Search
Generic filters
Search
Generic filters

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

‘আমাদের হাতে পায়ে মাঠঘাটের কাদা, মুখে মঞ্চের আলো, আঙুলে ভোটের কালি। দূর থেকে দেখি, আমাদের ধর্ম আর রাজনীতি অধর্মের পা ধরে আছে।’ [উপন্যাস ‘ত্রিস্তর’ (২০০৮)/ রাজর্ষি দাশভৌমিক]
ওই যে তরুণ, শুয়ে আছে বিডিও অফিসের সরু বেঞ্চে, যার ব্যান্ডেজবাঁধা মাথা সদ্যবাঁধা বোমার মতো— ও টেবিলে টেবিলে চা দেওয়ার অর্ডারটা পেয়েছিল… ওই যে মাস্টারমশাই, প্রিসাইডিং অফিসার যাঁর নাম, ভোটের ডিউটিতে বেরোনোর আগে আট বছরের মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বারবার সেলফি নিতে থাকেন; কিংবা ওই যে মুখে গামছা জড়ানো মাঝবয়সি, নিরাসক্ত ভঙ্গিতে খইনি ডলতে ডলতে যিনি বলেন— ‘বলে দিয়েছে, ইশারা করলে ভিড়ের দিকে আটটা ফায়ার করতে হবে। দু’নম্বরি মুঙ্গেরি তামাঞ্চা… তিন রাউন্ডের পর এমন গরম হয়ে যায়, হাতে ধরে রাখা যায় না। ফেটে গেলে আমিও মরতে পারি— কী করে বলব কার গায়ে লাগবে? এর জন্য পাঁচ হাজার দিবে— ছেলেটার কিডনির অসুখ, রাজি না হয়ে উপায় কী?’ এরা সবাই সেই বিয়োগান্তক নাটকের কুশীলব, যার সুতো ধরা আছে রাষ্ট্রের হাতে।
ইংরাজিতে ‘এক্সলটেশন অফ এন্ডস ওভার মিনস’ বলে একটা কথা আছে— এখানে সবাই এক বিরাট চক্রের অংশ হিসাবে সেই শেষটা দেখার অপেক্ষাই করে চলেছে, তার পদ্ধতিটা নিয়ে কেউ ভাবিত নয়। এই না-ভাবনার জগতে হারিয়ে যাওয়াটুকুই আমাদের সঙ্গী থেকে যায়।
তিনটে পোলিং বুথ একই স্কুল ক্যাম্পাসের মধ্যে। বোমাটা ফাটানো হয়েছিল মাঝখানের ফাঁকা মাঠে। কাউকে আঘাত করা নয়, ভিড় কাটিয়ে দেওয়াই ছিল প্রধান লক্ষ্য। অন্যান্য ভোটকর্মীর সঙ্গে সেও দরজার আড়ালে আশ্রয় নিয়েছিল। সঙ্গে থাকা দিশেহারা নিরাপত্তারক্ষীটি ততক্ষণে প্রায় শাসানির সুরে পরিষ্কার বলে দিয়েছে, ‘স্যর, নিজেরা নিজেরা ম্যানেজ করবেন। কোনও ঝামেলায় আমায় ডাকবেন না।’ সে বোঝে, কিছু কিছু ক্রোধ ভয় আর অসহায়তা থেকেই আসে। তার ফোন ঘনঘন বেজে চলে— সে অসহায়ভাবে নিজের অক্ষমতাটুকু জানিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারে না। ফুল, ফল, নৈবেদ্যর সামনে পাথরের মূর্তি যেমন অসহায়— সে জানে তার পুজো হবে; কিন্তু শোকতাপটুকু শুনে যাওয়া ছাড়া সে আর কিচ্ছুটি তার হাতে নেই! সে গালভরা নামের সেক্টর অফিসার— সে নৈবেদ্যর ওপরের দুর্গামণ্ডা— কোনও কাজে লাগে না, তবু তাকে রাখা হয়; তাকেও অবহেলার ফুল ছুড়ে দেওয়া হয়।
হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘কলকাতার যিশু’ কবিতায় কলকাতার ব্যস্ত ট্র্যাফিককে স্তব্ধ করে রেখে একটি উলঙ্গ শিশুর রাস্তা পার হওয়াকে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রেখেছেন। সেখানে সদ্য হাঁটতে শেখার আনন্দে সমগ্র বিশ্বকে হাতের মুঠোয় পাওয়ার বিশ্বাসটুকু নিহিত ছিল। আর এই মেঘচাপা শ্রাবণের দুপুরে, বুথের ‘বাহির’ লেখা দরজা দিয়ে শিশুটির একাকী বেরিয়ে আসা… এ তো আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়ানো, তবে তাতে বুকের মাঝে কোন বিশ্বলোকের সাড়া নেই। সরকার আর দল যখন এক হয়ে যায়, তখন সিস্টেমের নির্লজ্জ নিষ্ঠুরতা আর প্রতিকারহীন স্বার্থপরতা গণতন্ত্রকে,স্বাধীন মত প্রকাশের ন্যূনতম অধিকারকে এভাবেই দরজা দেখিয়ে দেয়।
ছোট মানুষ সিল্যুয়েটে দীর্ঘ ছায়া ফেলে গুটিগুটি পায়ে দরজা পার হয়ে বারান্দার দিকে এগোতে থাকে— বাইরে পলায়নরত পায়ের শব্দকে ঢেকে দেয় সেন্ট্রাল ফোর্সের ভারি বুটের আওয়াজ। মারামারি, বুথ জ্যাম, ছাপ্পা, রক্তপাত আর হিংসার ছবিতে তার মেমোরি উপচীয়মান— এতক্ষণে একটা মনমতো ফ্রেম তার সামনে পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনার মতো হাজির হয়! সন্তর্পণে মোবাইল বের করে ক্যামেরা তাক করে সে…

চিত্র: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − six =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »