বিদগ্ধ জোনাকি
বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। মা, বাবা, ড্রাইভার ও বাড়ির কাজের মাসির হাত ধরে স্কুল গেট থেকে একে একে বেরিয়ে আসছে বাস্তবের চুটকি ধলু ভুলু কৃষ্ণা কালিয়া রাজু ছোটাভীম ইন্দুমতী অজয় লিটল সিংঘমরা। টিচারদের মধ্যে ব্যস্ততা কম। কেউই এলাকার নন। সবাই ট্রেন-বাসের যাত্রী। গেটের কছে স্রোত একটু কমে এলে যারা বাস ধরবেন তারা দেবতুল্য সমীহ পেতে পেতে বড়রাস্তার দিকে স্রোতের অংশ হচ্ছেন। ট্রেনের টিচারদের সে ব্যস্ততা কম। ভিড় একটু পাতলা হলে তবেই আসবে স্টেশনের টোটো। ট্রেনের এখনও বেশ খানিকটা দেরি। স্টেশনটাও তেমন পুরনো নয়। হল্ট স্টেশন। সব ট্রেন থামে না। টিচারদের সমস্যা হয়। তবু অনেক কিছু সম্ভব-অসম্ভবের চলতি চক্করের মতো এটাকেও সবাই মেনে নিয়েছেন। বলা ভাল মানতে বাধ্য হয়েছেন। সেই বাধ্যবাধকতার গণ্ডি সকলের আবার সমান নয়। পারা ও পারকতার দিকটাও সমানে দ্বন্দ্ব বাধায়। তাই মাঝে মাঝেই টিচার বদলায়। কল্পিত কার্টুন চরিত্ররা বাস্তবে এতই মেধাবী ও পরিণত মস্তিষ্কের যে, একটু প্রিয় হয়ে ওঠা ভরসার স্যার-ম্যডামদের হঠাৎ হঠাৎ বদলকে তারা বড়দের মতোই নির্দ্বিধায় মেনে নিতে শিখে যাচ্ছে। তাই বাস্তবিক অতি দ্রুত হারে ঘটছে তাদের মেধার বিকাশ। আর হবে নাই বা কেন, দিল্লি বোর্ডের সিলেবাস, ভাবলে হবে খরচাও আছে ।
বাসের টিচার একজন কমে গিয়ে ট্রেনের টিচার একজন বেড়ে গেছে। আগে দুটো টোটোয় চারজন করে সেটিং ছিল। আজ একজন বেশি। টোটোওয়ালাদের মনে ভাগাভাগি দোলাচল। কিন্তু নতুন স্যার যেমন হ্যান্ডসাম, তেমনই রেজাল্ট। মার্জিত কথা কিন্তু ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত। ফলে যাত্রীদের মধ্যে ওকে নেওয়ার বিষয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে গেল। তারপর পিছনের টোটোয় ড্রাইভারের পাশে জায়গা হল তার। সামনের টোটোয় মাঝখানের সিটে পিছন দিকে মুখ করে বসেছে সুতপা। সুতপা সান্যাল। ইংলিশে এমএ, বিএড। পিছনের টোটোর সামনে ড্রাইভারে পাশে বসা অর্ধেন্দু গুপ্ত। এমএসসি, ম্যাথ, বিএড এবং সেট কোয়ালিফায়েড। নতুন এলাকা তাই সবকিছুকে অবাকবিস্ময়ে মানসপটে আঁকতে আঁকতে যাচ্ছে সে। চেনা দৃশ্যপটের মধ্যে অচেনা অর্ধেন্দুকে চেনার চেষ্টা করছে সুতপা। নয় জন টিচার প্লাটফর্মে উঠছে। একজনের মনে নতুন জীবিকার না-পোষানো হালকা তৃপ্তি আর একজনের মধ্যে জীবনকে নতুন করে সাজাবার রামধনু কল্পনা। বাকিরা থিতু হয়ে বসে গেছে চার হাত চার চোখের চার দেয়ালে। কারও বা দুটো বগি ডবল ইঞ্জিন। কারও ডবল ইঞ্জিন বগি এখনও চিত্তরঞ্জনে। তাদের কাছে অর্ধেন্দু ও যা পূর্ণেন্দুও তাই। সে কেবলই আকাশের চাঁদ। সুতপার এখন জ্যোৎস্নাবিলাসী হলে ক্ষতি নেই। দেখা যাক, তার মন-জোনাকির আলো কার বা চোখে লাগে ভাল।
পরদিন ট্রেন থেকে নামার আগে থেকেই বৃষ্টি। অর্ধেন্দু ছাতা আনেনি। এটা তার অভ্যাসে নেই। টোটোয় পৌঁছতে তাকে ভিজতে হবে। তাই শেডের নীচে দাঁড়িয়ে আছে। ক’জন ম্যাডাম আগেই চলে গেছেন ছাতা নিয়ে। বন্দনা ম্যাম বয়সে সবার বড়। কথা ভাসালেন— কী সুতপা, নতুন স্যার কি ভিজতে ভিজতে যাবেন নাকি?
—এ মা, আমি কী জানি! বিস্মিত হল সুতপা। তবে উদ্দেশ্যটা তার মন্দ মনে হয়নি।
—না না আমি একটু বাদে আসছি, বৃষ্টি কমছে তো।
—আরে স্যার, বৃষ্টি কমলে যাবেন। তখন টোটো কোথায় পাবেন। সর্বাণী টিপ্পনী কাটল।
—টোটো পাব না তাই না! নিতান্ত অসহায় হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল।
—এই সুতপা ওকে তোর ছাতায় নে। বন্দনার কথায় যেন আদেশ। অর্ধেন্দুর মনে সংকোচ। সে যতটা হ্যান্ডসাম, ঠিক ততটা স্মার্ট নয়।
—না না চলুন না সবাই, আমি দৌড়ে টোটোয় চলে যাচ্ছি। সুতপার মনে আলতো করুণার সঙ্গে আলতো হতাশা বুকের ভিতরে একটা নরম কষ্টের জন্ম দিতে যাচ্ছে, তখনই বন্দনা ম্যাম একটু শাসনের সুরে বেজে উঠলেন— কেন, ম্যাডামের ছাতায় গেলে তোমার জিনিয়াস ইমেজে কি দাগ পড়বে ভাই?
—না না, তা কেন? উনি…
—উনি কী? ও তোমার কলিগ, স্কুলে তোমার সিনিয়র, ওরও তো একটা কর্তব্য আছে তোমার প্রতি।
—বন্দনাদি, আপনিও তো নিতে পারেন। সুতপা নিজেকে আড়াল করতে চাইল।
—আরে দেখছিস না আমার কতগুলো ব্যাগ। দু’জনেই তো ভিজে যাব। ওদিকে টোটোওয়ালা হর্ন দিতে শুরু করেছে। ইচ্ছে-অনিচ্ছের দোলাচালে অর্ধেন্দুকে ডেকে নিল সুতপার ছাতা। সুতপার গায়ের মেয়েলি পার্ফিউমের গন্ধটা দারুণ। অর্ধেন্দু তাতেই আবিষ্ট হচ্ছে। সুতপাকে সে ওই গন্ধেই জানছে। প্লাটফর্মের শেষে আসার আগের বৃষ্টি কমে গেল। অর্ধেন্দু আলগোছে ছাতা ছেড়ে আকাশের নীচে জায়গা করে নিতে গেলে সুতপার লেদার ব্যাগের ফিতে তার ক্যাম্বিসের ব্যাগের হাতলকে ধরে আটকাতে চাইল। যেন সুতপার হয়েই সে ব্যাট করছে। কেউ দেখল না বটে কিন্তু সুতপা একটু লজ্জা পেল যেন। আর ঠিক তখন হঠাৎ পাওয়া অগোছালো পুরুষের পুরুষালি ডিওর ভাঁজে হালকা ঘামের গন্ধ তার নাককে কষ্ট দিল, না মত্ত করল— সে বুঝতে পারল না। টোটোয় সিট ভাগাভাগিতে আবার ওরা দু’জন পাশাপাশি। ভবিতব্য কি তাহলে কোনও সংকেত দিচ্ছে? নাকি স্রেফ সময়ের খেলা। সে দারুণভাবে শুরু করছে ওদের নিয়ে।
