Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

জাজমেন্ট

ফ্রানজ কাফকা

অনুবাদ: অনিন্দিতা মণ্ডল

সেদিনটা হচ্ছে এক রবিবারের সকাল। নদীর ধারের প্রায় একরকম দেখতে ধূসর বাড়ির সারিতে একটি দোতলা বাড়িতে নিজের ঘরে বসে ছিল তরুণ ব্যবসায়ী জর্জ বেন্ডমান। সে এইমুহূর্তে তার এক প্রিয় বন্ধুকে চিঠি লেখা শেষ করল। তারপর ধীরে ধীরে, যেন খানিক ভাবের ঘোরে, চিঠিটা খামে পুরতে লাগল। তাঁর কনুই টেবিলের ওপরে রাখা। নদীর ওপারে পাহাড়ের সারি ও সবুজ তীরভূমির দিকে চেয়ে সে ভাবস্থ হয়ে রইল।

সে আসলে তার বন্ধুর কথা ভাবছিল। বন্ধুটি বেশ কয়েক বছর আগে ভাগ্যান্বেষণে রাশিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিল। সেন্ট পিটারসবুর্গে ব্যবসা শুরু করে। সেখানে প্রাথমিকভাবে তাঁর ব্যবসায়ে খুব উন্নতি হয় ঠিক, কিন্তু ধীরে ধীরে ব্যবসা পড়তে থাকে। তার ফলে দেশে আসা কমতে থাকে। অন্তত এমন কৈফিয়তই সে দিয়েছে।

অতএব সে বিদেশে অকারণে পড়ে পড়ে নিজেকে ক্ষয় করছে। জর্জ অনুভব করছে, তাঁর লম্বা দাড়ি দিয়ে ঢাকা যাচ্ছে না বিষাদাচ্ছন্ন মুখ। অন্তত জর্জ যে মুখখানির সঙ্গে আবাল্য পরিচিত সেই মুখ যেন হারিয়ে গিয়েছে। সে জায়গায় তাঁর মুখ এমন হলদেটে হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন তাঁর কোনও দুরারোগ্য ব্যাধি হয়েছে। বন্ধুর কথামত রাশিয়ায় তাঁর দেশের লোকেদের পল্লিতে তাঁর আসাযাওয়া নেই। কোনও রুশীয় মানুষ বা পরিবারের সঙ্গেও হৃদ্যতা নেই তার। তাই সে আজীবন অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একে কীইবা বলা যায়? যে পথ হারিয়েছে তাঁর জন্য দুঃখিত হওয়া চলে, কিন্তু কোনও সাহায্যই তো কাজে আসে না। ওকে কি দেশে ফিরে আসার পরামর্শ দেওয়া যায়? বন্ধুর দায়িত্ব কি নেওয়া যায়? কিন্তু তাতে কি ওঁকে এটাই পরিষ্কার করে জানানো হল না যে তুমি আসলে উড়নচণ্ডী? সবাই তোমাকে হাঁ করে দেখবে? তোমার দ্বারা কিছুই হল না! পলাতক মানুষটা যেন এক প্রাপ্তবয়স্ক শিশু। ফিরে এসে সে তার বন্ধুদের উপদেশে চলবে। জীবন কাটাবে। আর এইসব যন্ত্রণা কি তাকে বিদ্ধ করে সঠিক পথে আনতে পারবে? হয়তো তাকে দেশে ফিরিয়ে আনাটাই অসম্ভব। এখানে এখন ব্যবসাবাণিজ্য কীভাবে হয় সে সম্পর্কে তার আর ধারণা আছে কি? বন্ধুদের উপদেশের তিক্ততা তাকে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে দেবে। যতটা নিঃসঙ্গ সে তাদের থেকে দূরে থাকার জন্য হয়েছে তার চেয়েও বেশি।

এরপরও যদি সে বন্ধুদের পরামর্শমত চলে সফল না হতে পারে, অবশ্যই বিদ্বেষ নয়, পরিস্থিতির প্রতিকূলতার ফলে, নিজের কাছে ছোট হয়ে যাবে, হয়তো বন্ধুদের থেকে আরও দূরে সরে যাবে। এতে তার না থাকবে বন্ধু, না থাকবে নিজের জন্য কোনও দেশ। যা মনে হয়, যেভাবে সে আছে বিদেশে, ওইভাবে থাকাটাই ঠিক। তার পূর্ব ইতিহাস যা বলছে, তাতে দেশে ফিরেই যে খুব সফল হবে তার স্থিরতা নেই। হয়তো এই কারণেই দূরে থাকা বন্ধুকে চিঠিতে খোলাখুলি যে সব খবর দেওয়া যায়, ওর ক্ষেত্রে সেটা হয়ে ওঠে না। প্রায় তিন বছর হতে চলল সে দেশে এসেছিল। এতদিন না আসার কারণ হিসেবে সে রাশিয়ার অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা বলে। যখন হাজার হাজার রুশ দেশের বাইরে যাওয়া-আসা করছে তখন তার মত একজন তুচ্ছ ব্যবসায়ী নাকি দেশের বাইরে যাওয়ার অনুমতি পাবে না।

