Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

মায়ালী পাস অভিযান: আর হয়তো ফেরা হত না

সেপ্টেম্বরের এক বৃষ্টির রাত। আচমকাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম গাড়োয়াল যা্ব। হ্যাঁ, আবার গাড়োয়াল! গাড়োয়ালের গম্ভীর পাহাড় আমার বড় পছন্দের। ইচ্ছে, মায়ালী পাস অতিক্রম করে কেদারনাথ দিয়ে নামব। হাতে ঠিক ১৫ দিন বাকি। গাড়োয়ালের সহজ সরল মানুষগুলোর সঙ্গে আমার বড় আত্মিক সম্পর্ক বলে মনে হয়। তাঁদেরই একজন উত্তরকাশীর বহু পুরনো বন্ধু ‘মনোজ’। North Himalayan Holidays ওর সংস্থার নাম। বড়ই প্রাণের সম্পর্ক মনোজের সঙ্গে আমার। সোজা মনোজকে ফোন করলাম। ঘড়িতে রাত সাড়ে ন’টা বাজে। ওপার থেকে ভেসে এল সেই চেনা নমস্কার উচ্চারণ। পুরো আধ ঘণ্টা ধরে প্ল্যান ডিটেল শুনে মনোজ এককথায় রাজি। ঠিক হল শুধু তিনজন নেপালি HAP (high-altitude porters) আর কিছু বেসিক সরঞ্জাম নিয়ে জিপিএস ডিভাইস-এ নিজের বানানো ম্যাপ দেখে সেমি-অ্যালপাইন স্টাইলে পাড়ি দেব মায়ালী পাস। মনোজ শুধু খরচাটুকু নেবে। নো প্রফিট ফ্রম মি। দারুণ ব্যাপার। উত্তেজনায় ফুটছি তখন।

যাত্রার দিন ঠিক হল ৯ অক্টোবর। এই হঠাৎ অভিযান ঘিরে বিস্তর টানাপোড়েন চলল বাড়িতে। একরত্তি বাচ্চা, বউ আর পরিবারের সকলকে রেখে কেউ পুজোয় পাহাড়ে চড়তে যায় নাকি! কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। মহামারীর দাক্ষিণ্যে দুবছর কোনও অভিযানে যাওয়া হয়নি। অত্যন্ত স্বার্থপরের মত এক মাসের বাচ্চাকে রেখে, বাড়ির সকলের মতামত অগ্রাহ্য করে পাহাড়ে যাওয়া মনস্থ করলাম। শ্যালক বিপ্লব আর বন্ধু সনৎকে রাজি করিয়ে ফেললাম। বিপ্লব প্রথম থেকেই পজিটিভ ছিল এই ট্রিপটায়। কিন্তু সনৎকে একরকম জোর করেই টেনে নিয়ে গেলাম। বাড়ির প্রচণ্ড অমত। দেবুকেও বার বার বলেছিলাম যে আমি রুট দেখিয়ে দেব তুই বাকি কাজটা করবি, চল। এত অল্প সময়ে আর দেবুর ছুটি মিলল না। অগত্যা গাইড হিসেবে রাইথল-এর ‘বিপিন’-কে সঙ্গে দিতে বললাম। সেমি-অ্যালপাইন স্টাইলের কোনও প্রয়োজন নেই। টিমকে সাপোর্ট দেওয়া আগে। সেফটি ফার্স্ট। তাই শেষমেশ তিনজন মেম্বার আর চারজন কো-মেম্বার ঠিক হল। মোট সাত জনের দল।

৯ অক্টোবর, ২০২১
সকাল সকাল স্নান সেরে বাবা-মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে চন্দননগর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য ডিকাথলন, সেক্টর ফাইভ। বিপ্লবের অনলাইনে অর্ডার করা জুতোটা এ ক’দিনেও এসে পৌঁছায়নি। তাই স্টোর থেকে নিতে হবে। অগত্যা পুজোর ভিড় রাস্তায় ডিকাথলন গিয়ে জুতো কিনে হাওড়া পৌঁছাতে গিয়ে দেখি কুম্ভ এক্সপ্রেস প্লাটফর্ম ছেড়ে ছুট লাগিয়েছে। ট্রেন মিস! মনে মনে খুশিই হলাম। কারণ সেকেন্ড সিটিং-এ বসে বসে দুই দিনের জার্নি জীবন কয়লা করে দিত। সেদিন সকালেই দেখেছিলাম শিয়ালদা থেকে হরিদ্বারের একটা স্পেশাল ট্রেন দিয়েছে দুপুর তিনটের সময়। প্লাটফর্মে দাঁড়িয়েই আর একবার চেক করলাম। তখনও ১১৯টা সিট খালি। সঙ্গে সঙ্গে বুক করে পাড়ি জমালাম শিয়ালদা। অবশেষে প্রায় আধ ফাঁকা বগি নিয়ে দুপুর তিনটের সময় স্পেশাল ট্রেন ছাড়ল। চললাম হরিদ্বার।

১০ অক্টোবর, ২০২১
বিকেলে হরিদ্বার স্টেশনে স্বাগত জানাতে এলেন আমাদের প্রিয় অমিতাভদা আর ওঁর গুরুজি। উনি কানারি খাল ট্রেক করে ফিরছেন। সে রাতটা ওঁদের সঙ্গে দারুণ কাটল। আমরা পুরনো রীতি অনুযায়ী রাতের আশ্রয় নিলাম পরিচিত কালি কমলি-তে। তারপর রাতের খাবারের জন্য সেই দাদা-বউদির আন্ডার গ্রাউন্ড।

১১ অক্টোবর, ২০২১
শারদ ষষ্ঠীর কাকভোরে বিশ্বনাথ সেবার একটি বাসে আমরা রওনা দিলাম ‘ঘনশালির’ উদ্দেশে। ক্রমেই হৃষীকেশ ছুঁয়ে গাড়ি ছুটে চলল শিবালিকের আঁকাবাঁকা পথ ধরে। সবুজমাখা শান্ত স্নিগ্ধ হিমেল শারদ প্রাত। নীল আকাশের বুকে খণ্ড খণ্ড মেঘ, বলাকার মত তেপান্তরে পাড়ি দিয়েছে। ক্রমেই চাম্বা ছাড়িয়ে গহীন হিমালয়ের পথ ধরেছে আমাদের বাস। এক সময় উত্তর দিকে বার দুয়েক উঁকি দিল তুষারমোড়া গঙ্গোত্রীর শৃঙ্গ। আনন্দে প্রাণ নেচে উঠল। নীল আকাশের বুকে আকণ্ঠ অহঙ্কার নিয়ে উদ্যত শিরে দাঁড়িয়ে আছে গঙ্গোত্রীর শৃঙ্গদুটি। তেহেরি ড্যাম ধরে কয়েক ঘণ্টা পাক খেয়ে ঠিক ১২টায় ঢুকলাম ঘনশালি। সেখানেই মনোজের টিমের সঙ্গে দেখা হল। ৩ জন নেপালি হ্যাপ আর গাইড বিপিন।

বিপিন আমার ৪ বছরের বন্ধু। কী অমায়িক ছেলেটা। সেই নেলাং-এর ইন্দো-চিন সীমান্তে বাসিসি কল অভিযান থেকে ওর সঙ্গে পরিচয়। মানসদা বলত, ‘ওর হাসিটা কী সুন্দর দ্যাখ’। সত্যি ও একটা লালিত্যের হাসি হাসে সব সময়। কিছু মানুষের কিছু জিনিস ইনবিল্ড থাকে। এরকম মানুষ আমার কাছে মাইডিয়ার। মনের মানুষদের নিয়ে হইহই করে ছুটলাম রেশন নিতে। ঘণ্টা দু-এক পরে রওনা হলাম ঘুটটু-র দিকে। ঘুটটু এই রুটের শেষ জনপদ। দুরত্ব ৮০ কিলোমিটার মত। এরপর আর বড় চটি নেই। সেখান থেকে সরু আঁকাবাঁকা নবনির্মিত পিচ রাস্তা চলে গিয়েছে এই রুটের শেষ গ্রাম গাঙ্গীর দিকে। নীল আকাশের বুক ফুড়ে সবুজ দেওদার সারি সারি উঠে গেছে। পাতার ফাঁক দিয়ে নীলচে আকাশ উঁকি দিচ্ছে। সে এক মনভরানো রাস্তা বটে ঘনশালি থেকে ঘুটটু। স্মৃতির পাতায় ছবি হয়ে থাকবে চিরদিন।

