সম্প্রতি প্রকাশিত অঙ্কোলজির অধ্যাপক এবং চিকিৎসক বিষাণ বসুর ‘চিকিৎসা: বিজ্ঞান / কাণ্ডজ্ঞান’ বইটিতে ‘বিজ্ঞানমনস্কতার আড়ালে অন্ধ বিজ্ঞানবাদিতা’-র ভক্তবৃন্দের প্রসঙ্গে লেখকের তীব্র অস্বস্তি, শ্লেষ এবং কটাক্ষবাণ চোখে পড়ল। দ্বিতীয়ত, হোমিওপ্যাথি এবং তার পথিকৃৎ হ্যানিম্যান বা কান্টকে না পড়েই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে দড়দের, ডক্টর বসুর বইটা ক্ষতবিক্ষত করবে বলে মনে হয়। এ প্রসঙ্গে ভারতের অন্যতম হোমিওপ্যাথি জার্নালে প্রকাশিত মনু কোঠারি (বর্তমানে প্রয়াত) এবং লোপা মেহতার প্রায় ১২০টি নিবন্ধ পাঠের সুবাদে এটা বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, ডক্টর বসু বিজ্ঞানমনস্কতার আড়ালে অন্ধ বিজ্ঞানবাদীদের হীনমন্যতা, উপরচালাকিকে আন্তরিকভাবে ঘেন্না করেন।
উপরে যে দুটি বিন্দুর উল্লেখ করেছি, তার কেন্দ্রীয় বিষয় হল বিজ্ঞানমনস্কতা কারে কয়? ডক্টর বসুর মতে, “একথা অনস্বীকার্য যে, একদিকে যদি ভেল্কি বা মির্যাকলের আশা, তবে আরেকদিকে অজস্র হাইপ, উচ্চকিত ঘোষণা ইত্যাদিতে জারিত আমাদের বিজ্ঞান-বিশ্বাস। হ্যাঁ, বিজ্ঞানমনস্কতা বা যুক্তিবোধ নয়— নিখাদ বিজ্ঞানবিশ্বাস।… মুখে বিজ্ঞানমনস্ক বলে বড়াই করতে ভালবাসলেও, বেশ গোঁড়া ধর্মাচারীর সঙ্গে আমাদের অধিকাংশের বিজ্ঞান মানার কোনো মূল গত ফারাক নেই।’’ তিনি লিখছেন, “বিজ্ঞান ঠিক কীভাবে এগোয়,… বিশিষ্ট বিজ্ঞান-দার্শনিক কার্ল পপার এঁর মতে— বিজ্ঞান হলো তাই যাকে ভুল প্রমাণ করা যায়। অর্থাৎ, যে কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতার মূলই হলো তাকে নিরন্তর চ্যালেঞ্জ করে যাওয়া, তাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করার জন্য নতুন নতুন পরীক্ষার মধ্যে ফেলা। অর্থাৎ, নতুন নতুন পরীক্ষা বা নতুন করে প্রশ্ন করে চলাটা বিজ্ঞানের স্বরূপগত ধারণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।” (পৃষ্ঠা ৪১-৪২)।
শ্রদ্ধেয় বসুর বইতে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কিত অধ্যায়টি (পৃষ্ঠা ৫৭-৭৮) তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্কদের, বিশেষ করে মুদ্রা-মূর্ছনায় মজে থাকা, বা রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতির দাবেদার-ঘনিষ্ঠ চিকিৎসকদের বিরক্তিকর বা অপ্রীতিকরই মনে হবার কথা। কেননা, উল্লিখিত দুটি বিষয় নিয়ে তাদের মনের গহীন কোণে প্রোথিত বিজ্ঞানবাদিতার শেকড় ওপড়ানোর সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হয়। প্রশ্ন হল, তাঁর উপরিউক্ত বইটির কারণে তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক বন্ধুদের চোখে ব্রাত্য বলে চিহ্নিত হবেন না তো? হলে আমি অন্তত আশ্চর্যচকিত হব না। দাগিয়ে দেবার পুরনো অভ্যাস বা পেটেন্ট এই মহলের বাসিন্দাদের প্রধান অস্ত্র, তা ভুক্তভোগীরা হাড়ে হাড়ে জানেন।
কিন্তু আমার মূল আগ্রহের বিষয়, যা আমি ক্যানসার চিকিৎসক বিষাণ বসুর বই থেকে খুঁজে পেতে চাই, তা হল— সায়েন্স, আর্টস আর কমার্স— এই অর্ডারের ঠিক বিপরীতমুখী অবস্থানে দণ্ডায়মান শ্রেষ্ঠী-নিয়ন্ত্রিত ক্যানসার চিকিৎসার অভিমুখ সম্পর্কে, বিজ্ঞানমনস্কতার মাপদণ্ডে কমার্স, আর্টস, সায়েন্স চক্রব্যূহের বাইরে বেরিয়ে আসার পথের সন্ধানে ডক্টর বিষাণ বসুর অভিমতটা ঠিক ভাবে জানা বোঝা।
এর একটি অধ্যায় হোমিওপ্যাথি (৫৭-৭৮ পৃষ্ঠা) মন দিয়ে পড়লে, আর কিছু না হোক সাধারণভাবে বঙ্গ মার্ক্সবাদীদের এবং বিশেষ করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মার্ক্সবাদী চিকিৎসক সংগঠনের নেতা-নেত্রীদের অন্তত বোধোদয় হওয়া উচিত বলে মনে হয়। অবশ্য আগেই আমি সুস্পষ্টভাবে বলেছি, তার সম্ভাবনা খুব কম। বরং তেনারা ডক্টর বসুকে ‘ব্রাত্য’ বলে দাগিয়ে দিতেই পারেন।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদান করে দুশো বছরের পুরনো হ্যানিম্যানীয় চিন্তাভাবনাকে, বিগত দুশো বছরে চিকিৎসা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আমূল পরিবর্তিত ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে ভাবার জন্য আন্তরিক অনুরোধ করেছেন ডক্টর বসু। ভুঁইফোঁড়, বিজ্ঞানবাদীদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, তথাকথিত অ্যালোপ্যাথি (নামকরণটা হ্যানিম্যান সাহেবেরই করা) চিকিৎসা বীভৎস নীতি সিদ্ধান্ত অনুসারী থাকাকালীন, বীতশ্রদ্ধ হ্যানিম্যান তাঁর নতুন চিকিৎসা প্রণালী প্রতিপাদন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার হাল কী ছিল আজ থেকে দুশো বছর আগে? ডক্টর বসু তার বর্ণনা দিয়েছেন— তৎকালীন চিকিৎসার হালত কী ছিল, তার উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রক্তক্ষরণ বা ব্লাডলেটিংয়ের কথা, যেখানে অসুখবিসুখে শরীর থেকে খানিকটা রক্ত বের করে দিলে ‘‘অসুখবিসুখ সেরে যাবে, এটাই অন্যতম চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে মান্য ছিল।’’ (পৃষ্ঠা ৬২)
এমতাবস্থায় তামার খনি অঞ্চলে মজুরদের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে তিতিবিরক্ত হ্যানিম্যান প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর বিশ্বাস হারালেন। আর শুরু করলেন নিজস্ব চিকিৎসাপদ্ধতি, যা কিনা এক ভিন্ন চিকিৎসা-দর্শনও বটে। (পৃষ্ঠা ৬৩)। এর পরেই লেখক বলছেন— প্রায় একক প্রয়াসে প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার বিপক্ষে গিয়ে নতুন ভাবনার যে বৈপ্লবিক দুঃসাহস— যে প্রয়াস বিপুল জনপ্রিয়তা পেতে থাকল কয়েক দশকের মধ্যেই— তা এই বিগত দুশো বছরে দমবন্ধ জলাশয়ে পরিণত হলো কোন পথে! (পৃষ্ঠা ৬৩)। ডক্টর বসু মূলত দুটি কারণ দেখিয়েছেন। প্রথমটি আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি, অর্থাৎ অ্যালোপ্যাথিকে রাষ্ট্র সর্বান্তঃকরণে সমর্থন জানাল আর বাকি ‘প্যাথি’-কে হেয় প্রতিপন্ন করার সাথে সাথে আর্থিক সাহায্য বন্ধ করে দিল। লেখক ‘প্রাতিষ্ঠানিক নেকনজর’ থেকে বঞ্চিত করার কথা বলেছেন। লিখেছেন— প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই যে চিকিৎসাপদ্ধতির উদ্ভব ও বিকাশ, সে যে প্রাতিষ্ঠানিক আনুকূল্য পাবে না, এ তো জানাই কথা। (পৃষ্ঠা ৬৩)
দ্বিতীয় কারণটা, মূলত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের ভেবে, উত্তর খোঁজার জন্য আন্তরিক অনুরোধ করেছেন লেখক। যে মূল বিন্দুগুলি উল্লেখ করেছেন, তা অবশ্যই যথাযথভাবে গ্রহণযোগ্য উত্তরের দাবি করে। কেন পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে হ্যানিম্যানকে প্রায় ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে তাঁর সিদ্ধান্তকে ধর্মমতের স্তরে পৌঁছে দিলেন হোমিওপ্যাথির শাস্ত্রীরা? হ্যানিমানের ‘অর্গ্যানন’ নামক পুস্তকটির বিভিন্ন সংস্করণের উল্লেখ করেছেন লেখক। দেখিয়েছেন যে, হ্যানিম্যান নিজেই বার বার তাঁর রচনার পরিমার্জন করেছেন। ১৮১০-১৮৪২ পর্যন্ত মোট ছ’টি সংস্করণ তো তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছিল। লেখক সবিনয়ে উল্লেখ করেছেন— প্রথম এবং ষষ্ঠ সংস্করণে বিস্তর ফারাক তো অস্বীকারের উপায় নেই। তাঁর বিনম্র কিন্তু সুস্পষ্ট অভিমত হুবহু তুলে দিচ্ছি— “তাহলে হ্যানিম্যানের অনুসারীরা, সেই অর্গ্যাননকেই অভ্রান্ত, প্রায় ‘বাইবেল’, ‘কোরান’-তুল্য ধর্মগ্রন্থের সমতুল, এমনটি ধরে থেমে থাকলেন কেন? কেন প্রশ্ন করার, পরীক্ষা করার যুক্তিবোধ হোমিওপ্যাথি থেকে হারিয়ে গেল? বা, আরও রূঢ় ভাষায় বললে, কেন হোমিওপ্যাথি থেকে মেধা বিদায় নিল।” (পৃষ্ঠা ৬৫)
ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, তথাকথিত আধুনিকতম চিকিৎসা বিজ্ঞান আদপেই বিজ্ঞান অনুসারী কি না, সেই প্রশ্ন সরাসরি না তুললেও, বিষাণ বসুর বইয়ের পরতে পরতে মহার্ঘ ক্যানসার চিকিৎসা পরিণতি যে বিষাদ ভরা, ডক্টর বসু সে-কথা অস্বীকার করতে পারেননি বা চানওনি। লেখক ‘হসপিস’ অর্থাৎ ঘরে রেখে, চেনামুখের সান্নিধ্যে, ‘কেয়ার গিভার’-দের টিম ওয়ার্ক, প্যালিয়েটিভ ট্রিটমেন্ট-এর ওপর নির্ভরশীল ক্যানসার চিকিৎসার কথা বলেছেন। ক্যানসারমুক্ত স্বপ্নসৌধ নির্মাণের দিবাস্বপ্ন দেখাবার প্রচলিত ‘কমার্স ফার্স্ট সায়েন্স লাস্ট’ পথে হাঁটার পক্ষে নন তিনি। পাঁচতারা ক্যানসার হাসপাতালের বাস্তবিকতা যে বিল হাতে পাওয়া মাত্র দিনদুপুরে তারা ঝলমল আকাশ দেখা-ই— সে প্রসঙ্গ সরাসরি না বললেও, তার যথেষ্ট আভাস দেবার ব্যাপারে তিনি কার্পণ্য করেননি।
এই প্রসঙ্গে, দুনিয়া ব্যাপী মার্ক্সের উত্তরসূরিদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। সেও প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন দার্শনিক প্রবচনই। মাওয়ের দেশে ‘বিড়ালের রং নয় তার ইঁদুর ধরার দক্ষতা’-র তথাকথিত প্রাগম্যাটিজম বলুন, অথবা আমাদের দেশে আঞ্চলিক ক্ষমতাধারী বা শক্তিশালী রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ায় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রচেষ্টায় সমর্পিতদের দেখেই বুঝুন। ইতিহাসের ডাস্টবিনে কবেই নিক্ষিপ্ত ‘দ্য পয়েন্ট ইজ হাউ টু চেঞ্জ দ্য সিস্টেম’! সেই জুমলা আওড়ানোর দিন শেষ হয়েছে কবেই।
শ্রদ্ধেয় চিকিৎসক বিষাণ বসুকে অশেষ ধন্যবাদ। সততার সঙ্গে অনেক কিছুই যে নতুন করে কেঁচে গণ্ডূষ করার অভ্যাস রপ্ত করা আশু প্রয়োজন, তিনি সেদিকে তাকিয়ে দেখার শালীন আবেদন জানাতে খামতি রাখেননি।