তবে এই তিন বছরে জর্জের জীবনেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। দুবছর হল জর্জের মা মারা গিয়েছেন। মায়ের মৃত্যুর পর জর্জ ও তার বাবা একসঙ্গে বাড়িতে থাকতে শুরু করলেন। এই সংবাদ জানিয়ে বন্ধুকে চিঠি দেওয়ার পর অত্যন্ত নীরস একটি উত্তর আসে। যা পড়ে মনে হয় যে দূরদেশে বসে এই দুঃখ অনুভব করা সম্ভব নয়। যাই হোক, তার পর থেকে জর্জ অন্য সব কিছুর সাথে সাথে ব্যবসায়েও বেশি করে মন দেয়।

মা যখন ছিলেন, তখন বাবার কথামতো ব্যবসায়ে সব কিছু হবে, এই বাধা জর্জকে স্বাধীনভাবে তেমন কিছু করতে দেয়নি। মায়ের মৃত্যুর পর, এবং সম্ভবত ভাগ্যদেবীর প্রসন্নতার ফলে ব্যবসায়ে প্রভূত উন্নতির ফলে বাবা আর তত আক্রমণাত্মক রইলেন না। সত্যি বলতে গত দুবছরে ব্যবসা এতটাই বেড়েছে যে দ্বিগুণ কর্মচারী রাখতে হয়েছে, ব্যবসা বেড়েছে পাঁচগুণ এবং ব্যবসার যা গতিপ্রকৃতি তাতে সে যে আরও বাড়বে, তা বোঝাই যাচ্ছে।

কিন্তু জর্জের বন্ধু তার এই সাফল্য সম্পর্কে কিছুই ধারণা করতে পারেনি। শোক জানিয়ে যে চিঠি সে লিখেছিল তাতে সে জর্জকে রাশিয়ায় চলে আসতে বলেছিল। জানিয়েছিল যে, জর্জের যে ব্যবসা রাশিয়ায় তার সম্ভাবনা খুব উজ্জ্বল। জর্জের ব্যবসায়ে যা লাভ সেই অঙ্কের তুলনায় বন্ধু যা বলেছিল তা নেহাতই ক্ষুদ্র। তবু জর্জ বন্ধুকে এ সম্বন্ধে কিছু জানানো থেকে বিরত ছিল। আর এখন এই নিয়ে লেখাটা মানায় না। সেটা অদ্ভুত হবে।

ফলত, জর্জ বন্ধুকে সামান্য সব ঘটনা ও রটনা লিখতে থাকল। রবিবারের অলস সকালে যেরকম চিন্তা মাথায় আসে আর কী। আসলে জর্জ চেয়েছিল এতদিনের অনুপস্থিতিতে দেশ সম্পর্কে, এখানকার হালহকিকত সম্পর্কে বন্ধু যে ধারণা নিয়ে আছে সেটা বজায় থাক। তাকে আর ঘাঁটিয়ে লাভ নেই। তাই তিনবার তিনটি বেশ বড়সড় চিঠিতে জর্জ এক সামান্য মানুষের সঙ্গে একটি সামান্য নারীর প্রেম সম্পর্কে সবিস্তারে লিখেছিল। আর কী অবাক কাণ্ড, তার বন্ধু সেই ঘটনায় খুব আগ্রহ প্রকাশ করে।

যদিও জর্জ এইসব গুজবের মাঝে নিজে যে একটি মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে সেটি জানায়নি। তার বাগদত্তা ফ্রাউলিন ফ্রিডা ব্র্যাডেনফিল্ড সম্ভ্রান্তবংশীয়া। জর্জ মেয়েটিকে এই বন্ধুর কথা বলেছিল। শুধু চিঠির মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ ও অদ্ভুত সম্পর্কের কথা জানিয়েছিল।

—আচ্ছা, তার মানে সে বিয়েতে থাকছে না। অথচ আমার কিন্তু তোমার সব বন্ধুদের চেনাজানার অধিকার আছে। মেয়েটি বলল।

—আমাকে ভুল বুঝো না। আমি বললে সে হয়তো আসতে পারে। অন্তত আমার তাই মনে হয়। কিন্তু তার মনে হবে যে তাকে যেন ধরেবেঁধে আনা হয়েছে। কষ্ট হবে তার। তার ওপরে আমার অবস্থা দেখে তার হিংসে হতে পারে। ভীষণ অসুখী হবে সে। ফলে সে আবার ফিরে যাবে। একা। বুঝতে পারছ এর মানে? জর্জ বলল।

—কিন্তু সে যদি অন্য কোনও উপায়ে জানতে পারে?

—সে বিষয়ে আমি নিরুপায়। তবে তার না জানাটাই সম্ভব।

—তোমার এমন বন্ধুদের কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমার বিয়ে ঠিক করা উচিত হয়নি।

—এখানে আমাদের দুজনেরই দোষ। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই।

ফ্রিডা জর্জের চুম্বনে আবদ্ধ অবস্থাতেই যখন বলে উঠল— সে যাই হোক, আমার ব্যাপারটা খুব খারাপ লাগছে, জর্জের একবার মনে হল, খবরটা দিলেও অসুবিধে ছিল না। তারপরেই তার মনে হল, ‘আমি যেমন আমি তেমন। বন্ধুর বন্ধুত্বের উপযোগী করে নিজেকে এখন আর পালটাব কেন?’

তাই রবিবার সকালে এক দীর্ঘ চিঠিতে সে তার বাগদানের কথা বন্ধুকে জানিয়েছে। সে লিখল, ‘সবচেয়ে ভাল খবরটা আমি তোমাকে শেষে দিচ্ছি। আমি ফ্রাউলিন ফ্রিডা ব্র্যাডেনফিল্ডের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হতে চলেছি। সে সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়ে। তুমি এখান থেকে চলে যাবার অনেক পরে সে এসেছে। তাই হয়তো তোমার পক্ষে তাদের জানা সম্ভব নয়। তার সম্পর্কে পরে আরও কথা জানানো যাবে। তবে এখন এইটুকু বলব যে, আমি খুব সুখী। তোমার আর আমার সম্পর্কে যেটুকু পরিবর্তন হয়েছে তা হল, এতদিন তুমি একজন সাধারণ মানুষের বন্ধু ছিলে। এখন থেকে তুমি একজন সুখী মানুষের বন্ধু। তাছাড়া আমার প্রেয়সী তোমাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে এবং অচিরেই তোমাকে চিঠি দেবে। এতে তুমি একজন নারীকে বন্ধু হিসেবে পাবে, যা একজন ব্যাচেলরের পক্ষে কম সৌভাগ্যের নয়। আমি জানি, বিয়েতে আসতে পারার তোমার হাজার বাধা আছে। কিন্তু আমার বিয়ে, এটাই কি সব বাধা কাটিয়ে ওঠার যথেষ্ট কারণ নয়? তবু তোমার পক্ষে যা ভাল হবে তুমি তাই কোরো।’

চিঠিটা হাতে ধরে জর্জ অনেকক্ষণ তার লেখার টেবিলে বসেছিল। তার চোখ জানলায়। পথে একজন চেনা মানুষ তার দিকে চেয়ে হাত নাড়ল, কিন্তু আনমনে থাকার জন্য সেটা তার চোখে পড়ল না।

শেষে চিঠিটি পকেটে রেখে জর্জ ঘর থেকে বেরিয়ে ছোট দালানটি পেরিয়ে তার বাবার ঘরের দিকে গেল। বহু মাস সে এই ঘরে আসেনি। যদিও বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্য তার এই ঘরে আসার কোনও দরকার ছিল না, কারণ রোজই কর্মক্ষেত্রে তাদের দেখা হয়, দুজনে একসঙ্গে একই রেস্তোরাঁয় দুপুরে খেতে বসেন। সন্ধের ঝোঁকে দুজনে বৈঠকখানায় খবরের কাগজ নিয়ে বসেন। অবশ্য জর্জ যদি তার বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে না যায়। ইদানীং সে তার বান্ধবীর সঙ্গেও দেখা করতে যাচ্ছে।

এমন রোদ ঝলমলে দিনেও তার বাবার ঘরটা কি ভীষণ অন্ধকার! জর্জ অবাক হল। উঠোনের ওধারে উঁচু পাঁচিলটা হয়তো আলো আটকেছে। একটি জানলার পাশে এক কোণে, যেখানে জর্জের মৃত মায়ের অসংখ্য স্মৃতি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সেখানেই বসে আছেন তার বাবা। তিনি খবরের কাগজটা এমনভাবে মেলে ধরেছেন যাতে চোখখারাপের ফলে দেখতে অসুবিধে না হয়। টেবিলে ব্রেকফাস্ট পড়ে আছে। খুব সামান্যই খেয়েছেন। বেশিরভাগ খাবার পড়ে আছে।

—‘জর্জ।’ বাবা উঠে দাঁড়ালেন। তিনি এগিয়ে এলেন। তাঁর ড্রেসিং গাউনের প্রান্ত উড়তে লাগল। জর্জ মনে মনে বলল— বাবা এখনও খুব শক্তসমর্থ কিন্তু! তারপর জোরে বলল— ‘এখানে অসম্ভব অন্ধকার।’

—হ্যাঁ, এখানে খুব অন্ধকার। বাবা বললেন।

—আর তার ওপরে তুমি সব জানলা বন্ধ করে রেখেছ! জর্জ বলে উঠল।

—কারণ আমি এভাবেই থাকতে চাই। বাবার উত্তর।

—বাইরে আবহাওয়াটা বেশ উষ্ণ। কথা ক’টি বলতে বলতে জর্জ বসল।

বাবা এই অবসরে টেবিল থেকে সব সরিয়ে একটি জায়গায় রাখলেন। জর্জ তাঁর চলাফেরা লক্ষ্য করতে করতে বলল— আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। আমি সেন্ট পিটারসবুর্গে আমার বিয়ের সংবাদ পাঠাচ্ছি।

জর্জ পকেট থেকে চিঠিটি খানিক বার করে আবার পকেটে রেখে দিল।

—সেন্ট পিটারসবুর্গ? বাবা জানতে চাইলেন।

বাবার চোখে চোখ রাখতে চাইল জর্জ। —হ্যাঁ। আমার বন্ধুকে, যে সেখানে আছে। জর্জ অবাক হল যে, ব্যবসার জায়গায় যেরকম দ্যাখে, এখানে বাবা ঠিক সেরকম নন। কেমন হাতদুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি রেখে দৃঢ় স্বনির্ভর হয়ে বসে আছেন তিনি।

—আচ্ছা? তোমার বন্ধুকে? বাবার কণ্ঠস্বর কেমন অদ্ভুত।

—দেখো বাবা, আমি প্রথমে তাকে আমার বিয়ের কথাটা বলতে চাইনি। অবশ্যই তার কথা ভেবে আমি বলিনি তাকে। যদিও সে খুব একলা, তবু আমি চেয়েছিলাম খবরটা অন্য কেউ তাকে দিক। কিন্তু ওই একলা হওয়ার কারণেই আমি না চাইলেও তাকে খবরটা দিতে বাধ্য হচ্ছি।
জানলার তাকে বিশাল খবরের কাগজটি এবং তার ওপরে চশমা রেখে একহাত দিয়ে চাপা দিলেন জর্জের বাবা। তারপর বললেন— তুমি তাহলে মত বদলালে?

