Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

নারী: এক দৈবী আখর

নারী দেশে দেশে যুগে যুগে মহিমময়তার স্বরলিপি। প্রাচীন ভারতে যে বেদ রচিত হয়েছিল, সেখানে অন্তত ২৭ জন নারী-প্রণেতার নাম পাওয়া গিয়েছে,— সূর্যা, বাক, সাবিত্রী, ঘোষা, অপালা, অদিতি। তাঁদের কেউ ঋষিকন্যা, কেউ বা আবার ঋষিপত্নী। কুমারী-ও। শুধু তাই নয়, গার্গী ও যাজ্ঞবল্ক্যের সঙ্গে প্রকাশ্যসভায় যে বিতর্কের বর্ণনা বৃহদারণ্যক উপনিষদে পাই, তা প্রমাণ করে, সে-যুগে নারীর বিদ্যাবত্তা— বিদুষিতা প্রশ্নাতীত ছিল যেমন, তেমনই সামাজিক মর্যাদা ছিল পুরুষের সমান। এই যাজ্ঞবল্ক্যের স্ত্রী মৈত্রেয়ীর একটি হৃদ্গত উপলব্ধির সারাৎসার তো চিরকালীন বার্তাই বয়ে আনে,— ‘যেনাহং নামৃতা স্যাম্, কিমহম্ তেন কুর্যাম্?’— যা আমাকে অমৃতত্ব দেবে না, তা নিয়ে আমি কী করব?
কেবল কি ভারত? প্রাচীন মিশরে নারী-পুরোহিতের প্রতি অবনত হতেন ফারাওরা। আইসিস, হাথর, বা নেইথ-এর মন্দিরে পুজো করা, গান গাওয়া, বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কাজ করতেন তাঁরা। মিশরের ইতিহাসে অন্তত ৭ জন নারী-ফারাওকে রাজত্ব করতে দেখা গেছে। তাঁদের মধ্যে ক্লিওপেট্রার নাম জানি আমরা। ছিলেন রানি হাটসেপসুট-ও। ক্লিওপেট্রা কিন্তু একজন নন, পাঁচজন, এক-ই নামের মিশরের রানি।
রাজ্য পরিচালনায় অতীত কাল থেকে সমসাময়িক অধ্যায় পর্যন্ত শতাধিক নারী-শাসকের কথা জানা যায়। হ্যাঁ, শতাধিক। এঁদের মধ্যে প্রাচীন পারস্যের টমিরিস যেমন আছেন, তেমনই আছেন গ্রীকবীর আলেকজান্ডারের মা অলিম্পিয়াস। পুত্রের মৃত্যুর পর তাঁকে কিছুদিনের জন্য শাসনক্ষমতায় দেখি। আছেন সিরিয়ার রানি সেমিরামিস। দক্ষ যোদ্ধা, সংগঠক ও রূপলাবণ্যে অসামান্যা নবম খ্রিস্টপূর্বের এই রানির কথা হেরোডোটাস লিখে গেছেন। নিকট-অতীতে অস্ট্রিয়ার মারিয়া তেরেসা, রাশিয়ার ক্যাথারিন দ্য গ্রেট, সুইডেনের উলবিকা, স্পেনের ইসাবেলা, আর ব্রিটেনের ভিক্টোরিয়া। রানি প্রথম এলিজাবেথ তো ছিলেন স্বমহিমায় অসাধারণ, অনবদ্য, অনন্য। তাঁর সময়ে নাইজেরিয়া শাসন করতেন আমিনা (১৫৭৬-১৬১০)। পরবর্তীকালে ছিলেন ঘানার ইয়া আসান্তেওয়া, যিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। শেবার রানি বিলকিসের কথা ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে তাঁর প্রজ্ঞা ও সৌন্দর্যের জন্য।
এ তো গেল রানিদের কথা। সাহিত্যের অঙ্গনে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গ্রীসে স্যাফোর মতো কবি জন্মেছেন। মিশরের রানি হাটসেপসুট ও নেফারতিতির কবিতা পাওয়া গেছে। বৌদ্ধ ভিক্ষুণীরা রচনা করেছেন ‘থেরিগাথা’। জাপানের মহিলা মুরাসাকি দশম শতাব্দীতে বিশ্বকে প্রথম উপন্যাস উপহার দেন। মুঘল যুগে আত্মজীবনী লিখেছেন গুলবদন বেগম, জাহানারা; কবিতা লিখেছেন নূরজাহান, জেবউন্নিসা। মীরাবাঈ আর এক অনন্য কবি-গীতিকার। তেমনি বাংলায় চন্দ্রাবতী। প্রাচীন ভারতে তামিল ভাষার কবি আউভাইয়ার ও দেব ভাষার লোপামুদ্রা প্রেমের কবিতা রচনার জন্য বিখ্যাত। ছিলেন শীলা ভট্টারিকা, যাঁর কবিতার মুগ্ধ পাঠক ছিলেন স্বয়ং শ্রীচৈতন্য। আধুনিক বিশ্বে নারীরা বিস্ময়কর প্রতিভার পরিচয় দিচ্ছেন।
বিজ্ঞানের ভুবনেও নারীর বিজয় ঈর্ষণীয়। দু’বার নোবেল পেয়েছেন মারি ক্যুরি। আস্ত একটি গ্রন্থ দাবি করে বিজ্ঞানে নারীদের অবদান পরিমাপ করতে গেলে।
সামান্য একটু বলা যাক। মহাকাশবিজ্ঞান আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, চর্চার দিক থেকে। মহাকাশ-গবেষণায় বহু নারী গুরুত্বপূর্ণ পদে যুক্ত। মহাকাশ পরিক্রমায় যোগ দিয়ে ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা সেই ১৯৬৩-তেই বিস্মিত করেন আমাদের। সাভিৎস্কোয়া, অন্য এক সোভিয়েত নারীও যান, ১৯৮৪-তে। যান মার্কিন মহিলা স্যালি রাইড এবং জুডিথ বেসনিক। এ-পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অন্তত ৪০ জন নারী মহাকাশে গেছেন, যাঁদের মধ্যে সুনীতা উইলিয়ামস তো রেকর্ড সময় ধরে, ন’মাস (২৮৮দিন) মহাকাশে কাটিয়েছেন। তেমনই কল্পনা চাওলা ও আরও কয়েকজনকে মৃত্যূবরণ-ও করতে হয়েছে মহাকাশে!
এ-পর্যন্ত ১২ জন মহাকাশচারী চাঁদে পাড়ি দিলেও কোনও নারীকে সেখানে পাঠানো হয়নি। সেজন্যই কি নাসার সিদ্ধান্ত, চাঁদের পর মহাকাশের যে স্থানে মানুষের পদধূলি পড়বে, সেই মঙ্গলগ্রহে সর্বপ্রথম কোনও পুরুষ নন, যাবেন একজন নারী? উল্লেখ্য, এ যাত্রাটি কিন্তু ওয়ান ওয়ে বা একমুখী। অর্থাৎ তিনি যাবেন, তাঁর ফিরে আসবার কোনও সুযোগ থাকবে না। এই দুরূহ নিয়ম সত্ত্বেও যেতে রাজি আলিসা কারসন, এক মার্কিন মেয়ে, বয়স যাঁর মাত্রই পঁচিশ (জন্ম ১০.০৩.২০০১)। তিনি সেখানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০৩৩-এ রওনা হবেন তিনি। দ্বিতীয় আর একজনের নাম তালিকায় পাচ্ছি, যিনি একজন ভারতীয় শিখ। এবং নারী,— জসলিন কৌর জোসান।
আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

চিত্রঋণ: জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা প্রচারপত্র

Advertisement

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − 7 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »