আতঙ্ক
‘ঘন ঘন মোবাইল দেখছিস যে বড়?’
‘বরের মেসেজ?’
সীমা অপ্রস্তুত। সামাল দিতে বলে, ‘ধুর! শুনছি তো তোদের কথা।’ আসলে সে মোবাইলে দেখছিল ঘড়ি। দরজা-জানলা-বন্ধ এসি ক্যাফে-তে সময় বোঝা যায় না। ছ’টা!
ঊর্মিমালা সন্তুষ্ট নয়। ‘বল্ তো, কী কথা হচ্ছিল?’
সীমা ম্যানেজ দিতে যায়। ‘সরস্বতী পুজোর আল্পনা, তাই তো?’
‘ঘোড়ার ডিম!’, যূথিকা বলে, ‘কারেন্ট নুনে ছিলাম আমরা।’
অর্চনা আর বীথি হাসির হররা তোলে। আজ সবাই বালিকা। একবেলার কৈশোর। পাঁচ মাথা এক হয়েছে কয়েক যুগ পর৷ সব মাথারই চুলে পাক। অর্চনার স্কুলে থেকে রিটায়ার করতে আর বছর দশেক। যূথিকারও ওরকমই; সে নার্স। ঊর্মির আঁকার ইস্কুল হয়েছে নিজের। সীমা আর বীথি দুই শহরে দুই ঘর সামলায়। বীথি ব্যাঙ্গালোরে। সীমা মধ্যমগ্রামে। বেণী দুলিয়ে যে বালিকারা যেত বিনোদিনী ইস্কুলে, তাদের ভুলেই গিয়েছিল ওরা৷
বছর তিনেক আগে সীমার ছেলে চাকরি পেল। মাকে স্মার্ট ফোন গিফট করার সময় ছেলেই খুলে দিয়েছিল ফেসবুক। ছেলেই প্রথম ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করেছিল। তারপর মেয়ে। দেওর। ননদ। দাদা। বৌদি। অতঃপর সমীর রিকোয়েস্ট পাঠাল। অ্যাক্সেপ্ট না করে উপায় কী? মাসের পর মাস সীমার ফেসবুক পরিসর পরিবারের ভার্চুয়াল সংস্করণ হয়ে রইল। হঠাৎ একদিন ‘পিপল ইউ মে নো’-তে যূথিকার মুখ ভেসে উঠল। সীতাহরণ খেলতে গিয়ে খেজুর গাছে আছাড় খেয়ে রক্তারক্তি হয়েছিল— সেই দস্যি যূথী? সীমার থরোথরো আঙুল ছুঁয়ে দিয়েছিল ‘সেন্ড রিকোয়েস্ট।’ ব্যাস। সারা রাত ঘুম আসেনি৷ সমীরের সঙ্গে এক খাটে বারবার ফোন দেখা যায় না। সকালে এক ছুটে ফোন নিয়ে রান্নাঘরে। লগ ইন করতেই… ‘অ্যাক্সেপ্টেড।’ ইনবক্সে ঝাঁপিয়ে মেসেজ। ‘কেমন আছিস সীমা? কত খুঁজেছি তোকে! সারনেম চেঞ্জ করেছিস বলে কিছুতেই পাইনি!’
চায়ের জল ফুটছিল টগবগ। কান্না পাচ্ছিল না, আনন্দ হচ্ছিল না, অস্থির লাগছিল। সীমা কতদিন এমন কারও সঙ্গে কথা বলেনি, যে একান্ত নিজের! সীমা কি এমন কারও সঙ্গে কথা বলার এখনও অধিকারী? কী যে বলতে হয়, সীমার গুলিয়ে যাচ্ছিল। যূথিকাকে খুঁজে পাওয়ার পর রোজই সাজেশন–এ বহুযুগের ওপার থেকে নানা মুখ ভেসে উঠতে লাগল। একের পর এক ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে লাগল সীমা। অ্যাক্সেপ্টও হতে থাকল।
বাকিরা আগেই একে অপরকে খুঁজে পেয়েছিল ফেসবুকে। এক বেঞ্চে বসেছে যারা ফাইভ থেকে টেন। বিনুনি ধরে দিয়েছে রামটান। হু-হা শব্দে দশ পয়সার কারেন্ট নুন খেয়েছে। শুধু সীমা হারিয়ে গিয়েছিল। ওরা পরস্পরকে খুঁজে পেয়েছিল, কিন্তু দেখা করার তাড়া ছিল না। দেখা তো রোজই হচ্ছে ভার্চুয়ালে! সীমার তাতে মন ভরেনি। সীমারই উদ্যোগে মিট-এর তোড়জোড়। চাকরিওয়ালাদের সময় মেলে না। তার ওপর আছে বীথির ব্যাঙ্গালোর থেকে উজিয়ে আসা। দিন পিছোতে পিছোতে দেখা হল পৌনে দু’ বছরের মাথায়। লক্ষ্মীপুজোর একদিন বাদে। কারও বাড়িতে বসলে হত না? ওরা বলেছিল, ‘ধুর, মন খুলে গল্প করা যাবে?’ সীমা এড়াতে চাইছিল খরচ। সংসার থেকে যা বাঁচে, তা দিয়ে হাতখরচটা চালিয়ে নেয়। কিন্তু ক্যাফে-ট্যাফে… আবার হাত পাতবে?
মধ্যমগ্রাম থেকে সরকারি এসি বাসে নিয়েছিল সীমা। ঘেমেনেয়ে একসা হতে চায়নি৷ নামার আগে কাচে দেখে নিয়েছিল চুল, মুখ। ওরা কেন বলল, বাড়িতে কথা বলা যাবে না? সীমার তো বাড়িই সর্বস্ব৷ প্রতিটা ইট তাকে চেনে। সে না ছুঁলে পোষ-মানা মসলার কৌটোর প্যাঁচও আলগা হতে চায় না। বড় রাস্তা থেকে গলিঘুঁজি পেরিয়ে ক্যাফেটা। ভিতরটা ভেজা ন্যাকড়া জড়ানো জলের কুঁজোর মতো। শান্ত, ঠান্ডা৷ দরজা ঠেলতেই সিংহনাদে বলল যূথী, ‘এসে গেছে!’ এমন বাবু হয়ে বসেছিল, যেন নিজের ঘরবাড়ি৷ সোফা-চেয়ারে আধশোয়া ছিল ঊর্মি। ক্যাফেটায় এখন ওরা ছাড়া কোনও খদ্দের নেই। বীথি আর অর্চনা কথায় কথায় হেসে ঢলে পড়ছিল এ-ওর গায়ে৷ নাঃ, বাড়িতে এসব চলত না। বাড়িতে জোরে হাসেনি কখনও সীমা।
প্রথমে কথাবার্তা গোঁত্তা খাচ্ছিল এক জায়গায়। সুখী সুখী শ্রুতিনাট্য। বন্ধুদের অদেখা বর আর সন্তানের চরিত্রগুলো সফেদ কাপড় পরে স্মিতহাস্যে সার বেঁধে চোখের সামনে মার্চ করছিল। সমীর যেমন। সীমা বলল, সমীর তাকে চোখে হারায়। বিয়ের মাসখানেক পরে মা ডেকেছিল বাগানের আম ক’খানি দেবে বলে। কালবৈশাখী উঠতে বৌদি বলল, ‘থেকে যাও।’ বৌদিই ফোন করেছিল সমীরকে৷ বাবু বললেন, ‘থাকুক।’ কিন্তু গাম্ভীর্য দেখে দাদা সে রাতেই ছেড়ে এল। বৌদি টোন কাটল, ‘কী টান ঠাকুরজামাইয়ের গো!’ তারপর থেকে কয় রাত সে মায়ের বাড়ি থেকেছে, হাতে গোনা যায়। বীথি আর যূথী কিছু আদিরসাত্মক ঠাট্টা করল। চুপ করে শুনছে ঊর্মি। স্মিত হাসি ঠোঁটে। এ আলোচনায় ওর কিছু যোগ করার নেই।
টিফিনকৌটোয় লক্ষ্মীপুজোর নাড়ু এনেছে সীমা। ঊর্মি চাপা গলায় বলল, ‘টেবিলের তলা দিয়ে। ক্যাফেতে বাড়ির খাবার অ্যালাউড নয়!’ কিশোরীর মতো ওরা টুপটাপ মুখে পুরতে লাগে। আবার, আপাতভাবে অকারণ, হো-হো হাসিতে ক্যাফে কেঁপে উঠল৷ ওদের মনে পড়ে গিয়েছিল অঙ্ক পিরিয়ডে লুকিয়ে লজেন্স চালান।
‘একেবারে লক্ষ্মীঠাকরুণ তো! গুছিয়ে সংসার করছিস!’
সীমার গলায় খানিক অহংকার। ‘নিজের বাড়ি শুধু নয়, দেওর-ননদদেরও বাড়ির ভোগের নাড়ু আমিই বানাই।’
‘আমি কিন্তু শীতে নাড়ু বেচি, জানিস?’, বীথি বলে, ‘মেয়ে বড় হওয়ার পর হাতে অনেকটা সময়৷ ব্যাঙ্গালোরে বাঙালিরা নাড়ু, পিঠে, নিমকি, এসব পেলে লুফে নেয়।’
সীমা অবাক হয়। বেচার কথা তার মনেই আসেনি। পিঠে-পুলি-পাটিসাপটা-নাড়ু-কেক-পুডিং। আচার-জ্যাম-জেলি-স্কোয়াশ। মোগলাই-চাইনিজ-বিরিয়ানি। শিখতে হয়নি, এমন রান্না নেই৷ ও বাড়িতে কেনা খাবারে সবার অরুচি। বেচাও যায়?
যূথী বলে, ‘ছেলে আর তার বাবা গোঁসা করে। বিজয়ার সময় বাড়ির এটা-ওটা পেলে খুশি হত।’
অর্চনা বলে, ‘যা-ই ডিউটি থাক, শীতে এক সাঁঝ সরুচাকলি আর চিতোই পিঠে হবেই। কত্তা ঠিক নতুন গুড় নিয়ে হাজির হবে। মিক্সি হয়ে সুবিধে হয়েছে৷’
‘আমার এসব বখেড়া নেই।’ এই বলে ঊর্মি বাথরুমে চলে যায়। টেবিলে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর কফি। অর্চনা চোখের ইশারায় বাথরুম নির্দেশ করে। ‘খারাপ লাগে!’
ঊর্মি বিয়ে করেনি। কেন করেনি, কেউ জানে না। বাবার বাড়ির নিচের তলাটা পেয়েছে। ওপরতলাটা দাদা-বৌদির। বৌদির সঙ্গে নাকি খিটিমিটি লেগে থাকে৷ পুরো বাড়ি দাদার হয়নি, এতে বৌদির রাগ। ঊর্মি পাত্তা দেয় না। নিচের তলার একদিকে আঁকার স্কুল খুলেছে দুটো ঘর নিয়ে।
‘ওর বাবা-মা জোর করেনি?’, সীমা বিড়বিড় করে। ওর গ্র্যাজুয়েশনের থার্ড ইয়ার থেকে দেখাশোনা শুরু হয়েছিল। পরীক্ষা শেষ হতেই বিয়ে। রেজাল্ট বেরোয়নি তখনও। ঊর্মি কীভাবে যে একা কাটাবে আজীবন!
রুমালে মুখ মুছতে মুছতে ঊর্মি ফিরে আসতেই অর্চনা একটা আলটপকা কথা বলে৷ ‘ঊর্মি, তুই কি ইয়ে? লেসবিয়ান?’
সীমা বিষম খেল৷ ওরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। ভাগ্যিস ঊর্মিই হো-হো হেসে ওঠে! নইলে তাল কেটে যেত। বলে, ‘এদ্দিন পর? হঠাৎ?’
এসব আলোচনাই হয়নি কখনও স্কুলে। শব্দটাই জানত না ওরা। অর্চনা অন্য কথা তোলে, ‘তোর আঁকার স্কুলে যাব একদিন।’ ঊর্মি ঝলমল করে৷ ‘আলবাৎ আসবি! আমার অনেক বাচ্চাকাচ্চা।’
আরেকবার ঘড়ি দেখে সীমা। মানে মোবাইল। একটা হিসেব কষেছিল। মধ্যমগ্রাম থেকে যেতে দেড় ঘণ্টা৷ ঘণ্টা দুই গল্পগাছা। ফিরতে দেড় ঘণ্টা আরও৷ ফেরার সময় জ্যাম হতে পারে, তাই হাতে আরও এক ঘণ্টা ধরা৷ তা হলে হল গিয়ে ছ’ ঘণ্টা। দুটো নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। আটটায় মধ্যে বাড়ি ঢুকতে অসুবিধে হবে না৷ মেয়েকে বলা ছিল বাবাকে বিকেলের চা দিতে। অথচ এখানে সময় থমকে গেছে। গল্প ফুরোচ্ছেই না৷ আজকের অভিযান সমীর পছন্দ করেনি৷ মেয়ের টিউশন নয়। বাজারহাট নয়। ডাক্তারবদ্যি নয়। এমনি এমনি ভরদুপুর থেকে ভরসন্ধেবেলা পর্যন্ত বাড়ির বউ বাইরে! শাশুড়ি বেঁচে থাকতে এমন অলুক্ষুণে কিছু করার সাহস পায়নি সীমা। পাপান ব্যাঙ্গালোরে চলে যাওয়ার পর, মান্টি বড় হওয়ার পর, শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর, সমীরের অফিসের ভাতের তাড়াও যখন আর রইল না, তখন সীমা দেখল, মহামূল্য সময়ের খানিকটা তার কোলে আলগোছে পড়ে৷ অথচ আর কোনও শখ নেই পূরণ করার৷ আর কোনও সাধ নেই মেটানোর৷ সব ভোঁ-ভাঁ। সেই সময়ের খানিকটা যদি সে হঠাৎ-ফিরে-পাওয়া বন্ধুদের দেয়, সমীরের গোঁসা কেন হয়?
সাতটা নাগাদ, ফেরার কথাটা সীমাকেই তুলতে হল। দুয়ের বদলে চার ঘণ্টা কেটে গেছে আড্ডায়। এখনই বেরোলে, তেমন জ্যাম না পেলেও, বাড়ি পৌঁছতে সাড়ে ন’টা। শেষ কবে সাড়ে ন’টায় বাইরে ছিল সীমা? একা? ঊর্মির নয় সংসার নেই৷ যুথী-বীথি-অর্চনা? ওদের তাড়া নেই? চ্যাংড়া ঊর্মি গেয়ে উঠল, ‘আভি না যাও ছোড় কর।’ হাই তুলে অর্চনা বলল, ‘ঠিক হ্যায়! শেষ রাউন্ড কফি হয়ে যাক৷ সেল্ফি তোলাও বাকি।’
সীমার উচাটন লাগে৷ ও কি বলবে যে, সমীর রাগ করবে? ও কি বলবে যে, রেগে গিয়ে সমীর ওকে ‘বেশ্যা মাগী’ বলতে পারে? এসব কি বলার মতো কথা?
বীথি খুঁটিয়ে দেখছে, সেল্ফিতে কারও চোখ বোজা কি না৷ ‘এই সীমা, হাস্ একটু। আরেকবার নেব।’
কলের পুতুলের মতো হাসল সীমা। শেষ রাউন্ড কফি আসতে দেরি হচ্ছে। খেজুরগাছের কাঁটাগুলো তাকে গোপনে রক্তাক্ত করছে৷ জানু নয়, বুক৷ একে ‘চোখে হারানো’ বলে লোকে। সীমাও বিশ্বাস করতে চায়। হাসিঠাট্টা কলকল তার কানে ঢোকে না৷ ‘আমি কফি খাব না৷ বাড়ি যাব’, এই বলে যে বেরিয়ে আসবে, সে জোরও পায় না৷ তাতে কথা উঠবে। সন্ধে গড়ালে আত্মীয়বাড়িতে সে যখন আনমনা হয়ে যায়, বাড়ি যেতে চায়, তখনও কথা ওঠে। এত তাড়া কেন? কিন্তু সীমাকে তো দেখাতেই হবে, সব ঠিক আছে। কারণ আসলেই সব ঠিক আছে। একেই বলে ঠিক থাকা।
কফি এল। সীমা প্রথমেই ট্রে থেকে ছোঁ মেরে একটা কাপ তুলে নিতে চেয়েছিল। ফুঁ-ফুঁ করতে করতে নিমেষে গিলে নিতে পারবে না? যেভাবে সকালের চা-টা গিলে ফ্যালে? কিংবা গিলে ফেলে অপমান! তারপর আকর্ণ হাসি ঝুলিয়ে বলবে, ‘চলি রে! এবার দৌড়োই। নাহলে ও বড্ড চিন্তা করবে।’ এমনটাই ছকেছিল সীমা। কিন্তু তাড়াহুড়োয় হাত ধাক্কা খেল ট্রে-তে। সব কাপ থেকেই একটু-আধটু কফি চলকে উঠল৷ চিনেমাটির বাটিতে চিনি ভিজে গেল। ওয়েটার অবাক হয়ে চাইল। মাপা ভদ্রতায় বলল, ‘সুগার পাল্টে দিচ্ছি ম্যাম।’
অর্চনা আর যূথিকা, বীথির ফোনে হুমড়ি খেয়ে সেল্ফি দেখছে। ওরা খেয়াল করেনি। ভাগ্যিস! শুধু ঊর্মি ওকে চোরা চাহনিতে দেখছে। কফি গিলছে সীমা। প্রাণপণে গিলছে। ওর গলা নীল হয়ে যাচ্ছে। ঊর্মি বলল, ‘তুই এবার এগো সীমা। সেই কোন মধ্যমগ্রাম!’ ঊর্মি ওকে সাহায্য করতে চায়? কোনওমতে সবাইকে টা-টা জানিয়ে, কোলাকুলি সেরে, হাঁটা লাগাল সীমা।
মাথার উপর রাত আটটার চাঁদ। কখন বাড়ি ঢুকবে সীমা আজ? কীভাবে ঢুকবে? ঝড় থামতে দাদার সঙ্গে ফিরেছিল বহু বছর আগে৷ তখন শ্বশুরের ঘরে কালো একটা ঢাউস গ্র্যান্ড ফাদার ক্লক বাজত৷ দেউড়িতে পা দেওয়া মাত্র বেয়াড়া ঘড়ির ঢং ঢং জানিয়েছিল, দশটা! তারপর সমীর কী কী বলেছিল, মনে করতে চায় না সে। মনে পড়লে গলিঘুঁজি গুলিয়ে যাবে। পৌঁছতে পারবে না বড় রাস্তায়। বাস ধরতে পারবে না৷
বাস আসছে না। একটাই বাস এই রুটে। ধোঁয়া হয়ে আসছে রাস্তাঘাট। পঞ্চাশ বর্ষীয়া সীমা ভয় পাচ্ছে। ফোন করছে বারবার মেয়েকে। সমীর যে বারবার ফোন করে খবর নিচ্ছে না সে কোথায় আছে, এতে তার মন কু ডাকছে। মেয়ে অবশ্য বলে, বাবা চা খেয়ে ঘণ্টা খানেক ক্লাবে গিয়েছিল। এখন ফিরে মদের বোতল খুলেছে। মদ পেটে পড়লে দুটো সম্ভাবনা। হয় সমীর প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে খিস্তি করবে, পাড়া মাথায় করবে। নয় চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়বে। কোনটা কোন্ দিন ভাগ্যে ঝুলছে, তার ওপর সীমার হাত নেই। মেয়েকে সে বলল, ন’টা বাজলে পনিরের তরকারির পাশে যেন রুটি সাজিয়ে দেয়। গেলাসে জল গড়িয়ে দিতে না ভোলে যেন৷ দূর থেকে পরিপাটি পরিবেশন নিশ্চিত করতে চায় সীমা। হঠাৎ তার মনে পড়ল, দশ বছর হয়ে গেল মা নেই। মা মারা যাওয়ার পর সে আর বাপের বাড়ি যায়নি। সমীর যদি ঢুকতে না দেয়, তা হলে সে আজ রাতে যাবে কোথায়?
বাস কই? রুটে কি গণ্ডগোল? হঠাৎ রাস্তার ওপারে ঊর্মির স্কুটি দেখা যায়। এদিকেই আসছে৷ অথচ সীমা আর ওদের কারও মুখোমুখি হতে চায় না। ওর মুখটা হয়তো এখন চোরের মতো দেখাচ্ছে। যেন গত তিন ঘণ্টার সীমা একটা ভেক৷ স্কুটিটা থামে ওর সামনে।
‘আমি তো এয়ারপোর্টের দিকে যাব। চলে আয়। ওখান থেকে উবার নিয়ে নিবি’, ঊর্মি বলে। ওর ঘাড় পর্যন্ত কোঁকড়া কাঁচাপাকা চুল হেলমেট ছাপিয়ে বেরিয়ে আছে। যদিও কখনও একা উবার চড়েনি সীমা, তবু ঊর্মির গলায় একটা বরাভয় ছিল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সীমা বসে পড়ে পিছনে। এয়ারপোর্ট পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া মানে অনেকটাই। বাস্কেট থেকে হেলমেট বের করে দেয় ঊর্মি। গাড়ি স্টার্ট দিতে সীমা ওর পিঠ খামচে ধরে। ঊর্মি বলে, ‘আমার নাম্বার তো আছেই। অসুবিধে হলে ফোন করিস।’
নিশ্চুপ বসে থাকে সীমা। ওর লজ্জা পাওয়ার কথা ছিল। ঊর্মি কিছু একটা বুঝতে পেরেছে। অথচ ওর খানিক নিশ্চিন্ত লাগছে। ঊর্মিকে কি দেখানো যায় গোপন যত ক্ষত? অন্তত নিজের কাছে স্বীকার করা যায়? ঊর্মির কাঁধে আরও জোরে নখ বসিয়ে সীমা বলে, ‘এরকম সময় আমার আতঙ্ক হয়।’
ঊর্মি বলে, ‘ফোন করিস কিছু হলে। এখন চাঁদটা দেখ।’
পূর্ণিমার দুই রাত পর চাঁদ পুরোনো হয়েছে। তবু প্রায় গোল, প্রায় উজ্জ্বল। মায়াবী আলোয় শহর চিরে স্কুটি এগিয়ে যায়।
চিত্রণ: মনিকা সাহা







