Search
Generic filters
Search
Generic filters

বিশ্ব বিরিয়ানি দিবস: উত্তরের প্রবেশদ্বারের দাওয়াত-এ-ইশক

শুরু হয়েছিল একটি বাসমতী চাল প্রস্তুতকারক সংস্থার বিজ্ঞাপনী প্রচারের অংশ হিসাবে, কিন্তু বছর পাঁচেক ধরে জুলাই মাসের প্রথম রবিবার উদযাপিত হয় বিশ্ব বিরিয়ানি দিবস হিসেবে। এই বছর ২ জুলাই ভোজনবিলাসীদের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

প্রেমাঙ্কুর আতর্থী তাঁর কালজয়ী আত্মজীবনী ‘মহাস্থবির জাতক’-এ ১৯২২ সালে পরিহাসছলে বৃহদারণ্যকের একটি শ্লোক উদ্ধৃত করে দেখিয়েছিলেন— বেদে বিরিয়ানি জাতীয় খাদ্যের একটি আদিরূপের সন্ধান পাওয়া যায়। ভাগ্যিস কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা এই জাতীয় উদ্ধৃতির খবর রাখেন না! যতই বিরিয়ানিকে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের ‘স্টেপল ফুড’ হিসাবে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হোক না কেন, গবেষকদের মতে, ভারতবর্ষব্যাপী প্রধানত পাঁচ ধরনের বিরিয়ানি রয়েছে। জনপ্রিয়তম হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি, তামিলনাড়ুর চেট্টিনাড বিরিয়ানি, দিল্লির মোগলাই বিরিয়ানি, পাকিস্তান সীমান্তের সিন্ধ অঞ্চলের সিন্ধি বিরিয়ানি, এবং দাক্ষিণাত্যের মালাবার উপকূলের থালাসারি বিরিয়ানি। এই বিবিধের মাঝে মহান মিলন একজায়গাতেই— আসমুদ্রহিমাচল প্রচলিত এই খাদ্যে পেট ভরার সঙ্গে মন ভরার এক চিরকালীন রসায়ন আবহমানকাল থেকে কাজ করে যায়।

পরিসংখ্যান বলছে, মালদার মতো মিশ্র সংস্কৃতির একটি জেলা সদর কার্যত গৌড়বঙ্গের ‘বিরিয়ানি হাব’-এ রূপান্তরিত হয়েছে, যেটা বালুরঘাট বা রায়গঞ্জের ক্ষেত্রে ঘটেনি। তার কারণ, মূলত ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা এই শহরে আগত বিভিন্ন রুচির মানুষ নির্দিষ্ট দামের মধ্যে পেট ভরা এবং সুস্বাদু খাবার চান। এই প্রাথমিক চাহিদাকে অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। হোটেলগুলিতে মাংস-ভাতের থালি যেখানে ১৩০-১৪০ টাকার কমে পাওয়া যায় না, সেখানে অনায়াসে চিকেন বিরিয়ানি পাওয়া যায় ১০০-র মধ্যে। ভাত, আলু আর মাংসের জমাটি কম্বিনেশন— তার সঙ্গে তৃপ্তির আনন্দ। এটাই এখন মালদার বিরিয়ানি সংস্কৃতির ইউএসপি। এই জেলাশহরে ৬০ টাকার ‘কলেজ বিরিয়ানি’ যেমন পাওয়া যায়, তেমনই সাইকেলের ক্যারিয়ারে লাল শালু মোড়া হাঁড়ি নিয়ে নিম্নবিত্ত মহল্লার অলিতে-গলিতে পৌঁছে যায় ‘দুয়ারে বিরিয়ানি’। হ্যাঁ, এই নামেই সাইকেলবাহিত বিরিয়ানি স্থান করে নিয়েছে জনমানসে। অনলাইন ডেলিভারি অ্যাপের অর্ডার লিস্টের বেতাজ বাদশা বিরিয়ানির গ্রামের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাওয়ার মধ্যে একধরনের গরিবের গণতন্ত্র আছে। রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘আমার কবিতা আমি জানি/ গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী’; রবীন্দ্রনাথ পারেননি— কিন্তু বিরিয়ানি সর্বত্রগামী হতে পেরেছে।

জুলাই মাসের প্রথম রবিবার উদযাপিত হয় বিশ্ব বিরিয়ানি দিবস।

তবে বছরখানেক আগেও ছবিটা এমন ছিল না। শহরের এই বদলে যাওয়া বিরিয়ানি সংস্কৃতি প্রসঙ্গে প্রবীণ ইতিহাসবিদ মো. আতাউল্লাহ স্মৃতিচারণ করে বলেন, বিগত পাঁচ বছরে অদ্ভুতভাবে মালদা শহরে বিরিয়ানির চাহিদা বেড়েছে। এই বিষয়টা নতুন নয়, একটা সময় যেমনভাবে মোগলাই বা দক্ষিণ ভারতীয় খাবারের চাহিদা তৈরি হয়েছিল, একই রকমভাবে এই সময়ে দাঁড়িয়ে বিরিয়ানির চাহিদা তুঙ্গে। আজ থেকে প্রায় দশ-পনেরো বছর আগে শহরের প্রাণকেন্দ্র কে. জে. সান্যাল রোডের দিকে একটি রোলের দোকানে বিরিয়ানি পাওয়া যেত, তার পরবর্তীতে ইংরেজবাজার থানার বিপরীতে বিরিয়ানির বিক্রি শুরু হয়। কিন্তু এখন শহরের আনাচে-কানাচে অজস্র দোকান। যদিও সমস্ত দোকানে প্রকৃত গুণগত মানের বিরিয়ানি পাওয়া যায় না, তবুও মানুষজন সেই বিরিয়ানি খাচ্ছে। আসলে এর স্বাদ, গন্ধ ও পরিবেশনের রীতিটাই হয়তো মানুষের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।

দীর্ঘদিনের মালদা-বাসের অভিজ্ঞতা থেকে অধ্যাপিকা আইরিন শবনম সরাসরি বলেন— বিরিয়ানিকে ধর্মের সঙ্গে যোগ করার একটা চেষ্টা চলে বটে, তবে অভিজ্ঞতা থেকে বলছি— এমন একটা সময় ছিল, সচরাচর বাঙালি খাবারের বাইরে বেরিয়ে বহু আগে শুধুমাত্র মুসলিম পরিবারগুলিতেই এই বিরিয়ানি খাওয়ার প্রচলন ছিল। সেক্ষেত্রে রাজ্যের বাইরে থেকেও বহু বাবুর্চি এসে মুসলিম বাড়িগুলিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিরিয়ানি রান্না করতেন, তবে তার সংখ্যা খুব হাতেগোনা। ইদ বা অন্য উপলক্ষে বাধ্যতামূলক বিরিয়ানির চল হয়েছে এই সেদিন। বাঙালি মুসলিমের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে বিরিয়ানি ছিল না… এমনকি, সেভাবে দেখলে মালদা ও দুই দিনাজপুরের রাজবংশীদের মধ্যে রান্নার পদ্ধতিগত একটা মিল আছে, যার কারণ একান্তই সামাজিক।

চাহিদার সঙ্গে যোগানের তাল মেলাতে এই শহর খুঁজে নিয়েছে নতুন পদ্ধতি। গুটিকয়েক দোকান বা রেস্তোরাঁ ছাড়া এখানে আলাদাভাবে বিরিয়ানি বানানো হয় না। শহরের বিরিয়ানির সিংহভাগ তৈরি হয় হরিশ্চন্দ্রপুর, সামসি বা পাশের রাজ্য থেকে আগত বাবুর্চিদের হাতে। তারপর তা পৌঁছে যায় রথবাড়ি, সুকান্ত মোড়, বুলবুলি মোড়, আই টি আই মোড়ের বিপণিগুলিতে। অর্থাৎ, এদের ভূমিকা সার্ভিস আউটলেটের। পরিসংখ্যান বলছে, লকডাউনের সময় শুধুমাত্র মালদা টাউনে সার্ভিস আউটলেটের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। শহরে আসা অসংখ্য মানুষের মুখে একটু দামি লম্বা চালের ভাত, ৬০-৮০ গ্রাম ওজনের একটা মাংসের টুকরো, আধখানা আলু আর বড়জোর একটা ডিমসেদ্ধর সঙ্গে তারা তুলে দেয় একটুকরো আরামের আনন্দ— দমবন্ধ চৈত্রের পর হঠাৎ শ্রাবণ যেমন স্বস্তি নিয়ে আসে। শায়ের কাওসর মুনিরের সেই বিখ্যাত কাওয়ালি গানের মতোই তার আবেদন ঊর্ধ্বমুখী— পেট হয়ে হৃদয়ের দিকে তার যাত্রা— ‘দিল নে দস্তরখান বিছায়া/ দাওয়াত-এ-ইশক হ্যায়!’

আসলে, বিরিয়ানি এই কলকাতা থেকে প্রায় চারশো কিলোমিটার দূরের মফস্বলের কাছে সাধারণের মধ্যে অসাধারণ হয়ে ওঠার আনন্দ। রেস্তোরাঁর সরু কাঠের টেবিলে এক প্লেট থেকে দুই চামচে ভাগ করে খেতে গিয়ে আঙুলে আঙুলে বা হাঁটুতে হাঁটুতে হঠাৎ ছোঁয়া লাগার মতোই যা হঠাৎ চমক জাগায়। চামচ ধরা হাতদুটোর বয়স বাড়ে, বিরিয়ানি ফুরোয় না…

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve + three =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »