চরের মানুষ
সীতা বাউরি চিৎকার করতে করতে ছুটেছে— সনাতনদা, ও সনাতনদা, একটু চলো! নদীর চরে কে মরে পড়ে আছে গো!
সনাতন পিছন ফিরে তাকাতে দেখে সীতা চিৎকার করতে করতে তার দিকে আসছে। অনেকটা পথ ছুটে আসায় তার মুখ ঘামে ভিজে গেছে। কাপড়ও ভেজা ভেজা ভাব। সনাতন তার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। চেয়ে থাকার পর বলে, ‘কে মরে পড়ে আছে রে সীতা?’
‘জানি না গো সনাতনদা! ঠিক দেখা গেল না। পেছন হয়ে পড়ে আছে, চিনতি পারিনি! এ গেরামের কেউ হবে হয় তো!’
‘ঠিক দেখেছিস তো!’
‘হ্যাঁ গো, আমি ঠিক দেখেছি, লোকটা পেছন হয়ে পড়ে আছে!’ সনাতন বিশ্বাস করে সীতাকে বলল, ‘তুই চল, আমি যাচ্ছি।’
সে লুঙ্গির ওপর গামছাটা বেঁধে নিয়ে নদীর চরের দিকে রওনা দিল। এ গ্রামে কারও কিছু বিপদ–আপদ হলে এমনই সে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গ্রামের মানুষের কাজ করতে করতে নিজের বিয়ের কথাও ভুলে গেছে। সংসার বাঁধেনি। তাই সবার আগে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গোটা বাগদিপাড়া সনাতনকে দেবতার জ্ঞানে দেখে। সে তাদের একমাত্র দেবতা। গ্রামের বিচার-আচার সে একাই করে দেয়। রাতদুপুরেও সনাতনের ডাক পড়লে ছুটে যায়। নদীর ধার বরাবর বেশ কয়েকটা ঘর বাগদিদের বাস। বাগদিদের ছেলেপুলেরা ইস্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে খুব বেশি দূর যেতে পারে না। অল্প বয়সে ইস্কুল ছেড়ে কেউ ইটভাটার কাজ করে। আবার কেউ নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে চলে যায়। গ্রামের নিজস্ব প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও তেমন কেউ আসে না। তবে দুপুরে ভাত দেওয়ার সময় বাচ্চারা থালা নিয়ে ভিড় করে। খুব অল্প বয়সে এদের মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। তার ফলে ইস্কুল পিছনে পড়ে থাকে। তাদের স্বামীরা বেশিরভাগ সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে, রোজ মদ খেয়ে বাড়ি ফেরে। মদ খেয়ে বাড়ি ফিরলে যত বিপত্তি বউদের। নিত্যকলহ লেগে থাকে এদের মধ্যে।
সনাতন নদীর চরের দিকে এগোতে দেখে গ্রাম থেকে আরও কিছু লোক এসে ভিড় করে। সারারাত নাচানাচি করে গা-গতর বেশ ম্যাজ ম্যাজ করছে। নদীর জলে তখনও ভাসছে মাদুর্গার কাঠামো। গা থেকে সম্পূর্ণ মাটি ধুয়ে যায়নি। জলের উপর উঁচিয়ে রয়েছে দশটা হাত। সারারাত বিসর্জনের ঢাকের আওয়াজে মুখরিত ছিল এ গ্রাম। দূরে ভেসে যাওয়া কাঠামোর ওপর বসে এক ঝাঁক কাক ডেকে চলেছে কা-কা করে। নদীর জলে ডুব দিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তুলছে দুর্গা ঠাকুরের কাপড়-চোপড়গুলো। আবার কেউ সেই কাঠামোর ওপর বসে জলখেলা করছে। কাঠামোয় দাঁড়িয়ে ঝাঁপ দিচ্ছে কেউ কেউ। সনাতন সে দিকে তাকিয়ে থাকে।
লোকের ভিড় ঠেলে নদীর চরে এসে দাঁড়ায়। পড়ে থাকা লোকটাকে দেখে চমকে ওঠে! এ কাকে দেখছে! নদীর চরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে গঙ্গারাম। বউটা পাগলি হয়ে নিরুদ্দেশ হওয়ার পর গঙ্গারামের মাথাটাও খারাপ হয়ে যায়। কোথায় কখন আপনমনে নিজের খেয়ালে চলে যেত, গ্রামের লোক কিছু জানত না। প্রথম প্রথম এর-ওর বাড়িতে চেয়েচুয়ে চলে যেত। পরে আর কারও কাছে কিছু চাইত না। আপন খেয়ালে নদীর ধারে বসে বসে সারাদিনটা বিড়বিড় করে যেত। তার ভাষা কেবল সে একা বুঝতে পারত। আর কারও বোঝার ক্ষমতা ছিল না। একটা ফুলের মতো সংসার কীভাবে নষ্ট হয়ে গেল গ্রামের মানুষ দেখেছে।
সনাতন ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। মৃতদেহের সামনে এসে বসল। আস্তে করে ধরে মৃতদেহটা উল্টে দিল। মুখটা থেঁতলানো। মারের চোটে বিকৃতি হয়ে গেলে যেমন হয়। সারা মুখ কালশিটে হয়ে গেছে। চেনার উপায় নেই। সনাতন বুঝল, কেউ বা কারা তাকে মেরে ফেলে রেখে গেছে। নইলে এইভাবে কেউ মরতে পারে না। গোটা গ্রামের লোক দেখল কাদামাখা গঙ্গারামের মৃতদেহ। সারারাত মানুষের কোনও হুঁশ ছিল না। সবাই ব্যস্ত বিসর্জনের আনন্দে। সারা বছর ওই ক’টা দিনের অপেক্ষা করে থাকে গোটা বাগদিপাড়া। কবে পুজো আসবে। অভাব ভুলে আনন্দে মাতোয়ারা হবে সবাই। তারপর বিসর্জন। ছেলেবুড়ো নেশায় বুঁদ হবে। মেয়েরাও সিঁদুরখেলায় মেতে উঠবে। ছেলেমেয়েরা সবাই মিলে মা দুগ্গাকে জলে ভাসিয়ে দিতে যাবে। মাকে জলে ফেলতে গিয়ে তাদের চোখের কোণ জলে চিকচিক করবে। বাতাসে ভেসে উঠবে একটাই শব্দ, বলো দুগ্গা মাঈ কী জয়…!
সীতার কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে সনাতন ফিরে তাকায় তার দিকে। তার দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে জল। এ গ্রামে কারও কিছু হলে সেও ছুটে যায়। বাল্যবিধবা সীতা গোটা বাগদিপাড়ার বটবৃক্ষ। তার ছায়ায় সবাই এসে বসে। সেই কবে ভাইদের সংসারে এসে মাথা গুঁজেছে আর ফিরে যায়নি। কোথায় বা ফিরে যাবে। তার ফেরার কোনও আস্তানা নেই। ভাগের যা পেয়েছিল তা ভাইদের সব লিখে দিয়েছে। সে এইটুকু জানে, দু’চোখ বুজে চলে যেতে পারলেই শান্তি! সীতার দু’চোখে ভেসে ওঠে গঙ্গারামের মুখটা। ছোটবেলায় গঙ্গারাম কাকার কাঁধে চেপে মাঠে যেত। ছোট সীতা চুপটি করে মাঠের এক কোণে বসে বসে দেখত গঙ্গারামের হ্যাট হ্যাট করে গোরু তাড়িয়ে লাঙল দেওয়া। মাঠের লাঙল দেওয়া শেষ হলে আবার কাঁধে করে ঘরে নিয়ে ফিরত। গঙ্গারাম তাকে মেয়ের মতো সারা জীবন দেখে এসেছে। সেও বাবার মতো ভালবাসত। বাবা ছোটবেলায় মারা যাওয়ার পর তার কাছেই মানুষ।
সনাতন বলল, পুলিশকে একটা খবর দেওয়া ভাল।
গ্রামের সবাই তার কথায় সায় দিল, ‘ঠিক বলেছ। চলো, আমরা সবাই মিলে পুলিশকে একটা খবর দিই।’
গ্রামের সবাই চলল, পুলিশকে খবর পাঠাতে। কিছুক্ষণ পরে পুলিশ এল। পুলিশ এসে দেখল মৃতদেহ। মুখের ওপর মাছি ভনভন করছে। পুলিশও জানে, গোটা বাগদিপাড়ার একতা কাকে বলে। ওদের একটা কোনও ছেলের গায়ে হাত পড়লে এমনই মেয়েমদ্দরা কাটারি-বঁটি নিয়ে ছুটে আসবে। পুলিশেরও ভয় বাগদিপাড়াটাকে নিয়ে। কতবার পুলিশকে ওই বাগদিদের হাতে মার খেতে হয়েছে, তার কোনও হিসেব নেই। তাই বাগদিপাড়ায় এলে ভয়ে থাকে। তেমন কিছু কাউকে বলতে চায় না। মাথায় রক্ত উঠলে, কখন কী করে বসে, তার ঠিকঠিকানা নেই। পুলিশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করল, লোকটা কে, কোথায় থাকে, কী বৃত্তান্ত। জানল, ভবঘুরে গঙ্গারামকে বহুদিন এ তল্লাটে দেখা যায়নি। সনাতনকে আলাদা করে ডেকে কথা বলে পুলিশ থানার উদ্দেশে রওনা হল। লোকে দেখল, পুলিশের জিপ গ্রামের মেঠোপথের ধুলো ওড়াতে ওড়াতে ফিরে যাচ্ছে।
সনাতন গঙ্গারামের মৃতদেহের সামনে এসে হাঁটু মুড়ে বসল। গ্রামের ছেলেদের উদ্দেশে বলল, চরের গাছ কেটে সৎকার করা হবে। তার কথামতো ছেলেরা কুড়ুল নিয়ে গাছ কাটতে শুরু করে দিল। গাছ কাটার পর সবাই এসে সনাতনের কাছে দাঁড়াল। সে নির্দেশ দিল চিতা সাজানোর। সকালের রোদ গায়ে এসে পড়েছে গঙ্গারামের। সে হয়তো শুয়ে শুয়ে দেখছে তার প্রিয় গ্রামের মানুষদের। তাকে দেখবে বলে এত মানুষ এসেছে। সে যেন তাদের উদ্দেশে কিছু বলতে চায়। কী বলতে চায় সে! তার ঠোঁট এতটুকু কেঁপে ওঠেনি। হাত–পা শক্ত কাঠ হয়ে আছে। শুধু চোখদুটো খোলা আকাশের দিকে চেয়ে আছে। সে যেন সবাইকে চিৎকার করে বলছে, আমি ফিরেছি…!
গ্রামের ছেলেরা গাছের কাটা কাঠগুলো নিয়ে একটা একটা করে চিতা সাজিয়ে ফেলল। গঙ্গারামের মৃতদেহটি সেই চিতার ওপর শুইয়ে দিল। চরের মানুষ সে দিকে তাকিয়ে আছে। আচমকা তারা দেখল কিছু দূরে ধুলো উড়িয়ে কে যেন চরের দিকে হেঁটে আসছে। তাদের কারও চোখের পলক পড়ল না।
সীতা বাউরি চিৎকার করে উঠল, ‘ওই দেখো, গঙ্গারাম কাকার পাগলি বউ ফিরে এসেছে!’
তারা দেখল, পিচুটি পরা চোখ, ছেঁড়া ধুলোমাখা কাপড় পরে দাঁড়িয়ে এক পাগলি। সে দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল সব। চরের মানুষ তখনও দেখছে পুড়ে যাওয়া একটা মানুষ। একটা হারিয়ে যাওয়া সংসার। দাউ দাউ করে জ্বলছে তার সারা শরীর। কেউ এসে ডাকছে না। বলছে না, ওঠো গঙ্গারাম! দেখো, আমরা এসেছি, ওঠো গঙ্গারাম! সে কোনও কিছুতেই ভ্রূক্ষেপ করছে না। একলা একলা শুধু পুড়ে যাচ্ছে। গোটা শ্মশান জুড়ে ভেসে আসছে একটাই শব্দ ‘বলো হরি, হরি বোল’!
সনাতনের দু’চোখ ছলছল করে উঠল। দুঃখে নয়, শোকে নয়, একটা বিশ্বাসে। তার বিশ্বাস জুড়ে আছে না খেতে পাওয়া চরের মানুষগুলো। সনাতন আর একবার কেঁদে উঠল। আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষমাণ। চিতাকাঠ নিভে গেলে নাভিমূল নিয়ে যাবে গঙ্গার ঘাটে। সে দেখল বিসর্জনের বিষন্ন ছায়ার মাঝখান দিয়ে উড়ে চলেছে এক ঝাঁক প্রজাপতি। ভেসে যাওয়া প্রতিমার গা থেকে ধুয়ে যাচ্ছে মাটি। চরের মানুষ সেদিকে হাঁ করে তাকিয়ে।
চিত্রণ: মুনির হোসেন