—হ্যাঁ। আমি অনেক ভাবলাম। সে যদি প্রকৃতই বন্ধু হয় আমার, তাহলে এই সংবাদ পেয়ে সে খুশি হবে। তাই আর দেরি করলাম না। তবে তাকে জানানোর আগে তোমাকে একবার বলাটা দরকার মনে হল।

বৃদ্ধ তাঁর ফোকলা মুখটি যথাসম্ভব খুলে বললেন— জর্জ। শোনো, তুমি যে ব্যাপারে আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছ সেটা তোমার জন্য সম্মানের। কিন্তু পুরো সত্যিটা না বললে এ বিষয়ে কিছু না বলাই শ্রেয়। কিছু অপ্রিয় কথা আমি আর তুলতে চাই না। তোমার মায়ের মৃত্যুর পর এমন অনেক কিছুই ঘটেছে যা না ঘটা উচিত ছিল। হয়তো সময় আসবে সেসব কথা বলার। আমরা চিন্তা করতে পারার আগেই হয়তো আসবে। ব্যবসায়ে এমন অনেক কিছু ঘটছে যা আমি জানছি না। আমি বলব না যে আমার পেছনে ঘটছে, কারণ আমার স্মৃতি আর তেমন সতেজ নেই। কিছু মনে রাখতে পারি না। অনেক কিছুই আর লক্ষ্য করে উঠতে পারি না। প্রথমত তো এটা, দ্বিতীয়ত তোমার মায়ের মৃত্যু আমাকে ভীষণ শোক দিয়েছে, তোমার চেয়ে অনেক বেশি শোকগ্রস্ত হয়েছি আমি। কিন্তু এখন যখন আমরা এই চিঠিটার কথা বলছি, দোহাই জর্জ, আমার সঙ্গে প্রতারণা কোরো না। এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। না বললেও চলবে যে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুতরাং আমাকে প্রতারণা কোরো না। সত্যিই কি সেন্ট পিটারসবুর্গে তোমার এমন বন্ধু আছে?

জর্জ লজ্জায় উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে। —আমার বন্ধুদের কথা ভাবতে হবে না। হাজারটা বন্ধুও আমার বাবার জায়গা নিতে পারবে না। জানো বাবা? আমার মনে হচ্ছে তুমি ঠিক করে নিজের যত্ন নিচ্ছ না। কিন্তু বৃদ্ধ হলে যত্নের প্রয়োজন হয়। তুমি জানো, তোমাকে ছাড়া আমি ব্যবসা চালাতে পারি না। কিন্তু ব্যবসা করতে গিয়ে যদি তোমার শরীর খারাপ হয় তবে আমি কালই চিরতরে তা বন্ধ করে দিতে পারি। কিন্তু তাতে কিছুই হবে না। তোমার জীবনধারা বদলাতে হবে। খুব তাড়াতাড়ি। তুমি এখানে অন্ধকারে থাকো। কিন্তু বসার ঘরে প্রচুর আলো। শরীর শক্ত রাখার বদলে তুমি পেটভরে ব্রেকফাস্ট না করে একটু কী খাও। বন্ধ জানলার পাশে বসে থাকো, অথচ হাওয়া তোমার জন্য কত ভাল! না বাবা। আমি ডাক্তার ডাকছি। তাঁর নির্দেশ মানতে হবে। ঘর বদলাতে হবে। তুমি আমার ঘরে থাকবে, আর আমি এ ঘরে। তোমার কোনও অসুবিধে হবে না। তোমার সব কিছু ওই ঘরে চলে যাবে। দেখো, আমি ঠিক এটা করব। বা, তুমি যদি এখনই চাও তো আমার ঘরে আমার বিছানায় শুয়ে পড়তে পারো। কোনও অসুবিধে নেই। সত্যি বলতে সেটাই সবচেয়ে ভাল হবে।

জর্জ বাবার খুব কাছে দাঁড়িয়ে। বাবার সাদা চুলের রাশি তাঁর বুকের ওপরে এসে পড়েছে।

একটুও না নড়ে বাবা বললেন— জর্জ। জর্জ তখনই হাঁটু গেড়ে বাবার পাশে বসল। দেখল, বাবার শীর্ণ মুখে চোখের তারাদুটি অসম্ভব বড় হয়ে গেছে। আড়চোখে বাবা তাকে স্থির হয়ে দেখছেন।

—পিটারসবুর্গে তোমার কোনও বন্ধু নেই জর্জ। তুমি সারাজীবন মানুষকে হেয় করেছ। এমনকি আমাকেও এখন সেটাই করতে চাইছ। ওখানে তোমার কোনও বন্ধু থাকে কী করে? আমি বিশ্বাস করি না।

—বাবা। একটু ভাল করে চিন্তা করো। জর্জ বাবাকে চেয়ার থেকে তুলে তাঁর দুর্বল শরীর থেকে ড্রেসিং গাউন খুলতে খুলতে বলল। প্রায় তিন বছর হতে চলল সেই বন্ধু এখানে এসেছিল। আমার মনে আছে, তুমি তাকে খুব একটা পছন্দ করতে না। অন্তত দুবার আমি তাকে তোমার সামনে আনিনি। যদিও সে আমার ঘরেই বসেছিল। আমার বন্ধুটি একটু অদ্ভুত, তাই আমি বুঝতে পারি কেন তুমি তাকে পছন্দ করতে না। কিন্তু পরে তুমি তার সঙ্গে ভালই কথা বলতে। আমার গর্ব হত, তুমি তাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করতে আর সে উত্তর দিত। একটু যদি পিছিয়ে ভাবো তোমার মনে পড়বে। সে রুশ বিপ্লবের অনেক গল্প বলত। সে বলেছিল, একবার কিয়েভে ব্যবসার কাজে গিয়ে সে এক রায়টের মধ্যে পড়ে। তখন একজন যাজক বারান্দা থেকে হাতের ওপরে রক্ত দিয়ে ক্রুশচিহ্ন এঁকে ক্রুদ্ধ জনতার উদ্দেশে আর্জি জানিয়েছিলেন। তুমি নিজেই এই গল্পটা দু-একবার বলেছ।

কথা বলতে বলতে জর্জ বাবাকে চেয়ারে শুইয়ে তাঁর লিনেনের প্যান্টের ওপর থেকে উলের পাজামা খুলে নিয়েছে। তাঁর ময়লা অন্তর্বাস দেখে জর্জের খারাপ লাগছিল, বাবাকে সে অবহেলা করে। সে এখনও তার বান্ধবীর সঙ্গে বাবার ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও আলোচনা করেনি। সম্ভবত তারা দুজনেই ভেবেছে যে বাবা এরপর পুরনো বাড়িতে একা থাকবেন। কিন্তু এখন জর্জ স্থির করল যে, সে বাবাকে তার নতুন বাড়িতে নিয়ে যাবে। যে যত্ন সে করবে বলে ভেবে রেখেছে, তার জন্য আর দেরি করা যাবে না।

জর্জ বাবাকে দুহাতে পাঁজাকোলা করে বিছানায় শোয়াতে নিয়ে চলল। হঠাৎ তার শরীরে ভয়ের শিহরণ বয়ে গেল। বাবা তার গলায় ঝোলানো ঘড়ির চেনটা নিয়ে খেলছেন। শক্ত করে ধরে রেখেছেন সেটা।

কিন্তু বিছানায় শোয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। চাদরটা দিয়ে ঢেকে নিলেন নিজেকে। জর্জের দিকে যখন চাইলেন তখন সেই চাউনিতেও আর বিদ্বেষ ছিল না।

‘এখন তুমি হয়তো আমার বন্ধুকে মনে করতে পারছ। তাই না বাবা?’ বাবার চারপাশে কম্বলটা গুঁজে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল জর্জ।

তিনি যেন নিজের পা পর্যন্ত সবটা দেখতে পাচ্ছেন না এইভাবে জিজ্ঞেস করলেন, —আমি সবটা ঢাকা পড়েছি তো?

জর্জ আরও ভাল করে মুড়ে দিতে দিতে বলল— তুমি খুব ভালভাবে বিছানায় শুয়েছ বাবা।

কিন্তু আরও বেশি আগ্রহ নিয়ে তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন— আমি ভালভাবে ঢাকা পড়েছি তো?

—একদম ভেবো না। পুরোপুরি ঢাকা পড়েছ। জর্জ বলল।

কিন্তু তার কথা শেষ হবার আগেই বাবা চিৎকার করে উঠলেন, ‘না।’ আর সেই সঙ্গে প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে তিনি গায়ের কম্বলটি সরিয়ে ছুড়ে ফেললেন। নিজেকে স্থির রাখতে শুধু একটি হাত দিয়ে ছাদ স্পর্শ করে তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। —শোনো হে ছোকরা, আমি জানি তুমি আমাকে ঢাকা দিতে চাও। কিন্তু তার এখনও অনেক দেরি। যদি আমার সর্বশেষ শক্তি দিয়েও হয় তবু বলব তোমার জন্য তা যথেষ্ট। আমি তোমার বন্ধুকে বিলক্ষণ চিনি। সে আমার ভালবাসার সন্তান হতে পারত। আর সেই জন্যই তুমি তার সঙ্গে এতকাল ধরে এই ব্যবহার করে চলেছ। তোমার কী মনে হয়? আমি তার জন্য কষ্ট পাই না? সেই জন্যেই তুমি দরজা বন্ধ করে অফিসে বসে থাকো। চিফ এখন ব্যস্ত, তাঁকে বিরক্ত করা যাবে না। যাতে তুমি রাশিয়ার ঠিকানায় এইসব মিথ্যে চিঠি লিখতে পারো। কিন্তু একজন বাবাকে এসব শিখতে হয় না। সন্তানের গতিবিধি থেকে সে সহজেই জানতে পারে। এখন যখন তুমি আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, তুমি এই মিথ্যের ওপরে বসে কাটিয়ে দিতে পারো, সে একটুও নড়াচড়া করতে পারবে না, তখন তুমি নিজের বিয়ের কথা ঘোষণা করছ!

জর্জ হতবাক হয়ে গেল। বাবা কী অদ্ভুতভাবে ছায়াটি এঁকেছেন!

হঠাৎ যেন বাবা তার বন্ধুকে খুব গভীরভাবে চিনে ফেলেছেন। তার কল্পনাও পাখা মেলল। সে যেন রাশিয়ায় তার বন্ধুকে দেখতে পেল। এক জীর্ণ গুদামের দরজায় সে দাঁড়িয়ে। গুদামের তাকগুলি ভেঙে পড়েছে। পণ্যগুলি মলিন। আর সেই ভগ্নদশার মধ্যে বন্ধু দাঁড়িয়ে। কেন সে এত দূরে যেতে গেল?

‘আমার কথা শোনো!’ বাবার চিৎকারে জর্জের সম্বিত ফিরল। সে চমকে উঠে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু বাবা আবার তীব্রস্বরে বলে উঠলেন।

—‘কারণ সে তার স্কার্ট উঠিয়েছিল। এইভাবে, তাই তো? বিশ্রি মেয়েমানুষ।’ এ কথা বলতে বলতে বাবা তাঁর অধোবাসটি এভাবে তুলে ধরলেন যে, উরুতে তাঁর যুদ্ধকালীন ক্ষতচিহ্ন দেখা গেল। ‘সে তার স্কার্ট তুলে ধরেছিল বলে, যাতে তুমি তার সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করতে পারো তাই তুমি তোমার মায়ের স্মৃতিকে অসম্মান করলে, বন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে, আর আমাকেও বিছানায় শুইয়ে মুড়ে রাখতে চাও। কিন্তু আমি তো স্থবির নই! তাই না?’

এবার উঠে দাঁড়াবার জন্য তাঁর কোনও অবলম্বন দরকার হল না। নিজের মানসিক শক্তিতেই উঠে দাঁড়ালেন।

জর্জ ভয়ে এক কোণে সেঁধিয়ে গেল। বাবার থেকে যতটা দূরে সম্ভব ততটা দূরে সরে গেল। অনেক আগে সে নিজের মনকে দৃঢ় করে প্রতিটি সামান্য গতিবিধি লক্ষ্য রাখত, যাতে অতর্কিতে কোনও আঘাত না আসতে পারে। কিন্তু সূচের মধ্যে সুতো পরানোর মত মনোযোগ নিয়েও সেই কৌশল সে মনে আনতে পারল না।

‘কিন্তু তোমার বন্ধু পুরোপুরি এই বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়নি। আমি আজ এখানে তার প্রতিনিধিত্ব করছি।’ বাবা বলে চললেন।

‘মজা হচ্ছে?’ জর্জ বিকৃত স্বরে চিৎকার করে উঠল। পরক্ষণেই দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে ধরল। যা খারাপ হওয়ার হয়ে গেছে। এ বেদনা তার দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পর্যন্ত হরণ করছে।

‘হ্যাঁ, আমি মজা করছি। মজা। ভাল বলেছ। একজন বিপত্নীকের এর চেয়ে বেশি আর কী উল্লাস থাকতে পারে? বলো— তোমার বিবেক যেন জেগে থাকে— বলো আমার জন্য ওই পেছনের ঘরে কী পড়ে আছে? অবিশ্বাসী কর্মচারী দ্বারা প্রতারিত এই অধমের জন্য, কী পড়ে আছে এই বুড়ো হাড়ের জন্য? আর আমার ছেলে সর্বত্র চলে যাচ্ছে। আমার তৈরি করা যোগাযোগ থেকে ব্যবসা করে সে জয়ের গৌরবে জ্বলজ্বল করছে। সব কিছু লুকোতে একটা রাশভারি, ভারি ব্যস্ত মুখোশ পরে সে আমায় প্রতারিত করছে। কী মনে করো তুমি? আমি তোমায় ভালবাসি না? যে তুমি এই আমার থেকেই জন্মেছ?

জর্জের মনে হল, বাবা এবার সামনে ঝুঁকবেন। আর তারপর যদি উল্টে পড়ে পিষে যান তাহলে কী হবে? মনের মধ্যে ভাবনাগুলো হিসহিস করতে লাগল।

কিন্তু বাবা সামনে ঝুঁকলেও উল্টে পড়লেন না। জর্জ যেহেতু যথেষ্ট দূরে তাই তিনি তার ওপরেও মুখ থুবড়ে পড়লেন না। সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।

‘তুমি যেমন আছ তেমনই থাকো। তোমাকে আমার দরকার নেই। ভেবেছ তোমার অনেক শক্তি আর তাই দিয়ে তুমি খুশিমত যা ইচ্ছে তাই করবে। অত নিশ্চিত হোয়ো না। এখনও আমি তোমার চেয়ে বেশি শক্তি ধরি। আমার নিজের শক্তি কমে গেলেও তোমার মা আমাকে অসীম শক্তি দিয়েছেন। আর তাই তোমার বন্ধুর সঙ্গে আমি যোগাযোগ করতে পারি। মক্কেলরা সব আমার পকেটে।’

জর্জ ভাবল, বাবার শার্টে পকেটও আছে? এই ভাবনার মধ্যেই সে বিশ্বাস করল, জগতে এ ব্যক্তি একটি অবাস্তব অস্তিত্ব। একমুহূর্তের জন্যেই ভাবনাটার উদয় হল, কারণ সে তারপরেই সব ভুলে যাচ্ছিল।

‘তুমি শুধু তোমার বউয়ের হাত জড়িয়ে আমার পথ আটকাও, আমি কীভাবে তাকে তোমার পাশ থেকে উঠিয়ে নিই তুমি জানতেও পারবে না।’

জর্জ অবিশ্বাসী চোখে তাকাল। বাবা মাথা নাড়লেন, নিজের বক্তব্যের সত্যতাকে এইভাবেই জানালেন।

‘ওঃ তুমি আজ কী মজাই না করলে! আমাকে জিজ্ঞেস করতে এলে তোমার বন্ধুকে বিয়ের খবর দেবে কিনা। বোকা কোথাকার! সে তো আগেই জেনে বসে আছে! আমি তো তাকে চিঠি লিখি! তুমি আমার লেখার সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে ভুলে গেছ! তাই সে এত বছর এখানে আসে না। তুমি যা জানো তার চেয়ে শতগুণে বেশি সে জানে। তাই তোমার চিঠি পেয়ে সে বাঁ হাতের তালুতে সেগুলো মুড়ে ফেলে, আর আমার চিঠি ডান হাত দিয়ে খুলে পড়তে থাকে।’ উত্তেজনায় বাবা হাত ওপরে ছুড়লেন। ‘সে হাজার গুণে বেশি জানে।’

—‘দশ হাজার গুণে বেশি জানে।’ জর্জ ব্যঙ্গ করতে চাইল, কিন্তু শব্দগুলো তার মুখের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

‘এতকাল ধরে আমি এইদিনটির অপেক্ষায় ছিলাম। তুমি এমন একটি প্রশ্ন নিয়ে আসবে। কী মনে হয় তোমার? আমার আর কিছু সম্বন্ধে কোনও আগ্রহ আছে? কী ভাবো? আমি মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ি? দেখো।’ তিনি বিছানা থেকে একটি কাগজ তুলে জর্জের দিকে ছুড়ে দিলেন। জর্জ দেখল পুরনো তারিখ আর একেবারেই নাম না জানা একটি কাগজ।

‘বড় হতে কতদিন লাগল তোমার! এই সুখের দিন তোমার মা দেখতে পেলেন না। তোমার বন্ধু রাশিয়ায় ফ্যাকাশে হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। আর আমার কী হাল সে তো দেখাই যাচ্ছে।’

‘তুমি আমার অপেক্ষায় শুয়েছিলে এতদিন?’ জর্জ অবাক হয়ে বলল।

‘এখন আর তার দরকার নেই’, বাবা করুণ ও নীচু স্বরে বললেন। তারপর স্বর তুলে বললেন— ‘এইবার তুমি জেনেছ তো পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আরও কিছু আছে? এতদিন শুধু নিজেকে নিয়ে রইলে! তুমি সরল শিশু। কিন্তু তার চেয়েও বেশি তুমি এক শয়তান মানুষ। আর তাই আমি তোমাকে ডুবে মরার নিদান দিলাম।’

জর্জ দৌড়ে ঘর থেকে পালাতে গেল। বাবা সশব্দে বিছানায় আছড়ে পড়লেন, কানে সেই শব্দ রয়ে গেল। সে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকল। তার ঘর পরিষ্কার করতে আসছিল যে মেয়েটি তার সঙ্গে ধাক্কা লাগল। মেয়েটি চমকে উঠল, ‘জেসাস’, এবং অ্যাপ্রন দিয়ে ভয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। জর্জ ততক্ষণে চলে গেছে। সদর দরজা দিয়ে সে দৌড়ল, বড় রাস্তা পেরিয়ে সোজা জলের দিকে চলে গেল। ক্ষুধার্ত মানুষ যেমন আহার আঁকড়ে ধরে সে সেইভাবে রেলিং আঁকড়ে ধরল। সে রেলিং ধরে ঝুলল, ঠিক যেমন একজন পাকা জিমন্যাস্ট হিসেবে সে দোল খেত আর বাবা-মাকে গর্বিত করত।

ক্রমে তার মুঠো আলগা হতে লাগল। তবু সে ধরে থাকল রেলিং। ঠিক এই সময় একটা মোটর বাস সশব্দে ধেয়ে এল। ‘প্রিয় বাবা-মা, আমি তোমাদের চিরটাকাল ভালবেসেছি। চিরটাকাল।’ তার কথাগুলো এবং জলে ঝাঁপানোর শব্দ বাসের শব্দে চাপা পড়ে গেল।

ঠিক তখন সারি সারি গাড়ি ব্রিজের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সনজীদা খাতুন: শ্রদ্ধাঞ্জলি

সাতচল্লিশ-পরবর্তী পূর্ববঙ্গে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক সংস্থা গড়ে ওঠে, যাদের মধ‍্যে ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী’, ‘ক্রান্তি’, ‘উদীচী’ অন‍্যতম। রাজনৈতিক শোষণ ও পূর্ববঙ্গকে নিপীড়নের প্রতিবাদে কখনও পরোক্ষভাবে কখনও সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল এইসব সংগঠন। ‘ছায়ানট’ এমনি আর এক আগ্নেয় প্রতিষ্ঠান, ১৯৬৭-তে জন্মে আজ পর্যন্ত যার ভূমিকা দেশের সুমহান ঐতিহ‍্যকে বাংলাদেশের গভীর থেকে গভীরতরতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে সুস্থ ও সংস্কৃতিবান নাগরিক গড়ে তোলা। ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুনের মানসসন্তান এই ছায়ানট। মূলত রবীন্দ্রনাথের আদর্শে গড়ে ওঠা সঙ্ঘ, কাজী নজরুলের প্রিয় নামটিকে জয়ধ্বজা করে এগিয়ে চলেছে বহু চড়াই-উৎরাই, উপলব‍্যথিত গতি নিয়ে।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর গুচ্ছকবিতা

বিলাপ অভিসার জল আনতে চল রে সখী, জল আনতে চল নিভু নিভু আলোর সাজে সূর্য অস্তাচলে শেষবিকেলের রশ্মিমালায় বুকে ব্যথার ঢল লজ্জা আমার আবির হয়ে

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

যত মত তত পথ

বহুদিক দিয়েই একজন স্বতন্ত্র মননের ধর্মীয় সাধক। তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ধারণাতীত, আর তা কেবল তাঁর স্বদেশ বা এই উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা বিশ্বব্যাপী। এবং দিনের পর দিন তাঁর অনুগামীর সংখ্যা বাড়ছে। শ্রীরামকৃষ্ণ এবং সারদামণি ও স্বামী বিবেকানন্দকে কেন্দ্র করে যে ভাব-আন্দোলন, তার ফলশ্রুতিতে তাঁদের নিয়ে নিয়ত চর্চা ও গবেষণা হয়ে চলেছে। পৃথিবীব্যাপী দুশোর ওপর রামকৃষ্ণ মিশনের কার্যাবলি প্রমাণ করে (প্রতিবছর এর সংখ্যা বাড়ছে), আজকের এই অশান্ত বিশ্বে তাঁরা মানুষের কতখানি আশ্রয়।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব ছয়]

রবীন্দ্রভাবনায় যে নৃত্যধারা গড়ে উঠল তা দেশিবিদেশি নৃত্যের সমন্বয়ে এক মিশ্র নৃত্যধারা, তৎকালীন শিক্ষিত শহুরে বাঙালির সংস্কৃতিতে যা নতুন মাত্রা যোগ করল। নাচের প্রতি একরকম আগ্রহ তৈরি করল, কিছু প্রাচীন সংস্কার ভাঙল, মেয়েরা খানিক শরীরের ভাষা প্রকাশে সক্ষম হল। এ কম বড় পাওনা নয়। আরও একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, শিল্পক্ষেত্রে ভাবের সাথে ভাবনার মিল ঘটিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির প্রচেষ্টা। গতে বাঁধা প্র্যাক্টিস নয়। নিজের গড়ে নেওয়া নাচ নিজের বোধ অনুযায়ী।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব পাঁচ]

বাংলার মাটি থেকে একদা এই সুদূর দ্বীপপুঞ্জে ভেসে যেত আসত সপ্তডিঙা মধুকর। আর রবীন্দ্রনাথের পিতামহ, যাঁর কথা তিনি কোথাও প্রায় উল্লেখই করেন না, সেই দ্বারকানাথ-ও বাংলার তৎকালীন ব্যবসায়ীকুলের মধ্যে প্রধান ছিলেন। শুধু তাই-ই নয়, একদা তাঁর প্রিয় জ্যোতিদাদাও স্টিমারের ব্যবসা করতে গিয়ে ডুবিয়েছেন ঠাকুর পরিবারের সম্পদ। নিজে রবীন্দ্রনাথ বাণিজ্য সেভাবে না করলেও, জমির সম্পর্কে যুক্ত থাকলেও একদা বাংলার সাম্রাজ্য বিস্তার, বাণিজ্য-বিস্তার কী তাঁরও মাথার মধ্যে ছাপ ফেলে রেখেছিল? তাই ইউরোপ থেকে আনা বাল্মিকী প্রতিভার ধারাকে প্রতিস্থাপন করলেন জাভা বালির কৌমনৃত্য দিয়ে?

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব চার]

তৎকালীন দেশের বাস্তব সত্যের সঙ্গে মিলছে না বর্ণবাদ, উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ, মিলছে না পিকেটিং ও বিদেশি দ্রব্য পোড়ানোর আন্দোলন। রবীন্দ্রনাথ দেখতে পাচ্ছেন গ্রামে গ্রামে গরিব মানুষের খাওয়া নেই, নেই বেশি দাম দিয়ে দেশি ছাপ মারা কাপড় কেনার ক্ষমতা। দেখছেন পিকেটিংয়ের নামে গরিব মুসলমানের কাপড়ের গাঁঠরি পুড়ে যাচ্ছে যা দিয়ে সে তার পরিবার প্রতিপালন করে। রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করছেন তাঁর লেখায়। ‘গোরা’ ও ‘ঘরে বাইরে’ এমনই দু’টি উপন্যাস। গোরা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় প্রবাসী পত্রিকায়। পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশ ১৯১০ সালে। ঘরে বাইরের প্রকাশকাল ১৯১৬।

Read More »