Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘এক্ষণ’ পত্রিকা: একটি ধ্রুবতারা

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে লিটল ম্যাগাজিন একটা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে, এ কথা আমরা সবাই জানি। শহর কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রাম এবং দিল্লি ও মুম্বাই থেকেও অগণিত লিটল ম্যাগাজিন বেরিয়েছে। লেখার হাত মকশো করার সময় অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়েও ছোট পত্রিকা বের করেছে, যেগুলোর আয়ু দু-এক বছরের মধ্যেই শেষ। মানুষের সদিচ্ছে সেখানে কার্যকর হয়নি দুটি কারণে। অর্থ ও ভাল লেখা যেমন একটি, আর একটি কারণ সম্পাদনা। ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছে বেশ কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন। এগুলির মধ্যে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য নির্মাল্য আচার্য ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘এক্ষণ’ পত্রিকা। পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশ হয়েছিল ১৩৬৮ সনের বৈশাখ মাসে। প্রথম সংখ্যা থেকে এই পত্রিকা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

ষাটের দশকে বাংলা সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল, হাংরি জেনারেশন ও শাস্ত্র-বিরোধী সাহিত্য। তাদের পত্রিকাও প্রকাশ হয়। কয়েক বছরের মধ্যে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আন্দোলন সত্ত্বেও তাঁরা দীর্ঘস্থায়ী কোনও ছাপ ফেলতে পারেননি।

‘এক্ষণ’ পত্রিকা ছিল যাবতীয় আন্দোলনের বাইরে। মনে রাখতে হবে, পত্রিকাগোষ্ঠীর লক্ষ্য ছিল সৃষ্টি, চমক নয়! এই নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিই এক্ষণকে বিশেষ করেছে। উদ্দেশ্য সাহিত্য। উদ্দেশ্য আন্দোলন নয়। পত্রিকার সযত্ন সম্পাদনা এই কথাই প্রমাণ করে। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এই পত্রিকা ছিল মূলত প্রবন্ধের। আজকের দিনে একথা ভাবা প্রায় অসম্ভব। তবে গল্প-কবিতা-নাটক-উপন্যাস-চিত্রনাট্য এবং স্মৃতিকথাও অনেক ছাপা হয়েছে। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এক্ষণ পত্রিকায় মূলত তরুণ লেখকদের লেখাই প্রকাশ হত। তরুণ যাঁরা তাঁদের মানসসঞ্জাত নতুন ভাবনার ক্ষেত্র ছিল এক্ষণ।

প্রথম থেকে শেষ সংখ্যা পর্যন্ত একজন শিল্পীরই আঁকা প্রচ্ছদপট। তিনি সত্যজিৎ রায়। পত্রিকার নামকরণও তাঁরই!

তখনকার তরুণ লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, অতীন বন্দোপাধ্যায়, মতি নন্দী, বরেন গঙ্গোপাধ্যায় এবং সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের অনেক উল্লেখযোগ্য গল্প ছাপা হয়েছিল এক্ষণ পত্রিকায়। আর প্রবন্ধ? কেমন ধরনের প্রবন্ধ এই পত্রিকায় ছাপা হত একটু দেখা যাক! রবীন্দ্রনাথের ইতালি সফর ও রমাঁ রলাঁ— অবন্তীকুমার সান্যাল, সাহিত্যিক সমালোচনা— অরুণ মিত্র, দাস ক্যাপিটাল প্রসঙ্গে— অশোক মিত্র, বুদ্ধদেব বসুর কাব্য জিজ্ঞাসা— অশ্রুকুমার সিকদার, প্রসঙ্গ বিভূতিভূষণ— কার্তিক লাহিড়ী, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি— গিরিশচন্দ্র ঘোষ, মুঘল যুগে কৃষক বিদ্রোহ— গৌতম ভদ্র, দান্তের জীবনী— চঞ্চলকুমার চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী শশী ও রিউ— নবনীতা দেব সেন, ইউরোপীয় সংগীতের সন্ধানে— নীরদচন্দ্র চৌধুরী, ছক ও ছন্দ— পরিতোষ সেন, মেট্রোপলিটন মন— বিনয় ঘোষ (বিনয় ঘোষের অজস্র প্রবন্ধ এই পত্রিকায় ছাপা হয়েছে), রবীন্দ্র সংগীতে ভাববার কথা— সত্যজিৎ রায়! মাত্র কয়েকটি প্রবন্ধের উদাহরণ, পত্রিকার পঁয়ত্রিশ বছরের জীবনে এমন অসংখ্য বৈদগ্ধ্যপূর্ণ প্রবন্ধ পাঠকের তৃষ্ণা মিটিয়েছে।

ঐতিহাসিক রাধারমণ মিত্র ধারাবাহিক লিখেছেন ‘কলকাতার টুকিটাকি’, যা ছিল ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কলকাতার ইতিহাস! একাধিক পুরস্কারে ভূষিত সুধীর চক্রবর্তীর ‘গভীর নির্জন পথে’ এই এক্ষণ পত্রিকাতেই ছাপা হয়েছিল।

এক্ষণের কথা বলতে গেলে সত্যজিৎ রায়ের নাম আসবেই। প্রথম থেকে শেষ সংখ্যা পর্যন্ত একজন শিল্পীরই আঁকা প্রচ্ছদপট। তিনি সত্যজিৎ রায়। পত্রিকার নামকরণও তাঁরই! কমলকুমার মজুমদারকে খুঁজে আনা ও তাঁর প্রকৃত প্রতিভাকে পাঠকের সামনে পেশ করার অবদানও সত্যজিৎ রায়ের।

নির্মাল্য আচার্য ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘এক্ষণ’ পত্রিকা। পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশ হয়েছিল ১৩৬৮ সনের বৈশাখ মাসে।

বিশেষ সংখ্যার মধ্যে অতিশয় উল্লেখযোগ্য, দান্তে সংখ্যা ও কাল মার্ক্স সংখ্যা; যেদুটি সংখ্যা অবশ্যই ইতিহাস সৃষ্টিকারী। কমলকুমার মজুমদার নামে যে একজন মহান লেখক ছিলেন এই পত্রিকার প্রকাশ না হলে আমরা বোধহয় তা জানতেই পারতাম না, কারণ এহেন লেখকের উপন্যাস-গল্প-প্রবন্ধ ধারাবাহিক প্ৰকাশ করেছিল এক্ষণ, এবং চিত্রনাট্যও যে ছাপার যোগ্য তা আমরা জানতে পারলাম এই পত্রিকা থেকেই।

পরবর্তীকালে অনেক পত্রিকাই চিত্রনাট্য প্রকাশ করতে থাকে যার কৃতিত্ব অবশ্যই এক্ষণ পত্রিকার! সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার প্রায় সবক’টি চিত্রনাট্য এক্ষণে ছাপা হয়েছে! এই পত্রিকাটি আধুনিক সাহিত্যের একটা নতুন ধারা আমাদের চিনিয়েছে, সেটি হল পুনর্মুদ্রণ! উনবিংশ শতাব্দীর অনেক অনেক বিখ্যাত গ্রন্থ যেগুলি এখন অবলুপ্ত সেইসকল গ্রন্থের পুনর্মুদ্রণ হয়েছে এক্ষণে। এখানেই শেষ নয়! উনবিংশ শতাব্দীর অনেক গৃহবধূর স্মৃতিকথা ছাপা হয়েছে এই পত্রিকায়। কৈলাসিনী দেবী এবং ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর স্মৃতিকথাও এই পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিল এবং প্রকাশমাত্রই সাড়া ফেলে দিয়েছিল অপ্রকাশিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়! তাঁর ডায়েরি-চিঠিপত্র-লেখালেখির খসড়া ইত্যাদির অজস্র ডায়েরি ছাপা হয়েছে এক্ষণ পত্রিকার একাধিক সংখ্যায়! একটি সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘দিবারাত্রির কাব্য’ উপন্যাসের আদি তথা প্রাথমিক পাঠ। চমৎকার সম্পাদনা করেছিলেন যুগান্তর চক্রবর্তী, পরবর্তীকালে যা ‘অপ্রকাশিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’ নামে পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়!

দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এই পত্রিকা ছিল মূলত প্রবন্ধের। আজকের দিনে একথা ভাবা প্রায় অসম্ভব।

এই পত্রিকায় যা কিছু ছাপা হয়েছে তার পিছনে উদ্যেশ্য ছিল, চমক নয়! বেশ কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশের পর একার চেষ্টায় নির্মাল্য আচার্য পত্রিকা প্রকাশ করে যান! অপর সম্পাদক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় চিত্রতারকার খ্যাতি ও সময়াভাবে সম্পাদনা থেকে সরতে বাধ্য হন। একা নির্মাল্য আচার্য সাধকের একনিষ্ঠতায়, নির্মোহভাবে পত্রিকাটি আমৃত্যু সম্পাদনা করে যান।

প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৩৬৮ সনে এবং শেষ সংখ্যাটি ১৪০২। সম্পাদক নির্মাল্য আচার্যের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়! শেষতম সংখ্যাটিতে প্রকাশকের কথায় জানানো হয়েছে: ‘কিছু কিছু উদ্যোগ বা প্রতিষ্ঠান থাকে যা কেবল একজন ব্যক্তির চিন্তা-রুচি-দর্শন আর কর্তব্যনিষ্ঠার গুণে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অর্জন করে! এক্ষণ ছিল একান্তভাবেই নির্মাল্যবাবুর পত্রিকা। তাঁর অবর্তমানে পত্রিকার বিশিষ্ট চরিত্র বজায় রেখে প্রকাশ করা অসম্ভব। তাই এই সংখ্যাটি এক্ষণের শেষ সংখ্যা হিসাবে প্রকাশ করা হল।’

বঙ্গ সাহিত্যে ভারতবর্ষ, প্রবাসী, কল্লোল, কালিকলম, শনিবারের চিঠি, পরিচয়-এর পাশাপাশি এক্ষণ একটা বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে একথা ঐতিহাসিক সত্য।

চিত্র: গুগল
4.7 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »