নারী দেশে দেশে যুগে যুগে মহিমময়তার স্বরলিপি। প্রাচীন ভারতে যে বেদ রচিত হয়েছিল, সেখানে অন্তত ২৭ জন নারী-প্রণেতার নাম পাওয়া গিয়েছে,— সূর্যা, বাক, সাবিত্রী, ঘোষা, অপালা, অদিতি। তাঁদের কেউ ঋষিকন্যা, কেউ বা আবার ঋষিপত্নী। কুমারী-ও। শুধু তাই নয়, গার্গী ও যাজ্ঞবল্ক্যের সঙ্গে প্রকাশ্যসভায় যে বিতর্কের বর্ণনা বৃহদারণ্যক উপনিষদে পাই, তা প্রমাণ করে, সে-যুগে নারীর বিদ্যাবত্তা— বিদুষিতা প্রশ্নাতীত ছিল যেমন, তেমনই সামাজিক মর্যাদা ছিল পুরুষের সমান। এই যাজ্ঞবল্ক্যের স্ত্রী মৈত্রেয়ীর একটি হৃদ্গত উপলব্ধির সারাৎসার তো চিরকালীন বার্তাই বয়ে আনে,— ‘যেনাহং নামৃতা স্যাম্, কিমহম্ তেন কুর্যাম্?’— যা আমাকে অমৃতত্ব দেবে না, তা নিয়ে আমি কী করব?
কেবল কি ভারত? প্রাচীন মিশরে নারী-পুরোহিতের প্রতি অবনত হতেন ফারাওরা। আইসিস, হাথর, বা নেইথ-এর মন্দিরে পুজো করা, গান গাওয়া, বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কাজ করতেন তাঁরা। মিশরের ইতিহাসে অন্তত ৭ জন নারী-ফারাওকে রাজত্ব করতে দেখা গেছে। তাঁদের মধ্যে ক্লিওপেট্রার নাম জানি আমরা। ছিলেন রানি হাটসেপসুট-ও। ক্লিওপেট্রা কিন্তু একজন নন, পাঁচজন, এক-ই নামের মিশরের রানি।
রাজ্য পরিচালনায় অতীত কাল থেকে সমসাময়িক অধ্যায় পর্যন্ত শতাধিক নারী-শাসকের কথা জানা যায়। হ্যাঁ, শতাধিক। এঁদের মধ্যে প্রাচীন পারস্যের টমিরিস যেমন আছেন, তেমনই আছেন গ্রীকবীর আলেকজান্ডারের মা অলিম্পিয়াস। পুত্রের মৃত্যুর পর তাঁকে কিছুদিনের জন্য শাসনক্ষমতায় দেখি। আছেন সিরিয়ার রানি সেমিরামিস। দক্ষ যোদ্ধা, সংগঠক ও রূপলাবণ্যে অসামান্যা নবম খ্রিস্টপূর্বের এই রানির কথা হেরোডোটাস লিখে গেছেন। নিকট-অতীতে অস্ট্রিয়ার মারিয়া তেরেসা, রাশিয়ার ক্যাথারিন দ্য গ্রেট, সুইডেনের উলবিকা, স্পেনের ইসাবেলা, আর ব্রিটেনের ভিক্টোরিয়া। রানি প্রথম এলিজাবেথ তো ছিলেন স্বমহিমায় অসাধারণ, অনবদ্য, অনন্য। তাঁর সময়ে নাইজেরিয়া শাসন করতেন আমিনা (১৫৭৬-১৬১০)। পরবর্তীকালে ছিলেন ঘানার ইয়া আসান্তেওয়া, যিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। শেবার রানি বিলকিসের কথা ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে তাঁর প্রজ্ঞা ও সৌন্দর্যের জন্য।
এ তো গেল রানিদের কথা। সাহিত্যের অঙ্গনে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গ্রীসে স্যাফোর মতো কবি জন্মেছেন। মিশরের রানি হাটসেপসুট ও নেফারতিতির কবিতা পাওয়া গেছে। বৌদ্ধ ভিক্ষুণীরা রচনা করেছেন ‘থেরিগাথা’। জাপানের মহিলা মুরাসাকি দশম শতাব্দীতে বিশ্বকে প্রথম উপন্যাস উপহার দেন। মুঘল যুগে আত্মজীবনী লিখেছেন গুলবদন বেগম, জাহানারা; কবিতা লিখেছেন নূরজাহান, জেবউন্নিসা। মীরাবাঈ আর এক অনন্য কবি-গীতিকার। তেমনি বাংলায় চন্দ্রাবতী। প্রাচীন ভারতে তামিল ভাষার কবি আউভাইয়ার ও দেব ভাষার লোপামুদ্রা প্রেমের কবিতা রচনার জন্য বিখ্যাত। ছিলেন শীলা ভট্টারিকা, যাঁর কবিতার মুগ্ধ পাঠক ছিলেন স্বয়ং শ্রীচৈতন্য। আধুনিক বিশ্বে নারীরা বিস্ময়কর প্রতিভার পরিচয় দিচ্ছেন।
বিজ্ঞানের ভুবনেও নারীর বিজয় ঈর্ষণীয়। দু’বার নোবেল পেয়েছেন মারি ক্যুরি। আস্ত একটি গ্রন্থ দাবি করে বিজ্ঞানে নারীদের অবদান পরিমাপ করতে গেলে।
সামান্য একটু বলা যাক। মহাকাশবিজ্ঞান আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, চর্চার দিক থেকে। মহাকাশ-গবেষণায় বহু নারী গুরুত্বপূর্ণ পদে যুক্ত। মহাকাশ পরিক্রমায় যোগ দিয়ে ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা সেই ১৯৬৩-তেই বিস্মিত করেন আমাদের। সাভিৎস্কোয়া, অন্য এক সোভিয়েত নারীও যান, ১৯৮৪-তে। যান মার্কিন মহিলা স্যালি রাইড এবং জুডিথ বেসনিক। এ-পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অন্তত ৪০ জন নারী মহাকাশে গেছেন, যাঁদের মধ্যে সুনীতা উইলিয়ামস তো রেকর্ড সময় ধরে, ন’মাস (২৮৮দিন) মহাকাশে কাটিয়েছেন। তেমনই কল্পনা চাওলা ও আরও কয়েকজনকে মৃত্যূবরণ-ও করতে হয়েছে মহাকাশে!
এ-পর্যন্ত ১২ জন মহাকাশচারী চাঁদে পাড়ি দিলেও কোনও নারীকে সেখানে পাঠানো হয়নি। সেজন্যই কি নাসার সিদ্ধান্ত, চাঁদের পর মহাকাশের যে স্থানে মানুষের পদধূলি পড়বে, সেই মঙ্গলগ্রহে সর্বপ্রথম কোনও পুরুষ নন, যাবেন একজন নারী? উল্লেখ্য, এ যাত্রাটি কিন্তু ওয়ান ওয়ে বা একমুখী। অর্থাৎ তিনি যাবেন, তাঁর ফিরে আসবার কোনও সুযোগ থাকবে না। এই দুরূহ নিয়ম সত্ত্বেও যেতে রাজি আলিসা কারসন, এক মার্কিন মেয়ে, বয়স যাঁর মাত্রই পঁচিশ (জন্ম ১০.০৩.২০০১)। তিনি সেখানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০৩৩-এ রওনা হবেন তিনি। দ্বিতীয় আর একজনের নাম তালিকায় পাচ্ছি, যিনি একজন ভারতীয় শিখ। এবং নারী,— জসলিন কৌর জোসান।
আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।
চিত্রঋণ: জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা প্রচারপত্র







