Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ছোটগল্প: অন্য সমীকরণ

সা য় ন্ত নী  ব সু  চৌ ধু রী

হোটেল টিউলিপ। শহরের এই নামী রেস্তোরাঁটি উঁচুতলার লোকজনের বড় পছন্দের জায়গা। এখানেই কোণঘেঁষা টেবিলে তারা মুখোমুখি বসে রয়েছে বেশ খানিকক্ষণ। বাণিজ্যনগরীর বুকে বিকেল এখনও ফুরোয়নি। আরব সাগরের উদার কোলে লুটিয়ে পড়েনি আসমানি বাতিদের প্রতিচ্ছবি। অস্তগামী সূর্যের আভা আলপনা আঁকছে শ্বেতশুভ্র টেবিলে। ত্রিকোণ, চতুষ্কোণ ইত্যাদি জ্যামিতিক নকশা ফুটে উঠলেও মানবহৃদয়ের চাওয়া-পাওয়ার হিসেব কষতে তারা অপারগ। সোনালি আভাতে দিতিকে আজ একেবারে অন্যরকম লাগছে। অনেকখানি আনমনা, যেন একটু চিন্তান্বিতও। অন্যদিনের মতো আজ ও কলকল করছে না। জানালা দিয়ে একদৃষ্টে আকাশ দেখে চলেছে। ওর চোখ অনুসরণ করে আয়নার মতো আকাশে সুশোভন কোনও মুগ্ধতা খুঁজে পেল না। দিতির মুখের ভাষা পড়ে নিতে গিয়ে আজ বারবার হোঁচট খাচ্ছে সে। আর ভেতরে ভেতরে চাপা অস্বস্তিটা তাকে আঁকড়ে ধরছে। দিতি আসার আগেই সুশোভন বিকেলের জলখাবারের অর্ডার দিয়েছিল। মিনিটখানেক হল সুসজ্জিত প্লেটারে খাবার সার্ভ করা হয়েছে। গ্রিলড ফিশ উইদ লেমন বাটার সস আর ধোঁয়াওঠা কফি। টিউলিপের যেকোনও মাছের পদই দিতির খুব পছন্দের। দিতি বলে, মাছের ব্যাপারে এরা নাকি ‘নম্বর ওয়ান’! মাছ ফ্রেশ হলে যা খুশি বানাও, স্বাদ ভাল হতে বাধ্য। কিন্তু আজ খাবারটার দিকেও ওর মন নেই। হালকা গলাখাঁকারি দিয়ে সুশোভনই নীরবতা ভঙ্গ করে।

—‘মৃণালের সঙ্গে কথা হয়েছে তোমার?’

একইরকম নিস্পৃহ ভঙ্গিতে দিতি বলে, ‘উঁহু!’

মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখেছিল সুশোভন। নেতিবাচক উত্তরে চমকে তাকায়। উল্টোদিকের মানুষটার মনের ভাব বুঝে ফেলে বুদ্ধিমতি দিতি দ্রুত নিজেকে শুধরে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

‘আমায় আর একটু সময় দাও শোভন! এই মাসটা পেরোলেই…! জানোই তো, ছেলেটা আমার বড্ড সেনসিটিভ। আমি ভাবছিলাম ওর এক্সাম শেষ হলেই না হয় কথাটা বলব। বলতে তো এবার হবেই, আমি জানি।’

শেষের কথাগুলো পুরু ধোঁয়াশায় আচ্ছাদিত। বাঁ-হাত একটু বাড়িয়ে দিতির কাঁধে আলতো চাপ দেয় সুশোভন। নরম সুরে বলে, ‘টেক ইয়োর টাইম, দিতি। আমাদের তো কোনও তাড়া নেই! তাই না?’

আজ দিতির চোখে সেই ভরসার আলো খুঁজে পাচ্ছে না সুশোভন। অসময়ের জলভরা দস্যু মেঘেরা যেন তার মুখের সবটুকু লাবণ্য গ্রাস করে ফেলেছে। দিতি মরিয়া কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘ইউ নো শোভন, ইটস নট আ ভেরি ইজি জব!’

সুশোভন আলতোভাবে দিতির হাতে হাত রাখে। চোখের ভাষায় প্রকৃত বন্ধুর মতোই ভরসা যোগানোর চেষ্টা করতে থাকে। যদিও বান্ধবীর অন্তঃস্থলের আলোড়ন থেকে থেকে তাকেও আন্দোলিত করছে আজ। তরতাজা একটা গোধূলি ক্রমেই বিষাদাতুর রাত্রিতে বদলে যাচ্ছে। নীরবতার পুরু আঁচল ঘিরে ধরছে ঝলমলে দুটি মানুষকে। ভারি পর্দার মতো একটা আড়ালও বুঝি জন্ম নিচ্ছে তাদের মাঝে। সুশোভন ক্লান্ত চোখদুটো মেলে দিয়েছে দূরে। আরব সাগরের তীর এখন তরল স্বর্ণস্নাত যে-কোনও তীর্থভূমির চেয়েও অধিক রূপসী। নানা বয়সের কত মানুষের ভিড় সেখানে! আকাশের বুকে নিজেদের নাম লিখে ঘরে ফিরছে উপকূলীয় বিহঙ্গদল। হঠাৎ সুশোভনের মনে হল ঘর মানে কি শুধুই ইট-কাঠ-পাথরের ওই তথাকথিত কাঠামো? নিজের চারধারে চারটি পুরু দেওয়াল আর মাথার ওপরের ছাদ? কেবলই সুরক্ষা? আর চার দেওয়ালের ভিতরটা যদি খাঁখাঁ হয়, কোনও মানুষ কি সেখানে আদৌ বাঁচতে পারবে! পশুরা বাসা বাঁধে নিজেদের অনাগত সন্তানকে নিরাপত্তা দিতে। মানুষও ঘর বানায় পরিবারের স্বার্থে। অথচ সুশোভনের মতো একলা মানুষের কাছে নিরাপদ আস্তানা যেন দূর দ্বীপের মাঝে এক বন্দিগৃহ। নেহাত ভদ্রসমাজের নিয়ম মেনে প্রতিরাতে তাকে চেনা ঠিকানায় ফিরতে হয়, নাহলে খোলা আকাশের নিচেই নিজেকে অনেক বেশি জীবন্ত বলে মনে করে সে। কী আছে ওই থ্রি বি এইচ কে-এর ফ্ল্যাটে? ক’টা জড় আসবাব, কিছু বইপত্র, ফাইল, সামান্য সম্পদ আর দমবন্ধ করা একরাশ একাকিত্ব! রক্তের সম্পর্ক বলতে জীবিত কেবল মা, তিনিও পড়ে রয়েছেন দেশের বাড়িতে। শিকড়ের মায়া ছাড়তে পারেননি। দিতি তো জানে সবই। তবে আজ এতগুলো দিন একপথে চলার পর ওকে এমন উদাসীন লাগছে কেন? ও কি এখনও বিশ্বাস করতে পারে না সুশোভনকে? অবশ্য স্বার্থলোভী কিংবা সুযোগসন্ধানী ভাবতেই পারে! দিতিকে দোষ দেওয়া যায় না। একজন বিত্তশালী কর্মরতা স্বামীহীনা তরুণীর হাত ধরতে চাওয়া মাঝবয়সী পুরুষের মনে নিজের স্বার্থসিদ্ধির অভিসন্ধি থাকা যে অস্বাভাবিক কিছুই নয়! দিতি হয়তো ভাবছে নিজের প্রয়োজনেই সম্পর্কটাকে গালভরা নাম দিতে চাইছে সুশোভন! আর যেহেতু বিয়ের প্রস্তাবটা সুশোভনই যেচে দিয়েছে! মধ্য-চল্লিশে কেন যে হঠাৎ এইভাবে উতলা হয়ে উঠেছে সে!

—‘কী হল, নাও?’

আচমকাই দিতির কথায় সুশোভনের সংবিৎ ফেরে। ফর্কে ব্যাটার ফ্রাইয়ের ছোট্ট একটা টুকরো গেঁথে তার মুখের সামনে তুলে ধরেছে দিতি। সুশোভন মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘উঁহু, তুমি খাও। আমার জন্য নিয়েছি তো!’

—‘তোমার নাম করে তুললাম যে!’

দিতির কণ্ঠে এবার ছেলেমানুষি! খাবারের সঙ্গে আদিখ্যেতার মোলায়েম মোড়কটুকু গলাধঃকরণ করতে বাধ্য হয় সুশোভন। দেড়টা বছর! রাগ-দুঃখ-অভিমান-উত্তেজনা-ভয়-চাহিদা মুখোমুখি বসা মানুষদুটোর কাছে নিজেদের প্রায় সব আবেগই বড় পরিচিত এখন। প্রথমদিকে অবশ্য এমন ছিল না। নৈঃশব্দ্য একটা জমাটবাঁধা হিমশীতল দ্বীপের মতো এসে দাঁড়াত দুজনের মাঝে। সেসময় দিতিকে দেখে সুশোভনের মনেই হয়নি এই মহিলা হাসতে পারে, আবার মন খুলে আড্ডা মারতেও পারে। সেন্স অব হিউমারটাও বেশ স্ট্রং! সময় কেমন দেখতে দেখতে বয়ে যায়! শেষ ক’টা বছরে প্রতিটা কাজে দিতিকে পাশে পেয়েছে সুশোভন। কর্মক্ষেত্রে একের পর এক স্বপ্নকে বাস্তবায়িত হতে দেখেছে দুজনে একইসঙ্গে। দিতির সাহচর্যেই তার স্টার্টআপ তরতরিয়ে চলছে, কিছুই সুশোভন অস্বীকার করে না! করার ক্ষমতাও নেই। বর্তমানে যা কিছু অধরা আগামীতে মানুষ বেছে বেছে সেসবই পেতে চায়। সুশোভনও ব্যতিক্রম নয়, বলাই বাহুল্য! অথচ আজ এমন একটা বাঁকে এসে দুজন আটকে পড়েছে যে কেবলমাত্র নিজেদের ইচ্ছেতে এগোনো আর সম্ভব নয়। সুশোভন ঝাড়া হাত-পা। তার বাবা এবং একমাত্র দিদি দুজনেই গত হয়েছেন বহুকাল। তারপর থেকেই মা একপ্রকার বিবাগী। সারাদিন ধর্মকর্ম আর দানধ্যান নিয়েই রয়েছেন! ছেলেকে বিয়ের কথা যে কোনওদিন বলেননি তা নয়, তবে এতকাল সুশোভন নিজেই কোনও তাগিদ অনুভব করেনি। উল্টোদিকে দিতির জীবন একটা শান্ত নদী! যাত্রাপথের বাঁকে-বাঁকে কত তার বাঁধন! বড় যত্নে নিজের সঙ্গে নানা সম্পর্ক বয়ে নিয়ে এগিয়ে চলা প্রবাহ। জীবনের মধ্যলগনে এমন একজনকে নিজের সঙ্গে বাঁধতে গেলে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই, সত্যিই! হাসির আড়ালে দীর্ঘশ্বাস গোপন করে নেয় সুশোভন।

***

পোর্সেলিনের সাদা প্লেটের ওপর নিঃশব্দে চামচ বোলাচ্ছে দিতি। ওর অস্বাভাকিত্ব যে সুশোভনের চোখে পড়েছে সেকথা ও নিজেও বুঝেছে। দিতির সামনে এখন গগনচুম্বী পর্বত। সেটা ডিঙিয়ে মৃণালকে কী করে জানাবে কথাটা? সে কি মানবে এই সিদ্ধান্ত? বড় বেশি স্বার্থপর মনে করবে মাকে? কিন্তু নিজেকে নিয়ে ভাবার অধিকার তো প্রত্যেকটা মানুষেরই আছে। দিতি ভাবতে থাকে, মৃণাল যদি আহত হয়ে ওর ওপর চড়াও হয়! যদি বিদ্রোহ করে বাড়ি ছেড়ে দেয়? আজকালকার প্রজন্ম, হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে এরা পিছ-পা হয় না। আর মৃণাল তো এমনিতেই আর পাঁচজনের থেকে আলাদা। শৈশব পেরিয়ে ইস্তক দুর্বোধ্য এক দূরত্বই যেন দিতিকে উপহার দিয়ে চলেছে সে! যত দিন এগোচ্ছে, ছেলেটা ক্রমেই দুর্ভেদ্য একটা প্রাচীরের মতো হয়ে যাচ্ছে। বহু চেষ্টায় বাধা অতিক্রম করতে গিয়ে নিজেই ক্ষতবিক্ষত হয় দিতি। আজকাল জোর করতেও ওর ভয় করে। ছেলেরা সাধারণত মা-ন্যাওটা হয়ে থাকে। কিন্তু মৃণাল যে শিশুকাল থেকেই বাবার ঘনিষ্ঠ!

***

কেউ কেউ শৈশব থেকেই অন্তর্মুখী হয়। কৈশোরে পৌঁছে তারা হয়ে যায় বরফের মতো উত্তাপহীন। আবার পরিস্থিতি কাউকে করে তোলে নীরব। হয়তো সে ডানা মেলতে চায়, আকাশের বুকে দেদার লুটোপুটি খেতে চায়, অথচ পারে না। মুখ থুবড়ে পড়ার ভয় দুঃস্বপ্নের মতো ধাওয়া করে তাকে। মৃণালও তেমনই। উত্তাল খরস্রোতার বুকে দোদুল্যমান একখানি কচি সাঁকো। অপরিপক্ক, শীর্ণ। যেকোনও দুর্যোগ তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে মুহূর্তে। তাই তো সারাক্ষণ নিজেকে গুটিয়ে রাখে সে। ঘরের আলো বন্ধ করে মটকা মেরে পড়ে রয়েছে মৃণাল! তার মাথা ঝাঁঝাঁ করছে। খুব খিদে পেয়েছিল। বাড়ি ফিরে অঞ্জু মাসির দেওয়া টিফিনটুকুও আজ খেতে পারেনি। বারবার গা গুলিয়ে ওয়াক উঠছে। একবার ভেবেছিল স্কুল থেকে হাফছুটি নিয়ে বাড়ি চলে আসবে। কিন্তু তাতে ওই বদমাশগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়ে যেত! জোর করে কান্না চেপে তাই সবক’টা ক্লাস করেছে সে। বাবার কথা মনে পড়ছে মৃণালের। তার বাবা বলত, ‘কেউ তোমাকে অপমান করলে কোনওদিন পালিয়ে আসবে না মৃণাল। প্রতিবাদ না করতে পারো, মাথা উঁচু রেখে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকবে। দেখবে অসৎ লোকের উদ্দেশ্যটাই বিফলে যাবে তাতে।’

এতদিন নিজের মেয়েলি স্বভাবের জন্য, পাতলা কণ্ঠস্বর আর দুর্বল রোগাটে গড়নের জন্য উঠতে-বসতে অনেক লাঞ্ছনা সহ্য করেছে মৃণাল। কিন্তু স্কুলে আজ যা ঘটেছে, তার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। আজ রিসেসের কিছু পরে তুহিনাদের দলটা এসে হঠাৎই ঘিরে ধরে তাকে। ওই ছেলেমেয়েগুলোকে বিশেষ পছন্দ করে না মৃণাল। বড্ড উগ্র ওরা। যেন মৃণালের ঠিক বিপরীত। সামান্য হেসে সে এড়িয়েই যেতে চেয়েছিল প্রথমে। অনভিপ্রেত ঘটনাটা তখনই ঘটে গেল। পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে মৃণালের কাঁধে হাত রেখে তুহিনা বলল, ‘সো মৃণাল, হাউ ইজ ইওর নিউ পাপা? ইজ হি কুল? তোকে ভালবাসে তো? আচ্ছা, তুই কি এখন তোর নতুন বাবার বাড়িতে থাকিস?’

তুহিনার হাতে চওড়া স্ক্রিনের অতি আধুনিক সেলফোন। একটা ছবি মৃণালের নাকের ডগায় তুলে ধরেছিল মেয়েটা। মৃণালের পাদুটো থরথর করে কাঁপছিল। তার মা একটা রেস্টুরেন্টে বসে রয়েছে সুশোভন আঙ্কলের সঙ্গে। দুজনেরই মুখে হাসি, হাতে হাত। বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি মৃণালের। তুহিনার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল অম্বরীশ। সে উত্তর দিল, ‘কাম অন বেবিগার্ল! মম্মি কুলের বিএফ তো ড্যাডি কুলই হবে। সিম্পল!’

—‘এক্স্যাটলি!’

বলে ওরা সকলেই হাততালি দিয়ে অসভ্যের মতো খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসতে শুরু করল। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল মৃণাল। পারেনি। শেষমেশ দৌড়ে পালিয়ে বেঁচেছে। সে জানে নালিশ করলে ফল হত উল্টো। তুহিনার বাবা স্কুলের ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বার। কর্তৃপক্ষ ওদের কারও বিরুদ্ধে একটা কথাও শোনে না। অভিযোগ করলে মৃণালকেই নাস্তানাবুদ হতে হত। গার্জেন কলও হতে পারত তার। নিজের জন্য মাকে আর কিছুতেই বিরক্ত করতে চায় না সে।

বিছানা সংলগ্ন টেবিলের ওপর রাখা ছবিটার দিকে তাকিয়ে ভীষণ কান্না পাচ্ছে মৃণালের। সে আর বাবা-মা… কত সুখী ছিল তারা তিনজন! মা বরাবরই কেরিয়রিস্ট কিন্তু এমন উচ্ছৃঙ্খল তো ছিল না কোনওকালে! মৃণাল জানে, তার বাবা সবসময়ই মাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। মা কি বেমালুম ভুলে গিয়েছে সব কথা? কী করে মা এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারল? মা কি একা? মায়ের জগতে কি সে কোথাও নেই? সেই সময়েই মায়ের গলা কানে এল মৃণালের, ‘ঘুমিয়ে পড়েছিস নাকি বাবাই? আজ ফিরতে অনেক লেট হয়ে গেল রে। রাস্তায় যা জ্যাম! এই দেখ, তোর জন্য কী নিয়ে এসেছি!’

এসি কম্বলটা মাথার উপর টেনে ঝটপট চোখ বুজে ফেলেছে মৃণাল। মায়ের মুখোমুখি হতে তার ইচ্ছে করছে না। ওই মহিলার উপস্থিতিটাই এখন তার কাছে অসহ্য, বিরক্তিকর! নিজের মাকে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ বলে মনে হচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে মনেমনে মায়ের মৃত্যুকামনা করছে সে।

বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে দিতি দেখল ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। নীল কাগজে মোড়া উপহারটা টেবিলে নামিয়ে কম্বল ঢাকা অবয়বটার দিকে ও নিঃশব্দে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। কত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছে ছেলেটা! অবিকল যেন প্রকাশ! লম্বা-চওড়া-সাবলম্বী! তবে প্রকাশের মতো সেই পুরুষালি কাঠিন্য মৃণালের নেই। মৃণাল বড্ড নরম। মনটাও তেমনই, অল্পেই আঘাত পায়। তাই তো ছেলেকে নিয়ে সবসময় ওর দুশ্চিন্তা। ছেলেটা যার কাছে নিজেকে উজাড় করতে পারত, সেই মানুষটাও নেই। মায়ের সঙ্গে ছেলের কী যে লুকোচুরি সারাক্ষণ বোঝে না দিতি। তবুও ওর চোখ এড়ায়নি ছেলের পাতলা ঠোঁটের ওপর হালকা রোমের আভা। গলার স্বরও ভাঙছে ক্রমে। আগামী মাসে পনেরোতে পা দেবে মৃণাল! কেন যে এই কোমল সময়টায় ওকে ফেলে পালিয়ে গেল প্রকাশ! তার মতো বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান কি ও ইহজীবনে হতে পারবে? পারবে কি ছেলেটাকে মানুষের মতো মানুষ করে তুলতে!

***

—‘এটা আপনার কত নম্বর?’

আচমকা প্রশ্নে ছেলেটি অপ্রস্তুত! লজ্জায় আরক্ত মুখ। জিজ্ঞাসা করবে না করবে না করেও তিরটা তখন ছুড়ে ফেলেছে দিতি। ফেরানোর আর উপায় নেই। দিতি প্রমাদ গণছিল, অতিথিরা চলে গেলেই মা একহাত দেখে নেবে ওকে। উত্তরে যে দ্বিগুণ চমক অপেক্ষমাণ সেটা বুঝতে পারেনি।

—‘বত্রিশ!’

—‘বলেন কী? আমাকে নিয়ে?’

দিতির ভাসাভাসা চোখের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে অসম্মতি জানিয়েছিল সে।

—‘না, আপনি তেত্রিশ নম্বর।’

তারপরেই বুমেরাং!

—‘তা আমি আপনার কত নম্বর জানতে পারি?’

—‘আপনার কাছে আমি নেহাতই শিশু। এতবার ইন্টারভিউ দেওয়ার সুযোগ আমার হয়নি। আপনি ছয় নম্বর!’

ফিকে গোলাপি পর্দাটানা ঘরে হাসির শব্দ ঝনঝনিয়ে উঠেছিল তারপর। সেই বিষয়টা নিয়ে পরে ঠেলায়-ঠোক্করে অনেক কথা শুনতে হয়েছে দিতিকে। ‘গায়েপড়া মেয়ে!’ ‘চালাকি করেই তো আমার ছেলেটাকে পটিয়ে ফেলল।’

অতিথিরা বিদায় নিলে কাপ-ডিশ, চানাচুরের প্লেট গুছোতে গুছোতেই মা বলেছিল, ‘মানু, তুই কী অসভ্য মেয়ে রে? পাত্রপক্ষের সামনে কেউ অত হাসাহাসি করে? নির্লজ্জ একেবারে! লোকে তো আমাকেই দুষবে! বলবে, মা কোনও শিক্ষা দিতে পারেনি। আস্ত বাচাল তৈরি করেছে মেয়েকে।’

চিরকালের গম্ভীর বাবা যেন সুপ্ত ভিসুভিয়াস! মনমরা হয়ে ছাদে চলে গিয়েছিল দিতি। জামাকাপড় বদলায়নি। খেতেও নামেনি। রাত পৌনে এগারোটা নাগাদ দাদা গিয়ে ওর বেণীর ওপর আলতোভাবে হাত রাখে।

—‘প্রকাশ বোধহয় এ-রাজ্যে ফিরবে না কোনওদিন। আমাদের ছেড়ে ওই অতদূরে আরব সাগরের তীরে তুই থাকতে পারবি তো মানু? মনকেমন করলেই কিন্তু আসতে পারবি না!’

দাদাকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে উঠেছিল দিতি।

—‘এত তাড়াতাড়ি তোরা আমাকে বিদেয় করে দিতে চাইছিস কেন দাদা? যদি আর ক’টা বছর থেকেই যাই, তোদের কি খুব অসুবিধে হবে?’

দাদা কিছুই বলেনি। সে বছরের শুরুতে বাবা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। ওদের বাড়িতে বাবার সিদ্ধান্তের ওপরে কেউ কোনওদিন কথা বলতে পারেনি। প্রথম দেখাতেই হাসিখুশি, ছটফটে দিতিকে প্রকাশের পছন্দ হয়ে যায়। একদমই সময় নেয়নি সে। মানুষটার হিসেব ছিল জলের মতো সরল, ‘মিয়া-বিবি রাজি তো ক্যা করেগা কাজি!’ ওদের মধ্যে ‘উড বি’-কে নিয়ে ডেটে যাওয়ার চল ছিল না। দুই বাড়ির মতামত উপেক্ষা করেই প্রকাশ, দিতিকে ‘ডেটে’ নিয়ে গিয়েছিল। নিজে পছন্দ করে কিনে দিয়েছিল ময়ূরপঙ্খী রঙের জর্জেট শাড়ি। খাইয়েছিল চিকেন পিৎজা। সেইদিন দিতি বুঝেছিল মানুষটা ওকে ডানা মেলতে দেবে। খাবারে কামড় দিয়ে বিশ্বাসী গলায় জানতে চেয়েছিল, ‘তেত্রিশ নম্বরকে পছন্দ করার কারণটা কিন্তু আপনি এখনও বললেন না!’

—‘স্মার্টনেস, সেন্স অব হিউমার আর চোখ!’

স্বভাবের মতোই সোজাসাপ্টা ছিল প্রকাশের উত্তর! আজ ভাবলে দিতি অবাক হয়। সত্যি, কোন মফস্বল থেকে ওকে তুলে এনে নিজে হাতে পরিপাটি গড়ে নিয়েছিল সে! বলেছিল, ‘তুমি আরও পড়ো। যতদূর খুশি এগিয়ে চলো। আমি তো সঙ্গে রয়েছি। তোমার ভয় কী! শুধু আমার পরিচয়ে কেন পরিচিত হবে তুমি? আমি চাই, আমাকেও লোকে তোমার নামে চিনুক। তবেই না হিসেব বরাবর হবে!’

কর্মজগতে আজ দিতি যেটুকু জায়গা পেয়েছে তার কৃতিত্ব একমাত্র প্রকাশের। নিজের প্যাশনকে প্রফেশন বানিয়ে দিতি আজ চূড়ান্ত সফল। ওর ডিজাইন করা জুয়েলারির কদর সেলিব্রিটি মহলেও। অনেক পরে অবশ্য সুশোভনকেও ও পাশে পেয়েছে। তবে প্রকাশ আলাপ না করালে সুশোভনের সঙ্গে কোনওদিন দেখা হত কি?

কাচের জানালা দিয়ে বাইরে চোখ মেলে শুয়ে ছিল দিতি। কতগুলো বছর পার হয়ে গেল, শ্যামনগরের বাড়িতে গিয়ে আর থাকা হয় না। সন্ধেবেলা ছাদে মাদুর পেতে চা-মুড়িমাখা নিয়ে সেই গোলটেবিল, শীতের দুপুরে রোদ্দুরে পিঠ পেতে আন্ত্যাক্ষরী… বিগত দিনের ছবিগুলো কালেভদ্রে তাজা হয়ে বড় ব্যথা দেয়। এলোচুলে আবার সারা ছাদ ছুটে ছুটে বেড়াতে ইচ্ছে করে। রোদে মেলা মায়ের শাড়িগুলোর ফাঁকে গিয়ে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে মন চায়। কান্না কি কেবল মনখারাপের বাহ্যরূপ! শেষবার বোধহয় মায়ের কাজের সময় গিয়ে দশদিন থাকতে পেরেছিল দিতি। সেও প্রায় আট বছর আগে। দাদা কিংবা ভাইয়ের বিয়ের পর, বাপের বাড়িতে বহু মেয়েরই অধিকার ম্লান হয়ে যায়। একই বংশের দুই স্তম্ভের মাঝে জন্ম নেয় অদ্ভুত এক দ্বন্দ্ব! ছেলে আর মেয়ে নামক সেতুর মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে মায়েরা কেমন খেই হারিয়ে ফেলেন। দিতির ক্ষেত্রে সেসব কিছুই হয়নি। এই পরিণত বয়সেও মানু বলতে দাদা অজ্ঞান। বউদির সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওর কথা হয়, এখনও। শুধু মনের কথাগুলো বলতে চেয়েও বলা হয়ে ওঠে না। জমা হয় কেবল দীর্ঘশ্বাস!

***

উনত্রিশে ডিসেম্বর! মোবাইল ক্যালেন্ডারে দিনটা চিহ্নিত করে রেখেছে মৃণাল। আজ বাবা-মায়ের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি। বিশেষ একটা দিন। বাবা কত আনন্দ করত এই দিনটায়। অফিস যেত না। নিজে হাতে দারুণ দারুণ ব্রেকফাস্ট বানাত। বাছাই করা ফাইভস্টারে লাঞ্চ-ডিনার! মায়েরও সব মনে আছে। সে বিষয়ে মৃণালের আজ কোনও সন্দেহ নেই। গতকালই মাকে কাঁদতে দেখেছে সে। বাবার কফিমাগটা বুকে জড়িয়ে মা লুকিয়ে কাঁদছিল। মাগটায় বারবার ঠোঁট বুলিয়ে আদর করছিল। তারপর হঠাৎ অঞ্জুমাসিকে দেখে মা কেমন চমকে উঠল। অঞ্জুমাসি আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল, ‘কতই বা বয়স তোমার বউদি! এই বয়সে একলা থাকা যে কী জ্বালা, আমি বুঝি গো।’

মৃণাল সবটা দেখেছে, বুঝেওছে। আর সেই কারণেই আজকের দিনটাকে বেছেছে সে। আজই মায়ের সঙ্গে কথা বলা যায়। পরের মাসে তার পনেরো পূর্ণ হয়ে যাবে। ‘হি ইজ নট আ চাইল্ড এনিমোর!’ মাকে সে সরাসরি জিজ্ঞাসা করবে। তারপর নিজের সিদ্ধান্তটা জানিয়ে দেবে। মা যদি সুশোভন আঙ্কলকে বিয়ে করতে চায়, সে তাহলে আর মায়ের সঙ্গে থাকবে না। মা সুশোভন আঙ্কলকে নিজের হাজব্যান্ডের জায়গাটা দিতে পারলেও নিজের বাবার জায়গাটা সে কিছুতেই অন্য কাউকে দেবে না। তার আর কাউকে দরকার নেই। কারও সাপোর্টের প্রয়োজন নেই। বাবার সঙ্গে যেটুকু স্মৃতি রয়েছে, একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার পক্ষে সেটাই যথেষ্ট।

মায়ের ঘরের দরজা খুলে ভিতরে ঢোকে মৃণাল। বহুদিন পরে এই ঘরটায় পা দিয়ে হঠাৎই তার মনে হয় জানালার দিকে মুখ করে বাবা বিছানায় বসে রয়েছে। এখুনি বলে উঠবে, ‘দেখবি আয় মৃণু, ছাতিমের ডালে অনেকগুলো টিয়া এসে বসেছে…! আয়, ওদের বিস্কুট, ছোলা খাওয়াই।’

—‘আমি ছোলা নিয়ে আসছি বাবা…।’

কথাগুলো বলে ফেলতেই যাচ্ছিল মৃণাল। অতি সন্তর্পণে সামলে নিল নিজেকে। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, পর্দাটা হাওয়ায় উড়ছে। কেউ নেই সেখানে। চোখ ফিরিয়ে মৃণাল দেখল মা কেমন সুন্দর করে বাবার ছবিগুলো সাজিয়ে রেখেছে। বাবার কোলে সে। ছোট্ট, ন্যাড়ামাথা। একটায় তার অনেক বড় বড় চুল, কার্লগুলো কাঁধের নিচে নেমে এসেছে। ওটা কলকাতার ছবি। তাদের মানালি ট্যুরের ছবি, কাশ্মীরে চিনার গাছের নীচে তোলা ছবিগুলো… সব রয়েছে পাশাপাশি। মৃণালের কেমন যেন মায়া হল মায়ের ওপর। ডাহা ভুল ভাবছিল। মা কী করে তার বাবাকে ভুলে যেতে পারে? মা তো বাবাকে আগলেই রেখেছে। স্মৃতিগুলো সযত্নে সাজিয়ে রেখেছে নিজের চারপাশে। সে মনে মনে ঠিক করে নিল মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে। মাকে বলবে সুশোভন আঙ্কলের সঙ্গে বেশি মেলামেশার দরকার নেই। তাদের ব্যক্তিগত পরিসরে ওই লোকটার কী কাজ! আচমকাই রিনরিনে শব্দে দিতির মোবাইলে একটা মেসেজ ঢোকে। দ্বিধামুক্ত মনে বিছানার দিকে এগোয় মৃণাল।

—‘আগামীকাল কখন আর কোথায় জানিয়ো প্লিজ! আমি মাকে নিয়ে পৌঁছে যাব। ফার্স্ট মিটিংটা বাড়িতে হলেই ভাল হত, কিন্তু তোমার যেমন ইচ্ছে। বাই দ্য ওয়ে, মা কিন্তু খুব খুশি। বিয়ের জন্য আমি কোনওদিন রাজি হব মা বোধহয় স্বপ্নেও ভাবেনি!’

মুহূর্তেই মৃণালের চোয়াল শক্ত। মাথায় আগুন! তার সমস্ত ধারণা বদলে যাচ্ছে দ্রুত! বিষাক্ত একটা প্রতিক্রিয়া ক্রূর সর্পের মতো সমস্ত বোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। তুহিনারা তাহলে ভুল বলেনি! নিজের ভবিষ্যৎ ভাবনায় দিতি সেনগুপ্ত এতই ব্যস্ত যে ছেলেকে না জানিয়েই প্রেমিকের মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চলেছে! ছিঃ! রাগের মাথায় মায়ের মোবাইলটা আছড়ে ফেলতে গিয়েও নিজেকে সংযত করে নেয় মৃণাল। না, কাউকে জানতে না দিয়ে নিঃশব্দে সরে যাবে সে।

***

‘রাতে ভাল করে ঘুমোসনি নাকি বাবাই? মুখটা কী শুকনো আর ছোট্ট লাগছে! আয় আমার কাছে।’

ছেলের ঝাঁকড়া চুলের ভেতর অকৃত্রিম স্নেহের ছোঁয়াটুকু ছড়িয়ে দিতে গিয়ে তীব্র ঝাঁকুনি খেল দিতি। একঝটকায় মায়ের হাত ঠেলে উঠে দাঁড়িয়েছে মৃণাল। আলুথালু চেহারা, বিবর্ণ মুখ! উত্তেজনায় ঠেলে বেরিয়ে আসা বিস্ফারিত দু’চোখে প্রবল ক্রোধ!

—‘ডোন্ট টাচ মি…! সরে যাও। আমাকে ছোঁবে না তুমি।’

রান্নাঘর থেকে ছুটে এসেছে পরিচারিকা অঞ্জু! দিতির দিকে তাকিয়ে হতভম্বের মতো সে দাঁড়িয়ে! মৃণালের চিৎকারটা দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে। দিতিও মরিয়া, ‘তুই এরকম করছিস কেন বাবাই? আমি তোর মা! আমি ছাড়া আর কে তোর ভালমন্দ দেখবে? শান্ত হয়ে বস তো! কী হয়েছে? আমাকে বল সোনা! স্কুলে কিছু হয়েছে?’

সামান্য জোর ফলাতে গিয়ে এবার ফল বিপরীত। তুমুল আক্রোশে খাবারের প্লেট, ফলের ঝুড়ি, জুসের গ্লাস ছুড়ে ছুড়ে ফেলতে থাকে অবাধ্য কিশোর। দিতি আঘাতে রক্তাক্ত, স্থবির! এ কোন মৃণাল! নাড়িছেঁড়া সন্তানকে চিনতে আজ অসুবিধে হচ্ছে ওর। ছেলেটা এতখানি বেপরোয়া হয়ে গেল কবে? তবুও দিতি হাল ছাড়ে না। দুহাত বাড়িয়ে জাপটে ধরে আত্মজকে। দাঁতে দাঁত চেপে কাঁপতে কাঁপতে মৃণাল বলে, ‘ইউ সেলফিশ ওম্যান! কী বলব তোমাকে হ্যাঁ? কোনওদিন কি আমাকে ভালবেসেছ তুমি? জানতে চেয়েছ, বাবা নেই বলে নিজেকে কতখানি একলা লাগে আমার? চাওনি। তুমি তো অফিস, ক্লায়েন্ট মিট আর… আর নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত! নিজেকে ছাড়া আর কাউকে নিয়ে তুমি ভাবো নাকি?’

—‘রাবিশ! হোয়াট আর ইউ সেয়িং? আমি তোর কথা ভাবি না? তোকে ভালবাসি না? আমি যা যা করছি, সব তো তোর জন্যই বাবাই। আমি যদি কাজ না করি, তোর ফিউচার কী করে তৈরি করব বল? এই বাড়ির ইএমআই, তোর হায়ার স্টাডির খরচ কোত্থেকে আসবে মৃণু? তোর বাবা যে আমাকে এভাবে একলা করে দিয়ে চলে যাবে, আমি কি জানতাম, বল তো?’

ধৈর্যচ্যুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছে দিতি। ধূর্ত শ্বাপদের ভঙ্গিতে হিসহিসিয়ে ওঠে মৃণাল।

—‘এই খবরদার, তুমি আমাকে মৃণু বলে ডাকবে না। ওই নামে আমাকে শুধু বাবা ডাকত। আমার বাবা। আর হ্যাঁ, বাবা তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে, বেশ করেছে। বেশ করেছে। বাবা থাকলে কি তুমি তোমার বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে এনজয় করতে পারতে? গো, এনজয় মা! এনজয় ইয়োর লাইফ!’

সেগুনের ভারি দরজাটা সশব্দে মুখের ওপর বন্ধ হয়ে যায়। খানখান হয়ে যায় দিতি। দাঁড়িয়ে থাকে স্থাণুবৎ! সংবিৎ ফিরে পেতে কয়েক মুহূর্ত লেগে যায়। তারপর ব্যস্ত হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘অঞ্জুদি, যাও যাও যাও। তুমি গিয়ে দেখো একবার। ছেলেটার এখন মাথার ঠিক নেই! খুব কষ্ট পাচ্ছে আমার বাচ্চাটা! যাও না, হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছ কেন?’

ঘরময় ছড়িয়ে থাকা বাসনপত্র, জলের বোতল, খাবারের টুকরোর মাঝখান থেকে তীক্ষ্ণ সুরে বেজে ওঠে মুঠোফোনটা। দিতি এগিয়ে যাওয়ার তাগিদটুকুও অনুভব করে না।

গভীর রাতে ঘুমন্ত ছেলের মাথার কাছে বসে মোবাইলে স্পষ্ট ক’টা কথা লিখে ফেলে ও, ‘প্লিজ, কাল এসো না। অনেক ভাবলাম জানো! তারপর মনে হল, বাকি জীবনটা শুধু মৃণুর মা হয়ে থাকার মতো শান্তি আর কিছুতেই পাব না আমি। তুমি ভাল থেকো, তোমার নিজের মতো করে। পারলে ক্ষমা কোরো আমায়!’

রাত আরও বাড়লে ঘুম থেকে উঠে বসে মৃণাল। তার পায়ের কাছে ঘুমিয়ে রয়েছে মা। চুলগুলো এলোমেলো। মায়ের ঘুমন্ত মুখেও যেন শান্তির চিহ্ন নেই। মায়া লাগে মৃণালের। সে নিঃশব্দে তুলে নেয় মায়ের ফোন। একটা নম্বর তার বড় প্রয়োজন।

***

আজ প্রকাশের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। মানানসই ফ্রেমে বাঁধানো বিরাট ছবিটা যেন দেওয়াল জোড়া আহ্লাদ! যেন সূর্যের প্রথম কিরণ! ছবিটা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে দিতি। এইখানে, এই ঝুলবারান্দার লাগোয়া দেওয়ালে পিঠ দিয়ে বসতে খুব ভালবাসত মানুষটা। আর একদিন এখানে বসে বই পড়তে পড়তেই একেবারে অপ্রস্তুত করে দিয়ে চলে গেল! বুকের ভিতরের সেই গভীর ব্যথা চিরস্থায়ী সংক্রমণের মতো ছড়িয়ে দিয়ে গেল দিতির হৃদয়েও। কেবল পরিণতির তৃপ্তি দিল না। রেহাই দিল না। বলে গেল না, ‘দায়িত্ব সব তোমার। তুমি পারবে। তোমাকে পারতেই হবে দিতি। ভয় কী? হেঁটে চলো। এগিয়ে চলো। আমি রইলাম।’

রজনীগন্ধার মালাটা প্রকাশের প্রতিকৃতিতে পরিয়ে দিল দিতি। এও কি পুনরায় বন্ধনে জড়ানো নয়? মাথা নীচু করে বসেছিল মৃণাল। চোখে একরাশ অপেক্ষা। দিতি বলল, ‘জানিস বাবাই, মালাবদলের সময় তোর পাপা ঠিক এইভাবেই তাকিয়েছিল আমার দিকে!’

ধীরপায়ে মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায় মৃণাল। সন্তানের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে আর অপরাধী বলে মনে হচ্ছে না দিতির। ছেলেকে কাছে টেনে নেয় ও।

ফিসফিস করে মৃণাল বলে, ‘সুশোভন আঙ্কলকে আমি আজ আসতে বলেছি মা।’

দিতি অবাক হয়। মৃণাল থামে না। অভিভাবকসুলভ কণ্ঠে বলে, ‘আমি জানি মা, সামনের দিকে চলতে গেলে একজন বন্ধুর বড় প্রয়োজন।’

নীরবে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে দিতি। কচিমুখটা জুড়ে যেন প্রকাশের ছায়া।

চিত্রণ: শুভ্রনীল ঘোষ
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »