ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, জাতি-রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণ ও আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধগুলো বস্তুত মানবসভ্যতাকে এক অন্তহীন কসাইখানায় রূপান্তরিত করেছে। সমকালীন ভূ-রাজনীতিতেও এর কোনও ব্যতিক্রম ঘটেনি; সাম্প্রতিক আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ তার জলন্ত প্রমাণ। এই সংঘাত কেবল স্থানীয় ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্ব জুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং চরম মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। পুঁজিবাদের এই সংকটে যখন বিশ্ববাসী এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত, তখন যুদ্ধের অন্তর্নিহিত কারণ, রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র এবং শ্রমজীবী শ্রেণির মুক্তির উপায় নিয়ে একটি আমূল ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
রাষ্ট্র, বুর্জোয়া স্বার্থ এবং শ্রমের বিচ্ছিন্নতা (Alienation of Labor)
তাত্ত্বিকভাবে রাষ্ট্রকে ‘জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে দাবি করা হলেও, কার্যক্ষেত্রে তা শোষক শ্রেণির স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার মাত্র। রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব ও শাসনকাঠামো টিকিয়ে রাখতে যে সুবিশাল সামরিক ও প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র লালন করে, তার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করে উৎপাদক বা সর্বহারা (Proletariat) শ্রেণি। অথচ নির্মম বাস্তবতা হল, যুদ্ধকালীন সময়ে এই শ্রমজীবী মানুষগুলোকেই কামানের খাদ্য (Cannon fodder) হিসেবে ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়।
যুদ্ধে প্রধানত দুই ধরনের সম্পদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়:
১. প্রাকৃতিক পুঁজি: মাটি, জলবায়ু, বাস্তুতন্ত্র এবং বনাঞ্চল— যা মানবজাতির যৌথ উত্তরাধিকার।
২. মূর্ত শ্রম (Objectified Labor): অবকাঠামো, আবাসন, প্রযুক্তি ও উৎপাদিত পণ্য— যা মূলত শ্রমিকের উদ্বৃত্ত শ্রমের (Surplus Value) বাস্তব রূপান্তর।
ফলস্বরূপ, যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রগুলো যখন ধ্বংসযজ্ঞে মেতে ওঠে, তখন তারা প্রকারান্তরে প্রকৃতির মৌলিক ভারসাম্য এবং শ্রমিকের দীর্ঘদিনের সৃজনশীল শ্রমের ফসলকেই নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
শ্রমিকের বৈশ্বিক পরিচয়: দেশহীন সর্বহারা
পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিকের বর্তমান মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক অবস্থা চরম সংকটাপন্ন। অতিরিক্ত শ্রমের শোষণ (Over-exploitation) তাদের ঠেলে দিয়েছে গভীর মানসিক অবসাদ ও শারীরিক অসুস্থতার দিকে। নিজের শ্রমশক্তি (Labor-power) বাজারে বিক্রি করা ছাড়া শ্রমিকের বেঁচে থাকার আর কোনও বিকল্প নেই। এই শ্রমশক্তিই তার একমাত্র অস্তিত্ব।
জাতীয়তাবাদের যে ধারণা বুর্জোয়ারা প্রচার করে, শ্রমিকের জন্য তা এক অবভাস বা মরীচিকা। একজন শ্রমিকের টিকে থাকার জন্য নির্দিষ্ট কোনও ভৌগোলিক সীমানার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন কেবল তার শ্রম প্রদানের সক্ষমতা। তাই কার্ল মার্ক্সের অমোঘ বাণীর প্রতিধ্বনি ঘটিয়ে বলা যায়— ‘শ্রমিকের কোনও দেশ নেই।’
যখন আমরা বলি ‘এই দেশটি আমার’, তখন তা এক ধরনের মিথ্যা চেতনার (False consciousness) জন্ম দেয়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর পাকিস্তানের শ্রমিকদের ভাগ্যের যেমন কোনও গুণগত পরিবর্তন হয়নি, তেমনই বাংলাদেশের শ্রমিকদের জীবনেও শোষণমুক্তির স্বর্গরাজ্য আসেনি। রাষ্ট্রবিজয় শ্রমিকের শ্রমের বাধ্যবাধকতাকে দূর করতে পারে না। শ্রমিকের প্রয়োজন উৎপাদনের উপায় বা মাধ্যম (Means of production)। সেই কলকারখানা বা যন্ত্রটি কোন রাষ্ট্রে অবস্থিত, তা শ্রমিকের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। সুতরাং, বুর্জোয়াদের জাতীয়তাবাদী যুদ্ধে শ্রমজীবী শ্রেণির অংশীদার হওয়ার কোনও যৌক্তিক কারণ নেই।
যুদ্ধহীন সমাজ: রাষ্ট্রযন্ত্র ও সামরিক কাঠামোর বিলুপ্তি
যেহেতু যুদ্ধ সাধারণ মানুষের কোনও এজেন্ডা নয়, তাই যুদ্ধ টিকিয়ে রাখার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো— যেমন সেনাবাহিনী, সংসদ কিংবা আমলাতন্ত্রের কোনও ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা শ্রমিকের নেই। যদি উৎপাদক শ্রেণি একযোগে তাদের শ্রম উৎপাদন বন্ধ করে দেয় এবং যুদ্ধের রসদ জোগানো থেকে বিরত থাকে, তবে রাষ্ট্রযন্ত্র পঙ্গু হতে বাধ্য। শাসকশ্রেণি নিজেরা উৎপাদন করতে পারে না; শ্রমের সরবরাহ বন্ধ হলে যুদ্ধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হবে এবং রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞের অবসান ঘটবে।
সামরিক বাহিনীতে যাঁরা যোগ দেন, তাঁরা মূলত জীবিকার তাগিদে রাষ্ট্রযন্ত্রের বেতনভোগী শ্রমিকের ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্র কার স্বার্থে এই বিশাল বাহিনী পোষে? উত্তর স্পষ্ট: স্বদেশি একচেটিয়া পুঁজির মালিকদের (Monopoly Capitalists) স্বার্থে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মজ্জাগত স্বভাবই হল সীমাহীন মুনাফা সঞ্চয়ন (Infinite capital accumulation)। এই সঞ্চয়নের লোভই রাষ্ট্রকে সাম্রাজ্যবাদী ও যুদ্ধকামী করে তোলে।
উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব এবং পুঁজির সংকট: যুদ্ধ কেন অনিবার্য?
একটি পণ্যের (যেমন সাবান) বাজারমূল্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর পেছনে রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ এবং শ্রমিকের সামাজিক শ্রম। প্রকৃত প্রস্তাবে, পণ্যের সম্পূর্ণ মূল্যই হল শ্রমের মূল্য (Labor theory of value)। পুঁজিবাদী মালিকরা এই উৎপাদনের সিংহভাগ ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ হিসেবে আত্মসাৎ করে, যা মার্ক্সীয় পরিভাষায় এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক চৌর্যবৃত্তি।
পুঁজিবাদের চূড়ান্ত সংকট তৈরি হয় তখনই, যখন বাজারে অতি-উৎপাদন (Over-production) দেখা দেয়। শ্রমিককে কম মজুরি দেওয়ার কারণে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, ফলে উৎপাদিত পণ্য অবিক্রীত থেকে যায়। এই অবিক্রীত পণ্যের পাহাড় যখন পুঁজির পুনরুৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন পুঁজিপতিরা তীব্র আতঙ্কে ভোগে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তারা প্রতিযোগী পুঁজিপতির বাজার ও পণ্য ধ্বংস করতে চায়। আর এই ধ্বংসের বৈধ হাতিয়ার হিসেবে তারা রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। অর্থাৎ, উদ্বৃত্ত পণ্য এবং অতিরিক্ত শ্রমকে ধ্বংস করে পুঁজির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই বুর্জোয়া যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য।
এই শোষণের প্রক্রিয়াকে আড়াল করতে রাষ্ট্র একদল বুদ্ধিজীবী ও নীতিবিদ লালন করে, যারা কৃত্রিম ‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’-এর আফিম খাইয়ে শ্রমিককে বিভ্রান্ত রাখে, যাতে তারা শোষক ও শোষিতের মধ্যকার মৌলিক শ্রেণি-পার্থক্য ভুলে যায়।
ঐতিহাসিক সমাধান: সমবায়ভিত্তিক সাম্যবাদী সমাজ
এই অবক্ষয় থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হল— উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার ওপর থেকে পুঁজিপতি শ্রেণির নিয়ন্ত্রণ উচ্ছেদ করা এবং উৎপাদনের উপায়ের ওপর যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা।
ভবিষ্যতের সেই নতুন সমাজ কাঠামোটি গড়ে উঠবে একটি বৈশ্বিক উৎপাদন সমবায়ের (Universal Association) ভিত্তিতে। যেখানে মূলনীতি হবে: ‘প্রত্যেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী শ্রম দেবে, এবং প্রত্যেকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী ভোগ করবে।’ (From each according to his ability, to each according to his need)
যেখানে শিশু, বৃদ্ধ ও অক্ষমদের সামাজিক সুরক্ষার দায়িত্ব নেবে সমাজ স্বয়ং। সেখানে কোনও কৃত্রিম প্রতিযোগিতা, লোভ বা দারিদ্র্য থাকবে না; সমাজই হবে মানুষের মুক্তির ও শিক্ষার প্রকৃত ক্ষেত্র।
করণীয়
এই বৈপ্লবিক রূপান্তর অর্জনের জন্য প্রয়োজন শ্রমিক শ্রেণির সচেতন রাজনৈতিক সংগঠন বা পার্টি। যাঁরা এই তত্ত্ব অনুধাবন করতে পেরেছেন, তাঁদের দায়িত্ব হল শ্রমিককে সংগঠিত করা এবং তাদের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটানো।
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক। এই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ যদি অবিলম্বে বন্ধ করা না যায়, তবে পারমাণবিক বা পরিবেশগত বিপর্যয়ে মানবজাতির অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে। তাই কালক্ষেপণের সময় নেই; আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই আজ যুদ্ধবাজ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক শ্রমিক শ্রেণিকে এখনই সংগঠিত হতে হবে।





