চৈতন্যের সাহিত্য – সাহিত্যের চৈতন্য
সে কবে গেয়েছি আমি তোমার কীর্তনে
কৃতার্থ দোহার।
পদাবলী ধুয়ে গেছে অনেক শ্রাবণে;
স্মৃতি আছে তার।
রৌদ্র-জলে সেই স্মৃতি মরে না, আয়ু যে
দুরন্ত লোহার।
শুধু লেগে আছে মনের স্নায়ুতে
মর্চের বাহার ।।
—বিষ্ণু দে (সে কবে)
আমাদের নবম-দশম শ্রেণির বিদ্যালয়-পাঠ্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও গল্পমালায় একখানি পরিচ্ছেদ থাকত চৈতন্যদেবকে নিয়ে; তাঁর সমকালীন ও উত্তরকালের বাংলা সাহিত্যে তাঁর জীবন ও ভক্তি আন্দোলনের আদিগন্তবিস্তারী প্রভাব নিয়ে। পরিচ্ছেদটি শুরু হত মোটামুটি এইভাবে– যুগাবতার শ্রীচৈতন্য একজন অলৌকিক পুরুষ। ভগবৎ প্রেমের প্লাবনে সারা ভারতবর্ষকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলার বৈষ্ণবধর্ম তাঁরই অবদান। মহাপ্রভু শচীনন্দনের বিচিত্র জীবনী যেমন অপূর্ব তেমনি চিত্তাকর্ষক।১ পরবর্তী ছত্রসমূহের গদ্যভাষা ও আখ্যান এমত শৈলেরই অনুসারী। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে ! সত্য বটে। কিন্তু পূর্ণসত্য নয়। অন্যভাবে অন্যসন্ধানও শুরু হয়েছে অন্তত দীনেশচন্দ্র সেনের কলম থেকেই। তবে এই আধুনিক সন্ধান কতটা জনসভার সাহিত্যে প্রাণিত হতে পেরেছে সেটাই প্রশ্নের। জনসভার সাহিত্য শব্দবন্ধটি বিনয় ঘোষের– ওই নামে তাঁর একখানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আছে, ওঁর শেষের দিকের রচনা যেখানে শব্দবন্ধটির ব্যাপক ব্যাখ্যা আছে। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী বলেন– কেবল সেই বহিরঙ্গ অনুভূতি, তাঁর বিচিত্র ধর্মজীবন নিয়ে উচ্চগ্রাম প্রশস্তি…। …আবার একপ্রস্থ বৈদগ্ধ্যের প্রলেপ-মাখানো বাণী শুনতে পাই বুদ্ধিজীবীদের সভায়, যেখানে যেখানে মহাপ্রভুর গায়ে লাগে সাম্যবাদের ফুরফুরে হাওয়া। …এ সবকিছুই সত্যি, কিন্তু এই ছোট ছোট সত্যের তলায় চৈতন্যসত্তার আসল স্বরূপটি গেছে হারিয়ে, যা পাঁচশো বছরের নিকষে বেরিয়ে আসা উচিত ছিল। চৈতন্যদেবের প্রধান পরিচয়– তিনি একটি বিশেষ ধর্মের প্রবক্তা এবং সেই ধর্মের সাহসের পরিচয় যেখানে দিতে হয়েছিল– সেখানে তিনি একা।২
ব্যাপারটা দাঁড়াল ‘চৈতন্যসত্তার আসল স্বরূপটি’ পাঁচশো বছরে কেউ খুঁজে পাননি, কিন্তু তিনি পেয়ে গেছেন। আর তা হল চৈতন্য এক বিশেষ ধর্মের প্রবক্তারূপে এককভাবে সাহসী ছিলেন তাঁর ধর্মের প্রচারে। প্রতর্কের কী সহজ সমাধান! এ যুগের গবেষকদের কথা ছেড়েই দিলাম, এক লহমায় ভাদুড়ীমশাই অস্বীকার করে বসলেন পূর্বসূরি বিদগ্ধ মানুষদের দৃষ্টিশৈলীকে– দীনেশ সেন, নীহাররঞ্জন রায়, বিমানবিহারী মজুমদার, সুকুমার সেন প্রমুখদের। তো ভাদুড়ীমশাই সেই জনসমুদ্র পরিবেষ্টিত, অদ্বৈত-নিত্যানন্দের সাহচর্যভূষিত ছয় গোস্বামী-উদ্ভাসিত, রাজা প্রতাপরুদ্রের বিনত আনুগত্য-শোভিত ব্যক্তিটিকে কেন ‘একা’ বললেন, সেখানেও বিভ্রান্তি প্রকট। প্রতর্কের শেষ নেই। স্নেহশীলা জননী, প্রিয়তমা স্ত্রী, সংসার, যশ, প্রতিষ্ঠা, পাণ্ডিত্য সব ছেড়ে অকীর্তিতান আচন্ডালান সমস্ত মানুষের উদ্ধারকল্পে তিনি পথে নামলেন। কিন্তু কেন তিনি নবদ্বীপ ছাড়লেন? অদ্বৈত আচার্য জ্ঞানবাদের পক্ষপাতী হয়ে উঠেছেন শুনে যে নিমাই পণ্ডিত শান্তিপুরে ছুটে গিয়ে বয়সে প্রায় পিতৃসম বৃদ্ধ আচার্যকে তাঁর স্ত্রী-পুত্রের সামনে মারধর অবধি করতে দ্বিধা করেননি, তাঁকেই কেন নবদ্বীপ ছেড়ে যেতে হল? জ্ঞানবাদী আচারসর্বস্ব পণ্ডিতরাই নবদ্বীপবাসী হয়ে থাকলেন! দলের প্রাণপুরুষের নিষ্ক্রমণে নবদ্বীপের বৈষ্ণব আন্দোলনের ভরাডুবি হল! এই কঠিন জিজ্ঞাসার সন্ধানী হন একালের গবেষক অজিত দাস, যিনি নিজে একজন জাতবৈষ্ণব। তাঁর বৃত্তান্তে লজিক ও অনুমানের বিস্তার সাজিয়ে লেখক প্রয়াসী হয়েছেন সেই ষড়যন্ত্রের পুনর্নিমাণে, যেখানে প্রকল্পিত হয়েছে কাজী-বাহিনীর সঙ্গে চৈতন্য-অনুগামী পদযাত্রী বাহিনীর সম্ভাব্য সংঘর্ষের কথা, যা এক ভয়াবহ দাঙ্গার রূপ নিতে পারত। কিন্তু গৌরাঙ্গের বুদ্ধিমত্তায় সে-সম্ভাবনার পথ বন্ধ হয়ে গেল। তিনি সন্ন্যাস নিয়ে গৃহত্যাগ করলেন। বস্তুত তিনি গৃহত্যাগে বাধ্য হলেন। বলা যায় তাঁকে বিতাড়িত করা হল নবদ্বীপ থেকে। জয় হল ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত সমাজের। পরাজয় ঘটল গৌরাঙ্গের ভক্তি আন্দোলনের।৩ যদি চৈতন্যের জীবনপঞ্জীর সন-তারিখে ফিরে তাকাই– ১৫০৯ খ্রিস্টাব্দে মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করে নীলাচলে আসেন। তারপরের ছয় বছর অর্থাৎ ১৫১৫ পর্যন্ত তিনি দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারত, গৌড়বঙ্গ ও উত্তর ভারতের বৃন্দাবন-কাশী অঞ্চলে তীর্থ ও প্রচার পরিক্রমা করেন। তারপর সেই যে তিনি ফিরে এলেন পুরীতে, আমৃত্যু অর্থাৎ জীবনের বাকি আঠারো বছর আর কখনও পুরীধাম ত্যাগ করেননি। লোকান্তরিত হন মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়সে ১৫৩৩-এ। গবেষকদের অনুমিত তারিখ ২৯ জুন। একটিবারের জন্যও ফিরলেন না বঙ্গভূমিতে। তবে এহেন প্রকল্প বা জিজ্ঞাসা আগেও এসেছে একাধিকবার। ড. ক্ষেত্র গুপ্তের ভাষায়: চৈতন্য কেন পুরীতে চলে গেলেন তার গূঢ় কারণ বলা কঠিন। কিন্তু ধর্ম বা রাজনীতি– যে কোনো ধরণের আন্দোলনের নেতা নিজ ভূমি থেকে যখন চলে যান, বোঝা যায় আন্দোলন পর্যুদস্ত এবং নেতা পিছু হটলেন কিংবা নতুন পথে এবারে তাঁর যাত্রার প্রস্তুতি। চৈতন্য সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলার মতো উপাদান নেই, নবদ্বীপে তাঁর অসাধারণ জনপ্রিয়তার ধর্মীয় বিরুদ্ধবাদীরা বা মুসলমান শাসকেরা কি ভীত হয়ে পড়েছিল? প্রত্যাঘাতের কথা ভাবছিল? নবদ্বীপে চৈতন্যের নেতৃত্বে ভক্তি আন্দোলন যে সামাজিক সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছিল তাকে কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যে কিভাবে পরিচালিত করতে হবে, তাঁর জানা ছিল না। একটা রুদ্ধ পথের প্রান্ত দেখেই কি তাঁর পিছু হটা? তবে নিরাপত্তার প্রশ্ন কিছুটা ছিলই, মুসলমান রাজশক্তি সম্বন্ধে কিছু সতর্কতা, তা না হলে উত্তর-পশ্চিম দিকে না গিয়ে পুরীর হিন্দু রাজ্যে আশ্রয় নেওয়া কেন? শুধু মায়ের ইচ্ছা বলে প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।৪ ড. ক্ষেত্র গুপ্ত এবং অজিত দাসের দৃষ্টিকোণের মধ্যে মিল যথেষ্ট। তবে ব্যাপ্তি ও সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্যও আছে। তাঁরা ছাড়াও অন্যান্য মৌলিক গবেষণা প্রকল্প থেকে মনে হয়, বঙ্গে চৈতন্যের কর্মযজ্ঞ এবং জীবন, এই দুয়েরই স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার পক্ষে ‘থ্রেট’ এসেছিল তথাকথিত স্ব-ধর্মী (হিন্দু-ব্রাহ্মণ্য শ্রেণি) এবং তথাকথিত বি-ধর্মী (মুসলমান শাসক) উভয় দিক থেকেই। এবং এই আপাত-বিরুদ্ধ দুই শ্রেণির হাত মিলিয়ে ‘সেটিং’ কোনও অ্যান্টি-চৈতন্য ‘বাইনারি’-তে সক্রিয় হয়েছিল কি না সেও এক গভীর অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে। একালেও প্রগতিশক্তির বিরুদ্ধতায় অনুরূপ বাইনারির অপকলাপ আমাদের নজর এড়ায় না।
এবং প্রশ্ন থেকেই গেছে তাঁর অন্তর্ধান প্রসঙ্গে। প্রথমত, তাঁর জীবনীকারদের মধ্যেও মতভেদ ছিল অন্তর্ধানের লৌকিকতা বা অলৌকিকতা প্রসঙ্গে। কৃষ্ণদাস কবিরাজ-সহ চরিতকারেরা হয় তাঁর তিরোধান সম্বন্ধে নীরবতা পালন করেছেন, নয়তো অলৌকিক বিবরণ দিয়েছেন। যেমন– দারুময় জগন্নাথ বিগ্রহ অথবা টোটা গোপীনাথের বিগ্রহের সঙ্গে লীন হয়ে যাওয়া অথবা নীলাচলের সমুদ্রগর্ভে অপ্রকট হয়ে যাওয়া। লৌকিক মৃত্যুর প্রস্তাবনা এসেছে লোচনদাস ও জয়ানন্দের আখ্যানে। শেষোক্তজন লেখেন, রথ-বিজয়ার দিনে নৃত্যরত অবস্থায় ইস্টকখণ্ডে পায়ে আঘাত লেগে ক্ষত ও বেদনাজনিত কারণে তাঁর দেহান্ত হয়। কিন্তু নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দীনেশচন্দ্র সেন, নীহাররঞ্জন রায়, বিমানবিহারী মজুমদার প্রমুখের ধারণা, পুরীর মন্দির বা গুন্ডিচা মন্দিরের মধ্যেই তাঁর গুমখুনের দৃঢ় সম্ভাবনায়। প্রসঙ্গত, চৈতন্য মৃত্যুরহস্য নিয়ে প্রায় বাইশ বছর ধরে গবেষণারত ড. জয়দেব মুখোপাধ্যায়ের ১৭ এপ্রিল ১৯৯৫ তারিখে পুরীতে রহস্যজনক মৃত্যুর কিনারা আজও হয়নি। এর তিন দিনের মধ্যে মৃত্যু হয় তাঁর বৃদ্ধ মায়ের। এ প্রসঙ্গে পেটেন্ট থিয়েটারের প্রযোজনায় নিহত চৈতন্য নাটকের কথা মনে আসে। এসব নিয়ে আখ্যান, উপন্যাস ইত্যাদি লেখালেখি ও চর্চাও হয়েছে। কিন্তু আবেগবর্জিত দৃষ্টিকোণে একটি অসাধারণ নিবন্ধের উল্লেখ না করলেই নয়– শ্রী দীপ্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘শ্রীচৈতন্য অন্তর্ধান রহস্য: জয়দেব মুখোপাধ্যায়ের অনুমানসমূহ’।৫ ড. জয়দেব মুখোপাধ্যায়ের কাঁহা গেলে তোমা পাই পুস্তকখানি এবং সে কোথায় শিরোনামে ঝাড়গ্রাম পত্রিকার শারদীয়া ১৯৭৭ সংখ্যাটিতে প্রকাশিত আলোচনাকে ঘিরে দীপ্ত-র প্রকল্পের বিস্তার। এছাড়া আমার বিশ্বাস, সিরিয়াস পাঠক শারদীয় আজকাল ১৪০৭-এ সাংবাদিক অরূপ বসুর চৈতন্য খুনের কিনারা করতে গিয়ে খুন? শীর্ষক দীর্ঘ রচনাটি সম্বন্ধে অবহিত। এখানে বিষয়টি আর দীর্ঘায়িত করতে চাইছি না। শুধু অরূপবাবুর আখ্যান থেকে একটি সন্ত্রাসী আবহের কথা বলতে চাই– চৈতন্যের জন্মের পাঁচশো বছর পূর্তিতে পুরীতে জয়দেববাবুর উদ্যোগে প্রথম চৈতন্যমূর্তি স্থাপনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন রাষ্ট্রপতি জৈল সিং এবং কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি রঙ্গনাথ মিশ্র। সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জয়দেববাবু বলেছিলেন, যে কারণে মহাপ্রভু অন্তর্ধানের পর পঞ্চাশটি বছর উৎকল এবং বঙ্গের বৈষ্ণবমণ্ডলী নিদারুণ আতঙ্কে স্তব্ধ করে রেখেছিল নিজেদের পরমপ্রিয় নাম সংকীর্তনকে, ঠিক সেই কারণেই চৈতন্যদেবের উপর লেখা প্রায় সমস্ত গ্রন্থেই ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেছে চৈতন্য তিরোধানের শেষ মুহূর্তের দৃশ্য বর্ণনাকে।৬ বলা বাহুল্য, তাঁর প্রতিশ্রুত কাঁহা গেলে তোমা পাই গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডটি প্রকাশের আলো দেখার সুযোগ পায়নি।
ষোড়শবর্ষীয় নিমাইয়ের সঙ্গে নবদ্বীপের গঙ্গার ঘাটে সুন্দরী লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে প্রথমদর্শনেই প্রেম। এবং পরবর্তীতে ‘লাভ ম্যারেজ’। ভ্রমণশেষে নবদ্বীপে ফিরে পান সেই অপ্রত্যাশিত সংবাদ– সর্পাঘাতে লক্ষ্মীদেবীর মৃত্যু। নিমাইয়ের সঙ্গে প্রাণপ্রিয়া লক্ষ্মীদেবীর অনাড়ম্বর বিবাহে কন্যার পিতা বল্লভাচার্য পাঁচটি হরীতকী পণ দিয়েছিলেন। সে পরিণয়ে অনুরাগ ছিল তবে দ্বিতীয় দার-পরিগ্রহে শুভার্থীদের উপরোধে এবং হিতৈষী জমিদার বুদ্ধিমন্ত খান প্রমুখের আড়ম্বরপূর্ণ স্পনসরশিপে হলেও এ বিবাহে নিমাইয়ের হৃদয়ে সেই অনুরাগ অনুপস্থিত। হরিপ্রেমে অভিভূত নিমাইয়ের কাছে ঘেঁষতে সাহস পান না বিষ্ণুপ্রিয়া। এমনকি গৃহত্যাগের পর মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎপর্ব সম্পন্ন হলেও সন্ন্যাসের ধর্ম অনুযায়ী স্ত্রীকে কাছে আসতে দেননি। একটি বার চোখের দেখার তৃপ্তিও পাননি বিষ্ণুপ্রিয়া। একালে তাই নিমাইকে সমালোচনার রূঢ়তা পিছু ছাড়ে না। যে ব্যক্তি হরিপ্রেমের ভাবোন্মত্ততার মধ্যে দিয়ে সর্বাশ্লেষী ধর্মের অবতারণা করেছেন, তিনি কেন পত্নীকে প্রেমানন্দে বঞ্চিত রাখলেন?… সমাজ তাঁকে যে দৃষ্টি দিয়েছিল, তাই দিয়ে নারীকে সামান্য ভেবে অবজ্ঞাই শ্রেয় ছিল, এমনকি শ্রীচৈতন্যের মতো কালজয়ী পুরুষের পক্ষেও। যুগপুরুষ হতে গেলে কাছের নারীকে তুচ্ছ করতে হয়, সে দৃষ্টান্ত বুদ্ধদেব থেকে রামায়ণ মহাভারত– সর্বত্র উপস্থিত। ৭ এই উদ্ধৃতিটির জন্য ঋণস্বীকার করি তিলোত্তমা মজুমদারের কাছে। তবে প্রতর্কটির সমাধান বড় সহজ নয়। বুদ্ধ থেকে চৈতন্য সবাই একপেশে ছিলেন এই সিদ্ধান্তের মধ্যেও লজিকের অসম্পূর্ণতার অবকাশ আছে। এরই অনুসঙ্গে কিছু কথা আসে। নীলাচল-বাসের সময়ে যে চৈতন্য সনাতনকে কৃষ্ণের বাঁশির ধ্বনির কথা বলতে গিয়ে বলছেন, “ধ্বনি বড় উদ্ধত পতিব্রতার ভাঙ্গে ব্রত/ পতিকোল হইতে টানি আনে”– সেই চৈতন্য সত্যিই একবার যমেশ্বর টোটা যাওয়ার পথে এক দেবদাসীর কণ্ঠে গুর্জরী রাগে গীতগোবিন্দের পদ শুনে ‘স্ত্রী পুরুষ কে গায় না জানি বিশেষ’ ছুটে চললেন। গায়ে কাঁটা ফুটল তবু ঘোর ভাঙল না। শেষপর্যন্ত গোবিন্দ তাঁকে নিবৃত্ত করেন। তখন চৈতন্যের খেদোক্তি– “গোবিন্দ আজি রাখিলে জীবন। স্ত্রী-পরশ হৈলে আমার হইত মরণ।’’ কথার তো শেষ নাই। বাসুদেব সার্বভৌমের ঘনিষ্ঠ শিখি মাহিতী পুরীতে জগন্নাথ মন্দিরের ইতিহাস লিখতেন। তাঁর সঙ্গে থাকতেন ভাই মুরারি ও বোন মাধবী মাহিতী– সুন্দরী বিধবা যুবতী এবং অসাধারণ কীর্তন গীত-কণ্ঠী। সম্ভবত তাঁর প্রতি ছোট হরিদাসের সাময়িক দুর্বলতা অনুমান করে চৈতন্য তাঁর প্রতি এমনই বিরূপভাব প্রদর্শন করেন যে, ছোট হরিদাসের মতো অনুরক্ত ভক্ত প্রয়াগে গিয়ে আত্মবিসর্জন দেন। অথচ তাঁকে ক্ষমা করার জন্য পরিকরবৃন্দ সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছিলেন– “অল্প অপরাধ প্রভু করহ প্রসাদ।’’ যিনি নিজে তৃণের চেয়েও সহিষ্ণু হতে বলেন তিনি কিন্তু তাঁর ক্রোধ-যুক্ত সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ রাখি যে, সম্প্রতি রবিবাসরীয় আনন্দবাজারে প্রকাশিত অবিন সেন-এর ধারাবাহিক উপন্যাস অনন্ত পথের যাত্রী শেষ হয়েছে, যা এখনও পুস্তকাকারে আসেনি। সেখানে মহাপ্রভু-র মীমাংসাটিকে গৌড়ীয় ভক্তগোষ্ঠী ও নীলাচলের ভক্তগোষ্ঠীর পারস্পরিক টানাপোড়েনের ফলশ্রুতি হিসেবে দেখানো হয়েছে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে।৮ ক্ষমাধর্মের ওপরে হয়তো স্থান দিতে বাধ্য হয়েছিলেন গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ভারসাম্য রক্ষাকে। এইজন্যই কি রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল– চৈতন্যের মনে যে প্রেমধর্মের আদর্শ ছিল তাহার কোথাও লেশমাত্র কালিমাপাতের আশঙ্কায় তাহাকে অসহিষ্ণু ও কঠিন করিয়াছিল।
একটু প্রসঙ্গান্তরে যাই। আমার স্থির বিশ্বাস, অধুনা চৈতন্যের পুনর্নির্মাণে তাবৎ গবেষণাপত্রই যথেষ্ট নয়। একদা ড. বিমানবিহারী মজুমদারের আকরগ্রন্থ চৈতন্যচরিতের উপাদান-এর সমান্তরাল আধুনিক গবেষণার পাশাপাশি তাঁকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস বা গল্পেরও অনুপুঙ্খ কিন্তু সাবধানী সংযোজন ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন। প্রবন্ধে-নিবন্ধে অনুভূতির সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়, যার পরিপূরক তাই উপন্যাসের কাঠামো, তার সুচারু কল্পনা যেখানে তথ্যের সঙ্গে মানবিক অনুভূতি ও দৃষ্টিকোণ গবেষণার অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দেয় স্বধর্মে। এভাবেই একদিন ইতিহাসাশ্রয়ী কাহিনিকার শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের চুয়াচন্দন গল্পখানি আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে অন্য এক নিমাই পণ্ডিতের বাঙময় চিত্র। কীভাবে মধ্যযুগীয় মাৎস্যন্যায়ের বঙ্গদেশে তরুণ অধ্যাপক নিমাই পণ্ডিতের ক্ষুরধার বুদ্ধিদীপ্ত মধ্যস্থতায় দুর্দান্ত জমিদারের মহাপাষণ্ড ভাইপো তান্ত্রিক মাধবের নাগাল এড়িয়ে ষোড়শী কন্যা চুয়া ও চন্দনদাস বেণের রোমান্স পূর্ণতা পেয়েছিল।৯ চৈতন্যদেবের সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী মূর্তি এই গল্পে অনুপস্থিত। বরং পরবর্তী অধ্যায়ে যে মানুষটি জাতি-ধর্মের বাঁধ ভেঙে সমস্ত মানুষের হরিপ্রেমে অধিকারের কথা বলবেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখিয়ে যুবক নিমাইয়ের চুয়া-চন্দনের প্রেমের সহায়তা যেন তারই পরিপূরক এক ন্যারেটিভ। রাকেশ ঘোষের নাট্যনির্মাণে থিয়েলাইট নাট্যদল এখনও মঞ্চস্থ করে থাকে চুয়া-চন্দন। চন্দনদাস বণিক ও নিমাই পণ্ডিতের প্রসঙ্গের অবকাশে একবার বুঝে নিতে পারি সামাজিক-রাজনৈতিক আবহটিকে। পঞ্চদশ শতকে বাংলায় স্বাধীন সুলতানি আমলে বাণিজ্যের বিকাশ ঘটেছিল। প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করত ব্রাহ্মণ্যবাদ। অন্যদিকে পেশা-শ্রমী শ্রেণি আত্মপ্রতিষ্ঠার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। তাই দুপক্ষের সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। নবদ্বীপে নিমাইয়ের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই সময়েই। বাংলায় সুলতানি শাসনের অধ্যায়ে ১৪৯৩-১৫৩৮ অবধি হুসেন শাহি বংশের পরপর চার সুলতানের প্রথম আলাউদ্দিন হুসেন শাহের রাজত্বকাল (১৪৯৪-১৫১৯) চৈতন্যের সমসাময়িক। এই সময়েই উদ্ভব ও বিকাশ মঙ্গলকাব্যের, যার এক অবিসংবাদী নায়ক চাঁদবেণে বা চাঁদ সদাগরও জড়িয়ে পড়লেন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সংঘাতে। চৈতন্য আপামর মানুষের নেতৃত্বের কালে বিগ্রহের বদলে গুরুত্ব দিলেন বোধের ওপরে। ২০১০ সাল নাগাদ বহুরূপী মঞ্চস্থ করেছিল অলখ মুখোপাধ্যায়ের নাটক চৈতন্য। এই নাটকে চৈতন্য বলেছেন, মানুষ স্ববশ। সমষ্টির অঙ্গ হিসেবে নয়, তাকে ব্যক্তি হিসেবে মর্য্যাদা দিতে হবে। কিন্তু তারপরেই শুরু হয় ট্র্যাজেডি। এই নাটকে যে চৈতন্য বিগ্রহচ্যুতির কথা বলেন, তাঁকেই বিগ্রহে পরিণত করে দেওয়া হয়। কারণ বিগ্রহচ্যুতি রাষ্ট্রচেতনাযুক্ত প্রতিষ্ঠান স্বীকার করে না। সনাতন ধর্মও স্বীকার করেনি, কারণ তাতে সমষ্টির চেয়ে ব্যক্তির গুরুত্ব বেড়ে যায়। যার ঠিক বিপরীতেই হয়তো ছিল তাঁর লক্ষ্য। ১০
আমি অন্তত ২০১০ সালে বহুরূপীর চৈতন্য নাটকের নাট্যকার হিসেবে অলখ মুখোপাধ্যায়ের নাম প্রথম শুনি, যিনি হয়ে উঠবেন একালের মেধাবী চৈতন্য-স্কলারদের মধ্যে অন্যতম। ২০১৪-য় যখন তাঁর এক জন্মেই জন্মান্তর বইখানি১১ হাতে এল, পরিচয় পেলাম তাঁর রচনাপ্রতিভার একাগ্র গভীরতা এবং বিষয়গত অনন্যতাকে। ১৯৯ পৃষ্ঠার উপন্যাস-অবয়বে বইখানি ষোড়শ শতকের প্রথম দশক উপান্তের নবদ্বীপের পরিবর্তমান ধর্মসমাজ ও ভাবসংঘাতের গহন অবলোকন। এই কালখণ্ডে নবদ্বীপকে ঘিরে বিদ্যাভাবনা ও পুণ্যচর্চা, সাহিত্যাদর্শ ও শাস্ত্রচিন্তা, দেবভাষা ও বাংলা ভাষার মধ্যে যে সংঘত ঘটেছিল, তাতে টলে গিয়েছিল অজরামর ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের সংস্কৃতি। ৩৯ অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই কাহিনি চৈতন্যের আদিপাঠ, নিমাই পর্বের বিবিধ দোলাচল ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাসে জন্মান্তর হয় এক জনপদেরই– ভাগীরথী তীরের নবদ্বীপ। ভাববিহ্বল হরিকথাকাতর নিমাইয়ের পরিচিত ইমেজকে অলখ মুখোপাধ্যায় ব্যবহার করেননি সজ্ঞানে।
নিমাইকে নিয়ে শরদিন্দুর এই ফ্ল্যাগশিপ কাহিনির পরে বহুদিন সেরকম উপন্যাস চোখে পড়েনি যেখানে ইতিহাসকে আশ্রয় করে সাহিত্যসৃজন সন্ধান করেছে চৈতন্যের ভিন্ন অবয়বকে। তবে একুশ শতকের শুরু থেকেই সৃজনশীল লেখকেরা সেকাল ও একালকে জুড়ে সাহিত্য সৃজনে প্রয়াসী হয়েছেন– যাকে ভেবে নিতে পারি অ্যাকাডেমিক আলোচনার সমান্তরালে এক পরিপূরক চর্চা হিসেবে। আগেই উল্লেখ করেছি– অবিন সেনের অত্যন্ত সুলিখিত সদ্যসমাপ্ত ধারাবাহিক উপন্যাসটি অবশ্যই সাম্প্রতিকতম, যা অনেক নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। তার আগের অন্তত তিনখানি উপন্যাসের নাম করব যেখানে অসাধারণ মেধায় নির্মাণ হয়েছে সেই খোঁজের, যা পুনর্নির্মাণের প্রয়াসী ইতিহাসে বাঙালি-সত্তার সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ব্যক্তির অন্তর ও অবয়বকে। অব্যয় লিটারারি সোসাইটির বুলেটিনের জুলাই ২০১৪ সংখ্যায় এই তিনটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছিলাম। ২০০৮ থেকে ২০১২-র মধ্যে এগুলি প্রকাশিত। প্রথমটি অভিজিৎ সেনের রাজপাট ধর্মপাট। দ্বিতীয়টি শৈবাল মিত্রের গোরা এবং তৃতীয়টি রূপক সাহার ক্ষমা করো হে প্রভু। চৈতন্যদেবের গৌড় তথা রামকেলি প্রদর্শন প্রসঙ্গে ‘গৌড়ে ব্রাহ্মণরাজা হব হেন আছে’ অথবা ‘নবদ্বীপে ব্রাহ্মণ অবশ্য হব রাজার/ গন্ধর্বে লিখন আছে ধনুর্ময় প্রজা’ (জয়ানন্দ)। এহেন লিখনে কিছু অনুমানের সুযোগ আছে। চৈতন্যকে কেন্দ্র করে সুলতান হুসেন শাহ-র হিন্দু অমাত্যদের মধ্যে কি কোনও উচ্চাশা অঙ্কুরিত হয়েছিল? অভিজিৎ সেনের প্রাককথন অনুযায়ী, এই প্রশ্নটি কুড়ি বছর আগে আমাকে হঠাৎ আলোড়িত করেছিল। সত্যিই তো, চৈতন্য উড়িষ্যা থেকে ফিরে সোজা শান্তিপুরে গিয়ে অদ্বৈতের সঙ্গে কী আলোচনা করলেন ? সেখান থেকে কুলিয়া গ্রামে বিদ্যাবাচষ্পতির বাড়িতে অজ্ঞাতবাসই বা করতে গেলেন কেন ? সেখান থেকে রামকেলিতেই বা হঠাৎ এলেন কেন ? রূপ, সনাতনই বা ছদ্মবেশ ধারণ করে মাঝরাত্তিরে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন কেন ? এ ধরণের বহু প্রশ্নের কোন পরিষ্কার উত্তর নেই। ১২
এসব প্রশ্নের নির্মাণে-বিনির্মাণে তোলপাড় হয়েছে উপন্যাসখানি। রাজপাট ধর্মপাট– এই নামখানির মধ্যেও রয়েছে চৈতন্যের ধর্মপ্রবক্তা ইমেজের সঙ্গে রাজনৈতিক সত্তার এক জটিল রসায়ন। বোধহয় এই উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ১৯৬৩-১৯৬৯ এই ছয় বছর কলকাতার একটি বিমা কোম্পানিতে চাকরি করার পর চাকরি-ঘর-কলকাতা ত্যাগ করে অভিজিৎ সেন (জন্ম ১৯৪৫) নকশালপন্থী আন্দোলনে যোগ দেন। পরবর্তীতে রাজনীতি ত্যাগ করে উত্তরবঙ্গের বালুরঘাট শহরে ফের চাকরিতে যোগ দেন। সমবায় ও গ্রামীণ ব্যাঙ্কে ৩১ বছর চাকরির সূত্রে উত্তরের জেলাগুলিতে ব্যাপক ঘোরাফেরার সুযোগ তাঁকে গভীর পরিচয় করিয়ে দেয় গ্রামবাংলার সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গে।
শৈবাল মিত্রের ছয়-শতাধিক পৃষ্ঠার উপন্যাসের১৩ প্রোটাগনিস্ট একালের যুবক গোরা যাঁর চোখ দিয়ে দেখানো হয়েছে সেকালের গোরা– নিমাই-চৈতন্যকে। আর তাঁর অনুধাবনে উঠে এসেছে আর এক গোরা– রবীন্দ্রনাথের গোরা। রবীন্দ্রনাথের গোরা যেমন শুধু স্বদেশের জাতক নয়, চৈতন্যও তেমনি আন্তর্জাতিক। প্রভূত পরিশ্রম, চর্চা ও কল্পনার ইঙ্গিত রয়েছে তিন কালের তিন গোরা-কে জড়িয়ে। আশ্চর্য সমাপতনে লেখক শৈবাল মিত্রও ষাটের দশকের উল্লেখযোগ্য নকশালপন্থী ছাত্র-নেতা, যে দশকে দাঁড়িয়ে তাঁরা সতত প্রশ্ন করে গেছেন উনিশ শতকের বঙ্গীয় রেনেশাঁর পুরুষদের, যার অনুসঙ্গে এসেছে বহু বিতর্কিত মূর্তিভাঙার রাজনীতি। হয়তো উনিশ শতকের প্রতিতুলনাতেই চৈতন্যের নির্মাণ এই উপন্যাসের চলনে। এবং যে ভাবনা-প্রতিষ্ঠান মনে করে থাকে ভারতীয় আধুনিকতার প্রকৃত জন্ম সেই চৈতন্যের কালেই পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে, এ উপন্যাস সেই চিন্তাকে কোল দেয়। অন্তত বাংলাসমাজে নাগরিক ও গ্রামীণ সংস্কৃতির বহু লক্ষণ ইতিহাসে চৈতন্যপর্বেই পরিস্ফুট। এভাবেও বলা যায় যে, ভারতবর্ষে আইডেন্টিটি পলিটিকস বা দলিত রাজনীতি বা দেশভাগ-উত্তর দুই বাংলায় মতুয়া-নমঃশূদ্র সমাজের যে কণ্ঠস্বর শুনতে পাই এবং ভোটসর্বস্ব বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি সুকৌশলে আত্মসাৎ করে থাকে যে শক্তিকে, তাকে স্বার্থহীন মান্যতা ও সম্মান দেওয়া হয়েছিল সেই চৈতন্যের ভাবধারাতেই। চৈতন্যের ভোট-ভাবনা ছিল না। যদিও চৈতন্য-পরবর্তী কালে সেই ভাব কোণঠাসা হয়েছিল ক্রমে– বৈষ্ণব সমাজের মধ্যেই তো শূদ্র-বৈষম্যের বাস্তবতা থেকে তৈরি হয়েছিল জাতবৈষ্ণব গোষ্ঠী। বলা প্রাসঙ্গিক হতে পারে যে, উত্তর-ঔপনিবেশিক উত্তর-আধুনিক ইতিহাসচর্চা ভারতে খানিকটা গতি পায় ষাটের দশকের আন্দোলন থেকেই, সম্ভবত মূলে যাওয়ার তাগিদ থেকেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় উপন্যাসটি শৈবাল মিত্র ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন প্রায় আট বছর ধরে (২০০৪-২০১২) একটি পত্রিকায়।
রূপক সাহা-র ক্ষমা করো হে প্রভু উপন্যাসটিও১৪ ধারাবাহিকভাবে এসেছিল প্রতিদিনের রোববার-এ ২০১১-১২ সালের পরিসরে। এখানেও গোরা নামে এক আধুনিক চরিত্র আছে, যে দলিত মানুষদের নিয়ে সংগঠন করে। তাঁর উপন্যাসের বিস্তারে চৈতন্যের মৃত্যুরহস্য ও সংশ্লিষ্ট ষড়যন্ত্র নিয়ে প্রায় গোয়েন্দা কাহিনির মতো প্লট বিন্যস্ত হয়েছে। তথ্যসন্ধানের ব্যাপক পরিশ্রমও আছে।
সাধন চট্টোপাধ্যায়ের পাণিহাটা উপন্যাসেও১৫ রাজপাট-ধর্মপাট এবং গোরা-র মতোই চৈতন্যদেব প্রধান চরিত্র। উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র একালের দধীচী-র দৃষ্টি দিয়ে আমাদের বোধের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে পাঁচশো বছরেরও আগের একটি আঞ্চলিক ইতিহাস, ঐতিহাসিক সেইসব পুরুষ এবং সেইসঙ্গে লোককথা, মিথ, পরিত্যক্ত গড়, বৈষ্ণব পাটবাড়ি, মন্দির, হারিয়ে যাওয়া ডকইয়ার্ড, জমিদার বংশের টানাপোড়েন ইত্যাদি। এক দীর্ঘসময় ধরে জমে থাকা ধুলোমলিন নথিপত্রে আলো পড়ে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঔদাসীন্য, প্রোমোটার-রাজ, ধর্মীয় কর্পোরেট আগ্রাসন আর স্থানীয় মানুষের নির্লিপ্ত দৃষ্টিভঙ্গি মিলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা ইতিহাসকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। বিস্মরণের যুগে হারিয়ে যাচ্ছে এক একটি জনপদের আত্মপরিচয়। ইতিহাস তার শেষ নিশ্বাস ফেলছে কোনও ঠাকুরদালানের ফাটলে, কোনও বারান্দায় মুখ থুবড়ে। অথচ একসময়ে পাণিহাটির বৈষ্ণবকেন্দ্রের স্থান ছিল নবদ্বীপ এবং শান্তিপুরের পরেই। একদিন পাণিহাটির গঙ্গায় ভিড়েছিল শ্রীচৈতন্যের বজরা। নিত্যানন্দের মূল আন্দোলনের কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল এখান থেকেই। এই পাণিহাটিতেই কৈশোরের বেশ কিছুদিন কেটেছিল রবি ঠাকুর নামের এক একাদশ বর্ষীয় বালকের। বৃদ্ধ বয়সে রবীন্দ্রনাথ এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র এখানেই উদ্বোধন করেছিলেন বাসন্তী সুতোকল, অধুনা যা আগাছা-জঙ্গলে পরিত্যক্ত। চৈতন্য এবং তাঁর সময়কে ফ্রেম অব রেফারেন্স বা স্থানাংকে রেখে উপনিবেশ-উত্তর বঙ্গজীবনের বিবর্তন ও গহন ক্ষতির এক দলিল হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাসখানি।
বিনির্মাণে পুনর্নিমাণে চৈতন্য-প্রতিমার রূপায়ণের প্রয়াসে সন্ধানী মেধার সঙ্গে মিশে থাকবে কিছু অতিশয়োক্তি বা ত্রুটিপূর্ণ দৃষ্টিকোণ। তবু এই প্রয়াস স্বাগত। কারণ যে চৈতন্যকে ও তাঁর উত্তরাধিকারকে আমরা আশৈশব জেনে এসেছি পাঠ্যপুস্তকের পৃষ্ঠায় প্রথাগত চর্চায় সেও তো নিদারুণভাবে অসম্পূর্ণ। প্রথম গণজাগরণ এনেছিলেন যে পুরুষ, তিনি প্রথাগত ইতিহাসের ফ্রেম-বন্দি থাকাটা একটি জাতির আত্মপরিচিতি তথা অস্মিতার পক্ষে শুভ নয়। সমাজমানসে তার নতুন বীক্ষা হবেই। প্রথাগত গবেষণার বাইরে সৃজনশীল সাহিত্যেও তাঁকে খুঁজতে হবে ইতিহাস মন ও মননের সম্মিলনে। চৈতন্য ও তাঁর ধর্মের উত্তরাধিকারকে চিহ্নিত করতে এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে। যেভাবে বাংলা সাহিত্য সঙ্গীত সংস্কৃতি প্রভাবিত হয়েছে উত্তর-চৈতন্যযুগে সেখানেও বিশ্লেষণের অবকাশ আছে, কতটা প্রভাব তাঁর স্বাভাবিক উত্তরাধিকারজাত আর কতটা তাঁর সম্পূর্ণতাকে সঠিক আধারে ধরতে পারা-না-পারার সীমাবদ্ধতাজাত। সম্পূর্ণ চৈতন্যের সন্ধানের সন্ধানের জন্য তাই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের ভিন্নতর খোঁজের সঙ্গে মিশে আছে সাহিত্যের চৈতন্যের প্রশ্নটি। চৈতন্য আসুক সার্বিকভাবে গবেষণায় ধ্যানে ধারণায় প্রেরণায় শ্রাবণের ধারার মতো। পরিশেষে বলা প্রয়োজন, এ লেখার কোনও তথ্য বা দৃষ্টিকোণ স্ব-সৃজিত নয়, বরং বিভিন্ন গবেষক-লেখকের অনুমান বা মীমাংসার কিছুটা সমাহার। আমরা যারা বুদ্ধ চৈতন্যের মতো যুগ-পুরুষের ঐহিক অবয়বটিকে খুঁজেই চলি সারাজীবনের ব্যস্ততায় কিংবা অবসরে, তাদের কাছে এই সমাহার হয়তো কিছুটা অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। অবন্তীকুমার সান্যালের একটি সন্দিহান জিজ্ঞাসা দিয়ে শেষ করি।১৬ বৃন্দাবন দাসের জীবনী গ্রন্থে প্রকট হয় যে, নবদ্বীপে ও নীলাচলের প্রথম পর্বে তাঁর ভাবসাধনা ছিল ‘দাস্য’। কিন্তু অন্তিমের ১২ বছরে তিনি ‘মধুর’ ভাবের সাধনায় বাহ্যজ্ঞানলুপ্ত। দাস্য ও সখ্য ভাব থেকে মধুর ভাব প্রকৃতিতে স্বতন্ত্র। দাস্য ও সখ্য সমষ্টির মানসিক নৈকট্য সৃষ্টির অনুকূল। আধ্যাত্মিক হলেও সামাজিক সংহতি ও সাম্যের উপযোগী। ‘মধুর’ সমষ্টি থেকে একান্ত দূরগত। যে নিত্যানন্দ ও অদ্বৈতকে চৈতন্য বঙ্গে প্রচার ও সাংগঠনিক দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন, তাঁরা কেউই ‘মধুর’ ভাবের সাধক ছিলেন না। অথচ তাঁর শেষ ১২ বছরের মধুর ভাব ও বাহ্যজ্ঞানশূন্যতা এহেন পরিচিতি এই অতীতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই ‘মধুর’ ভাবসাধনা কি তাঁর শেষজীবনের উত্তরণ নাকি তাঁর ভিন্নতর নির্মাণে আরোপিত সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রসঙ্গসূত্র
১) বাংলা সাহিত্যের গল্পমালা/ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও আশা গঙ্গোপাধ্যায়/ পৃ. ৩৬/ ২য় সং/ নাগ বুক হাউস
২) চৈতন্যদেব/ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী/ পৃ. ৯/ সেপ্টেম্বর ২০১২/ প্রথম পত্রলেখা মুদ্রণ
৩) জাতবৈষ্ণব কথা/ অজিত দাস/ পৃ. ২৭/ ২য় পরিবর্ধিত সং/ জানুয়ারি ২০০৬/ সময়
৪) শ্রীচৈতন্য : একালের দৃষ্টিকোণ/ সম্পাদনা ড. ক্ষেত্র গুপ্ত/ পৃ. ১১৪/ প্রথম প্রকাশ ৯ জুলাই ১৯৮৬/ যুগ প্রকাশনী
৫) দশদিশি, বিষয় শ্রীচৈতন্য/ পৃ. ৩১৮/ নভেম্বর ২০০৯/ দশদিশি
৬) ‘চৈতন্য খুনের’ কিনারা করতে গিয়ে খুন?/ অরূপ বসু/ শারদীয় আজকাল ১৪০৭/ পৃষ্ঠা ৩৯২
৭) ওগো বিষ্ণুপ্রিয়া/ তিলোত্তমা মজুমদার/ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১২/ আনন্দবাজার পত্রিকা
৮) অনন্ত পথের যাত্রী/ অবিন সেন/ পর্ব-২১/ আনন্দবাজার রবিবাসরীয়/ ১ জুন ২০২৫
৯) চুয়া-চন্দন/ শরদিন্দু অমনিবাস ষষ্ঠ খণ্ড/ পৃষ্ঠা ১০৬/ ১৯৭৮/ আনন্দ পাবলিশার্স
১০) বহুরূপী-প্রযোজনা চৈতন্য-এর মুদ্রিত ফোল্ডার থেকে
১১) এক জন্মেই জন্মান্তর/ অলখ মুখোপাধ্যায়/ প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ২০১৪/ কৃতি
১২) রাজ্যপাট-ধর্মপাট/ অভিজিৎ সেন/ পৃ. ৮/ প্রাক-কথন/ প্রথম প্রকাশ/ জানুয়ারি ২০০৮
১৩) গোরা/ শৈবাল মিত্র/ পৃ. ১০/ প্রথম প্রকাশ সেপ্টেম্বর ২০১২/ দেজ পাবলিশিং
১৪) ক্ষমা করো হে প্রভু/ রূপক সাহা/ প্রথম প্রকাশ ২০১৩/ দীপ প্রকাশন
১৫) পাণিহাটা/ সাধন চট্টোপাধ্যায়/ প্রথম প্রকাশ ২০১৪/ করুণা প্রকাশনী
১৬) শ্রীচৈতন্য এবং ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত/ অবন্তীকুমার সান্যাল/ পৃ. ২৭/ দেশ/ ৪ মার্চ ২০০২
চিত্রণ: রাজ রায়







