আমেদাবাদ, গান্ধীনগরের বসন্তসময়
এ এক মধুর সময়। না অসহ্য গরম, না জলজ স্যাঁতসেঁতে বাতাস। স্নিগ্ধ নির্মল আকাশে ফাগুনের আবাহন আবীর দিয়ে। পলাশে, শিমুলে, অশোকে, চাঁপাফুলে বসন্ত যেন জাগ্রত দ্বারে। এ হেন সময় বাংলার বাইরে কেমনভাবে চলে দোলের পরব, তার সঙ্গে ন্যাড়াপোড়া, তা নিয়ে আজ একটু কলম চালনা।
আজ বলব গুজরাটের কথা। আমেদাবাদ এয়ারপোর্ট ছাড়িয়ে প্রায় ঘণ্টা খানেকের পথ গান্ধীনগরের পালাজ। অবশ্যই গাড়িতে। এখানে অটোও পাওয়া যায় ফোন মারফত। পালাজে কালীমাতা মন্দিরে সন্ধ্যায় আরতি হয় রোজ। জাগ্রত কালীমাতা। দোল উৎসব উপলক্ষে আলোকমালায় খুব সুন্দর করে সাজানো হয় সমগ্র মন্দির চত্বর। স্থানীয় মানুষ ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন ন্যাড়াপোড়া দেখতে। কাছাকাছি বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা যারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন, তারাও মহা উৎসাহে সামিল হন। এই বৃহদাকার বুড়ির ঘর পোড়া বা ন্যাড়াপোড়া আর কোথাও দেখিনি। অনেকদিন আগে থেকে কাঠ জড়ো করা হয়। বিশাল বিশাল গাছের কাণ্ড আর গুঁড়ি দিয়ে বুড়ির ঘর বানানো হয়। তিন-চারতলা বাড়ির সমান উঁচু। আগুন জ্বালানো দেখতে হাজির শয়ে শয়ে মানুষ। আগুন প্রদক্ষিণ করে ঘুরছে সব মানুষ। গায়ে এসে লাগছে তাপ, তবু কী এক নেশায় মানুষ আগুন প্রদক্ষিণ করে চলেছে। হঠাৎ করে কানে এল সমবেতভাবে ‘আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বলো হরিবোল!’
বাংলার ধ্বনি শুনে পুলকিত মন সমস্বরে শব্দ তুলল। এদিকে আগুনের লেলিহান শিখা, তার পিছনে পূর্ণিমার পূর্ণচাঁদ সম্রাট। অপূর্ব অনুভব এক। বসেছে বিরাট মেলা মন্দিরের বাইরে সমগ্র চত্বর জুড়ে।
ওদিকে মন্দিরে চলছে পুজো, মন্ত্রোচ্চারণ। জনসমাগমে আলোকিত জীবন এক। সরাসরি মন্দিরের ভিতরের দৃশ্য দেখানো হচ্ছে দূরদর্শনে।
মহিলা পুলিশের দল সতর্ক পাহারায় রত। কথা বললাম, মহিলা পুলিশ বাহিনীর কৌশল এবং পঞ্চাল দেবীর সঙ্গে। জানালেন, এক দিনের জন্য মেলা বসে। প্রচুর লোকসমাগম হয়। ভাল লাগল সবার জন্য চায়ের ব্যবস্থা। বিনামূল্যে। তিন জায়গা থেকে প্রসাদ বিতরণ হচ্ছে। বোঁদে আর নকুলদানা।
সমগ্র পরিবেশ কী এক পবিত্র আনন্দময়তায় পূর্ণ।
পর দিনের কথায় আসি। পালাজ গাঁও পিছনে রেখে বৈষ্ণো দেবী মন্দির ছাড়িয়ে গান্ধীনগর পেরিয়ে আমেদাবাদ কালীবাড়ির বসন্তোৎসব পালনের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথ এখনও কত প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালে তালে চলল নাচ।
ছোটবড় সকলে মিলে আবির আর ফুল দিয়ে চলল দোল উৎসব। সঙ্গে ছিল স্বরচিত কবিতা পাঠ, গল্পপাঠ, গান, নাচ। দুপুরে নিরামিষ খাওয়ার ব্যবস্থা যত্ন সহকারে। চাঁদা দিয়ে অবশ্য।
শান্তিনিকেতনের দোলবাহার আমাদের প্রাণের উৎসব। বাঙালি তাই সুদূরে বসেও পালন করছে দোল উৎসব। আমেদাবাদ কালীবাড়িতে মা কালীকে দর্শন করা যাবে বেলা দুটো পর্যন্ত। কাঠের দরজা কিছু সময়ের জন্য বন্ধ। ১৯৩৮ সাল থেকে আমেদাবাদ কালীবাড়ির যাত্রা। রয়েছে রাধাকৃষ্ণ মূর্তি৷ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে মায়ের দর্শন মেলে। দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ির মূর্তির ধাঁচে মায়ের মূর্তি।
সমস্ত পরিবেশের সবুজ আবহে মনে হয় ঈশ্বর সর্বত্র একমেবাদ্বিতীয়ম্।
চিত্র: গুগল






