Search
Generic filters
Search
Generic filters

সুজিত বসুর একগুচ্ছ কবিতা

স্মৃতিতে অলি

ভিতরে প্রোথিত থাকি

ফটোগ্রাফ থেকে অলি মাঝে মাঝে উঠে আসে আশ্চর্য হরিণী
দুহাতে ছিল না কোনো পুষ্পশর ফুলধনু চুনি পান্না হিরে
ওভারকোটের ফাঁকে গোলাপি স্তবক চুড়ো দেখিয়ে কি ঋণী
এ অজর শিকারীকে, নিষাদ এখন এসে বুকখানি চিরে
বাহির করেছে তার শলাকা গম্বুজ আর শলাকার কোণ
শলাষড়যন্ত্র করে দেখায় রন্ধ্রের মুখ, এ পূর্ণিমা তিথি
ধূমকেতুভস্মে ধীর ভরে যাবে ভরে যাবে, পুচ্ছের গোধূলি
মস্কো নগরীর কত উলিৎসা সরণি ঘিরে মৃদু সংযোজন
এই ফটোগ্রাফময়, মৃত্তিকা শিল্পীর পটে বৃত্তের পরিধি
আশ্লেষে বন্দিনী করে কি আমার প্রতিমার দীর্ঘ করাঙ্গুলি
চোখের পিঙ্গল তারা, শ্বেত মুখমন্ডলের জ্যোৎস্নাময় দ্যুতি
সমস্ত ছাপিয়ে ওঠে গরাদ, ফাঁসের রজ্জু খড়্গ ঘাতকের
ছবির কোমল দেহে, ভিতরে প্রোথিত থাকি অমৃত কুম্ভের
আমি কি বরণডালা সাজিয়েছি ফটো ছিঁড়ে ভেঙে প্রতিশ্রুতি!

***

দুপাশে শৃঙ্খল আর কারা

তৃষিতের মতো এই চেয়ে থাকা মস্কোর রাস্তাতে
রুপোলি পরীর ঢেউ হিমভেজা বৃষ্টির সকালে
মেট্রো থেকে বেরোতেই কলস্বনা, ঝাপটা মারে, তাতে
বর্ষালি বর্ষার ফলা, অন্ধচোখ গোলাপি ও লালে
প্রভেদ বোঝে না যেন, অলি তুমি গ্রীষ্মের ছুটিতে
হিমের কয়েকটি কণা স্কার্টে মেখে সংগীত শিবিরে
শান্ত অবগাহনের স্রোতে মগ্ন, জরির বুটিতে
কলঙ্কের বিন্দুগুলি রেড স্কোয়ারের এই রক্তিম নিবিড়ে
জ্বলে জ্বলে পুঞ্জময়, গোরকি পার্কে ভীষণ আরতি
অধরে, মসৃণ ভাঁজে, চামড়ার বর্ম ঘিরে ধোঁয়া
ঘনায়, মেট্রোর চাকা ঝমঝম গভীর মন্দ্রে, জ্যোতি
ঘনিষ্ঠ উদ্ভাসে স্থির, উন্মীলিত বাহুমূল ছোঁয়া
যাবে না তোমার অলি, দুপাশে শৃঙ্খল আর কারা
ঠোঁটের পাষাণ স্পর্শে আমার দুঠোঁটে নামে শুধু রক্তধারা।

***

অলির জন্য মন্দির

অর্কেস্ট্রার সুরে বেজে যায় যে মূর্ছনা
তাতে ভেসে ওঠে শুধু বিষাদের প্রতিচ্ছবি
অতীতে আকাশে ছড়ানো সূর্যোদয়ের সোনা
এখন সেখানে রক্ত মাথায় অস্তরবি।

সে কোন ধূসর অতীতে দিয়েছি প্রতিশ্রুতি
অলির জন্য মন্দির গড়ে তার প্রতিমা
বসাব বেদিতে, প্রয়োজনে দেব আত্মাহুতি
তা শুধু ছলনা, পেরিয়েছি অপযশের সীমা।

অলির জন্য মন্দির গড়ে জ্যোৎস্নারাতে
ভেবেছি সাজাব নৈবেদ্যের বরণডালা
কবে ভুলে গেছি, এখন নিজেকে প্রশ্নাঘাতে
ক্ষতবিক্ষত করেও মেটে না মনের জ্বালা।

অজান্তে কবে ঘটেছে নিজের পদচ্যুতি
দুষ্ট গ্রহের মতো আর্থিক শিথিল জটা
গ্রাস করে নেয়, স্বপ্নে কেবল লাল মারুতি
বুকে বাসা বাঁধে পাখির ধূসর বিষণ্ণতা।

শ্রাবণের উত্তাল নদী হয়ে খরস্রোতা
বয়ে যেত প্রেম বন্যার মতো গুঞ্জরনে
অলির জন্য মন্দিরে ছিল পবিত্রতা
দেখাত বিজন স্বর্গের পথ উত্তরণে।

ডিনামাইটের ধ্বংসলীলায় সে মন্দির
উড়িয়ে দিয়েছি, হয়েছি ভীষণ স্বেচ্ছাচারী
ঘরে ভেসে আসে জলজ কুমির অশান্তির
বুকের বেদিতে এখন শুধুই পণ্যা নারী।

***

অলি তুমি নেই

কতকাল যেন তোমার সঙ্গে কতটি কাল যে
দেখা সাক্ষাৎ হয়নি আমার, ওষ্ঠের মিল
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসরে কবে ওয়ালজে
ঘূর্ণনে ঘোরা চকিত নৃত্যে, রক্তপদ্ম
ঊরুর মিনারে ফুটে উঠেছিল, সরু হাইহিল
ভ্রষ্ট বুকের পাষাণে একটি কুয়াশাবিন্দু
রেখে গিয়েছিল বিষণ্ণতায়, ওই সরোবর
এখন মৃণালে হয় বহুভুজ, যুদ্ধ আঙিনা।

জঙ্গি গিটারে রণ ব্যাঞ্জোয় গীতিকা, কিন্তু
তুমি নেই বলে এই মার্বেল ভূমিতে বধ্য
জন্তুরা শোকে লুপ্তচেতন, ঐতিহাসিক
আদিমতা মাখা, ফ্লাডলাইটের আলোয় প্রখর
শবাধার এত স্বচ্ছ কাচের জানি না জানি না
দোনলা প্যান্টে বন্দুক থেকে ধাতব মাসিক
উল্কা অরণি রণে মেতে যাবে, জলাশয় ভরে
ঝলসানো হবে নিহত কুহেলি, নিষাদীরা আজ
ওড়নায় রাখে চুলকাঁটা তির, তৃতীয় প্রহরে
শিল্পীর কারুকলাতে যা হবে অস্ত্রের ভাঁজ।

অলি তুমি নেই, শঙ্কাশিহরে কখনো যাই না
নাচের ‘যুদ্ধে’, রুশ অনুবাদে যা শুধু ‘ভাইনা’।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

3 Responses

  1. কি অসাধারণ সব পংক্তি অনায়াস ছন্দে সাজিয়ে দিয়েছেন কবি। আপ্লুত হলাম। বর্ষিয়ান কবি কি সহজে আজও যৌবনের অমল আলোকে দীপ্ত হয়ে আছেন, উজ্জীবিত হয়ে আছেন, নিমজ্জিত আছেন, সে এই কাব্যময় উৎসার থেকে সহজে অনুমেয়। ভালভাষাকে অশেষ ধন্যবাদ, এই তোষামোদ-লাঞ্ছিত কবিতা-আবহে সুজিত বসুর মতো প্রবাসী কবির লেখা নিয়মিত পৌঁছে দিচ্ছেন।

  2. অমিতাভ ভট্টাচার্য
    কলকাতা. আবার অনেক দিনের পরে কবি শ্রী সুজিত বসুর নতুন এই চারটি কবিতা পড়ে খুব খুব ভালো লাগলো. ওনার যৌবনের স্মৃতি থেকে মনে হয় উঠে আসা “অলি * প্রতি ভালবাসা আপনাদের ভালো ভাষা digital এ প্রকাশ করার জন্যে অনেক অনেক ধন্যবাদ রইলো. আর আশা করি এইরকম সুন্দর সুন্দর লেখা আপনাদের ভালো ভাষা তে দেখতে পাব. কবি শ্রী সুজিত বসুর জন্যে রইলো আন্তরিক শুভেচ্ছা.

  3. আমার প্রিয় কবি শ্রী সুজিত বসুর লেখা প্রতিটি কবিতা পড়তে খুবই ভালো লাগে। এই চারটি কবিতাও ছন্দেভরা, আবেগ আপ্লুত, অর্থপূর্ণ পড়ে খুবই ভালো লাগলো। এই ধরনের সুন্দর সুন্দর কবিতা উপহার দেওয়ার জন্য কবিকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। কবির লেখা সুন্দর সুন্দর কবিতা পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ভালভাষা কে জানাই অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × three =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »