ি কিন্তু আজও কেনা হয়নি। একথা মুখ ফুটে বললেই মিলি খারাপ। মিলিকে তো ভাল বৌয়ের মেডেল পেতেই হবে। তার বৌদি বরং অনেক স্পষ্টবাদিনী। দাদা এদিক-ওদিক করলে কটকটিয়ে শুনিয়ে দেয়। সে যাহোক, এতদিন পর নিজের পছন্দের নিজের জিনিসটি পেয়ে, ব্যবহার করে মিলি খুশি। সে ছুটির দিনে, উল্টেপাল্টে, পায়ের ওপর পা তুলে শুয়ে থাকে, আয়েশ করে। হপ্তাতিনেক পর থেকে গুনগুন শুরু করলেন শাশুড়ি। ঘর পরিষ্কার হয় না, জায়গা জুড়ে আছে, কাজের মেয়ে পাশ দিয়ে ঝাঁটা বুলিয়ে চলে যায়। একবার শুনেই মিলি লাফ দিয়ে উঠে, বিছানাটাকে টেনে ঘরের পাশে নিয়ে, নিজেই ঝাঁটপাট দিয়ে একদম ‘স্বচ্ছতা অভিযান’ চালিয়ে দিল। শাশুড়ি চেয়ে চেয়ে দেখলেন। তারপর সন্ধ্যায় মিলির ভাজা পকোড়া খেতে খেতে বললেন, একদিন একটু নড়ে বসলেই কী আর হল? ঘর পরিষ্কার, সাজানো এগুলো অভ্যাস। জিনিস কিনলেই হয় না, যত্ন করতে হয়। এক সপ্তাহ ঘষেমেজে আবার ভুলে গেলে, যে কে সেইই তো হবে। জিনিস তো টিকবে না।
মিলি ঠোঁট টিপে থাকল। তরপরের রবিবার, ঘর মুছতে আসার আগে সে যখন বিছানা ঝাড়ছে, শাশুড়ি বললেন, মিলি ওর সঙ্গে পুরো ঘরটা আর বারান্দাটাও টেনে নাও না। ঝর্না যে কী ছাই মোছে। নিজের ঘরবাড়ি নিজেরা না করলে কী আর হয়! আমার তো হাত-পা নেই। সর্বাঙ্গে ব্যথা। তুমিই করো।
মিলি প্রমাদ গণল। এ তো সেই উট ও তাঁবুওলার গল্প হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে নাক, তারপর মাথা, তারপর গোটা শরীর ঢুকিয়ে উট মালিককে তাঁবুছাড়া করেছিল। এখানে প্রথমে ঘর, তারপর বারান্দা, তারপর দোতলা, শেষে পুরো বাড়ি পরিষ্কারের দায়িত্ব তার ওপর চলে না আসে! কিন্তু এখন ঢেঁকি গেলা ছাড়া কিছুই করার নেই। নিজের শখ। দেখা যাক, বেশি বাড়াবাড়ি হলে মুখের ওপর না বলতেই হবে। অতঃপর মিলি পরপর দুটো রবিবার ঝর্না আসার আগে গোটা দোতলা সাফ করল।
তারপরেও জিষ্ণু একদিন বলল, এই বিশ্রী বিছানাটা ঘর জুড়ে আছে। এটাকে তোমার মায়ের ফ্ল্যাটে চালান করে দাও।
মিলি ঘুরে বলল, কেন? ওটা তো আরও ছোট্ট ফ্ল্যাট। আর তাছাড়া ওদের দরকারও তো নেই।
আমাদেরও দরকার নেই। বেকার একটা জিনিস। ফালতু পড়ে আছে।
মিলির চোখ ফেটে জল এল। ফালতু পড়ে আছে? ওটা যে তার পছন্দের, মিলি যে অফিস থেকে ফিরে ওটাতেই চা নিয়ে বসে, কাজ করে, ঘুমায়, জিষ্ণুর চোখে পড়ে না? জিষ্ণুর নিজের ডেস্কটপ সেটআপটাকে যদি সে ফালতু বলত? কেমন লাগত? একটুও রোমান্স নেই লোকটার ভিতর। রোবোটিক একটা লোক। কাজ আর টাকা ছাড়া কিছুই মাথায় ঢোকে না। মিলির কপাল। সে কিছু না বলে, জিষ্ণুকে দেখিয়ে দেখিয়ে নিজের বালিশ, কোলবালিশ নিয়ে নিজের বেডে শুতে চলে গেল। জিষ্ণু শোবার আগে জিজ্ঞেস করল, বিছানায় আসবে না? মিলি ‘উঁহু’ বলে পাশ ফিরে শুল।
ঠিক তিনদিন পর শাশুড়ি বললেন, মিলি তোমার ওই বেডখানা দাও, আমাদের নিউ টাউনের নতুন ফ্ল্যাটে রেখে আসি।
কেন?
না, এখানে তো জায়গা জুড়ে আছে। ওখানে এখনও ফার্নিশিং হয়নি। থাকলে, মাঝে মাঝে আমরা যখন দেখাশোনা করতে যাই, তখন কাজে লাগবে, বসা যাবে। তারপর ধরো ফ্ল্যাটের কমিটির মিটিং-টিটিং হলে, ওখানেই দিব্যি করা যাবে, খালি ফ্ল্যাট।
মিলির আয়েশের আকাশে প্রবল ঘনঘটা। একটু তো তো করে বলল, কিন্তু মা আপনারা তো অত নিচু বেডে বসতেই পারবেন না, কোমর নিয়ে। কমিটির আপনাদের সবারই তো হাঁটুতে বাত।
শাশুড়ি বললেন, না না, কেউ কেউ তো পারবে। আর চেয়ারও থাকবে। ও হয়ে যাবে।
মিলি খুব মিষ্টি হেসে বলল, তার চেয়ে মা, বরং ও-বাড়ির জন্য একটা সোফাই কিনে দেই। এখনও কাজে লাগবে, পরেও লাগবে, বসতেও সুবিধা।
শাশুড়ি বললেন, সে সোফা তো আমরাই কিনতে পারি। কিন্তু ইন্টেরিয়র এসে যা করবে, তখন আবার এই সোফাটা বাতিল করতে না বলে! তার চেয়ে বেডখানা দাও। ওটা বাতিল করলে অসুবিধা নেই। তত দাম তো না, আর ফালতুই পড়ে আছে।
আবার ফালতু! মিলির বুকের রক্ত চলকে ওঠে। ওই বেডটার ওপর তার মায়া পড়েছে। ওটাকেই তার নিজের মনে হয়। আর এদের যত কুদৃষ্টি এটার ওপর।
সে মুখ নিচু করেই বলে, আমি ওটা এখন দেব না মা। শখ করে কিনেছি। ক’দিন যাক, পরে ভাবা যাবে।
শাশুড়ি বিরক্ত হয়ে দপদপিয়ে উঠে যান।
পরদিন অফিসফেরত মিলি বৌদির কাছে যায়। দুঃখের কথা বলতে গিয়ে প্রায় কেঁদে ফেলে। তার সাধের বেডের সবাই দুশমন। কেউ বোঝেই না।
বৌদি মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। অর্বাচীন পুরুষমানুষ দাদা। সে হা হা করে হাসতে থাকে।
কীরে মিলি, বাচ্চা নাকি তুই? এখন শখের বেডের জিদ ধরে বিছানা আলাদা করে ফেললি জিষ্ণুর থেকে?
মা বকতে থাকেন, সত্যি মেয়েটার আক্কেল হল না। এই বয়সে তুই রাগ করে থাক, আর জামাই বারমুখো হয়ে যাক। তখন কিন্তু কেঁদে কূল পাবি না। এই জিষ্ণুই তোকে কত খাট, পালঙ্ক কিনে দিতে পারে। কেউ এই নিয়ে জিদ ধরে থাকে? শাশুড়ি তাঁর নতুন ফ্ল্যাটের জন্য চাইছে, দিয়ে দে। ওরাও তো তোকে কত কী দিয়েছে।
মিলি চোখ মুছে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বৌদিকে জিজ্ঞেস করে, আমার পছন্দের কোনও মানে নেই না বৌদি? আজকে সামান্য খাট নিয়ে এত ঝামেলা। কালকে বড় কিছু নিয়েও হতে পারে। বাচ্চা হলে, তাকে মানুষ করা নিয়েও বিরোধ হবে। তখনও কি আমি সব মেনেই নেব? কোনটা ম্যাচিওরিটি বলো তো? নিজের পছন্দ জোর করে আদায় করে নেওয়া, নাকি অন্যের চাপিয়ে দেওয়া মতামত মুখ বুজে মেনে নিয়ে শান্তিরক্ষা করে যাওয়া?
কঠিন প্রশ্ন মিলি। তুমি নিজেই ভেবে দেখো। বেডটা ঘর থেকে চলে গেলে ওঁরা খুশি হবেন। থাকলে তুমি। ওঁরা তোমার খুশিটা দেখছেন না। তুমি কি ওঁদের খুশিটা দেখবে? আর খুশি করাটা তোমার অভ্যাস হয়ে গেছে। তুমি তার বাইরে গিয়ে নিজের খুশিমতো থাকতে পারবেও না। আর বাচ্চাকাচ্চা হলে, ভবিষ্যতে কী হবে? নিশ্চয়ই, ওঁরা তোমার মত নেবেন না। কারণ তোমার মত নিতে তাঁরা প্রস্তুত নয়। অভ্যাসও হচ্ছে না। কাজেই তোমাকেই বুদ্ধি করে চলতে হবে। যখন মনে করবে, যে কাউকে ছাড়া নিজেই নিজের সিদ্ধান্তে চলতে পারবে, তখন বাচ্চার কথা ভেবো। ওনাদের খুশি করতে বাচ্চা নিয়ো না। এইটুকুই বলতে পারি।
মিলি ভাবতে ভাবতে ফের মানিকতলা থেকে সল্টলেকে শ্বশুরবাড়ি চলে এল। সে একটা সিস্টেমে থেকে অভ্যস্ত। এই সিস্টেমের বাইরে সে যেতে পারবে না। দাদা বলেছে, মাও বলেছে, সামান্য একটা বেডকে অস্তিত্বের লড়াইয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনও দরকার নেই। ছোট ছোট ইস্যুতে মতবিরোধ হলেই সেটা তারপর একটা বড় ইস্যুতে গিয়ে আগ্নেয়গিরি হয়ে ওঠে। বাইরের কোনও সমস্যাই যখন তোদের নেই, টাকাপয়সা আছে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন মানুষও খারাপ না, তোকে যত্নেই রেখেছে, তখন সামান্য বিষয়ে মতামত জাহির করা মানে নিজের সর্বনাশ নিজে ডেকে আনা। কে না জানে, মেয়েমানুষের চোপাই সাজানো সংসার নষ্ট করে।
মিলি চুপ করেই ছিল। তার সাজানো সংসার নয়। শাশুড়ির সাজানো সংসার। কোনওদিন তার সংসার হবে কি না সেটা নির্ভর করে জিষ্ণুর ওপর। জিষ্ণু এখন বাচ্চা চায় না। কারণ সে দায়িত্ব নিতে ভয় পায়। মিলি চায়। এই বেড বাদ দিয়ে মিলিকে এবার নিজের ওপর ফোকাসড হতে হবে। সংসার রাজনীতিতে নামতে হবে। বেড, অন্য ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়, যাক। সংসার মিলির হোক। গায়ের জোরে সে জিততে পারবে না, মাথা খাটাতে হবে, ম্যানিপুলেশন করতে হবে।
বেশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মন নিয়ে মিলি বাড়ি ফিরল। রাত ন’টা নাগাদ বাড়ি ঢুকেই দেখল, প্রলয় কাণ্ড! ঠাকুমাশাশুড়ির যে চব্বিশ ঘণ্টার অ্যাটেনডেন্ট, সে ক’দিনের জন্য দেশের বাড়ি গেছে ছুটি নিয়ে। তার জায়গায় দু’জনকে আয়া সেন্টার থেকে নেওয়া হয়েছে দু’বেলা ডিউটি দিতে। এখন নাইট ডিউটির যে মহিলাটি এসেছে নতুন, সে পরিষ্কার জানিয়েছে, সে আগের মহিলার বিছানা ব্যবহার করবে না, আর সে মেঝেতে শতরঞ্জি পেতে শোবেও না। তাকে আলাদা নতুন ব্যবস্থা দিতে হবে। এইবার এই আলাদা ব্যবস্থাটা কী হবে?
ঠাকুমাশাশুড়ি প্রবল কাঁইমাই করছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, এইসব নবাবি এইখানে চলবে না। ঝিয়ের যদি শুতে হয়, তাঁর ঘরের মেঝেতে শতরঞ্জি পেতে, চাদর নিয়েই শুতে হবে। না পোষালে চলে যাক।
নতুন আয়া শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। শাশুড়ি তাকে মিনতি করে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, আজ রাতটা কোনও রকম চালিয়ে দিতে। কাল সকালেই বাবু গিয়ে দড়ির খাট কানে আনবে।
ঠাকুমাশাশুড়ি ফুট কাটেন, হ্যাঁঃ,আনিস, শিয়ালদা থেকে ওই মড়া ফেলানো খাট নিয়ে আসিস সস্তায়। পয়সা বেশি হয়েছে? ক’দিনের মামলা। আমার গোধূলি ফেরত এলেই এরে আমি চিনি না।
শাশুড়ি, কঠিন চোখে তাকান।
আহ্ মা, ছি, এরমভাবে বলে না। গোধূলি কবে আসবে, আদৌ ফিরবে কি না ঠিক নেই। এমন না হয় বীণার সঙ্গেই আপনাকে বরাবর থাকতে হল।
ঠাকুমা মুখ বাঁকিয়ে বসে থাকেন।
মিলি আস্তে আস্তে শাশুড়ির গায়ের কাছে দাঁড়ায়। বলছি, মা, বীণাদিকে আপাতত আমার সেই সিঙ্গল বেডটা দিয়ে দেই, ঠাকুমার ঘরে ফিট করে নিক। বীণাদি চলে গেলে, গোধূলি এলে তখন ফের তুলে নিয়ে যাব? ওটায় দিব্যি একজন শুতে পারে। এখনকার মতো তো ঝামেলা মিটুক।
শাশুড়ির মুখ দেখে মনে হয়, হাতে চাঁদ পেয়েছেন। সুন্দর সমাধান। কাজের লোক রাখা আর টেঁকানোর চেয়ে সংসারে কঠিন কাজ কিছুই নেই।
শাশুড়ির ইশারায়, তাঁর ছেলে তুরন্ত উপর থেকে বেড নিয়ে এসে ঠাকুমার খাটের পাশে ছোট্ট সিঙ্গল চেয়ার কাম বেড সেট করে দেয়। এক মিনিটের মধ্যে বীণা চাদর, শতরঞ্জি পেতে বিছানা করে নেয়। মিলি হাভাতের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। তার শখের বেড গৃহপরিচারিকার হয়ে গেল। সব মিটে গেলে যে যার ঘরে ঘুমাতে চলে যায়।
জিষ্ণু উপরে এসে দরজা বন্ধ করে মিলিকে জড়িয়ে ধরে পিছন থেকে। অনেক দিন পর, আদর পেয়ে মিলির বুকের ভিতরটা ছলোছলো করে ওঠে। সেই ছলোছলো ভাবের নীচে একটা সরু শীতল স্রোত সে স্পষ্ট টের পায়, বুকের একটু নীচের দিকে, হৃদয়ের গভীরে। জিষ্ণু কাঁধে মুখ ডুবিয়ে বলে, কত্ত দূরে চলে গেছিলে তুমি। ও খাট বিদায় হয়েছে ভাল হয়েছে। আমরা একসঙ্গে জড়িয়েমড়িয়ে ঘুমাব।
মিলি ঘাড় কাত করে খুশিমুখে হ্যাঁ বলে। তারপর ঘুরে গিয়ে গলা জড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, এইবার আমরা ফ্যামিলি প্ল্যানিং করি। কীগো? পাঁচ বছর হয়ে গেল। এবার তো দায়িত্ব নেওয়া উচিত। হাতের কাজে প্রবল ব্যস্ত জিষ্ণু চোখ নামিয়েই বলতে থাকে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, করব, করব এবার।

°°°

চিত্রণ: রাজ রায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × five =

Recent Posts

অরিজিৎ চক্রবর্তী

অরিজিৎ চক্রবর্তীর ছোটগল্প

ট্রমা-চিহ্নিত সেলফিগুলি অ রি জি ৎ  চ ক্র ব র্তী অজ্ঞাত পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধারকৃত দু’টি টীকা (লেখকের নাম অনুপস্থিত। পাণ্ডুলিপির শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা বহু আগেই

Read More »
পিয়াস মজিদ

পিয়াস মজিদের কবিতা

পি য়া স  ম জি দ অনিমিখ তোমার ভেতর যত ময়ূরতা, কেকা; আমি বন থেকে তার দিকে লক্ষ করে আছি। আমার চোখের সবুজ লোকালয়ের বাকি

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

স্বপনকুমার মণ্ডলের ছোটগল্প

জিতকা স্ব প ন কু মা র  ম ণ্ড ল ১ হাটবারে বিদ্যাখাড়ির পাড়ে রাস্তা জুড়ে জমাটি ভিড়। মোরগ লড়াই চলছে। কাঁতিদার লড়াইয়ের তাগদ দেখে

Read More »
সুদীপ্ত মাজি

সুদীপ্ত মাজির কবিতা

সু দী প্ত  মা জি মেঘ জংলা হাওয়ার গন্ধে জাগা নেশার মতো উড়িয়ে দিচ্ছ ওড়না তোমার, দিদিমণি এখন কি আর তেমন সবুজ বয়স আছে কুড়িয়ে

Read More »
চম্পা রায়

চম্পা রায়ের ছোটগল্প

ডিঙি চ ম্পা  রা য় ‘ও যদু… জাল নিয়া এগাও।’ মাঝ-নদীতে কারেন্ট জাল পাতছিল কালিচরণ। যদুকে ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাঁক দিল। যদিও কালিচরণ জানে,

Read More »
হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়

হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতাগুচ্ছ

হৈ ম ন্তী  ব ন্দ্যো পা ধ্যা য় মোহনার দিকে লুম্পেন হয়েছে রাত, রাহাজানি করে নিয়ে গেছে মন জ্যোৎস্নার গভীরদেশে ঘরবাড়ি তার গাঢ় হলুদের মতো

Read More »