Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

নিজভূমেই বিস্মৃত বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সৈনিক শান্তিগোপাল সেন

১৯৩৫ সাল। সুদূর আন্দামানের সেলুলার জেলের কারাকক্ষ। সন্ধ্যাবেলার অলস আড্ডায় কোনও এক স্বাধীনতা সংগ্রামী আক্ষেপ করে বলছেন— গুলি ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিভলভার কেঁপে যায় বলে রিভলভারে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রাইফেলের থেকে অনেক বেশি। সেই জন্যই তিনি চোদ্দো হাতের মধ্যে থাকা ইংরেজ সাহেবকে সামনে পেয়েও মারতে পারেননি। এই লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার ঘটনা নিয়েই বিপ্লবীদের মধ্যে সেদিন তুমুল তর্ক। চশমা পরা খুব সাধারণ চেহারার এক যুবক তুমুল তর্কের মাঝখানে মৃদু গলায় বললেন— ‘সিক্স ও ক্লক এ রেখে এইম করলেই টার্গেট মিস হয় না। পরে প্র্যাকটিস করে দেখতে পারেন।’ তিনিই ব্যাখ্যা করে বোঝান— দেওয়াল ঘড়ির কাঁটার বারো সংখ্যাটিকে যদি টার্গেট করতে হয়, রিভলভার তাক করতে হবে ছয় সংখ্যাটির দিকে। তাহলেই সঠিকভাবে লক্ষ্যভেদ সম্ভব। বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত তাঁর কারাবিবরণীতে লিখছেন: রিভলভারের টার্গেট প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ঝকঝক করে উঠছিল চশমার আড়ালে একজোড়া চোখ। তিনি কোনওদিন ভুলতে পারেননি তীব্র চোখের সেই তরুণকে। তাঁর নাম শান্তিগোপাল সেন।

মালদা জেলার ইংরেজবাজারের পিরোজপুরে মালদা উইমেন্স কলেজের যাওয়ার রাস্তার একধারে আছে পুরসভার উদ্যোগে স্থাপিত তাঁর আবক্ষ মূর্তি। শহরের পুরনো বাসিন্দারা বলেন, শান্তিগোপাল সেন জাতীয় কংগ্রেসের টিকিটে ইংরেজবাজার বিধানসভা কেন্দ্রের তিনবার নির্বাচিত বিধায়ক। স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। সামাজিক সংস্কারমূলক আন্দোলন ছাড়াও মালদা গার্লস স্কুল এবং মালদা উইমেন্স কলেজ প্রতিষ্ঠার পিছনে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। ব্যস, এটুকুই। ৭৬তম স্বাধীনতা দিবস পালনের তুমুল উল্লাসের মধ্যে আমরা ভুলেই থাকলাম ১৯৩০-এর দশকে ইংরেজ প্রশাসনের বুক কাঁপিয়ে দেওয়া বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স দলের সদস্য এবং সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের এই নায়ককে। ভুললে চলবে না, রাইটার্স বিল্ডিং কাঁপিয়ে দেওয়া বিনয়-বাদল-দীনেশ এই বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স বা বি ভি দলেরই সদস্য।

শান্তি ‘ক্র্যাকশট’ সেন— ইংরেজ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের গোপন নথিতে এটাই ছিল শান্তিগোপাল সেনের সাংকেতিক নাম। অভিধান বলছে— ‘ক্র্যাকশট’ শব্দের অর্থ বন্দুক-পিস্তলে অব্যর্থ লক্ষ্য। পুলিশের এই নামকরণ থেকেই পরিষ্কার, আপাত সাধারণ চেহারার এই চশমাপরা তরুণটিকে তারা কী চোখে দেখত। অবশ্য তা হবে নাই বা কেন? তিনি ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্রের হাতে তৈরি এবং পরবর্তীকালে মেজর সত্য গুপ্তের হাতে পরিচালনাধীন অন্যতম সশস্ত্র গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স-এর সক্রিয় সদস্য। অবিভক্ত বঙ্গের মেদিনীপুর জেলা সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র।

বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স বা বি ভি-র সদস্যদের সঙ্গে সর্বাধিনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। ১৯২৮-এ তোলা ছবি।

১৯১৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর ইংরেজবাজার শহরেই জন্ম তাঁর। মালদা জিলা স্কুল থেকে ১৯২০-২১ নাগাদ ম্যাট্রিক্যুলেশন পাস করে বাবার চাকরিসূত্রে ভর্তি হন মেদিনীপুর কলেজে। সেখানে সহপাঠী বন্ধু পূর্ণানন্দ সান্যালের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে যান বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্সের সশস্ত্র বিপ্লববাদী আন্দোলনে। ১৯৩১-৩২-এর মধ্যে বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্সের গুলিতে মেদিনীপুর শহরেই ম্যাজিস্ট্রেট পেডি এবং ডগলাসের মৃত্যুর পর কড়া হাতে মেদিনীপুরকে দমন করার দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয় কুখ্যাত ব্রিটিশ আইসিএস বার্জকে। বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সদের সভায় সিদ্ধান্ত হয়, বার্জ সাহেবকেও সরিয়ে দিতে হবে পৃথিবী থেকে। সভায় উপস্থিত ছিলেন নবজীবন ঘোষ, রামকৃষ্ণ রায়, ব্রজকিশোর চক্রবর্তী, প্রভাংশুশেখর পাল, কামাখ্যাচরণ ঘোষ, সনাতন রায়, নন্দদুলাল সিংহ, সুকুমার সেনগুপ্ত, বিজয়কৃষ্ণ ঘোষ, পূর্ণানন্দ সান্যাল, মণীন্দ্রনাথ চৌধুরী, সরোজরঞ্জন দাস কানুনগো, শান্তিগোপাল সেন, শৈলেশচন্দ্র ঘোষ, অনাথবন্ধু পাঁজা এবং মৃগেন্দ্রনাথ দত্ত। হত্যার পরিকল্পনার তৈরির ক্ষেত্রে সকলের ভূমিকা থাকলেও নির্মলজীবন ঘোষ এবং মৃগেন দত্তের উপর গুলি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঘটনার একমাস আগে থেকে শান্তিগোপাল সেন এবং অন্যান্যরা সাইকেল করে মেদিনীপুর শহর সরজমিনে ঘুরে দেখে সিদ্ধান্ত নেন, পুলিশ গ্রাউন্ডে আয়োজিত ফুটবল ম্যাচেই গুলি করতে হবে বার্জকে।

তারপর এল সেই দিন। ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩। ব্র্যাডলে বার্ট পুলিশ টুর্নামেন্টের হাফটাইমে খেলে বেরিয়ে আসছেন দক্ষ খেলোয়াড় (ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাবের নিয়মিত সদস্য) জেলাশাসক বার্নার্ড বার্জ। তাকে ঘিরে ধরে গাড়ির দিকে নিয়ে যাবেন নিরাপত্তারক্ষীরা। এমন সময় নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে তার দিকে গুলি চালান মৃগেন দত্ত এবং অনাথবন্ধু পাঁজা। গুলির আঘাতে গাড়ির পাদানিতেই মুখ থুবড়ে পড়েন বার্জ। দেহরক্ষীদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই মারা যান অনাথবন্ধু এবং আহত মৃগেন দত্ত পরের দিন মেদিনীপুর জেলা হাসপাতালে মারা যান।

সারা শহর জুড়ে পুলিশি তাণ্ডবের ফলে ধরা পড়ে যান সকলে। বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে শুরু হয় বিচারের নামে প্রহসন। রায় বেরোলে দেখা যায়, শান্তিগোপাল সেনের নেতৃত্বে কামাখ্যাচরণ ঘোষ, সনাতন রায়, নন্দদুলাল সিংহ, সুকুমার সেনগুপ্ত, প্রভাংশুশেখর পাল এবং শৈলেশচন্দ্র ঘোষের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়েছে প্রমাণের অভাবে এবং অপরিণত বয়স্ক হওয়ার জন্য সামান্য কয়েকজন ছাড়া পেয়েছেন। আন্দামানের সেলুলার জেলের বাঙালি বন্দিদের ১৯৩৫ সালের তালিকায় চোখ রাখলে তার দ্বিতীয় নাম হিসেবে শান্তিগোপাল সেনের নামটি আজও জ্বলজ্বল করে। প্রায় ১২ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করার পর তিনি নিজ ভূমিতে ফিরে আসেন।

আন্দামানের সেলুলার জেলের বাঙালি বন্দিদের এই তালিকায় দ্বাদশ নামটি শান্তিগোপাল সেনের।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শুরু হয় তার অন্যরকম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। ১৯৫৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের টিকিটে দাঁড়িয়ে শান্তিগোপাল সেন তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কমিউনিস্ট পার্টির নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে প্রায় চার হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে ইংরেজবাজারের বিধায়ক হন। ১৯৬২ এবং ৬৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও তিনি অপরাজেয় ছিলেন। জেলার শিক্ষা বিস্তার আন্দোলনে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে তাম্রপত্র দিয়ে সম্মানিত করে। ১৯৯৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর মালদাতেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

আর কিছুদিন বাদেই তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। ইংরেজবাজার পুরসভার উদ্যোগে যথানিয়মে একটি মালা জুটবে মূর্তির গলায়। সামনে দিয়ে বয়ে যাবে শহরমুখী জনস্রোত। মোটা ফ্রেমের চশমার আড়াল থেকে এই বদলে যাওয়া পৃথিবীর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকবেন তিনি— বিপ্লবী শান্তিগোপাল সেন।

চিত্র: গুগল

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight + fifteen =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »
রুহ

রুহের কবিতাগুচ্ছ

একই আলোকমালায় কাটিয়েছি/ বহুকাল দু’জনে…/ বলিনি কখনও।/ তারা খসা দেখেছি একসাথে, যদিও/ গোপন থেকেছে চাওয়া-পাওয়া।/ মাঝে বহুদিন, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো/ একা… নীরবে বয়েছি যাতনা।/ আজ মিথ্যের নেই অবকাশ/ তোমাকে কি পড়েনি মনে/ কোনও মুহূর্ত বা ক্ষণে/ ভাবিনি কি একান্ত বন্ধু আমার—/ এতদিন পরে, পুনর্মিলনে বলেছ/ পাখি হতে চেয়েছিলে এ জীবনে

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

যুদ্ধ: বৈশ্বিক কসাইখানা, পুঁজির সংকট ও শ্রমের মুক্তি

অবিক্রীত পণ্যের পাহাড় যখন পুঁজির পুনরুৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন পুঁজিপতিরা তীব্র আতঙ্কে ভোগে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তারা প্রতিযোগী পুঁজিপতির বাজার ও পণ্য ধ্বংস করতে চায়। আর এই ধ্বংসের বৈধ হাতিয়ার হিসেবে তারা রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। অর্থাৎ, উদ্বৃত্ত পণ্য এবং অতিরিক্ত শ্রমকে ধ্বংস করে পুঁজির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই বুর্জোয়া যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য। এই শোষণের প্রক্রিয়াকে আড়াল করতে রাষ্ট্র একদল বুদ্ধিজীবী ও নীতিবিদ লালন করে, যারা কৃত্রিম ‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’-এর আফিম খাইয়ে শ্রমিককে বিভ্রান্ত রাখে, যাতে তারা শোষক ও শোষিতের মধ্যকার মৌলিক শ্রেণি-পার্থক্য ভুলে যায়।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

বিশ্বকাপ জৌলুসে আর্জেন্টিনা গণহত্যার বধ্যভূমি

বুয়েনস আইরেসের রিভার প্লেটের যে স্টেডিয়ামে তখন খেলা হত, তার মাত্র এক মাইল দূরে ছিল সামরিক সরকারের বন্দিশিবির নেভি স্কুল অব ম্যাকনিকস। সাংবাদিক ডেভিড কক্স ফুটবল বিশ্বকাপের খবর সংগ্রহ করতে গেছিলেন। তিনি ‘ডার্টি ওয়ার’ বইতে লিখেছিলেন, যখন স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার ম্যাচ চলত তখন ওই টর্চার সেল থেকে কান্নার শব্দ শোনা যেত। আর্জেন্টিনার ভুবনমোহিনী ফুটবলে লেগে আছে রক্ত।

Read More »