Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

অ্যাডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডোর ধ্রুপদী অর্থনীতিকে বিশ্লেষণ করে কার্ল মার্ক্স প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কয়েক দশক আগেই ‘উদ্বৃত্ত-মূল্য তত্ত্ব’ উন্মোচন করেছিলেন। মার্ক্স দেখিয়েছিলেন যে, মানবসভ্যতার গত কয়েক হাজার বছরের মৌলিক চাহিদার অভাবগুলো আসলে সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানাভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর মৃত্যুর পর এই তাত্ত্বিক মানদণ্ডেই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বর্তমান প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হল— উদ্বৃত্ত-মূল্য রক্ষার শর্ত এবং আধুনিক বৈশ্বিক উৎপাদন পদ্ধতির রসায়ন বিশ্লেষণ করে এটি দেখানো যে, আজকের ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ উন্মাদনা মূলত আসন্ন এক বৈশ্বিক সংঘাত বা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধেরই অর্থনৈতিক অংশমাত্র।

আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের নেপথ্যে থাকে পুঁজিপতিদের বিভিন্ন জোটের পারস্পরিক সংঘাত। এই সংঘাতের মূলে রয়েছে পুঁজি রক্ষার তাড়না। পুঁজি টিকে থাকার প্রধান শর্ত দুটি: পুনরুৎপাদন ও সঞ্চালন। উৎপাদিত পণ্য যদি বাজারে বিক্রি বা সঞ্চালিত না হতে পারে, তবে পুঁজির বৃদ্ধি থমকে যায় এবং উৎপাদন খরচও বৃথা যায়। বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাজারে পণ্যের পাহাড় জমেছে কিন্তু সাধারণ মানুষের তা ক্রয়ের সামর্থ্য নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রভাবে একদিকে উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে বিপুল হারে শ্রমিক ছাঁটাই ও বেকারত্ব তৈরি হচ্ছে। ফলে এক অদ্ভুত সংকট সৃষ্টি হয়েছে— পণ্যের উৎপাদন অঢেল, কিন্তু যথেষ্ট বাজার সঞ্চালন নেই।

এই ‘অতি-উৎপাদন’ ও সঞ্চালন সংকটের মুহূর্তে পুঁজির মালিকদের কাছে যুদ্ধ একটি অনিবার্য বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধের মাধ্যমে মূলত বিশ্বকে একটি কসাইখানায় পরিণত করা হয়। লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে বলিদানের মাধ্যমে শ্রমশক্তির জোগান কমিয়ে দেওয়া হয় এবং সরাসরি পণ্য ও অবকাঠামো ধ্বংস করে বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। যখন বিশ্ববাজার পণ্যশূন্য হয়ে পড়ে, তখন যুদ্ধে বিজয়ী শক্তিগুলো তাদের অবিক্রীত পণ্য সঞ্চালন ও পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে নিজেদের পুঁজি রক্ষার নতুন সুযোগ পায়। আজকের যুদ্ধ-অর্থনীতির সারকথা হল— বুর্জোয়া যুদ্ধ মূলত পণ্যের সঞ্চালন সংকটের বিরুদ্ধে পুঁজির মালিকদের এক আত্মঘাতী প্রচেষ্টা।

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এই কন্টেন্ট ক্রিয়েশন-প্রিয়তা কেবল কোনও ব্যক্তিগত হিরোইজমের ফল নয়; বরং এটি একটি গভীর অর্থনৈতিক মন্দা এবং সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাতছানি। আমরা যদি সজাগ দৃষ্টিতে তাকাই, তবে দেখব জনপ্রিয় অ্যাপগুলো এখন বৃহৎ কর্পোরেটদের নিয়ন্ত্রণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সচেতনভাবেই রাজনৈতিক বা একাডেমিক অ্যাকাউন্টগুলোকে দমিয়ে রেখে বাণিজ্যিক বা বিনোদনমূলক কন্টেন্টকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এমনকি জ্ঞানচর্চাও আজ বিজ্ঞাপনের আড়ালে তার আপন সত্তা হারিয়ে ফেলছে।

যদি একটি বিশ্বযুদ্ধ সত্যিই আগের যুদ্ধগুলোর মতো ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তবে এই পেশাগুলোর ওপর তার চরম প্রভাব পড়বে। যুদ্ধের ফলে যখন পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে, তখন বিজ্ঞাপনের প্রয়োজনীয়তা উবে যাবে। ফলে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা মিডিয়া হাউজ ও ক্রিয়েটরদের সুসময়ও থমকে যাবে। তবে এই বিশ্লেষণে আমাদের হতাশ হওয়ার অবকাশ নেই। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় উৎপাদন পদ্ধতি বৈশ্বিক এবং প্রতিটি জাতি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এই আন্তঃনির্ভরশীলতা আমাদের সামনে নতুন আশাবাদের পথও খুলে দেয়।

পরিশেষে, আমাদের এই আলোচনা কয়েক কোটি মানুষের রক্ত ও ক্ষুধার্ত মানুষের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ওপর দাঁড়িয়ে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে— পুঁজি রক্ষার জন্য কি মানুষ-হত্যা জায়েজ, নাকি মানুষ-রক্ষার জন্য পুঁজির প্রাচীন রীতিনীতি বিসর্জন দেওয়া কাম্য? আমরা প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক হয়েছি, আমাদের উৎপাদন যন্ত্র আধুনিক হয়েছে; কেবল আমাদের বণ্টন ব্যবস্থাটি আজও সেকেলে রয়ে গেছে। এই অসামঞ্জস্য কাটিয়ে একটি মুক্ত ও বৈষম্যহীন বিশ্ব নির্মাণ করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। আমাদের বুঝতে হবে, আজকের কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের এই জোয়ার মূলত এক বিপর্যয়কর বৈশ্বিক যুদ্ধ-অর্থনীতির একটি অংশমাত্র। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত পুঁজির দাসত্ব নয়, বরং মানুষের মুক্তির আর্ট অফ কমিউনিকেশন আয়ত্ত করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + seventeen =

Recent Posts

কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বঙ্গের প্রথম নারীকবি চন্দ্রাবতী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধ: অন্ধকারে আলোর দিশারী

তিনি বলেন গেছেন, হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না, তাকে জয় করতে প্রেম ও ভালবাসা দিয়ে। মৈত্রী ও করুণা— এই দুটি ছিল তাঁর আয়ুধ, মানুষের প্রতি ভালবাসার, সহযোগিতার, বিশ্বপ্রেমের। তাই তো তাঁর অহিংসার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে,— চীন, জাপান, মায়ানমার, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানে। এই বাংলায় যে পালযুগ, তা চিহ্নিত হয়ে আছে বৌদ্ধযুগ-রূপে। সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে সমগ্র বাংলা বুদ্ধ-অনুশাসিত ছিল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধ কবিদের দ্বারাই রচিত হয়েছে।

Read More »