নগর বর্ধমানের ৩ কিমি পশ্চিমে কাঞ্চননগর প্রতিষ্ঠা করেন জমিদার কীর্তিচাঁদ। রাখালদাস মুখোপাধ্যায়ের ‘রাজবংশানুচরিত’-এর ২৭ পৃষ্ঠা থেকে জানা যায়, “বর্ধমান নগরের সন্নিকটে কাঞ্চননগর নামক ক্ষুদ্র নগর কীর্ত্তিমান কীর্তিচাঁদেরই স্থাপিত। পূর্ব্বে বর্ধমানে এই রকম সুন্দর নগর আর ছিল না। দু পাশে সুদৃশ্য প্রশস্ত রাজপথ, বিভিন্ন পণ্যদ্রব্যের দোকান, স্বর্ণকার, কংসাকার ও কর্মকারগণের নয়নমুগ্ধকর বিবিধ কারুকার্য্যপূর্ণ দ্রব্য সমূহ এবং স্থানে স্থানে নিত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যপূর্ণ কাঞ্চননগর যেন নিত্যই উৎসবময় বলে অনুভূত হত। বিশেষতঃ, কাঞ্চননগর, সুচারু কারুকার্য্যর কারিগরদের আবাসভূমি বলে বঙ্গদেশে খ্যাতি লাভ করেছিল। এখানকার কর্মকারদের নির্মিত বিবিধপ্রকার দ্রব্য বঙ্গদেশে অতি সমাদরে বিক্রী হত। অতীতে কাঞ্চননগর বিশেষ সমৃদ্ধশালী ও রাঢ়ীয় সভ্যতার কেন্দ্র বলে পরিচিত ছিল। এখনও কাঞ্চননগরে সেই অতীত কীর্তির বহু নিদর্শন বর্তমান। তাই অনেক গবেষকদের মতে কাঞ্চননগরই রাঢ়ের রাজধানী ছিল। তৎকালে এই কাঞ্চননগরই ছিল ছুরি-কাঁচির জন্য বিখ্যাত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এখানকার তৈরী ছুরি-কাঁচির প্রচুর চাহিদা ছিল। তাই কাঞ্চননগরকে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত শিল্প নগরী ‘শেফিল্ড’-এর সমকক্ষ হিসাবে চিহ্নিত করে বলা হত ‘শেফিল্ড অব ইন্ডিয়া’। কাঞ্চননগরে এই ছুরি-কাঁচি তৈরীর পথিকৃৎ ছিলেন ‘প্রেম চাঁদ মিস্ত্রী’। আবার কাঞ্চননগর ছিল পোড়া মাটির শিল্প সমৃদ্ধ নগর। এখানকার বহু মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির শিল্প কার্য শোভিত ছিল যার নিদর্শন এখনও কিছু কিছু পাওয়া যায়। বর্ধমান রাজপরিবার যে বাংলার শিল্প-সংস্কৃতি এবং শিল্প কলার বিশেষ সমাদর করতেন তার বহু নিদর্শন আছে কাঞ্চননগরে। কীর্তিচাঁদ বহু মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেগুলি সবই পোড়া মাটির শিল্পকর্ম সমৃদ্ধ।’’

কীর্তিচাঁদের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ‘রাজার’ সম্মানের অধিকারী হওয়া। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য তিনি এই কাঞ্চননগর প্রতিষ্ঠা করেন, যা নগর বর্ধমান থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। কিছুদিনের মধ্যে এই নগরটি সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে এবং এই নগরের তৈরি ছুরি, কাঁচি, কাঁসা-পিতলের বাসন অখণ্ড বংলাদেশ তো বটেই ভারতবর্ষ এবং বিদেশে সম্মান অর্জন করে। এই নগর পরিকল্পনামাফিক তৈরি করা হয়। সুন্দর সুন্দর পথঘাট, পথের দুধারেই সুসজ্জিত দোকানপাট, সুন্দর সুন্দর অট্টালিকা ও বিভিন্ন কারুকার্যখচিত সামগ্রীর কারিগরগণের আবাসভূমি নির্মিত করা হয়। পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠা করে এই নগরেই নিজ পরিবারের বাসের জন্য এক সুন্দর মনোরম প্রাসাদ নির্মাণ করেন, যার নাম দেন ‘বারদোয়ারী প্রাসাদ’। এখন এই প্রাসাদের অবলুপ্তি ঘটেছে। কিন্তু অতীতের সাক্ষ্য হিসাবে বহু প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কালের পরিবর্তন-বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে সময় সঙ্কেতকে অগ্রাহ্য করে কীর্তিচাঁদের কীর্তিকে ঘোষণা করছে সেই ‘বারদোয়ারী সিংহদ্বার’, যা বর্ধমানের একটি প্রধান সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রূপে আমরা পেয়েছি। তোরণটির উচ্চতা প্রায় ১০ মিটার এবং প্রস্থ ৭ মিটার। তোরণের মাথায় বারোটি ছোট ছোট দ্বার আছে, যেগুলি মন্দিরের মতো দেখতে। এই বারোটি দ্বার হচ্ছে পূর্বদিকে পাঁচটি, পশ্চিম দিকে পাঁচটি, উত্তরদিকে একটি ও দক্ষিণ দিকে একটি। অষ্টম বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনী স্মারক গ্রন্থেও উল্লেখ আছে— “রাস্তার উপরে বারদ্বারী নামে একটি ফটক আছে। প্রবাদ এইরূপ যে, মহারাজ কীর্তিচাঁদ বিষ্ণুপুর রাজকে পরাজিত করে কীর্তিচিহ্ন স্বরূপ এই ফটক প্রস্তুত করিতে আদেশ দেন।”

প্রসঙ্গক্রমে বর্তমানে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে— উক্ত স্থানে ১২টি তোরণদ্বার নির্মিত হয়েছিল, না ১টি তোরণদ্বার নির্মিত হয়েছিল? কিন্তু জনশ্রুতি ও ইতিহাসে চিরপ্রবাহিত নদীর মোহনার পাকদণ্ডী পথে বার বার ঘুরপাক খেতে হয় দর্শক, পাঠক এবং গবেষকদের। কারণ এই তোরণদ্বারের উভয় দিকে যে শ্বেতপাথরের শিলালিপি আছে, তাতেই এই প্রমাদ। একদিকে শিলালিপিতে উপরে দেবনাগরী এবং নীচে বাংলায় আর একদিকে উপরে ইংরেজি ও নীচে ফারসি ভাষায় উল্লেখ আছে, যার বাংলা অংশটি উল্লেখ করছি, “বর্ধমানপতি বীরবর কীর্তিচাঁদ চিতুয়া ও বরদায় জমিদার শোভা সিংহের পাশবিক অত্যাচারের প্রতিশোধার্তে তার ভ্রাতা হিম্মত সিং এবং রহিম খাঁ কে সম্মুখ সমরে ইংরাজী ১৭৩৭ সালের কিছুকাল পূর্বে পরাজিত করিয়া বর্ধমানের নিকট স্বস্থাপিত কাঞ্চননগর প্রবেশ দ্বার বারদোয়ারী নামক স্থানে দ্বাদশটি বিজয় তোরণ নির্মাণ করেন।’’ তন্মধ্যে একটি মাত্র তাঁর সেই প্রাচীন কীর্তি ঘোষণা করছে বর্তমানে। শিলালিপি দেখে ধারণা করা যায়, তা কীর্তিচাঁদের আমলে লেখা হয়নি। নিশ্চয়ই তাঁর পরবর্তী কোনও রাজা ওই ফলক স্থাপন করেন। কারণ ফলকের ওপর ফলক স্থাপনের সময়ের কোনও উল্লেখ নাই। ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে কীর্তিচাঁদের জীবনাবসান হয়। এখন প্রশ্ন, যদি দ্বাদশটি তোরণ থাকত তা হলে একটি অবশিষ্ট রইল আর এগারোটির কোনও চিহ্ন নেই, এমনকি ভিতের গাঁথনিরও কোনও অস্তিত্ব থাকবে না, এটা সম্ভব নয়। তা ছাড়া কীর্তিচাঁদের সময়ের যে বর্ণমালা বাংলায় ছিল, শিলালিপিতে খোদিত বাংলা বর্ণমালার পার্থক্য অনেক। শিলালিপির বর্ণমালা অনেক আধুনিক। সুতরাং কীর্তিচাঁদের পরবর্তীকালের কোনও রাজপুরুষ কর্তৃক লিখিত হয়েছে।
আবার ‘বার’ কথাটি চলিত ভাষা, যার অর্থ ‘বাহির’। আবার সেই ‘বার’ কথাটি ‘১২’ সংখ্যাও বোঝায়। কীর্তিচাঁদ বর্ধমান শহরের বাহিরে প্রসাদ নির্মাণ করেন বলেই তার নাম দেন ‘বারদোয়ারী’। আসলে তিনি একটি মাত্র সিংহদ্বার নির্মাণ করেন এবং এই দ্বারের ওপর ১২টি ছোট ছোট দ্বার নির্মাণ করেন। যে জন্য এই বিভ্রান্তি।

অন্যান্য সব জেলার মতোই বর্ধমান জেলার সবচেয়ে প্রাচীন শিল্পের নাম লৌহ শিল্প। এবং এ নিয়েই বর্তমান বর্ধমানে শহরের লাগোয়া সুপ্রচীন স্থান কাঞ্চনগরের দেশজোড়া নাম। প্রবীণেরা বলেন, কাঞ্চননগরের ছুরি কাঁচি অখন্ড ভারতে সবিশেষ কদর লাভ করেছিল। শ’খানেক বছর আগেও কাঞ্চননগরের ছুরি, কাঁচি, তির, উঘা, ছুঁচ (বস্তা সেলাই-এর), বঁটি, সাঁড়াশি, কাতুরি, বাকনল প্রভৃতি তৈরি করে এখানকার কর্মকারেরা অসামান্যতার পরিচয় দিয়েছেন। কাঞ্চননগরের কর্মকার শিল্পীদের ঘিরে সেই গল্পটি এখনও প্রচলিত আছে। মহারাজা এক শিল্পীকে একটি শ্রেষ্ঠ ছুরি নির্মাণ করতে বলেছিলেন। কিন্তু নির্মিত ছুরিটি দেখে তিনি কর্মকার শিল্পীকে তো সমাদর করলেনই না, বরং বড় অবজ্ঞা করেই ছুরিটি একটি গাছের দিকে ছুড়ে দিলেন। ছুরিটা গাছের গায়ে লাগল কি না তিনি লক্ষ্য করলেন না। পাঁচ-সাত দিন পরে রাজা দেখলেন, গাছটা শুকিয়ে গেছে। একজন ভৃত্যকে ডেকে বিষয়টা জানতে বললেন। ভৃত্যরা গাছটি সজোরে নাড়তেই শুকনো গাছটি মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেল। মহারাজা অবাক হয়ে কাছে এলেন। দেখলেন কর্মকারের সেই ছুরিটি তার কাছেই পড়ে আছে। ব্যথিত হৃদয়ে রাজা শিল্পীকে ডাকলেন। এবং তাঁকে যথোচিত পুরস্কৃত করলেন। হয়তো এটা নিছকই গল্প— কিন্তু এই রকম আশ্চর্য মনুষ্য-দুর্লভ ছুরি নির্মাণ করার ক্ষমতা একদিন কাঞ্চননগরের কর্মকার শিল্পীদের ছিল। ষোড়শ শতাব্দীর চৈতন্যসঙ্গী গোবিন্দ দাস কর্মকার এই কাঞ্চননগরেরই অধিবাসী ছিলেন। তিনি চৈতন্যের দক্ষিণ ভ্রমণের কথা তাঁর ‘করচা’ গ্রন্থে লিখে গেছেন। আত্মপরিচয়ে গোবিন্দ দাস বলেছেন— ‘অস্ত্র হাতা, বেড়ি, গাড়ি জাতিতে কামার’। অর্থাৎ সেই প্রাচীন কাল থেকেই এখানের কর্মকারেরা অস্ত্র তৈরি করতেন এবং নিত্যব্যবহার্য খুন্তি, হাতা, বঁটি ইত্যাদি নির্মাণ করতেন। শ’খানেক বছর আগেও এখানের জিনিসের চাহিদা বড় বেশি ছিল। বিশেষ নকশা আঁকা জাঁতি ও তির একদা খুব সুখ্যাতি অর্জন করেছিল। এখানে প্রবীণ কর্মকার শিল্পীদের মধ্যে এখনও সচল আছেন রূপকুমার মণ্ডল ও তাঁর ভাই দিলীপকুমার মণ্ডল।

কাঞ্চননগর প্রধানত লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের জন্যই বিখ্যাত। এখনও সেখানে গেলে পুরোনো শাল দেখতে পাওয়া যায়। শালে হাপর, নেহাই, জাঁতা, চৌকি বর্তমান। কিন্তু নিতান্তই আধুনিক যন্ত্রদানবের আক্রমণে এই কর্মকার শিল্পীরা বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছেন। কলকারখানায় উৎপন্ন দ্রব্যাদির সঙ্গে তাঁরা টিকে থাকতে পারছেন না। তাই অনেকে এই বৃত্তি ছেড়ে দিয়েছেন বা ছেড়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ অন্য বৃত্তি গ্রহণ করছেন।
এখন যে ক’ঘর শিল্পী আছে, তারা বড় মুমূর্ষু। নানা দুঃখের কথা তাঁরা জানালেন। কাজের কথায় একযোগে বললেন, এখন যে-টুকু দ্রব্য নির্মিত হচ্ছে, তাতে লাগে প্রধানভাবে ইস্পাত। এছাড়া লোহা বা লোহার শিক বা তার প্লেনসিট, কোনও কোনও কাজে পেতলের টুকরোও লাগে। এছাড়া পাথুরে কয়লা কিংবা কাঠকয়লা, কখনও কোনও কাজের জন্য কোনও পশুর বিশেষত মোষের শিং বিশেষ দরকার হয়। স্বাবলম্বী শিল্পীরা এগুলি প্রধানত কলকাতা ঠনঠনিয়া বাজার থেকে আনেন। কোনও কোনও জিনিসের জন্য যেতে হয় কলকাতার বড়বাজার কিংবা কলুটোলা। তবে অতি সম্প্রতি এসব জিনিসের এজেন্ট বর্ধমান শহরে গজিয়ে উঠেছে। সেখান থেকে এগুলি আনা যায়, তবে দাম অনেক বেশি।
অন্যান্য সব স্থানের মতোই লোহা বা ইস্পাতকে শালে পুড়িয়ে হাতুড়ি দিয়ে প্রচণ্ড পরিশ্রমে দ্রব্যাদির ঢঙে আনতে হয়। ছুরির বাঁটের জন্য মোষের শিং উৎকৃষ্ট। সাধারণত কলুটোলা থেকে শিং এনে এখানের শিল্পীরাই বাঁট তৈরি করে নিতেন। এখন ভাল কাঠ থেকে বাঁট তৈরি হচ্ছে। এক সময় পেতলের বাঁটের খুব প্রচলন ছিল। কিন্তু প্রচণ্ড দামের জন্য পেতল উঠতে বসেছে। শিল্পীরা বলেন, এখনও অনেকেই সেকালের মতো একালেও বিবিধ আকারের ছুরি-কাঁচি তৈরি করেছেন। আকারে ছোটগুলি দু’ইঞ্চির সমান। সবচেয়ে বড় প্রায় দু’ফুট। কিন্তু শিল্পীদের দুঃখ, উপযুক্ত ফিনিশিং করেও দাম মিলছে না। কারখানার জিনিসের মতো এগুলির জৌলুশ থাকে না, সেটাই এই শিল্পের প্রতি খদ্দেরকে বিমুখ করছে। তারপর মহাজনদের কাছে ঠিক সময়ে টাকা না পাওয়া, বা অর্থকষ্ট, খদ্দেরদের কম দাম দেবার প্রবণতা তো আছেই। পর্যটনকারীরা এখন কাঞ্চননগরের দেবী কঙ্কালেশ্বরীকে দেখতে আসেন, গোবিন্দদাসের মেলায় যোগ দেন, এখানের বারদুয়ারী, নবরত্ন মন্দির এবং বহু প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখে যান। কিন্তু একটা ছুরি বা কাঁচি কেনেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শিল্পী রূপকুমার মণ্ডল বলেছিলেন, ‘‘অর্থাভাবে কোনও মেলায় আর প্রদর্শনী করা যাচ্ছে না। এমনকি অধুনা বিখ্যাত কাঞ্চন উৎসবেও তাঁদের দ্রব্যের প্রদর্শনীর জন্য কোনও ব্যবস্থা করা হয়নি। সরকারি উদ্যোগও দেখিনি। আমরা কী করব। বড় বিভ্রান্ত হচ্ছি।’’
চিত্র: লেখক ও গুগল






