Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

কৃষ্ণকান্তর দলিল বলছে, রামমোহন তিব্বতে যাননি!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। সুভাষবাবুর গোপনে ভারত-ত্যাগ নিয়ে তীব্র আলোড়িত দুনিয়া। এমনই সময়ে ১৯৪১ সালের বৃষ্টিভেজা দিনে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার একটি মারকাটারি প্রতিবেদন রাজা রামমোহন রায়ের তিব্বত গমন বিষয়ে বহুচর্চিত দাবিতে জল ঢেলে দিল! হইহই পড়ে গেল বঙ্গ সুশীল সমাজে। কোনও এলেবেলে পত্রিকা নয়, খোদ ‘ভারতবর্ষ’ ছেপেছে। তা হলে তো এর কিছু সারবত্তা আছে। তবে তিব্বত-প্রিয় বাঙালি অত সহজে সব মেনে নেবে তাও কি হয়? ফলে যে প্রতিবেদন ভারতবর্ষ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ভাদ্র সংখ্যায় প্রকাশ করেছিল, সেটি নিয়ে প্রশ্ন না তুলেও বাঙালিরা কিন্তু কায়মনোবাক্যে মেনে নিয়েছেন বা নিচ্ছেন রামমোহন তিব্বতে গেছিলেন। এখানে যুক্তি উহ্য, আবেগ গ্রাহ্য!

তিব্বত— বিস্তীর্ণ ঢেউখেলানো পাহাড়, ধূ ধূ হাওয়া বয়ে চলা সমতলভূমি, গুরুগম্ভীর গুম্ফা, প্রবল শীত ও চোখ ঝলসানো সূর্যালোকে গা পুড়ে যাবে এমন ভূভাগ। এই ভূখণ্ডের অবিরত হাতছানিতে বহু অভিযাত্রীর দুরবিন খুঁজে নিয়েছে দুর্গম পথের ঠিকানা। এই তালিকায় কিছু বাঙালিও আছেন। তবে বিতর্কের কেন্দ্রে রামমোহনের তিব্বত যাত্রা। তিনি জীবদ্দশায় এই বিতর্কের কোনও সমাধান করেননি। বস্তুত তিনি যে একজন সীমান্ত কূটনীতিক, এই বিষয়টিও গোপন রেখেছিলেন।

তিব্বত ও ভারতের মাঝে ছোট্ট একটি দেশ— ভুটান। এ দেশকে বহু প্রাচীন সময় থেকে ভোট দেশ বলা হয়। দেশটি পশ্চিম বাংলা ও অসমের লাগোয়া। উনিশ শতকে এই ভোট দেশের সঙ্গে সীমান্ত-বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিল ব্রিটিশ তথা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সে এক গরম সময়।

সীমান্তের ওপারে কুতকুতে চোখে ভুটানি সেনারা তলোয়ারে জিভ ঘষছিল (এ তাদের এক যুদ্ধরীতি)। মাঝেমধ্যে সীমান্ত পার করে ভুটানি সেনা ঢুকছিল ভারতের জমিতে। ভুটানে ঢুকে হুটহাট যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। দেশটার রাজধানী পুণ্যাক্ষ বহু উঁচুতে অবস্থিত— ঠিক যেন আকাশের বুকে ঝুলছে! ফলে ভুটানি সেনার বেয়াদপি হজম করছিল ব্রিটিশরা। এমন সময় সীমান্ত-সমস্যা সমাধানে ব্রিটিশদের তরফে দুই বাঙালি কৃষ্ণকান্ত বসু ও রামমোহন রায়ের ভোট দেশ যাত্রা। এই ভোট দেশের ছত্রে ছত্রে তিব্বতি শাসন ও সংস্কৃতির ছাপ সুস্পষ্ট। বাঙালিরা মনে মনে ধরেই নিলেন রামমোহন রায় তিব্বতেই গেছিলেন।

তিব্বত-ভুটানের খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রাহক ও বিশেষজ্ঞ কৃষ্ণকান্ত বসু। বাঙালিরা না করলেও গুণীর মান রাখতে জানা ব্রিটিশরা তাঁর গবেষণাপত্র যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে প্রকাশ করেছিল ‘Political Missions To Bootan’ নামে বইতে। এই বইটির একটি অংশ ‘Account Of Bootan’ -এর লেখক কিষেনকান্ত বসু (কৃষ্ণকান্ত বসু)। সেই রিপোর্ট ব্রিটিশদের তিব্বত অভিযানে প্রভূত সাহায্য করে। “Political Missions to Bootan”— মূল বইটি ১৮৬৫ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় এবং এতে ১৯শ শতকে ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে ভুটানের চারটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দৌত্যের বিবরণ রয়েছে।

প্রথম বিবরণের লেখক স্যার অ্যাশলি ইডেন (Sir Ashley Eden)। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ প্রশাসক। ১৮৬৩ সালে তাকে ভুটানে পাঠানো হয়েছিল শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি সম্পাদনের জন্য। তাঁর এই মিশন ব্যর্থ হয়। ভুটানি রাজদরবারে ইডেন সাহেবের অপমানের বদলা নিতে মরিয়া ব্রিটিশরা। ফলে ১৮৬৪ – ১৮৬৫ সালে অ্যাংলো ভুটান যুদ্ধ (ডুয়ার্স ওয়ার) হয়। সেই যুদ্ধে ব্রিটিশরা বিজয়ী হয় এবং ভুটান তাদের বেশ কয়েকটি সীমান্ত অঞ্চল ব্রিটিশদের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়।

দ্বিতীয় বিবরণের লেখক ক্যাপ্টেন আর. বোইলো পেম্বারটন (Captain R. Boileau Pemberton) (১৮৩৭ – ১৮৩৮ সালে পেম্বারটন ভুটানে যান এবং একটি কূটনৈতিক মিশন পরিচালনা করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ভুটান ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পাদন। কিন্তু এই মিশনও সফল হয়নি, এবং চুক্তি সম্পাদন সম্ভব হয়নি।

তৃতীয় বিবরণের লেখক ডা. উইলিয়াম গ্রিফিথস। তিনি ছিলেন একজন চিকিৎসক যিনি পেম্বারটনের মিশনের অংশ হিসেবে ভুটানে যান। তাঁর ডায়েরিতে ভুটানের ভৌগোলিক, আবহাওয়াগত ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ রয়েছে।

চতুর্থ বিবরণের লেখক বাবু কৃষ্ণকান্ত বোস (১৮১৫)। তাঁকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ থেকে ভুটানে পাঠানো হয়েছিল। তার মিশনের উদ্দেশ্য ছিল কিছু নির্দিষ্ট সমস্যা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা। তাঁর রিপোর্টটি এই গ্রন্থে অনুবাদসহ সংকলিত হয়েছে। এই বিবরণটি সবচেয়ে প্রাচীন এবং প্রথম ব্রিটিশ-ভুটান সংলাপের লিখিত দলিল হিসেবে ধরা হয়।

কৃষ্ণকান্ত বসুর যাত্রাসঙ্গী রামমোহন রায় বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব, পণ্ডিত মানুষ। অকুতোভয়। বলশালী। খাদ্যরসিক। তিনি যখন ব্রটিশ কর্মচারী হয়ে রংপুরে (বাংলাদেশের একটি প্রশাসনিক বিভাগ) কর্মরত, সেই সময়েই সীমান্ত সমস্যা সমাধানে অংশ নিয়েছিলেন। তারপর?

যতদূর জানা যায়, রামমোহন রায় তাঁর কূটনৈতিক দৌত্যকার্য অসমাপ্ত রেখেই চলে এসেছিলেন। তিনি কেন তড়িঘড়ি ফিরেছিলেন সে বিষয়ে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। তবে কৃষ্ণকান্ত বসু ভ্রমণ করেছিলেন মো-চু আর ফো-চু নদী যেখানে মিশেছে সেই আকাশের বুকে ভেসে থাকা রাজধানী পুণ্যাক্ষ। শহরটির বর্তমান নাম পুনাখা। আধুনিক ভুটানের একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র হল ওয়াংদিফোডরং। কৃষ্ণকান্ত বসুর লেখায় এই শহরটির নাম ওয়াংদিপুর! এখানেই তিনি ভুটান রাজার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়েছিলেন।

পুণ্যাক্ষ। বর্তমান নাম পুনাখা।

তৎকালীন ভুটানের রাজার তরফে লেখা কিছু চিঠি থেকে ভারতবর্ষ পত্রিকায় “রামমোহন রায়ের তিব্বত গমন” শিরোনামে একটি গবেষণা প্রবন্ধের লেখক ডক্টর. শ্রী সুরেন্দ্রনাথ সেন। এই প্রবন্ধে বহু পুরনো চিঠি ও নথি খুঁজে তিনি রামমোহনের তিব্বত গমন নয় ভুটান গমনকেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ওই সকল চিঠি থেকে তিনি গবেষণায় উল্লেখ করেন,

(১) “৩০৮ শকের ই১৭ কার্ত্তিক দেবরাজা কুচবিহারের কমিশনরের নিকট যে চিঠি লিখিয়াছেন তাহাতেও রামমোহনের নাম নাই, কৃষ্ণকান্তের নাম আছে। অথচ ১৮১৫ সালের নবেম্বরের পত্রে রামমোহনের নাম এতবার এমনভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে যে তিনি যে কৃষ্ণকান্তের সঙ্গে ভোটানের রাজধানীতে গিয়াছিলেন তাহাতে সন্দেহ থাকে না। যদি তিনি কেবল দেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে সরকারের অজ্ঞাতে কৃষ্ণকান্তের সঙ্গী হইয়া থাকিতেন তবে সকল কথা বুঝাইয়া তাঁহাকে রঙ্গপুরে পাঠাইবার কোন অর্থ হয় না। ডিগবীর দেওয়ান বলিয়া ভোটানের কর্তৃপক্ষের রামমোহনের প্রতি বিশ্বাস না থাকিবার কথা, অথচ সীমান্ত সম্বন্ধে তিনি ওয়াকিবহাল ব্যক্তি। এই জন্যই কি কৃষ্ণকান্তকে সাহায্য করিবার জন্য তাঁহাকে ভোটানে পাঠান হইয়াছিল? এই অনুসন্ধান সত্য হইলে কৃষ্ণকান্তই ইংরেজ দূত ছিলেন। রামমোহন তাঁহার সহকারী ছিলেন মাত্র। সুতরাং স্কট সাহেব তাঁহার চিঠিতে একজন উকিলের কথাই বলিয়াছেন, উকীলের সঙ্গীয় লোকদিগের কথা বলেন নাই। আর যদি রামমোহন ব্যক্তিগতভাবে কেবল দেশ ভ্রমণের অভিপ্রায়েই ইংরেজ দূতের সঙ্গে গিয়া থাকেন, যদিও তাহা সম্ভব বলিয়া মনে হয় না, তবে হয়ত কৃষ্ণকান্তের সঙ্গ পরিত্যাগ করিবার পর অন্যত্র ভ্রমণ করিয়া থাকিতে পারেন। কিন্তু এই অনুমান প্রমাণ সাপেক্ষ।”

(২) “রামমোহনের ভোটান যাত্রাও তখনকার দিনে তিব্বতভ্রমণ বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকিতে পারে। ভোটান তখন রাজনৈতিক-হিসাবে তিব্বতের অধীন অথবা তিব্বতের অংশ। সাধারণের নিকট ভোটানও যে তখন লাসা রাজ্যের অংশবিশেষ বলিয়া বিবেচিত হইত তাহার প্রমাণ আছে। ইংরেজী ১৭৭৯ সালে ভোটানের দেবরাজার দূত নিরপুর পিয়াগা একখানি পত্রে লিখিয়াছেন-‘পূর্ব্বে লাসার রাজ্য ও বাঙ্গালা দেশের লোকের মধ্যে প্রচুর ব্যবসা বাণিজ্য হইত এবং হিন্দু ও মুসলমানগণ বিনা বাধায় দুই রাজ্যে যাতায়াত করিত। মধ্যে লড়াইর জন্য যাতায়াতের বাধা হয় সম্প্রতি দেবধৰ্ম্ম লামা রিম্বোচে ও ইংরেজ কোম্পানীর মধ্যে দৃঢ় বন্ধুত্ব হইয়াছে, দেবরাজা আর হিন্দু ও মুসলমান-গণের ব্যবসায়ে এবং ভ্রমণে কোনরূপ বাধা দিবেন না।’ বলা বাহুল্য যে লাসায় কখনও বাঙ্গালী হিন্দু-মুসলমানের অবাধ যাতায়াত ছিল না। বাঙ্গালী বণিকেরা ভোটানে যাইত এবং ভুটিয়ারা উত্তর বাঙ্গালায় ব্যবসায়-সূত্রে যাতায়াত করিত; সুতরাং নিরপুরে পিয়াগা এখানে ভোটানকেই লাসার রাজ্য বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। হয়ত ভোটানের দৌত্যের পর এই কারণেই সাধারণে রামমোহনের তিব্বত ভ্রমণের কথা প্রচারিত হইয়া থাকিবে। কিন্তু পূর্ব্বেই বলিয়াছি যে, সরকারী কার্য্যোপলক্ষে তিব্বতের রাজধানী লাসায় যাওয়াও তাঁহার পক্ষে অসম্ভব ছিল না। চীনের আম্বানদিগের নিকট যে পত্র লেখা হইয়াছিল ঐ সম্পর্কে কোন দেশীয় কর্মচারীকে লাসায় পাঠাইবার প্রয়োজন হইয়া থাকিলে রামমোহনের ন্যায় ভোটান সম্বন্ধে অভিজ্ঞ বহু ভাষাবিদ ব্যক্তিরই ঐ কার্য্যের জন্য নির্বাচিত হওয়া অধিকতর সম্ভব।”

(৩) ”রামমোহন কোন্ পথে ভোটানে গিয়াছিলেন তাহা তাঁহার সহযোগী কৃষ্ণকান্তের বিবরণ হইতে জানা যায়। কৃষ্ণকান্ত গোয়ালপারা, বিজনী, সিডলি ও চেরঙ্গের পথে পুনখে দেব রাজার দরবারে পৌঁছিয়াছিলেন। সুতরাং তাঁহার সহযাত্রী রামমোহনও ঐ পথে ভোটান গিয়াছিলেন সন্দেহ নাই, কিন্তু তিনি কবে কোন্ পথে রঙ্গপুরে ফিরিয়াছিলেন, পুনরায় ভোটান গিয়াছিলেন কি-না তাহা এখন আর জানিবার উপায় নাই। তাঁহার জীবনের এই অধ্যায় বাস্তবিকই রহস্যাবৃত।”
[গবেষণাপত্রটির কিছু অংশ দেওয়া হল। বানান অপরিবর্তিত]

ভুটান ফেরত রামমোহনের সামাজিক বিপ্লবের আগুনে ভারত জ্বলছিল। তাঁর ভুটান যাত্রার সঙ্গী কৃষ্ণকান্ত বসু তথা ‘বাবু কিষেনকান্ত বোস’ যে কোথায় কোন চুলোয় ভবলীলা শেষ করেছিলেন, তার হদিস মেলা কঠিন। কারও তেমন দায় ছিল না।

চিত্র: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 − five =

Recent Posts

সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার…

মনু-পরাশর-বৃহস্পতি-কৌটিল্যদের অনুশাসন এসে নারী প্রগতির রাশ টেনে ধরল। নারীর শিক্ষালাভের ইতি ঘটল, অন্তঃপুরে বাস নির্দিষ্ট হল তাঁর জন্য। তাঁকে বাঁধা হল একের পর এক অনুশাসনে। বলা হল, স্বাধীনতা বলে কোনও পদার্থ থাকবে না তাঁর, ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি’! কুমারী অবস্থায় পিতা-মাতার অধীন থাকবে সে, বিয়ের পর স্বামীর, বার্ধক্যে সন্তানের। ধাপে ধাপে তাঁর ওপর চাপানো হতে লাগল কঠিন, কঠিনতর, কঠিনতম শাস্তি।

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

গরিব হওয়ার সহজ উপায়

এককালে পর্তুগিজ-মগরা আমাদের নিম্নবঙ্গ থেকে দাস সংগ্রহ করত মালয়-বার্মাতে শ্রমিকের কাজের জন্য, ইংরেজ সাহেবরাও কিনত গোলাম। আজ আবার মানুষ সস্তা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকের দরকার নেই। খোলাবাজারে নিজেরাই নিজেদের কিনছে দেশের মানুষ। মানুষ বিক্রির মেলা বসে এখন গ্রামগঞ্জের হাটে হাটে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহাশ্বেতা দেবী: স্বনামে চিহ্নিত অনশ্বর প্রতিভা

গ্রামশি-বর্ণিত ও পরবর্তীতে বহুলচর্চিত ‘সাব অলটার্ন’-এর আগেই মহাশ্বেতার লেখায় ব্রাত্যজনসংহিতা মূর্ত; ‘অরণ্যের অধিকার’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭-এ। আর সাব অলটার্ন-তত্ত্ব প্রথম দানা বাঁধছে ১৯৮২-তে জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, রণজিৎ গুহ, গৌতম ভদ্র, শাহেদ আমিন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়দের সঙ্কলন প্রকাশের মাধ্যমে। অবশ্য তার বহু আগেই ইতিহাস রচনায় সাব অলটার্ন চেতনায় স্থিতধী দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথকে। স্বামী বিবেকানন্দ মূর্খ, চণ্ডাল ও দরিদ্র ভারতবাসীর মাহাত্ম্য বুঝিয়ে গেছেন, আর বিভূতিভূষণকেও আমরা সামগ্রিক বিচারে প্রান্তিক মানুষের কথাকার রূপেই পাই। কিন্তু মহাশ্বেতা আরও ব্যাপক, গভীর, তন্ময়, নিবিড়, ও নিঃসন্দেহে দলিত জনতার কথাকার।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সারদাদেবী: এক অনন্যা মাতৃরূপা

ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে ও বধূ হয়ে তিনি কিনা মুসলমান ঘরামি আমজাদকে খেতে দিয়ে তার এঁটোকাটা নিজের হাতে পরিষ্কার করেন! বিধর্মী খ্রিস্টান নিবেদিতার সঙ্গে বসে আহার করেন! আর তাঁর চেয়েও বড় কথা, সে যুগের বিচারে বিপ্লবাত্মক ঘটনা, স্বামীর মৃত্যুর পর যে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন তিনি, বিধবাবিবাহের প্রবর্তক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-ও যা কল্পনায় আনতে গেলে নির্ঘাত মূর্ছা যেতেন, লালপেড়ে শাড়ি আর সোনার বালায় ভূষিতা থাকতেন তিনি! আজকের উচ্চশিক্ষিত সমাজেও ক’জন পারবেন এ-কাজ করতে, বা নিদেন এ কাজকে সমর্থন করতে?

Read More »
মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »