ভারতীয় হিন্দু পুরাণ ও ধর্মে বহুবিধ আচারাদির কথা আছে। একদিকে পূজা-পার্বণ, অন্য দিকে, নানান রিচুয়াল তার অঙ্গ। লক্ষ্মী-সরস্বতী-দুর্গা-শিবপুজোর বাৎসরিক অনুষ্ঠেয়তার কথা যেমন পাই, তেমনই সামাজিক বহু রকমের কৃতকৃত্যাদির কথাও আছে।
মহালয়া এমন একটি কৃত্য, যা হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে পরলোকগত পিতৃপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনরূপে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। খ্রিস্টান ও মুসলমানরাও নিজেদের ধর্মীয় আবহে পিতৃপুরুষদের অনুরূপ স্মরণ, শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন, যথাক্রমে ‘All Souls’ Day’ আর ‘শবে বরাত’ উদযাপনের মাধ্যমে। বৌদ্ধরাও ‘পুণ্যদান’, ‘সঙ্ঘদান’ ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে প্রয়াত পিতৃপুরুষদের স্মরণ করেন। জাপানি বৌদ্ধরা ‘ওবোন’ পালনের মাধ্যমে দিনটি পালন করে থাকেন।
মহালয়া হল প্রয়াতদের স্মরণ। শব্দটির দু’টি ভাগ, মহা (মহান বা বড় অর্থে) আর আলয়। হিন্দুধর্মে বিশ্বাসীদের মতে, মৃত ব্যক্তিরা একপক্ষ কালের জন্য পৃথিবীতে তাঁদের গৃহে ফেরেন। তারপর আবার প্রেতলোকে চলে যান। এই সময়টিতে তাই মৃত ব্যক্তিদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা করার বিধি। এইভাবে মৃত ও জীবিতদের মধ্যে এক অতীন্দ্রিয় যোগসূত্র রচিত হয়।
প্রয়াত পিতৃপুরুষের স্মরণ করাকে বলে তর্পণ। কোনও মানুষের মৃত্যুতে হিন্দুরা মৃতের পরলোকগমনে ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ বর্ণভেদে দশ, তেরো বা তিরিশ দিন পর যে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করে (অপমৃত্যু, অর্থাৎ দুর্ঘটনা, সাপে কাটা, আত্মহত্যা ইত্যাদিতে তিনদিন। প্রয়াতের কন্যাসন্তানদের ক্ষেত্রেও তিনদিন পর শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের বিধি), সেটাও তর্পণ। তবে এ দুয়ের পার্থক্যও আছে। মহালয়া বাৎসরিক তর্পণ। প্রতি বছর অনুষ্ঠেয় তাই।
উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, তিনপুরুষকে স্মরণ করতে হয় মহালয়ায়। কারণ, তার আগের পুরুষেরা (এখানে পুরুষ মানে পুরুষ-ই নয়, নারী-ও। অর্থাৎ বাবা-মা, পিতামহ-পিতামহী, প্রপিতামহ-প্রপিতামহী) ইতিমধ্যেই স্বর্গবাসী হয়ে যান বলে মহালয়ায় তাঁরা আর মর্ত্যে ফিরে আসেন না। এজন্য শাস্ত্রে বিবাহ ও সন্তানজন্ম দেওয়ার আবশ্যিকতার কথা বলা হয়েছে। প্রজন্ম সৃষ্টি না হলে পূর্বপুরুষের স্বর্গরাজ্যে বাস করা সম্ভব হবে না, তাই। সন্তানহীন পিতা-মাতাকে ‘পুন্নাম’ নামক নরকে বাস করতে হয়।
মহাভারতে পাই, মৃত্যুর পর কুন্তীপুত্র কর্ণকে প্রতিদিন আহার্য রূপে অঢেল সোনাদানা পরিবেশিত হত। স্বর্ণ, কেন? জিজ্ঞাসু কর্ণকে বলা হল, যেহেতু তিনি জীবিতকালে ছিলেন মহান এক দাতা, বহু মানুষকেই স্বর্ণালঙ্কার দান করতেন, প্রতিদানে তাঁকে এহেন আহার্য দেওয়া হয়। তিনি কখনও পিতা-মাতার তর্পণ করেননি, অতএব সাধারণ ব্যক্তির আহার তাঁর জন্য নয়। কর্ণ জানান, তিনি তো তাঁর মাতা-পিতা সম্পর্কে অজ্ঞ। তখন কর্ণকে তাঁর প্রকৃত মাতা-পিতার কথা বলা হয়, ও পুনরায় এক পক্ষকালের জন্য পৃথিবীতে গিয়ে তর্পণ করে আসতে বলা হয়। কর্ণ এইভাবে তর্পণের সুযোগ পান। বলা বাহুল্য, রূপকের মাধ্যমে এইভাবে তর্পণের গুরুত্বকে তুলে ধরা হয়েছে।
তর্পণের সময়কাল কখন ও কেন?
মহালয়া ও দুর্গাপুজোর সঙ্গে ঠিক সরাসরি যোগ না থাকলেও পরোক্ষে যোগ আছে। মহালয়া হল পিতৃপক্ষের শেষ দিন। তারপর থেকে দেবীপক্ষের সূচনা। সেই দিনেই নাকি দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন। এজন্য শাস্ত্রমতে ওইদিন দেবীর বোধন। যার অন্য নাম কল্পারম্ভ। অধিকাংশ স্থলে ওইদিন না হয়ে ষষ্ঠীর দিন বোধনক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। এজন্য তাকে ষষ্ঠ্যাদিকল্প বলে।
বোধন কী? বোধন কেন?
শ্রাবণ মাস থেকে পৌষমাস দেবতাদের নিদ্রার সময়। মাঘ-আষাঢ় তাঁদের জেগে থাকার সময়। দুর্গাপুজো-সহ প্রায় সব দেবদেবীর আরাধনা তাই ওই ছ’মাসের মধ্যে হয়। আদিতে দুর্গাপুজো-ও বসন্তকালে হত। নাম ছিল তাই বাসন্তীপুজো। কিন্তু শারদীয়া (একবছর আশ্বিনে, পরের বছর কার্তিক, অর্থাৎ হেমন্তে দুর্গাপুজো হয়। তাই একে সর্বাঙ্গীণভাবে কিন্তু ‘শারদীয়া’ বলা যাবে না!) হল অকালবোধনের জন্য, দেবী যখন নিদ্রিত। বোধন, অর্থাৎ নিদ্রিত দেবীকে জাগিয়ে তোলা।
পিতৃপক্ষ শেষ হলেই তাই বোধনের মধ্যে দিয়ে দেবী দুর্গার আরাধনার সূত্রপাত। আর দুর্গা যেহেতু মধুকৈটভ, শুম্ভনিশুম্ভ, মহিষাসুর প্রভৃতি দৈত্যের বধ করেছিলেন, তাই মহালয়ার প্রত্যূষে চণ্ডীপাঠ করার রীতি আছে। কেননা চণ্ডীতে এইসব দৈত্যনিধনের কথা আছে। ওইদিন চণ্ডীপাঠ করেন যারা, তারা কেবল মহিষাসুর বধের অংশটিই পাঠ করেন, পুরো চণ্ডী নয়। ভক্তিমান হিন্দুরা তর্পণ করেন যেমন, তেমনই চণ্ডীপাঠ-ও করে থাকেন।
এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও এক ঘরে গাদাগাদি করে বসে মহালয়া শোনার দৃশ্য স্থান পেয়েছে, তানভীর মোকাম্মেলের ছবি ‘চিত্রা নদীর পারে’-তে।
১৯৭৬-এ আকাশবাণী মহালয়াকে অন্যভাবে উপস্থাপিত করে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণের স্থলে মহানায়ক উত্তমকুমারকে আনা হয়। দর্শকের প্রবল আপত্তিতে পরের বছর থেকে পুরনো অনুষ্ঠানেই ফিরে যেতে বাধ্য হয় আকাশবাণী। আগে এটি লাইভ প্রচারিত হত। এখন প্রচারিত হয় ১৯৬৬ সালের রেকর্ডকৃত অনুষ্ঠানটি।
যাই হোক, মহালয়া আর দুর্গাপুজো সনাতন বাঙালির কাছে (অন্য কিছু প্রদেশবাসীর কাছেও) নিঃসন্দেহে সেরা আনন্দোৎসব।
কলকাতা বেতারে নাটক, সঙ্গীত, খবর পড়া, কথিকাপাঠ ও আরও কত অনুষ্ঠানের আয়োজন। আর বছরে মাত্র একটি প্রাক্-সূর্যোদয়কালীন দেড় ঘণ্টার অনুষ্ঠান ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। তবু এটি-ই জনপ্রিয়তার শীর্ষে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। এর কারণ, এটি গানে-ভাষ্যে ও আবহসঙ্গীতের ত্রিবেণীসঙ্গমে শ্রোতার কাছে নান্দনিকতার অপার বৈভব নিয়ে আসে। ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’ গানটি দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা, মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিনবার শঙ্খধ্বনির পর ‘যা দেবী মধুকৈটভাদি’ স্তোত্রপাঠান্তে। এখানে একের পর এক অনবদ্য শ্রুতিমধুর সঙ্গীতে কণ্ঠ দিয়েছেন সুপ্রীতি ঘোষ, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুমিত্রা সেন, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, বিমলভূষণ, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, শিপ্রা বসু, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। হেমন্ত-ও ছিলেন, কিন্তু অনিবার্য কারণে পরে তিনি বাদ পড়েন।
গানগুলি সুর ও কথায় অনবদ্য। এজন্য সুরকার হিসেবে পঙ্কজকুমার মল্লিককে অন্তহীন সাধুবাদ জানাতে হয়, আর গীতিকার বাণীকুমারকে অশেষ অভিনন্দন। তবে অনুষ্ঠানটির মূল আকর্ষণ গানগুলির মধ্যপর্বে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের বাংলায় ভাষ্যপাঠ, আর সেই সঙ্গে ওজস্বী ভাষা ও বিশুদ্ধ উচ্চারণে শ্রীশ্রীচণ্ডী থেকে উপযোগী অংশ পাঠ। এই বিশুদ্ধ উচ্চারণ তাঁকে রীতিমতো দিনের পর দিন ধরে পণ্ডিত অশোক শাস্ত্রীর কাছ থেকে শিখতে হয়েছে। মনে রাখতে হবে, সংস্কৃত-জানা বাঙালি পণ্ডিত মানুষের অভাব নেই। অভাব আছে হ্রস্ব ও দীর্ঘস্বরকে যথার্থ মান্যতা দিয়ে উচ্চারণকারীর, ‘ণ’ ও ‘ন’-এর পৃথক উচ্চারণে যথার্থ উপস্থাপনের, শ, ষ, ও স-কে পার্থক্য বুঝে উচ্চারণ করার লোকের। বৈদিক যুগে যে ছ’টি বিষয়ে পাঠদান করা হত, সেগুলি হল ব্যাকরণ, কল্প, জ্যোতিষ, নিরুক্ত, ছন্দ ও শিক্ষা। এর মধ্যে ‘শিক্ষা’ হল ধ্বনিবিজ্ঞান। বর্ণের যথার্থ উচ্চারণ যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রমাণ ‘শিক্ষা’-কে পাঠ্যতালিকায় আবশ্যিক করা। সে-অর্থে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ কিন্তু সংস্কৃতে কৃতবিদ্য ছিলেন না। তাই তাঁর অধ্যবসায়কে কুর্নিশ জানাতেই হয়। আমরা আশ্চর্য না হয়ে পারি না, যখন তিনি ‘গর্জ গর্জ ক্ষণং মূঢ়’– যে ক্ষ-কে যথার্থ উচ্চারণ করেন, ‘খ’-য়ের মতো না করে। এরকম বহু উদাহরণ দেওয়া যায়। সবচেয়ে অবাক লাগে, এই অনুষ্ঠানটি কিন্তু ১৯৬৬ পর্যন্ত লাইভ প্রচারিত হত। কী করে যে এত নির্ভুল উচ্চারণ আর তার সঙ্গে অসীম প্রাণবন্ততা নিয়ে আসতেন তিনি!
১৯৭৬ সালে আকাশবাণী এই অনুষ্ঠানটির বিকল্প হিসেবে অধ্যাপক ধ্যানেশনারায়ণ চক্রবর্তীর লেখা ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম্’ নামে নতুন একটি প্রযোজনা নিয়ে আসে। বাঘা বাঘা শিল্পীতালিকা ছিল এখানে,– লতা, সন্ধ্যা, আশা, মান্না, আরতি। ভাষ্যপাঠে উত্তমকুমার। সিদ্ধান্তটি যে নিতান্তই হঠকারী ছিল, অনতিবিলম্বে তার প্রমাণ মিলল। আকাশবাণীর এক বিশিষ্ট কর্মী মিহির বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন, ‘অনুষ্ঠান শেষ হতে না হতেই আকাশবাণী ভবনের সামনে সমবেত হয় বিশাল জনতা। ফটকে নিয়োজিত প্রহরীরা সামাল দিতে হিমশিম খেয়ে যায়। ফটকের গেট ভেঙে ঢুকে পড়তে চায় উত্তাল মানুষের ঢল।’ অতএব সে-বছর ষষ্ঠীর ভোরে ফের প্রচারিত হল ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। বোঝা গেল, এ-অনুষ্ঠানের বিকল্প অসম্ভব।
আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের যাবতীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ তো সর্বশ্রেষ্ঠ বটেই, মনে হয়, ভারতের সমগ্র ৪৭০টি আকাশবাণী কেন্দ্রের মধ্যে কেউ এর জনপ্রিয়তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি। একমাত্র ‘বিনাকা গীতিমালা’ তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বলে বিবেচিত হতে পারে।
চিত্র: গুগল






