Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

সহস্রাব্দ পেরিয়েও মানুষ মনে রেখেছে লেডি গোডিভা-কে

সুস্বাদু আর উৎকৃষ্ট গুণমানের চকোলেটের কথা উঠলে চকোলেট-রসিকরা যে ব্রান্ডটির কথা প্রথমে বলে থাকেন, তা হল ‘গোডিভা’। পৃথিবীর প্রিমিয়াম কোয়ালিটির এই চকোলেট প্রস্তুত হয়ে আসছে প্রায় একশো বছর আগে থেকে। মাস্টার জোসেফ ড্রাপস নামের একজন বিখ্যাত চকোলেট ব্যবসায়ী বেলজিয়ামের রাজধানী শহর ব্রাসেল্‌স-এ ‘হ্যান্ড-মেড চকোলেট’-এর একটি ওয়ার্কশপ এবং কোম্পানি খোলেন লেজেন্ডারি লিডার লেডি গোডিভার (জন্ম: ৯৮০-১০৬৭ খ্রি.) সম্মানে। বর্তমানে সারা পৃথিবী জুড়ে ১০৫টি দেশে যাদের আটশোটি স্টোর রয়েছে। এই চকোলেট কোম্পানি যাঁর নাম বহন করে চলেছে, সেই ইতিহাসও দারুণ সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক। এই ব্র্যান্ডের চকোলেট প্যাকেটে থাকে একটি আইকনিক লোগো। এই গোডিভা ‘ব্র্যান্ড নেম’-এর পেছনে রয়েছেন মহতী একজন নারী— লেডি গোডিভা (Lady Godiva)। ঘোড়ার ওপর বসা নিরাবরণ লেডি গোডিভার ছবিটিই কোম্পানির লোগো।

শুধু চকোলেটই নয়, অ্যালফ্রেড টেনিসন ‘গোডিভা’ নামের দীর্ঘ কবিতায় (১৮৪২) লিখেছেন অসামান্যা সেই নারীর কথা। কবিতা ছাড়াও একাধিক সিনেমায়, উপন্যাসে এবং গল্পে রূপায়িত হয়েছে গোডিভা চরিত্রটি। সত্তর আশির দশকে ‘ব্যান্ড কুইন’ তাঁদের বিখ্যাত গানে তুলে ধরেছে লেডি গোডিভা-র কথা।

ঘোড়ার ওপর বসা নিরাবরণ লেডি গোডিভার ভাস্কর্য।

সহস্রাব্দ পেরিয়েও এই সম্ভ্রান্ত ইংরেজ নারীকে আজও মানুষ মনে রেখেছেন লেডি গোডিভা নামে। তাঁর নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে একটি ছবি ফুটে ওঠে। ঘোড়ার পিঠে বসা একজন নারী, যিনি তাঁর শরীর ঢেকে রেখেছেন তাঁর খোলা চুলে। পনেরোশো শতকের আঁকা ছবি, ভাস্কর্য, কবিতা, গদ্য বা আধুনিক চকোলেট প্যাকেটের ওপরে লেডি গোডিভার ঘোড়ার পিঠে বসা সেই ছবি মানুষের কল্পনায় জীবন্ত করে রেখেছে বহু শতক ধরে। কে ছিলেন এই লেডি গোডিভা? কী জন্যে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন? সেই কথা-ই বলব এই লেখায়। তাঁর কাহিনিকে এককথায় ‘ন্যাকেড ট্রুথ অ্যান্ড দ্য ন্যুড রাইড’ বলা যেতে পারে।

সকাল ছ’টা। সবে সূর্য উঠেছে। শরীরের ভেলভেট চাদরটি আস্তে আস্তে খুলে ফেলে দিলেন মাটিতে। ধীর অথচ মার্জিত পায়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন ঘোড়ার দিকে। সারা শরীরে একটিও সুতো নেই। তাঁর উজ্জ্বল শরীর থেকে অপরূপ আলোর আভা ছড়িয়ে পড়ছিল চারধারে। ঘোড়ার পিঠে চেপে বসলেন অপরূপ সুন্দরী নারী। প্রিয়দর্শিনী সুতনুকা গোডিভার শরীরের শোভা যেন শহরের বাতাসে পবিত্র এক সৌরভ ছড়িয়ে রেখেছে। শর্ত অনুযায়ী মেয়েটিকে এই অবস্থায় ঘোড়ায় চেপে কভেন্ট্রির রাস্তায় ঘুরে আসতে হবে। লম্বা চুল দিয়ে নগ্ন শরীরের অনেকখানি অংশ ঢাকা পড়েছে। শুধু তুষার-শুভ্র রঙের অনাবৃত পা দুখানি নীচে ঝুলিয়ে রাখা। বন্ধ ঘর থেকে মানুষ শুধু ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনেছে। পরিভ্রমণ শেষ হলে ঘণ্টা বেজে উঠল। সমস্ত মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এসে করতালি দিয়ে সম্মান জানালেন লেডি গোডিভাকে। কানে তালা লাগার মত ছিল সেই করতালির শব্দ। ইংল্যান্ডের কভেন্ড্রি নগরীতে আজও অমর হয়ে আছে হাজার বছর আগের লেডি গোডিভা-র নাম।

স্যার উইলিয়াম রিড ডিক-এর তৈরি লেডি গোডিভার ভাস্কর্য।

কেউ বলেন গোডিভার কাহিনি রূপকথা। কেউ বলেন সম্পূর্ণ না হলেও আংশিক সত্য কাহিনি। এইভাবেই ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোডিভার কাহিনি বহু শতাব্দী ধরে আজও চলে আসছে। তাঁর নামে কভেন্ড্রির ওয়ার মেমোরিয়াল পার্কে আয়োজিত হয় তিন দিনের মিউজিক ফেস্টিভাল। যা ১৯৯৭ সাল থেকে চালু হয়েছে। গোডিভার কাহিনির পেছনে আছে একদিকে অসহায় গরিবগুরবো প্রজাদের ওপর ট্যাক্সের বোঝা চাপানো অত্যাচারী জমিদার। অন্যদিকে ওই ট্যাক্সের ভার মকুব করার জন্যে লেডি গোডিভার অসাধারণ এক দরদি প্রচেষ্টা।

উদার ও দরদি মনের মহতী নারী লেডি গোডিভার স্বামী লর্ড লিওফ্রিক ছিলেন ক্ষমতার প্রতিভূ অত্যাচারী একজন জমিদার। তাঁর রাজ্যের কোনও প্রজাই সুখী ছিল না জমিদারের নানান কায়দায় কর চাপানোর জন্যে। নিজের ক্ষমতার অলিন্দেই ছিল তাঁর বাস, প্রজাদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ছিল না কোনও মাথাব্যথাই।

গোডিভা ব্র্যান্ডের চকোলেট শপ।

প্রজাদের কাছ থেকে কর (ট্যাক্স) আদায় করার ক্ষেত্রে প্রজাদের অভাব-অভিযোগ বা কোনও অসুবিধার কথায় কর্ণপাত করতেন না জমিদার। একসময় করের বোঝা এতই বেড়ে গেল যে, প্রজাদের কঠিন দুর্দশার মধ্যে পড়তে হল। অনাহার এবং দারিদ্র্যের সঙ্গে নিত্যদিন লড়াই করে জীবন কাটাতে হয়। প্রজাদের নিদারুণ দুর্দশার কথা গোডিভা যখন শুনলেন তখন তাঁর দরদিহৃদয় কেঁদে উঠল। তিনি জানেন অবুঝ পাষাণহৃদয় স্বামী এই নিয়ে তাঁর কোনও কথাই শুনবেন না। তবু তিনি স্বামীকে রাজি করানোর জন্যে বারবার বললেন। আবদার অনুরোধ এমনকি নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করলেন। কিছুতেই বরফ গলল না। অবশেষে স্বামী বললেন— ‘আমি যেরকম বলব, তুমি যদি তা করতে পারো, তাহলে আমি প্রতিজ্ঞা করছি প্রজাদের কর বৃদ্ধি মকুব করে দিতে পারি।’ কারণ তিনি ভেবেছিলেন এমন প্রস্তাবে স্ত্রী কখনওই রাজি হতে পারে না।

স্ত্রীকে কী শর্ত দিলেন স্বামী? সারা শরীরে কোথাও এতটুকু সুতো থাকবে না, সেই অবস্থায় ঘোড়ায় চেপে কভেন্ট্রির রাস্তায় ঘুরে আসতে হবে গোডিভাকে। স্বামী হয়ে তিনি এমন প্রস্তাব কেন দিয়েছিলেন? বিরক্ত হয়ে, হতাশ হয়ে নাকি মস্করা করে বলেছিলেন, তা আজ অনুমান করা শক্ত। যাই হোক জমিদারগিন্নি বুঝতে পেরেছিলেন, এ ছাড়া তাঁর আর কিছু করার নেই। গোডিভা রাজি হয়ে গেলেন এবং একই সঙ্গে স্বামীকেও একটি শর্ত দিলেন তিনি। ‘যে সময় আমি ঘোড়ায় চেপে যাব, শহরের সমস্ত মানুষদের সেসময় বাড়ির ভেতরে থাকতে হবে এবং সব বাড়ির জানালা বন্ধ রাখতে হবে।’

শাসকের কাছে ‘এ আর এমন কী কঠিন কাজ’! তিনি নির্দেশ দিয়ে দিলেন, ‘ওই সময় কেউ বাইরে থাকতে পারবে না এবং সকলের সব ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ রাখতে হবে।’

গোডিভা চকোলেট।

হয়েছিল কী, কেবলমাত্র একজন মানুষ ওই দৃশ্য দেখার প্রলোভন থেকে নিজেকে সংযত করতে পারেননি। ‘টম’ নামের সেই ব্যক্তি নিষেধ সত্ত্বেও জানলার ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে চোখে বিদ্ধ করে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এই লোককাহিনি থেকেই ‘পিপিং টম’ কথাটি এসেছে। যে ব্যক্তি পরের গুপ্ত ব্যাপার দেখবার জন্যে বা গুপ্তকথা শুনবার জন্যে ঘুরঘুর করে বেড়ায়, বিশেষত জানালা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারে সেই ব্যক্তিকে ‘পিপিং টম’ বলে।

বিত্তশালী জমিদারের স্ত্রী হয়েও সাধারণ জনগণের দুঃখদুর্দশায় বেদনাদীর্ণ হয় যাঁর মহতী হৃদয়, সেই নারীকে কুর্নিশ জানাই। একদিকে অসীম দরদি মন, অন্যদিকে অকুতোভয় সৎসাহস; স্বামীর অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে যিনি প্রতিবাদে মুখর হতে পারেন। সেই মহতী নারী লেডি গোডিভা-র উদ্দেশে, আসুন আমরা সকলে মাথা নত করে শ্রদ্ধা জানাই।

চিত্র: গুগল

One Response

  1. লেখকের মসৃণ সুন্দর কলমে… গোডিভা’র কাহিনী…তা সে রূপকথাই হোক অথবা আংশিক সত্যি গল্পই হোক… সুস্বাদু ‘গোডিভা ‘ চকোলেটের মতই একই রকমের মনকাড়া ভাললাগা❤️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 5 =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »