Search
Generic filters
Search
Generic filters

সুজিত বসুর কবিতাগুচ্ছ

টুপিতে আমার পাথরের ফলা

‘লালচক থেকে ঘুরে আসি চলো’ মন্দ্র আদেশ:
মন্ত্রোচ্ছার! ঘন বিস্তার! বৃষ্টি অঝোর
মস্কোর পথে ঝরে অবিরল, বন্ধুর বেশ
কোনো বন্ধুর সর্পিলতায়, দৃষ্টির ঘোর
ছন্ন ছাড়ানো অঞ্জনময় জটিলতা ভরা;
টুপিতে আমার পাথরের ফলা, রেনকোটময়
বর্শা শাণিত ধাতব তুহিন, বড় অসময়
মৃগয়ার কাল রেড স্কোয়ারের ভিজে চত্বরে:
হরিণী হারানো অস্থিরতায় দুর্গ যে গড়া
ভগ্ন যা হবে প্রতি মুহূর্তে, কী যে পথ ধরে
চলেছি কেন যে জানি না, সহসা ভঙ্গুরতায়
কত বৃত হবে অস্ত্র আমার, গলার নিচেই
টাই হয়ে দোলে ফাঁসের বদ্বীপ, আমি যেন সেই
মেট্রোর দ্বারে চক্রে জড়ানো বন্দি কারায়।

*

সিংহনাদে বাজো না কেন

সজ্জা শেষে বাসে চড়েছি, পাঁচ কোপেকি মুদ্রা
ফেলব যেই মেশিনে, কেউ চকিত বেগে ঝাপটা
মেরেছে ঘন সোনালি চুলে, বনজ ভূমি তুন্দ্রা
উদ্বেলিত স্তনযুগলে, ত্রিকোণ প্রতিবিম্বে
শীতের জড় পাষাণ ভেঙে, এমন সময় সাপটা
শিথিলতাতে হিসিয়ে ওঠে, ‘সুজিত শোনো কিনবে
বিদেশি কিছু ধাতব গুলি, এবার থেকে, শোনোনি
বাষ্পধূমে কিছুটা মরে, কিছুটা প্রতিধ্বনিতে
শরীরে যত শত্রুগুলি, তীব্র কোনো অরণি
নাও না কেন মৃগয়াকালে, শিকারী তুমি কবে যে
দক্ষ হবে! লোহিত বিষ এভাবে তবে শোণিতে
জমানো কেন অহংকারী, একটু পরে স্টপেজে
নেমে তো যাবে পাতালে, তবে লম্বা চুলে কেশরে
সিংহনাদে বাজো না কেন, একটুখানি হাসি বা
জমাতে যদি পুরু অধরে, নখরে যদি ঝিকোনো
ছুরির ধার, সুজিত তাকে লুকিয়ে তুমি কি কোনো
ধন্যবাদে মুখর হবে, রুশভাষাতে ‘স্পাসিবা’!

*

কী যেন প্রহেলিকা

নেমেছি বাস থেকে, সন্ধানী দৃষ্টি
মস্কো নগরীর পাতালের সমুখে
তীক্ষ্ণ গম্ভীর, চারদিকে বৃষ্টি
মেট্রো দুয়ারেও, কুয়াশার ফোয়ারা
ঝরেছে গুঞ্জনে, সঙ্গের ধনুকে
কী যেন প্রহেলিকা, শিকারীও বুঝি বা
কেঁপেছে শঙ্কায়, সামনের দোহারা
মায়াবী বিভ্রম, ছলনায় গুপ্ত
চলেছে নিস্তেজ, এ কি তার পুঁজি বা
লব্ধ শান্তির বিতরণ! মহিমা!
হরিণী অদ্ভুত দেখাও কি লুপ্ত
তোরণ দম্ভের, ধ্বংস হিরোশিমা
অথচ পিছনে নিশ্চল শিকারী
কোমল কীরকম, কতখানি লিপ্ত
বৃষ্টির ছলনায়, অথবা এ বিকারই
জ্বরের, দাঁড়িয়েছি তাই বিক্ষিপ্ত।

*

পাতাল থেকে আরোহণ

পাতাল থেকে বেরিয়ে দেখি ভীষণ উঁচু এস্কালেটার
চলনবলন পোশাকআশাক, অস্ত্রগুলো ঠিক করে নিই
বিঘূর্ণিত ছিটকে যাব, এই রকমে স্বর্গসিঁড়ি
আমায় টানে নির্বিচারে, রেডস্কোয়ারে শেষকালে দ্বার
খুলবে হঠাৎ আমন্ত্রণে, সত্যি বুঝি তাই পোড়েনি
অগ্নিশিখায় চর্মকেশর, ক্রেমলিনের রক্ততারা
নিষেধ আলোয় জড়াও শরীর, দূরের বড় হোটেল থেকে
তীব্র শিহর বিজলিবাতি, লম্বা নখে একটু ছিঁড়ি
তন্তুজালের বিহ্বলতা, রিস্টওয়াচে প্রহর গোনা
হরিণীদের প্রহর গোনা, ধনুক হাতে মৃগয়া কে
করতে পারো লক্ষ্যভেদী, মস্কো নদী জলের লহর
বাজাও এত সর্বনাশা, শরীর জুড়ে এ যন্ত্রণা
আমায় বড় ব্যাকুল করে, হাতের থেকে ধাতুর গুলি
ছিটকে পড়ে আত্মঘাতে, সুজিত তুমি একটু কি জোর
দিচ্ছ আমায় সমর্থনে, শিকারটুকু গুছিয়ে তুলি।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

One Response

  1. ভালভাষাকে ধন্যবাদ; তাঁরা নিয়মিত কবি সুজিত বসুর কবিতা আমাদের মতো উন্মুখ পাঠককে উপহার দিচ্ছেন। এই কবিতা গুচ্ছে আষ্টেপৃষ্ঠে কবির যৌবনের স্মৃতিময়তার মুগ্ধ প্রকাশ।‌‌ কবিতার শরীর জুড়ে ভিন্ন দেশের অনুসঙ্গ কী অনায়াসে দেশ-কালের সীমা ভেঙেচুরে সার্বজনীন হয়ে ওঠে! এখানেই কবির কবিতার ম্যাজিক, সুজিত বসুর মুন্সিয়ানা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 + 1 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »