Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ত্রিপুরা জনজাতির লোককাহিনিতে জুমজীবন

বাংলাদেশে বৃহৎ জাতি বাঙালি ব্যতীত অন্যান্য পঞ্চাশোর্ধ জনজাতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসকারী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খাসিয়া, পাংখোয়া, খিয়াং, খুমী, ম্রো, রাখাইন, বম, চাক, তঞ্চঙ্গ্যা, লুসাই উল্লেখযোগ্য। বর্তমান বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি জেলায় ত্রিপুরাদের বসবাস বেশি। তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনাচরণের বিষয়গুলো তাদের প্রচলিত সাহিত্যের মধ্যে অল্প-বিস্তর লক্ষ করা যায়। তাদের নিজস্ব জীবন ও সমাজের পরিচিতি সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমে পাওয়া গেলেও তাদের লোকসাহিত্যের লোককাহিনি ও কিংবদন্তিমূলক রচনায় প্রাচীন জীবন ইতিহাস কতোটা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত তা খুঁজে যায়। ত্রিপুরা জনজাতির প্রকৃত ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে তাদের রূপকথা, লোককাহিনি ও কিংবদন্তিমূলক রচনায়।

ত্রিপুরাদের রূপকথা, লোককাহিনি ও কিংবদন্তিমূলক রচনায় প্রতিফলিত হতে দেখা যায় যেমন ১. ত্রিপুরাদের পাহাড়ি কৃষিভিত্তিক জুম জীবন; ২. ত্রিপুরাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ; ৩. ত্রিপুরা নর-নারীর প্রতিকৃতি; ৪. রূপকথা, লোককাহিনি ও কিংবদন্তিমূলক রচনার গঠন, শব্দ, ভাষা, শিল্পরূপ, সাহিত্যমূল্য প্রভৃতি। দেখা যায় এসবের মধ্যে ত্রিপুরা জীবনের নিজস্ব ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যিক বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে এই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এদেরকে অন্য জনজাতি হতে পৃথক করে রাখে। এতে ত্রিপুরাদের অতীত ইতিহাস অর্থাৎ তাদের সমাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি তথা তাদের নিজস্ব সামগ্রিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা অনেকটা জীবন্ত হয়ে ওঠে।

ত্রিপুরা লোকসাহিত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। লোককাহিনিতে পাওয়া যায় যেমন ১. পৃথিবী সৃষ্টি, দেবতাদের কাহিনি ও ধর্মীয় বিশ্বাস, ২. ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তি কাহিনি, ৩. প্রেম ও সম্পর্কের কাহিনি, ৪. প্রাকৃতিক কাহিনি, প্রাণীকেন্দ্রিক কাহিনি ও জাদুকরী উপাদান, ৫. সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ, ৬. জীবন-যাত্রার সংগ্রাম প্রভৃতি। বাংলাদেশে মহেন্দ্রলাল ত্রিপুরার (১৯৪৫-২০১৩) ‘ত্রিপুরা রূপকথা’ এবং ‘ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি’র পাশাপাশি শোভা ত্রিপুরার ‘রূপকথার রাজ্যে’, প্রভাংশু ত্রিপুরার ‘ত্রিপুরা লোককাহিনী’, কুমার প্রীতীশ বলের ‘ত্রিপুরা উপজাতি রূপকথা’ বা এর বাইরেও প্রভৃতি গ্রন্থে ত্রিপুরাদের রূপকথা, লোককাহিনি ও কিংবদন্তিমূলক গল্প পাওয়া যায়। মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা রচিত ‘ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি’ (২০১২) গ্রন্থে মোট চারটি লোককাহিনি ও কিংবদন্তি স্থান পেয়েছে। এগুলো হলো ১. পুন্দা তান্নায় (অজবদ/লালমতির প্রেম কাহিনী), ২. কুচুক হাসিকাম্ কামানি (সুউচ্চ সুসাই রাজ্যজয়/সেনাপতি রায় কাচাক সুমন্তের জয় কাহিনী), ৩. হায়া বিদাসি থামানি (ভিন দেশে গমন) এবং ৪. খুম কামানি (পুষ্পচয়ন/ফুলগাছে আরোহণ)। এই চারটি কাহিনিতে পর্যায়ক্রমে প্রত্যক্ষভাবে স্থান পায় পরিশ্রমী ত্রিপুরা জনজাতির প্রধান পেশা কৃষিভিত্তিক জুমজীবন; লুসাই রাজার অত্যাচার থেকে সুরক্ষা পেতে ত্রিপুরা সৈন্যের যুদ্ধকৌশল ও যুদ্ধ অভিযান, যুদ্ধে লুসাই রাজ্য জয় লাভ ও রাজ্যাভিষেক; ত্রিপুরা জনজাতির জুমচাষ, পরিশ্রমী নারীর জুমচাষ ও মনোবেদনা; যুবক-যুবতীর প্রেম ও প্রেমে বাধা, সুকুন্দ্রাই ও বুকুন্দ্রাই দেবতার অলৌকিক শক্তি। ত্রিপুরা বয়োজ্যেষ্ঠ পল্লীর পালাগায়কেরা নিজস্ব ছন্দে বেহালা ও বাঁশি বাজিয়ে কাহিনিগুলো গেয়ে বা বর্ণনা করে থাকেন। এসব কাহিনিতে পাওয়া যায় যেমন ১. পৃথিবী সৃষ্টি, দেবতাদের কাহিনি ও ধর্মীয় বিশ্বাস, ২. ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তি কাহিনি, ৩. প্রেম ও সম্পর্কের কাহিনি, ৪. প্রাকৃতিক কাহিনি, প্রাণীকেন্দ্রিক কাহিনি ও জাদুকরী উপাদান, ৫. সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ, ৬. জীবন-যাত্রার সংগ্রাম প্রভৃতি।

লোককাহিনিগুলোতে বিবৃত সমাজ গড়ে উঠেছে অরণ্যপূজারী জুমিয়া শ্রেণির জীবন-জিজ্ঞাসাকে কেন্দ্র করে। ত্রিপুরা লোককাহিনিগুলোতে ত্রিপুরাদের সামাজিক ও ব্যবহারিক পাহাড়ি জীবনের সামগ্রিক বিষয়ই খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে প্রচলিত ত্রিপুরা লোককাহিনি ও কিংবদন্তিতে ত্রিপুরাদের এই জুমজীবন কেমন; জুমকেন্দ্রিক পারিবারিক জীবনপ্রবাহ কেমন প্রভৃতি একে একে খুঁজে দেখা যেতে পারে। বর্তমান আলোচনায় ‘পুন্দা তান্নায়’ এবং ‘হায়া বিদাসি থামানি’ লোককাহিনিতে ত্রিপুরা জনজাতির পাহাড়ি জুমকেন্দ্রিক জীবন কীরূপ সেবিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

পুন্দা তান্নায় (অজবদ/লালমতির প্রেম কাহিনি): কাহিনিটিতে পরিশ্রমী এক ত্রিপুরা নারীর জুমের ফসল রক্ষার নানা কার্যাবলি লক্ষ করা যায়। তাছাড়া জুমের এই ফসল রক্ষার্থে তাকে বারংবার ব্যর্থ হতেও দেখা যায়। কাহিনিটিতে বিশেষ করে জুম ফসল রক্ষায় পাখি মারতে যে গুলতি ও মাটির তৈরি গুলির লোকপ্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহারের কথা উল্লেখ আছে, তা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রাচীন একটি রীতি। কাহিনিমতে, এক রাজ্যের কামি রোয়াজার গ্রামে এক চন্তাই বা অচাই বা পুরোহিতের ঘরে সুমন্ত নামের এক যুবক অতিথি হিসেবে আসে। সুমন্ত অন্য এক রাজ্যের কামি রোয়াজার উজিরের ছেলে। বর্তমানে তার বাবা-মা কেউ নেই। সে গোঁসাইন রাজার এলাকার দাংগুই বুড়ার গ্রামে থাকে। সুমন্ত নিজের পরিচয় ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য তথ্য দেওয়ার পরে চন্তাই জানতে পারেন যে, যুবকটির বাবা-মা এবং এই চন্তাই পরিবারটি পূর্বে একসময় একই পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। তারা একসঙ্গে জুমচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। যুবকটির বাবা ছিলেন খুবই ভালো মানুষ এবং কোনোদিন কারো সঙ্গে তার কোনো প্রকার ঝগড়া-বিবাদ হতো না। অচাইয়ের সংসারে দুই কন্যা আছে যথাক্রমে রায়বর্তী ও সুমতি। এই পরিবারে আগত অতিথি সুমন্তের ব্যবহারে অচাই যথেষ্ট সন্তুষ্ট হন। তার কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় অচাই তার বড় কন্যা রায়বতীর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে সুমন্তকে ঘরজামাই করে রাখার প্রস্তাব দিলে সুমন্ত রাজি হয়ে যায়। আমরা জানি, ত্রিপুরা সমাজে এজাতীয় বিবাহ-রীতিকে ‘কাইজালাই কুসুর’ রীতি বলে। এক্ষেত্রে বর ঘরজামাই হিসেবে আখ্যায়িত হয়ে থাকে। তবে ত্রিপুরা জনজীবনে ‘কাইজালাই কুসুর’ বিবাহ সম্পাদন যেকোনো পুরুষের জন্য কলঙ্কজনক।

‘পুন্দা তান্নায়’ লোককাহিনিতে দেখা যায় একটি শুভ দিন দেখে সুমন্তের সাথে রায়বতীর বিয়ে হয়। রায়বতী একদিন তার ছোট বোন সুমতিকে নিয়ে জুমের কাজে যায়। জুমের পাকা ধান খেতে আসা তোতা পাখি এবং বাবুই পাখি তাড়াতে সুমতিকে পাঠালে সে একা একা যতবার পাখিদেরকে ক্ষেতের একপ্রান্ত থেকে তাড়িয়ে দেয়, ততবার তারা উড়ে গিয়ে অপরপ্রান্তে বসে। অবশেষে সুমতি ব্যর্থ হয়ে একটি গাছের গোড়ায় বসে কাঁদতে থাকে। একসময় সুমন্ত তার স্ত্রী রায়বতীকে ডেকে সুমতিকে জুমঘর থেকে সাথে নিয়ে আসতে বলে। সুমন্ত এই দুই বোনকে উই ভিটা থেকে মাটি এনে গুলি তৈরি করে তা আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করে নিতে বলে। এরপর সুমন্ত একটি মোটা বাঁশ ও বেত কেটে নিয়ে ‘বাদল’ (ধনু বিশেষ) তৈরি করে। তারপর বেত কেটে ‘চেমনাই’ (গুলি নেওয়ার ব্যাগ) বানিয়ে কাঁধে নিয়ে প্রথমে জুমঘরের মাচাঙের উপরে দাঁড়িয়ে বাদল দিয়ে পাখি মারতে থাকে। উল্লেখ্য, পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র জনজাতিকে প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত উপাদানের মাধ্যমে নিজের হাতে নিত্য ব্যবহার্য লোকপ্রযুক্তি তৈরি করতে দেখা যায়। এভাবে তৈরিকৃত কৃষি এবং গার্হস্থ্যধর্মী লোকপ্রযুক্তিগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবেশবান্ধব হয়ে থাকে। এই লোককাহিনিতে দেখা যায় একসময় সুমন্ত অলৌকিক ক্ষমতাবলে মন্ত্র পড়ে নিজেই পাখির মতো আকাশে উড়ে উড়ে পাখিদের গুলি মারতে থাকলে সেগুলো বৃষ্টির ফোঁটার মতো মাটিতে পড়তে থাকে। সুমন্ত এভাবে পাখির দলকে সাত সমুদ্র তের নদী পার করে দেয়। তারপর সে পাহাড়ি ছড়ায় নেমে স্নান করে ছড়া থেকে জুম ঘরে ফিরে আসে। জুম ঘরে এসে ভাত খেয়ে পাখি তাড়ানোর এই অলৌকিক ঘটনা বাড়িতে বা পাড়ায় কাউকে বলতে সে নিষেধ করে। কিন্তু সুমন্তের শ্যালিকা সুমতি ঐ রাতেই তার মাকে চুপি চুপি ভগ্নিপতি (কুমুই) সুমন্তের এই জুমকেন্দ্রিক কার্যক্রম প্রকাশ করে দেয়।

‘হায়া বিদাসি থামানি (ভিনদেশে গমন)’: লোককাহিনিতে দেখা যায় সেখানে জুমপথের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে জুমচাষী দুই নারীর জুমের বর্ণনা পাওয়া যায়। কাহিনিমতে, কামি রোয়াজার গ্রাম এলাকায় এক প্রাক্তন উজিরের বাড়ি ছিলো। উজিরের এক মেয়ে নাম লক্ষ্মী এবং এক ছেলে নাম গান্ধেরব। পাড়ার এক অচাই বা পুরোহিতের মেয়ে সামাতির সঙ্গে গান্ধেরব খেলাধুলা করে বেড়ে ওঠে। গান্ধেরব সামাতিকে পছন্দ করে এবং একবার সে সামাতিকে কিছু অলংকারও উপহার হিসেবে দেয়। কিন্তু গান্ধেরবের পিতার এই বিয়েতে মত নেই জেনেও গান্ধেরব পিতার বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। অপরদিকে উজিরের স্ত্রীর জোর দাবি ছিলো ছেলেকে তিনি সামাতির সঙ্গেই বিয়ে দিবেন। কিন্তু উজির তা কখনোই চান না। উজির তার কন্যার স্বামী হাদুকমিনিকে গান্ধেরবের সাথে দিয়ে কামি রোয়াজার বাড়িতে কামি রোয়াজার কন্যাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। কামি রোয়াজার কন্যাকে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার সময় গান্ধেরব ও তার সঙ্গী যুবক দল বহু পাহাড়, পর্বত, নদীনালা পার হয়ে বিশাল এক জুমে পৌছে। সেখানে প্রথমে কোনো লোকজন দেখা না গেলেও পরে এক দল যুবতীকে জুমে লাকড়ি ও শাকসজি খুঁজতে দেখা যায়। গান্ধেরবের সঙ্গীরা এই যুবতী দলকে পান, সুপারি, তামাক খাওয়ায়; তাদেরকে চুড়ি, আংটি ও কানের দুল দিয়ে বিশ্রাম নিয়ে কামি রোয়াজার ঠিকানা জেনে নেয়। মেয়েরা বলে, পশ্চিম দিকে কয়েকটি পাহাড় ও নদী-‘ নালা অতিক্রম করে গেলে প্রথমে লুংগিনি ও পুংগিনি নামের দুই বোনের জুম দেখা যাবে। তারা কামি রোয়াজার গ্রামের অচাই বা ওঝার কন্যা। সেই জুমে পৌঁছালে কামি রোয়াজার গ্রামের খবর পাওয়া যাবে। সেই জুম পার হয়ে গেলে রোয়াজার গয়াল চড়ার পাহাড় দেখা যাবে। সেখানে গরু, মহিষ, ঘোড়া চড়ার পাহাড় দেখা যাবে। সেই এলাকার গাছগুলো নিচু এবং ছোট ছোট। সেই পাহাড় অতিক্রম করে গেলেই গ্রামে ঢেঁকির শব্দ, রাজহাঁসের ডাক শোনা যাবে। এই বর্ণনা থেকে সহজেই বোঝা যায়, প্রাচীনকালে ত্রিপুরা নারীরা অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিলো। এই নারীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী জুমচাষে নিয়োজিত থাকতো এবং যা বর্তমানেও প্রচলিত আছে।

