Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

প্রত্যাবর্তন

ভোররাত থেকে মুষলধারে বৃষ্টি। আকাশের সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়ে কেঁদে চলেছে পিটুলি। ভোরের দিকে ব্যথার তারসে সে যখন ঠকঠক করে কাঁপছিল, তার ফোলা পায়ে সেঁক দিতে দিতে টুয়ার মনে হচ্ছিল, এযাত্রায় মেয়েটা রক্ষা পেলে হয়! জন্ম ইস্তক বেচারির দিকে যমের নজর। একটুর ভুলে সেদিন আবার সাইকেলের ধাক্কা খেয়েছে। চিৎকারটা শুনে প্রথমে টুয়া ভেবেছিল পিটুলি বুঝি মরেই গেল। তারপর পড়িমরি ছুটে রাস্তায় বেরিয়ে দেখে, হালদারদের রিন্টু বিবর্ণ মুখে দাঁড়িয়ে। ঘটনাটা বেশ ভালভাবেই অনুমান করতে পেরেছিল টুয়া তবুও ছোকরাটিকে কড়কাতে ছাড়েনি।

“দিলি তো আমার বেড়ালকে খোঁড়া করে? দাঁড়া, আজই তোর জ্যাঠাকে বলছি। দিনেদুপুরে সাইকেল নিয়ে টোটো করা একেবারে বেরিয়ে যাবে।”

বয়স অপেক্ষা রিন্টু একটু বেশিই বোকা। তারওপর সকাল সকাল বলের মত একটা বেড়ালের গায়ে সাইকেলের চাকা তুলে দেওয়ার গ্লানিতে কেমন যেন ভেবলে গিয়েছিল সে। আত্মরক্ষার তাগিদে বারবার বলছিল,
—“নাগো টুয়াপিসি, আমি ইচ্ছে করে করিনি। বিশ্বাস করো, বেড়ালটাই ওদিক থেকে ছুটে এল।”

টুয়া জানে, পেটে বাচ্চা এলে প্রতিবার পিটুলি এরকমই পাগলামি করে। তা বলে ভেতরের কথা পাড়াপড়শির কাছে প্রকাশ করলে চলবে কেনও! আচমকা আঘাতে ভয় পেয়ে মার্জারকন্যাটি ততক্ষণে ঝোপের মধ্যে সেঁধিয়েছে। রিন্টু আরও কীসব বলে যাচ্ছিল। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে পোষ্যকে উদ্ধার করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে টুয়া। সেই থেকে একটানা পিটুলির সেবা চলছে। ভাগ্যিস পা-টা ভাঙেনি, না হলে এই পোয়াতি শরীরে চতুর্গুণ কষ্ট হত। এখনও কি আর ভোগান্তি কম? আগের মত বাইরে বেরোতে পারছে না। জল খাচ্ছে না। খাবারে অনীহা। নেতিয়ে পড়ে বেচারি কেবল ঘুমোচ্ছে। টুয়ার পুষ্যি মেয়েটা যে সত্যি-সত্যিই বাঘের মাসি সে বিষয়ে অবশ্য কারও কোনও সন্দেহ নেই। সুস্থ শরীরে তাকে যারা দেখেছে, কথাটা তাদের জানা। পাড়ার কেঁদো হুলোগুলো পর্যন্ত সমঝে চলে ওই ছোট্ট মেনিকে। উঠোনের কোণে নির্বিকারচিত্তে দাঁড়িয়ে নখের আঁচড় খায় বুড়ো বেলগাছ।

বেলা বয়ে চলেছে। আঁতিপাঁতি খুঁজেও বাড়িতে কোনও ব্যথার ওষুধ পায়নি টুয়া। বাবার ওষুধপত্রের পাহাড় সমান ভিড়ে সাধারণ প্যারাসিটামল কোথায় গা ঢাকা দিয়েছে কে জানে! তাই নিরুপায় হয়েই সুমেলিদের বাগানঘেঁষা অপ্রশস্ত পথটা ধরে ও হাঁটছে। পচা পাতার টিবি থেকে ভ্যাপসা গন্ধ উঠে জায়গাটাকে কেমন যেন ছেয়ে ফেলেছে। টুয়া দেখল, বেশ উঁচুতে বাঁশঝাড়ের মাথার ওপর রোদ্দুরের হলুদ আভা অনুসরণ করে বৃষ্টির ফোঁটারা গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। ওর একবার ইচ্ছে করল বছর সাতেক আগের মত ফুরফুরে মেঘ সেজে আমবাগানের সবুজে আবার হারিয়ে যায়। কিন্তু সাতবছরের সমস্ত গল্প হাত ধরাধরি করে দাঁড়ালে যে অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি হবে, সেটা ডিঙোবার সাহস নেই বলে ইচ্ছেটা মাথা তোলামাত্রই মনের মধ্যে তাকে মেরে ফেলল টুয়া। তারপর ভারি বাতাসে প্রায় মিশে থাকা জল মাখতে-মাখতে এগিয়ে চলল।

***

গোলাপি কাগজফুলের কেয়ারি করা গেটটা ব্যস্ত হাতে ঠেলে উঠোনে পা রাখে টুয়া। রান্নাঘরের ঘরের দরজায় শিকল। এবাড়িতে সকাল সাড়ে ছ’টার আগেই চা-পর্ব চুকে যায়। আজ টুয়া বারান্দার কোথাও এঁটো কাপ-প্লেটের দেখা পেল না। একবার ভাবল ফিরে যাবে, হয়তো সবাই ঘুমোচ্ছে। তারপর খানিক ইতস্তত করে গলা তুলল ও।
—ফুলকাকি… ও ফুলকাকি, একবার বাইরে আসবে?

বারান্দা পেরিয়ে শোওয়ার ঘরের আবছা অন্ধকারের ভেতর থেকে উত্তর এল,
—কী হয়েছে বল না।

—বলছিলাম কী, প্যারাসিটামল হবে গো একটা?

—না রে। কাল রাতে তোর কাকার গাটা ম্যাজম্যাজ করছিল বলে দিয়ে দিলুম যে! ওই একখানাই ছিল।

কাকির কথা শেষ হতে না হতেই সময়ের গায়ে মিলিয়ে যাওয়া সুরের মত ভেসে এল খুকখুক কাশির আওয়াজ। কাশতে কাশতে হাঁপাচ্ছে ফুলকাকা। হাতঘড়িতে চিন্তিত দৃষ্টি রেখে টুয়া বলল,
—আচ্ছা, শ্যামাপদর দোকানেই যাই তবে।

আটটা বাজতে মিনিট পাঁচেক বাকি। দোকান খুলতে সাড়ে দশটা-এগারোটা। এখনও ঢের দেরি। মেঘলা দিন, তার ওপর ছুটির বাজার। দোকান আর এবেলা খুললে হয়! শ্যামাপদর ভারি রেলা। এ চত্বরে ওই একটাই বড় ওষুধের দোকান কিনা! মানুষগুলোকে শ্যামা আঙুলের ডগায় তুলে নাচায়। কী আর করা! গ্রাম-মফস্বলের মানুষকে জীবনদায়ী ওষুধের জন্য অপেক্ষা করতেই হয়, হবেও। টুয়ার ভাবনার মাঝে পায়ে-পায়ে কখন যেন বারান্দায় বেরিয়েছে ফুলকাকি! ভাসুরঝির ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে ভেজা হাতদুখানা আঁচলে মুছতে মুছতে মহিলা বলল,
—হ্যাঁ রে, এই সাত সকালে জ্বরের ওষুধের খোঁজ পড়ল যে? কার আবার কী হল?

—তেমন কিছু নাগো। আমারই মাথাটা একটু ভার। তাই…

—ওহ! বৃষ্টি ভিজেছিস নির্ঘাত!

—হুঁ…

বলেই টুয়া পিছন ফিরল। আর দাঁড়াবে না। ঠেকায় না পড়লে এবাড়ির ছায়া ও মাড়াতে চায় না। কোনওমতে উঠোনটা অতিক্রম করে গেট বন্ধ করতে করতে টুয়া শুনতে পেল ঘরের ভেতরের দিকে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়ে ফুলকাকি গজগজ করছে,
—মাথার আর দোষ কী মা? ছেলেপুলে মানুষ করার বয়সে পথেঘাটে বেড়াল-কুকুরের সেবা করে বেড়াচ্ছ। বৃষ্টি ভিজছ, রোদে পুড়ছ। কাঁধে ঝোলা টাঙিয়ে সমিতির মিটিংয়ে যাচ্ছ। কত রঙ্গই না দেখাচ্ছ! আমাদের সময় হলে…

ওর হাত কাঁপে। বিষাক্ত তেতো স্বাদটা আবার ছড়িয়ে পড়ছে মুখময়। চোখের সামনে আম-কাঁঠাল-সবেদা-কাশীর পেয়ারা ঘেরা মাখনকোমল উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে বিরূপাক্ষ। ধীরে ধীরে জ্যৈষ্ঠের রোদ্দুরের মত ঝকঝকে হয়ে উঠবে তার অবয়ব। তাড়াতাড়ি চোখ বুজে ফেলে টুয়া। ভাবে, শ্যামাপদর দোকানে গেলেই বোধহয় ভাল হত। তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনায় বৃথাই অন্যকে জড়াতে চাওয়া। পিটুলির শরীর খারাপ না হলে কি আর এখানে আসত! জোরে পা চালিয়ে বাঁ-হাতে আমবাগানটা ফেলে ও তাড়াতাড়ি বাড়িতে ঢুকে পড়ে। টাইমের কল খুলে আঁজলা ভরে জল নেয়। মাথা নিচু করে মুখপানে ছুড়ে দেয় স্বস্তি। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই অদ্ভুত একটা ছড়া কাটা সুর ধাক্কা মারে কানে। ওর সম্বিত ফেরে।

পা ধুতে-ধুতে টুয়া দেখল পরনের বাদামি লুঙ্গিটা একহাতে উঁচু করে ধরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বুড়ো বাবা। খালি গা, মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। উত্তেজনায় দুচোখ চকচক করছে। বাবা অদ্ভুতভাবে হাসছে। ও জানতে চাইল,
—“কিছু বলবে নাকি বাবু?”

বাবা মাথা নাড়ল। তারপর থপ করে বসে বারান্দার ধার থেকে সরু পা-দুটো ঝুলিয়ে দিল মাটির দিকে। লাজুক হেসে কেটে-কেটে বলতে শুরু করল,
—“আজ রবিবার, না? আমি জানি। আমি তো জানি…”

এদিকে ওর গলা পেয়ে পিটুলিটা মিয়াঁও মিয়াঁও করছে। ক’টা দিন আগে হলে ঠিক উঠে এসে পায়ে গা ঘষত। এই ক’দিনে টুয়া বেশ বুঝেছে পাড়াবেড়ানিকে ঘরবন্দি করে রাখা আর বাতাসকে বইতে না দেওয়া প্রায় সমার্থক। জন্মসূত্রে পাওয়া স্বাধীনতা হারিয়ে পোষ্যটি এখন ওর যাবতীয় মনোযোগ অধিকার করেছে। তাকে সুস্থ করতেই টুয়া মরিয়া। কথার পিঠে নীরবতা পেয়ে গাল ফুলিয়ে বারান্দা থেকে ডেকে উঠল বৃদ্ধ।
—টুয়ারানি, ও টুয়ারানি, তুমি কিন্তু আমার কথা শুনছ না! আজ রবিবার, তাই না?

এই এক জ্বালা। দ্বিতীয় শৈশবে পা রেখে হিংসুটে বাচ্চাকেও হার মানায় টুয়ার এই বুড়ো ছেলে। এক একদিন ওর মনে হয় বাবা বুঝি নাটক করে। সত্যিই কি বাবা কিচ্ছুটি বুঝতে পারে না? নাকি পিটুলির সময়টুকুও কেড়ে নিতে চায়? রুক্ষ গলায় ঝাঁঝিয়ে ওঠে টুয়া।
—হ্যাঁ হ্যাঁ, রবিবার। কেন; কী হয়েছেটা কী? কোন কথাটা শোনা হয়নি তোমার?

—তুমি বলেছিলে… রবিবার আমাকে সেই…টা এনে দেবে! সেই যে সেই—টা…!

রান্নাঘরের দিকে হেঁটে যেতে যেতে টুয়া দেখে, ডান হাতের দুটি আঙুল জড়ো করে মুখের কাছে তুলে ধরে সুখটান দিচ্ছে বাবা। একটু হেসে ও স্বগতোক্তি করে।

—“ও বুড়ো খোকার বিড়ি চাই! দাড়িগুলোও বেড়েছে। কামিয়ে দিতে হবে।”

***

বৈকুণ্ঠপুরে পোস্টিং পেয়ে প্রায়ই ফুলকাকির বাড়ি চলে আসত বিরূপাক্ষ। বোনের ছেলে এলে নিঃসন্তান ফুলকাকির চোখমুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠত। লম্বা-চওড়া সুদর্শন যুবকটির উপস্থিতিতে ওবাড়ি যেতে চাইত না টুয়া। তার উপস্থিতিতে ভুল করে কখনও গিয়ে পড়লে কিংবা শীতের দুপুরে রোদে চুল এলিয়ে কাকির বারান্দায় বসে আসনে নকশা তোলার সময় “চলে এলাম বড়মাসি” বলে সে হঠাৎ এসে পড়লে, বরফের মতো ঠান্ডা আর আড়ষ্ট হয়ে যেত কলেজে পড়া টুয়া। না পারত মাথা তুলে চাইতে, না পারত ছুটে বাড়ি চলে আসতে। ওর পাদুটো কেউ যেন অদৃশ্য শিকলে তখুনি বেঁধে ফেলত। ফুলকাকি ওই অস্বস্তির কথা জানত তবুও থালায় সন্দেশ-সিঙ্গাড়া-চা সাজিয়ে ওকেই ডাকত প্রত্যেকবার,
—“রূপকে জলখাবারটা দিয়ে আয় তো টুয়া। অফিস থেকে এল ছেলেটা! খেয়ে একটু জিরিয়ে নিক।”

সরকারি অফিসার বিরূপাক্ষর বিন্দুমাত্র অহংকার ছিল না। খুব সহজভাবেই টুয়ার পড়াশোনার কথা জানতে চেয়ে সে বলত,
—“কিছু দরকার হলে জানিও কিন্তু। লজ্জা পেয়ো না যেন!”

তারপর একসময় জড়তা কেটে গিয়ে কী করে যেন বন্ধুত্ব হয়ে গেল ওদের। গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় বিরূপাক্ষ এলেই তখন ইটখোলার দিকে বেড়াতে যেত ওরা। কখনও কখনও ভাঙা জমিদারবাড়ির সানবাঁধানো ঘাটে গিয়েও বসত। চাকরির পরীক্ষাগুলো নিয়ে নানা কথা বলে যেত বিরূপাক্ষ। মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা যে কতখানি জরুরি বুঝতে পারত টুয়া। বিরূপাক্ষ একটা অদ্ভুত সুন্দর পারফিউম মাখত। গন্ধটা অনেকটা শিব মন্দিরের চরণামৃতের মত। সেই গন্ধে বিভোর হয়ে জলে পা ডুবিয়ে দূরের আকাশে ফুটে থাকা তারাদের দিকে চেয়ে থাকত টুয়া। এমনই এক নিষ্পাপ গোধূলিতে বিরূপাক্ষ বলল,
—“ছেলেবেলায় তুমি কী যে ছিঁচকাঁদুনে ছিলে তিতলি! তোমাকে রাগিয়ে খুব মজা পেতাম আমরা, জানো।”

—“মিথ্যে কথা। ছেলেবেলায় তুমি আমাকে দেখেছ নাকি?”

বিরূপাক্ষ লাফিয়ে উঠল।
—“দেখেছি মানে? বহুবার দেখেছি। বড় মাসির সঙ্গে আমাদের বাড়িতে কম গিয়েছ নাকি তুমি।”

উত্তেজনায় বিরূপাক্ষর চোখদুটো পূর্ণিমা রাতের জ্যোৎস্নার মত সোনালী হয়ে গিয়েছিল। ছেলেবেলার কথায় অদ্ভুত একটা ভাল লাগা ঘিরে ধরেছিল টুয়াকে। ঠিকই, মা বেঁচে থাকতে বেশ কবার ওকে নিয়েই ফুলকাকির বোনের বাড়ি গিয়েছে। কিন্তু এতটা পথ পেরিয়েও বিরূপাক্ষ সব মনে রেখেছে? সে-রাতে এক মুহূর্তের জন্যও দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি টুয়া। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছিল নিজেকে। পাশাপাশি দাঁড়ালে একেবারেই কি মানাবে না ওদের? বিরূপাক্ষ বিদ্বান, প্রতিষ্ঠিত, ভাল বাড়ির সন্তান। আর ও? ও তো কিছু কম সুন্দরী নয়! সুগৃহিণী হওয়ার সব গুণই তো ওর আছে।

ফুলকাকি চেয়েছিল চারহাত এক হোক। মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। যে ফুলকাকির কাছে না গিয়ে টুয়া একটা বেলাও থাকতে পারত না, আজ সেই মানুষটাকে এড়িয়ে যাওয়ার বাহানা খুঁজে মরে।

—“টুয়াদি…ও টুয়াদি, দোকান খুলবে না?”

পিটুলির গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে কোথায় যেন ভেসে গিয়েছিল মন। বিশুর ডাকে হুড়মুড়িয়ে বাস্তবে এসে পড়ল। ব্যস্ত পায়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল টুয়া। বেড়ার দরজা খুলে সতেরো-আঠারো বছরের ছেলেটা উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে। হাত নাড়িয়ে তাকে কাছে ডাকছে বাবা।
—“এই বিশু, আয় এদিকে আয়। খেলব। আয় আয়।”

বিশু হাঁ করে চেয়ে রয়েছে বুড়ো মানুষটার দিকে। বাবার দিকে একবার তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয় টুয়া। তারপর আঁচল থেকে চাবির গোছাটা খুলে দোকানের চাবিটা বিশুর দিকে ছুড়ে দেয়। ক্যাচ লুফে নেয় বিশু। অবিলম্বে দোকানের দিকে পা বাড়ায়। ব্যস্ত হয়ে টুয়া তাকে পিছনে ডাকে আবার।
—“দাঁড়া রে বিশু, আগে একটা ওষুধ এনে দে।”

ছেলেটা ভারি চটপটে। টাকা নিয়েই দৌড় লাগিয়েছে। বাবাকে ধরে বারান্দার ধার থেকে সরিয়ে নিল টুয়া।
—“এইখানে বসে থাকো বাবু। বৃষ্টি হয়েছে তো, উঠোনটা পিছল। ধারে যেয়ো না। পড়ে যাবে।”

মানুষটা ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে চেয়ে রইল।
—“পড়ে গেলে বুঝি লাগে? ও টুয়ারানি…পড়ে গেলে লাগে?”

টুয়া বলল,
—“হুম! খুব লাগে।”

বাবার সঙ্গে বকবক করতে করতে রান্নার যোগাড় করতে থাকে টুয়া। আজ সবকিছুতে তালগোল পেকে গিয়েছে। অন্যদিন সকাল সকাল দোকান খুলে ধূপ দেখিয়ে কাজকর্ম নিজেই কিছুটা এগিয়ে রাখে। বিশু এলে তার হাতে দোকানের দায়িত্ব দিয়ে ভেতরবাড়িতে এসে সংসারের হাল ধরে। রান্না চাপায়। বাবাকে স্নান করিয়ে, ভাত খাইয়ে কলতলায় ডাঁই করা কাপড়চোপড় নিয়ে বসে। ভারসাম্য হারানো এই বুড়োটা এখন টুয়ার কোলের ছেলে। পায়খানা-পেচ্ছাপের জ্ঞান নেই। কখনও দৌড়ে যাচ্ছে, কখনও উল্টে পড়ছে। এই হাসছে, এই কাঁদছে, কখনও বায়না করছে! সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখতে হয়। প্রণবের সঙ্গে টুয়ার সেপারেশনের পরেও বছরখানেক দিব্যি ছিল মানুষটা। ভোরবেলা উঠে হাঁটতে বেরত। ফিরত একেবারে বাজার সেরে। তারপর স্নান খাওয়া হলে নৃপতিকাকার সঙ্গে কখনও মন্দির কমিটির কাজে, কখনও বা বিপিনবিহারী অবৈতনিক স্কুলবাড়িটা সংশোধনের মিটিংয়ে ছুটত। ঠিক সন্ধে ছটায় বাড়ি ঢুকেই চায়ের জন্য লাফালাফি জুড়ে দিত। হঠাৎ কী যে হয়ে গেল! এক রাতে আচমকাই বাথরুমে পড়ে গেল। হুঁশ ফিরতে বারো ঘণ্টা লেগেছিল। তারপর থেকে এভাবেই চলছে। এত বড় বাড়ি, উঠোন, নীচতলায় তিনটে ঘর, দোতলার বড় ঘর, ফাঁকা বারান্দা… অশক্ত মানুষটাকে নিয়ে এককোণে পড়ে পড়ে সারাটাদিন কেমন যেন গা ছমছম করত টুয়ার। অবশ্য বাপ-বেটি ছাড়া এবাড়িতে আর কেই বা থেকেছে? মায়ের মুখটা ওর ভাল করে মনেই পড়ে না। অনেক ভেবে তাই বাড়ির সামনের অংশে একটা দোকান খুলেছে টুয়া। চালডাল, মশলাপাতি সংসারের দৈনন্দিন কাজে লাগে এমন কিছু জিনিসের সঙ্গে আজকাল সিগারেট, কোল্ডড্রিংক, পানমশলাও রাখছে। বিশুই এখন সবটা দেখে। সে বলে,
—“সিগারেট আর কোল্ডড্রিংক থেকেই টাকা আসবে, দেখো টুয়াদি।”

স্টেশনমাস্টার লোকনাথকাকু বিশুকে জুটিয়ে দিয়েছেন। বাপ মরে যেতে মা আর দুটো ভাইবোন নিয়ে ছেলেটা একেবারে পথে বসেছিল। প্ল্যাটফর্মের কোণে পলিথিন টাঙিয়ে বাস করছিল। লোকনাথকাকুর মুখে জানতে পেরে টুয়াই জেদ ধরে,
—“ছেলেটাকে পাঠিয়ে দিন না কাকু। বাবাকে সামলে আমার পক্ষে তো আর দোকান চালানো সম্ভব নয়! চালু দোকানটা বন্ধ করে দেওয়ার ইচ্ছেও নেই। একটা ছেলে পেলে কাজটা চলবে।”

লোকনাথকাকু অবশ্য আগেভাগেই হাত-পা ঝেড়ে রেখেছেন।
—“দেখিস মা, ভিখিরি ঘরের ছেলে, চুরিচামারি করলে পরে কিন্তু আমায় এসে ধরিস না। আমার কোনও দায় নেই বাপু!”

—“মাস মাইনে পাবে, দুপুরে-সন্ধ্যায় আমার সঙ্গেই খাবে; চুরি করবে কেন কাকু?”

—“অভাব যে বড় বালাই রে মা। মানুষের সব বোধ হরণ করে নেয়!”

উদাস হয়ে গিয়েছিল টুয়া। সত্যি, ভাগ্য কী নিষ্ঠুর! মায়ের হাত ধরে ছেলেটা প্রথম যেদিন এল, দেখেই ও আঁতকে উঠেছিল। ওর মনে হয়েছিল উঠোনে দুটো কঙ্কাল এসে দাঁড়িয়েছে। এখন ওর কাছে থেকে, ভালমন্দ খেয়ে একটু চেহারা ফিরেছে বিশুর। প্রতিদিনই তার ভাইবোনের জন্য কিছু না কিছু পাঠায় টুয়া। মা-টাকেও কাপড়চোপড় দেয়। স্টেশনধারের বস্তিতে সামান্য টাকার একটা ঝুপড়ি ঘর ভাড়া নিয়েছে বিশুরা। টুয়াকে অনেকবার নিয়ে গিয়েছে সেখানে। ‘তিতলি দিদিভাই’ বলতে বিশুর মা অজ্ঞান। মাঝে মাঝে এসে টুয়াদের ঘরদোর ঝেড়ে মুছে আবর্জনা ফেলে নিজে থেকেই সাহায্য করে যায় মহিলা। টাকা দিতে গেলে হাতজোড় করে। বলে,
—“আপনি না থাকলে ছেলেমেয়ে নিয়ে আমি যে ভেসে যেতুম দিদিভাই।”

লোকজনকে বলেকয়ে তারও একটা কাজের ব্যাবস্থা করে দিয়েছে টুয়া। জুনিয়র হাইস্কুলে মিড ডে মিল রান্নার কাজ। মায়েপোয়ে কিছু টাকা উপার্জন করছে, দুটি খেতে পাচ্ছে, এতেই টুয়ার শান্তি। মাঝে মাঝে ওর মনে হয়, বিরূপাক্ষ সঙ্গে থাকলে এইসব মানুষগুলোর জন্য সত্যিই কিছু করতে পারত। জীবনটা সার্থক হত। বিরূপাক্ষ একবার বলেছিল এই বৈকুণ্ঠপুরেরই ভেতরের দিকে ক’টা পাঠাগার করতে চায় সে। বড় পরিসরে স্কুল তৈরির স্বপ্নও দেখত। বলত, একমাত্র শিক্ষাই মানুষের দুর্দশা ঘোচাতে পারে। ছেলেটাকে যত দেখত ততই অবাক হত টুয়া। খুব অল্প সময়ের সান্নিধ্যেও ওই জীবনদর্শন ওর মনে প্রবল ঢেউ তুলেছিল।

***

একমাত্র কন্যার সুযোগ্য পাত্র হিসেবে তরুণ সহকর্মী প্রণবকে পছন্দ করে রেখেছিলেন টুয়ার বাবা। স্কুলফেরতা বাবার সঙ্গে প্রথমদিকে প্রণব যখন ওদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করত টুয়া ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি লোকটা মদ্যপ এবং চূড়ান্ত বদমেজাজি। সেসময় বিরূপাক্ষ ছাড়া অসমবয়সী অন্য কোনও পুরুষকে দেখার বা চেনার ইচ্ছেও ছিল না ওর। তখন আশ্বিন প্রাতের শিশির ভেজা পুষ্পকলির মতই মিষ্টি একটা স্বপ্ন ওর বুকের গহীনে লালিত হচ্ছে বড় আদরে। কথায় কথায় একদিন ফুলকাকির বাড়িতে বসেই বিরূপাক্ষ বলে,
—“আচ্ছা বড়মাসি, এই মেয়েটাকে দাসবাড়ির বউ হিসেবে কেমন মানাবে বলো তো?”

ফুলকাকি আনন্দে আত্মহারা হয়ে জড়িয়ে ধরেছিল ওকে। লজ্জায় মুখ তুলতে পারছিল না টুয়া। বিকেলের রোদ্দুর পড়ে এলে যখন ওরা হাঁটতে হাঁটতে নদীর দিকে এগোচ্ছে, তখন অবশ্য দীর্ঘদেহী যুবকের বাহুতে আলতো একটা চাপড় মেরে বলেছিল,
—“এই, তুমি কী অসভ্য গো! কাকির সামনে অমন করে বলতে পারলে? লজ্জা করল না তোমার!”

মুহূর্তেই হাঁটা থামিয়ে টুয়ার হাতদুটি নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়েছিল রূপ।
—“ভুল বলেছি কি? সত্যি বলতে লজ্জা কীসের তিতলি?”

সেই একটিবারই বিরূপাক্ষর প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে হৃদয়ের গান শুনেছিল টুয়া। অমোঘ আবেশে চোখ বুজে এসেছিল ওর। ফিসফিস করে বলেছিল,
—“আমি জানি না। বাবাকে জিজ্ঞেস করো তুমি।”

বিরূপাক্ষর সম্বন্ধ নিয়ে আসে ফুলকাকি। বাবার রিটায়ারমেন্টে তখন বছর খানেক বাকি। বাংলায় এমএ করছে টুয়া। চোখে আগামীর স্বপ্ন! ফুলকাকি বলেছিল,
—“এখনই উপযুক্ত সময় দাদা। আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে হলে টুয়া সুখেই থাকবে। কোনও কিছুর অভাব হবে না ওর। আমার বোন, ভগ্নিপতি সকলকেই তো আপনি চেনেন। সরল সোজা ভদ্র মানুষ ওরা। আজকাল যা সব ঘটনা শুনছি, মেয়ের বিয়ে দিয়ে দুশ্চিন্তায় বাপ-মায়ের ঘুম উড়ে যাচ্ছে। টুয়াকে নিয়ে সারাক্ষণ আমাদের দুশ্চিন্তা হয়। ভাল ছেলেটা নিজে থেকে ওকে পছন্দ করেছে। আর কী চাই? আপনি যদি বলেন, একটা রবিবার অসিতদা আর তনু এসে কথাবার্তা বলে যাবে’খন।”

টুয়া নিজের ঘরের দরজা ভেজিয়ে লজ্জায় মরে যাচ্ছিল তখন। বিরূপাক্ষ ল্যান্ড রেভিনিউ অফিসার। যোগ্যতম ছেলে। আশা ছিল, বাবা সাদরে মেনে নেবে ওই সম্পর্ক। কিন্তু বাবার কাঠিন্যমাখা গলাটা চিনতে ভীষণ অসুবিধে হয়েছিল ওর।
—“দেখো রিনা, তোমার প্রস্তাব খারাপ নয়। তবে টুয়া তো আমার একমাত্র মেয়ে। ওকে নিয়ে আমারও কিছু ভাবনা-চিন্তা আছে। তুমি বললেই তো আমি চোখ বুজে তোমার বোনের ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে পারি না!”

অদ্ভুত একটা শীতলতা নেমে এসেছিল বাবা এবং কাকিমার মাঝে। কথা আর এগোয়নি। তারপর কাউকে কিছু না জানিয়েই একদিন প্রণবের বাবা-মা, জ্যাঠা-কাকা মায় গোটা পরিবারকে নেমতন্ন করে ফেললেন টুয়ার বাবা। তাঁরা চলে যেতে টুয়াকে ডেকে বললেন,
—“বিরূপাক্ষ ভাল ছেলে, সরকারি চাকরি সব মানলাম, কিন্তু বংশকৌলীন্য? সেটাই তো জীবনের মূলধন! মিত্রবাড়ির মেয়ে লোয়ার কাস্টের বউ হবে, সেটা আমি মেনে নেব না। শিডিউলদের ঘরে ঘরে ওরকম সরকারি অফিসার অনেক আছে।”

বাবার দিকে তাকাতেও ঘেন্না হচ্ছিল টুয়ার। একজন শিক্ষক কী করে মনের কোণে কাস্টিজম-এর মত বিষাক্ত জঞ্জাল লালন করতে পারেন! পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল। এই বাবাকেই ও এতকাল নিজের আদর্শ হিসেবে দেখেছে?

বিরূপাক্ষর সঙ্গে শেষ দেখার বিকেলটা ছিল অদ্ভুত। রোদের পড়ন্ত আলো গায়ে মেখে টিপটিপ জল ঝরছিল অবিরাম। বুদ্ধিমান ছেলেটাকে বোঝানোর মত কোনও যুক্তি সাজাতে পারছিল না টুয়া। আনমনে তাকিয়ে ছিল সুমেলিদের আমবাগানের দিকে। সবুজ বলে সবুজ! ঝড়বাদলের দিনে বাগানটা কেমন ঘোর কালচে লাগে। আর অন্যরকম বিকেলগুলোতে লাগে রহস্যময়। বাইরে থেকে বোঝা যাবে না কী আছে ভেতরে! টুয়াও নিজেকে সাজাচ্ছিল যাতে বাইরে থেকে ওর অন্তরের কান্না, ক্ষত কিছুই দেখা না যায়।

—“কিছু বলছ না যে! কাকাবাবুর আপত্তিটা কোথায়?”

বাগানের দিকে আঙুল তুলে টুয়া বলেছিল,
—“কতো মুকুল ধরেছে দেখো! পাতা দেখা যাচ্ছে না একেবারে। এই সব মুকুলেই কি আর আম হবে রূপ?”

হতভম্বের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাথা নামিয়ে নিয়েছিল ছেলেটা। আবেগের ঝুলি পেতে টুয়ার সামনে দাঁড়াতে আর ইচ্ছে করেনি তার। ভালবাসার জায়গা দখল করে নিয়েছিল নৈঃশব্দ্য। বিরূপাক্ষ যখন চলে যাচ্ছে টুয়ার খুব ইচ্ছে করেছিল দৌড়ে গিয়ে তার হাতদুটো ধরে বলে,
—“আমাকেও নিয়ে চলো রূপ। কারও আপত্তিতে আমার কিচ্ছু আসে যায় না।”

প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর মাসির বাড়িতে আর কোনওদিন পা রাখেনি বিরূপাক্ষ। টুয়ার প্রতি অভিমানে ফুলাকাকির মনটা শীতল জলাশয়ের মত হয়ে গিয়েছে। হাজার আলোড়নেও উষ্ণতার ঢেউ ওঠে না সেখানে। প্রণবদের বাড়িতে মাত্র সাতমাস কাটাতেই নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল টুয়ার। দাঁতে দাঁত চেপে ও তখন বারবার বাবার দিকে আঙুল তুলেছে। বংশকৌলীন্য আর বাবার গোড়া মানসিকতাই ওর জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছে। জীবনপ্রবাহের ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জরিত হতে হতে সুখ-দুঃখের হিসেব নিয়ে আর কখনও বাবার সামনে বসাই হল না ওর। তবে আলাভোলা মানুষটা বায়না করলে এখন টুয়া মনের সুখে কথা শোনায়। জানে, অর্থহীন প্রলাপ ছাড়া আর কোনও উত্তর দেবে না বাবা।

দুই

তিনদিন আগে পিটুলির একটা ছানা হয়েছে। দুধের মত সাদা গা। গোলাপি নাকমুখ। বিশু তার নাম রেখেছে পায়েস। ওষুধ-পথ্যে পালিকা মায়ের সেবায় পিটুলিও ক্রমে সেরে উঠছে। এবারের বাচ্চাটা বেঁচেছে বলে তার চোখেমুখে সারাক্ষণ অদ্ভুত প্রশান্তির চিহ্ন খেলা করে। বারান্দায় রোদ্দুর ছড়িয়ে পড়তে বাবাকে একটা খাটো টুলের ওপর বসিয়ে দাড়ি কামিয়ে দিতে গিয়ে নাস্তানাবুদ খাচ্ছিল টুয়া। গায়ের তোয়ালেটা বারবার খুলে ফেলছে বাবা। সেইসময় বিনু এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
—“টুয়াদি, শিগগির চলগো। তোমার কাকা আর উঠছে না।”

ছেলেটার মুখ দেখে টুয়ার বুকের মধ্যে ছ্যাঁৎ করে উঠল।
—“উঠছে না মানে? কী বলছিস তুই?”

বাবার গালে আধকামানো দাড়ি। ওই অবস্থাতেই মানুষটাকে টেনে তুলে ঘরে বসিয়ে কাকার বাড়ির দিকে দৌড়ল টুয়া। ফুলকাকি পাথরের মত বসে আছে। বিছানার ওপর পাশ ফিরে রয়েছে কাকা। গা-টা ঘামে ভিজে। ঠান্ডা শরীরটার হাতে হাত রেখে পালস পেল না টুয়া। ওর চোখের সামনেটা ঝাপসা হয়ে এল। বরাবরের কম কথা বলা একটা মানুষ। ও ফিরে আসতে কাকা একবারই বলেছিল,
—“জেদ করে দাদা দুটো জীবন নষ্ট করে দিল! তুই কষ্ট পাস না রে মা। জানবি, রাতেরও একটা শেষ আছে।”

কাকার সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত, রথের মেলা দেখতে যাওয়া, ঘাড়ে চেপে নদীর বান দেখা, অনেক ছেলেবেলায় কাকার বলা গল্পগুলো মনের মধ্যে কেমন যেন কোলাহল শুরু করেছে। উথলে ওঠা স্মৃতির ঢেউ শান্ত করতে করতেই ডুকরে উঠল টুয়া। নিঃস্পৃহ কণ্ঠে ফুলকাকি বলল,
—“আমার ফোন থেকে রূপকে ফোন করে দে। ও যেন এখুনি চলে আসে।”

আজ আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কাকা-কাকির প্রতি ওরও অনেকখানি দায়িত্ব ছিল। এযাবৎ যতটুকু পেয়েছে তার কিছুই তো ফিরিয়ে দেওয়া তো হল না! জীবনের কারসাজিতে শুধুই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল টুয়া। কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে বিরূপাক্ষর নম্বর ডায়াল করল। আবেগে ওর গলা বুজে আসছে। রিং শেষে সেই কণ্ঠটা শুনতে হবে এতদিন পরে! ডেকে নিতে হবে তাকে। টুয়া শুনতে পেল কে যেন মৃদু কণ্ঠে বলছে,
—“রাতেরও একটা শেষ আছে…।”

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »