ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঔপন্যাসিক সলমন রুশদি আক্রান্ত হলেন খোদ আমেরিকাতেই। এই জঘন্য ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উইলিয়াম ডালরিম্পিল, নেইল গাইমান প্রমুখ সাহিত্যিক। আবার ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকারের মত কেউ কেউ হিরন্ময় নীরবতা পালন করলেন। কেউ কেউ আবার উল্লসিতও। ঠিক হয়েছে। যেমন কর্ম, তেমন ফল পেয়েছেন।
১৯৮৮ সালে কোনও এক উপন্যাসের জন্য এই লেখকের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হয়। ওই উপন্যাসে নাকি মহানবীকে অপমান করা হয়েছে। এই অপরাধে তাঁর বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেন ইরানের সেই সময়ের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা খোমেইনি। এই উল্লসিতরা এমন একটি ভাব দেখাচ্ছেন যাতে মনে হতেই পারে যে, সেই ফতোয়ার ধারা মেনেই এই এত বছর বাদে এই আক্রমণ। যা সত্যি কি না এখনই বলা যাচ্ছে না। তদন্ত চলছে। তবে এখনও কোনও সেরকম তথ্য পাওয়া যায়নি। মূল অভিযুক্ত বলে যাকে মনে করা হচ্ছে সে একজন ২৪ বছরের মার্কিন যুবক। তবে তার মা ও বাবা লেবাননি। বাবা থাকেন লেবাননে। মা আমেরিকায়। তার মায়ের দেওয়া তথ্য অনুসারে, সে ২০১৮ সালে লেবাননে যায় ও বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এর পরই সে নাকি কট্টর মুসলমান হয়ে ওঠে। তার আচরণেও পরিবর্তন দেখা যায়। অসামাজিক হয়ে ওঠে সে।
এখানেই বেশ কিছু প্রশ্ন উঠে আসে। প্রথমত, যে লেখকের ওপর ফতোয়া আজও বহাল, তাঁর নিরাপত্তা এত ঢিলেঢালা হবে কেন? দ্বিতীয়ত, চার বছর ধরে যার এরকম অসামাজিক আচরণ, তাকে তার পরিবার অথবা পুলিশের পক্ষ থেকে মেন্টাল অ্যাসাইলামে পাঠানো হয়নি কেন? কেন এত সহজে সে সশস্ত্র অবস্থায় বুকার-জয়ী এক লেখকের কাছে যেতে পারে? তবে কি এখানে কোনও অন্য গল্প আছে? আছেই, এখনই এমনটা বলা না-গেলেও, কিছু সন্দেহ যে হয় না এমন নয়। এখানে তার অবতারণা করি।
সলমন রুশদি চিরকালের বামপন্থী। সকল শাসকেরই সমালোচনা করেছেন তিনি। এই সমালোচনা প্রবণতার কারণে তিনি যে শুধু খোমেইনির বিরাগভাজন হয়েছিলেন এমন নয়। ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী, জুলফিকার আলি ভুট্টো, কন্যা বেনজির। এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানেরও। রিগ্যানের আমলে নিকারাগুয়ার সান্দানিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে সিআইএ-কে লেলিয়ে দেন তিনি। যার সমালোচনা করেন রুশদি। চলমান রুশ-ইউক্রেন সংঘর্ষেও তাঁর অবস্থান আমেরিকাকে রুষ্ট করে। পেন ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে তিনি ‘অবিলম্বে এই অর্থহীন যুদ্ধ’ বন্ধের আবেদন করেন। যারা এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাইছে, তাদের কাছে এই বার্তা নিশ্চয় মধুবর্ষণ করবে না। তারাই কি চাইছে রুশদিকে খুন করে তার দায়টা মুসলমানদের ঘাড়ে চাপাতে? তারা যে ‘সন্ত্রাসবাদী’ জনমনে তার একটা ছাপ ফেলা গেছে বিগত ২৫ বছরের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায়। এখন বাকিটুকু করা কি বড়ই শক্ত? বিশেষত ৭৫ বছরের এই বাম-মনস্ক ঔপন্যাসিক যে বেশি নিরাপত্তা নিয়ে চলাফেরা পছন্দ করেন না, তা সবাই মোটামুটি জানে।
না। এরকমই যে হয়েছে তা আমি বলছি না। তবে এটি সম্ভাবনামাত্র। যেমন সম্ভাবনা যুবকটির জঙ্গিযোগ। এখনও এটির বিষয়ে কোনও স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু পশ্চিমি মিডিয়াগুলি এমন করছে যাতে এই যুবক যে একজন জঙ্গি, তা আমাদের মালুম হচ্ছে। গত তিরিশ বছর ধরে অত্যন্ত সুচতুরভাবে এই মিডিয়াই মানুষের মনে ইসলামোফোবিয়া ঢুকিয়ে দিয়েছে। যার ফলে মানুষের মনে ধারণা তৈরি হয়েছে যে মুসলমান মানেই বর্বর, জঙ্গি। সেই ধারণার ওপরই নির্মাণ চলছে যুবকটির জঙ্গিযোগ তত্ত্বের। তবে একটা কথা বলাই যায়। রুশদির ওপর আক্রমণ আমাদের সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তুলল।
পড়ে দারুন লাগলো