ঘণ্টা দুয়েক পর ঘুটটু পৌঁছে বের করা হল আমাদের অভিযানের পারমিশান। সারাদিন পর একটা হোটেল দেখে কিছু খাবারের যোগাড় হল। তারপর ঘুটটু থেকে গাঙ্গীর দিকে যাত্রা। মাত্র ২০ কিলোমিটার পথ। ২০০০ টাকা ভাড়া নিল আবার একটা গাড়ি। নতুন পিচ কালো রাস্তার মিশকালো বুক চিরে ছুটে চলল আমাদের গাড়ি। অনেক নীচে দিয়ে ভিলঙ্গনা নদী বয়ে যাচ্ছে। ওপারে সবুজ গালিচার মত হলুদ-সবুজ পাহাড় সার বেঁধে আছে। ক্রমেই ধুপি বনে মেঘ জমছে। সূর্যের শেষ কিরণ গিয়ে পড়েছে ওপারের হলুদ-সবুজ পাহাড়ে। ক্রমেই সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। সন্ধে ৬টা নাগাদ গিয়ে পৌঁছলাম গাঙ্গী। পাহাড়ের কোলে একটা ছোট্ট গ্রাম। গাড়ি থেকে নামতেই শীত কুঁকড়ে ধরল। কী ঠান্ডা উত্তুরে হাওয়া চলছে এখানে। রাস্তা শেষ। সামনে উত্তরে আমাদের গন্তব্য কাল পদব্রজে। যেখানে গাড়ি দাঁড়িয়েছে সেখান থেকে একটা খাড়া ঢাল সোজা নেমে গিয়েছে ভিলঙ্গনার বুকে। বহু নীচে আপন ছন্দে বয়ে চলেছে উদ্যমী ভিলঙ্গনা। ওপারের পাহাড়ের সবুজ জঙ্গলে কালো অন্ধকারের ছোপ ধরেছে তখন। আমরা কাঁপতে কাঁপতে মালপত্র নামিয়ে হাঁটা দিলাম কাম্পিং জোনে। জিএমভিএন-এর একটা রেস্ট হাউসের সামনের খোলা মাঠে প্রথম দিনের ক্যাম্প পড়ল আমাদের।

সেই রাতে আমরা সবাই মিলে হইহই করে চিকেন রান্না করে খেলাম। দেবীপক্ষের আধভাঙা চাঁদ উঠেছে তখন আকাশের বুকে। বৃহস্পতি গ্রহটাও এখান থেকে অনেক চকচক করছে। তার কিছু দূরে সমান্তরালে শনি তার লাল দ্যুতি নিয়ে মিটমিট করছে। পুব দিকের কালো পাহাড় বেয়ে চুঁইয়ে পড়ছে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নাধারা। দূর পাহাড় থেকে একটানা ঝিঁঝির ডাক ভেসে আসছে। পশ্চিম দিকে পাহাড়ের গা বেয়ে টানা জঙ্গল উঠে গেছে ঘন হয়ে। কী মায়াবী রাত! মনভরে ছবি তুললাম। মাঝরাতে সনতের ডাকে তন্দ্রা ভাঙল। তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এলাম দুজনে। ঠান্ডার প্রকোপ বেড়েছে। একটা হালকা হাওয়া বইছে। চাঁদ তখন পিছনের পাহাড়ে অস্ত নিয়েছে। একটা চাপ চাপ অন্ধকার জেঁকে ধরেছে গোটা ভ্যালিটায়। নির্মেঘ কালো আকাশের বুকে জ্বলছে তখন লক্ষ-কোটি বিন্দু বিন্দু মিনিয়েচার। গোটা আকাশ একটা মৃদু মায়াবী রহস্যময় স্নিগ্ধ আলোয় নেশাতুর হয়ে আছে। এটা আমাদের গ্যালাক্সি! আকাশগঙ্গা! এত সহস্র কোটি তারার মাঝে আমার অস্তিত্ব একটা ব্যাকটেরিয়ার থেকেও নগণ্য! সামনে কোজাগরী পূর্ণিমা। আকাশে লাইট বাড়বে। যত দিন যাবে তত আস্তে আস্তে হারিয়ে যাবে গ্যালাক্সি। তাই অপার বিস্ময়ে পরখ করে নিলাম সেই মহাজাগতিক দৃশ্যকে।

১২ অক্টোবর, ২০২১
সকাল ৭টা। সূর্য এখন ‘ভি’ শেপের ভ্যালিটার পিছনে। ৯টার সময় রোদ আসবে। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে গোটা ভ্যালিটায়। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় গা ঝেড়ে উঠছে হিমালয়ের বনানী প্রকৃতি। আজ আমাদের ট্রেক শুরু। সকাল সকাল তল্পিতল্পা গুছিয়ে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ঠিক ৯টার সময় রোদ উঠল। একদম পূর্ব হিসাবমত। আমি প্রতিটা অভিযানে এসব আগে থেকেই হিসেব করে যাই। গোটা ট্রেকটায় মাসার অবধি কোনওদিন ৫-৬ ঘণ্টার বেশি সূর্যকে পাব না এটা আগে থেকেই জানতাম। সেইমত ঠান্ডার প্রকোপ থেকে বাঁচতে সতর্কতা নিয়েছি যথেষ্ট। দারুণ আবহাওয়া। মাথার উপর নির্মেঘ খোলা আকাশ। উত্তর দিকে কৈরির শৃঙ্গগুলো উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।

সাড়ে ন’টায় যাত্রা শুরু করলাম। ভিলঙ্গনাকে বহু নীচে ডান দিকে রেখে জঙ্গলে ভরা আঁকাবাঁকা চড়াই-উৎরাই পথ গিয়েছে সোজা কল্যাণী পেরিয়ে ‘ভিরোধা’। টানা দুবছর গৃহবন্দিত্বের পর আবার পাহাড় চড়া। কষ্টও হচ্ছিল ভীষণ। বড় বড় চড়াইগুলো পার করতে ঘেমেনেয়ে একসা হয়ে গেছি প্রথম দিন। স্যাকটারও অনেক ওজন হয়েছে। হওয়াই তো উচিত। কী নেই ব্যাগে। ১০ দিন টিকে থাকার মত প্রয়োজনীয় সব কিছু আছে স্যাকে। একদম পরিপাটি করে গুছিয়ে নিয়েছি সব কিছু। অনেকগুলো ঝোরা পেরিয়ে জঙ্গলের পথ ধরে ঝিঁঝির একঘেয়ে ডাক শুনতে শুনতে ক্রমেই ৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ফেলেছি। ঘড়িতে দুপুর ১২টা। একটা টানা চড়াই পেরিয়ে উঠে এলাম একটা পাহাড়ের টপে।

জায়গাটার নাম কল্যাণী। কচি সবুজ ঘাসে মোড়া একটা ছোট্ট বুগিয়ালের মত জায়গা। সূর্য এখন মধ্যগগনে। কড়া রোদ যেন পুড়িয়ে দিচ্ছে চামড়া। দূরে গাঙ্গী দেখা যাচ্ছে। উত্তরে দিগন্তজোড়া নির্মেঘ নীল আকাশের বুকে পাল তুলে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববিখ্যাত পর্বত ‘থালায়সাগর’। এটা সাউথ ফেস। আমরা বলি পিছন দিক। সামনের দিক অর্থাৎ নর্থ ফেস গঙ্গোত্রী-কেদারতাল থেকে দেখেছি আগে। থালায়সাগর তার বিশালকায় সাউথ রিজ মেলে পালতোলা নৌকার মত উদোম খোলা নীল আকাশের বুক ফুঁড়েছে। আহা কী দৃশ্য! মনে মনে থালায়সাগর মহারাজকে প্রণাম জানালাম। কল্যাণী বুগিয়ালের মাঝখান দিয়ে একটা জলের ধারা চলে গিয়েছে। এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কিছু ছোটবড় রডোডেনড্রন গাছ। তারই একটার ছায়ায় বসে আমরা লাঞ্চ সারলাম। ঝোরার জল আকণ্ঠ পান করে ক্লান্ত ঘর্মাক্ত শরীর তৃপ্ত করলাম। তারপর কল্যাণীকে বিদায় জানিয়ে আবার ধরলাম জঙ্গলের পথ। দুপুর ২টোর সময় এসে পৌঁছলাম ভিরোধা। চারিদিকে গহীন জঙ্গল আর মাঝখানে একটা আগাছাময় ছোট্ট জায়গা। আগাছা পরিষ্কার করে সেখানেই পড়ল আমাদের দ্বিতীয় দিনের ক্যাম্প।

গরম গরম সুপে শরীর চাঙ্গা করে নিয়ে ক্যাম্প রেডি করলাম। এবার ক্রমেই সূর্য ঢলে পড়তে লাগল ‘ভি’ শেপের ভ্যালিটার ওপারে। একটু পরেই রোদ চলে গেল। শুরু হল হিমেল হাওয়ার দাপট। চারপাশের জঙ্গল মর্মর শব্দ করে উঠল। কোনও গাছের মগডাল থেকে একটা পাখি খুব কর্কশ শব্দে ডেকেই চলেছে। বুক যেন খান খান করে দিয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডাও লাগছে প্রবল। আমাদের ক্যাম্পের পাশে একটা জায়গায় মেষপালকরা একটা অগ্নিকুণ্ড বানিয়েছিলেন লক্ষ করলাম। বেশ কিছু কাঠ এখনও আধপোড়া অবস্থায় পড়ে আছে। তাতে কিছু শুকনো ঝোপঝাড় আর কাঠকুটো ফেলে আবার জ্বালানো হল আগুন।

হঠাৎ করে দূরে একটা ফায়ারিংয়ের শব্দ কানে এল। বিপিন বলল, নীচের গ্রাম থেকে কোনও চোরাশিকারি ঢুকে কিছু শিকার করেছে। জঘন্যতম অপরাধ এটা। তারপর থেকে অল্প দূরে জঙ্গলের ভিতর কিছু ভাল্লুক একসঙ্গে ডাকতে শুরু করল। মনে হয় বন্দুকের আওয়াজে ভয় পেয়েছে। সে কী হৃদয়বিদারী ডাক, শুনলে শরীরের রক্ত শুকিয়ে যায়। আমার সঙ্গীসাথিরা একটু ভয় পেল। বিপিন বলল, ভয় নেই আগুন জ্বলছে। ওরা ঘেঁষবে না। অগ্নিকুণ্ডে আরও শুকনো কাঠ যোগাড় করে এনে দেওয়া হল। একসময় সন্ধে নামল জঙ্গলের বুকে। হাড় হিম করা ঠান্ডায় অনেক রাত অবধি অগ্নিকুণ্ডের ধারে কাটালাম সবাই। তারপর রাতের খাওয়া শেষ করে আগুনে একটা বড় কাঠ ফেলে দিয়ে শয্যা নিলাম।

১৩ অক্টোবর, ২০২১
ঘড়িতে সকাল ৮টা। সূর্যের দেখা নেই। চারিদিকে আগাছাময় সবুজ জায়গাটা যেন ফিকে হয়ে আছে। রাতের জমা শিশির প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে সবুজ রঙে সাদা প্রলেপ দিয়েছে। ৯টার মধ্যে তাঁবু গুছিয়ে সবাই রেডি। গন্তব্য খরসলি। দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। আবার ভিলঙ্গনা বরাবর উত্তরে যাত্রা শুরু হল। এবার সূর্যমামা তার মিঠেল রোদ নিয়ে আমাদের পিছু পিছু ধাওয়া দিয়েছে। আবার জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। একটা স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার তখনও জঙ্গলের ভিতর। মাঝে মাঝে পাতার ফাঁক দিয়ে ছুঁয়ে আসছে সকালের শান্ত রোদ। আলো-আঁধারির এক মায়াবী পরিবেশ তখন জঙ্গলের মধ্যে। আজ সারাদিনের চড়াই পথ, তাই লম্বা চলা আবার একটু বিশ্রাম। এইভাবেই চলেছি। কতগুলো নালা পেরলাম গোটা রাস্তাটায় তার হিসেব নেই। কোনওটা লাফিয়ে আবার কোনওটা এক গোড়ালি ঠান্ডাজল ভেঙে, আবার কোনওটা উদ্দাম স্রোতে চেন করে। এখন চারিদিকে ভোজপত্রের জঙ্গল।

বেলা ১২টা নাগাদ একটা চড়াইয়ের নীচে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছি এমন সময় দুজন মেষপালকের সঙ্গে দেখা। এরা গ্রামে ফিরছেন। প্রায় সাড়ে চারশো ভেড়া নিয়ে ওদের একটা দল তখনও ওপরে রয়েছে। প্রতি গ্রীষ্মের শুরুতে কচি ঘাসের জন্য ওরা প্রচুর রেশন আর ভেড়ার পাল নিয়ে ৪-৫ মাসের জন্য গহীন হিমালয়ের বুগিয়ালগুলোর খোঁজে যাত্রা শুরু করেন। সঙ্গে থাকে ৪-৫টে হিংস্র কুকুর। যারা ভেড়ার পালকে হিংস্র জীবজন্তুর হাত থেকে রক্ষা করে। ঠিক শীত আসার আগে আবার মেষপালকের দল ফিরে আসে লোকালয়ে। যেন যাযাবরের জীবন। বিশাল বিশাল ভেড়ার পাল নিয়ে ওরা হিমালয়ের এক দেশ থেকে আর এক দেশে ঘুরে বেড়ান। পাথরের অন্দর কন্দর, গুহাগুলো হয় তখন ওদের অস্থায়ী মাথা গোঁজার আস্তানা। ওদের কাছে দুর্গম হিমালয়ের অজানা কিছু নেই, প্রায় সব কিছু নখদর্পণে। সত্যিকার হিমালয়ের পথপ্রদর্শক একজন শেফার্ড। কত কিছু জানলাম ওদের কাছে। দুর্ভেদ্য হিমালয়ের প্রকৃতি, তাদের জীবনযাপন, বন্য জীবজন্তুর উৎপাত, রোগভোগ থেকে দুষ্প্রাপ্য জড়িবুটি সব কিছু উজাড় করে দিলেন এক প্যাকেট বিড়ির বিনিময়ে। শেষে ক’টা জড়িবুটিও উপহার পেলাম তাদের থেকে। কী অসীমসাহসী এই মানুষগুলো। কী কাঠিন্যের ছাপ এই অকুতোভয় গাড়োয়ালি তামাটে চোয়ালে। কিন্তু কোনও অহঙ্কারের লেশমাত্র নেই। অতঃপর ওদের বিদায় জানিয়ে আবার ধরলাম চড়াই পথ।

দুপুর দুটো। ক্রমাগত নামতে নামতে একটা নালার ধারে এসে পৌঁছলাম। এর নাম কৈরি নালা। বাম দিকে এই ভ্যালিটার বুক চিরে আর একটা ভ্যালি ঢুকেছে। ওটা কৈরি গাদ ভ্যালি। ওই ভ্যালির অনুচ্চ শৃঙ্গগুলো আমরা গাঙ্গী থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম। সেখান থেকে বয়ে আসছে এই স্রোতস্বিনী কৈরি নালা। জঙ্গলের ভাঙা দুটো ডাল পাশাপাশি ফেলে এখানে একটা পুল বানানো হয়েছে। এর ওপারটাই খরসলি। দূরে খরসলি মাতার মন্দির দেখা যাচ্ছে। তারপর পুল পেরিয়ে রাশি রাশি বোল্ডার পার হয়ে পৌঁছলাম মন্দিরে। সেখানে খরসলি মাতাকে প্রণাম জানিয়ে সুস্থ অভিযানের প্রার্থনা করলাম। তারপর নেমে এলাম ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডে। ডান পাশ দিয়ে দিয়ে তীব্র স্রোতে ভিলঙ্গনা বয়ে যাচ্ছে। রিভার বেডের ওপর একটা উঁচু জায়গাতে পড়ল আমাদের আজকের ক্যাম্প।

পূর্ব দিকে নদীর ওপারে খাড়া পাহাড় উঠে গেছে। তার ওপারে ত্রিজুগীনারায়ণ। অন্ধকার নামার আগে নদীতে ভেসে আসা কিছু শুকনো ডালপালা যোগাড় করে আনল রাজকুমার আর শিবুদা। আজ আবার আগুন জ্বালানো হল। আর সেটা চলল অনেক রাত অবধি। আজ ওরা টিফিনে গরম গরম চায়ের সঙ্গে সেই লাল নীল পাঁপড় ভেজেছে। আগুনের কুণ্ডের সামনে বসানো আছে এক থালা ভাজা পাঁপড়। অনেক স্মৃতি এই লাল নীল পাঁপড়ের। আমার পুরনো টিমমেটদের খুব মনে পড়ছে। আগুনের লালচে আভা ছাপিয়ে আর একটা জিনিস আকাশে জ্বলজ্বল করছে। দেবীপক্ষের আধভাঙা চাঁদ। খণ্ড খণ্ড মেঘের আড়াল থেকে মাঝে মাঝেই উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। দূরে বোল্ডারের গায়ে চিপকে থাকা অভ্রগুলো চাঁদের আলোয় চিকচিক করে উঠছে। খরসলির আর এক মায়াবী রাত। কোত্থাও কেউ নেই। শুধু উন্মুক্ত বন্য প্রকৃতি, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া জীবন্ত ভিলঙ্গনা, আকাশের রাতজাগা চাঁদ তারা আর কোথা থেকে উড়ে আসা গুটিকয়েক রাতপোকা। এখানে বন্য জন্তুর উৎপাতের ভয় নেই। জঙ্গল অনেক দূরে।

৭টার মধ্যে রাতের খাবার সাঙ্গ করে তাঁবুতে ঢুকলাম। তারপর শুরু হল আমাদের গল্প। পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য থেকে হিমালয় সৃষ্টির ইতিহাস, ভূগোল, যোগী, যোগ সাধনা, আধ্যাত্মিকতা থেকে হিমালয় ভ্রমণের ইতিবৃত্ত নিয়ে রাত ১২টা অবধি আলোচনায় মশগুল হয়ে রইলাম সবাই। তারপর রোজের মত শোয়ার আগে শেষবার রাতের আকাশকে অনুভব করতে ঠান্ডা উপেক্ষা করে ছুটতাম বাইরে। পাগল পাগল লাগত মহাবিশ্বের রূপ দেখে। কতক্ষণ বিভোরভাবে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতাম জানি না। যখন সম্বিত ফিরত গিয়ে শুয়ে পড়তাম। এখনও তাই হল। অনেকক্ষণ বাইরে আছি, তাঁবুর ভিতর থেকে সনৎ ডাকছে।

১৪ অক্টোবর, ২০২১
সকাল সকাল আবার যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছি। আজ আমরা তাম্বাকুণ্ডের কাছাকাছি ক্যাম্প করব। দূরত্ব ৭ কিলোমিটার মত। কিন্তু গোটা রাস্তায় চড়াই অনেক। যাইহোক সূর্যের আলোর অপেক্ষা না করে সকাল সকাল নেমে পড়লাম ভিলঙ্গনার বুকে। রাশি রাশি বোল্ডার পার হয়ে নদী ধরে চলেছি উত্তরে। বাম হাতি পথ। টানা এক কিলোমিটার নদী ধরে চলতে চলতে আবার চড়াই শুরু হল। একটানা চলল সেই চড়াই। বেলা বাড়ছে ক্রমেই। অনেকটা এগিয়ে একটা খোলা জায়গা পড়ল। আবার উন্মুক্ত নীল আকাশ দেখা গেল। উত্তরে এখন খোলা গায়ে গর্জে উঠছে বিখ্যাত পর্বত কীর্তিস্তম্ভ। থালায়সাগর এখন আঁকাবাঁকা ভ্যালির অন্তরালে মুখ লুকিয়েছে। জঙ্গল পাতলা হয়ে এসেছে। উচ্চতা বাড়ছে, সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা হাওয়াটাও। তারপর অনেক চড়াই পথ উঠে একসময় বড় বড় বনস্পতির দল হারিয়ে গেল। সামনে এখন উন্মুক্ত প্রান্তর। দূরে ডান দিকে নদীর ওপারে চৌকির বাঁক দেখা যাচ্ছে। আরও দুই কিলোমিটার মত এগিয়ে চৌকির কাছাকাছি একটা জায়গায় আমাদের ক্যাম্প পড়ল।

বিপিন বলল, এই ক্যাম্পটা ওরা তাম্বাকুণ্ড বলে। কিন্তু লজিক্যালি এটা তাম্বাকুণ্ড ক্যাম্প নয়। তাম্বাকুণ্ড এখান থেকে অনেক দূর। বহু দূরে একটা মোরেন রিজ সাতলিং হিমবাহ থেকে নেমে আসছে ঠিক ধনুকের মত। তাম্বাকুণ্ড ওই লাটারাল মোরেনের ওই পাড়ে। ওখানে পৌঁছতে গেলে ভিলঙ্গনা ক্রশ করে যেতে হবে। ওই জায়গাটা হল আসল তাম্বাকুণ্ড ক্যাম্প। আর এটা হল বিফোর চৌকি। একটা ইন্টারমিডিয়েট ক্যাম্প। সেটা ওকে বুঝিয়ে বললাম। মেনেও নিল। ঘড়িতে দেড়টা বাজে। আকাশে রোদ গনগন করছে। আশপাশের আগাছা পরিষ্কার করে ম্যাটগুলো বিছিয়ে দিলাম খোলা আকাশের নীচে। তারপর উন্মুক্ত প্রকৃতির বুকে গড়াগড়ি। প্রকৃতির নীল নীলিমায় শয্যা নিয়েছি। আহা! মাথার উপর নীল আকাশের চাঁদোয়া। উত্তরে উদোম খোলা প্রান্তর। পূর্বে আকাশছোঁয়া পাথুরে পাহাড় নদীর ওপ্রান্ত থেকে খাড়া উঠে গেছে। কী অনাবিল প্রকৃতি। ঘণ্টাখানেক ওইভাবে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে লাগলাম। তারপর ক্যাম্প রেডি করে যখন বেরলাম তখন আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ জমতে শুরু করেছে।

ঠিক ৩টের সময় আবার সূর্য মুখ লুকাল পাহাড়ের কোলে। ঝুপ করে ঠান্ডা নেমে এল গোটা ভ্যালিটায়। হঠাৎ দেখি উত্তর আকাশে কীর্তিস্তম্ভকে ঢেকে দিয়েছে একরাশ কালো নিম্বাস মেঘ। উত্তরে হাওয়ায় ভর করে ছুটে আসছে এদিকেই। একটু শঙ্কিত হলাম। অসময়ে আবার বৃষ্টি কেন! প্রচণ্ড ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। ভালই হচ্ছে কারণ এরকম হাওয়া চললে নিম্বাস কেটে যাবে। হলও তাই। ঘণ্টাখানেক পর উত্তর আকাশে মেঘ কেটে একখণ্ড নীল আকাশ দেখা দিয়েছে। মেঘের ফোঁকর থেকে অস্তগামী সূর্যের রাঙা রোদ গেরুয়া কাপড় পরিয়েছে কীর্তিস্তম্ভকে। যেন এক প্রকাণ্ডদেহী যোগী, গেরুয়া বস্ত্র পরে দিনের শেষে তার পরিশ্রান্ত দেহ মেলে দিয়েছে প্রকৃতির বুকে। তার শরীরের তীব্র আগুনরাঙা ছটা ধাঁধিয়ে দিচ্ছে মানবচক্ষু। কী অপরূপ প্রকৃতি মা! ক্রমে হাওয়া কমে এল। কিন্তু কনকনে করে দিয়ে গেল গোটা ভ্যালিটা। ক্রমেই সন্ধ্যা হল। এক সময় রাত। খণ্ড খণ্ড মেঘ জমেই রইল গোটা ভ্যালিতে।

১৫ অক্টোবর, ২০২১
ঘড়িতে সকাল ৭টা। দুর্যোগের মেঘ কেটে গিয়ে নীল আকাশ দেখা গেল। আমরা খানিকটা এগিয়ে চৌকি থেকে পায়ে হেঁটে ভিলঙ্গনা ক্রশ করে পুব দিকে মোড় নেব। তারপর ওপারে খানিকটা উঠে চৌকি ক্যাম্প। ওই মোড় পার হলেই খুলে যাবে ডান দিকের ভিউ। অর্থাৎ দুধগঙ্গা ভ্যালি। ওই ভ্যালি পার হয়ে পুব দিক ধরে আমরা পায়ে পায়ে উঠে যাব মায়ালী পাসের দিকে। একটানা পাথরের খাড়া ঢাল অপেক্ষা করে আছে মাসার তাল অবধি। এটা ক্রস করে নিতে পারলেই প্রকৃতির দ্বার খুলে যাবে। চোখের সামনে তখন ফুটে উঠবে উদোম খোলা আকাশ আর দিকচক্রবালে গাড়োয়ালের বড় বড় পিক। কেদারনাথ, ভারতিকুণ্ঠা, সুমেরু, মান্দানি, আরও কত কী। এসব ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। লোটাকম্বল গুটিয়ে আবার যাত্রা শুরু হল।

দু’কিলোমিটার চড়াই উঠে সামনে চৌকি মোড় এল। খুলে গেল ডান দিকের লুকোনো দুধগঙ্গা ভ্যালির রূপ। ঠিক মাঝখান দিয়ে বয়ে আসছে দুধগঙ্গা নালা। সামনের গগনচুম্বী খাড়া কালো পাহাড়টা এখন ধোঁয়াটে হিমশীতল নীল বর্ণে রেঙে আছে। ওটাই খাড়া ক্রশ করে আমাদের মাসার পৌঁছাতে হবে কাল। এখানে একটু থামলাম। দেখলাম ছোট্ট পায়েচলা রাস্তাটা সোজা গিয়ে বাম দিকে মোড় নিয়ে পশ্চিমে খাটলিং হিমবাহের দিকে নেমে গেছে। যেখান থেকে ভিলঙ্গনা জন্ম নিয়ে চৌকিতে মোড় নিয়েছে। সব কিছু আমার বানানো ম্যাপের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। সেই ট্র্যাক, সেই পয়েন্টিং, সেই ডিরেকশন সব কিছু এখনও অবধি পারফেক্ট। প্রতিদিন চলতে চলতে ১০ মিনিট অন্তর জিপিএস চেক করেছি। মনে অনেকটা ভরসা পেয়েছি, যে একটু হলেও শিখতে পারছি। আমার রাতজাগা খাটুনি আর পড়াশোনা সফলভাবে এগোচ্ছে।

এখানে ডান দিক বরাবর আগাছাময় একটা খাড়া ঢাল বহু নীচে ভিলঙ্গনার বুকে নেমে গেছে। নীচে দিয়ে গর্জন করে নদী বইছে। এখানে নদী পার করার জন্য একটা ব্রিজ ছিল। কিন্তু সেটা প্রচণ্ড বর্ষায় ভেসে গেছে। তাই অগত্যা পায়ে হেঁটেই নদী ক্রস করতে হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ওই আগাছাময় ঢাল ধরে রাস্তা ছেড়ে জেড কাট নীচে নেমে যাব। বেলা বাড়ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নদীর জলও। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নদী টপকাতে হবে। ক্রমেই খাড়া ঢাল বেয়ে নামতে লাগলাম। যত নীচে নামতে লাগলাম আগাছার জঙ্গল বাড়তে লাগল। চারিদিকে কাঁটা ঝোপ। যেখানেই লাগছে সেখানেই চিরে যাচ্ছে। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। রাস্তা নেই, ধরার জায়গা নেই, যেখানেই হাত পা পড়ে সেখানেই কাঁটা। ওই করতে করতে অতিকষ্টে এসে পৌঁছলাম স্রোতস্বিনী ভিলঙ্গনার ধারে। প্রবল স্রোতে নদী বয়ে চলেছে। এখানে পা দেওয়া মানে নিশ্চিত ভেসে যাব। অগত্যা নদীর ধার ধরে একটা প্রশস্ত জায়গা খুঁজতে খুঁজতে এগোতে লাগলাম।

অনেকটা রাশি রাশি বোল্ডার ভেঙে এসে পাওয়া গেল একটা প্রশস্ত জায়গা। এখানে নদীটা একটু চওড়া হয়েছে। স্রোতও কিছুটা কম। একটা বড় বোল্ডারের ওপর বসে বসে চিন্তা করতে লাগলাম কোন জায়গা থেকে পার করা যেতে পারে। একটা সম্ভাব্য জায়গা দেখে বিপিন সটান জলে ঝাঁপ দিল। সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে পড়ল কোমরসমান জলের স্রোতে। নিজেকে সামলাতে তখন ওর নাস্তানাবুদ অবস্থা। কিছুতেই পার হয়ে যেতে দিল না উদ্যমী ভিলঙ্গনা। বিপিন ফিরে এল আধভেজা হয়ে। এখান থেকে নদী পার হওয়া সম্ভব নয়। অগত্যা সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা খাটলিং ভ্যালি ধরে পশ্চিমে আরও অনেকটা এগোব। তারপর খাটলিং জিরো পয়েন্ট থেকে নদী ক্রস করব কাল ভোরে। ওখানে নদীর স্রোত অনেক কম হবে। প্রশস্ত রিভার বেল্টে গভীরতাও অনেক কম থাকবে। সম্পূর্ণ ইউ টার্ন মেরে নদীর ওপার ধরে আবার চৌকি পৌঁছব কাল। তবে রুট প্ল্যান থেকে একদিন পিছিয়ে থাকব। তা হোক, মায়ালী ক্রস করা চাই। সেইমত রাশি রাশি বোল্ডার পার হয়ে চড়াই পথে উঠতে লাগলাম।

রাস্তা বলে কিছু নেই। শুধু লুজ বোল্ডার। অনেকটা এগিয়ে ডান দিকে ফাটিং হিমবাহ দেখা গেল। তার শেষপ্রান্তে খাড়া উঠে গাছে থালায়সাগরের দেওয়াল। ফাটিং হিমবাহের সমান্তরালে আর একটা মোরেন রিজ নেমে এসে ভিলঙ্গনার সামনে থেকে চৌকির দিকে ধনুকের মত বাঁক নিয়েছে। ওখানেই লুকিয়ে আছে তাম্বাকুণ্ড। ওই রিজের উৎস যেখানে সেখান থেকে সাতলিং হিমবাহ শুরু হয়েছে। ফাটিং হিমবাহের বাম পাশ দিয়ে আর একটা বড় কালো পাহাড় থালায়সাগরকে ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে। ওটা রুদুগয়রা। তার পাশে আরও পশ্চিমে শ্বেতশুভ্র রতনভিয়ান উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। একসময় সূর্য ঢেকে গেল বাম দিকের পাহাড়ের ঢালে। ঘড়িতে ২টোর কাছাকাছি। জিপিএস বলছে, এখনও দেড় কিলোমিটার জিরো পয়েন্ট। শরীর আর দিচ্ছে না। কাঁধগুলো যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ছে। ক্রমেই গুটি গুটি পায়ে তিনটের সময় এসে পৌঁছলাম খাটলিং জিরো পয়েন্ট। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল প্রবল হিমেল হাওয়া। যাহোক করে তাঁবু লাগিয়ে আগে গরমের পোশাক বের করে পরা হল। তারপর গরম চায়ে চুমুক দিয়ে দেখতে লাগলাম প্রকৃতির শোভা।

ওপারে তখনও রোদ ঝকমক করছে। আর এপারে অন্ধকারে স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডার প্রবল কামড়। এখানে নদীর পাশে প্রশস্ত বালির তট। তার ওপর গা ছড়িয়ে কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে ভিলঙ্গনা। জলের স্রোত আর গভীরতা সত্যি অনেক কম এখানে। কাল সূর্য ওঠার আগে এখান থেকে টুক করে নদী পার হয়ে যাব। ভিলঙ্গনার ওপারের পাহাড় বেয়ে খাড়া নেমে আসছে রতনভিয়ান হিমবাহ। আর তার মাথায় মুকুটের মত ২টো অনামী পিক। ৫৭০৯ আর ৫৭৩৩। আস্তে আস্তে সন্ধে ঘনিয়ে এল। আটটার সময় ডিনার সেরে একবার উষ্ণতা মাপা হল আমার ঘড়িতে। মাইনাস ৪ দেখালও। আকাশে লক্ষ-কোটি তারার ঝিকিমিকি। মৃদু আলোয় ম্লান হয়ে আছে কিছু দূরের কীর্তিস্তম্ভ। থালায়সাগর ঢেকে আছে রুদুগয়রার আড়ালে। আকাশে চাঁদের আলো নেই। চাঁদ ঢেকে আছে ওপাশের ভ্যালিটায়। একদম ক্রিস্টাল ক্লিয়ার ওয়েদার আজ। ফাটিয়ে ঠান্ডা দিয়েছে তাই। বেশিক্ষণ বাইরে থাকা দায়। কাল ভোরে আবার নদী পার, অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।

১৬ অক্টোবর, ২০২১
সকাল ৬টা। সূর্যের আলোর লেশমাত্র নেই। এই ফাঁকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নদী ক্রস করে ফেলতে হবে। সেইমত ৭টার মধ্যে প্রস্তুত হয়ে নেমে পড়লাম ভিলঙ্গনার বালুতটে। আশপাশে জল জমে বরফ হয়ে আছে। অসাবধানে পা পড়লেই পেছলাচ্ছে। ছোট ছোট কয়েকটা ধারা লাফিয়ে পার হলাম। তারপর এসে দাঁড়ালাম মূল নদীর ধারে। রাজকুমার কয়েক পা নেমে হাঁটু অবধি ভিজিয়ে ঠান্ডায় কুঁকড়ে আবার ফিরে এল। ভয়ংকর শীতল বরফগলা জল বইছে নদীতে। যা হোক করে পার করতেই হবে আমাদের। আর না হলে ফিরে যেতে হবে, কোনও উপায় নেই। অগত্যা জুতো খুলে হাফ প্যান্ট পরে নিলাম। তারপর সবাই হাতে হাত দিয়ে একটা চেন বানিয়ে ঝুপ করে নেমে পড়লাম এককোমর বরফগলা জলে। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল হাজার হাজার ছুচ একসঙ্গে বিঁধল শরীরের চামড়া ভেদ করে। সনৎ আর বিপ্লব প্রচণ্ড আর্তনাদ করে উঠল। সারা শরীরে আর কোনও সাড় রইল না। ওরা একরকম হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলল আমাদের। প্রায় ৩ মিনিট ওই ঠান্ডাজলে ভিলঙ্গনার সঙ্গে লড়াই করে এক এক করে সবাইকে ওপারে পৌঁছে দিল ওরা।

এইটুকু নদী ক্রস করতে আমাদের সারা শরীর হিম হয়ে গেল। পাগুলোয় আর কোনও সাড় নেই। ভাগ্যক্রমে সূর্যের প্রথম কিরণ এসে পড়ল নদীর বুকে। কয়েকটা বোল্ডারের ওপর বসে ক্রমাগত ম্যাসাজ করতে লাগলাম। সূর্যের আলোয় অনেকক্ষণ বসে থাকার পর আবার পায়ে বল ফিরে পেলাম। তারপর ড্রেস করে আবার চলা শুরু। কিছুদূর গিয়ে আবার একটা নালা পড়ল। এটা ফাটিং নালা। ফাটিং হিমবাহ থেকে বয়ে আসছে। একইভাবে এটাও ক্রস করা হল। তারপর বাম দিক থেকে নেমে আসা রিজের ঢাল ধরে লম্বালম্বি চলতে লাগলাম চৌকির দিকে। রাস্তার কোনও লেশমাত্র নেই। ছোটবড় বোল্ডার ডিঙিয়ে এগিয়ে চলেছি। ঘণ্টা দুয়েক পরে রিজের মাথায় উঠে এলাম। সেখানেই দেখা দিল পূর্বকল্পিত তাম্বাকুণ্ড। গহীন হিমালয়ের কোলে একটা পান্নাসবুজ টলটলে জলের সরোবর মানবচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে ছিল। ওদিকে না এলে দেখতেই পেতাম না। সরোবরের পিছন দিকে ফাটিং হিমবাহ আর তার শেষপ্রান্তে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে ঝকঝকে থালায়সাগর। কী অসাধারণ দৃশ্য! মনভরে ছবি তুললাম যে যার মত পোজ দিয়ে, যেমন খুশি। বিপিন একটা গান ধরেছে… অনাবিল আনন্দে ভেসে পড়েছি তার সুরে।

আধ ঘণ্টা এখানে বিশ্রাম নিয়ে আবার চলা শুরু। ঘণ্টাখানেক পর এসে পৌঁছলাম প্রপার চৌকিতে। হাতে এখনও অনেক সময় আছে। সূর্য এখন মাঝগগনে। এখানে একটুও সময় নষ্ট না করে বাম দিকে মোড় নিয়ে আমরা উঠে গেলাম দুধগঙ্গা ভ্যালির দক্ষিণ গাত্র ধরে। পথে পেরতে হল দুধগঙ্গার বিশাল রিভার বেল্ট। মাঝে দুধগঙ্গা নালার কয়েকটা ধারাও লাফিয়ে লাফিয়ে পার হতে হল। মাসার তালের দিকে খানিকটা উঠে একটা ছোট্ট বুগিয়ালের মত জায়গা পাওয়া গেল। এই জায়গাটা হল আপার চৌকি। এখানেই পড়ল আজকের ক্যাম্প। দুপুর একটার মধ্যে ক্যাম্প করে ফেলেছি। হাতে সারাদিন সময়। আবার উদোম খোলা নীল আকাশের নীচে শয্যা নিয়েছি। মাথার উপর উজ্জ্বল গাঢ় নীল রঙের শামিয়ানা। মাঝ আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে বলাকার দল। গন্তব্য কোনও গহীন হিমালয়ের তেপান্তরের মাঠ। বহু দূরে পশ্চিমে খাটলিং জিরো পয়েন্ট দেখা যাচ্ছে। তার ওপরের অনামা পিকগুলোর পিছনে যোগিন ৩ উঁকি দিচ্ছে। অনামা পিকগুলো থেকে ঝুলন্ত হিমবাহগুলো এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। একটা আলোছায়া মাখা রহস্যময় বিশালাকায় স্নো ফিল্ড দেখা যাচ্ছে ঠিক রতনভিয়ান আইস ফল-এর উপরে। তার ডান পাশে কালো পাথরের পাহাড় রুদুগয়রার আপাদমস্তক এখন খুলে গেছে। তার ডান দিকে ফাটিং হিমবাহ আর বুক চিতিয়ে থাকা গর্বোদ্যত থালায়সাগর। নির্মেঘ আকাশে প্রকৃতি যেন ঢেলে দিয়েছে।

কে আর জানত সামনে কী ভয়ঙ্কর দুর্যোগ অপেক্ষা করে আছে! এই প্রকৃতি দেখে ভাবতেই পারিনি সেসব। রাজকুমার গরম গরম চায়ের সঙ্গে আবার বসিয়ে দিয়ে গেল এক থালা লাল নীল পাঁপড় ভাজা। গরম চায়ে প্রেমের চুমুক আর সঙ্গে একটা করে কড়মড়িয়ে পাঁপড়। উফ! সেসব অবাস্তব লাগছে এখন। কী দিন কাটিয়েছি। কত ভালবাসা, কত আতিথেয়তা, কত কষ্ট আর কত দুঃস্বপ্নের রাতগুলো। সারা জীবনেও ভুলব না। সেসব ভাবলে দুচোখ ফেটে জল আসছে এবার। সন্ধ্যা হল। নির্মেঘ আকাশ আলোকিত হয়ে উঠল জ্যোৎস্নাধারায়। ফেটে পড়ছে প্রকৃতির রূপ। সামনে থালায়সাগর চাঁদের আলোয় মায়াবী হয়ে আছে। রাতের খাওয়া শেষ করে যখন তাঁবুতে ঢুকব, দেখি ৯টা বাজে। আকাশে খণ্ড খণ্ড কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। চাঁদ ঢেকে যাচ্ছে নিম্বাস মেঘের চাদরে। তখনও বুঝিনি এ কীসের সংকেত। আজ বেশিক্ষণ গল্প হল না। সবাই শুয়ে পড়লাম। এখন গভীর রাত। আকাশে মেঘ ডাকছে। একটা বজ্রপাতের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। আর ঘুম এল না। রাত তিনটে থেকে শুরু হল টিপটিপে বৃষ্টি। ভোরের দিকে একবার বাইরে বেরোলাম প্রকৃতির ডাকে। টিপটিপে বৃষ্টি বেড়েই চলেছে ক্রমেই। ভাবলাম পাহাড়ের বুকে ক্ষণেকের মেঘ জমেছে। কেটে যাবে নিশ্চয়ই। এটা সাধারণ ব্যাপার। আবার তাঁবুতে ফিরে এসে শয্যা নিলাম।

১৭ অক্টোবর, ২০২১
পর্বতারোহণের ইতিহাসে একটা কালো দিন। লামখাগা-কানাকাটায় প্রকৃতির রোষে বলি হয়েছে কিছু তরতাজা প্রাণ। অথচ আমরা এসব কিছুই জানি না তখন। সকালে উঠে দেখলাম আকাশের মুখভার। বৃষ্টি কমেছে। ভাবলাম বেলা হলে মেঘও কেটে যাবে। তাই ৮টা নাগাদ ক্যাম্প গুটিয়ে পাড়ি দিলাম মাসার তালের উদ্দেশে। পথে এ রুটের ভয়ংকর চড়াই পার হতে হবে আজ। কষ্টও হবে খুব। শরীরে আস্তে আস্তে শক্তি কমে আসছে। টানা চড়াই চড়তে চড়তে বার বার ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ছি। ঘণ্টা দুয়েক ওইভাবে চড়াই চড়তে চড়তে অনেক উঁচুতে উঠে গেছি তখন। সামনে একটা বিশাল পাহাড়ের দেওয়াল দেখা গেল। এটা মাসারের পথের শেষ চড়াই। এটা ক্রস করে ফেলতে পারলেই ওপারে মাসার তাল। ঘড়িতে ঠিক দশটা কী সাড়ে দশটা হবে। আচমকা বৃষ্টি শুরু হল ঝমঝমিয়ে। আমরা পাহাড়ের ঢালে মাঝপথে দিশাহারা হয়ে পড়লাম। কিছু দূরে একটা পাথরের ওভারহ্যাং দেখে দৌড়ে গিয়ে তার নীচে আশ্রয় নিলাম। কিন্তু বৃষ্টি একনাগাড়ে পড়েই চলল। এক সময় বৃষ্টির ছাঁট এসে ভিজিয়ে দিতে লাগল ওভারহ্যাং-এর নিচেটা। এখানে আর বসে থাকা যায় না।

আচমকা বৃষ্টি একটু কমল। আমরা তাড়াতাড়ি ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম সামনে কিছু দূরে দুটো তাঁবু লাগানোর মত একটা ছোট্ট জায়গা আছে। বিপিনকে বললাম, ভাই, আপাতত একটা তাঁবু ফেলে দাও ওখানে। আকাশের অবস্থা ভাল না। সঙ্গে সঙ্গে রাজকুমার, ললিত আর শিবুদা মালপত্র নিয়ে ছুটল ওদিকে। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যেই যাহোক করে একটা তাঁবু লাগিয়ে ফেলা হল। আমরা সবাই আশ্রয় নিলাম ওখানে। তারপর আবার ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে স্টোভের আগুন জ্বালানো হল। তারপর হাত-পা সেঁকা, বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি। একপ্রস্ত চা পর্বও হয়ে গেল। এইভাবে ঘণ্টাখানেক কাটল। আস্তে আস্তে বৃষ্টি কমে এল। এরপর শুরু হল সাবুর দানার মত মুহুর্মুহু শিলাবর্ষণ। কিছুক্ষণের মধ্যে চারদিক সাদা হয়ে গেল। প্রচণ্ড ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে বাইরে। অবস্থা বেগতিক দেখে বিপিন আর একটা তাঁবু লাগিয়ে দিল ওই দুর্যোগের মধ্যেই। তারপর শিলাপাত কমে গিয়ে আবার শুরু হল বৃষ্টি। আমরা স্যাকগুলো নিয়ে ওই তাঁবুটায় ৩ জনে আশ্রয় নিলাম।

তাঁবু থেকে ক্রমাগত জল লিক করতে লাগল এবার। আমার কাছে একটা বড় রেন পঞ্চু আর কিছু প্লাস্টিক ছিল। সেগুলো দিয়ে তাঁবুর ওপরটা যাহোক করে তাপ্পিও দেওয়া হল। এইভাবে অনেকক্ষণ কাটল। ইতিমধ্যে বৃষ্টি কমে গিয়ে আর একটা নতুন জিনিস শুরু হয়েছে। আর সেটা হল তুষারপাত। প্রবল তুষারপাতের মধ্যে ফেঁসে গেলাম আমরা। মিনিট পনেরোর মধ্যে গোটা ভ্যালিটা ঢেকে দিল তুষারের চাদরে। বাইরের আকাশ ঘন কালো। অবস্থা মন্দ নয়। আবার একদিন লেট হল রুট প্ল্যানে। সারাদিনটা আমাদের ওইভাবেই কাটল। সারাদিন রান্না হল না তাঁবুতে। সবাই খুব চিন্তাগ্রস্ত। এখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামছে। তার সঙ্গে অঝোরধারায় নুয়ে পড়ছে প্রকৃতি। বেড়েই চলেছে তুষারপাত। কী এমন হল যে অক্টোবরের মাঝখানে এমন ভরা দুর্যোগ। একেবারে অপ্রত্যাশিত। তখনও বুঝিনি আগামী দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করে আছে। যদি বুঝতাম তবে তো নিচেই কাটাতাম।

বরফের চাপে আস্তে আস্তে নুয়ে পড়ছে আমাদের তাঁবু। বার বার ঝাড়া দিচ্ছি। তাঁবু পরিষ্কার রাখছি। না হলে আমাদের তুষারসমাধি অবধারিত। তাঁবুর দরজার কাপড়টা হালকা করে খোলা আছে। ওতে ভিতরে তাজা অক্সিজেন সরবরাহ হতে থাকছে। ঠান্ডার চোটে সব বন্ধ করে দিলে ভিতরে সাফোকেশন হয়ে আর এক বিপদ শুরু হয়ে যাবে। ক্রমেই অন্ধকার হল। এক সময় টর্চ নিয়ে এক গা বরফ মেখে বাইরে হাজির হল রাজকুমার। হাতে গরম খিচুরির প্লেট। অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেয়ে নিলাম। তারপর সারা রাত চলল একটানা তুষারপাত। একজন একজন করে জেগে বসে রইলাম রাতভর তাঁবু ঝাড়ার জন্য। সবাই একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লেই বিপদ। বসে বসে প্রচুর চিন্তা হতে লাগল। এ কী মহাবিপদে পড়লাম। এর থেকে উদ্ধার হতে পারব তো! যেভাবে তুষারপাত বেড়েই চলেছে তাতে পিছনের দেওয়ালে বরফ ৪ ফুট জমে গেলেই তুষারধস অবশ্যম্ভাবী। আর একবার যদি তুষারধস নামে তবে সব শেষ! অত্যধিক দুশ্চিন্তা জেঁকে বসেছে মাথার অভ্যন্তরে। ক্রমশ ভারি হয়ে আসছে মাথা। কী করব এখন। নেমে যাওয়ারও কোনও সুযোগ নেই। একটা মুহূর্ত বন্ধ হচ্ছে না স্নো ফল। পুরো ফেঁসে গেলাম। কত দিন এইভাবে চলবে জানি না। এইসব ভাবছি আর বাইরে ঘন ঘন বাজ পড়ছে। বাজের আওয়াজে দুশ্চিন্তার জগৎ থেকে হঠাৎ হঠাৎ সম্বিত ফিরে আসছে। সারারাত এইভাবেই কাটল।

১৮ অক্টোবর, ২০২১
বাইরে ভোর না সকাল সেটা দেখে বোঝার উপায় নেই। চারিদিক ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে। অবিরাম তুষারপাত চলছে তো চলছেই। একটা মুহূর্তও থামে না। চারিদিকে হাঁটুর নীচে বরফ। তাঁবুর ভিতর জল লিক করে ভিজে ঢোল। স্লিপিং ব্যাগ, স্যাক সব কিছু আধভেজা হয়ে গেছে। কী কষ্ট! তাঁবুর ভিতর আমরা তিনজন গোল হয়ে বসে মাথা নিচু করে গভীর চিন্তায় ডুবে আছি। না পারছি উঠতে, না পারছি নামতে— এমন একটা অবস্থায় ফেঁসে বসে আছি। পিছনের চেন খুলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় দেখছি পিছনের পাহাড়টা। মনোযোগ আমার ওদিকে। কতটা বরফ জমছে সেটা বার বার খেয়াল রাখছি। এই বুঝি ঝরে নেমে এল রাশি রাশি বরফের পাহাড়! উফ! বড্ড চিন্তা হচ্ছে! কীভাবে এর থেকে মুক্তি পাব! সকাল থেকে পেটে দানা পড়েনি। সকালে একবার চা আর দুপুরে এক কাপ সুপ খেয়ে আছি। আস্তে আস্তে দুপুর গড়িয়ে আবার সন্ধে নামল।

শিবুদা দুটো করে রুটি আর সবজি দিয়ে গেল দিনের শেষে। আর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে গেল ‘স্যার উপার যানে সে হাম সব মর যায়েঙ্গে। উপার এক আদমি বরফ হ্যায়। তুরন্ত নিচে যানা হ্যায় স্যার। সব কুছ ভিগ গায়া অন্দর। হাম কাল রাত সো নেহি পায়ে। পুরা রাত ব্যায়েঠকে কাটা দিয়া। হাম সব মর জায়েঙ্গে স্যার। কোয়ি লটেগা নেহি আগার ইহা রহে তো।’ এই কথাগুলো আরও ভাবিয়ে তুলল আমাকে। সত্যি সবাই ফিরতে পারব তো! যদি একজন কেউ না ফিরি! বা আমার দলের গাইড, পোর্টারভাইদের যদি কোনও ক্ষতি হয়! কী উত্তর দেব বাড়িতে! কী উত্তর দেব মানুষকে! বা আদৌ উত্তর দিতে ফিরব তো কোনওদিন! উফ আর ভাবতে পারছি না এসব। আমার এক মাসের বাচ্চা, তার মুখটা বড্ড মনে পড়ছে! আমার নিষ্পাপ পুপু সোনা! আর সুলেখা! আমার স্ত্রী! আমায় বার বার বলেছিল এবার না যেতে। কত ঝগড়া করেছি। মা-বাবার কথা ভেবে খুব কষ্ট হচ্ছে। ইস! এসব করে মানুষকে কাঁদিয়ে কেন এলাম! হায় গুরুজি! এবারটা ফিরিয়ে দাও! এটাই শেষবার! আর কোনওদিন এভাবে আসব না! কাতর প্রার্থনা করে চললাম সারা রাত।

আমার গুরুজি শ্রীমৎ স্বামী পরমানন্দ মহারাজ এই হিমালয়ের যোগী ছিলেন। এই হিমালয়ের অন্দর কন্দর তার তপোভূমি। এখানে নিশ্চয়ই মহারাজ সূক্ষ্ম দেহে সর্বত্র ঘুরে বেড়ান। নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রার্থনা শুনবেন। এসবের মধ্যে আবার ডান দিক থেকে ঘন ঘন তুষারধসের শব্দ ভেসে আসছে। কোথায় ঝরছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না অন্ধকারে। খুব ভয় লাগছে। বার বার পিছনের চেন খুলে হেড টর্চ মেরে মেরে দেখছি পিছনের দেওয়ালটা। এই না ঝরে নেমে আসে। সেদিনও সারা রাত এইভাবে ঘুমতে পারলাম না। এবার খাদ্যভাণ্ডারে টান পড়ছে। এভাবে চলবে আর কতদিন। কয়েক দিন এভাবে চলতে থাকলে খাবার শেষ হয়ে যাবে। খাব কী!

১৯ অক্টোবর, ২০২১
এ ক’দিনে হিমালয়ের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা অধিক উচ্চতার পর্বতারোহী দলগুলো তছনছ হয়ে গেছে। কতগুলো প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে। গোটা হিমালয় জুড়ে প্রবল দুর্যোগ। গোটা উত্তরাখণ্ড বন্যায় ভেসে গেছে। কেদারনাথে কয়েক হাজার যাত্রী আটকে। এসব আমরা কিছুই জানি না। ভাগ্যিস আমরা মায়ালী ক্রস করে কেদারনাথ গিয়ে পড়িনি। তাই সমূহ বিপদ থেকে এবারের মত বেঁচে গেলাম। নইলে আর হয়তো ফেরা হত না। সকাল থেকে হঠাৎ দেখি তুষারপাত বন্ধ হয়ে গিয়ে বৃষ্টি শুরু হল। টানা বৃষ্টিতে তুষার কিছুটা কমতে শুরু করল। আজ তৃতীয় দিন এখানে আটকে আছি। বেলা দশটা নাগাদ মনে হল বৃষ্টি কমছে। সাড়ে দশটায় আচমকাই তিন দিনের টানা বৃষ্টি বন্ধ হল একবার। তখনও আকাশ কালো হয়ে আছে। বিপিন বলল, এই সুযোগ, চলো নেমে যাই।

আমরাও নামার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। বেলা এগারোটার মধ্যে লোটাকম্বল গুটিয়ে নামতে শুরু করলাম। নামা বললেই তো আর নেমে আসা যায় না। রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। গোটা রাস্তায় প্রচুর বরফ। প্রচণ্ড স্লিপ করতে লাগল। বার বার আছাড় খেতে খেতে বরফের ঢাল ধরে গ্রিপ করে করে নামতে লাগলাম। বেলা দুটোর সময় নেমে এলাম চৌকি-তে। ততক্ষণে পশ্চিম দিকে মেঘের ফোঁকর থেকে একফালি নীল আকাশ দেখা দিয়েছে। দুর্যোগের কালো মেঘ কাটছে। এবারটা সত্যি তাহলে প্রাণে বেঁচে গেলাম। অশেষ ধন্যবাদ তোমাকে প্রকৃতি। ধন্যবাদ তোমাকেও গুরুজি, আমাকে ক্ষমা করার জন্য।

বাড়ির লোকের কাছে আমরা চারদিন নিখোঁজ। কী ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে পরিবারের লোকজন তা ভেবেই খুব চিন্তা হচ্ছে। দুর্যোগের পর গাঙ্গী অবধি গোটা রাস্তাটা কী অবস্থায় সেটাও জানা নেই। অনেক ধস নেমেছে হয়তো। এবার নিরাপদে লোকালয়ে ফিরে যেতে হবে। আমরা যে রাস্তা দিয়ে এসেছি সেই রাস্তাতেই ফিরব। চৌকি থেকে আরও এগিয়ে চললাম। সারাদিন হেঁটে তাম্বাকুণ্ডের কাছে পড়ল আজকের ক্যাম্প। এখন সবাই অনেকটা স্বস্তি অনুভব করছি। সন্ধের দিকে আকাশ একেবারে পরিষ্কার হয়ে তারারা বেরিয়ে পড়ল। শুধু তুষারে ঢেকে রইল ফেলে আসা দুধগঙ্গা ভ্যালি। স্মৃতির পাতায় কালো ছাপ ফেলে মনের মণিকোঠায় সারা জীবনের স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল ভয়ংকর দুর্যোগের প্রহরগুলি।

তারপর লম্বা লম্বা পথ হেঁটে দুই দিন ধরে নামতে নামতে এসে পৌঁছলাম গাঙ্গী গ্রামে। তাহলে আমরা বিপন্মুক্ত এ যাত্রায়। সে রাতে ঘুট্টু পৌঁছে জানতে পারলাম সব কিছু তছনছ হয়ে গেছে। লামখাগা-কানাকাটা পাসে মারা গিয়েছেন বাংলার অনেক অভিযাত্রী। কেদারনাথে সেনা নামানো হয়েছে। আমরা ৪ দিন ধরে যোগাযোগহীন। বাড়িতে সবাই ধরে নিয়েছে খারাপ খবর। কান্নায় ভেঙে পড়েছিল সকলে। খাওয়াদাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ক’টা দিন। মনোজ উত্তরকাশী থেকে হেলিকপ্টার পাঠানোর বন্দোবস্তও করে ফেলেছিল। আমাদের রেসকিউ করতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল। অথচ এত কিছু ঘটে গেছে তার কিছুই টের পাইনি। অবশেষে পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ। সব ক’টা পরিবারকে ভীষণ নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে এই অভিযান। পরিবারে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পাহাড়ের আর পা না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জানি না তা সত্যিই কতদূর সম্ভব? কারণ, আমার জীবনের দুই শ্রেষ্ঠতম আশ্রয়, পরিবার আর পাহাড়।

চিত্র: লেখক

কেমন কেটেছে তুষারপাতের প্রহরগুলি? দেখুন ভিডিও-তে।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »