টক টক টক…
সহসা রাতের কড়ানাড়ার শব্দ! গম্ভীর কণ্ঠে কেউ ডাকে:
দিয়েগো বাড়ি আছ?
এলা বাড়ি আছ?
আর্মান্দো বাড়ি আছ?
হেনরিয়েটা বাড়ি আছ?
এমনই হাজার খানেক নামের তালিকায় বেশিরভাগই ‘নিরুদ্দেশ’-‘মৃত’। আর্জেন্টিনার ঘরে ঘরে আছে এই নামগুলো। ভয়াবহ রাতে তুলে নিয়ে যাওয়া দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক ও গণতন্ত্রী মতবাদে বিশ্বাসী সেদিনের যুব আর্জেন্টিনীয়রা চার দশক পরও আলোচিত হন। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার স্টেডিয়ামের পাশ থেকে ভেসে আসত তাদের মরণ চিৎকার। কলঙ্কিত সেই বিশ্বকাপ। জবরদস্তি জয়ী নীল-সাদা আর্জেন্টিনা।
বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় এদিক-ওদিক লেজ গুটিয়ে শুয়ে থাকা কুকুরগুলো গণ অপহরণ-হত্যার নীরব সাক্ষী ছিল। নীলচে-কালো পোশাকের সেনা অফিসারের হাতে সাইলেন্সার লাগানো রিভলভারের নলটা মাথার উপরে মৃত্যু স্পর্শ করতেই দৃঢ় কণ্ঠে কমিউনিস্ট কর্মী এলা বলেছিলেন, ‘লিবার্তে… ভিভা আর্জেন্টিনা।’ (এর অর্থ, স্বাধীনতা। জয় আর্জেন্টিনা)
আর্জেন্টিনার সামরিক সরকারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে (নির্যাতন শিবির) এলার ঘোষণা আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্নানির বন্দুকের সামনে মিত্রপক্ষের কিংবদন্তি গুপ্তচর নূর ইনায়ত খানের শেষ মুহূর্তের শেষ কথাটি যেন হুবহু বসানো। মৃত্যুর আগে দু’জনেই বলেছিলেন ‘লিবার্তে’ (স্বাধীনতা)।
এলা, দিয়েগো, আর্মান্দো, হেনরিয়েটা, এমনই সব নিখোঁজ-মৃত হাজার হাজার নাম। বন্দিশিবির থেকে ভেসে আসা চিৎকার মিশে যেত আটলান্টিকের নোনা হাওয়ায়। রাজপথে সন্তানের দেহ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষায় মা দাঁড়িয়ে। বিশ্বকাপ ফুটবলের তুমুল উন্মাদনার মাঝে সেও এক ভয়াবহ দৃশ্য। যে মুহূর্তগুলো আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলির পাঠানো খবর ও ছবিতে চিরস্থায়ী হয়ে গেছে। বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই আর্জেন্টিনার ঘরে ঘরে ফুটবলের উন্মাদনায় মিশে থাকে হাজার হাজার গণতন্ত্রী বিদ্রোহীদের নাম।
১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা। দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে তখন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে চলছিল গণতন্ত্র রক্ষা করার সংঘর্ষ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন মদতে আর্জেন্টিনায় বিশ্বকাপ আয়োজনের দাবি পূরণ হয়। কে দেবে ভেটো? ১৯৬৬ সাল থেকে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে চিহ্নিত।
সামরিক শাসন বনাম আর্জেন্টিনার কমিউনিস্ট ও বাম সংগঠনগুলির তীব্র সংঘাত চলছিল। ঘরে ঘরে রাতে অন্ধকারে তল্লাশি চালিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হত যুবক-যুবতীদের। বিশ্ব জুড়ে প্রবল সমালোচিত হচ্ছিলেন আর্জেন্টিনার স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট ভিদেলা। তিনি চাইলেন বিশ্বকাপের জৌলুসে সব ঢাকতে। হুঙ্কার দিলেন, আমার বিশ্বকাপ চাই!
ভিদেলার হুঙ্কারে ফিফা কাঁপছে। একের পর এক গড়াপেটা ম্যাচে আর্জেন্টিনার জয় আসছে। অবশেষে এল সেই দিন, ১৯৭৮ সালের ২১ জুন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে আছে আর্জেন্টিনা বনাম পেরুর সেই ম্যাচ। অভিযোগ, দুই দেশের সরকার ঠিক করে নেয়, ম্যাচ জিতবে আর্জেন্টিনা। ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড পাওয়া আর ১৩ জন বন্দিকে রাজনৈতিক বন্দির সম্মান দেওয়ার শর্তে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচটি ছেড়ে দিয়েছিল পেরু। সেই ম্যাচে জয়ী আর্জেন্টিনা উঠল ফাইনালে।
১৯৭৮ বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হল হল্যান্ড (নেদারল্যান্ডস)। তীব্র গা-জোয়ারির খেলায় ৩-১ গোলে জয়ী আর্জেন্টিনা। তার পর বিশ্বকাপজয়ী গণজোয়ার দেখা গেল দেশটির রাজপথে। সেও সাজানো। বন্দুকের ইশারায় উল্লাস চলছে।
বুয়েনস আইরেসের রিভার প্লেটের যে স্টেডিয়ামে তখন খেলা হত, তার মাত্র এক মাইল দূরে ছিল সামরিক সরকারের বন্দিশিবির নেভি স্কুল অব ম্যাকনিকস। সাংবাদিক ডেভিড কক্স ফুটবল বিশ্বকাপের খবর সংগ্রহ করতে গেছিলেন। তিনি ‘ডার্টি ওয়ার’ বইতে লিখেছিলেন, যখন স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার ম্যাচ চলত তখন ওই টর্চার সেল থেকে কান্নার শব্দ শোনা যেত। আর্জেন্টিনার ভুবনমোহিনী ফুটবলে লেগে আছে রক্ত।
১৯৮৩ সালে প্রবল গণবিদ্রোহে স্বৈরাচারী ভিদেলার শাসন শেষ হয়ে গেল। আর্জেন্টিনায় ফিরে এল গণতন্ত্র। তারপরের বিশ্বকাপ আসরে দেশটির ফুটবল ঝলকে মারাদোনার ম্যাজিক।
চিত্র: গুগল






