Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ধর্মযুদ্ধ

মহাভারতে কৌরব এবং পাণ্ডবদের মধ্যে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ হয়েছিল। বিষয়টি যদি এভাবে দেখি যে, কৌরবরা সরকার-পক্ষ এবং পাণ্ডবরা তাদের বিরোধী-পক্ষ তা হলে ধর্ম এবং অধর্ম সম্পর্কে ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা যায়। এখানে সরকার-পক্ষে সিংহাসনের মূল রক্ষক ছিলেন মহামতি ভীষ্মদেব। মনে করুন তিনি রাষ্ট্রপতি। এছাড়া ছিলেন কৌরব রাজদরবারের বিভিন্ন দায়িত্বপ্রাপ্ত বেতনভোগী যোদ্ধা এবং মিত্রশক্তি। যাঁরা দ্রোণাচার্য, কর্ণ, বিদুর, কৃপাচার্য, অশ্বথামাদি মহামহিমবৃন্দ। কিন্তু যিনি আসল রাজক্ষমতায় তিনি ছিলেন এক্ষেত্রে অন্ধ। এমনকি রাজমাতাও স্বেচ্ছান্ধ। ভাল করে ভেবে দেখলে বোঝা যায়, এই অন্ধত্ব বাহ্যিক দৃষ্টিগত অন্ধত্ব নয়, অন্তর্লোকের দর্শনগত অন্ধত্ব। অপত্যস্নেহের অন্ধত্ব, ন্যায়-অন্যায় বোধ সম্পর্কে অন্ধত্ব, বিদ্বেষ এবং হিংসাজাত অন্ধত্ব। রাজপুত্র দুর্যোধন এবং দুঃশাসন রাজক্ষমতার এই অন্ধত্বকে কাজে লাগিয়ে স্বেচ্ছাচারী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। আসলে, রাজা অন্ধ হলেই তো তাঁর স্নেহধন্যরা যা ইচ্ছে তাই করার অধিকার আয়ত্ত করে। পরিবারের ক্ষেত্রেও একথা সত্যি, আবার দেশের ক্ষেত্রেও সত্যি। শাসক ন্যায়-অন্যায় বোধের জ্ঞান হারিয়ে ফেললে নিতান্ত নিরীহ প্রজাও দুষ্কৃতী হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে তা-ই হয়েছিল। কৌরব প্রশাসন এতটাই অন্ধ হয়ে উঠেছিল যে, ন্যায়-অন্যায় বোধ সম্পর্কে সাধারণ বিচারবোধটুকুও তার ছিল না। বাহুবল ও বিদ্বেষিতার নেশা দিয়ে সে সাধারণ জনগণের মতামতকে স্তব্ধ রাখতে চেয়েছিল। নারীর অপমান, জুয়া, জতুগৃহ দাহন, গরু হরণ, জবরদখলের মতো অন্যায় সেখানে হয়ে উঠেছিল জলভাত। তবে রাজা এবং রাজপুত্রেরা অন্ধ হলেও কৌরব রাজদরবারের সকলেই যে অন্ধ ছিলেন তা কিন্তু নয়। বিদুর, কর্ণ, ভীষ্মদেব, দ্রোণ প্রমুখের মতো অনেকেই ছিলেন যথেষ্ট জ্ঞানী-গুণী মানুষ। বুদ্ধিজীবী বা বিদ্যাজীবীও বলতে পারেন। কারণ তাঁদের বিদ্যা, বুদ্ধি এবং জ্ঞান সমস্ত মহাভারত জুড়ে বন্দিত হত। কিন্তু এখানে লক্ষ করার বিষয় যে, শত জ্ঞান-বুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও তাঁরা সরকারের অন্ধত্বকে অতিক্রম করে নতুন কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। বরং তাঁদের উপস্থিতির বল সরকার-পক্ষকে আরও অন্যায়কর্মে লিপ্ত হতে উৎসাহিত করেছিল। একথা ঠিক যে, তাঁদের পক্ষে সরকারের মতামতের বিরুদ্ধে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ তাঁরা ছিলেন দায়বদ্ধ চাকুরে, সুবিধাভোগী। কৌরবের নুন খেয়ে ন্যায়ের বাহানায় পক্ষত্যাগ বেমানান হত। (বিদুরের উক্তি— ‘ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, অশ্বথামা ও জয়দ্রথ, ইঁহারা দুর্যোধনের নিকট হইতে জীবিকা লাভ করিয়া থাকেন, সুতরাং শান্তিপক্ষে কদাপি সম্মত হইবেন না।’) তাছাড়া এখনকার মতো দলবদল করার সুযোগ হয়তো তখন ছিল না। ফলে দলের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, উন্নয়ন করতে পারছি না— এইসব বলে দল পালটে ফেলেননি কেউ। কারণ, ক্ষমতার প্রতি দায়বদ্ধতাকেই তাঁরা ধর্ম মনে করেছিলেন। সে কারণে বিদুর, কর্ণ, দ্রোণাদি মহামহিমবৃন্দ অন্যায় বুঝেও কৌরবপক্ষেই থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন।
আমাদের দেশে উক্ত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধকেই বলা হয় ধর্মযুদ্ধ। তবে এখানে যেটি লক্ষ করার সেটি হল, কোনও বিশেষিত ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য কিন্তু এই যুদ্ধ হয়নি। এক ধর্মের বিরুদ্ধে অন্য ধর্মের লড়াইও নয়। এ লড়াই হয়েছিল ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য। অর্থাৎ ন্যায়কেই আমাদের মহাকাব্যে বলা হয়েছে ধর্ম। বিপরীতপক্ষে অন্যায়কে বলা হয়েছে অধর্ম। যুদ্ধ হয়েছিল ভাইয়ে ভাইয়ে, একই পরিবারের মধ্যে। কোনও সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, কোনও বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, কিংবা কোনও উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়। নিছকই পারিবারিক দ্বন্দ্ব। অথচ সেই দ্বন্দ্বের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিলেন প্রায় সারা ভারতের রাজন্যবর্গ। কারণ মূল প্রশ্নটি ছিল ন্যায়ধর্ম প্রতিষ্ঠা। ভাল এবং মন্দ সম্পর্কে ধারণার অস্পষ্টতা, ধর্ম এবং অধর্ম সম্পর্কে ধারণার অস্পষ্টতা যুদ্ধের পথে নিয়ে গিয়েছিল দু’পক্ষকে। কথাটি এইজন্য বলছি যে, কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের দু’পক্ষই কিন্তু ধর্ম মানতেন। দেব-দেবতার প্রতি ভক্তি ছিল সবারই। ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে উভয়পক্ষই মানতেন। কিন্তু কোনটি আসলে ধর্ম এবং কোনটি আসলে অধর্ম এই বিষয়টিতে কৌরবদের ধারণা ছিল অস্পষ্ট। সে কারণে স্বামীর অন্ধ বিচারবোধ নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলেননি গান্ধারী। চোখ বেঁধে রেখেছিলেন সতীত্বের মাহাত্ম্য দেখাতে। আবার দ্রোণাচার্যের মতো মহামহিম বিদ্বান ধর্মবোধ হারিয়ে শিক্ষার্থী শিষ্যদেরকে গোধন অপহরণ করতে পাঠিয়েছিলেন। আসলে, তিনি ব্যক্তিগত প্রতিশোধস্পৃহার মধ্যে জড়িয়ে দেন নিজের ছাত্রদের, যা ছিল নিতান্তই অন্যায়। একইভাবে ভীষ্মদেব ন্যায় প্রতিষ্ঠা অপেক্ষা গুরুত্ব দিয়েছিলেন তাঁর প্রতিজ্ঞাকে, যে প্রতিজ্ঞা জগৎ-সংসারের কোনও মঙ্গল করেনি। বরং ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছিল। ভুল করেছিলেন কর্ণও। নিজের অভিমান, ক্ষোভ এবং মিত্রতার দায়বদ্ধতাকে ধর্ম বিবেচনা করে তিনি ন্যায়ের পক্ষ নিতে ভুল করেন। অর্থাৎ এখানে স্পষ্ট যে, ধর্ম কাকে বলে বা ন্যায় কাকে বলে— এ সম্পর্কে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের নায়কদের সম্যক ধারণা ছিল না। নিজ নিজ ক্ষোভ ও দায়বদ্ধতার জায়গাটিকে তাঁরা ধর্ম বলে ভুল করেন। জগৎ-সংসারের বৃহত্তর ধর্মের সন্ধান তাঁদের অজানা ছিল। শ্রীকৃষ্ণ যখন হস্তিনাপুর রাজদরবারে এসে দুর্যোধনের অধর্মগুলিকে চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন, তখনও তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারেননি। দুর্যোধন বলেছিলেন, ‘আমি বিশেষরূপে অনুসন্ধান করিয়া আপনার অণুমাত্রও অপরাধ ও অন্যায়াচরণ দেখিতে পাই না; তথাপি তোমরা সকলে নিয়ত আমার প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করিতেছ।’ পাঁচ ভাইয়ের জন্য পাঁচটি মাত্র গ্রাম ভিক্ষা চেয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু তার জবাবে দুর্যোধন বলেছিলেন, ‘আমি বেঁচে থাকিতে পাণ্ডবগণ কদাপি তাহা প্রাপ্ত হইবে না। অধিক কি সুতীক্ষ্ণ সূচীর অগ্রভাগ দ্বারা যে পরিমাণে ভূমিভাগ বিদ্ধ করা যায়, পাণ্ডবগণকে তাহাও প্রদান করিব না।’
অবশ্য এমন নয় যে, যুধিষ্ঠির, ভীমাদি পাঁচ ভাই সকলেই খুব ধার্মিক ছিলেন বা ধর্মজ্ঞানী ছিলেন। তেমন ধর্মজ্ঞানী হলে নিজের স্ত্রী দ্রৌপদীকে কখনও পাশা খেলায় বাজি ধরতে পারতেন না যুধিষ্ঠির। আরও অনেক বিষয় আছে। দোষে-গুণেই মানুষ। সে সব না-ই বললাম। কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে, যুদ্ধের যে কারণ, সেখানে ন্যায় এবং অন্যায় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ছিল। সেইটিই আসল। এক্ষেত্রে অন্যায়ের পক্ষ ছিলেন কৌরবেরা এবং ন্যায়ের পক্ষ ছিলেন পাণ্ডবেরা। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন সেই ন্যায়ের মূর্ত রূপ। যুদ্ধের প্রতিটি পদে তিনি ন্যায় এবং যুক্তির পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। চিনিয়ে দিয়েছিলেন অন্যায় কাকে বলে, অযুক্তি কাকে বলে। সেই হিসেবে শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কোনও মূর্ত চরিত্র নন। চর্মচক্ষে তাঁর থাকা এবং না থাকা সমান। কিন্তু তিনি ছিলেন স্বয়ং কর্মফল অথবা স্বয়ং ন্যায়। তিনি কোনও অস্ত্রধারণও করেননি, যুদ্ধও করেননি; কিন্তু যুদ্ধের প্রতিটি পর্বের ফলাফল তাঁর নির্ধারিত প্রাকৃতিক নিয়মেই রচিত হয়েছিল। দুর্যোধনের বিশ্বাস ছিল, ভীষ্মের মতো মহাশক্তি, দ্রোণের মতো অস্ত্রগুরু এবং কর্ণের মতো ধনুর্ধর যে পক্ষে আছে, সে পক্ষ অপরাজেয়। ভীমার্জুনের সাধ্য নেই তাঁদের পরাজিত করে। তাছাড়া অস্ত্রহীন শ্রীকৃষ্ণকে তিনি কোনও শক্তি হিসেবে বিবেচনাই করেননি। কারণ ন্যায়ের শক্তি বা সত্যের শক্তি সম্পর্কে তাঁর কোনও ধারণাই ছিল না। ব্যক্তিগত অহং-এর বশবর্তী হয়ে নিজেই ধর্মযুদ্ধের ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মে তা কখনও সম্ভব নয়। তাই আঠারো দিনের যুদ্ধশেষে অমিতশক্তি কৌরবপক্ষের প্রতিটি বীর পরাজিত এবং নিহত হয়েছিলেন। জয়ী হয়েছিল ন্যায় এবং সত্য। উল্লেখ্য, এই জয় কিন্তু আপাত জয়লাভ নয়। এ হল জগৎ-সংসারের উপসংহার, শেষ পর্যন্ত যা সত্য হয়ে উঠেছে।
আলোচনাটি এইখান থেকে সমসময়ের মাটিতে নিয়ে আসা যায়। প্রশ্ন হল, তা হলে আজকের মহাভারত যে ধর্মযুদ্ধে নেমেছে সেটি কী ধরনের যুদ্ধ? এটি কি ধর্ম প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ, না কি অধর্ম প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ? এটি কি ন্যায় প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ, না কি অন্যায় প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ? মহাভারতে কিন্তু হিন্দুধর্ম প্রতিষ্ঠা, সনাতন ধর্ম প্রতিষ্ঠা— এইসব কিছু ছিল না। সেখানে দু’টি মাত্র ধর্ম— ন্যায় এবং অন্যায়। তা হলে আমরা যে এখন হিন্দু-মুসলমান নিয়ে পড়েছি, একদল আর এক দলের বিরুদ্ধে নিরন্তর বিষোদ্গার করে চলেছি, এইগুলি কোন ধর্ম? না, কুরুক্ষেত্রের মতো রক্তাক্ত যুদ্ধ হচ্ছে না বটে, কিন্তু বিশ্বব্যাপী সোস্যাল মিডিয়া প্রতিদিন যেভাবে প্রান্তবাসী মানুষের হৃদয়বৃন্তকে রক্তাক্ত করে চলেছে, যাতে নিরন্তর অপমানিত হচ্ছে মানবতা, নিপীড়িত হচ্ছে নিরীহ শিশু-কিশোরের চেতনা, সেটি কুরুক্ষেত্র অপেক্ষা কম কীসে? প্রশ্ন হল ক্ষমতার অহংকারে এই যে সম্প্রদায়ের নামে মানবতার অপমান, এটি কি ধর্ম? এটি কি ন্যায়?
এই প্রসঙ্গে একটি অত্যন্ত বাস্তব ঘটনা উল্লেখ করি। শিক্ষকতার পেশায় যুক্ত থাকার সুবাদে কিছুদিন আগে একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। অষ্টম শ্রেণির কয়েকজন ছাত্র ক্লাসের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভাগাভাগি করে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তার সবটা এখানে তুলে ধরা অশোভন হবে। কিন্তু যেটুকু বলার মতো সেটি হল, একটি ভিনধর্মী ছেলেকে তার সহপাঠীরা এতটাই অপমান করেছিল যে, আতঙ্কে রাতে ঘুমাতে পারত না সে। শিক্ষকরাও সে ঘটনার সুবিচার করতে পারেননি। বাধ্য হয়ে ওর পিতা ছেলেটির পড়া ছাড়িয়ে দিয়েছেন। প্রশ্ন হল, ন্যায়ের প্রশ্নে, ধর্মের প্রশ্নে, মানবতার প্রশ্নে এই ঘটনার দায় কাদের বলে মনে হয়? এই যে সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন শতমুখে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, এই যে ফেসবুক জুড়ে বিশেষ সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করে সম্মানীয় নেতা-মন্ত্রীদের কুৎসিত ইঙ্গিত, হিংসার প্রদর্শনী— এর প্রতিক্রিয়া কোথায় গিয়ে ঠেকে তাঁরা কি জানেন? পাড়ায় পাড়ায়, রকের আড্ডায়, ক্লাবের আড্ডায়— সর্বত্র বয়োজ্যেষ্ঠদের নির্বোধ অসংযত উচ্চারণ কোন শিশুর হৃদয়ে কেমন ভাবে প্রোথিত হয় তাঁরা কি জানেন? ভেবে দেখেছেন কি এই বিদ্বেষিতার মধ্যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আগামী প্রজন্ম?
সত্যি কথা হল আজকে যাকে ধর্ম বলা হচ্ছে, সেখানে বিন্দুমাত্র ধর্ম নেই। পুরোটাই অধর্ম। বহিরঙ্গের ধর্মীয় চিহ্নকে যেখানে ধর্ম বলে চিহ্নিত করা হয়, তিলকধারী কিংবা ফেজটুপিধারীকে যেখানে মহাধার্মিক বলে মনে করা হয়, সেখানে অন্তরের ধর্ম বা প্রকৃত ধর্ম গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। আজকের ধর্মাচরণ সেই গুরুত্বহীনতায় গিয়ে ঠেকেছে। দেখনদারিটাই এখানে আসল হয়ে উঠেছে। ন্যায়ধর্ম, মানবতার ধর্ম এখানে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। একটি সম্প্রদায়কে ‘লুঙ্গিবাহিনী’ বলার মধ্যে যে বিদ্বেষিতা প্রকাশিত হয়, রোহিঙ্গা বলে দাগিয়ে দেওয়ার মধ্যে যে উদ্দেশ্য প্রকটিত হয়, সেখানে কোনও ধর্ম থাকতে পারে না। এ হল ক্ষমতালাভের সহজ সমীকরণ, যেখানে প্রকৃত ধর্মের প্রতি কোনও দায়বদ্ধতা নেই। তাই আমরা দেখছি, সীমান্তের উন্মুক্ত আকাশের নিচে নিষ্ঠুরভাবে কিছু মানুষকে বসিয়ে রাখা হয়েছে বিদেশি হওয়ার অজুহাতে। এটি মানবতার অপমান, কোনও ধর্ম নেই এখানে। রাজধর্ম আর মানবধর্ম ভিন্ন কোনও বিষয় তো নয়। পৃথিবীর মাটিতে জন্মগ্রহণ করে যদি আমার আচরণের জন্য বা আপনার আচরণের জন্য একটি মানুষও তার জীবন-যাপন থেকে বঞ্চিত হয়— সেটি অবশ্যই অধর্ম। হ্যাঁ, সীমান্তের প্রতিরক্ষক শাসক; কিন্তু মানবতাকে অতিক্রম করে কোনও শাসক সেখানে অন্যায়বিধান করতে পারেন না। বেঁচে থাকার অধিকার সবারই আছে। বিকল্প মানবিক আচরণ অবশ্যই করা যায়।
আমাদের শাস্ত্রকাহিনিতে বহিরঙ্গের ধর্মীয় চিহ্নকে যাঁরা প্রবল করে তোলেন এবং অন্তর্লোকের ধর্মকে নির্বাপিত করে রাখেন তাঁরা রাক্ষস অথবা দানব নামে চিহ্নিত। রাবণ, মহীরাবণ, ময়দানব, হিরণ্যকশ্যিপু, কংস, মহিষাসুর, রাহু, কেতু প্রমুখ সেই অপশক্তি। অন্যদিকে অন্তর্লোকের ধর্মকে যাঁরা জাগ্রত করে তোলেন এবং অন্তরের আলোতে বহিরঙ্গকে দেদীপ্যমান করেন তাঁরা দেবতা অথবা মহর্ষি। এই দানব এবং দেবতাদের মতাদর্শগত সংঘাত চলছে নিরন্তর। যাকে সমুদ্রমন্থন কাহিনির সঙ্গে তুলনা করা যায়। জগৎ-সংসারের ভাল এবং মন্দ, ন্যায় এবং অন্যায়ের বোধ নিয়েই এই সংঘাত। মৈনাক পর্বত হল এখানে স্থবির জগৎ কিংবা অনন্ত সময়, যা নৈর্ব্যক্তিক। অন্যদিকে চেতনার প্রবাহ বা জ্ঞান হল বাসুকি নাগ। যাকে নিয়ে চলছে নিরন্তর টানাটানি। ‘অন্তর ও বাহিরের’ লড়াই। বহিরঙ্গের বৈভব নিয়ে যাঁদের অহঙ্কার তাঁরা প্রবল হয়ে উঠতে চান বাইরেই। তাই তাঁদের সাধনা হয় ভোগ, যার সঙ্গে বিষের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। অন্যদিকে অন্তর্লোকের বৈভব নিয়ে যাঁদের সাধনা, তাঁরাই পান করেন অমৃত, অমরত্ব লাভ করেন যুগ থেকে যুগান্তরে। আমরা এখানে দ্বন্দ্ববাদের তত্ত্বটি হাজির করেও তুলনা টানতে পারি। থিসিস (Thesis) এবং অ্যান্টি-থিসিস (Anti-thesis)-এর সংঘাত, যা নিরন্তর চলছে, যা থেকে উৎপন্ন হচ্ছে সিন্থেসিস (Synthesis)। অর্থাৎ প্রতিটি যুগের শেষপর্বে সিন্থেসিস বা অমৃতের সন্ধান মেলে। এই অমৃত যাঁরা পান করতে পারেন তাঁরা হন অমর, যুগ পেরিয়ে গেলেও তাঁদের মৃত্যু হয় না। কিন্তু যাঁরা সময়ের বুকে ভোগবাদের সন্তুষ্টি নিয়ে বিষয়বিষে আবিষ্ট হন, ক্ষমতার মোহে আবিষ্ট থাকেন, যুগ শেষ হলে তাঁদের আর কোনও চিহ্ন থাকে না।
ধর্ম এবং অধর্ম নিয়ে সেই সমুদ্রমন্থন পর্বে আজ বোধহয় আবার আমরা দাঁড়িয়ে পড়েছি। একদিকে অন্তর্লোকের আলোড়নশূন্য, বহিরঙ্গের আড়ম্বর নিয়ে দুর্যোধনের মতো রাজশক্তি বলছেন বিদ্বেষই ধর্ম, অন্যদিকে তার বিপরীতে কতিপয় মানুষ মানবতার দাবি নিয়ে, ন্যায়ের দাবি নিয়ে বলছেন, সবার উপরে মানুষ সত্য। কতদিনে এই দ্বন্দ্ব মিটবে, সত্য এবং ন্যায় আবার জাগ্রত হয়ে উঠবে, আমরা তাকিয়ে আছি সেই দিকেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight + 13 =

Recent Posts

রাধাবল্লভ রায়

ধর্মযুদ্ধ

এই যে সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন শতমুখে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, এই যে ফেসবুক জুড়ে বিশেষ সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করে সম্মানীয় নেতা-মন্ত্রীদের কুৎসিত ইঙ্গিত, হিংসার প্রদর্শনী— এর প্রতিক্রিয়া কোথায় গিয়ে ঠেকে তাঁরা কি জানেন? পাড়ায় পাড়ায়, রকের আড্ডায়, ক্লাবের আড্ডায়— সর্বত্র বয়োজ্যেষ্ঠদের নির্বোধ অসংযত উচ্চারণ কোন শিশুর হৃদয়ে কেমন ভাবে প্রোথিত হয় তাঁরা কি জানেন? ভেবে দেখেছেন কি এই বিদ্বেষিতার মধ্যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আগামী প্রজন্ম?

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

চেতনার বিবর্তন ও ঈশ্বরের নৃবিজ্ঞান

মানুষের অজ্ঞানতা ও ভুলের গর্ভেই ঈশ্বরের জন্ম হয়েছিল; আর মানুষের জ্ঞান ও সভ্যতার ঐতিহাসিক অগ্রগতিই একদিন ঈশ্বরের কবরে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে। জ্ঞানতাত্ত্বিক আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান তাত্ত্বিকভাবে বিনাশ করবে অলৌকিক সৃষ্টিকর্তার ধারণা, আর সম্পদের সুষম বণ্টন ও সাম্যবাদ (Communism) বিলুপ্ত করবে প্রাচীন টোটেমীয় কুসংস্কারকে। একদিন ধর্মের এই অন্ধ খোলস ভেদ করে স্থান করে নেবে উচ্চতর গণিত, আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্ব এবং বিজ্ঞানসম্মত মানবিক কর্তব্যবোধ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »