নাল
মেট্রোয় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করল আমার একপাটি চটি। কলেজ স্ট্রিটে গিয়েছিলাম শুক্রবার। মেয়ের ক্লাস নাইন। তার সায়েন্সের একটা বই আমাদের দিকে পাওয়া যাচ্ছে না। তা বউ বলল, কলেজ স্ট্রিটে খোঁজ করতে। বউয়ের আদেশ ঠেলতে পারে এমন বুকের পাটা যাদের আছে, তাদের মধ্যে আমি পড়ি না। শনি-রবি অফিস ছুটি। তাই শুক্রবারটাকেই বেছে নিলাম।
আমার কলেজ ছিল গড়িয়ায়। দু’দফায় ভেঙে ভেঙে মেট্রো যখন দমদম অবধি চালু হয়ে গেল তখন মাঝে মাঝে কলেজ স্ট্রিটে চলে আসতাম পুরোনো বই কিনতে। ওই দোকানগুলোয় ঘোরাফেরা করতাম, বই ঘাঁটতাম, ধুলো ঘাঁটতাম। মৃত উইপোকার শুকনো ঝুরঝুরে গুঁড়ো, আচমকা বেরিয়ে আসা জ্যান্ত রুপোলি বইপোকা ঝেড়ে ফেলে দিতাম। তক্কে তক্কে থাকতাম যদি নিরুদ্দেশে চলে যাওয়া কোনও বইকে আমার ঠিকানায় এনে তোলা যায়। আমি কোনও প্রাবন্ধিক, গবেষক, লেখক বা টীকাকার নই। লিটল ম্যাগাজিন অবধি করি না। চাকরি করি, বউ–মেয়ে নিয়ে সংসার করি আর এককালে বই পড়তাম। অপরাধ বলতে ওইটুকুই।
অফিস ডালহৌসি পাড়ায়। রোজই সেখান থেকে হেঁটে সেন্ট্রাল স্টেশনে এসে ট্রেনে উঠি। কলেজ স্ট্রিটে আর যাওয়া হয়ে ওঠে না। সেদিন মেয়ের বই কেনার পর পুরোনো ব্যথাটা চাগাড় দিয়ে উঠল। ঘুরতে লাগলাম।
প্রেসিডেন্সির পাশে একটা দোকানে একটা বই পছন্দ হল। ভ্রমণের নেশা। মণীন্দ্রনাথ মুস্তোফি। ১৩৩৭ সালে বাদুড়বাগানের প্রেস থেকে ছাপা। ভূমিকা জলধর সেন। ওই মণীন্দ্রনাথ সাইকেলে কাশী, পুরী, দার্জিলিং ঘুরে একেবারে কাশ্মীর পাড়ি দিয়েছিলেন। সাদা-কালো অনেক ছবিও আছে বইটাতে। পঞ্চাশ টাকা চাইল। মেয়ের বই কেনার বাজেটের পর ওটা এক্সট্রা যাবে তা হলে। থাক এখন। দেখা তো হল। একদিন এসে একটা বই কিনে কী হবে এতদিন পর? অভ্যেসটাই তো উইয়ে খেয়েছে।
হাঁটতে হাঁটতে ইউনিভার্সিটির পাঁচিলের পাশে এসে দেখি ফুটপাথে শুয়ে দেব সাহিত্য কুটীরের পূজাবার্ষিকী অলকনন্দা। পা আটকে গেল। মহালয়া ১৩৬৯। ছেলেবেলায় আমার একবার বসন্ত হয়েছিল। ক্লাস ফাইভ। মশারির ভেতর আমায় শুইয়ে রাখা হত সারাদিন। বাবা বলেছিল, শান্ত হয়ে থাকলে একটা বই দেবে। এই সেই বই। কিন্তু বইয়ের ছাপার সাল দেখে অবাক লাগল। ওই সময় তো আমার জন্মই হয়নি। তা হলে কি বাবাও পুরোনো বই কিনে এনে দিয়েছিল? আমি নতুন মনে করে তা আনন্দে পড়েছি জানালা দিয়ে আসা আলোয়? হতে পারে। পুলিশ কোর্টের মুহুরি তার রংচটা অ্যাটাচি কেসের ভেতর থেকে ছেলের জন্য নতুন বই কোথা থেকে বের করবে তখন! তবু এই বইটা তখনও আমার কাছে পুরোনো ছিল না, এখনও নয়। মেয়ের জন্য কিনব কি? পড়বে কখন? পড়ার বইয়েরই যা চাপ। দাম জানতে চাইলাম। এও পঞ্চাশ। আগেরটা আর এটা মিলিয়ে একশো। থাক। মেয়ের বইয়ে দেড়শো গিয়েছে এরমধ্যেই।
মেডিক্যাল কলেজে ভেতর দিয়ে হেঁটে সেন্ট্রাল স্টেশনে এলাম। মেট্রো ধরব। সেখানেই ঘটনাটা ঘটল।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই দেখতে পাচ্ছিলাম গড়িয়ার দিকের ট্রেন এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। ফলে আর একটু দুদ্দাড় করেই নামতে থাকলাম। একেবারে শেষ কামরাটা ছেড়ে পরের কামরার গেটের কাছে পৌঁছে গেলাম। ডান পা-টা বাড়িয়েও দিলাম। তখনই পাশ থেকে একজন এসে ধাক্কা মারল এবং দরজা বন্ধ হওয়ার আগে সুট করে ঢুকেও গেল। দু’পাশের পাল্লা এসে ধড়াম করে আমার পায়ে লাগল। পা সরিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার চটি প্রথমে দরজার ফাঁকে কয়েক সেকেন্ড আটকে থেকে তারপর অভিমানাহত হয়েই বোধহয় টুপ করে প্ল্যাটফর্মের গায়ে ঘসে পড়ে গেল।
ট্রেন চলে গেল। ভেতরে কয়েকজনের হাসিমুখ দেখতে পেলাম একঝলক। কারও দুর্দশা বুঝতে পেরে যেভাবে আমরা হাসি আর কী। আমি একটু উঁচুনিচু অবস্থায় প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রইলাম। চটি আছে বলে বাঁদিকটা উঁচু আর নেই বলে ডানদিকটা নিচু।
যে আমায় ধাক্কা দিয়েছিল, সে এখন অনেক দূরে। আমি আমার চটিটাকে দেখব বলে সন্তর্পণে লাইনে উঁকি দিলাম।
ওই যে, পড়ে আছে। উপুড় হয়ে। মাত্র সাত-আট মাস আমার পায়ের ঘর করেছিল বেচারা। ট্রেনের ভেতর থেকে ও কি পায়ের সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যাটফর্মে ফিরে আসতে পারত না? সমস্ত স্মৃতি ত্যাগ করে ঝাঁপ দেওয়ার কারণ কী?
আমি যখন উঁকি দিয়ে দেখছিলাম তখন চারপাশে কয়েকজন আমাকে দেখছিল। সাধারণত তো চটি-জুতো লাইনে ঝাঁপায় না। মানুষই ঝাঁপায় এবং তখন তারা তার সঙ্গেই থাকে। কাজেই ওরা সঙ্গত কারণেই আমায় দেখছে। একজন আমারই মতো উঁকিও দিলেন। তারপর ভুরু নাচিয়ে বললেন, ‘কী করে গেল?’
সে তো অনেক কথা। ছোট করে বললাম, ‘ধাক্কাধাক্কিতে সামলাতে পারিনি।’
‘আপনি স্টেশনমাস্টারের কাছে চলে যান। গিয়ে বলুন। ওদের লোক আছে। তুলে দেবে।’
তুলে দেবে! তাই তো, এ তো হতেই পারে। চটি তো ফিরে পেতে পারি তা হলে। আনন্দে আমার ডান পা নেচে উঠল।
কিন্তু স্টেশনমাস্টারের কাছে যাব কী করে। হাঁটতে গেলেই তো নিজেকে দাঁড়িপাল্লা মনে হচ্ছে। পা ফেললেই ভুল বাটখারা চাপাচ্ছি যেন। একটা চটি আমায় ত্যাগ করেছে, অন্যটাকে আমি ত্যাগ না করলে তো হবে না।
মেট্রো স্টেশনে আরপিএফের জওয়ান মোতায়েন থাকে। তারা মেশিনগান নিয়ে পায়চারি করে, ট্রেন আসার আগে ফু-র-র-র করে বাঁশি বাজিয়ে সাবধান করে। কেউ অনেকক্ষণ স্টেশনে বসে থাকলে তুলে দেয়, কোনও কথা বললে রা কাড়ে না। আজ একজন এগিয়ে এসে আমায় বলল, ‘যাও, উপর চলা যাও। যা কে বোলো।’
এখন আপনি-তুমি নিয়ে মাথা ঘামানো যাবে না। আমরাও তো পুলিশকে আপনি-আজ্ঞে করি না। আমি সিঁড়ির পাশে, এককোণে বাঁ পায়ের চটিটা খুলে খালি পায়ে উঠতে শুরু করলাম।
উঠতে উঠতেই খেয়াল করছিলাম, যারা মেট্রোর এই উজ্জ্বল আলোর ভেতরে আসছে কিংবা যাচ্ছে তাদের কেউই আমার পায়ের দিকে লক্ষ করছে না। আমার কাঁধে ব্যাগ, প্যান্টের মধ্যে জামা গুঁজে পরা, হাতে ঘড়ি, চোখে চশমা অথচ পায়ে কিছু নেই। এত লোকের কেউ একবারও তো তা দেখছে না। তা হলে কি আমরা কেউ মাটির দিকে তাকাই না? তা কী করে সম্ভব? হতে পারে যে আমার জায়গায় কোনও সুন্দরীর চটি খোয়া গেলে তাকে লোকে দেখত। দেখার মতো ব্যাপারই হত। ছেচল্লিশ বছরের একটা দামড়া লোক খালি পায়ে হাঁটছে, কার কী এসে গেল।
স্টেশনমাস্টারেরও কিছু এল-গেল না। তিনি শান্ত গলায় বললেন, ‘আমাদের লোক কম, বুঝলেন। এখন তো ছ’মিনিট পরপর গাড়ি। লাইনে কাউকে নামানো যাবে না।’
আমি বললাম, ‘ওটা তো লাইনের মাঝখানে গিয়ে পড়েনি। এক ধারে পড়ে রয়েছে। কোনওভাবে যদি…। তা না হলে এক পায়ে চটি পরে তো আমি বাড়ি ফিরতে পারব না।’
স্টেশনমাস্টারের কণ্ঠস্বর আরও শান্ত হয়ে এল। ‘শুনুন, ওটা তোলা যাবে না। কেন যাবে না সেটা আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলতে পারি।’
আমি অশান্ত হয়ে উঠছিলাম। বললাম, ‘চটি যদি না-ই তোলা যায় তা হলে আমার আর বোঝার বাকি রইল কী? ঠিক আছে, ছাড়ুন।’
চটিতং হয়ে হাত-পা নেড়ে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু তারপরেই মনে হল, এখন ফিরব কীভাবে? এখান থেকে গীতাঞ্জলি পাক্কা আধঘণ্টা। খালি পায়েই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ট্রেনের ভেতরে। এখন না হয় মনে হচ্ছে কেউ দেখেনি, তখন দেখবেই। মুখে কিছু বলবে না, তাকিয়ে থাকবে। বাড়ি গিয়ে গল্প করবে। তাছাড়া জানতেও চাইতে পারে যেতে যেতে। তা হলে তাকে আবার গল্পটা বলতে হবে আমাকেই। ট্রেন থেকে নেমে পাঁচ-সাত মিনিট হাঁটতে হয়। সেটাই বা যাব কী করে! পুরো জামাকাপড় পরে থাকার পরেও শুধু চটি নেই বলে নিজেকে কেমন ল্যাংটো ল্যাংটো লাগছে।
স্মার্ট কার্ড পাঞ্চ করে ঢুকেছি। এই স্টেশনেই আবার পাঞ্চ করে বেরোনো যাবে না। গেটের লোকটিকে গিয়ে বলতে সে আড়চোখে আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে বের করে দিল। খালি পায়ে এসকেলেটরে চাপলাম। সিঁড়ি টপকালাম। বাইরে এসে দাঁড়ালাম। এবার একটা জুতোর দোকান চাই। যেভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম সেভাবেই ফিরতে চাই আমি।
আমার সামনে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ। ডানদিক ধরে গেলে জুতোর দোকান নেই। বাঁদিকে গেলেও হয় চাঁদনি চক না হয় বউবাজার। উলটোদিকে রাস্তা পেরিয়ে গেলে ডালহৌসি অবধি যাওয়া যেতে পারে। মনে করতে পারছিলাম না এইসব দিকের মধ্যে কাছাকাছি কোথাও জুতো পাব কি না। এই সময় মোবাইলে বউ কথা বলতে চাইল। ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে হয়তো। ধরলাম বিদিশার ফোন।
‘হ্যাঁ বলো। বই পেয়েছি।’
‘আচ্ছা, ভাল। তোমার কি ফিরতে দেরি হবে আরও? যদি এখন ফেরো তা হলে আসার সময় মাদার ডেয়ারি থেকে এক প্যাকেট দুধ এনো। কাল সকালেই চায়ের জন্যে লাগবে।’
‘আমার ফিরতে দেরি হবে।’ বলে বিদিশাকে চটির কথাটা জানালাম। বাকিটা বাড়ি গিয়ে বলব।
বিদিশা বলল, ‘তুমি হাওয়াই স্যান্ডেল একটা কিনে নাও আপাতত। তোমার বাড়ির হাওয়াইটা ছিঁড়ে গেছে, ওটাও হয়ে যাবে। আর কাল না হয় দেখেশুনে একটা চটি কিনতে।’
‘ধ্যাত্তেরি! তুমি ছাড়ো তো।’ কেটে দিলাম ফোন।
বাঁ হাতে একটা পান-সিগারেটের দোকান। রাস্তায় নেমে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ‘এখানে জুতোর দোকান আছে কোনও? বলতে পারেন?’
‘নয়া কি পুরানা?’
অ্যাঁ! আমি ভোম্বল হয়ে তাকিয়ে রইলাম। কলকাতায় পাওয়া যায় না এমন কোনও জিনিস নেই কিন্তু তা বলে পুরোনো চটি-জুতোরও দোকান আছে না কি? কোথা থেকে আসে সেসব? বিক্রি করে কারা? কেনেই বা কে? বললাম, ‘পুরোনো চটি কোথায় পাওয়া যায় ভাই?’
‘মুচি কে পাস। পুরানা চপ্পল মিল যায়ে গা।’
ও, মুচি। হ্যাঁ, মিললেও মিলতে পারে। কিন্তু এখন মুচি কোথায় খুঁজব? তারপর তো আমার পায়ের মাপের চটি। নাঃ, নতুনই লাগবে।
টানারিকশা দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা ফুটপাথ ঘেঁষে। আমি ঠিক করে নিয়েছি, আবার কলেজ স্ট্রিটে ফিরব। ওখানে পাশাপাশি কয়েকটা জুতোর দোকান আছে পাতিরাম ছাড়িয়ে।
‘কলেজ স্ট্রিট কিতনা লেগা?’
‘মোড় তক যাইয়ে গা তো তিশ রুপেয়া।’
বোঝাবার মতো করে বললাম, আমার চটি মেট্রোর লাইনে পড়ে গেছে ভাই। নতুন কিনতে হবে। তা না হলে আমি টানারিকশা চড়ি না। একটু কম হয় না?
রিকশাওয়ালা আমার পায়ের দিকে দেখল। মাথা নাড়ল ওপর-নিচে। তারপর বলল, ‘আপ বাবুলোগ, চপ্পল বিনা ক্যায়সে যায়েঙ্গে। পাঁচ রুপেয়া কম দিজিয়ে গা।’
কোনও কথা না বলে একপাশে সরে দাঁড়ালাম। মনটা চুলকোচ্ছে। টানারিকশা চড়াটা কি উচিত হবে? কেউ জানতে পারবে না যদিও একদিন চড়লে। তবুও। কলেজ স্ট্রিট আর কতটুকু এখান থেকে? বাড়ি অবধি খালি পায়ে যাওয়ার থেকে ওখানে যাওয়াই ভাল নয় কি? চৈতন্যদেব কত জায়গায় খালি পায়ে হেঁটেছেন। বুদ্ধদেবও। যিশুও হেঁটে থাকতে পারেন। মহাপুরুষরা যে পথে হেঁটেছেন সে পথে হাঁটার কথাই তো বলা হয়ে থাকে। মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন হয়েছেন প্রাতঃস্মরণীয়, সেই পথ লক্ষ্য করে স্বীয় কীর্তি ধ্বজা ধরে আমরাও হব বরণীয়। অবশ্য এতদিন ভাবিনি যে হাঁটতে গেলে খালি পায়ে যেতে হবে কি না। কিন্তু ওঁরা পারলে আমার মতো চুনোপুঁটি কেরানি পারবে না? একেবারে হালের উদাহরণও আছে। মকবুল ফিদা হোসেন তো সব জায়গায় বিনা চটিতেই যেতেন। কোথায় যেন এজন্য ঢুকতে দেয়নি তাঁকে। কিন্তু ওর আঁকা ছবি তো লক্ষ লক্ষ টাকায় বিক্রি হত। মারা যাওয়ার পর হয়তো তারও দাম বেড়ে গিয়েছে। সেদিক থেকে আমার নিজেরই কোনও দাম নেই। মেট্রোর লাইনে চটির বদলে আমি গলে গেলে বড়জোর কালকের খবরের কাগজে কয়েক সেন্টিমিটার। তার চেয়ে লোকে যা গালাগাল করত তা ছাপতে পুরো এক পাতা লাগবে। আচ্ছা, এত কথা না হয় ফেলেই দিলাম। এই যে রিকশাওয়ালা, এ তো খালি পায়েই সওয়ারি নিয়ে দৌড়ে বেড়ায়। ওরও কিছু মনে হয় না, যে চড়ে তারও নয়। আবার গ্রামে যে চাষবাস করে সে বছরভর খালি পায়েই থাকে। শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় দ্যাখো, ঠিক পায়ে চটি গলিয়ে নেবে। চটি পরাটা একটা ভদ্রলোকের অভ্যেস। এর থেকে আমাদের মুক্তি নেই।
আমি নগ্নপদে কলেজ স্ট্রিটের দিকে যাত্রা করলাম।
হাঁটতে হাঁটতে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল, ছাতা খুললাম ব্যাগ থেকে বের করে। কত পরিকল্পনা করে বেরোই রোজ। ছাতা, টিফিন বাক্স, জলের বোতল। রোদ, বৃষ্টি, খিদে তেষ্টার হিল্লে হবে বলে। কিছু একটা গড়বড় হয়ে গেলেই সব ভণ্ডুল। পায়ের নীচে মাটি আছে কিন্তু চটি নেই বলে সব তছনছ। অথচ এই যে আমি— সঞ্জয় চক্রবর্তী, ট্রামলাইনের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটছি, বাঁদিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছি মেডিক্যাল কলেজ, কালো পিচের ওপর আমার সাদা পা দুখানি কেমন কাদা মাখছে, কেউ খেয়াল করছে না। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজে বা মাথায় রুমাল চাপা দিয়ে কত লোক তো আমার সামনে-পিছনে হেঁটে চলেছে। তারাও কেউ দেখতে পাচ্ছে না? সবাই কি তা হলে নিজের নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে চলে? এত ব্যস্ত সকলে? মাটির নীচে, ওপরে সব একইরকম?
ভাবতে ভাবতে আমার মনে হল আমি যেভাবে রয়েছি, আমায় যেরকম দেখা যাচ্ছে তাতে কেউ ভাবতেই পারে না যে আমার সব আছে কিন্তু পায়ে কিছু নেই, তাই কেউ দেখছে না।
মহাত্মা গান্ধী রোডের ক্রসিংয়ে গিয়ে বাস, অটোর ফাঁকফোকর গলে আমি আরও অনেকের সঙ্গে রাস্তা পেরোলাম। ঝলমল করছে সব দোকানপাট। এখনও অবধি কোনও অসুবিধে হয়নি। শুধু নিজেকে একটু বেঁটে লাগছে।
জুতোর দোকান একদম ফাঁকা। সামনে একজন দাঁড়িয়ে ছিলেন। এতক্ষণ পর কাউকে অবাক হতে দেখলাম। হাইপাওয়ার চশমার পিছনে চোখদুটো আরও গোল গোল দেখাচ্ছিল। জুতোর দোকানের কর্মচারীরা বোধহয় লোকের পায়ের দিকে নজর রাখে। আমি ছাতা বন্ধ করে ঠাট্টার ভঙ্গিতে বললাম, ‘জুতোই যখন কিনব তখন জুতো পরে দোকানে আসব কেন! খালি পায়েই আসা উচিত, কী বলেন!’
‘কী হয়েছে আপনার?’
চটি পছন্দ করতে করতে ব্যাপারটা বলে দিলাম। শুনে তিনি বললেন, ‘আরেক পাটি আপনি ওখানেই ফেলে এলেন?’
‘কেন বলুন তো? তাতে কী?’
‘আরে অন্য পাটিটা কেউ তুলে নিলে তো পুরোটাই তার হয়ে যাবে।’
‘না না। স্টেশনমাস্টার তো বলে দিয়েছেন, ও চটি কেউ তুলতে পারবে না।’
কথা বলতে বলতে একটা ছেঁড়া ন্যাকড়া দিয়ে পা বেশ করে মুছে নতুন চটি পরে দেখলাম। আগেরটা পায়ে গলিয়ে নিলেই চলত। এবার কিনলাম বেল্ট লাগানো। যত ধাক্কাই কেউ মারুক না কেন, আর খুলে বেরিয়ে যেতে পারবে না। তবে দাম দিতে গিয়ে খচখচ করে উঠল মনটা। দুশো নিরানব্বই টাকা আলটপকা বেরিয়ে গেল মাসের হিসেবের বাইরে। এই টাকায় অন্য কত কী হতে পারত! একশো টাকার জন্য দু-দুটো বই ছেড়ে দিলাম খানিক আগে।
তবু দোকান থেকে বেরিয়ে আরাম লাগল। নিজেকে যেন ফিরে পেয়েছি। যেন আমার কাছ থেকে কিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এইবার আমি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। যদিও টের পাচ্ছি এতে পৃথিবীর কিছুই আসে-যায়নি। আমি শুধু ভিড়ে মিশে গিয়েছি আবার।
মেট্রোয় ফিরে এসে কিন্তু বেকুব হয়ে গেলাম। যেখানে চটিটা পড়ে গিয়েছিল সেখানে ফের উঁকি মেরে দেখি সে নেই। যেটা খুলে ফেলে দিয়েছিলাম সেটাও উধাও।
খুব রাগ হল। রেগে দুশো নিরানব্বই টাকা মসমসিয়ে স্টেশনমাস্টারের ঘরে গেলাম। সেখানে ভিড়। তিনটি অল্পবয়সি ছেলে কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে। তাদের টপকে গিয়ে বললাম, ‘আমি একটু আগে আপনার কাছে এসেছিলাম। আপনি বলে দিলেন লোক নেই, চটি তোলা যাবে না। এখন এসে দেখছি আমার দুটো চটির একটাও নেই। বেকার এতগুলো টাকা খরচা করে চটি কিনতে হল! সেই যখন তোলাই হল তখন আগে তুললে আমার এত হ্যারাসমেন্ট হত না।’
আগের মতোই শান্ত গলায় স্টেশনমাস্টার বললেন, ‘আমি বলতে পারব না কে আপনার চটি তুলেছে। কখন তুলেছে।’
‘সে কী! লাইনে নেমে যে তুলেছে সে তো আপনাদেরই লোক হবে। অন্য কেউ তো এটা করতেই পারবে না।’
‘বললাম তো, আমার কাছে কোনও খবর নেই।’
‘আপনার হাতের কাছে মনিটর, সেখানে ক্যামেরায় গোটা স্টেশনের ছবি দেখা যাচ্ছে আর আপনার অজান্তে কেউ লাইনে নেমে পড়ল?’
‘নামতে নাও পারে। লাঠি দিয়েও তুলে নেওয়া যায়।’
‘বাঃ, তা হলে তখনও তো সেটা করা যেত। আর সেভাবেও যদি কেউ নিয়ে থাকে, আপনি জানবেন না? আপনি তো বললেন ছ’মিনিট অন্তর ট্রেন চলে, কিছুই করা যাবে না।’
‘বললাম যে আমার কাছে কোনও খবর নেই। তাছাড়া ট্রেন আধঘণ্টা বন্ধ ছিল।’
আমি আর পারলাম না। বললাম, ‘কেন? বন্ধ ছিল কেন? আমার চটি পড়ে গেছিল বলে!’
স্টেশনমাস্টারের গলা ততটা শান্ত রইল না আর। তিনি বললেন, ‘টেকনিক্যাল ফল্ট হয়েছিল। কারও চটি পড়ে গেলে ট্রেন বন্ধ হয় না। কী ভাবেন কী আপনারা?’
টাকা যখন গচ্চাই গিয়েছে আর পুরোনো চটিও যখন ফেরত পাব না তখন আমিই বা চুপ থাকি কেন। তেড়ে বললাম, ‘ভাবতে আর কী বাকি রেখেছেন? আপনি তো কিছুই জানেন না বলে চলেছেন। কেউ যদি লাইনে বোমাও নামিয়ে রেখে যায়, বলবেন আপনার কাছে খবর নেই।’
‘দেখুন, অযথা অ্যালিগেশন আনবেন না। আপনার চটির চেয়ে অনেক ইমপরটেন্ট ব্যাপার নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাতে হয়। জব্বলপুরের একটি কলেজের মেয়ে কোন স্টেশনে রয়ে গেছে, এরা খুঁজছে। অ্যানাউন্স করাতে হবে। কত কিছু সামলাতে হয়, জানেন কিছু?’
সেই তিনটি কমবয়সি ছেলের একজন এগিয়ে এসে বলল, ‘হাম লোগ জবলপুর সে হ্যায় স্যার।’
‘হাঁ হাঁ, জানতা হ্যায়। জব্বলপুর হাম গয়ে হ্যায়। মার্বেল রক্স।’
‘রাইট স্যার। লেকিন উও জবলপুর হ্যায় স্যার।’
‘আরে হাম রেল কা আদমি। হামকো জব্বলপুর শিখাতা হায়? জব্বলপুর হ্যায় কি জবলপুর— জাগা তো এক হি হ্যায়। যাও যাও, বাহার যাকে অ্যানাউন্স শুনো।’
ছেলেগুলোর সঙ্গে আমিও বেরিয়ে এলাম। আর কথা বলে লাভ নেই। যে দুটো বই কিনিনি তার একটার লেখক সাইকেলে দেশজুড়ে চক্কর দিয়েছিলেন। আমরা সাইকেলে চড়ি না। আমাদের ভরসা মেট্রো। যতই ঝগড়া করি, কাল ওতেই চাপতে হবে। আর পূজাবার্ষিকী অলকনন্দা তো ছোটবেলার স্মৃতি। তাতে ভর করে ওড়া যায় না।
ট্রেন বন্ধ ছিল বলে প্ল্যাটফর্মে লোক জমে গিয়েছে। এরা কেউ জানে না গত আধঘণ্টায় আমার কী পদস্খলন হয়েছিল এবং সেখান থেকে কীভাবে উদ্ধার করেছি নিজেকে। আমি ভিড়ের মধ্যে আরপিএফের সেই জওয়ানকে খুঁজছিলাম। যদি দেখে থাকে— কে তুলল আমার চটিটা। ওদের তো সতর্ক দৃষ্টি। দেখার কথা। চটি নেই। কৌতূহল রয়েছে আমার।
প্ল্যাটফর্মের এ মুড়ো থেকে ও মুড়ো ঘুরে এলাম। কোথাও নেই খাকি উর্দি। অদ্ভুত। আমার চটি কেলেঙ্কারির ঠেলায় সেও উবে গেল না কি! সিকিউরিটির দায়িত্ব তা হলে কার এখন?
ঘুরেফিরে আমি আবার সেখানে এসে দাঁড়ালাম যেখানে চটিটা ঝাঁপ দিয়েছিল। বলতে গেলে খুনির অকুস্থলে ফিরে আসার মতোই এলাম। এসে আরও একবার লাইনে উঁকি মারার ইচ্ছেটাও সামলাতে পারলাম না
এ কী! ওখানে ওটা কী পড়ে রয়েছে? ফিরে এসে কি তা হলে ভুল দেখছি? স্টেশনমাস্টারকে কত কথা শোনালাম। কিন্তু না, চটি তো নয়। পা শিরশির করে উঠল। তারপর শিরশিরানিটা মাথা অবধি ঢেউ তুলল। আমি কাঁধের ব্যাগ সামলে আরও একটু ঝুঁকিয়ে দিলাম নিজেকে। নাঃ, ভুল তো দেখছি না। ওখানে পড়ে রয়েছে একটা ঘোড়ার নাল। মেট্রোর লাইনে ঘোড়ার নাল কোথা থেকে আসতে পারে? অথচ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি নালটাকে। খানিকটা মরচে পড়া। গায়ের কয়েকটা ফুটো অবধি দেখা যাচ্ছে। ইংরেজিতে দেখলে— ইউ।
‘এত ঝুঁকছেন কেন আপনি? কী দেখছেন?’
পট করে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। আমার ডানপাশে এসে দাঁড়িয়েছে একজন। আমি হাত সোজা করে আঙুল তুলে দেখালাম লাইনের দিকে। ‘ওখানে একটা ঘোড়ার নাল পড়ে আছে।’
লোকটা হাসল। ‘আছে তো। আমিও দেখেছি। হর্স শু।’
‘আশ্চর্য ব্যাপার। এখানে ঘোড়ার নাল কী করে এল বলুন তো?’
আমার বাঁপাশ থেকে তখন একজন বলে উঠল, ‘আশ্চর্যের কী আছে? কারও পা থেকে খুলে পড়ে গিয়েছে হয়তো। সরে আসুন। মেট্রো আসছে। খুব ভিড় হবে।’
চিত্রণ: মুনির হোসেন






