মহাশ্বেতা দেবী (১৪.০১.১৯২৬-২৮.০৭.২০১৬) ছিলেন লেখক, পত্রিকা সম্পাদক, অধ্যাপক এবং মানবতাকর্মী। নব্বই বছরের এক ব্যাপ্ত জীবনকে বহুমাত্রিক কাজে ব্যয় করে গিয়েছেন তিনি। তাঁর জীবনে উত্থান-পতন ছিল ঘটনাবহুল ও নাটকীয়। পিতা মণীশ ঘটক কল্লোল যুগের বিশিষ্ট লেখক, কাকা ঋত্বিক স্বনামধন্য চলচ্চিত্র পরিচালক। তাঁর প্রথম স্বামী বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন অভিনেতা-নাট্যকার-নাট্যপরিচালক, যার লেখা ‘নবান্ন’ আধুনিক বাংলা নাটকে যুগান্তর এনেছিল। মহাশ্বেতার একমাত্র পুত্র নবারুণ ভট্টাচার্য-ও ছিলেন প্রথিতযশা কবি, গল্প-উপন্যাসকার ও সেইসাথে পত্রিকা সম্পাদক।
পরিবারের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মধ্যে জীবন গড়ে ওঠে মহাশ্বেতার। আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় ছোটবেলায় শান্তিনিকেতনে পড়ার সুবাদে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়। এর ফলে তাঁর মানসগঠন স্থায়ীভাবেই এক উজ্জ্বল রেখায় রঞ্জিত হতে পারে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব আর স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গি। আর সেখানেই তিনি অনন্যা। রবীন্দ্রনাথ-মণীশ-ঋত্বিক তাঁকে পরিপোষণা দিয়েছেন, আর তিনি তাঁর মেধার বাতানুকূল বিস্তার ঘটিয়েছেন একান্তই নিজস্বতা দিয়ে। এখানেই তিনি স্বনামে চিহ্নিত অনশ্বর প্রতিভা।
সম্ভ্রান্ত ও প্রগতিশীল পরিবারে জন্মেও কিন্তু তিনি চলার পথে কম বাধা পেরোননি। বিশেষ করে বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করার পর তাঁকে যথেষ্ট কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন তাঁর প্রথম স্বামী, যাঁর সঙ্গে ১৯৪৭-এ বিয়ে হয় তাঁর। টিউশনি করে, সাবান বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়েছে, পোস্টাল অফিসে চাকরি পেয়েও তা হারাতে হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যোগ থাকার অপরাধে। সরাসরি পার্টি সদস্য ছিলেন না তিনি, তবে আশুতোষ কলেজে পড়বার সময় (শান্তিনিকেতন ছেড়ে তিনি কলকাতায় ইন্টারমিডিয়েট পড়তে আসেন। পরে আবার শান্তিনিকেতনে পড়তে যান। সেখান থেকে বিএ পাশ করেন) Girls Student Association-এ যোগ দিয়েছিলেন। পার্টির পত্রিকা ‘জনযুদ্ধ’ ও ‘Peoples’ War’ বিক্রি করতেন। এসময় লেখালেখি করতেন ‘সুমিত্রা দেবী’ ছদ্মনামে। প্রসঙ্গত, তাঁর প্রথম লেখা বেরোয় তাঁর স্কুলজীবনে, ১৯৩৯-এ, খগেন্দ্রনাথ সেন-সম্পাদিত ‘রঙমশাল’ পত্রিকায়।
তাঁদের একমাত্র পুত্র নবারুণের জন্ম (২৩.০৬.১৯৪৮-৩১.০৬.২০১৪) এসময়। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কিছু লেখা চলছিল তাঁর। কিন্তু তাঁর সত্যিকারের লেখকজীবন শুরু হয় ‘ঝাঁসির রাণী’ উপন্যাস রচনার মাধ্যমে। এই উপন্যাসটি প্রথমে সাপ্তাহিক ‘দেশ’-এ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৫-৫৬-তে। পরে বই আকারে বেরোয়।
এই উপন্যাসটি নিয়ে বিশদভাবে কিছু বলতে হবে। বাংলা সাহিত্যে মেয়েদের লেখালেখি, পত্রিকা-সম্পাদনার ইতিহাস কম দিনের নয়। বাংলা উপন্যাস রচিত-ই তো হয়েছিল এক নারীর হাত ধরে,— হানা ক্যাথারিন মুলেনস (০১.০৬.১৮২৬-১৮৬১) বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৮৬৫) প্রকাশের তেরো বছর আগেই ১৯৫২-তে তাঁর ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ বেরোয়। তবে তাঁর সম্পর্কে বিতর্ক আছে, এবং তিনি বাঙালি নন। স্বর্ণকুমারী দেবী (২৮.০৮.১৮৫৫-০৩.০৭.১৯৩২), নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী (১৮৩৪-২৩.০৯.১৯০৩, ‘রূপ জালাল’ তাঁর লেখা উপন্যাস), বেগম রোকেয়া (০৯.১০.১৮৮০-০৯.১০.১৯৩২) প্রমুখ সার্থক উপন্যাস লিখেছেন। মহাশ্বেতার ঠিক আগেই পাই শৈলবালা ঘোষজায়া (০২.০৩.১৮৯৬-২১.০৯.১৯৭৪), আশাপূর্ণা দেবী (০৮.০১.১৯০৯-১৩.০৭.১৯৯৫)-কে, পাই সাংবাদিক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের দুই কন্যা শান্তা (২৯.০৪.১৯৯৩-৩০.০৫.১৯৮৪) ও সীতা দেবীকে (১০.০৪.১৮৯৫-২০.১২.১৯৭৪) যাঁরা যুগ্ম নাম ‘সংযুক্তা দেবী’ ব্যবহার করে উপন্যাস লিখেছেন, ‘উদ্যানলতা’। তাছাড়া বাংলা সাময়িকপত্র সম্পাদনাতেও মহিলাদের অবদান আছে। মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায় (১৮৪৭-১৯৩০) পাক্ষিক ‘বঙ্গমহিলা’ বের করেন ১৮৭০-এ, বঙ্কিমের ‘বঙ্গদর্শন’-এর দু’বছর আগে। ঠাকুরবাড়ির থেকে জ্ঞানদানন্দিনী, স্বর্ণকুমারী, সরলা দেবীরা পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন, আর বনলতা দেবী, বেগম সুফিয়া কামাল, নূরজাহান বেগমদের ‘বেগম’ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।
কিন্তু কী উপন্যাস রচনায়, কী পত্রিকা সম্পাদনায়, মহাশ্বেতা দেবী এঁদের সকলের চেয়ে আলাদা। এবং অভিনব। তিনি ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈকে নিয়ে উপন্যাস লেখার শুরুতে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রতুলচন্দ্র গুপ্তের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর কাছ থেকে সমসাময়িক ইতিহাসের পাঠ নেন। এতেও সন্তুষ্ট না থেকে তিনি ক্যামেরা-হাতে বেরিয়ে পড়েন ঝাঁসি ও কাছেপিঠের স্থানগুলো নিজের অনুসন্ধানী চোখে দেখে লেখায় হাত দিতে। এই পূর্বপ্রস্তুতি মহাশ্বেতার আগে কারও ছিল না। এর ভিতর দিয়ে লেখকের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর বিষয়ের প্রতি গভীর নিষ্ঠার পরিচয় মেলে। পরবর্তীতেও আমরা দেখব, তিনি যখন আদিবাসী জনজীবন নিয়ে গল্প-উপন্যাস লিখছেন, তাঁদের জনপদে গিয়ে, তাঁদের জীবনযাপনকে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে তাঁদের সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনা ও আশা আকাঙ্ক্ষার কথা ফুটিয়ে তুলেছেন, পরোক্ষভাবে অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে নয়।
গ্রামশি-বর্ণিত ও পরবর্তীতে বহুলচর্চিত ‘সাব অলটার্ন’-এর আগেই মহাশ্বেতার লেখায় ব্রাত্যজনসংহিতা মূর্ত; ‘অরণ্যের অধিকার’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭-এ। আর সাব অলটার্ন-তত্ত্ব প্রথম দানা বাঁধছে ১৯৮২-তে জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, রণজিৎ গুহ, গৌতম ভদ্র, শাহেদ আমিন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়দের সঙ্কলন প্রকাশের মাধ্যমে। অবশ্য তার বহু আগেই ইতিহাস রচনায় সাব অলটার্ন চেতনায় স্থিতধী দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথকে। স্বামী বিবেকানন্দ মূর্খ, চণ্ডাল ও দরিদ্র ভারতবাসীর মাহাত্ম্য বুঝিয়ে গেছেন, আর বিভূতিভূষণকেও আমরা সামগ্রিক বিচারে প্রান্তিক মানুষের কথাকার রূপেই পাই। কিন্তু মহাশ্বেতা আরও ব্যাপক, গভীর, তন্ময়, নিবিড়, ও নিঃসন্দেহে দলিত জনতার কথাকার।
তেমনি পত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রে তাঁর অনন্যতা রয়েছে। ‘বর্তিকা’ নামে যে পত্রিকার তিনি সম্পাদক ছিলেন, তার ভার পিতার হাত থেকে পান তিনি। এটিকে ব্রাত্য, অন্ত্যজ, দলিত, আদিবাসী এবং ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে শোষিত-নিপীড়িত-লাঞ্ছিত মানুষের মুখপত্র করে তোলেন তিনি। বাংলা সাময়িকপত্রে নজিরবিহীন ঘটনা এটি। আদিবাসীদের লেখা স্থান পেয়েছে এখানে। মনোরঞ্জন ব্যাপারীর মতো রত্নাকরকে বাংলা সাহিত্যের সার্থক লেখক বানিয়েছেন তিনি। এর কাছে তাঁর ম্যাগসেসে লাভ, অথবা জ্ঞানপীঠ, সাহিত্য আকাদেমি বা নানান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডক্টরেট পাওয়া তুচ্ছ, তুচ্ছ পদ্মবিভূষণ-অর্জন। দেশিকোত্তম পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন তিনি, রবীন্দ্রনাথের যোগ্য আশ্রমকন্যা! তাঁর নাম নোবেল-তালিকায় একাধিকবার উঠেছিল। ভারতীয় বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর লেখা। আবার তিনি নিজেও অনুবাদ করেছেন জিম করবেটের শিকার কাহিনি সমগ্র। ইংরেজি, ফরাসি, রুশ, জার্মান ও জাপানি-সহ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত তিনি। লিখেছেন কিছু পাঠ্যপুস্তক।
বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর অবহিতি ও কৌতূহল ছিল বরাবর। তাঁর জন্ম অবিভক্ত ভারতের ঢাকাতে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একাধিকবার তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর। পরবর্তীকালে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক প্রমুখের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে।
চিত্র: গুগল







