—তোমরা কতটা জানো সোনাগাছির সম্বন্ধে?
—তেমন কিছুই জানি না, এই কয়েক মাস আসাযাওয়ায় যা দেখছি আর অর্গানাইজেশন থেকে যতটা জানানো হয়েছে ততটা। কেস আলোচনা করতে করতে কিছুটা।
—আচ্ছা তা হলে শোনো, এখানে অনেকগুলো ভাগ আছে, কিছু আছে দালালবাড়ি, যেখানে কাজ হয় লিগ্যাল।
—লিগ্যাল মানে?
—মানে ধরো, যে মেয়েরা এখানে কাজে আসে, তাদের কেউ জোর করে আনে না, নিজের ইচ্ছেয় আসে, কাজ করে আবার ফিরে যায়, কেউ কেউ থাকে, ওদের পরিচয়পত্র জমা থাকে। পুলিশি ঝামেলা থাকে না।
—নিজের ইচ্ছেয়? নিজের ইচ্ছেয় কেউ সোনাগাছিতে কাজ করতে আসে? মানে দেহব্যবসা? এখানে এসে থেকে যে ক’টা কেস জানলাম, ইন্টারঅ্যাকশন করলাম তারা তো কেউই নিজের ইচ্ছেয় আসেনি। কারও স্বামী তো কারও প্রেমিক এনে রেখে পালিয়ে গেছে। কাউকে কলকাতায় লোকের বাড়ি কাজ পাইয়ে দেবে বলে এনে সোনাগাছিতে বেচে দিয়েছে। মোটামুটি এইরকমই তো শুনলাম।
—হ্যাঁ মানে সেরকমই, বলতে চাইছি ওখানে ১৮ বছরের নীচে কাউকে রাখা হয় না, সবাই অ্যাডাল্ট। অনেক সিকিউরিটি থাকে।
—সিকিউরিটি? মানে রেগুলার কাস্টমার পাওয়া আর পুলিশের ঝামেলা না হওয়া? কাজের গ্যারান্টি? সব কাস্টমার রোজ একই মেয়ে চায়? নতুন মেয়ের ডিমান্ড থাকে না? তা হলে পুরনো মেয়েরা কোথায় যায়?
—হ্যাঁ ঠিকই বলেছ ম্যাম, নতুন মেয়েদের চাহিদা বেশি, পুরনোরা বেশিরভাগ ভিতরের গলিতে চলে আসে, ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। অনেকের আবার দালালবাড়ি পছন্দ নয়, তারা একাই থাকে ঘর ভাড়া নিয়ে। কেউ কেউ অনেক বেশি রোজগারও করে সেটাও সত্যি কিন্তু এদের কিছুই থাকে না, নেশা করে আর বাবুর পিছনে খরচা করেই সব শেষ করে ফেলে।
কথা হচ্ছিল এনজিও সেন্টারের ঘরে বসে এক ছাত্রীর সাথে, সেদিন সম্ভবত একা ছিলাম ডিউটিতে, বাকিরা কেউ ছুটিতে, কেউ অন্য সেন্টারে ডিউটি করছে। ছেলেমেয়েও এসেছে হাতেগোনা কয়েকজন, রোজের কাজ সেরে গল্প করা ছাড়া আর তেমন কিছু করার ছিল না, অবশ্য ছেলেমেয়েদের সাথে গল্প করাটাও আমাদের কাজের মধ্যেই পড়ত। বাঁধাধরা গতে থেরাপি কিংবা নাচ শেখানো কোনওটাই এখানে প্রয়োজনীয় ছিল না, কাজ ছিল গল্পের মাধ্যমে কে কী ভাবছে, কে কী করতে চাইছে সেসব আন্দাজ করা, কোনও বিষয়ে খটকা লাগলে সে বিষয়ে খোঁজখবর করা এবং উচ্চতর কর্তৃপক্ষকে জানানো। আমাদের কাজ সরাসরি যৌনকর্মীদের সাথে না, ছিল তাদের বাচ্চাদের সাথে। বাচ্চাদের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে মায়েদের সাথে, তাই তাদের উপেক্ষা করা যেত না।
উপরোক্ত কথোপকথনে একটা কথা পাঠক লক্ষ্য করে থাকবেন যে, এরা নির্দিষ্ট প্রশ্নের সঠিক উত্তর কখনও দেয় না, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কথা বলে, নিজের অবস্থান অনুযায়ী ভাষ্য বানায়, বা নিজের ভাবনা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ওই ছাত্রীটির বাবা-মা (পালক বাবা-মা) একটি দালালবাড়ি চালায় এবং তারা বেশ অবস্থাপন্ন, তাকে যা বোঝানো হয়েছে বা তার নিজের সুযোগ-সুবিধে, যা সে মা বাবার কাছে পায় সেসব বজায় থাকে এবং তাতে দাগ না লাগে এমন বয়ানই সে দেয় আমার কাছে। এইসব দালালবাড়িতে আসে শহরের অবস্থাপন্ন বাড়ির পুরুষেরা, তাদের গাড়ি সরাসরি ঢোকে না সোনাগাছির গলিতে, দূরে কোথাও অপেক্ষা করে, দালালের কাজ তাদের সেখান থেকে নিয়ে আসা, কাজ হয়ে গেলে আবার সে স্থানে ফিরিয়ে দিয়ে আসা। তাদের পছন্দ অনুযায়ী মেয়ে রেডি রাখা ইত্যাদি। এসবের নির্দিষ্ট কোনও সময়ও থাকে না, সাতসকালেও হতে পারে, আবার দুপুর বিকেল রাতবিরেতেও হয়।
আবার ও যে মিথ্যে বলছে, এমনও না। দারিদ্র্য এতই ভয়ংকর যে, এখন অনেকেই খোঁজখবর নিয়ে বুঝেশুনে আসছেন এই কাজে। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে যেমন কায়িক শ্রমের জন্য আসে গ্রামের মেয়েবউরা, তেমেই কেউ কেউ আসে এখানেও। সে রাস্তা দেখিয়ে দেয় অবশ্যই শুভানুধ্যায়ী সেজে কোনও পুরুষ অথবা কোনও নারী, যে এ কাজ আগে করেছে বা করে চলেছে। এদের কাজের ধরন সোনাগাছির বাসিন্দাদের তুলনায় কিছুটা আলাদা। এরা সকালে ট্রেন ধরে আসে, ঢুকে পড়ে কোনও না কোনও দালালবাড়িতে, রাস্তায় এরা দাঁড়ায় না। দালালের কাজ কাস্টমার ঠিক করা, বাড়ির ভিতরে কাস্টমার পছন্দ করে কার ঘরে যাবে, রাস্তায় না। কাজ শেষে মেকআপ তুলে খুব সাধারণ পোশাকে আবার তারা বাড়ি ফেরে বিকেল-সন্ধেতে।
যার সাথে কথা হচ্ছিল সেই মেয়েটির নিজের মা যৌনকর্মী, সোনাগাছি ছাড়া অন্যত্রও কাজ করে, পার্মানেন্ট বাবু আসে সুসজ্জিত ফ্ল্যাটে, সোনাগাছিতে কাজ করে যেসময় সে বাবু তার কাছে আসে না বা কলকাতায় থাকে না। মেয়েকে সে দিয়ে গেছিল অন্য একজনের কাছে, এটা এখানে একরকম নিয়মের মধ্যে পড়ে। যৌনকর্মীরা জন্ম দিয়ে মাসখানেকের মধ্যে বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য একজনকে ঠিক করে ফেলে পয়সার বিনিময়ে, তারপর তারা ফিরে যায় কাজে। কেউ কেউ কিছুদিন পয়সাকড়ি দেয়, বাচ্চাকে দেখতে আসে মাঝেমাঝে, তারপর চলে যায় অন্যত্র, পয়সা আসাও বন্ধ হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, যে বাড়িতে বাচ্চাটি বড় হয় সেখানে সে পরগাছা, পরিণত হয় কাজের লোকে। থাকা-খাওয়ার বদলে যাবতীয় সংসারের কাজ করে বাচ্চাটি। কী বলব একে, শিশুশ্রমিক, না দাস শ্রমিক?
এই মেয়েটির ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটেনি, জন্মদাত্রী টাকা দেওয়া বন্ধ করলেও পালনকর্ত্রী মা যত্নে বড় করেছে নিজের মেয়ের সাথে, জানি না ভবিষ্যতে তার রোজগারে বসে খাওয়ার ইচ্ছে লুকানো আছে কি না, তবে যতটা চোখে পড়েছে মেয়েদের নানা বিষয়ে দক্ষ করে তোলার চেষ্টাটাই দেখেছি। হয়তো অন্যরকম জীবন চাইছে তাদের জন্য, হয়তো না, কিছুই নিশ্চিত হয়ে বলা যায় না। নিজে যৌনকর্মী না হলেও তাদের ব্যবসার হাল ধরবে মেয়েরা এমন আশা থাকাও অমূলক নয়। যে-কোনও ব্যবসায়ী পরিবারই যেমন চায়, আর এ তো প্রাচীন ব্যবসা। এ ব্যবসা বন্ধ হবে এমন আশা দূর দূর ভবিষ্যতেও দেখতে পাই না। এই পালনকর্ত্রী মাও একদা যৌনকর্মী ছিল, এক খদ্দেরের সাথেই ঘর বাঁধে, তার মায়ের ব্যবসার হাল ধরে দু’জন মিলে, নিজে আর খদ্দেরের আশায় থাকে না, অন্য মেয়েদের রোজগারের কমিশনেই তার পরিবার অবস্থাপন্ন।
বড় দালালবাড়ি ছাড়াও দালালরা আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এগলি-ওগলিতে। সোনাগাছির বাইরের দিকে সে সংসারী, ছেলেমেয়ে বউ নিয়ে তার স্থায়ী সংসার। আবার কয়েক গলি পর ভিতর দিকে ঘর ভাড়া নিয়ে রাখা আছে আর একজন, যার রোজগারে চলে তার বাইরের সংসার, দালালের ইনভেস্টমেন্ট শুধু ওপর ওপর আদর, অসুস্থ হলে খানিক দেখভাল, পয়সাওয়ালা খদ্দের ধরে আনা ইত্যাদি। বাইরের ছেলেমেয়েদের ভিতর গলিতে যাওয়া মানা, বৌ তো একেবারেই যাবে না ওদিকে। পুরুষমানুষ কী কাজ করে তা তাদের না জানলেও চলে অথবা মিথ্যে জানলেই বা ক্ষতি কী! এসব সত্ত্বেও সবই যে অজানা থাকে তাও না, লোকমুখে ছড়ায় এসব কথা, সামনে শুধু একটা পর্দা থাকে স্বচ্ছ, যা দিয়ে আসলে সবই চোখে পড়ে আবার না জানার ভান করাও চলে। এ নিয়ে আমাদেরও সমস্যা হত। ভিতরে সেন্টারের যে ঘর আছে সেখানে যাবে না কিছু বাচ্চা, বাড়ি থেকে বারণ করে দিয়েছে। এ সমস্যার সমাধান হল, মোবিলাইজারদের এই বাচ্চাদের সেন্টারে নিয়ে যাওয়া, আবার বাড়ি ফেরত দিয়ে আসার দায়িত্ব দিয়ে।
প্রজেক্টের লক্ষ্য কী?
প্রশ্নটা করেছিলেন হেড আপিসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মচারী। সত্যি বলতে, প্রজেক্ট কী সে বিষয়ে খুব হালকা আভাস ছাড়া স্পষ্ট ধারণা আমরা পাইনি। স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যেকে যেহেতু আলাদা আলাদা জায়গা থেকে গিয়েছি, নিজস্ব অভিজ্ঞতা আর বোধের জায়গা থেকে বুঝে নিতে চেয়েছি প্রজেক্টের উদ্দেশ্য কী হতে পারে। সেরকম একজন বলেছিল, তার কাছে এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য হল, এই বাচ্চারা যেন মায়ের পেশা না নেয় সেই চেষ্টা করা অর্থাৎ পরের প্রজন্মকে এই পেশা থেকে দূরে রাখা। কেন জানি না প্রথম তিনমাসের মধ্যেই আমার মনে হয়েছিল, এ কাজ কঠিন শুধু না অসম্ভব। অসম্ভব কারণ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পুরুষের মনোরঞ্জন, তাদের চাহিদা পূরণই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এ ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার কোনও বাসনা তাদের নেই, পারলে এর বিস্তার ঘটাবে। দিনের পর দিন ঘটে চলা ধর্ষণ কী কারণে ঘটে চলে? কেন তারা কোনও সাজা পায় না? কেন শাসক (কেন্দ্র হোক বা রাজ্য) তাদের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে মিছিল করে? কেন তাদের আড়াল করে, আশ্রয় দেয়? কারণ এ ব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক এবং তাদের শক্তি প্রদর্শন করার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র নারী শরীর। যে ব্যবস্থা নারীকে সম্মান দেয় না, সে সমাজে নারী স্বাধীন হতে পারে না। স্বাধীনতা বলে যা যা নির্দেশ করা হয়, তা আসলে ততটাই স্বাধীন যা এই ব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থাকে (মেয়েদের জন্য সমাজ নির্দেশিত ব্যবস্থা) উল্লঙ্ঘন করে আমরা স্বাধীনতার স্বাদ পেতে চাই। কখনও কখনও যেমন আমরা বলি যে, কোনও বিবাহিত নারী বা ধর্ষিতা নারীর তুলনায় যৌনকর্মীরা অনেক বেশি স্বাধীন, কারণ তারা কার সাথে বিছানায় যাবে তা নিজেরাই ঠিক করতে পারে। ভুলে যাই সেটা অর্থের বিনিময়ে, ভুলে যাই ব্যবস্থার জাঁতাকলে সে আগেই বাঁধা পড়ে আছে, ভুলে যাই নারী পুরুষের একান্ত নিজস্ব অন্তরঙ্গ সুন্দর যে প্রেম যৌনতা তাকেই এখানে পণ্য করা হয়েছে, এর মধ্যে স্বাধীনতা খোঁজা অর্থহীন। এখানেই স্বাভাবিকভাবে চলে আসে সেক্স আর জেন্ডার নিয়ে আলোচনা। সে প্রসঙ্গে পরে আসব।
আলোচনার সারাংশ হল এই যে, আমরা আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষমতায় এসব কিছুই করতে পারব না, আমাদের লক্ষ্য খুব সাদা বাংলায়, ১৮ বছর পর্যন্ত বাচ্চাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা। এর আগে যাতে ওরা পেশায় ঢুকে না পড়ে সেটা দেখা, পাচার না হয়ে যায় তা নজরে রাখা। এই পরিবেশে শিশুদের অধিকার সবচেয়ে বেশি লঙ্ঘিত হয়, তাই ওদের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করা।
কেস চাই কেস…
প্রজেক্ট রাখতে গেলে কেস দেখাতে হবে, কেস সাজানোই যায় কিন্তু সত্যি হলে জোর বাড়ে এবং রেসকিউ করলে, প্রজেক্টের অর্ন্তগত কেউ সাহসিকতার পুরস্কার পেলে তাতে অর্গানাইজেশনের রেটিং বাড়ে। খুব বেশি জড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ সেক্ষেত্রে যদি কর্মচারী বিপদে পড়ে তবে কর্তৃপক্ষ তার দায় নেবে না। নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। প্রমাণ থাকবে ছবিতে আর খাতায়। তুমি ফিল্ডে আছ ছবি দাও, কেস ডিল করছ ছবি দাও, বাচ্চার মায়ের সাথে কথা বলেছ ছবি দাও (মায়ের বাচ্চাদের মুখ বাদ দিয়ে), ক্লাস করাচ্ছ ছবি দাও, মিটিং করাচ্ছ ছবি দাও, ছবি ছবি আর ছবি। মাঝেমাঝে রবীন্দ্রনাথের গানটা মনে পড়ত, তুমি কি কেবলই ছবি…
প্রজেক্টে আমার কাজের শুরুর দিন থেকে আমার যাবতীয় শিক্ষা প্রয়োগ করে যাবতীয় বোধ আবেগ সমস্তটা দিয়ে বাচ্চাগুলোকে আপন করতে চেয়েছিলাম, বুঝতে চেয়েছিলাম ওদের, হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম ওদের হাতটা ধরতে চেয়েছিলাম। প্রজেক্ট ওদের কী দেবে জানি না, আমি ওদের খানিক বোধ দিতে চেয়েছিলাম, প্রশ্ন করতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে এমন একটা মন আর মাথা তৈরি হোক চেয়েছিলাম। জানি খুব খুব বেশি চেয়েছি, আবার সে-সব তো আমার চাওয়া, ওদের প্রয়োজন নয়, সেটাও সত্যি। পেটে ভাত আর বাস করার ন্যূনতম নিরাপত্তা যদি না থাকে তা হলে আমার ভাবনার সাথে ওদের ভাবনার মিল কিছুতেই হবে না। ওদের হাতে খাবার আর মায়েদের হাতে রেশন, মাঝেমধ্যে এক একজনকে সাহসিকতার পুরস্কারের পাঁচ হাজার টাকা, এটুকুই ওদের কাছে অনেক। আবার এইটুকুর জন্যও অনেক বাচ্চাকে সেন্টারে আসতে দেবে না বাড়ির লোক, এও সত্যি। দেবে না কারণ, এনজিও দাদা-দিদিরা বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাতে বলবে, নাচ গান ইত্যাদির জন্য ডেকে নিয়ে যাবে, তারপর কীসব অধিকার-টধিকারের কথা বলবে, ঘরে এসে বাচ্চা তাদের কথা শুনবে না, মারধোর করলে চাইল্ড লাইনে ফোন করার ভয় দেখাবে, ইত্যাদি। এনজিও কর্মী দরজা থেকে গালাগাল খেয়ে ফিরে আসবে কিন্তু আবার যাবে, গায়ের চামড়া মোটা করতে হয় এসব কাজে। ওদের কাজ অনেক, বাচ্চা এবং বাচ্চার মায়ের ট্র্যাক রাখা, সরকারি কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা না থাকলে সে-সব অফিসে নিয়ে গিয়ে কাগজ তৈরি বা সংশোধন করতে সাহায্য করা। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই— যাও একজন অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করো। বাচ্চা রোজ স্কুল যাচ্ছে কি না নজর রাখা, তারপর কোথায় কার সাথে মিশছে, নেশা করছে, কাজ করছে— সব সবের খবর রাখতে হত। এরা সাধারণত এক বাড়িতে বেশিদিন থাকে না, বারবার ঠিকানা বদল করে, সেসব নজরে রাখতে হয়। এত যে খবর জোগাড় হল সে-সব নিয়ে হবে কী? কথা বলা হবে বাচ্চার সাথে, ওদের অভিভাবকের সাথে, বোঝানো হবে শিশুশ্রমিক আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, ওদের এখন পড়ার সময় খেলার সময়, ইত্যাদি প্রভৃতি।
কথায় মেনে নেবে এমন বান্দা এরা কেউ না। ‘নেহি ম্যাম কাম তো নেহি করাতে হ্যায়’, ‘আপ বোলতে হ্যায় কাম কর রাহা হ্যায়, পয়সা তো ঘরমে নেহি দেতা হ্যায়’। মজার বিষয়, আমরা ওই অঞ্চলে থাকি ৮ ঘণ্টা, আমাদের চোখে পড়ে, খবর পাই সে বাচ্চা একটা দোকানে কাজ করে মাল লোডিং-আনলোডিংইয়ে, ঘর থেকে দুটো বিল্ডিং পরে কাজ করতে অভিভাবক দেখতে পায় না। দেহব্যবসার মতো শিশুশ্রমিকও ছিল আছে, আরও বহুকাল থাকবে, এটাই বাস্তব কিন্তু আইডিয়াল নয়।
কৈলাশ সত্যার্থী চাইল্ড ফাউন্ডেশন রিপোর্ট বলছে (২০২১), সারাদেশে প্রতিদিন আটজন বাচ্চা পাচার হয়। তারা এও বলছে যে, কোভিডের পর এই সংখ্যাটা বেড়েছে। কীরকম বেড়েছে? অল্প ডেটা দিই, তা হলেই বোঝা যাবে।

এই অবস্থায় এনজিওগুলোর কাজ থাকে কেসগুলো প্রশাসনের নজরে আনার, রেসকিউয়ে সহায়তা করা, প্রশাসনের তৎপরতায় বাচ্চা এবং মেয়েরা উদ্ধারও হয়। এই রিপোর্টই বলছে যে, ৮০% বাচ্চা উদ্ধার করা গেছে।
এখানে আমার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। একটা খবর আমরা পাই যে, সোনাগাছি অঞ্চলে একজন নাবালিকা মেয়ে পালিয়ে যায় বাড়ি থেকে এবং সে নাকি বিয়েও করে নেয়। মেয়েটি আগে এনজিও সেন্টারে আসত, পরে আসা বন্ধ করে দিয়েছিল। বাড়ির লোক আসে সেন্টারে সাহায্য চাইতে এবং থানায় নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। (সেন্টারে খবর গেছে সেটা জানতে পেরেই এসেছে, নইলে আসত না) যাই হোক, তাদের নিয়ে থানায় যাওয়া হয়, ডায়েরি হয়, এখানে এনজিওর কাজ শেষ। পুলিশ রাতের মধ্যেই মেয়েটিকে উদ্ধার করে হোমে দেয়, ছেলেটিকে নিয়ে যায় থানায়। কিন্তু কতদিন রাখতে পারে মেয়েটিকে তারা হোমে? মেয়েটির মা (পালিতা) প্রতিদিন থানায় গিয়ে হাজিরা দিয়ে কান্নাকাটি করে, মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনে তাকে।
আমি যেটা বলতে চাইছি তা হল, পাচার বা নাবালিকা বিবাহ এই কেসগুলি ডায়েরি হল, অর্থাৎ ডেটায় ঢুকে গেল, আবার উদ্ধারের ডেটাতেও দেখা গেল, কিন্তু বাস্তবে মেয়েটি কী অবস্থায় আছে? মেয়েটি প্রকারান্তরে দেহব্যবসায় জড়িয়ে গেছে, এবং তার এই পালিতা মা তার রোজগারের টাকায় দিব্বি আছে। মেয়েটি নিজের মা যৌনকর্মী, বয়স হয়েছে, নিজে একজনের সাথে থিতু হয়েছে। তারা কেউই মেয়েকে এখান থেকে সরিয়ে নিতে চায়নি, কম বয়সী মেয়ের মধ্যে যে যৌনতাড়না ও দামি ফোন, জামাকাপড়, বড় রেস্টুরেন্টে খাওয়া— এসবে আকর্ষণ তাকে যে কোন অন্ধকারে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সে বোঝার জ্ঞান তার নেই। সমস্ত গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়াগুলো জুড়ে, বিজ্ঞাপনে এই ভোগসর্বস্ব জীবনকেই উন্নত জীবন আখ্যা দিয়ে চলেছে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে। এসবের বাইরে দাঁড়ানো কাঁচাবয়সের ছেলেমেয়েদের কাজ নয়, বেশিরভাগই এভাবে চলতে চলতে তলিয়ে যায়, যেখান থেকে উদ্ধার করার সাধ্য কারও থাকে না। বয়ঃসন্ধির মেয়েদের বেশিরভাগেরই প্রেমিক থাকে, তাদের সাথে এদিক-ওদিক যাওয়াও লেগেই থাকে। এমনি একজনকে বলেছিলাম, শোন, ঘুরতে যা কিন্তু কোনও হোটেলে যাস না। উত্তর যা পেয়েছিলাম, তাতে আমার ভদ্রবিত্ত মন ধাক্কা খেল জোর। ‘বুঝেছি ম্যাম, তুমি বলতে চাইছ, পেট করে দেবে, তাই না?’ অবশ্য সোনাগাছির মেয়েরা এই ভাষায় কথা বলে না, এটাই ওরা অন্যভাবে বলবে। এ ভাষা উত্তর ২৪ পরগনার বর্ডার অঞ্চলের।
অর্থাৎ মেয়েটির জীবন যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেল। কাজ অবশ্যই করল, এনজিও প্রশাসন সকলেই, কিন্তু কাজের কাজ হল না। ধীরে ধীরে তলিয়ে যাবে জীবন, কম বয়সে বারংবার যৌনকর্ম তাকে রোগাক্রান্ত করে তুলবে, বেঁচে থাকবে কতদিন, তাতেই প্রশ্নচিহ্ন লেগে গেল বলা যায়। এই সমস্ত নিয়েই সোনাগাছি বাঁচে, পুজো করে, সাজগোজ করে, এনজিওর প্রোগ্রামে মঞ্চ সাজায়, নাচে গায়, খাবার দেওয়ার লাইনে দাঁড়ায়। এনজিওর স্যার-ম্যামদের ভালবাসে, বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, নিজেদের সাধ্যমতো তাদের জন্য উপহার কেনে (টিচার্স ডে-তে) মিষ্টি খাওয়ায়। আবার এনজিওর দেওয়া খাবার পছন্দ না হলে ডাস্টবিনে ফেলেও দেয় কৌটোসমেত, যাতে পরের দিন আমাদের চোখে পড়ে এবং তারা বলতে পারে যে, খাবার নষ্ট হয়ে গিয়েছিল বা খেতে খারাপ ছিল। বলবে কিন্তু বেশি শোরগোল করবে না, কারণ হেডদিদির গুডবুকে না থাকলে পরের বার রেশন দেওয়ার লিস্টে নাম নাও থাকতে পারে। দিবে আর নিবে করে যেমন সরকার চলে, তেমনি এনজিও-ও চলে।

একটা ট্রেনিংয়ের দিন সকাল আটটায় ঢুকে গেছি ফিল্ডে, কাজ সব বাচ্চাদের ট্রেনিং সেন্টারে নিয়ে আসা ৯.৩০টার মধ্যে। ১০টায় ট্রেনিং শুরু। এর আগে এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন সবাইকে পইপই করে বলা সত্ত্বেও কেউ নিজে থেকে হাজির হবে না। সকালে তাই সেদিন যে ক’জন দায়িত্বে থাকবে তাদের কাজ হল বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের নিয়ে আসা। হ্যাঁ, প্রতিটা ট্রেনিংয়েই এই একই পদ্ধতি চলে। সেদিন ঢুকলাম একটি বাড়িতে সেখানে চার-পাঁচজন বাচ্চা আছে, যারা আমাদের সেন্টারে আসে। বাইরে থেকে নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ভিতরে ঢুকতে হয়, একটি ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম চৌকির উপরে বাবা-মা আর নীচে বাচ্চাদুটো শুয়ে আছে। বাবা-মা জেগে বসে আছে, বাচ্চারা ঘুমে। ডাকাডাকির পর উঠল, হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল চৌকির তলা থেকে। এরপর আবারও আসতে হবে, নইলে কোথায় পালাবে তাদের ধরে আনা যাবে না। বড়জোর ১০/১০ একটা ঘর, স্যাঁতসেঁতে ইট বেরনো মেঝে, রান্না থেকে খাওয়া, এর মধ্যেই গোটা সংসার। বয়স্ক কেউ থাকলে তার বিছানা এক চিলতে বারান্দায়। এইসব বাচ্চাগুলোর মায়েরা যৌনকর্মী না, তারা অস্থায়ী দোকান দেয় এই চত্বরে, একথা আমরা জানি, জগৎসংসার জানে না, বা মানে না, সোনাগাছি অঞ্চলের লেনগুলোর নাম ঠিকানায় থাকলেই মেয়েরা যৌনকর্মী, এনজিও-র খাতাতেও তাই।
এ তো তবু এই অঞ্চলে বলতে গেলে ভাল অবস্থা, এর থেকে ছোট ঘরে মা প্যারালাইসড, বাপ মদখোর, তিনটে বাচ্চা নিয়ে থাকাটাই বরং স্বাভাবিক। এই বাচ্চাগুলো এনজিও সেন্টারে নাম লেখায় কেন? অনেক কিছু শিখবে বলে? না, মাঝে মাঝে ভাল খাবার পাওয়া যাবে আর যদি সেন্টারের ম্যাডামের গুডবুকে ওঠা যায় তা হলে রেশন পাওয়া যাবে তিনমাসে একবার। যৌনকর্মীদের বাচ্চাদের নিয়েই যদিও কাজ কিন্তু এরাও আসে, দারিদ্র এমনই ভয়ংকর এখানে। তাই চৌকির তলায় শোয়া রোগা বাচ্চাটা যদি জলের বোতল আর ঠান্ডা পানীয়ের ক্রেট তোলে তা হলে তাদের সে-কথা আমাদের কাছে স্বীকার না করাই স্বাভাবিক। আমরা কী করতে পারব? খানিক জ্ঞান দেওয়া ছাড়া?
