পঁচিশ বছর
মুখোমুখি ফ্ল্যাটটায় যিনি থাকেন, তাকে দেখা যায়নি তেমন। একা থাকছিলেন। প্রায় কখনও বাইরে বেরোতেন না। গেটে যারা দারোয়ান থাকে, তাদের কেউকেউ কখনও বাজার করা বা চিঠি পৌঁছে দিয়ে যাওয়ার মতো কাজ করে দিয়ে যেত। তিনি কখনওই বাইরে আসতেন না।
অনেক ঘরের বসত এই আবাসনে, বেশিরভাগই বাঙালি। অবাঙালি যারা আছেন তারা অল্প ক’জন, সবাই প্রায় ভাড়া। ফলে মোটামুটি একটা চেনা-পরিচিতি আছে নিজেদের মধ্যে। নীচে দেখা হয়, কথা হয় দু’মিনিট দাঁড়িয়ে, কখনও একসঙ্গে মর্নিং বা ইভনিং ওয়াক। এছাড়া দোল-দুর্গোৎসব। তাও যৌথ। কিন্তু এসবে ওনাকে প্রায় দেখাই যায়নি।
সুদীপ্তর মোটামুটি উল্টো দিকে ওনার দরজা। সারা দিন সারা মাস বন্ধ থাকে সেটা। ভেতর থেকে লাগানো। সুদীপ্ত মনে করতে পারে না, শেষ কখন ওনাকে দেখেছে। একবার, সেটা গতবারই হবে, কী একটা পুজোর মুখে বেরিয়েছিলেন তিনি। মানে, দরজায় এসেছিলেন। সুদীপ্ত মুখোমুখি পড়ে যায় ওনার। কিছু বলার আগে উনিই হেসেছিলেন। খবর নিয়েছিলেন ছেলের, মণিদীপার। পুজোর পরে বলে হয়তো প্রণামও করেছিল সুদীপ্ত। উনি মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তারপর অল্প কথা হলে ঢুকে যান ভিতরে। সেই শেষ সম্ভবত। তারপর আর সুদীপ্ত দেখেনি।
মণিদীপা কথা বলেছে মাঝেমাঝে। মণিদীপার সঙ্গেও বছরে এক-দু’বার চোখাচোখি হয়েছে। দরজায়। অল্প কথা হয়েছে তখন। কিন্তু সম্পর্ক এগোয়নি। উনিই এগোতে চাননি। ফলে না-দেখাই রয়ে গেছে দিনের পর দিন। এসব জায়গায় প্রতিবেশীকে নিয়ে কথা হয় না, এমন নয়। প্রতিবেশী নিয়ে কথা না বলে বাঙালি ঘুমোতে যেতে পারে না। ফলে কথা চলেই। কিন্তু ওনাকে নিয়ে কখনও নয়। তার কারণ, উনি চোখের সামনে নন। আড়ালের। আর কীই বা কথা হবে ওনাকে নিয়ে! সেই কবে একদিন যেন মণিদীপা বলেছিল, আচ্ছা, এভাবে একা থাকেন মাসিমা, ওনার কি কেউ নেই!
নিরুৎসাহী সুদীপ্ত বলেছিল, দেখি না তো, কে জানে!
পুজোর চাঁদা উনি ঠিকঠাক দিয়েছেন। অন্যান্য যৌথ কাজেও না-থেকে টাকার অংশটা ঠিক দিয়ে গেছেন। গেটে একটা ছেলে আছে, গোপাল। তার সঙ্গেই ওনার যা যেটুকু যোগাযোগ। গোপাল দুধ দেয়, কাগজ পৌঁছে দেয়, আবার ওর হাত মারফত চাঁদা আসে, অন্যান্য টাকাও। মোবাইলে মোবাইলে কাজ। কিন্তু তিনি আড়ালেই। এবং একা।
মণিদীপা একদিন বলেছিল, আচ্ছা, আত্মীয়স্বজনও তো থাকে মানুষের। এই বয়স…।
সুদীপ্ত কোনও রকম উত্তর করেনি।
কিন্তু এই একা থাকার ভেতরেও ওনার সঙ্গী আছে দু’জন। বাইরে থেকে মাঝেমাঝে তাদের ডাক শোনা যায়। দু’একবার দেখেও ফেলেছে কেউ কেউ। একটা বাদামি, অন্যটা সাদা। পায়ে পায়ে ঘোরে। একবার তাদের দেখানোর জন্য ডাক্তার ডেকে এনেছিল গোপাল। দামি ডাক্তার। সাদা শ্যুট, কালো টাই। কোলে করে একটা বিড়ালকে ডাক্তারবাবু ক’দিনের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন।
এইভাবেই চলে যাচ্ছিল সব। একটা মানুষ কাছে অথচ তার কোনও খবর নেই। তাকে নিয়ে কোনও উৎসাহ দেখানো চলে না। তারও হয়তো দরকার ছিল না কাউকে। কিন্তু সুদীপ্তর ধাক্কা লাগল সেদিন যেদিন অফিস থেকে ফেরার সময় শীতকালের এক সন্ধেবেলা নীচে দেখল শববাহী গাড়ি এবং গাড়ির পাশে গোপাল।
মাসিমার বয়স কম হয়নি। গোপালই বলল, সত্তর। কিন্তু হঠাৎ কী হল! কেউ জানে না শোনে না, হঠাৎ এ রকম! নীচে জড়ো হয়েছিলেন আরও দু’একজন। বেশিরভাগই বয়স্ক। সবাই থমথমে। গোপাল বলল, জ্বর-সর্দিকাশি চলছিল ক’দিন ধরে। হার্টের সমস্যাটা নাকি পুরনো। নিজেই সকালে ফোন করে গোপালকে ডেকে ডাক্তার আনতে বলেন। আর আশ্চর্যভাবে ডাক্তার দেখতে দেখতেই নাকি হার্টফেল…।
কথা বিশেষ কিছু নেই। সবাই ঘুরছে নীচে নীচে। সুদীপ্ত ওপরে গিয়ে চা খেয়ে ব্যাগ রেখে এসেছে। মণিদীপা অবাক। কথা বলেনি কিছুক্ষণ। পরে বলেছে, নিয়ে যাওয়ার সময় একটা মিস্ কল দিয়ো। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াব। মুখটা দেখব শেষবার।
আরও ক’জন হাজির হচ্ছিল নীচে। কেউ কিছু জানেন না। চিনতেনও না অনেকে। যেটুকু যা জানে, তা গোপাল। ও-ই বলল, ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। বালিগঞ্জে থাকে। রওনা হয়েছে। সে এলেই বেরিয়ে পড়া হবে। বাকি কী হবে, তা সেই ঠিক করবে।
কারও কোনও কথা নেই। দু’একজন গাড়ির পাশে ঘুরছে বা গম্ভীর। পাঞ্জাবির পকেটে হাত। কেউ চাইছে উপরমুখো। চারতলায় মাসিমার জানালা। পাল্লা বাইরের দিকে খোলা। ওখানেই কোনও ঘরে শায়িত আছেন তিনি। ভটচাজবাবু এবং পালবাবু একবার ওপরে গেলেন। ফিরে এলেন কিছুক্ষণ পর। পালবাবু বললেন, চলে গেছেন বোঝাই যায় না। বিছানার মাঝখানে শোওয়া। পায়ের কাছে গুটিসুটি দুটি বেড়াল। ভটচাজবাবু বললেন, দাঁড়াও পাল, আমি একটু ঘর থেকে আসি। আজ আবার প্রেসারের ওষুধটা খেতে ভুলে গেছি।
কে একজন সুদীপ্তকে বলল, আপনাদের তো মুখোমুখি। কিছু বুঝতে পারেননি?
সুদীপ্ত না বলল। এবং তারপর বলল, যোগাযোগ তো কারও সঙ্গে ছিল না। আমাদের সঙ্গেও নয়। বছরে ক’দিন দেখা হয়, তাও বলতে পারব না।
গোপালের কাছে একবার ফোন এল। সামান্য কথা। ফোন রেখে ও বলল, স্যর এসে গেছেন। মিনিট খানেকের মধ্যে ঢুকছেন। উনি এলেই বেরিয়ে পড়া হবে।
হলও তাই। এক মিনিটের আগেই ঢুকে এল নীল ছোট গাড়িটা। পেছনের আসন থেকে দরজা খুলে নামল মাসিমার ছেলে। গম্ভীর চোখমুখ। শান্ত। বয়স চল্লিশের মাঝামাঝি হবে। উনি কাউকে চেনেন না। ওনাকেও চেনে না কেউ। ছোট জটলার দিকে এগিয়ে এলেন তিনি।
কেমন একটা ধাক্কা লাগল সুদীপ্তর। অরিন্দম না? অরিন্দমই তো। গাড়ি থেকে নেমে তারও চোখ আটকে গেছে সুদীপ্তর দিকে।
কীরে অরিন্দম?
আমার মা তো। তুই এখানে থাকিস?
হ্যাঁ… তোর মা মানে। সুদীপ্ত কেমন ভ্যাবাচ্যাকা। আমাদের উল্টোদিকেই তো থাকতেন। একদম মুখোমুখি…
অরিন্দমও অবাক। আমি বার দুয়েক এসেছি। দু’বারই অবশ্য রাতে। কিন্তু মা তোকে চিনতে পারেনি? আগে এতবার দেখা।
সুদীপ্ত চুপ। হাত-পা কেমন বিবশ। বলল, তুই ওপরে যা। গোপালও যাচ্ছে। যা যা করার গোপালকে বল। আমি আছি তোর সঙ্গে।
কথাবার্তাতেই আশপাশের সবাই যা বোঝার বুঝল। কোনওভাবে দুই পুরনো সম্পর্কের দেখা। ভটচাজবাবু বললেন, তা হলে তো অনেক দিনের চেনা। পালবাবু বললেন, যাক, ভাল হল।
গোপালকে নিয়ে অরিন্দম চলে গেল ওপরে। সন্ধে হল। শববাহী গাড়ি তাড়া দিল একবার। সুদীপ্ত হাঁটতে লাগল অন্ধকারে একা।
বিই কলেজের হস্টেলে সুদীপ্ত কলেজের প্রথম দিন থেকে। রানাঘাটে বাড়ি। যাতায়াত সম্ভব নয়, তাই হস্টেল। অরিন্দম এসেছিল হাওড়া থেকে। মালিপাঁচঘড়া। থার্ড ইয়ার থেকে দু’জন রুমমেট। দোতলায় এক ঘর। সুদীপ্ত গুনতে শুরু করল। প্রায় পঁচিশ বছর। সুদীপ্তর বাড়ি থেকে কেউ আসত না। কেই বা আসবে তখন। কিন্তু হাওড়া থেকে এক-এক রবিবার দুপুরে এসে হাজির হতেন অরিন্দমের মা। ওদের সকলের মাসিমা। সুদীপ্ত অবশ্য মাসি বলত ওনাকে। চল্লিশ ছাড়ানো বয়স। ফর্সা চেহারা। অসম্ভব স্নিগ্ধ সুন্দর। একেবারে ছোটবেলা থেকে অরিন্দমের বাবা নেই। কী একটা দুর্লভ অসুখে অনেক আগেই চলে গেছেন। মাসি কাজ করতেন একটা কোম্পানিতে। সম্ভবত ক্লারিকাল। যে রবিবার আসতেন, ওদের ঘরের তিনজনের জন্যই কৌটো ভরে খাবার বানিয়ে আনতেন।
পালবাবু বললেন, আজকাল এই এক সুবিধা। কারও কিছু করতে হয় না। টাকা ধরে দাও। শ্মশানের কাজ শেষ করে শ্রাদ্ধ পর্যন্ত মিটিয়ে দিয়ে যাবে। আর আগেকার দিনে…
ভটচাজ বললেন, সেদিন উল্টোডাঙার মুখে জ্যামে আটকেছি। সামনে এ রকম একটা গাড়ি। কাচঢাকা। বেশ সুন্দর। আরও আশ্চর্য, সেটা আবার এসি!
নীচের শববাহী গাড়ির বুড়ো পাঞ্জাবি ড্রাইভারটি তাড়া দিল আর একবার।
ফাইনাল ইয়ারের শেষে একবার মালিপাঁচঘড়া গিয়েছিল সুদীপ্ত। ছিল দু’দিন। দুই বন্ধুর আড্ডা, এদিক-ওদিক ঘোরা আর মাসির হাতের রান্না। সে প্রায় ভোলার মতো নয়। তার আগে রানাঘাট গিয়েও একবার থেকে এসেছে অরিন্দম। সুদীপ্তর এক মাসতুতো বোনের সঙ্গে অরিন্দমের ছোট একটু সম্পর্ক শুরু হয়েছিল সেই সময়। একেবারেই কয়েক দিনের। তারপর অরিন্দম হঠাৎই স্টেটস্ চলে যায়। পুরনো সম্পর্কগুলো কাটতে শুরু করে তখন থেকে। বাইরে গেলে যা হয়, সুদীপ্ত এবং দেশের অনেকের অ্যান্টেনা থেকে অরিন্দম হারিয়ে যায় ক্রমশ।
সুদীপ্ত পায়চারি করে। গাড়ির হেল্পার ছেলেটিকে গোপাল এসে ডেকে নিয়ে গেল। তার মানে, মাসিকে নামানো হবে এবার। অরিন্দম যদি চায় তো সুদীপ্ত যাবে সঙ্গে।
কিন্তু সময় কি এতখানি বদলে দেয় মানুষকে! পঁয়তাল্লিশ বছরের এক মহিলা, তার হাঁটাচলা কথা-বলা, সত্তরের সঙ্গে এতই তফাত! একেবারে যেন ভিন্ন দু’জন। কোথাও কোনও ছাপ ছিল নাকি! অথবা ছিল, সুদীপ্ত জানেনি, তাই খুঁজে পায়নি। মাসির চোখ, তার নাক মুখ চিবুক কোথায়! মুখোমুখি দু’বছর বাস করেও সুদীপ্ত কোনও ইঙ্গিত পেল না…!
মাসিকে নামানো হয়। নীচে আলো কম। সুদীপ্ত পাশ থেকে একটুখানি দেখে। পঁচিশ বছর আগে দেখা স্নিগ্ধ শান্ত মুখটিকে খোঁজে। এবারে ও চিনতে পেরে যায়। পঁচিশ বছর আগে আর পরে। মানুষ একই। সব চুল সাদা। গালের চামড়ায় ভাঁজ। কিন্তু এ তো তিনিই।
অরিন্দম বলে, কী রে, যাবি?
সুদীপ্ত বলে, চল।
মণিদীপাকে জানিয়ে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি ভাঙে সুদীপ্ত। ওপরে যায়। যেতে যেতে ভাবে, তার সময় থেকেও তো পঁচিশ বছর!
নইলে মাসিই বা তাকে চিনতে পারল না কেন?
চিত্রণ: বাপ্পাদিত্য জানা