স্কুলের এই পথটা সুতপার চেনা, তাই তার মন এখন নতুন পথের সন্ধানে ব্যস্ত। সে পথে হয়তো অর্ধেন্দুকে সে পথিক হিসাবে দেখতে চাইছে। কিন্তু অর্ধেন্দুর আলো সে পথকে তেমনভাবে আলোকিত করতে পারছে না। অর্ধেন্দু নতুন পথটাকে গাছ পুকুর বাড়ি ঘর দিয়ে বাঁকে বাঁকে চিনে রাখার চেষ্টা করছে। কে জানে কে কখন একা হয়ে পড়ে। গন্তব্যে তো পৌঁছতে হবে।
ওদের দু’জনের পার্থিব বয়স প্রায় কাছাকাছি হলেও শরীরী পূর্ণতার পরিভাষায় অনেকটাই পথ হেঁটে ফেলেছে সুতপা। রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রে তাদের মতো শত শত সপুষ্পক উদ্ভিদের ফুল কেবলই ঝরে যাচ্ছে। অনিবার্য বন্ধ্যাত্বের কিনারে দাঁড়িয়ে সুতপার মতো অনেকেই একটা স্বপ্নময় কাঙ্ক্ষিত ফলের আশায় যেমন-তেমন একটা ছোট্ট মাচায় লাউলতা হতে চাইছে।
স্কুলে সুতপা এতদিন জুনিয়র মোস্ট টিচার ছিল। টিচার রুমে লম্বা ঘরে মাঝখানে টেবিল, দু’দিকে বসার জায়গা। যার জায়গায় অর্ধেন্দু এসেছে, তার জায়গা ছিল সুতপার ঠিক সামনে। তাই প্রিন্সিপ্যাল স্যার এসে সবাইকে বলে সেই সিটেই ইমিডিয়েট জুনিয়র অর্ধেন্দুর জন্য জায়গার সিলমোহর দিয়ে গেলেন। হা মধুসূদন, রাধারাণীর কী ইচ্ছে কে জানে? পড়ে পাওয়া প্রণয়াভাস, নাকি সমূহ সংঘাতের বিরোধাভাস! মনযমুনাকে এখন তিনি কোন দিকে নেন। টিফিন খেতে বসে দু’জনের পায়ে পায়ে হঠাৎ পরিচয় ঘটে গেল। কিন্তু অচেনা সংকোচে আলাপ জমল না তেমন। তবে পায়ের ভাষা যদি সীমিত না হত, তার চলার ছন্দের মতো ভাষাও যদি অনাবিল হত— এদিকের দুটো পা ওদিকের দুটিকে ডেকে নিয়ে আলাপ জমাত কত। সে আলাপ এক সময় ঠিক পেয়ে যেত মনের হদিস। তারাই তৈরি করে নিত জীবনের পথ। এমন বৃষ্টিভেজা পাদুটো জুতো থেকে বেরিয়ে ভেজা গন্ধে আকৃষ্ট করত পরস্পরকে। হালকা শৃঙ্গারে টেবিলের উপরের মুখ দুটোতে ফুটিয়ে তুলত বৃষ্টিস্নাত রৌদ্রের মতো মিষ্টি হাসি। তার ছায়া পড়ত হৃদয়ের খোলা বারান্দায়।
সবারই টিফিন খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। অর্ধেন্দু তেমন কোনও টিফিন আনেনি। একটা কেকের প্যাকেট শেষ করে সবে জল খেতে যাচ্ছে— বন্দনা ম্যাম চোখের ইশারায় সর্বাণীকে যোগ করে প্রশ্নের সুরে বললেন— কী নতুন স্যার, শুধুই কেকে হবে?
—কী করব ম্যাম? এখনও ধাতস্থ হতে পারিনি।
—এরা সবাই আমাকে দিদি বলে, তুমিও তাই বলতে পারো।
—আচ্ছা, দিদি।
—আর জীবনের পথে কি কেউ আছে নাকি…
—না না, তেমন কেউ নেই। একেবারেই সাধারণ উত্তর।
—তা হলে কি আমরা দেখব? র্যাগিং উইথ ট্যাগিং প্রপোজালে ঝনঝন করে উঠল সর্বাণী।
—না না, এমনিতেই লেখাপড়া করে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখে যে পাপ করেছি, তার প্রায়শ্চিত্ত করতে এসেছি? ও একাই ভাল।
—কেন? সঙ্গী থাকলে কি প্রায়শ্চিত্ত কম হয় যাবে?
—ওভাবে ভেবে দেখিনি। নিতান্তই নিষ্প্রভ উত্তর।
—ভাবতে হবে তো। বয়স তো থেমে থাকবে না ভাই?
ক্লাস থাকায় সুতপা এই আলোচনার পাশ কাটিয়ে ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে গেল। তার ভিতরে অর্ধেন্দুর কথাটাই ঘুরেফিরে অনুরণিত হচ্ছে— না না, না না…
বাড়ি ও স্কুলের পথে অর্ধেন্দুরা পার করে ফেলেছে একটা পূর্ণচন্দ্র পক্ষ। চেনাজানা হয়ে গেছে পথ ও পথিকের অনেকের সাথে। চেনা হয়ে গেছে শ্রেণিকক্ষের ঘ্রাণ, ম্যানেজিং কমিটির চাহিদাও। পাশাপাশি থাকা দুটো ব্যাগের মধ্যে শুরু হয়েছে এটাওটা বিনিময়। লেদার ব্যাগ জেনেছে ক্যাম্বিসের ব্যাগের মালিকের বাবা রিটায়ার টিচার, পারিবারিক অবস্থা মন্দ নয়। সরকারি স্কুলে নিয়োগ বন্ধ, কলেজেও তাই। শিক্ষা-দুর্নীতি শিক্ষিতদের মন ও মানকে হত্যা করছে। শহরের কোনও বেসরকারি স্কুলেই ভ্যাকান্সি ফাঁকা নেই। অগত্যা এখানে। এটাকে সে মানতে পারছে না। ক্যাম্বিসের ব্যাগ জেনেছে লেদার ব্যাগের মালকিনের বাবা নেই। মাকে নিয়ে তার সংসার। সেইই ওর মায়ের একমাত্র ভরসা। দূরে যাতায়াত করে টিউশন করতে পারছে না। তাই শহর থেকে অনেক দূরে এই আধা মফস্বলে অল্প ভাড়ার বাড়িতে চলে আসবে। তাতে দু’বেলা টিউশন করে কোনও মতে চালিয়ে নিতে পারবে। দুটো ব্যাগ ও দু’জোড়া পায়ের এত জানাজানি তবু তারা একে অপরের আজীবনের ভরসা হয়ে উঠতে পারছে না। তাদের জীবনপথ এখনও দূরপাল্লার রেললাইনের মতো। কিছুতেই কাছে আসতে পারছে না। এখনও ওরা দু’জনেই নিরালোকে নিষ্প্রভ নক্ষত্র— দু’জনেই বিদগ্ধ জোনাকি।
চিত্রণ: মনিকা সাহা