কিন্তু আমরা খানিক এর মধ্যে ঢুকব, কারণ প্রজেক্ট চালাতে কেস চাই। চাইল্ড লেবার, চাইল্ড ট্র্যাফিকিং, নাবালিকা যৌনকর্মী হওয়ার প্রবণতা, অ্যাডিকশন, এসব সমস্যা না থাকলে এনজিও কী করবে এই ফিল্ডে? ফান্ড কেন দেবে অর্গানাইজেশনকে?
বড় কেস পেয়েছিলাম কাজে জয়েন করার দু’তিন মাসের মধ্যেই। নাচ করতে সব মেয়েরাই ভালবাসত, আমি নাচের মধ্যে দিয়ে ওদের থেরাপি করার চেষ্টায় থাকতাম। মুভমেন্টের মধ্যে দিয়ে বার করার চেষ্টা করতাম ওদের মনের ভাব। একটি মেয়ে চুপচাপ থাকত, হাতেপায়ে জড়তা, নজর পড়েছিল ওর ওপর। কথা বলতাম ওর সাথে বেশি। দু’মাসের মধ্যেই ওর খুব কাছের হয়ে উঠতে পেরেছিলাম। সে-সময় অসুস্থ হতে শুরু করে মেয়েটি, শ্বাসের কষ্ট হতে থাকে, মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যায়। ডাক্তার দেখানো হয়, ওষুধ-প্রেসক্রিপশন দেখে আসি বাড়িতে গিয়ে। তেমন কোনও বড় সমস্যা নয় বুঝতে পারি, শুধু ভিটামিন আর হজমের ওষুধ দিয়েছে ডাক্তার। তা হলে সমস্যাটা কোথায়?
সেদিন আমরা দু’জন কর্মী থাকি সেন্টারে, সুপারভাইজার আছেন ফিল্ডে, কথা হয় আমি কাজ শুরু করব সব বাচ্চাদের নিয়ে, আস্তে আস্তে সব বাচ্চাদের বের করে দেবে আর-একজন, যখন আমি বলব। আমি শুধু সেই মেয়েটির সাথে বলব কথা। সিরিয়াস কিছু বুঝলে সুপারভাইজারকে ফোন করে ডেকে নেব। কাজ হয় একদম সেভাবেই, সেশনে কাজও হয়, কথাও বলে সে। নাবালিকা ধর্ষিতা হয়েছে ওর নিজেরই ঘরে, সম্ভবত মেয়েটিকে নেশার কিছু খাওয়ানো হত খাবারের সাথে, তারপর চলত ধর্ষণ। ও ভূতে ভয় পেতে শুরু করেছিল, জানত না কী ঘটছে ওর সাথে। একদিন ঘুম ভাঙলে দেখে যে, ওর প্যান্ট খোলা। ভূত ছাড়াবার জন্য ওকে ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, ঝাঁটাপেটা করে ওঝা, টোটকা ওষুধও গেলানো হয়। মায়ের সাথে কথা বলে এ-সব না করার কথা বলা হয় কিন্তু কাজ হয় না। আমি যে সত্য সেদিন জানতে পারি, তা সুপারভাইজার ছাড়া আর কাউকে জানাবার উপায় ছিল না। তাই সমস্তটা ছিল গোপন।
এরপর মেয়েটির সেন্টারে আসা কমে যায়, ওর মা গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যায় ওকে, ফেরে কিছুদিন পর, সেন্টারে আসত কিছুক্ষণ আমার পাশে বসত, একটু আমার হাতটা ধরে থাকত। রাস্তায় দেখলে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরত, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে হেসে চলে যেত স্কুল। কিন্তু এই কেসের কী হল? কেসটায় আপাতত এনজিও ঢুকল না, কিন্তু নিশ্চিত জানি যে, এটা থাকল খাতায়, প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা হবে সারভাইভার হিসেবে। না ঢোকার কারণ হয়তো অনেক আছে, তার মধ্যে একটা অবশ্যই ক্ষমতার নানা স্তর। আঞ্চলিক এই স্তরগুলিকে চটিয়ে এনজিওর পক্ষেও কাজ করা সমস্যার, যদি তাদের আবার অধিকতর ক্ষমতার সাথে যোগাযোগ না থাকে। কেস নথিভুক্ত থাকা প্রজেক্ট চালাতে সাহায্য করে, কেসের সমাধান হবে কি না বা এমন ঘটনার জন্য দোষী শাস্তি পাবে কি না— এ-সব এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ এগুলো প্রশাসনের কাজের মধ্যে পড়ে, এনজিওর কাজ না।
এনজিও তাই জোর দেয় সচেতনতার কাজে, বাচ্চাদের, মায়েদের এবং কর্মীদেরও প্রচুর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওয়ার্কশপ হয় প্রতিমাসে। তাতে কাজ কতটা হবে সন্দেহ থাকেই, কারণ মূল সিস্টেমই ত্রুটিপূর্ণ। এনজিও মূলত পেশাদার সমাজসেবী সংস্থা। এখানকার কর্মীরা পেশাদারী সমাজসেবক, যেমন এখনকার রাজনীতিকরা পেশাদার মানুষের সেবক, মাইনে নেই কিন্তু উপরি আছে। এনজিও কর্মীদের কম হলেও মাইনে আছে, সাথে যদি তুমি কায়দাকানুন জানো তো উপরিও আছে। ফিল্ড স্টাফেদের কাজ প্রচুর, কষ্টও আছে। মাটিতে ত্রিপল পেতে বসা আছে, কোনওরকম একটা ওয়াশরুম আছে, সেন্টারের ঘর পরিষ্কার করা, ময়লা ফেলা এসবের জন্য কোনও অন্য লোক সবসময় থাকে না, করতে হয় স্টাফদেরই। কিন্তু হেড অফিসের বাবুরা, দিদিরা এসিতেই কাজ করেন, সকল সুবিধা সেখানে পাওয়া যায়, আধা কর্পোরেট বলতে পারা যায়। কানাঘুষো শোনা যায়, হেড অফিসের লোকেদের মাইনের টাকায় হাত পড়ে না। এসব কিছুই কখনও প্রমাণিত হবে না নিশ্চিত, রাজনীতিকদের চুরির যেমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই সেবাটা ঠিক সমাজের, না নিজেদের, সেটাই গুলিয়ে যায় মাঝখান থেকে। খাতায়-কলমে, ছবি-টবিতে কাজ দেখা গেলেই হবে, সাপও মরবে আবার লাঠিও ভাঙবে না। সরকার, রাজনৈতিক দল থেকে এনজিও একই রাস্তায় চলেছে, এক্ষেত্রে ছবিতে কাজের প্রমাণ দেয় সক্কলে।
সক্ষমতা বা সচেতনতা বৃদ্ধি ওয়ার্কশপ
এই সেশনগুলো খুবই কাজের এবং যাঁরা আসেন ক্লাস করাতে তাঁরা যথেষ্ট দক্ষ। ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কীভাবে সহজে বাচ্চাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তা তাঁরা জানেন। কিন্তু এখানেও একটা কিন্তু আছে, তা হল মনঃসংযোগ, যা এখানকার বাচ্চাদের অত্যন্ত কম। মোবাইল অ্যাডিক্টেড আজকের প্রজন্মে এমনিতেই মনঃসংযোগ কমেছে, আর এই অঞ্চলের বাচ্চাদের তো খরচার খাতায় নাম তোলা আছে পারিবারিক ও সামাজিকভাবেই। এনজিও তবু এখনও কিছু স্বপ্ন দেখাতে চেষ্টা করে, অন্তত এই পরিবেশ থেকে বেরতে চাইলে পাশে থাকতে পারে এমন কিছু প্রকল্প সত্যিই আছে, আবার এও সত্যি, শুধু প্রকল্প থাকলেই হয় না, মানুষের সদিচ্ছা লাগে কাজ করতে। আবার আমার মতো সদিচ্ছা থাকলেও হয় না। এমপ্যাথি বা সহমর্মিতা নিয়ে বেশ কয়েকটা সেশন হয়েছে আমাদের কর্মীদের লাইফস্কিল ওয়ার্কশপে। এই সেশনগুলোর মোদ্দা বক্তব্য ছিল, শুধু সহানুভূতি নয় সহমর্মিতার সাথে কাজ করতে হবে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, যখনই কেউ সহমর্মী হবে তখনই সে এর পিছনের কারণগুলি খুঁজতে শুরু করবে, যুক্তিবাদী মনের সেটাই রীতি, আর তখনই সমস্ত বিষয়ের ভ্রান্তিগুলো তার চোখে পড়বে, তার পক্ষে কাজ করা মুস্কিল হয়ে পড়বে। যেমন ধরুন, এই মেয়েটি যার ঘটনা কিছু আগেই বললাম, ধরুন তার নাম সীতা। সীতা লাঙ্গলের ফলায় কর্ষিত হল যে, বা ধর্ষিত হল যে মেয়ে নিজের বাড়িতে, বাবা বা দাদার দ্বারা— তার প্রতি যদি সহমর্মী হন তা হলে আপনি এই অন্যায়ের শাস্তি চাইবেনই চাইবেন। একবার অ্যাবরশন করে নিয়ে আসা হল ১৫ বছরের মেয়ের, এসে রইল সেই একই বাড়িতে সেই একই মানুষদের সাথে, অবস্থার কোনও বদল হল না। আবার যে এমন ঘটনা ঘটবে না তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। সহমর্মী হয়ে কী কাজ করল এনজিও সীতার জন্য? প্রশ্নগুলো রেখে গেলাম, শুধুমাত্র এইজন্যই এই লেখা লিখছি।
বাচ্চাদের সেশনগুলো হত বেশিরভাগই শিশুর অধিকার নিয়ে। শিশুর অধিকারের চারটি পিলার কী, জিজ্ঞেস করলে মোটামুটি ৫০% বাচ্চা বলতে পারত। শুধু এই ট্রেনিংয়ের দিন না, প্রতিদিনই নানা রকম পদ্ধতিতে ওদের এগুলো মনে করানো হত। খেলার মধ্য দিয়ে, ওদেরই বলা কোনও গল্পের মধ্য দিয়ে। এইরকম একটা সেশনে বাচ্চাদের আগ্রহ ও কাজে যুক্ত হওয়া ছিল আশাব্যঞ্জক। সেশনে ওদেরকে গল্প লিখতে বলেছিলেন অতিথি শিক্ষক, নিজেদের আশপাশের বন্ধুবান্ধবদের গল্প। কারা ফাঁদে পড়ে পাচার হয়ে যাচ্ছিল, নেশা করে বিপদে পড়েছিল, এবং সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে, তাতে বন্ধুদের কী কী সাহায্য সে পেয়েছে, সেন্টারের কী সাহায্য সে পেয়েছে ইত্যাদি। সবার কাছেই আছে এমন অনেক গল্প কিন্তু সেসব সাজিয়ে লিখতে তো পারে না ওরা, নাইন-টেনের বাচ্চারাও সাবলীলভাবে লিখতে পারে না। আমাদের কাজ ছিল ওর গল্পটা শুনে কীভাবে লিখবে অর্থাৎ বাক্যগঠন কেমন হবে, তা বুঝিয়ে দেওয়া। হইহই করে কাজ হয়েছিল সেদিন। বিশাল এক দেওয়াল পত্রিকা বানানো হল ওদের গল্প দিয়ে ওদের নাম সমেত। এত খুশি হয়েছিল সেদিন বাচ্চারা ভাবা যায় না। এই সেশনগুলোই হয়তো ওদের মধ্যে কাউকে অন্য কিছু হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখাবে, সম্ভাবনা তো থাকে, ভবিষ্যৎ আমরা কে জানি? কেউ না। তাই ভাবি, চেষ্টা চলুক, সম্ভাবনাগুলো বেঁচে থাকুক অন্তত।
গুড টাচ ব্যাড টাচ, বয়ঃসন্ধির বাচ্চাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এর ফলে অনেক আগেই বাচ্চারা সাবধান হতে পারে, বুঝতে পারে অপরপক্ষের অভিপ্রায়। এই ট্রেনিংগুলো হত দারুণ দক্ষতার সাথে এবং বাচ্চাদের গায়ে হাত না দিয়ে। বোর্ডে অথবা মেঝেতে মানব শরীরের রেখাচিত্র এঁকে চিহ্নিত করা হত কোন কোন অংশগুলো আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত অংশ, আমাদের অনুমতি ছাড়া কারও সেইসব অংশে হাত দেওয়ার অধিকার নেই। আবার স্বাভাবিক সৌজন্যবশত যে অংশগুলি দিয়ে আমরা অপরের সাথে সংযোগ স্থাপন করি যেমন হাত, সেক্ষেত্রে স্পর্শের পার্থক্য থাকে। স্বাভাবিক সৌজন্য ও ভোগের লালসা— দুইয়ের স্পর্শ আলাদা, এও বোঝানো হত। স্পর্শ, দৃষ্টি, অঙ্গভঙ্গির স্বাভাবিক ও বিশেষ অভিপ্রায়ের জ্ঞান যাদের থাকে— তারা নিজেদের ও বন্ধুবান্ধব সঙ্গীসাথিদের বিপদ থেকে বাঁচাতে সক্ষম হয়। নিঃসন্দেহে এনজিওতে ট্রেনিং নেওয়া বাচ্চারা এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন হয়ে ওঠে। আবার এই স্পর্শের পার্থক্য যে আছে, তা আমাদের বলার আগে ছেলেমেয়েরাই বলে দিত ওদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই। ফলে এই ট্রেনিংয়ে যৌনতা নিয়ে কথা বলার অভ্যাসও তৈরি হত। এই সময়ে আমার বাইরের জগতের কথা মনে হত খুব, কারণ এমন খোলামেলা পরিসরে যৌনতা নিয়ে কথা বলার অভ্যাস আমাদের মধ্যবিত্ত পরিসরে এখনও তেমন গড়ে ওঠেনি, বরং অনেক ট্যাবু আছে এ নিয়ে।
মেয়েদের ঋতুস্রাব-জনিত সমস্যা, স্যানিটরি ন্যাপকিনের ব্যবহার সে-সময় মেয়েদের কী কী শারীরিক সমস্যা হয়, তাদের খাওয়াদাওয়ার যত্ন রাখা, ভারী কাজ এ-সময় মায়েদের-বোনেদের করতে না দেওয়া অর্থাৎ এ-সময় তাদের খেয়াল রাখতে শেখানো হত ছেলেদেরও। এগুলো শুধু যে একদিনের ট্রেনিং হত এমন না, প্রায় প্রায় এ নিয়ে ওদের সাথে কথা হত, স্যানিটরি ন্যাপকিন হাতে ধরিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করা হত কী কাজ এর, কেন এটা খুব প্রয়োজনীয়, ইত্যাদি। যত্ন ও সম্মান এইদুটো বিষয় মানুষের জন্য মানুষের থাকা এর মধ্য দিয়েই শেখানো যায়। এ-সব প্রথম প্রথম যখন শুরু হয় এনজিওর কর্মীদের মারতে তাড়া করেছিল এলাকার কিছু বয়স্ক মানুষ। ধৈর্য ও জেদ এদুটি এক্ষেত্রে খুবই দরকার, সোজা দাঁড়িয়ে থেকে ধারাবাহিক কাজ করা, এবং এ কাজে এনজিওগুলো সফল। এই অঞ্চলে কিছু ছেলেমেয়ে তো অবশ্যই তৈরি হয়েছে, যারা পাচারের গন্ধ পায়, দৌড়ে খবর দেয় এনজিও-তে অথবা ফোন করে চাইল্ড লাইনে। নিজেরা চেষ্টা করে নেশা থেকে দূরে থাকতে, নজর রাখতে শেখে কে কোথায় কী করছে, বিপদে পড়লে প্রথম ওরা ধরে হাতটা, সেই বা কম কীসে?
সোনাগাছির আনাচে-কানাচে
এ এক বিশাল অঞ্চল, তার কয়েকটি লেনেই সীমাবদ্ধ ছিল আমাদের যাতায়াত। গলি তস্য গলি সরু হতে হতে কোনও কোনও রাস্তা দু’টি বাড়ির মাঝের ফাঁক গলে যেত। পরিচ্ছন্নতায় কলকাতার সুনাম না থাকলেও এ অঞ্চল রীতিমতো জঞ্জালে ভরা, এটাই এখানে স্বাভাবিক। সাফাইকর্মী অবশ্য সবসময় চোখে পড়ত, বারেবারেই ঝাঁটা হাতে পরিষ্কার করত তারা, তবু ঘণ্টাখানেকের বেশি পরিষ্কার থাকত না রাস্তা। সকালে যখন ঢুকতাম ৮/৮:১৫ নাগাদ তখনকার অবস্থা থাকত সবচেয়ে খারাপ। যে বাড়িতে সেন্টারের ঘর, সে দরজার আগের দরজাগুলোতে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে থাকত মেয়েরা। একটি কমবয়সি মিষ্টি দেখতে মেয়ে ছিল ওদের মধ্যে, রোজই দেখা হলে দু’তরফে হাসি বিনিময় হত। একদিন একটা হালকা গোলাপি রঙের জামা পরে দাঁড়িয়েছিল। বললাম, খুব সুন্দর লাগছে, হাসিতে ধন্যবাদ দিল। তখন দাঁত ছিল ঝকঝকে, চামড়া উজ্জ্বল, চোখে লেগে থাকত হাসি, ঝকঝক করত। আস্তে আস্তে দাঁতে পড়তে শুরু করল দাগ, চোখের কোণে পড়ল কালি, সাজগোজও হতে থাকল কড়া, গালে রুজ, আইশ্যাডো ক্লান্তি ঢাকতে ব্যবহার করত হয়তো। আর একটি মেয়েকেও দেখতাম রোজ, খুবই ময়লা জামাকাপড়ে ঘুরতে থাকত একা, রোগা চেহারায় চোখ মুখ ঠোঁট ফুলে ঢোল, অতিরিক্ত বাংলা মদ পেটে গেলে যেমনটা হয় সে-রকম। কাজ করার অবস্থায় আর নেই, কোনওদিন দেখি বেহুঁশ রাস্তার পাশে পড়ে থাকে, কোনওদিন চায়ের দোকানে এসে চুপ করে এক পাশে দাঁড়ায়। পয়সা দিতে পারে না, দোকানি বা পাড়ার কেউ পয়সা দিলে চা-বিস্কুট খায়।

আর একজনের সাথে কথা হত প্রায়, তিনি প্রায় মধ্যবয়সি, একা থাকেন একটা ঘর ভাড়া নিয়ে। কথায় কথায় জেনেছিলাম, গ্রামের বাড়িতে মা, ভাই, ভাইয়ের বউ, তাদের ছেলেমেয়ে সবাই আছে, পুজোপার্বণে যান গ্রামের বাড়ি। কোনও নেশা করেন না, এ কথার সত্যতা মেলে ওনার দাঁত ঠোঁট চোখের কোলে। সারাদিন কাজ করেন কিন্তু রাতে বেরন না। প্রতিবার কাস্টমার বেরিয়ে গেলে উনিও শাড়ি বদলে আবার এসে দাঁড়াতেন গলির মুখে। মাঝবয়সে মেয়েদের চাহিদা যেমন এখানে কমে তেমিই কম রোজগেরে দরিদ্র পুরুষও আসেন এখানে যৌনচাহিদা মেটাতে। তাই ২০০/২৫০ টাকাতে কাজ করতে হলেও উনি সেটাই করবেন, কখনওই ছিনতাই করবেন না। কথায় কথায় বলতেন, কেন মানুষের সর্বনাশ করব বলতে পারো? ভয়ে এখন এখানে লোক আসে কম, ছিনতাই করে সোনাগাছির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। কিছু মেয়েরা গ্যাং বানিয়ে নতুন লোক কেউ এখানে ঢুকলেই ধরে, সে ডেলিভারি বয় হোক বা অন্য কোনও কাজে ঢুকে থাকুক, তার সর্বস্ব লুটে এমনকি জামাকাপড় ছিঁড়ে ছেড়ে দেয় রাস্তায়, এমন চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা আমারও হয়েছে। কিন্তু শুধু সেইজন্যই সোনাগাছির বারোটা বাজেনি। উনি হয়তো জানেন না এখন আরও অনেক পন্থা আছে, জায়গা আছে যেখানে যৌনব্যবসা চলে, সোনাগাছি এখন আর একমাত্র জায়গা নয়। ছিনতাই শুধু যে মেয়েরা করে এমন না, ঘরে ঢুকে মেয়েদের টাকা মোবাইল সব নিয়ে পালায় এমন কাস্টমারও আসে এখানে।
তবে সোনাগাছির সাজো সাজো রব দেখেছিলাম ভোটের সময়। সারাদিন মেয়েরা ব্যস্ত, যত বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনী আসবে রাজ্যে তত বেশি মেয়েদের কাজ হবে সোনাগাছির। যে মেয়ে পসার জমাতে পারে, পয়সাওয়ালা বাবু পায় এবং সে যদি চোর-চিটিংবাজ না হয় তবে মেয়েটির জীবন খানিক স্বস্তির হবে, নইলে তার অবস্থা হবে ওইভাবে রাস্তায় ঘোরা, নইলে রোগে জর্জরিত হয়ে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়া। এই দুয়ের মাঝামাঝি রাস্তা কিছুজন বের করেছে ছিনতাই ইত্যাদিতে। জোর যার জীবন তার। লড়াইটা বাঁচার। কাকে, ঠিক কাকে ভুল বলব জানি না, গুলিয়ে যায় সব কঠিন বাস্তবের সামনে দাঁড়িয়ে।
আত্মহত্যা এখানে ভীষণ স্বাভাবিক বিষয়, কয়েকদিন পুলিশ আসে খোঁজখবর করে, তারপর আবার গতানুগতিক জীবন চলে। একদিন সকালে দেখলাম পুলিশে ভর্তি রাস্তা, জানলাম একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। কেন করেছে, কী বৃত্তান্ত সে বিষয়ে অনেকরকম কথা আসবে কানে। ঝেড়েবেছে বিষয়টা হল এই, মেয়েটি কমবয়সি কিন্তু সাংঘাতিক অসুস্থ হয়ে পড়েছিল কিছুদিন যাবৎ, সঙ্গে থাকত যে লোকটি, সেটি আর বসে খেতে পারছিল না সম্ভবত, মেয়েটি কাজ না করলে তাকে খাওয়াবে কে? দালালি ছাড়া সে তো কিছু করে না, তাই তাকে নিশ্চয় নতুন মেয়ে খুঁজতে হবে, তার হয়ে দালালি করবে, তার বাবু সাজবে, পা টিপে দেবে, মদ, পান এনে দেবে, তার গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য আর কিছু করতে হবে না, তাই সে পালিয়েছে। মেয়েটি এমনিতেই যন্ত্রণায় কাতর, তায় টাকাপয়সা সর্বস্ব নিয়ে যদি কেউ পালায় তার বাঁচার আর পথ থাকে না। এখানকার বেশিরভাগ ছেলেদের এটাই কাজ, দালালি করা। গতর না খাটিয়ে যদি বসে খাওয়া চলে, তবে আর কেউ খাটবে কেন? মেয়েরা এত এতবার ঠকেও কেন এদের প্রশ্রয় দেয়, সে উত্তর খুঁজতে গেলে হাতে মিলবে পুরুষতন্ত্র, এই সিস্টেম, যা নারীকে পুরুষের অধীন থাকতে শিখিয়েছে, সঙ্গে একটা পুরুষমানুষ নিয়ে বাইরে বেরতে শিখিয়েছে, হাতে শাঁখা-পলা, সিঁথিতে সিঁদুর পরে গর্বিত হতে শিখিয়েছে। তারই রোজগারের পয়সায় মদ গিলে পুরুষ যদি তাকে মারে, তা সইতে শিখিয়েছে, মারের দাগ মেকআপে ঢেকে আবার আরেক পুরুষের চাহিদা মিটিয়ে রোজগার করতে শিখিয়েছে। পুরুষের ক্ষমতা প্রদর্শনের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান নারী শরীর, এর কোনও বিচার হয় না, কারণ আদতে সমাজ মনেই করে না এ ঘোরতর অন্যায়, তাই বাবা নাবালিকা মেয়েকে ধর্ষণ করে গর্ভবতী করে দিলেও কোর্ট তাকে বিরলের মধ্যে বিরলতম মনে করে না, সেখানে যৌনকর্মীর আর কীসের মানমর্যাদা! শুধু আইন বানিয়ে সমাজ পরিবর্তন হয় না, যদি মানুষের পরিবর্তন না হয়, কারণ আইন প্রয়োগ করবে তো মানুষই, সে যদি নিজেই এই সিস্টেমের সুবিধাভোগী হয়, তবে অন্যথা হবে কীভাবে? এর মাসখানেক পর কাছের আর এক গলিতে আবার একটি মৃত্যু, এবার একটি বছর ২৩/২৪-এর ছেলে। অস্বাভাবিক মৃত্যু বলছে কেউ, তো কেউ বলছে হার্ট অ্যাটাক। পোস্ট মর্টেম হবে, জানা গেল তার কোনও কাগজপত্র নেই। আধার, রেশন, কোনও কার্ডই নেই। কাউন্সিলরের সহায়তায় শেষকাজ হল। মারা গেল লিভার খারাপ হয়ে, রক্তবমি করে। ছোট থেকে মদ গাঁজা নানারকম নেশায় শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেছে এইটুকু বয়সে। এ বাজারে শুধু মেয়েরা নয়, মরছে ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সবাই। এ অবস্থার বুঝি কোনও উন্নতি নেই।

উত্তর কলকাতার পুরনো বাড়ি সম্বন্ধে বহু পুরনো অভিজ্ঞতা আছে আমার। তখন পড়াতে যেতাম একজনের বাড়িতে, আরও তিনজন আসত ওর বাড়ি। গলির শুরু থেকে শেষতক একটাই দেওয়াল, মাঝে মাঝে দরজা, এক একটা দরজায় এক এক পরিবারের বাস, নম্বর আলাদা। প্রথম প্রথম অন্য দরজায় টোকা দিতাম, এক ভদ্রলোক খবরের কাগজ পড়তেন সামনে বসে আঙুল তুলে দেখাতেন পরের দরজার দিকে। পরে দরজা গুনে ঠিক দরজায় কড়া নাড়তাম। সোনাগাছিতেও এই একইরকম ছিল বাড়িগুলো। দরজা দিয়ে ঢুকলে চৌকো চাতাল সেখানে কর্পোরেশনের জল আসে, কলের সাথে পাইপ লাগানো, চারদিকে পরপর ঘর আর ঘর লাগোয়া টানা বারান্দা। বাসন মাজা, কাপড় ধোয়া এবং স্নান সবই চলে ওই চাতালে। ছেলে বুড়ো মহিলা সবাই পালা করে কাজ সারে সেখানে। দোতলা তিনতলা থেকে নীচে তাকালে অদ্ভুত লাগে সেই চাতাল। অনেক বাড়িতে দোতলায় লোহার হালকা জালি লাগানো থাকত চাতালের মাথায়, জানি না হয়তো আত্মহত্যা আটকানোর কোনও উপায় অথবা শুকোতে দেওয়া জামাকাপড় যাতে চাতালে পড়ে নোংরা না হয় তার জন্য লাগানো হয়েছে। জানি না, কিন্তু এই মৃত্যুগুলোর পর মাঝেমাঝেই স্বপ্ন দেখতাম কেউ একজন বাঁচতে চাইছে, আমাকে ডাকছে আমি তার কাছে পৌঁছতে পারছি না, তারপর উপর থেকে রক্তাক্ত একটা মেয়ে এসে পড়ছে ওই তারজালিতে।
ঘুম ভেঙে যেত, কষ্ট হত খুব। সহমর্মিতা নিজের মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এ আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে শিখলাম। কাজ ছাড়ার পর প্রায় মাস দুই ভাল করে ঘুমাইনি, সর্বক্ষণ বাচ্চাদের কথা, এই মেয়েদের কথা মনে পড়ত। শুনতে পেতাম ওরা যেন ডাকছে আমায়, নিজের ছেলেমেয়ের সাথে কোথায় যেন ওদেরকেও জুড়ে নিয়েছিলাম মনে মনে। এ লেখা লিখতে গিয়ে আবার আমার মনের ক্ষত থেকে খানিক রক্ত ঝরল, কান্না হয়ে গড়িয়ে এল গাল বেয়ে।
এই এক একটা বাড়িতে অনেকগুলো পরিবার বাস করত, এক একটা ঘরে। মেয়েরাও থাকত, কাজ করত, বিকেলে রকে বসে গল্প করত নিজেদের মধ্যে, দেখা হলে আমিও জুড়ে যেতাম ওদের গল্পে। নাইটি থেকে শাড়ি, গয়না সব নিয়ে আসত ফেরিওয়ালা এ অঞ্চলের গলিতে। মেয়েরা দেখেশুনে কিনে নিত। দেখো তো দিদি, কোনটা ভাল লাগছে? এর উত্তর যথেষ্ট কঠিন, সাজানো কথা বলতে বাধে, আন্তরিক প্রশ্নে আন্তরিক উত্তর দেওয়া বাঞ্ছনীয়, যথাসম্ভব তাই দিতাম। যারা একটু সচ্ছল তারা থাকে একটু বড় ঘরে, কাঠের বা রট আয়রনের খাট, আয়না লাগানো আলমারি ফ্রিজ, টেবিল এসব থাকে আসবাবপত্রের তালিকায়। বেশিরভাগেরই ঘর একটা পায়রার খুপরি, বারান্দায় স্টোভে কোনওরকম রান্নার ব্যবস্থা। রোজগার ও ছেলেমেয়ে বড় করা সবই একটা ঘরে, তাদের জীবন আরও খারাপ। বেশিরভাগ সময় একটু বড় বাচ্চারা ঘোরে রাস্তায়, ঘরে লোক এলে, মায়ের কাজের সময়ে। সকালে ২০ টাকার একটা নোট নিয়ে চলে যায় কচুরির দোকানে সারাবেলার জন্য হয়ে গেল খাওয়া। এরপর কখন মা রাঁধবে আর খেতে দেবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। শরীর, মন আর মগজের সমস্ত পুষ্টি থেকেই বঞ্চিত এই বাচ্চারা। টেলিভিশন বা ফোন দিয়ে আটকে রাখার প্রবণতা এখানেও একইরকম চালু নিয়ম। যন্ত্র থাকলেও বয়ঃসন্ধি এমন একটা সময়, যে সময়ে ছেলেমেয়েদের তাদের বয়সি ছেলেমেয়েই লাগে। নিজের শরীরের পরিবর্তন মনের পরিবর্তন সে যে সঠিক বোঝে তা নয়, সমবয়সিদের মধ্যে একই বিষয় দেখে তাদের অন্তত একা লাগে না। দশজনের মধ্যে দু’জনও হয়তো তাকে বোঝে বা বুঝতে চেষ্টা করে। অনেক না জানা, অনেক ভুল জানা তাদের অস্থির করে, প্রশ্ন থাকলেই তার উত্তর নিজেদের মধ্যেই যে পাওয়া যাবে তাও নয়, ছটফট করে সারাক্ষণ। প্রেম আর শরীর অল্পবয়সেই টেনে নেয় তাদেরও।
এখানকার ছেলেমেয়েরা আশেপাশের সরকারি স্কুলে পড়ে। হাতেগোনা কয়েকজন যায় ইংলিশ মিডিয়ামে। ওদের স্কুলে প্রজননতন্ত্র চ্যাপ্টারটা পড়ায় না। ওদের সাথে কথা বলেই বুঝেছি, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য কোনও বিষয়েই স্বচ্ছ প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও নেই ওদের। প্রজননতন্ত্র মোটেই পড়ানো হয় না, স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকা বলেন, ওই চ্যাপ্টারটা নিজেদের পড়ে নিতে। অদ্ভুত মানসিকতা, অবশ্য এইধরনের মানসিকতার মানুষই বেশি আমাদের সমাজে তা সাম্প্রতিক ভাইরাল আলোচনাগুলো শুনলেই বোঝা যায়। যাইহোক, মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে এইরকম কয়েকটি ছেলেমেয়েকে বোঝালাম প্রাথমিক বয়ঃসন্ধি সময়ের শারীরবৃত্তিয় পরিবর্তনগুলো, কেন হয় ইত্যাদি এবং প্রজননতন্ত্র সম্বন্ধে। সবটাই যদিও বই ছাড়া। বইখাতা নিয়ে পড়তে বসালে ওরা দু’মিনিট বসবে না, গল্প করলে এক ঘণ্টা পার করে দেবে। চট করে একজন বলে উঠল, জানো ম্যাম, আমার দাদাজি বলে, আমি নাকি রোজ মাস্টরবেট করি তাই আমি এমন রোগা। বলো ম্যাম বলো, এটা কি সত্যি? আমি রোজ করিই না, উনি কী করে জানল? আমি তো ছোট থেকেই রোগা, এ-সব বললে মাথা গরম হয় না বলো? সত্যি তো হয় তো। এই বয়সের ছেলেমেয়েদের বন্ধু হয় না বাড়ির লোক, শুধু দোষারোপ আর বকাঝকা দিয়ে আগলে রাখতে চায় কিন্তু এই ব্যবহারগুলোই ছেলেমেয়েগুলোকে বেয়াদপ বানিয়ে ফেলে।
অল্পবয়সি নিজের মেয়েদের সাজিয়েগুজিয়ে নাচিয়ে ঘরে আসর বসানো মাও যেমন আছে সোনাগাছিতে, আবার স্বামী-পরিত্যক্ত নারীর দেহব্যবসায় না গিয়েও ছেলেমেয়েদের বড় করার লড়াইও আছে এইখানেই। চায়ের দোকান, মুদিখানা, আলু পরোটা, ঘুগনি রুটি বিক্রি করে সংসার টানছে মেয়েরা। পুরসভার সাফাইকর্মী হয়ে, লোকের বাড়ি রান্না ও ঠিকে কাজ করেও বেঁচে থাকে মায়েরা। যদিও ভদ্রলোকেরা রান্না ও ঠিকের কাজ করা মেয়েদেরও পারলে বিছানায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। তবে পেরে ওঠে না সবসময়, কারণ মুখরা বদনামই এক্ষেত্রে এদের রক্ষাকবচ, চাইলে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দিতে এদের দু’মিনিট লাগে।
সেক্স এবং জেন্ডার
যৌনতা শুধু শারীরিক সম্পর্ক বোঝায় না। যৌনতা হল তাই, যা নিয়ে আমরা জন্মগ্রহণ করি, নারী/পুরুষ/ইন্টারসেক্স। জন্মে আমাদের হাত নেই কিন্তু জন্মের পর যা ঘটে অর্থাৎ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আমাদের মাথায় যা কিছু ঢুকিয়ে দেয়, এই তিন ধরনের মানুষের জীবনযাপন সংক্রান্ত যে ধারণা দিয়ে দেয়, তাকেই বর্তমানে বলা হচ্ছে জেন্ডার। মেয়ে হলে সে কেমন পোশাক পরবে, রাতে বাইরে যাবে না বা একা বাইরে যাবে না, জোরে কথা বলবে না, জোরে হাসবে না, শরীর যথাসম্ভব ঢাকা দিয়ে থাকবে ইত্যাদি প্রভৃতি যা নিয়ম মেয়ের জন্য আছে, তা কিন্তু ছেলের জন্য নেই। ছেলেদের বরং অতিরিক্ত লাইসেন্স দেওয়া হয়, রাতে বাইরে থাকার, নেশা করার, রাগ দেখানোর, মারপিট করার ইত্যাদি প্রভৃতি। জেন্ডার বাহ্যিক বিষয়, যা দিয়ে যৌনক্ষেত্রে পৃথক দুটি মানুষকে ব্যবহারিক ও অভ্যাসগতভাবে আলাদা করে গড়ে তোলা হয়। এভাবেই পরস্পরের থেকে বহুদূরে পাঠিয়ে দেয়, প্রতিপক্ষ বানিয়ে দেয় সমাজই। ছোট থেকেই একদল শক্তিমান ও আর একদলকে যদি দুর্বল প্রতিপন্ন করে রাখা যায়, তা হলে শোষণ করা সুবিধেজনক হয়। নারীর জন্য ঘর, ঘরের যাবতীয় কাজ নির্দিষ্ট থাকলে গৃহশ্রমের থেকে মুক্তি পায় পুরুষ। রোজগার পুরুষের হাতে থাকলে সংসারের যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ তার হাতে রাখতে সুবিধে হয়।
যে জগতে নারীই মূলত রোজগেরে সেখানে কেন তবে তার এত জীবন এমন কদর্য? কারণ সে মানুষটাই এখানে পণ্য। ‘যদি ভাবো কিনছ আমায়, ভুল ভেবেছ’ খদ্দেরের সাথে এমন ভাবই রাখে মেয়েরা কিন্তু যতক্ষণ সে খদ্দের থাকে ততক্ষণ। প্রেমের ফাঁদে পড়েছে যেই, মন সমেত সমস্ত বিকিয়ে দিতে আর দেরি লাগে না। আসলে এ বাজার শুধু শরীরের-যৌনতার নয়, আবেগ, ভালবাসা, দরদ, প্রেম, সহানুভূতি, সহমর্মিতা সব বিকোয় এ হাটে।
আমাদের দেশে পুরুষ নারী জন্মের শতাংশের হিসেব (ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী) ২০২৫-এ হল ৫১.৬% পুরুষ এবং ৪৮.৪% মহিলা। গ্রামাঞ্চলে ৯৪৯ জন মেয়ে প্রতি ১০৩৭ জন ছেলে জন্ম হয়, সেখানে শহরাঞ্চলে ৯২৯ জন মেয়ে জন্মায় ১০২০ জন ছেলে প্রতি। মেয়ে কম জন্মায়, কারণ তাদের জন্মাতে দেওয়া হয় না, শহরাঞ্চল এ বিষয়ে এগিয়েই আছে। সোনাগাছিতে মেয়ে জন্ম দামি হলেও তার কদর নেই, স্বাধীনতাও নেই। আগ্রাওয়ালি পরিবারে আবার মেয়ে জন্ম আকাঙ্ক্ষিত, তার যত্নও প্রচুর। খাইয়ে পরিয়ে যত্নে বড় করে মেয়েকে, তৈরি করে ভবিষ্যতের যৌনকর্মী হিসেবেই। সে জন্মেছে কেবল পুরুষের মনোরঞ্জন করে রোজগার করতে। এখানে রোজগার করলেও তার নিয়ন্ত্রণ তার হাতে নেই, থাকে না। ঠকতে ঠকতে কিছু ক্ষেত্রে সে নিজেও ঠকাতে শিখে যায়, তবু বেশিরভাগই ভালবাসার কাঙাল, একটু আদর একটু যত্ন পেলেই সর্বস্ব দিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবে। ফুরিয়ে যাবে জীবন নেশায় অথবা রোগে, স্বাভাবিক মৃত্যুর আগেই মরবে সিলিং থেকে ঝুলে নয়তো ছাদ থেকে পড়ে, যখন প্রতিদিন মরে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা আর সইবার ক্ষমতা থাকবে না।
পারিবারিক বা সাংসারিক জীবন হোক না যৌনকর্মী মেয়েরা আদতে বন্দি পুরুষতন্ত্রের খাঁচায়। মুক্ত মানুষের চাই মুক্ত পরিসর, পুরুষতন্ত্রের অবসান ব্যতীত নারীদের মুক্তির কোনও পথ নাই। ঘরেবাইরে পুরুষতান্ত্রিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইটাই নারী-পুরুষ সকলের লড়াই। কিছুদিন আগে নারীবাদী একজন সমাজকর্মীর বক্তব্য শুনছিলাম, তিনি বলছেন, মেয়েদের স্বাধীনতা দিয়ে দাও, দেখো ছেলের মতো মেয়েও সংকটকালে তোমার লাঠি হতে পারবে। ‘স্বাধীনতা দিয়ে দাও’ কথাটিতেই আমার আপত্তি আছে। দিয়ে দেওয়া মানেই আবার সেই পিতৃতন্ত্রকেই অধিকারী মেনে নেওয়া হল। প্রতিটা মানুষ জন্মায় স্বাধীন হয়েই বিভেদ না করে নারী পুরুষ ক্যুইয়ার, স্পেশাল চাইল্ড সবার সমান অধিকার আছে এই পৃথিবীতে। আবার শুধু মানুষ না জল জমি জঙ্গল সেখানের জীবজগৎ সবাই এই পৃথিবীর সন্তান, সবার সমান অধিকার। পৃথিবীটা একা মানুষের বাপের না তাদের বাপেরও।
শেষকথা
আমার জীবনের এক জোরালো স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল সোনাগাছি আর সেন্টারের বাচ্চাগুলো। ভীষণভাবে চাই ওদের সাথে কোনওদিন দেখা হয়ে যাক ওই বাজারের চৌহদ্দির বাইরের কর্মজগতে। হয়তো তখন বুড়ি হয়ে যাব কিন্তু ওদের ঠিক চিনতে পারব, কখনও কোনও সম্মানজনক কাজে ওদের দেখলে। চাই ওদের সমস্যার কথা ওরা বলুক, সমাধান ওরা ভাবুক, সচেতন হয়ে কাজ করুক নিজেদের অবস্থার উন্নতিতে। আবারও অনেক বেশি হয়তো চেয়ে ফেলছি, চাইছি কারণ আশা ছাড়া বাঁচার আর কোনও মন্ত্র আমার জানা নেই। তাই আশা করি, স্বপ্ন দেখি, একদিন এ সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা হবেই।
চিত্রণ: ধৃতিসুন্দর মণ্ডল, চিত্র: লেখিকা








6 Responses
পড়লাম।খুব আন্তরিক লেখা।প্রতিটা ভাবনার পিছনে সত্যিকারের ভালবাসা অনুভব করা যায়।কিন্তু ওই…ধাঁধার মত..কি যে করা যায় শেষ পর্যন্ত,কি করলে যে কিছু করা হবে সেটাই বোঝা হয়ে ওঠে না।খুব হতাশ লাগে।শুধু সোনাগাছি কেনো আমাদের চারপাশে তথাকথিত স্বাভাবিক সমাজে থেকেও কত মেয়েরা একইরকম অবস্থার স্বীকার।হয়তো মুখোশটা এতো ভালোভাবে এঁটে নেয় তারা যে,সেটাই কখন মুখ হয়ে ওঠে।তবুও লেখিকাকে ধন্যবাদ কিছু হলেও তিনি তো চেষ্টাটা করেছেন,আশাও করছেন। আমরাও সেই আশা করাটাকেই পথ হিসেবে মেনে নিই আপাতত…
হ্যাঁ ওই আশাটাই সম্বল আমাদের
Such a detailed ,compassionate study of human life.Language specially shows that every human life needs respect.The author has observed the people of a red light area so closely.
Thank you ❤️
সত্যি কথা বলতে কি স্তম্ভিত, দুটো কারণে প্রথমত এরকম বাস্তবতা পাইনি আগে, দ্বিতীয়ত লেখিকার লেখনীর সাথে এই প্রথম আলাপ।
ধন্যবাদ 😊