Search
Generic filters
Search
Generic filters

রোজগেরে ছেলে

চুনিলাল কে মাড়িয়া

ভাষান্তর: শুভঙ্কর সাহা

গালা শেঠ খুব খুশি হল যখন সে শুনল যে তার মোষটা খুব তাড়াতাড়ি একটা বাচ্চার জন্ম দেবে। সে তার চাকরবাকরদের নির্দেশ দিল ভাগরিকে ভাল ভাল খাদ্যখাবার খাওয়াতে। নিজের গো-খাদ্যের ব্যবসা, ফলে ভাগরির জন্য সেরা বীজটা, খোলটার অভাব ছিল না।
শেঠের খুব উচ্চাশা ছিল এই মোষটার কাছ থেকে। খুব শীঘ্রই এমন একটা বাচ্চা পাওয়া যাবে যে বড় হলে প্রচুর দুধ দেবে। বীজটা, খোলটা, মাখনটা বরাদ্দ হল ভাগরির জন্য। এ আর এমনকী! পরে এর শতগুণ উঠে আসবে দুধ বিক্রি থেকে। কিন্তু হায়! মোষটা কিনা তার মালিককে ঠকিয়ে দিল! শেষে কিনা একটা এঁড়ের জন্ম দিল, এত খরচের পর এই! গালা শেঠ সত্যিই আঘাত পেল। দোকানের খাতা লেখার ছেলেটাও গালা শেঠের মত খরচের খোঁটা দিল ভাগরিকে।
গ্রামবাসীরাও একমত হল এই এঁড়েটাকে নিয়ে শেঠ একটা পয়সাও খরচা করবে না। নির্ঘাৎ গ্রামের ওই খোঁয়াড়টায় পাঠিয়ে দেবে। ওর জায়গা হবে বুড়ো, পঙ্গু, অকাজের সব গোরু-ছাগলের সঙ্গে। খোঁয়াড়টা গ্রামে মানুষের দানধ্যানের ওপরেই চলত।
কিন্তু শেঠের এই পরিকল্পনাটা ভাল লাগল না— বাড়ির পোষ্যটাকে ওই খোঁয়াড়ে দিয়ে দিলে ভাল দেখায় না। যতই অকাজের হোক ছেড়ে দিলে ব্যাপারটা খুব স্বার্থপরের মত হবে। যাইহোক কিছুদিন এইভাবে চলল। কিন্তু পরিবারের অন্যান্যরা বলতে লাগল একে বসিয়ে বসিয়ে খাইয়ে পয়সা ধ্বংস করে লাভ কী? তারা শেঠকে জোর করতে লাগল এঁড়েটাকে ওই খোঁয়াড়ে পাঠিয়ে দিতে। অবশেষে শেঠও হার মানল। একদিন সকালে ওই খোঁয়াড়ে নিয়ে যাবার পথে শেঠের সঙ্গে লাখুর দেখা হল। লাখু ছিল পেশাদার রাখাল। বংশ পরম্পরায় ওরা এই কাজই করে আসছে। সেই সকালে লাখু বেশ অল্পবয়স্ক নধর একটা মোষ নিয়ে চলেছিল পুকুরপাড়ে। এঁড়ে সেটাকে দেখে স্থির দাঁড়িয়ে পড়ল। অনেক বকাঝকা, মারের পরও এঁড়েকে এক ইঞ্চিও নড়ানো গেল না।
লাখু মজা করে বলল, দুষ্টু কোথাকার! আমার মোষের দিকে তাকিয়ে থাকতে তোর লজ্জা হয় না?
কিন্তু এঁড়েটার কোনও বিকার নেই।
গালা শেঠও দেখল রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এ তো বেশ অসুবিধায় ফেলল। ফলে লাঠি দিয়ে আবার মার। কিন্তু তাকে নড়ানো গেল না। বিরক্ত শেঠ মধুবর্ষণ করতে লাগল! এঁড়ের চোখে যেন ঘোর লেগেছে!
লাখুর অভিজ্ঞ চোখ বুঝে নিল, এঁড়ে পরে ভাল ষাঁড় হয়ে উঠবে। সে শেঠকে বলল, ‘শেঠ, একে আমার কাছে দিয়ে দাও। গ্রামের ওই খোঁয়াড়ে পাঠাতে হবে না। ওকে খাবারদাবার খাইয়ে ঠিক মানুষ করে নেব। ও কখনওই আমার কাছে বোঝা হয়ে উঠবে না।’
‘এই অকাজের এঁড়েকে নিয়ে তুই কী করবি?’
‘আমি ওকে ট্রেনিং দিয়ে রোজগেরে করে তুলব। কয়েক বছরের মধ্যেই এ ভাল ষাঁড় হয়ে উঠবে। তারপর গোরু, মোষ ডাকলে ওকে কাজে লাগাব।’
‘ঠিক আছে, যা ভাল বুঝিস কর। তোর যদি দুটো পয়সা আয় হয় আমি কিছু ভাবব না।’
‘কি বললে, পয়সা? কে জানে বড় হয়ে কী হবে? তবে ওর পিছনে এখন আমার অনেক খরচা আছে।’
শেঠ খুশি হল দুটো কারণে। প্রথমত সামাজিক লজ্জার হাত থেকে বাঁচবে আর দ্বিতীয়ত বাড়ির প্রাণীটা চোখের সামনে সামনে থাকবে। আসলে শেঠের কেমন যেন একটা মায়া পড়ে গেছে এই অবোধ প্রাণীটার প্রতি। গালা শেঠ আবার ভাবল একেবারে মাগনা দিয়ে দেব? লাখু তো পরে টাকা কামাবে। চিন্তাটা শেঠের মত ব্যবসায়ীর বেশ মনে ধরে গেল।
পরেক্ষণেই শেঠ দরদাম করতে শুরু করে দিল, ‘শোন, এঁড়োকে বড় হয়ে যখন কাজে লাগাবি তখন প্রত্যেকটা গোরু দেখালে আমাতে কত দিবি? তুই তো পয়সা নিবি।’
সহজ সরল লাখু তো ব্যবসায়ী নয়, তাই সে সঙ্গে সঙ্গেই বলল, ‘ঠিক আছে আধাআধি দেব।’
শেঠ খুশি হয়ে চুক্তিটা পাকা করে ফেলল।
লাখু তার দূরদৃষ্টি দিয়ে বুঝতে পারল এঁড়েটা পরে যথেষ্ট কাজে আসবে। তার সমস্ত পরিশ্রম, ভালবাসা দিয়ে লাখু একে বড় করে তুলতে লাগল। লাখুর বাবাও তো তাকে এই অবলা প্রাণীদের মধ্যে বড় করে তুলেছে, তাই এদের প্রতি লাখুর দয়ামায়াটাও একটু বেশি। এদেরকে শুধু পয়সা আয়ের যন্ত্র মনে করে না, প্রত্যেই তার কাছে নানান অর্থে হাজির হয়, যেন সবাই আপনজন।
বছর খানেক আগে তার ছেলে রানা কলেরায় মারা গেল। সে দুঃখ এখনও ভোলেনি লাখু। পার্থিব হিসেবনিকেশের প্রতি তার আর তেমন টান ছিল না। কিন্তু এই ছোট্ট এঁড়েটা তার গোয়ালে ঢোকার পর থেকেই লাখুর ভিতরে ভিতরেও বদল এল। ওকে দেখলেই রানার কথা মনে পড়ে।
একদিন রাত্রে এঁড়েটাকে খাওয়ানোর সময় লাখু কান্নায় ভেঙে পড়ল। মনে মনে ভাবল যদি রানাটা বেঁচে থাকত তাহলে বুড়ো বয়সে নিশ্চয় দুটো ভাত-রুটি দিত। যা হোক উপরওয়ালা আছেন। এই এঁড়েটাই ছেলের কাজ করবে। রানার মত এও আয় করে খাওয়াবে। সেই থেকে এর নাম রাখল রানা।
রানার মধ্যে খুব শীঘ্রই পরিবর্তন এল। মুখের ভাবভঙ্গি বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে গলার স্বর। লাখু তার অভ্যস্ত ও অভিজ্ঞ কান দিয়ে বুঝতে পারল, এবার থেকে রানার জন্য পাহারা আরও জোরদার করতে হবে।
পরদিন সকালে জঙ্গল থেকে শক্তপোক্ত একটা বাবলা গাছের ডাল কেটে নিয়ে এল। ছুতোরের কাছে নিয়ে গিয়ে এক মাথায় হুক তৈরি করিয়ে গোয়ালঘরের মেঝেতে পুঁতে দিল গোঁজ হিসেবে। আর রানার গলার চেনটা আটকে দিল এর সঙ্গে।
রানা এখন বড় হয়ে উঠেছে। লাখু ওর জন্য সব সেরা খাবারটা বরাদ্দ করে রাখে। একদিন রাত্রে রানার ঘড়ঘড়ানি শুনে লাখু উঠে গিয়ে দেখে এল সব ঠিক আছে কিনা। গলার চেনটা আর একটু শক্ত করে দিয়ে এল। ভোরের দিকে রানার তীব্র ঘড়ঘড়ানিতে আবার ঘুম ভেঙে গেল। এবার গিয়ে দেখল রানাও নেই আর খুঁটিটাও নেই। তেলের বাতিটা আর একটু উস্কে দিয়ে খুঁজতে লাগল রানাকে। লাখু দেখল দূরে অন্ধকারে রানা, পরম তৃপ্তিতে এক মোষের সঙ্গে তার শরীর ঘষে চলেছে। গলায় ঝুলছে চেনটা।
শক্ত গোঁজটা উপড়ে ফেলে দিল রানা! লাখু অবাক হল কিন্তু ধৈর্য্য হারাল না। জীবনে এর চেয়ে আরও শক্তপোক্ত ষাঁড় সামলেছে সে। কাছাকাছি আর একটা হুকে রানাকে বুদ্ধি করে বেঁধে ফেলল সে। চালাকি করে মোষটাকে সরিয়ে নিল পাশের ঘরে। এতে রানা রেগে গিয়ে তার মালিকের দিকে চেয়ে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। আরও একটা চেন দিয়ে রানাকে কব্জা করে নিল।
এটা লাখুর কাছে পরিষ্কার একটা সতর্কবাণী। সে ভাবল এবার রানার নাক ফুটিয়ে একটা বালা পরিয়ে দিতে হবে। ওই বালার সঙ্গে একটা চেন বেঁধে দিলে একে পোষ মানানো সহজ হবে। গ্রামের দক্ষ নাপিতকে ডেকে কাজটা সেরে ফেলল লাখু। রানার সামনের হাঁটুতে রুপোর পাত লাগানো আছে। তার সঙ্গে নাকের বালাটা চেন দিয়ে বেঁধে দিল। এবার থেকে সহজেই রানার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যাবে।
রানা ক্রমে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। লাখু মনে মনে ভাবল এবার থেকে একে কাজে লাগানো যাবে আর মাদি-প্রতি চার্জ নেবে এক টাকা। গালা শেঠও এরকমটা ভাবছিল কিন্তু তার মতে চার্জটা বাজার অনুযায়ী কম। সে দু’টাকার কথা বলল। লাখুরও রাজি না হয়ে উপায় নেই। খবরটা পাশের সব গ্রামে রাষ্ট্র হতে দেরি হল না।
চারপাশে গোরু দেখানোর মত মাত্র একটাই ষাঁড় ছিল। তার চার্জ মাত্র এক টাকা। কিন্তু রানার মত সে বলশালী নয়। ফলে রানার এই বাড়তি টাকাটা সবাই মেনেই নিল। অনেক দূর দূর থেকে মানুষ তাদের গোরু-মোষ রানার কাছে আনতে লাগল। লাখুর ভাগ্যও খুলে গেল। যদিও এক টাকা করে শেঠকে দিতে হয়, তবুও লাখুর ভাগ্যে যা জুটছে তা কম কীসে! সে রানাকে একটা সোনার পাত গড়িয়ে দিল।
লাখুর আনন্দ যেন উপচে পড়ছে। রানা সত্যি সত্যিই তার উপায়ী ছেলে হয়ে উঠেছে। লাখুও তার প্রতি পিতার স্নেহ ও যত্ন ফিরিয়ে দিতে কসুর করে না। কিন্তু গালা শেঠ এতে খুশি নয়। রানা তো আসলে ওর। ফলে ও মতলব ভাজে কী করে চার্জটা বাড়িয়ে দেওয়া যায়।
একদিন সকালে দূর দেশ থেকে এক কৃষক এল তার গোরু নিয়ে। গ্রামের কুয়োতলার কাছে দাঁড়িয়ে লাখুকে খবর পাঠাল। লাখুও রাজকীয়ভাবে রানাকে নিয়ে এল। রানা ছুটে যাবার চেষ্টা করতেই লাখু তাকে চেন দিয়ে আটকে দিল। এমন সময় শেঠ সেখানে এসে হাজির হল। সে বলল, এই কৃষকের কাছ থেকে তিন টাকা নেওয়া হোক। শেষমুহূর্তে এই বেশি পয়সার কথা শুনে কৃষকও যেমন সংকটে পড়ল, তেমনই লাখুও শেঠের প্রতি অসন্তুষ্ট হল। রানা কিন্তু ধীরে ধীরে অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে লাগল। এদিকে কৃষকও বেশি পয়সা দেবে না। শেঠও নাছোড়।
রানার অবস্থা দেখে লাখু শেঠকে অনুনয়-বিনয় করতে লাগল আর কৃষকও বেশি পয়সা না দিয়ে অন্য ষাঁড়ের সন্ধানে চলল। রানাকে ধরে রাখাই কঠিন হয়ে দাঁড়াল। শেঠ শুধু পয়সা বোঝে। আর কিছু নয়। শেঠ লাখুকে বলল, ‘ষাঁড়টাকে বেঁধে ফেল।’
‘এটা কিছুতেই সম্ভব নয় আর।’
‘আমি বলছি, বাঁধ।’
‘এটা খুব বিপজ্জনক ব্যাপার এখন।’
‘আমি তোকে আদেশ করছি লাখু, বাঁধ।’
নিরুপায় লাখু বালার মধ্যে চেন ঢোকানোর চেষ্টা করতেই উপস্থিত জনতা চেঁচিয়ে উঠল, ‘নাকের বালা বাঁধতে যাস না, রানা কিন্তু তোকেও মানবে না…।’
মন্দিরের চাতালে দাঁড়ানো মানুষজনও বুঝতে পেরেছে রানার চোখের ভাষা। কিন্তু শেঠ পারেনি। জনতা নিষেধ করলেও শেঠ চায় লাখু তার আদেশ পালন করুক। সে কারও কাছে মাথা নোয়াতে চায় না।
লাখু আদেশ পালন করার চেষ্টা করল। নাকের বালার মধ্যে যেই না চেনটা ঢুকিয়েছে, রানা তার মনিবকে অস্বীকার করতে এক হ্যাঁচকায় মাথা তুলে ধরল। এই টানে তার নাক গেল ছিঁড়ে। বালা বেরিয়ে এল আর অঝোরধারায় রক্ত ঝরতে লাগল। কিন্তু রাগে হিংস্র হয়ে ওঠা রানার কছে ব্যথাযন্ত্রণার চেয়ে তার অতৃপ্তির দাম বেশি। তাই সে ক্রোধান্ধ হয়ে তার মনিবের দিকে ছুটে গেল প্রতিশোধ নিতে।
লাখুও প্রাণভয়ে ছুটতে লাগল। শেঠ আর সবাই মন্দিরে আশ্রয় নিল। লাখু জঙ্গলের পথে ছুট লাগাল। রানাও তার পিছু নিল। যেন হত্যা না করতে পারলে ওর শান্তি নেই। মানুষজন চিৎকার করে সবাইকে সাবধান করে দিতে লাগল। ‘পালাও পালাও, রানা পাগল হয়ে গেছে।’
লাখুও বাঁচার জন্য জঙ্গলের মধ্যে শুধু আঁকাবাঁকা পথ নিতে লাগল। কিন্তু রানাও তাকে অনুসরণ করে চলেছে। লাখু তার গতি বাড়িয়ে দিল। ও বুঝতে পারল অতৃপ্ত রানার হাত থেকে আর নিস্তার নেই। লাখুর বয়স হয়েছে, যুবক রানার সঙ্গে পারবে কী করে! ভাগ্যের কী পরিহাস, যাকে পুত্রস্নেহে গড়ে তুলল সেই কিনা তার প্রাণ নেবার জন্য ছুটছে! সমস্ত ভালবাসা, স্নেহ অসার প্রতিপন্ন হল। লাখু আর দৌড়তে পারছে না। তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। মরিয়া লাখু্ মাথার লাল পাগড়িটা ফেলে দিয়ে রানাকে বিভ্রান্ত করতে চাইল। সেটা শিংয়ে তুলে নিয়ে রানা তাড়া করতেই লাগল।
লাখু শেষ আশ্রয় হিসাবে একটা বড় ক্যাকটাসের পিছনে দাঁড়িয়ে পড়ল। এক মুহূর্তের জন্য ভাবল, ‘বোধহয় বেঁচে গেলাম।’ কিন্তু না, রানা ওকে দেখে ফেলেছে। তার সোনার পাত মোড়া সামনের পা দুটো তুলে রানা বৃদ্ধ লাখুর পাঁজরে সজোরে লাথি মারল। দু’পা দিয়ে হাড়পাঁজরা পিষে দিল। লাখু মরল। রক্তের স্রোতের মধ্যে তার নিঃসাড় শরীরটার ওপরে দাঁড়িয়ে রানা প্রস্রাব করল। প্রতিশোধ নেবার পাশাপাশি তার শারীরিক চাহিদার অতৃপ্ত বাসনা যেন পূর্ণ হল।

[মূল গল্পের নাম The earning son। চুনিলাল কে. মাড়িয়া গুজরাতি আধুনিক ছোটগল্পের রূপকার। ছোটগল্পের পাশাপাশি উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধেও সমান স্বচ্ছন্দ তিনি।]

চিত্রণ : শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × two =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »