Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

শুভদীপ রায়চৌধুরীর ছোটগল্প

সেলফি

১. সেলফি

ফোন বাজছে। সামনে তিনটে মনিটরে নানা জিনিস ফুটে আছে। একদম বামদিকেরটায়, ফেসবুক। তিন-চারটে বার্তা-জানলা খোলা। মাঝেরটায় গান চলছে। ভেলভেট আন্ডারগ্রাউন্ড। ইউটিউবে। ফুটে আছে অ্যান্ডি ওআরহল-এর করা সেই অর্ধেক কালো হয়ে যাওয়া কলার আইকনিক ডিজাইন। ডানদিকেরটায় ফটোশপ। সেখানে একটা মেয়ের সঙ্গে তার ছবি। পেছনে বর্ষাভেজা কলকাতা। সেদিকেই এতক্ষণ ধরে চোখ রেখেছিল ঋত্বিক।
ফোন বেজে ওঠায় আড়চোখে দেখল। স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠেছে, ‘বিক্রম খিল্লিবাজ’। ঠোঁটে একটা মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলেও তার আদতে এই ফোন ওঠানোর কোনও ইচ্ছা ছিল না। কাজ অনেকটা বাকি। আজকাল সোশ্যাল মিডিয়াগুলো এআই-এর ব্যবহারের ব্যাপারে বেশ কঠোর হয়েছে। এ এক আশ্চর্য বিষয়। কারণ অন্যদিকে এরাই আবার নিত্যনতুন এআই মডেল আনছে। তো, সে যাই হোক, এই কঠোরতার কারণে তারা, মানে সে আর ভৈদেহি (নামটা সম্ভবত বৈদেহী, তবে সে কোনওদিন কাউকে ওই নামে ডাকতে শোনেনি), ঠিক করেছিল তাদের নতুন ক্যাম্পেন, ‘পুজো তো পুজো হ্যা ইয়ার’-এর সবক’টা ছবি হাতে এডিট করে দেবে। কয়েকদিন বাদেই ষষ্ঠী। আজ সন্ধের মধ্যে একটা পোস্ট দিতেই হবে। তাদের প্রায় লাখ-দুয়েক ফলোয়ার (এই ক্যাম্পেনের পরে সেটা আড়াই হবে বলে তারা মনে করে) অপেক্ষা করে আছে। এই পরিস্থিতিতে বিক্রমের সঙ্গে কথা বললে কাজ করা সম্ভব না।
কিন্তু এই সবকিছুর মধ্যে বাদ সাধল বিজ্ঞাপন। গোটা অ্যালবামটাই সে চালিয়েছিল, কিন্তু ‘নিকো’-র মায়াবী কণ্ঠে ‘ফেম ফ্যাটাল’ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি বিখ্যাত ভ্রমণ কোম্পানি তাদের অবর্ণনীয় রকমের আকর্ষক তাইল্যান্ড ভ্রমণের কথা প্রবল চিৎকার করে বলতে শুরু করে দিতে, সে, হতাশ হয়ে, ইয়ারবাড খুলে রেখে, তখনও বেজে চলা ফোনটি হাতে তুলে কলটা রিসিভ করে।
‘ড্যুড’, চোদ্দআনা বিরক্তির সঙ্গে দু’আনা উৎসাহ মিশিয়ে সে বলে, ‘তোকে কতবার বলেছি, কাম কে টাইম পে ফোন মত কিয়া কর। বাট ইউ নেভার লিসেন। বল।’ বিক্রম ওপাশ থেকে উত্তরে বলে, ‘তোর কি মনে হয় যে, তুই কখন কাজ করছিস সেটা নিউজ বুলেটিনে আসে? কেন কি, তোর কথা শুনে সেটাই মনে হয়। এনিওয়ে, হোয়াট আর ইউ আপ টু?’
এর পরে দু’জনের কথা চলে প্রায় আরও মিনিট দুয়েক। শেষে ঋত্বিক বলে, ‘ধুর, ওই কলেজস্ট্রিটে যেতে বোর লাগে। তুই যে কেন ওখানেই যেতে চাস সারাক্ষণ কে জানে। বুকস আর বোরিং ইয়ার।’ বিক্রম জবাব দেয়, ‘ওকে, দিস লাস্ট টাইম। নেক্সট তুই যেখানে বলবি উই উইল হ্যাং আউট। আয় না প্লিজ। একা যেতে ইচ্ছা করছে না। তোরও একটা ব্রেক হবে। বাত সহি হ্যা না?’
‘চল। সি ইউ।’ বলে ফোন কেটে, তার হয়ে প্রক্সি দেওয়ার জন্য (কারণ যদি ভৈদেহি ফোন করে এবং বুঝতে পারে সে কাজ করছে না তা হলে বড় ঝামেলা হবে) ‘প্রতিরূপ’ নামক এআই এজেন্টকে কাজে লাগিয়ে দিয়ে, প্রস্তুত হয়ে, ‘নোয়া’ নামের উড়ন্ত ক্যাব সার্ভিস থেকে ক্যাব বুক করে আকাশপথে কলেজস্ট্রিটে পৌঁছাতে পৌঁছাতেও প্রায় ঘণ্টা খানেক লেগে গেল। আকাশেও জ্যাম ইদানীং। সিটি পুলিশরা মাঝে মাঝেই হুটার বাজিয়ে দুরন্ত গতিতে যাচ্ছে। তাদের উড়ুক্কুযানের রং সাদা আর সবুজ। দেখলেই চেনা যায়। নিয়ম অনুযায়ী তাদের পথ ছেড়ে দিতেই হবে। সাঁ করে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তোমার চোখে পড়তে বাধ্য তাদের গায়ে বিরাট আকারে মহান নেতার ছবি ছাপা। হাসি মুখে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। তলায় লেখা ‘দেশের জন্য সব ত্যাগ করা যায়। আমি করেছি।’
কলেজস্ট্রিটকে, বেশ কয়েক বছর আগে, প্রোটেক্টেড জোন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে, সেখানে কিছুই আর বদলানো চলে না। ক্যাব ছেড়ে দিয়ে রাস্তায় নেমে ঋত্বিকের মনে পড়ল কালকে থেকে, শুধু কালকেই বা কেন গত বেশ কয়েকদিন ধরেই, বৃষ্টি হচ্ছে। এই পুরনো রাস্তাগুলোয় জল জমেছে। পায়ের পাতা ভিজে যাচ্ছে জলে। সাবধানে চলতে হচ্ছে। তবে সাবধানতা তো শুধু জলের জন্য নয়। এই জায়গাগুলো থিকথিক করছে অ্যান্টি-সোশ্যাল এলিমেন্টে। মহান নেতা বা তাঁর রাজদরবারের লোকজনকে (সেই সব লোকজন যারা বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত) যেকোনওভাবে বিরক্ত করতে পারলে খুশি হয়। এই যেমন ধরো, ওই যে একটা চায়ের দোকানে যে ছেলেটি আর মেয়েটি দাঁড়িয়ে। ছেলেটির বয়স কত হবে? বড়জোর পঁচিশ। এর মধ্যে চেহারায় কেমন একটা বয়সের ছাপ চলে এসেছে। মেয়েটিও মনেহয় সমবয়সী। কী শ্যাবি ড্রেস! চোখে দেখা যায় না। তার কানে লাগানো ইয়ারপডে ‘অল ক্যাচ’ অপশনটা চালিয়ে দিয়ে সে শুনতে পেল ছেলেটি মেয়েটিকে বলছে,
‘মন মানে না বৃষ্টি হল এত
সমস্ত রাত ডুবো-নদীর পারে
আমি তোমার স্বপ্নে-পাওয়া আঙুল
স্পর্শ করি জলের অধিকারে।’
‘লুকস লাইক একটা প্রেমের কবিতা। তাও ভাল। তবে, এ সব ট্র্যাশ যে এরা কোথায় পায়। মাই গড!’ ভাবতে ভাবতে যখন সে ভাঙাচোরা পুরনো একসার বাড়ি আর শুকিয়ে যাওয়া একটা পুকুরের (এর নাম কখনও ছিল কলেজ স্কয়ার) মাঝখানে, কোনও একজন ওল্ড বেঙ্গলি রাইটারের (বঙ্কিম চ্যাটার্জি?) নামে একটা রাস্তায় ঢুকে পড়তে যাচ্ছে, পেছন থেকে ডাক ভেসে এল, ‘ড্যুড! ঋত্বিক!! রিত-ডিক!!!’
বিক্রমের সঙ্গে দেখা হলে, প্রথমেই যেটা হয় সেটা হল মেয়েদের নিয়ে আলাপ-আলোচনা। গত কয়েক মাসে ওর তিনটে সম্পর্ক সিচুয়েশানশিপ ছাড়িয়ে ইনফ্যাচুয়েশানশিপে ঢুকেছে আর বেরিয়েছে। ওই লেখকের নামওয়ালা রাস্তায় (বঙ্কিম চ্যাটার্জি?) বসে, একটা অতিপ্রাচীন দোকানে সরবত খেতে খেতে, সে বলছিল, ‘আর না। এবার আর না। এসব ভাল লাগে না। আগে শুনতাম ভালবাসা-টাসা বলে কিছু একটা ছিল। আজকাল শালা যেমন আমরা তেমনি ওরা। সব বেকার কা চিজ হ্যা।’ সরবতে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে, একটা আরামের শ্বাস ছেড়ে ঋত্বিক বলে, ‘লুক হিয়ার বিক্রম, তুই কেন শালা সব সময় এত মেয়ে হ্যাংলা আমি বুঝতে পারি না। ডু সামথিং এলস না।’ বিক্রম কেমন যেন উদাস হয়ে যায়। বাইরের ফাঁকা রাস্তার (বঙ্কিম চ্যাটার্জি?) দিকে তাকায়। উল্টোদিকের ফুটপাথে একজন বৃদ্ধ লোক বসে আছেন। সামনে কয়েকটা বই। উনি আসলে কিছু বিক্রি করছেন না। ফুটপাথে দোকান দেওয়া বেআইনি। ওটা ‘সেলফি-পয়েন্ট’। অনেকেই ওল্ড-ওয়ার্ল্ড ভাইবের জন্য ওখানে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে। সেই দিকে দেখতে দেখতে বিক্রম বলে, ‘হে। লেটস গো। এক সেলফি লেতে হ্যা।’
ঋত্বিকের এই ধরনের সেলফি ভাল লাগে না। তবু বিক্রমের চাপাচাপিতে যেতেই হয়।
মানুষটা বৃদ্ধ। পরনে, অনেক আগে যেমন হত, ছেঁড়া, তালি মারা একটা কুর্তা গোছের জিনিস। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। সামনে, একটা প্লাস্টিকে (এটা বেআইনি নয়), কয়েকটা বই ছড়ানো। প্রায় সবগুলোই মহান নেতা অথবা তাঁর রাজদরবারের কারও লেখা। দারুণ সব নাম আর কভার ডিজাইন তাদের। একটা ড্রাগন উড়ে যাচ্ছে একটা চক্রের আঘাতে, নাম? ‘ড্রাগনবীর দামোদর’। একটা বিরাট বড় রথে, একজন প্রচণ্ড পেশিবহুল, ফর্সা ধবধবে লোক বসে আছে যার সামনে আর একজন একই রকম লোক দাঁড়িয়ে, নাম? ‘রথের রথীন’। এইরকম।
তারা গিয়ে দাঁড়াতে বৃদ্ধ পাশে রাখা রেট-চার্টের দিকে নিঃশব্দে আঙুল দেখায়। তাতে লেখা, ‘নর্ম্যাল সেলফি – ৫০০০, স্পেশাল সেলফি – ৭০০০’। ঋত্বিক কৌতূহল বোধ করে। প্রশ্ন করে, ‘স্পেশাল সেলফিটা কী?’ বৃদ্ধ উত্তরে যা বলেন, তাঁর শ্লেষ্মাজড়িত কণ্ঠস্বরে যা শুনতে তাদেরকে রাস্তায় প্রায় বসে পড়তে হয় (ভাবা যায়!), তার মানে করলে দাঁড়ায় যে— স্পেশাল সেলফি হল এই বইগুলো ছাড়া অন্য বইয়ের সঙ্গে নেওয়া সেলফি। সেগুলো ওপরে রাখা নেই।
বিষয়টায় রহস্যের গন্ধ পেয়ে ঋত্বিক বলে, ‘ইফ উই টেক সেলফি দেন লেটস টেক আ স্পেশাল ওয়ান। হোয়াট সে?’
বৃদ্ধ কোনও কথা না বলে প্লাস্টিকের তলায় হাত ঢুকিয়ে একটি বই বার করে আনেন। অনেক অনেক পুরনো বই। পাতাগুলো হলুদ হয়ে তারপরে মরচের রং ধারণ করছে। লেখাগুলো ঝাপসা অনেক জায়গায়। চটি বই। খুব মোটা নয়। সবচেয়ে বড় কথা, বইটার সেই অর্থে কোন মলাট নেই। সম্ভবত ছিঁড়ে, হারিয়ে গেছে। বইটা হাতে তুলে দেখে ঋত্বিক। বিক্রম পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সেও দেখছে। মরচে-হলুদ পাতায়, ঝাপসা অক্ষরে, তিনটে জিনিস লেখা। একদম নিচে লেখা যেটা, সেটা সম্ভবত এই বইয়ের প্রকাশকের নাম। তার ওপরে, পাতার মাঝামাঝি লেখকের নাম, ‘সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর’। আর একদম ওপরে লেখা বইয়ের নাম, ‘লেনিন’।
‘উই বংস হ্যাভ অলওয়েজ হ্যাড কুল সারনেমস। না?’ জিজ্ঞাসা করে বিক্রম। বইটা বুকে চেপে ধরে, ফোনের সেলফি ক্যামেরাটা তাক করতে করতে ঋত্বিক জবাব দেয়, ‘‘অল দোজ ঠাকুরস নেভার সেইড— ‘ইয়ে হাত মুঝে দে দে’।”
খিচিক।
বই বুকে চেপে প্রথম সেলফিটা ওঠে। সঙ্গে সঙ্গেই সে পোস্ট করে, #বুকস #বেস্টটাইমস #ফিলিংনস্টালজিক #বংস #কলেজস্ট্রীট #বিআরেবেল
তারপরে বইটা হাতে ধরে হাত বাড়িয়ে দেয় সামনে। শুধু বইটার একটা ছবি পোস্ট করা দরকার। #ওল্ডটাইমস #বুকগ্রাম #লেনিন
খিচিক।

২. সর্বনাশ

‘মানে?’ বড় ডিটেকটিভ প্রশ্ন করে। ‘হ্যাঁ। মানে?’ মেজ টিকটিকি সেই কথাটা রিলে করে। ‘মানে আমি কী জানি। আজ দুপুর থেকে এই পোস্টটা ভাইরাল। মানে-ফানে জানতে গেলে বেশি পয়সা দিয়ে লোক পুষুন। আমার কাজ জানানো। জানিয়ে গেলাম।’ দাঁত খিচিয়ে বলে ছোট খোঁচড় বিদায় নিল।
বড় ডিটেকটিভ নিজের সামনে টেবিলে রাখা ল্যাপটপটা খুলতে খুলতে বিড়বিড় করে, ‘শালা পয়সা থাকলে তোমাকে বিদায় করে একটা ভাল এআই এজেন্ট পুষতাম। কাজের কাজ কিছু নেই দিনরাত শুধু…।’
মেজ টিকটিকি কানে একটা ইয়ারবাড ঢুকিয়ে কান খোঁচাচ্ছিল। অসাবধানে গুঁতো লেগে যায়। সে বিরক্তির মুখভঙ্গি করে ইয়ারবাডটা ফেলে দিয়ে বড় ডিটেকটিভকে প্রশ্ন করে, ‘পেলেন কিছু স্যার?’
বড় ডিটেকটিভ তাকে ভেঙিয়ে বলে ওঠে, ‘পেলেন কিছু স্যার? পেলেন কিছু স্যার? আরে দেখছ না এইমাত্র খুললাম। মান্ধাতার আমলের জিনিস। সময় লাগবে তো। নাকি?’
মেজ টিকটিকি ঘাড় নেড়ে অম্লান মুখে সায় দিয়ে পকেট থেকে ফের একটা ইয়ারবাড বার করে কান খোঁচাতে শুরু করে। বড় ডিটেকটিভ ঝুঁকে আসে কম্পিউটার স্ক্রিনের ওপরে।
একটু বাদেই তিনি ভয় ও বিস্ময়ে একটা চাপা শীৎকার দিয়ে ওঠেন, ‘হি ইজ রাইট। দিস ইজ বিগ।’ বলে তিনি মুখ তুলে তাকান। মেজ টিকটিকি একমনে তাঁর দিকে চেয়ে। ছোট্ট, বদ্ধ ঘরটার বাতাস ভারী। দেওয়ালের ফিকে হয়ে যাওয়া হলুদ রং আর তার ওপরে ঝোলানো প্রমাণ সাইজের মহান নেতার ছবি দুটোই অস্পষ্ট লাগছে। তিনি আসলে দেখতে পাচ্ছেন একটা সুসজ্জিত কক্ষ। মৃদু, ঢিমে লয়ের সঙ্গীত ভেসে আসছে কোথাও থেকে। সারি সারি সুসজ্জিত চেয়ার। তাতে সুসজ্জিত মানুষ বসে। তার মধ্যে তিনিও আছেন। আর তাঁর স্ত্রী। সামনে একটা অনুচ্চ মঞ্চের মতো। সেখানে উর্দি পরা একজন দাঁড়িয়ে মাইকে ঘোষণা করছেন, ‘এ বছরের, উত্থান দমন মেডেল পাচ্ছেন…’।
ওই তো তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। ওই তো তাঁর স্ত্রী হাসি হাসি মুখে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর গালে একটা ছোট্ট চুমু এঁকে দিলেন। ওই তো তিনি তাঁর র‍্যো থেকে বেরিয়ে দুসারি চেয়ারের ভেতর দিয়ে ধীরে কিন্তু শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে হেঁটে চলেছেন মঞ্চের দিকে। চারিপাশে হাততালি, কোলিগদের চোরা ঈর্ষার দৃষ্টি। ওই তো কে যেন জোর শব্দ করে বাতকম্ম করে দিল! পাদল? হ্যাঁ, পাদল!
বিরক্ত মুখে তিনি মেজ টিকটিকির দিকে চেয়ে বললেন, ‘দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান খোঁচালে তো চলবে না। আসুন বেরতে হবে।’ এই বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। দু’হাতে টেনে, লুজ হয়ে যাওয়া প্যান্ট তুলে নিয়ে, মেজ টিকটিকিকে সঙ্গে করে ঘর থেকে দ্রুত বেরলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সেপাইকে গাড়ি আর লোকের ব্যাপারে নির্দেশ দিয়ে সাবধানি কিন্তু কর্তৃত্বব্যঞ্জক পদক্ষেপে হেঁটে গেলেন ডিপার্টমেন্টের বাইরের দিকে। আজ তাঁর পয়া দিন। এত বড় মাছ অনেকদিন জালে পড়েনি।

অকুস্থল থেকে একটু দূরেই গাড়িটা পার্ক করলেন তাঁরা। যার এত সাহস তার ক্ষেত্রে কোনও হঠকারিতা করা ঠিক না। গাড়ির বাইরে বেরিয়ে ধীরে হাঁটতে লাগলেন। চারপাশে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন। এটা শহরতলির একটা জায়গা। ‘সেটাই স্বাভাবিক’, তিনি ভাবলেন, ‘শহরে বাড়ি কেনা বা ভাড়া করার মতো পয়সা এই মালগুলোর নেই।’
চারপাশে মূলত নিম্নবিত্ত আর নিম্ন-মধ্যবিত্তের বাস। সব বাড়িরই দরজা বন্ধ। রাস্তায় লোকজন নেই। রাত দশটার পরে বিশেষ অনুমতি ছাড়া কারও থাকার কথাও নয়। ‘এদের কারও কাছে পাস নেই। শালা বাচ্চা বিয়োতে গেলে বা মারা গেলেও, নিজের ঘরে। দেশের জন্য সব ত্যাগ করা যায়। মহান নেতা করেছেন। শালা অকৃতজ্ঞের দল।’ ভাবতে ভাবতে তাঁর চোখ পড়ে গেল আকাশে, ‘আরেএএএ, আজ পূর্ণিমা। বউটা আবার উপোস করেছে কি না কে জানে।’
বাড়িটা আরও কাছে চলে এসেছে। বড় ডিটেকটিভ হাত তুলে ইশারা করলেন। পেছনে যে জনা সাতেক তাঁকে ফলো করছিল তারা মুহূর্তের মধ্যে তাদের কব্জিতে বাঁধা ঘড়ির মতো একটি যন্ত্রে মৃদু একটা চঞ্চলতা অনুভব করে নিজেদের পদক্ষেপ আরও সংযত করে নিল। অন্ধকার এখানে গাঢ়। অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামের মতো গড়িয়ে যাচ্ছে চারপাশে। হঠাৎ কেউ দেশলাই ঠুকে দিলে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে এই প্রাচীন আঁধার। কেবল চাঁদের ফ্যাকাশে আলোয় দেখা যাচ্ছে রাস্তাটা একটু দূরেই মোড় ঘুরেছে। বড় ডিটেকটিভ তাঁর কব্জিতে বাঁধা যন্ত্রটিতে কী যেন দেখলেন। তারপরে আবার নিঃশব্দে ইশারা করলেন। আট জনের দলটি একটি সাপের মত ধীরে এগিয়ে চলল।
মোড় ঘুরে রাস্তাটা আরও সরু হয়ে গেছে। দু’পাশের বাড়িগুলো, যেন তাদের অন্দরমহল বমি করে দেবে রাস্তায় এমন বিপজ্জনকভাবে, নিকটবর্তী হয়ে উঠছে। এটা কানাগলি। গোটা দশেক বাড়ির পরেই এটা শেষ। সেখানে ‘প্রাচীনবিদ্যা চর্চা কেন্দ্র’-এর পাঁচিল। ‘ভাবা যায়?’ মনে হল বড় ডিটেকটিভের, ‘শালা এখানে ঘাঁটি গেড়েছে।’
বাড়িগুলো কাছাকাছি বলেই কি না কে জানে, মাঝে মাঝে আওয়াজ ছিটকে বেরিয়ে আসছে। ‘আইয়ে মেহেরবাঁ…’ ‘আহ! আশা ভোঁসলে। ওহ! মধুবালা।’ ‘আজ মহান নেতা তাঁর ভাষণে বলেছেন…’ ‘ঈশ্বর! আমাদের নেতা যেন থাকে দুধেভাতে।’ ‘‘গত কয়েকদিন যাবৎ ‘খাব তোকে খাব’ ট্রেন্ডটি বজায় ছিল। তার জায়গায় আজ এই এক নূতন। একজন ফিল্মের মানুষ হিসাবে আপনার…” ‘শালা! ফিল্মের মানুষ। ও হাগে না, পাদে না, খায় না, লাগায় না, ও ফিল্ম করে। তাও যদি ক্রাইমগুলো একটু ইন্টালিজেন্ট হত। ফিল্মের লোক। শালা।’ ‘আগামী দু’দিন গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে প্রবল…’ ‘ভেসে যাক শালা! সব ময়লা নিয়ে ভেসে যাক। আমাদের কাজ ইজি হয়।’
‘তোমারই শিংয়ের কাছে গুঁড়ি মেরে বসে থাকি—কখন যে চাঁদ
ওঠে, কখন যে মেঘ
ঢেকে দিয়ে চলে যায় তোমাকে আমাকে—
চারিদিকে বালি ওড়ে, তোমার দেহের ছায়া অন্ধকারে আরও
দীর্ঘ হয়।’
হাত তুলে ধরেন বড় ডিটেকটিভ। সবাই দাঁড়িয়ে যায়। এটাই নাকি? এই সব কথাবার্তা তো সাধারণ বাড়িতে বলবে না। ধীরে, অতি ধীরে, চূড়ান্ত সাবধানতা নিয়ে হাতটা নামিয়ে আনেন তিনি। তিনি প্রাণপণ চাইছেন যে আশপাশের শব্দ যেন তাঁর ক্যামোফ্লেজ হয়। কেউ বলতে পারে না এরা সশস্ত্র কি না।
কব্জিটা চোখের কাছে আনতে, তাঁর মনে হল, প্রায় এক ঘণ্টা লাগল। চোখ কুঁচকে দেখার চেষ্টা করলেন। কব্জিতে যেটা রয়েছে তার ছোট্ট স্ক্রিনটা কালো। দ্বিতীয় হাত তুলে তিনি আলতো করে টোকা মারলেন। কিছুই হল না। তিনি ফের টোকা মারলেন। ছোট্ট যন্ত্রটার কালো রঙের পর্দা কালোই রয়ে গেল। ‘শালা ওই ছোট খোঁচড়ের কাজ’ দ্রুত ভাবতে শুরু করলেন তিনি, ‘কত করে বললাম যে, অত কায়দার দরকার নেই। তা না প্রাইভেসি মারাচ্ছে। ভয়েস কম্যান্ড। নাও এবার। বার করো ভয়েস। আর ফট করে গুলি চালিয়ে দিক। যারা ওইসব কবিতা-ফবিতা বলে, এই অঞ্চলে থাকে, তাদের কাছে এটা কোনও বড় ব্যাপার নয়।’
ঠিক এই সময়, তাঁর শ্বাসের শব্দে কি না কে জানে, আলো জ্বলে উঠল স্ক্রিনে। সেখানে দুটি ছোট ছোট রঙিন দাগ। একটি লাল রঙের— লক্ষ্য। একটি নীল রঙের— তিনি। সেটা দেখলেই বোঝা যায় যে তিনি এখনও অভীষ্ট লক্ষ্যের কাছে পৌঁছাননি।
তিনি দরজায় লেখা নম্বরটা দেখে নেন। এখানেও আসতে হবে। কিসব শিং-টিং বলছে। দেখা দরকার সরজমিনে। তিনি দেখেন দরজার ওপরে লেখা, ‘মরবো দেখে বিশ্ব জুড়ে যৌথ খামার’। তিনি তাঁর প্রোটেক্টিভ জ্যাকেটের পকেট থেকে ‘আলিবাবা মার্কার’-টা বার করে দরজায় অদৃশ্য একটা দাগ এঁকে দেন লেজার দিয়ে।
ঘড়ির মতো যন্ত্রটির নির্দেশ অনুযায়ী তাঁরা যেখানে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে আর মাত্র কয়েক মিটার দূরেই লক্ষ্য। তাঁরা অতি সন্তর্পণে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ান একটা একতলা বাড়ির দরজার সামনে। দরজার পেছনে আলো জ্বলছে। যদিও কোনও শব্দ শোনা যাচ্ছে না।
তিনি নিঃশব্দে ইশারায় নির্দেশ দেন কিছু। সকলেই নিজের অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হয়। তিনিও। তিনি পেছনে দু’জনকে নিয়ে, সাবধানে, ‘এক, দুই, তিন’ গুনে সজোরে দরজায় একটা লাথি মারেন।
দরজা যে কেবল ভেজানো থাকতে পারে, বন্ধ নয়, এটা বড় ডিটেকটিভ অনুমান করতে পারেননি। তাঁর শক্তিশালী লাথিতে সেটা আচমকা খুলে যায়। তিনি হুড়মুড় করে ভেতরে গিয়ে পড়েন। টাল সামলাতে না পেরে বসে পড়েন মাটিতে। সেই অবস্থায় দেখেন তাঁর সামনে একটি বড় টেবিলে রাখা তিনটে কম্পিউটার মনিটরের সামনে, তাঁর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে একটি যুবক। মুখে তার বিস্ময়।
তাঁর পেছন পেছন বাকিরা ঢুকে আসে ঘরে। ছেলেটি হাতদুটো মাথার ওপরে তুলে ধীরে ধীরে বসে পড়তে থাকে।

৩. সওয়াল

চুপ করে ছেলেটি বসে আছে। আসার পর থেকে বিশেষ কথাবার্তা বলেনি সে। সম্ভবত ঘটনার আকস্মিকতায়। বড় ডিটেকটিভ আর মেজ টিকটিকি দুজনে, চেম্বারে বসে, একমনে ছেলেটাকে দেখছেন একটা পর্দায়। যেটা দেওয়ালে আটকানো।
বড় ডিটেকটিভ আচমকাই বলেন, ‘অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলাম। এবার যেতে হবে।’ মেজ টিকটিকি তাঁর কথাটা পুনারাবৃত্ত করে, ‘যেতে হবে।’ তারপরে, কেন কে জানে, গানের সুরে বলেন, ‘যেতে হবে, চলো যাই’। বড় ডিটেকটিভ দাঁত খিঁচিয়ে উত্তর দেন, ‘গান করো না তো। গান করো না। আমাদের পেছনে মেশিনগান ঢুকে যাচ্ছে আর তোমার গান পাচ্ছে।’
তাঁরা দু’জনে নিজেদের চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন ছোট্ট কক্ষটিতে। দরজা খুলে তাঁরা প্রবেশ করলেন। ততক্ষণে ছেলেটি, অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে, বোর হয়ে, ঘুমিয়ে পড়ছিল। তাঁদের প্রবেশের শব্দে চটকা ভেঙে সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘আমি কিছু জানি না স্যার।’
বড় ডিটেকটিভ কোনও উত্তর দিলেন না। ছেলেটি যেখানে বসে আছে তাঁর উল্টোদিকে একটা চেয়ার টেনে বসলেন। একমনে ছেলেটিকে দেখলেন। রোগা, ফর্সা, মাথায় ঝাঁকড়া চুল। টিশার্ট আর সাধারণ নীল ডেনিম পরনে। দেখে কোনওভাবেই বোঝা সম্ভব নয় কোন স্তরের অপরাধী এ। ছেলেটি তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। মেজ টিকটিকি তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি সামান্য সময় চুপ থেকে বললেন, ‘বহুল প্রচারিত মিথ্যা, আসলে সত্যি। তাই তো? তোদের গুরুঠাকুর বলেছেন তো। জানিস না? নাকি ন্যাকা সাজলি?’
মেজ টিকটিকি প্রতিধ্বনি করে, ‘সাজলি নাকি? ন্যাকা?’
ছেলেটি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। তারপরে বলে, ‘আমি এসব কিছু জানি না স্যার। আমি তো গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ভিডিও বানাই। এসব আপনি কী বলেছেন?’
‘হা হা হা!’ হেসে ওঠেন বড় ডিটেকটিভ। ‘তোরা এত লুকোচুরি কোথা থেকে যে শিখিস?’ বলতে বলতে তিনি সঙ্গের একজন পুলিশ অফিসারকে নির্দেশ দেন। সে গিয়ে ছেলেটির হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেয়। তিনি একমনে লক্ষ্য করেন। তারপর বলেন, ‘কখনও কখনও, ইতিহাসকে ধাক্কা দিতে হয়। তাই তো? তা তোর কী ধারণা, তুই তেমন একটা ধাক্কা দিবি। নাকি?’
ছেলেটি কেঁদে ফেলে।
তার কান্না দেখে সম্ভবত বড় ডিটেকটিভের করুণা হল। তিনি বললেন, ‘শোন, তুই আমাকে বল, এরকম ছবি তুলে তুই কাকে মেসেজ পৌঁছে দিচ্ছিস। শুধু নামটা বলে দে। তা হলেই হবে। তোকে আমরা সাধারণ টার্ম দেব। তোর একটা কেরিয়ার আছে তো, নাকি?’
মেজ টিকটিকি প্রতিধ্বনি করে, ‘আছে তো, নাকি?’ বড় ডিটেকটিভ চোখ পাকিয়ে তার দিকে চেয়ে বললেন, ‘কাজের কথা বলতে পারলে মুখ খুলবে। নয়তো স্পিকটি নট।’
ছেলেটির কান্না যদিও কমল না।
বড় ডিটেকটিভ ফের বলতে শুরু করলেন, ‘তোর নাম তো ঋত্বিক। তাই না?’
ছেলেটি নীরবে ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেয়। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নেয় চোখ।
বড় ডিটেকটিভ একমনে তাকে দেখেন। ‘ছেলেটি কি সত্যি বলছে?’ চিন্তা আসে মনে। মাছি তাড়ানোর মতো সেটাকে তাড়িয়ে দেন। হতেই পারে না। ‘আই হ্যাভ টু ডিগ মোর’। ‘এই বইটা কোথায় পেলি?’ তিনি সেলফিটা দেখিয়ে প্রশ্ন করেন ঋত্বিককে।
কান্না জড়ানো গলায় সে উত্তর দেয়, ‘স্যার, আমি রাস্তায় বুক-সেলফি পয়েন্ট দেখে সেখানে যাই। বুড়ো লোক একটা। দু’রকমের সেলফি ছিল। আমরা স্পেশাল করতে চাইলে ও এই বইটা বার করে দেয়। আমি আর কিছু জানি না স্যার।’
‘জানিস না। অ। তাই যদি হয় তবে এই যে গত দু’বছরে দশবার এসেছিস কলেজস্ট্রিটে, সেটা কেন? মানে এত মল, এতকিছু থাকতে এখানে কেন? হ্যাঁ? এই দেখ। আরও দেখাব? ছবি?’ বড় ডিটেকটিভ একটার পর একটা ছবি দেখাতে দেখাতে জিজ্ঞাসা করেন। ছেলেটির মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে আসে।
মেজ টিকটিকি প্রতিধ্বনি করে, ‘দেখাব?’
বড় ডিটেকটিভ একটা কড়া ধমক দেবেন বলে চোখ তুলে তাকান। আর সেই সময়ে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারেন চারপাশ মুছে গেছে। শীত লাগছে। তিনি একটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে অনেক অনেক মানুষ। সবাই অদ্ভুত পোশাক পরা। সেই মানুষের সারির মাঝখানে একটা মঞ্চ। সেখানে, এই দূর থেকেও তিনি দেখতে পাচ্ছেন, দাঁড়িয়ে রয়েছে একজন মানুষ। থুতনিতে দাড়ি। কপালের দিক থেকে অনেকটা টাক পড়ে গেছে। এই শীতেও সে টুপিটা খুলে হাতে রেখেছে। গায়ে ওভারকোট। বরফ পড়ছে একটু একটু। ঠান্ডা গাঢ় হয়ে আসছে। তবুও একজন মানুষও নড়ছে না। তারা একমনে শুনছে মানুষটার কথা। কোনও মাইক্রোফোন বা আধুনিক কিছু নেই মানুষটির মুখের সামনে। ছোটখাটো মানুষটার গলার জোর অভাবনীয়।
‘আমাদের পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্রটিকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে এবং তার জায়গায় একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিপীড়িত মানুষের মুক্তি অর্জনের আর কোনও পথ নেই। শ্রমজীবী মানুষকে নিজেদের শাসন করা শিখতেই হবে— আর কেবল আজ্ঞাবহ থেকে থেকে তারা তা কখনওই শিখতে পারবে না।’
বড় ডিটেকটিভ অসহায়ের মতো এদিক-ওদিক চাইছেন। বুঝতে পারছেন না কী করবেন। বিড়বিড় করে তিনি বললেন, ‘মেজ টিকটিকি। ছোট খোঁচড়।’
কোনও সাড়া আসে না। তিনি কোথায়? এসব কী হচ্ছে?
লোকজনের মধ্যে ঠেলাঠেলি করতে করতে তিনি কখন কে জানে বেশ কাছাকাছি এসে পড়েছেন মঞ্চের। লোকটি দৃঢ়, অবিচলিত কণ্ঠে বলে চলেছে, ‘বিপ্লবী তত্ত্ব ছাড়া বিপ্লবী আন্দোলন সম্ভব নয়… কেবলমাত্র উন্নত চিন্তাধারায় পরিচালিত দলই অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করতে পারে।’
তিনি বিড়বিড় করেন ফের, কিন্তু তাঁকে আশ্চর্য করে দিয়ে তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, ‘নিপীড়িতরা শুধু শাসক বদলের জন্য লড়াই করলে চলবে না— তাদের নিজেদের শাসন করা শিখতে হবে।’
প্রাণপণে তিনি বেরনোর চেষ্টা করেন।
বন্দুক। হ্যাঁ, বন্দুকটা দরকার। কোমরে আটকানো বন্দুকটা বার করে হাতে নেন। উঁচিয়ে ধরেন সামনে। একজন মানুষও সেটা পরোয়া করে বলে মনে হয় না। তারা যেমন দাঁড়িয়ে ছিল তেমন দাঁড়িয়ে থাকে। তিনি চিৎকার করেন, ‘হারেরেরেরে! চুপ। একদম চুপ। এসব নিষিদ্ধ। এখুনি সবক’টাকে গুলি করে মারব। বুঝলি। গুলি করব। এখুনি…।’

Advertisement

বন্দুক হাতে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন ঘরে। টেবিলের ওপরে। ভয়ে সবাই দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঋত্বিক, বসে থাকা অবস্থায়, টেবিলের নিচে মুখ লুকিয়েছে। তিনি অবাক চোখে চারপাশে দেখেন। ওই তো মেজ টিকটিকি। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। সে কী যেন বিড়বিড় করছে। তিনি সাহায্য চাইতে গেলেন। তিনি বলতে গেলেন, ‘এসব কী হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না। মেজ টিকটিকি শিগগিরি আমার কাছে এসে আমাকে সাহায্য করো।’ যদিও তিনি তা বলতে পারলেন না। বদলে তিনি বললেন, “Men make their own history, but they do not make it as they please; they do not make it under self-selected circumstances, but under circumstances existing already, given and transmitted from the past.” হাতের বন্দুকটা বিপজ্জনকভাবে দুলতে লাগল।
ঠিক এই সময়ে দড়াম করে দরজা খুলে ঘরে ঢুকে এল চারজন সশস্ত্র লোক। আপাদমস্তক উর্দিতে মোড়া। হাতে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। আলট্রাসনিক বন্দুক। তাদের মধ্যে থেকে একজন বলল, ‘এখুনি হাতের অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করুন।’
তিনি অস্ত্র নামিয়ে রাখতে চাইলেন। চিৎকার করে বলতে চাইলেন, ‘আমি এই লোকটা নই। কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে কোথাও। আমি এই লোকটা নই। আমার ঘরে মহান নেতার ছবি বাঁধানো। আমি রোজ সকালে দেশস্তোত্র পাঠ করে দিন শুরু করি। আমি সোশ্যাল মিডিয়া করি। ট্যাক্স দিই। আমি ছুটিতে বউকে নিয়ে বেড়াতে যাই। না উত্তরে বহিঃশত্রুর আক্রমণের সম্ভাবনা আছে বলে আমরা দক্ষিণে নিরাপদে ঘুরি। গত রবিবার আমি ইভলিউশান মলে গিয়েছিলাম। না আমি ছোলে-বাটুরা ছাড়া কিছু খাইনি। আমি সাধারণ। আমি নিরাপদ। আমি দেশভক্ত।’
তিনি, আশ্চর্যজনকভাবেই, বলতে পারেন না। তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, “Revolutions are the locomotives of history.”

৪. স্বপ্নভঙ্গ

দূর থেকে, অনেক দূর থেকে একটা শব্দ ভেসে আসছে। ঋত্বিক শুনেও শুনতে পাচ্ছে না। তার ঘুম থেকে জেগে উঠতে ইচ্ছা করছে না। আলস্যে শরীরটা ভারী।
চোখ না খুলে সে রিং হতে দেয়। একবার। দু’বার। তিনবার।
চোখ খোলে সে। ক্লান্ত চোখটা তুলে দেখে নিজের ঘরে সে শুয়ে আছে। মানে ঠিক শুয়ে নেই। টেবিলে বসে কাজ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে কখন। একটু বিভ্রান্ত লাগে তার।
অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল। স্ক্রিন-সেভার ফুটে উঠেছে পর্দায়। মাস কয়েক আগে ‘কুল ফিলো কোট’ নামে এই স্ক্রিন-সেভারটা সে ইন্সটল করেছে। তিনটি পর্দা জুড়ে লেখা দেখাচ্ছে এখন, “The hyperreal is no longer a copy of the real; it is the generation of the real by models of the real” – Jean Baudrillard

দরজায় কেউ আঘাত করে। জাগরণ এসে গ্রাস করে তার শরীর সম্পূর্ণ। সে উঠে দাঁড়ায়।

চিত্র: বিজন সাহা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 3 =

Recent Posts

প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারী: এক দৈবী আখর

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

Read More »
তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

মাতৃভাষা: অবিনাশী হৃৎস্পন্দন ও বিশ্বজনীন উত্তরাধিকার

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব একটি আলো আছে, সে নিজের দীপ্তিতেই ভাস্বর। পৃথিবীতে আজ প্রায় সাত হাজার ভাষা আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শতাব্দীর শেষে তার অর্ধেকেরও বেশি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য সত্যিই বেদনাদায়ক। একটি ভাষার মৃত্যু মানে কেবল কিছু শব্দের মৃত্যু নয়— সে মানে একটি জগৎদর্শনের অবলুপ্তি, একটি জাতির স্মৃতির চিরকালীন বিনাশ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক বহুমাত্রিক। নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসা, তাকে চর্চায় রাখা, তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর তার সাথে অন্য সমস্ত ভাষার প্রতি আরও বেশি করে শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শংকর: বিচিত্র বিষয় ও আখ্যানের কথাকার

শংকরের জনপ্রিয়তার একটি কারণ যদি হয় সাবলীল ও সহজ গতিচ্ছন্দময় ভাষা, অন্য আরেকটি কারণ হল, নিজ সময়কে করপুটে ধারণ করা। তার সঙ্গে মিশেছে আমাদের পরিকীর্ণ জগতের বহুকিছু, আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে, অথচ আমরা এ-পর্যন্ত যার হদিশ পাইনি, তাকে পাঠকের দরবারে এনে হাজির করা। ১৯৫৫-তে যে উপন্যাসটি দিয়ে বাংলা-সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব, সেই ‘কত অজানারে’ হাইকোর্টের জীবনযাপন, সেখানকার আসামি-ফরিয়াদি, উকিল-ব্যারিস্টার প্রমুখের চিত্র। লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা এটি। তিনি প্রথম জীবনে হাইকোর্টের সঙ্গে চাকরিসূত্রে যুক্ত ছিলেন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত/ রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা/ আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর/ কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি/ তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়/ ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি/ অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা/ তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।

Read More »
সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »