Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

১৪ জুলাই: কবি ও বিজ্ঞানীর কথোপকথন

নিজের নিজের যে জ্ঞানচর্চার কক্ষ সেই পরিধির বাইরে অন্য বিভাগে আগ্রহ প্রকাশ করতে খুব কম মানুষজনকেই দেখতে পাওয়া যায়। আসলে নিজের অধীতবিদ্যা এবং নিজের জ্ঞানচর্চার কক্ষের মধ্যে থাকতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন সকলে। একদিকে মানবীয়বিদ্যা আর অন্য দিকে বিজ্ঞান বিভাগ— এই দুই বিভাগ যেন দুটি বিপরীত মেরুতে বিচ্ছিন্ন। বিজ্ঞানের মানুষজন যেমন সাহিত্যের ভুবনের কোনও খবর রাখেন না, অন্যদিকে শিল্প সাহিত্যের চর্চা করেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যেও বিজ্ঞানের জগতের কী ঘটছে না ঘটছে সে ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখতে পাওয়া যায় না। যদিও এক বিভাগের সঙ্গে অন্য বিভাগের এই যে সংযোগহীনতা, তা নতুন কথা কিছু নয়। তাছাড়া শিল্প ও বিজ্ঞানের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে এই যে দূরত্ব, তা কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই চলে আসছে। সিপি স্নো-র লেখা ‘টু কালচার্স’ বইটির মধ্যে এই দুই সংস্কৃতির ব্যবধানের কথা রয়েছে, সে কথা আমরা অনেকেই জানি।

তবু এই সাংস্কৃতিক ব্যবধানের মধ্যে মেলবন্ধন বা আদান-প্রদানের দৃষ্টান্তও রয়েছে। বিজ্ঞানচর্চাকারীদের কবিতা বা শিল্পচর্চার দৃষ্টান্ত অনেক পাওয়া যায়, কিন্তু সেই তুলনায় কবি বা শিল্পীদের বিজ্ঞানে অনুরাগের কথা খুবই কম শোনা যায়। বিষয় আর বিভাগের সীমারেখা মুছে তবু কেউ কেউ পারেন বা পেরেছেন মুক্তমনে ভাবতে। সেরকমই একজন কবির কথা বলব এখানে। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

জার্মানির পটসডামের কাছে বার্লিনের উপকন্ঠে কাপুথ (Caputh) নামের একটি ছোট জায়গা। বিশ্ববন্দিত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন সেখানে একটি ছোট বাড়ি কিনেছিলেন। টিলার ওপর সেই চমৎকার বাড়ি। চারপাশে পামগাছ। বাড়ির সামনে ঘন হয়ে আছে সবুজ ঘাস। অদূরে দুটি লেক। অরণ্যের সবুজ নিঃশব্দ। যেন স্বর্গীয় পরিবেশ। প্রকৃতি যেন উজাড় করে দিয়েছে সৌন্দর্য। অপরূপ পরিবেশে সেই বাড়ি। ১৯২৯ থেকে ১৯৩২ সালে প্রত্যেক গরমের সময় এই বাড়িতেই থাকতেন আইনস্টাইন। বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী অটোহান থেকে ফ্রিজৎ হেবার, ওপেনহাইমার, ম্যক্স প্ল্যাঙ্ক, শ্রয়েডিঙ্গার, সমারফিল্ড সহ আরও বহু প্রথিতযশা মনীষা এসেছেন আইনস্টাইনের কাপুথের এই বাড়িতে।

দিনটি ছিল ১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই। ওই দিন বিকেল বেলায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বিশ্ববন্দিত বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের কথোপকথন হয়েছিল কাপুথ-এর ওই বাড়িতে। এই সাক্ষাৎকারে কবির সঙ্গে ছিলেন কবি ও রবীন্দ্রনাথের সচিব অমিয় চক্রবর্তী।

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের জন্ম যথাক্রমে ১৮৬১ আর ১৮৭৯ সাল। তার মানে কবি প্রায় আঠারো বছরের মত বয়সে বড় ছিলেন বিজ্ঞানীর চেয়ে। এই সাক্ষাৎকারের সময়ে আইনস্টাইনের বয়স সবে পঞ্চাশ বছর আর কবির বয়স ছিল সত্তরের কাছাকাছি। কবি ও বিজ্ঞানীর এই দেখা হওয়ার ষোলো-সাতেরো বছর আগেই রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। অন্যদিকে ১৯০৫ সালে আইনস্টাইনের জগদ্বিখ্যাত আবিষ্কারের জন্যে ১৯২১ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। অর্থাৎ এই সাক্ষাৎকারের আট-ন’বছর আগের কথা।

যদিও এর আগেও কবির সঙ্গে বিজ্ঞানীর সাক্ষাৎ হয়েছে। তাঁরা প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলেন ১৯২৬ সালে। রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয়বার জার্মান ভ্রমণের সময় আইনস্টাইনের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় কবির। যদিও আরও আগে থেকেই কবির কথা শুনেছিলেন আইনস্টাইন। তবে তাঁদের এই প্রথম বারের সাক্ষাৎকারটি রেকর্ড করা হয়নি, তবে এর পরে পরেই আইনস্টাইনের একটি চিঠির বার্তা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কবির প্রতি এই মহান বিজ্ঞানীর ছিল কী গভীর শ্রদ্ধা। আইনস্টাইন লেখেন, ‘If there is anything in Germany that you would like and which could be done by me. I beg you to command me at any time.’। ১৯৩০ সালেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের চার বার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনবার জার্মানিতে এবং একবার নিউ ইয়র্কে। ১৯ আগস্ট বার্লিনে দ্বিতীয় এবং সেপ্টেম্বরের শেষে আবার বার্লিনে তৃতীয় সাক্ষাৎকারটি হয়েছিল, কবি মস্কো থেকে ফিরে আসার পরে। নিউ ইয়র্কে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হয় তাঁদের চতুর্থ সাক্ষাৎকার।

তবে দুজনের সবচেয়ে সার্থক এবং উল্লেখযোগ্য সাক্ষাৎকারটি হয় ১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই। অর্থাৎ আজকের দিনে। ‘মর্ডান রিভিউ’ সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই সাক্ষাৎকারের বিবরণী বেরিয়েছিল। তাঁদের সেই সাক্ষাৎকারে নানান প্রসঙ্গ এসেছে ওই আলোচনায়। বিজ্ঞানের প্রসঙ্গ থেকে দর্শন থেকে ঈশ্বর। তেমনি আলোচনা গড়িয়েছে সত্য, সুন্দর ও সৌন্দর্য নিয়ে। আগেই উল্লেখ করেছি, ১৯৩০ সালেই মোট চারবার মুখোমুখি হয়েছেন এই দুই মনীষা। তাঁদের মধ্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গীত, তাল, মাত্রা, বাদ্যযন্ত্র ও শিল্পকলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইনস্টাইনের সঙ্গে কবির আলাপচারিতা নিয়ে একাধিক রচনা এবং বই রয়েছে। আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর কী নিয়ে কথাবার্তা হয়েছিল সে সব কিছু বিস্তারিতভাবে অনেক লেখকই লিখেছেন। আগ্রহী পাঠকদের অনেকেই সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল আছেন। তাই সেসব কথার পুনরুক্তি করতে চাই না এখানে। কিংবদন্তি দুই মনীষার সাক্ষাৎকারের দিনটি স্মরণ করার জন্যেই এই লেখা।

শুধু আইনস্টাইন নন, দেশ-বিদেশের সমসাময়িক একাধিক শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর সঙ্গে কবির সাক্ষাৎ হয়। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু সঙ্গে কবির অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কথা বহু আলোচিত। প্রায় চার দশক ধরে তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল। মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সি ভি রমন প্রমুখ বরেণ্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গেও গড়ে উঠেছিল কবির পরিচয়। আইনস্টাইনের সঙ্গে কবির আলাপচারিতা ছাড়াও কবি হাইজেনবার্গ রয়েন্টগেন, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, রাদারফোর্দ প্রমুখ বিজ্ঞানীদের কাজের সঙ্গেও যথেষ্ট পরিচিত ছিলেন।

বেদনার হলেও একথা সত্যি যে কবির বিজ্ঞানপ্রীতি এবং তাঁর প্রবল বিজ্ঞান ভাবুকতার বিষয়টি নিয়ে চর্চা হয় না বললেই চলে। রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানবোধ আর উপলব্ধি তাঁকে এমন এক স্তরে উন্নীত করেছিল যাতে সমসাময়িক আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি সম্যক ওয়াকিবহাল ছিলেন। কবির সঙ্গে স্বনামধন্য বিজ্ঞানীদের এই নিবিড় যোগাযোগ এক বিরল ও বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

চিত্র: গুগল
4.8 4 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সনজীদা খাতুন: শ্রদ্ধাঞ্জলি

সাতচল্লিশ-পরবর্তী পূর্ববঙ্গে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক সংস্থা গড়ে ওঠে, যাদের মধ‍্যে ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী’, ‘ক্রান্তি’, ‘উদীচী’ অন‍্যতম। রাজনৈতিক শোষণ ও পূর্ববঙ্গকে নিপীড়নের প্রতিবাদে কখনও পরোক্ষভাবে কখনও সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল এইসব সংগঠন। ‘ছায়ানট’ এমনি আর এক আগ্নেয় প্রতিষ্ঠান, ১৯৬৭-তে জন্মে আজ পর্যন্ত যার ভূমিকা দেশের সুমহান ঐতিহ‍্যকে বাংলাদেশের গভীর থেকে গভীরতরতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে সুস্থ ও সংস্কৃতিবান নাগরিক গড়ে তোলা। ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুনের মানসসন্তান এই ছায়ানট। মূলত রবীন্দ্রনাথের আদর্শে গড়ে ওঠা সঙ্ঘ, কাজী নজরুলের প্রিয় নামটিকে জয়ধ্বজা করে এগিয়ে চলেছে বহু চড়াই-উৎরাই, উপলব‍্যথিত গতি নিয়ে।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর গুচ্ছকবিতা

বিলাপ অভিসার জল আনতে চল রে সখী, জল আনতে চল নিভু নিভু আলোর সাজে সূর্য অস্তাচলে শেষবিকেলের রশ্মিমালায় বুকে ব্যথার ঢল লজ্জা আমার আবির হয়ে

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

যত মত তত পথ

বহুদিক দিয়েই একজন স্বতন্ত্র মননের ধর্মীয় সাধক। তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ধারণাতীত, আর তা কেবল তাঁর স্বদেশ বা এই উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা বিশ্বব্যাপী। এবং দিনের পর দিন তাঁর অনুগামীর সংখ্যা বাড়ছে। শ্রীরামকৃষ্ণ এবং সারদামণি ও স্বামী বিবেকানন্দকে কেন্দ্র করে যে ভাব-আন্দোলন, তার ফলশ্রুতিতে তাঁদের নিয়ে নিয়ত চর্চা ও গবেষণা হয়ে চলেছে। পৃথিবীব্যাপী দুশোর ওপর রামকৃষ্ণ মিশনের কার্যাবলি প্রমাণ করে (প্রতিবছর এর সংখ্যা বাড়ছে), আজকের এই অশান্ত বিশ্বে তাঁরা মানুষের কতখানি আশ্রয়।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব ছয়]

রবীন্দ্রভাবনায় যে নৃত্যধারা গড়ে উঠল তা দেশিবিদেশি নৃত্যের সমন্বয়ে এক মিশ্র নৃত্যধারা, তৎকালীন শিক্ষিত শহুরে বাঙালির সংস্কৃতিতে যা নতুন মাত্রা যোগ করল। নাচের প্রতি একরকম আগ্রহ তৈরি করল, কিছু প্রাচীন সংস্কার ভাঙল, মেয়েরা খানিক শরীরের ভাষা প্রকাশে সক্ষম হল। এ কম বড় পাওনা নয়। আরও একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, শিল্পক্ষেত্রে ভাবের সাথে ভাবনার মিল ঘটিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির প্রচেষ্টা। গতে বাঁধা প্র্যাক্টিস নয়। নিজের গড়ে নেওয়া নাচ নিজের বোধ অনুযায়ী।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব পাঁচ]

বাংলার মাটি থেকে একদা এই সুদূর দ্বীপপুঞ্জে ভেসে যেত আসত সপ্তডিঙা মধুকর। আর রবীন্দ্রনাথের পিতামহ, যাঁর কথা তিনি কোথাও প্রায় উল্লেখই করেন না, সেই দ্বারকানাথ-ও বাংলার তৎকালীন ব্যবসায়ীকুলের মধ্যে প্রধান ছিলেন। শুধু তাই-ই নয়, একদা তাঁর প্রিয় জ্যোতিদাদাও স্টিমারের ব্যবসা করতে গিয়ে ডুবিয়েছেন ঠাকুর পরিবারের সম্পদ। নিজে রবীন্দ্রনাথ বাণিজ্য সেভাবে না করলেও, জমির সম্পর্কে যুক্ত থাকলেও একদা বাংলার সাম্রাজ্য বিস্তার, বাণিজ্য-বিস্তার কী তাঁরও মাথার মধ্যে ছাপ ফেলে রেখেছিল? তাই ইউরোপ থেকে আনা বাল্মিকী প্রতিভার ধারাকে প্রতিস্থাপন করলেন জাভা বালির কৌমনৃত্য দিয়ে?

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব চার]

তৎকালীন দেশের বাস্তব সত্যের সঙ্গে মিলছে না বর্ণবাদ, উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ, মিলছে না পিকেটিং ও বিদেশি দ্রব্য পোড়ানোর আন্দোলন। রবীন্দ্রনাথ দেখতে পাচ্ছেন গ্রামে গ্রামে গরিব মানুষের খাওয়া নেই, নেই বেশি দাম দিয়ে দেশি ছাপ মারা কাপড় কেনার ক্ষমতা। দেখছেন পিকেটিংয়ের নামে গরিব মুসলমানের কাপড়ের গাঁঠরি পুড়ে যাচ্ছে যা দিয়ে সে তার পরিবার প্রতিপালন করে। রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করছেন তাঁর লেখায়। ‘গোরা’ ও ‘ঘরে বাইরে’ এমনই দু’টি উপন্যাস। গোরা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় প্রবাসী পত্রিকায়। পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশ ১৯১০ সালে। ঘরে বাইরের প্রকাশকাল ১৯১৬।

Read More »