কাহিনিতে দেখা যায়, কয়েকটি পাহাড় ও নদীনালা পার হয়ে গান্ধেরবের দল একটি জুম বা হোগ দেখতে পায়। সেই জুমে কোনো ঘর-বাড়ি দেখতে পাওয়া যায় না। লুংগিনি ও পুংগিনি দুই বোন যুবক দলকে দেখে পালাতে চাইলে এই দল তাদেরকে অভয় দিয়ে কামি রোয়াজার বাড়ির ঠিকানা জানতে চায়। বড় বোন লুংগিনি যুবকদের কাছে এসে জুমে কাজের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করে। লুংগিনি বলে, তাদের বাবা কামি রোয়াজার গ্রামের বিভিন্ন জনের বাড়িতে দেব-দেবীর পূজা দিতে গিয়ে আর জুমের খবর রাখতে পারে না। তাদের বড় ভাইও বাবার সাথে পশু বলি (তানচরাই) দেওয়ার কাজে সাহায্য করতে যায়। যে জুমে তারা কাজ করে সেখানে তাদের বাবা বা বড় ভাই কেউ জঙ্গল কেটে দিতে পারে না। গ্রামের সবাই মিলে সেই জঙ্গল কেটে দেয়। তাদের সারা বছর ধওে জুমে যতক্ষণ রৌদ্র থাকে ততক্ষণ রোদ সহ্য করতে হয়। আর যতক্ষণ বৃষ্টি হয় ততক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজতে হয়। তাদের বাবা বা দাদা কোনোদিন তাদের মাথা গুজার মত সামান্য জুমঘরও তৈরি করে দিতে পারে না।

লুংগিনির এই কথা শুনে যুবক দলের মনে মায়া জন্মে। নিরীহ মেয়ে দুইটিকে সাহায্য করতে গান্ধেরবের ভগ্নিপতি হাদুকমিনি দলের সবাইকে প্রস্তুতি নিতে বলে। আর লুংগিনি এই দলের জন্য ভাত রান্না করতে পুংগিনিকে বাড়িতে পাঠায়। লুংগিনি পুংগিনিকে আরো বলে পাঠায় সে যেন বাবা-মাকে বলে যে, উজির বাড়ির যুবকেরা কামি রোয়াজার বাড়িতে বেড়াতে আসার পথে তাদের দুই বোনকে জুমের কাজে দেখে তাদের সম্পর্কে অবহিত হয় এবং তারা এই দলকে তাদের দুঃখের কথাও জানিয়েছে। ফলে দলটি দয়াপরবশ হয়ে তাদের জুমঘর (গাইংরিং) তৈরি করে দিচ্ছে। আর তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য চাউল, তরিতরকারি, শূকর, মোরগ, মুরগি প্রভৃতি নিয়ে দাদাকে জুমে আসতে বলে দেয়। যুবক দল সেই জুমের চারিদিকের জঙ্গল কেটে দেয়, ঝর্ণার পানিতে স্নান করার জন্য ঝর্ণার চারিদিকের জঙ্গল কেটে দেয়, ঝর্ণা থেকে জুমঘরে আসার জন্য রাস্তা তৈরি করে দেয়। ত্রিপুরা জনজাতির জুমচাষভিত্তিক এই জীবন শাশ্বত। জুমচাষে ত্রিপুরা নারীদের এই অগ্রণী ভূমিকা প্রশংসনীয়।

লোককাহিনিটির শেষে দেখা যায় কামি রোয়াজার কন্যা সুমিতি ও গান্ধেরব পালিয়ে গিয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। একসময় মেঘনা নদীর পাড়ের বাঙালি গ্রাম থেকে আদরের কন্যা সুমিতি ও জামাই গান্ধেরবকে ফিরিয়ে এনে কামি রোয়াজা তার কন্যার দাবি অনুসারে সুমিতির নামে নতুন গ্রাম তৈরি করে দেন। কামি রোয়াজা সেই নতুন স্থানে জঙ্গল কেটে সেখানে গরীব লোকজনকে বসতি করে দেন। নতুন গ্রামে সুন্দর নতুন ঘরে ওঠে, তারা সেখানে জুমচাষ ও জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে। উর্বর জমির জুম হিসেবে তাদের খানা খোরাকির কোনো অভাব থাকে না। সেখানে ধান, সূতা বা তুলা, তিল, বিভিন্ন রকমের শাকসজি ও অন্যান্য ফসল ফলে। জুমে উৎপাদিত ধান দিয়ে সারা বছরের খোরাকি চালানো যায়; তুলা দিয়ে নিজেদের কোসন তাঁতে নিজ নিজ চাহিদা মতো নিজেদের কাপড় তৈরি করে নেওয়া যায়। তিল বিক্রি করে চাহিদা মতো অলংকার-পত্র ক্রয় করা যায়। আর এভাবে তারা নতুন গ্রামে সুখে-শান্তিতে জীবন-যাপন করতে থাকে। এভাবে কয়েক বছর কেটে যায়। একসময় সুমিতি ও গান্ধেরবের ঘরে সুন্দর একটি ছেলের জন্ম হয়। গান্ধেরব বাড়িতে ফিরে এসে এক বছর তার বাবার বাড়িতে জুমচাষের সিদ্ধান্ত নেয়। সেদিকে গভীর ও উর্বর ভূমি আছে। সেখানে সে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে জঙ্গল কেটে বৈশাখ মাসে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করে ধান, সূতা ও তিলের বীজ বপন করে। এতে জুমের ফসল খুব সুন্দর হয়ে ওঠে। সে সেখানে গাইরিং বা জুমঘর তৈরি করে ছড়া থেকে ঝর্ণার পানি আনার জন্য সুন্দর রাস্তা তৈরি করে। জানা যায় সেই একই বছরে গান্ধেরবের পূর্বের প্রেমিকা অচাই বা পুরোহিতের কন্যা সামাতিও সেই জুমের কাছাকাছি পাহাড়ে এসে জুম চাষ করে। সেখান থেকে কেউ কথা বললেও গান্ধেরব তার জুম থেকে সেসব কথা শুনতে পায়।

উপর্যুক্ত বর্ণনায় দেখা যায় দুইটি লোককাহিতে জুম পেশায় নর-নারীর ভূমিকা, জুম চাষ, উৎপাদন, জুমকেন্দ্রিক পাহাড়ি যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থা, দারিদ্র্য থেকে মুক্তির উপায়, জুম ফসল রক্ষার কৌশল, জুমঘর প্রস্তুতকরণ, লোকপ্রযুক্তি প্রভৃতি কমবেশি স্থান পায়। এর পাশাপাশি জুমকেন্দ্রিক বাস্তুসংস্থান, পারিবারিক বন্ধন, পাহাড়ি গ্রামজীবনের জঙ্গমতা, পাহাড়ি সামাজিক দ্বন্দ্ব ও গোষ্ঠীচেতনা, অন্যান্য পেশাজীবীর পরিচয় প্রভৃতিও সেখানে স্থান পেয়েছে। এতে পার্বত্য ত্রিপুরা জনজাতির বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষের কঠোর পরিশ্রমী জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত ত্রিপুরা জনজাতির মধ্যে এই ঐতিহ্যিক জুমচাষ পদ্ধতি চলমান আছে, যা তাদের জীবন-জীবিকার অন্যতম অংশ। শিকার পরবর্তী জুমচাষভিত্তিক শাশ্বত এই পরিচয় মানব জীবনেরই অন্যতম অংশ হিসেবে বিবেচিত— এমনটা ভেবে নিলে ত্রিপুরা লোককাহিনির মর্মার্থ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 + 8 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »