Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

গ্রিন হাইড্রোজেন গবেষণা তুঙ্গে

‘সিলভার লাইনিং’ বোধহয় একেই বলে। ঘনকৃষ্ণ আকাশে রুপোলি রেখা। যুদ্ধের ধূম্রজালের মধ্যে স্বস্তির সুখবর।

ফেব্রুয়ারি মাসের ২৪ তারিখ থেকে চলছে রুশ আর ইউক্রেনের যুদ্ধ। পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হবার পরেও কোনও লক্ষণ নেই বিরামের। আর এই সময়কালে হু হু করে বেড়েছে তেল আর গ্যাসের দাম। স্বভাবতই মানুষ এখন খুঁজছে সেই জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প। এইখানেই প্রবলভাবে উঠে আসছে গ্রিন হাইড্রোজেনের নাম। গবেষণা সংস্থা রাইস্ট্যাড এনার্জি জানাচ্ছে, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ ও বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিগুলির চাহিদা বাড়ছে। আর এগুলির সামনের সারিতে রয়েছে গ্রিন হাইড্রোজেন। বাড়ছে তাকে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ করার জন্য গবেষণা। ইতোমধ্যেই এর ওপর গবেষণার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৩০ কোটি ইউরো বরাদ্দ করেছে। যা ২০৩০ সাল নাগাদ ১৯০ কোটি ইউরোতে দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে। গ্রিন হাইড্রোজেন ঠিক কীরকম? কীভাবে উৎপাদন হয় এর?

আমরা জানি, জলের অন্যতম উপাদান হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন। জলের তড়িৎ বিশ্লেষণের ফলে ক্যাথোডে জমা হয় হাইড্রোজেন। কিন্তু এই তড়িৎ বিশ্লেষণে যে তড়িৎ প্রযুক্ত হয়, তা সাধারণ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদিত তড়িৎ হলে গ্রিন হাইড্রোজেন পাওয়া হয় না। গ্রিন হাইড্রোজেন পেতে হলে প্রযুক্ত তড়িৎকেও হতে হবে সৌরবিদ্যুৎ বা বায়ুবিদ্যুৎ। কেন না তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত হয় কয়লা বা পেট্রোল বা গ্যাস। যা অবশ্যম্ভাবীভাবে বাতাসে ছাড়ে কার্বন যৌগ। আর এইভাবে ঘটায় বায়ুদূষণ। গ্রিন হাইড্রোজেন হল সেরকমই এক বস্তু যার উৎপাদনে বায়ুমণ্ডলে কোনওভাবে কার্বন যৌগের নিঃসরণ ঘটায় না। স্বভাবতই এই ধরনের একটি বস্তু বানানোর খরচ যথেষ্ট বেশি। এই খরচ কমানোর চেষ্টা চলছে। আশা করা যাচ্ছে, তা কমবে এবং এ সাধারণ পেট্রোল ও গ্যাস ব্যবহারকারীর মধ্যে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।

কয়লা, পেট্রোল ও গ্যাস সহ প্রতিটি জীবাশ্ম জ্বালানির দহনে উৎপন্ন হয় কার্বন মনোঅক্সাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইড। যে দুটি গ্যাস স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। শ্বাসকষ্ট, সিভিডি (কার্ডিও ভ্যাসকুলার ডিজিজ) ও অন্যান্য অসুখ ঘটায় এই দুটি গ্যাস। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ায় এরা। যার ফলে হয় বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং। যা এক মারাত্মক বিপদ হিসেবে নেমে এসেছে এই পৃথিবীর বুকে। একে ঠেকাতে ১৯৯২ সালের কিয়োটো প্রোটোকল থেকে অনেক সম্মেলন ইত্যাদি হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েই গেছে। বেড়েছে জলস্তর। গলেছে উত্তর মেরুর বরফ। বিপন্ন হয়ে পড়েছে মুম্বাইয়ের মত সমুদ্রের তীরবর্তী শহরগুলি। বিপন্ন হয়ে পড়েছে মেরুভালুকের মত উত্তর মেরুর প্রাণীকুল। একটি হিসাব বলছে, ১৯৮০-র পর থেকে প্রতি দশকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়েছে কমপক্ষে ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে।

এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ, পরিবহণ ক্ষেত্রে আমাদের চিরাচরিত জ্বালানির প্রতি নির্ভরতা। এগুলির দাম এখনও পর্যন্ত গ্রিন হাইড্রোজেনের মত অচিরাচরিত জ্বালানির তুলনায় অনেকটাই কম। মূলত দামের কারণেই ধাক্কা খেয়েছে এই গ্রিন হাইড্রোজেন ব্যবহার। পরিবহণ ব্যবস্থা থেকে গেছে পেট্রোল ও গ্যাস নির্ভর হয়ে। আর সেখানেই টেক্কা মেরেছে রাশিয়া। ইংল্যান্ড, জার্মানির মত ইউরোপীয় দেশগুলি প্রচণ্ড পরিমাণে নির্ভর করে থাকে রাশিয়ার পেট্রোল ও গ্যাসের ওপর। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তারা রাশিয়ার গ্যাস-পেট্রোল কিনছে।

Advertisement

এই পরিপ্রেক্ষিতে গ্রিন হাইড্রোজেনের কদর বাড়ছে। কিন্তু একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এর উৎপাদন খরচ। যে-কারণে পেট্রোলিয়াম উৎপাদনকারী দেশগুলি বিশ্বরাজনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করছে। অনেকেই জানি না যে, সৌদি আরবের পর বিশ্বের সর্বোচ্চ তৈল উৎপাদানকারী দেশ হল রাশিয়া। রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনে পশ্চিম ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলি। এই দেশগুলি আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও সঙ্গী। তাই যখন রুশ-ইউক্রেন সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে আর্থিক অবরোধ জারি করলেন, তখন মনে করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় বন্ধুদেশগুলি সেই নিষেধাজ্ঞাকে মান্যতা দিয়ে রাশিয়া থেকে তেল-গ্যাস কেনা বন্ধ রাখবে। কিন্তু কোথায় কী। স্যাম চাচার বন্ধুত্ব থেকে এরা যে নিজের দেশের অর্থনৈতিক চাকাটিকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তা প্রমাণিত হয়ে গেল আর-একবার। এই চাকাটিকে সচল না-রাখতে পারলে জনগণ যে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করবে, তা বিলক্ষণ জানেন নেতারা। আর তাই, এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা ছাড়া অন্য উপায় নেই তাঁদের।

আর সেই পরিপ্রেক্ষিতেই উঠে আসছে গ্রিন হাইড্রোজেনের কথা। ইউরোপীয় নেতারা বুঝছেন, উন্নয়ন স্তব্ধ না-করে রাশিয়াকে আটকানোর একমাত্র উপায় হল বিকল্প জ্বালানি। যতদিন না প্রতিযোগিতামূলক দরে এই জ্বালানি উৎপাদিত হয়, ততদিন রাশিয়ার উপর তাঁদের নির্ভর করতে হবেই। এই উপলব্ধি থেকেই গ্রিন হাইড্রোজেনের গবেষণায় এই বিপুল খরচ। এর দাম কী করে সাধ্যের মধ্যে আনা যায় তা নিয়ে ব্যস্ত সবাই। কেন না, একমাত্র এই পথেই রাশিয়া-নির্ভরতা কমানো যেতে পারে। আর একমাত্র রাশিয়া-নির্ভরতা কমাতে পারলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরও ভালও সেবাদাস হওয়া যাবে। যা ছাড়া পশ্চিম ইউরোপের বোধহয় কোনও গতি নেই।

কিন্তু এর ফলে একটা ভাল জিনিস হতে চলেছে। মানুষ হয়তো মুক্তি পেতে চলেছে দূষণ সৃষ্টিকারী জ্বালানি থেকে। যদি তা হয়, তার থেকে ভাল কিছু হতে পারে না। সুতরাং এই যুদ্ধ সম্বন্ধে আমাদের যে মতই থাকুক না, আমরা চাইব সার্থক হোক এই গবেষণা।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − 12 =

Recent Posts

কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধ: অন্ধকারে আলোর দিশারী

তিনি বলেন গেছেন, হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না, তাকে জয় করতে প্রেম ও ভালবাসা দিয়ে। মৈত্রী ও করুণা— এই দুটি ছিল তাঁর আয়ুধ, মানুষের প্রতি ভালবাসার, সহযোগিতার, বিশ্বপ্রেমের। তাই তো তাঁর অহিংসার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে,— চীন, জাপান, মায়ানমার, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানে। এই বাংলায় যে পালযুগ, তা চিহ্নিত হয়ে আছে বৌদ্ধযুগ-রূপে। সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে সমগ্র বাংলা বুদ্ধ-অনুশাসিত ছিল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধ কবিদের দ্বারাই রচিত হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

স্যার রোনাল্ড রস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য

রোনাল্ড রসকে তাঁর গবেষণার সহায়তাকারী এক বিস্মৃত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৯)। তাঁর অবদান কিন্তু খুব কম নয়। তিনি ছিলেন রস-এর অধীনে সহ-গবেষক। রস নোবেল পেলে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কিশোরীনাথের ভূমিকার বিষয়টি বড়লাট লর্ড কার্জনকে জানান। কার্জন এ-বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের গোচরে আনেন। এর ফলে ১৯০৩ সালে যখন দিল্লিতে দরবার বসে, তখন ডিউক অফ কনট-এর মাধ্যমে কিশোরীনাথকে ব্রিটিশরাজ সপ্তম এড‌ওয়ার্ড-এর তরফ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। পরে কলকাতা
র সেনেট হলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

দুই হুজুরের গপ্পো

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শতবর্ষী বাঙালি

বাঙালিদের মধ্যেও শতায়ু লোক নেহাত কম নেই। একটা কথা মনে রাখা জরুরি, বিখ্যাত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের আয়ু নিয়ে বিশেষ কোনও গবেষণা থাকে না। আবার একটু বেশি বয়স্ক মানুষকে শতায়ু বলে চালিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ-ও রয়েছে। তবে শতবর্ষের আয়ুলাভ যে মানুষের কাঙ্ক্ষিত, তা উপনিষদের‌ একটি বাক্যে সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে— ‘জীবেম শরদঃ শতম্’, অর্থাৎ শতবর্ষ বাঁচতে ইচ্ছে করবে। কেবল অলস জীবন নিয়ে বাঁচবার ইচ্ছে করলেই হবে না, কর্ম করে বাঁচার কথাও বলা হয়েছে সেখানে— ‘কুর্বেন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিষেচ্ছতম্ সমাঃ’।

Read More »