Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বিশেষ নিবন্ধ: সৃজা মণ্ডল

প্রতিমাশিল্প: এক নিবিড় সমন্বয়ের আয়না

আশ্বিন মাস। খেতের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে আশ্বিনের হাওয়া। সবুজ মাঠেই হয়তো দাঁড় করানো আছে ছাল-ছাড়ানো পাটের গোছা। মাঠের ধারে ফুটেছে কাশফুল। আকাশে আকাশে উৎসবের আয়োজন। বাতাসে বাতাসে নিমন্ত্রণ। আসছেন হিমালয়-কন্যা পার্বতী, ঘর আলো করে। তাঁর আসার পথ যেন এইভাবে গড়ে উঠছে পরতে পরতে। আলোয়, হাওয়ায়। জমিতে, আসমানে।
দুর্গাপুজো বাঙালি সংস্কৃতির এক অনুভূতিমুখর সত্তা। প্রায় আড়াইশো বছরের পুরোনো আমাদের দুর্গাপুজো। প্রতিমাশিল্প এই মহানগর ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বৃহত্তম লোকশিল্প। আজও এই শিল্পের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন হাজার হাজার মানুষ। মণ্ডপের আলোকসজ্জা ও জাঁকজমকের আড়ালে আসল কাহিনিটা রয়ে যায় মাটির গন্ধে-ভেজা এইসব শিল্পীর হাতে। প্রথমেই আসেন প্রতিমাশিল্পী। তাঁরা শুধু মূর্তি বানান না, তাঁরা জীবন গড়েন, ছড়িয়ে পড়ে তাঁদের আবেগ, আশায় বুক বাঁধেন তাঁরা। এছাড়া আছেন শিল্পীর সহকারী, দক্ষ কারিগর। কেউ খড় আনেন, কেউ মাটি তোলেন, কেউ বা সরবরাহ করেন প্রতিমার বস্ত্র, অলংকার, ডাকের সাজ। গড়েন নানা আয়ুধ। মাথার চুলের জন্য কেউ বা বানান নাইলন বা পাটের গুছি। সবাই মিলে লালন করছেন এই লোকশিল্পকে। আমরা যখন সুসজ্জিত মণ্ডপে প্রতিমার মুখ দেখি, তখন কয়েকজন নামী শিল্পী ছাড়া সবার মুখই হারিয়ে যায়। এই হাজার হাজার মানুষের শ্রম, ত্যাগ— সর্বোপরি যাপনই রয়ে যায় আমাদের দৃষ্টির অগোচরে।
প্রতিমাশিল্পের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে লোকশিল্পের বিভিন্ন ধারা, রুজি-রোজগারের নানা পথ, আর ছোটবড় নানা হাতের দিনরাতের সাধনা। কুমোরটুলির গলিতে গলিতে প্রতিমা গড়েন প্রতিমাশিল্পীরা। প্রথমে বাঁশ-কঞ্চি বেঁধে কাঠামো গড়া। তার পরে খড় বাঁধা। যাকে বলে ‘পোয়াল বাঁধা’। সে কাজের শেষে মাটি চড়বে। শুকিয়ে ফেটেফুটে যায় মাটি। তখন তাতে পড়ে দ্বিতীয় পরত। তার ওপরে রং। সবশেষে মাথার চুল, হাত ও গলার অলংকার, অস্ত্রশস্ত্র। এছাড়াও আছে শোলার কাজ, চাঁদমালা, চালচিত্র, সিংহের কেশর, পেঁচা, হাঁসের গায়ে নানা কারুকাজ, ময়ূরের পাখা। প্রতিমাকে ঘিরে বিচিত্র শিল্প ও শিল্পীর মেলবন্ধন।
কীভাবে তৈরি হন একজন প্রতিমাশিল্পী? মাত্র একুশ বছর বয়সে সমরেশ বসু ‘নয়নপুরের মাটি’ উপন্যাসে তুলে ধরলেন এক কৃষকের ঘরের ছেলের শিল্পী হওয়ার কাহিনি— “দুর্গা পুজো এগিয়ে আসছে। কুমোরেরা মূর্তি গড়ছে মাটির, সমস্ত দেবদেবীদের। স্কুল পালিয়ে মহিম তখন শুধু কুমোরবাড়ির আনাচে-কানাচে ঘোরাফেরা করছে।… নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, নেই লেখাপড়া, একমাত্র কাজ মাটির পুতুল বানাবার কারিগরি দেখা। প্রয়োজন মতো ব্যস্ত কারিগরদের ফাই-ফরমাস খাটা থেকে শুরু করে ইস্তক তামাক ভরে দেওয়া পর্যন্ত। কিছুই বাদ যায়নি। প্রতিদানে শুধু তাকে ভাগিয়ে না দিয়ে চুপচাপ করে বসে সেই মূর্তি গড়া দেখতে দেওয়া।… অর্জুন পাল ভালোবেসেছিল মহিমকে। বুঝেছিল, ছেলেটার চোখে যেন থেকে থেকে স্বয়ং বিশ্বকর্মা ভর করে”। —সমরেশ বসু লিখলেন মহিমের প্রতিমাশিল্পী হয়ে ওঠার কাহিনি। বছর কয়েক প্রতিমা বানানোর তালিম দিয়ে তাকে বামুনপাড়ার পাশ করা শিল্পী গৌরাঙ্গসুন্দরের সঙ্গে নয়নপুর থেকে টেনে আনলেন কলকাতায়। মহিমের শিল্পচর্চা শুরু হল গৌরাঙ্গের মেসে। উপন্যাসের মহিম আর বাস্তবের ভাস্কর রমেশ পাল মিলে যায় এখানেই। ফরিদপুরের পালঙ থেকে কলকাতায় শিল্পের পাঠ নিতে এলেন রমেশচন্দ্র পাল ১৯৪১-এ। অনিতা অগ্নিহোত্রী ‘অকালবোধন’ উপাখ্যানে লিখছেন রূপেন দাস তথা রূপীন চামারের ছেলে অর্জুনের মৃৎশিল্পী হওয়ার কাহিনি। ভূমিকায় তিনি লেখেন, “…একে তো মৃৎশিল্পী মরণের সঙ্গে লড়াই করছে, ক্রমবর্ধমান মজুরি ও কাঁচামালের দাম, নিয়ন্ত্রণহীন বাজার, আকণ্ঠ ঋণে জর্জর শিল্পীরা— তারই মধ্যে অন্য পাড়া, অন্য জাত অর্জুনের। তার লড়াই-এর চেহারা আরও কঠিন।” বাস্তবেও প্রতিনিয়ত মৃৎশিল্পীরা রক্তাক্ত। নিজেদের হাতের রং করা প্রতিমার মতো রং মাখানো মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যেতে গিয়েও হারায় না ওরা। মাটি তাদের বারে বারে ফিরিয়ে আনে। অর্জুন দাস যেমন প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে অনুভব করে মৃত্তিকার ঘ্রাণ, মৃদু তাপ, শ্বাসপ্রশ্বাস।
আড়া থেকে ঝোলানো দড়ি দু-হাতে ধরে দু-পায়ে মাটি মাখতে হয়। মাটির আবার নানা প্রকার। বেলে মাটি আদতে গঙ্গা মাটি, দামে সস্তা। বাগবাজারের ঘাটগুলি থেকে গঙ্গা মাটি আসে। আমরা যাকে এঁটেল মাটি বলি, কারখানায় তার নাম ‘চিট মাটি’, যা আসে ডায়মন্ড হারবার অথবা বজবজ থেকে। চিট মাটির দাম বেশি, স্থানীয় জোগান কম। বেলের রং সাদাটে, আর চিট মাটি নিকষ কালো। খড় আসে সুন্দরবন থেকে নৌকাপথে গঙ্গায়। অরণ্য তীরের খেতে বড় বড় ধান হয়, সেই ধানের খড়। খড় আর পাট এই দুই প্রধান উপকরণের স্বভাব-বৈচিত্র্যের মিল–অমিলে প্রতিমার নানা অঙ্গ তৈরি হয়।
কাঠামোর ঠিক ওপরেই পড়ে খড়মাটির পোঁছা। এঁটেল বা চিট মাটির সঙ্গে খড়ের কুচি মেশানো। এঁটেল মাটির গুণ হল খড়ের অসম ভূমির কাঠামোকে আঁকড়ে ধরে থাকে, ছেড়ে যায় না। বেলে মাটির গুণ হল গড়নকে করে মোলায়েম, চিকন। ঠাকুরের বুক, পেট, হাত, পা সবকিছুর সবথেকে ওপরের স্তরটি হল বেলে মাটির। বেলে মাটির আস্তরণে ফাটল ধরলে আবার জলে বেলে মাটিই গুলে ফাটল বোজাতে হয়। সবচেয়ে যে অঙ্গ সুন্দর, ঠাকুরের মুখ, তাতে লাগে ‘বেলে কাচান’ মাটি— বেলে আর চিট মাটির মিশ্রণ। মুখের গড়ন যাতে নিখুঁত, মোলায়েম, চমকদার হয়— সেই জন্য জল মিশিয়ে মাটি আগে পাতলা কাপড়ে ছেঁকে নেওয়া হয়। তারপর সেই মাটি রোদে শুকোয়। কাঁকর, পাথর এসব থাকলে একটুও চলে না। চিটে আর বেলে মাটির অনুপাত শিল্পী-বিশেষে আলাদা আলাদা। মাটির মিশ্রণের মধ্যে কেবল অঙ্ক নয়, থাকে শিল্পীর নিজস্ব কল্পনার জাদু।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘একা এবং কয়েকজন’ উপন্যাসের প্রতিমাশিল্পী জলধর। “লক্ষ্মী সরস্বতী আর কার্তিকের মুখ সে ছাঁচে ঢেলে বানায়। গণেশের মুণ্ড তো হাতে বানাতে হবেই। কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে দুর্গার মুখ— তার জন্য সে কোনও দিন ছাঁচ ব্যবহার করেনি। একতাল মাটি সে অনেকক্ষণ হাতে নিয়ে ছানাছানি করে, এদিক-ওদিক ঘোরে, নানা কথা ভাবে। তারপর হঠাৎ এক সময় বিদ্যুৎবেগে সে মুখখানি বানিয়ে ফেলে। দেড়-দু’মিনিটের বেশি লাগে না। তখন সেই মুখটা প্রতিমার ওপর বসিয়ে সে অনেক দূরে চলে যায়, চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। এক একবার ছুটে এসে নাকের পাশটা একটু টিপে দিয়ে যায়, চোখটা একটু বড় করে। পরদিন সে রং তুলি নিয়ে বসে।” জলধরের ছায়া পাওয়া যায় ঢাকা-বিক্রমপুরের ষোলোঘর গ্রামের মৃৎশিল্পী রাখালচন্দ্র পাল-এর মধ্যে। তিনি কুমোরটুলিতে আসেন ১৯৪৮-এ। প্রথমে প্রতিমার মুখ গড়তে তিনি ছাঁচ ব্যবহার করতেন না। বলতেন, ‘ধ্যান কইর‌্যা মুখ বানাইতাম!’ ধ্যান বস্তুটি কী, কখনওই বুঝিয়ে বলতেন না। খানিক চুপ করে থেকে বলতেন, ‘শ্রীমুখের তপস্যা!’
প্রতিমার যেসব অঙ্গ অনেক সংখ্যায় তৈরি করতে হয় নিখুঁত দৃশ্যমান দক্ষতায়, তাঁদের জন্য লাগে ছাঁচ। শিল্পীর ভাষায় ‘শাঁচ’। ছাঁচে গড়া হয় প্রতিমার চারটি আঙুল। বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ আলাদা করে গড়তে হয়। শিল্পীর আঙুলের চাপে ভাঁজ তৈরি হয় অঙ্গুষ্ঠে। হাতের মুদ্রা গড়তে বড় আঁট লাগে। বৃষ্টির সময় ব্লোয়ার দিয়ে মাটি শুকোতে হয়। একটু বেশি শুকিয়ে গেলে আঙুলে ফাট দেখা যায়। সেসব জায়গা মাটি বুলিয়ে ঠিক করতে হয়। বড় মমতা লাগে মাটি বোলানোর সময়ে। তারপর বাঁশের চোয়াড়ি দিয়ে নিপুণভাবে আঁকেন কর-রেখা। মাটির কাঠিন্য হাতের ছোঁয়ায় হয়ে যায় মানবীর আঙুলের ভঙ্গিমা।
কিন্তু শুধু তো মায়ের মূর্তি গড়লে হবে না। সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ। আছে বাহন, মহিষাসুর। এদের সকলের দেহ আছে, আছে চোখ। পশু বাহনদের শরীর তৈরি হয় ‘বেলে-কাছা মাটি’ দিয়ে— কোথাও ঢিলে ত্বকের আভাস, কোথাও দৃশ্যমান মাংসপেশি, দেহে গতির নানা বাঁক নির্মাণে চিট, বেলে আর পাটের মিশ্রণ দরকার। অসুরের মুখ, মহিষের মাথা ছাঁচে হয়। সিংহের কেশরসুদ্ধু মাথা গড়তে হয় হাতে, সিংহের নির্মাণে শিল্পীর নিজের প্রতিভার বৈচিত্র্য ধরা পড়ে। প্রতিমার রং একসময় তৈরি হত ভেষজ উপাদানে— সিন্দুর, হিঙ্গুল, নীলখড়ি, শঙ্খখড়ি। এখন ব্যবহার হয় কেমিক্যাল রং ।
এরপর সাজসজ্জার পালা। সাজের নানা নাম— ‘বাংলা’, ‘আট বাংলা’, ‘ডাকের গয়না’, ‘বুলেন গয়না’। ‘বাংলা সাজ’ হল আদি সাজ, একচালা প্রতিমাকে শোলার যে সাজে সাজানো হত। শোলার সাজ, শোলার মুকুট, গয়না— এইসব হল মাটির ফসল। শোলা আসে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর ও উত্তরবঙ্গের মালদহের ইটাহার থেকে। দুদিন রোদে শুকিয়ে সেই শোলা বান্ডিল বেঁধে গ্রামের হাতে আসে, সেখান থেকে গ্রামের লোক শোলা বিক্রি করতে আসেন কুমোরটুলি।
‘আট বাংলা’ সাজে যে শোলার গয়না ব্যবহার হয়, তাকে ভূমি হিসেবে ব্যবহার করে হয় রুপালি রাংতার কাজ। আট বাংলার এক বিবর্তন ‘ডাকের সাজ বা গয়নার ঠাকুর’— কাটোয়া, নবদ্বীপ অঞ্চল থেকে আসে পুঁতি ও তারের গয়না, মুকুটের কাজ সাদা শোলার পটভূমিতে বসানো। শোলার এমন গুণ, তাকে কেটে যে কোনও জ্যামিতিক আকৃতি দেওয়া যায়। কর্মকারের কল্পনা আর ছুরি চালানোর মেলবন্ধনে প্রতিমা সেজে ওঠে অপরূপায়।
আশির দশক থেকে জনপ্রিয়তা পেল ‘বুলেন গয়না’— সোনালি রাংতা, পুঁতি, জরির ঝলমলে মুকুট। সাজের উপকরণ আসে বড়বাজার থেকে, পাইকারি হারে। সোনালি রাংতা, পুঁতি, জরির ফিতে আসে সুরাত থেকে। কুমোরটুলি ছাড়াও সাজ ও গয়নার বাজার আছে কলকাতার বাইরে— জয়নগর। গয়না ছাড়াও জয়নগরে তৈরি হয় মাথার চুলের সেট ও পরনের শাড়ি। কলকাতা ও বহির্বঙ্গের সাজের জোগান–চাহিদার এক গুরুত্বপূর্ণ সাঁকো কৃষ্ণনগরের সাজের বাজার। কাঠ, খড়, মাটি, রংয়ে গড়ে উঠছে প্রতিমা, এই দেখার যেন শেষ নেই। ক্লান্তি নেই এই দেখার।
এরপরই প্রতিমা আনতে কুমোরটুলিতে ভিড়। লরিতে করে ‘প্রতিমা’-যাত্রার উল্লাস। সমস্ত শহর তখন উৎসবের আবেগে ছুটে চলেছে। ঢাকের বাদ্যি বাজে, রুক্ষ কলকাতার বাতাসে সুরের মেজাজ লাগে। একসঙ্গে অনেকগুলো ঢাকের শব্দ শোনা যায় শিয়ালদহ স্টেশনে। যাঁদের ছাড়া দুর্গাপুজো অসম্পূর্ণ, সেই দূরাঞ্চলের ঢাকিরা আসে কলকাতায়। একটু আশা এই ক’দিনে বাজিয়ে কিছু উপায় হবে, তাই ওরা বসে আছে শিয়ালদায়, কালিঘাটে, বৌবাজার, শ্যামবাজারের মোড়ে। ঢাকের বায়না করতে আসছে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ। ঢাক বাজাবার দক্ষতার অনুপাতে ওরা এক একজন এক এক রকম বায়না হাঁকেন। দৈন্য আর বঞ্চনার শব্দ সারাটা বছর ধরে চিৎকার করে। শুধু এই তিন-চারটে দিন। ম্লান, মলিন মুখে একটু হাসি। তবু উৎসব বাজছে। ঝলমল করছে কলকাতা। পথ চলতে শোনা যাবে শব্দ। ঢাকের বাদ্যি বাজছে। গমগম করছে কলকাতা।
প্রতিমা গড়ার ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। কুমোরটুলি, কৃষ্ণনগর— এই এলাকাগুলি প্রতিমা তৈরির পীঠস্থান হয়ে উঠেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। পূর্বপুরুষদের শিল্পকলা ও আস্থার সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা। প্রতিমার গায়ে সোনালি রং লাগলেও, সেই শিল্পীর জীবনে রয়ে যায় সাদা-কালোর টানাপোড়েন। সারা বছর কাজ নেই, দুর্গাপুজোর সময়টুকুই ভরসা। অনেক দিনই চলে যায় বাঁশ কাটতে কাটতে, খড় বেঁধে, জল মেখে মাটি তৈরি করতে করতে। অর্ধেক সময় যায় কাঁচামাল কিনতে, বাকিটা কেটে যায় আশা আর চিন্তায়। একেকটা প্রতিমা বানাতে খেটে যেতে হয় অনেক রাতজাগা দিন— অথচ দাম মেলে সামান্যই। তাঁরা চান, মাটির কাজের কদর যেন মাটিতেই মিশে না যায়। বছরের বাকি সময়টাতেও যেন বিকল্প কাজ থাকে। তাঁদের সন্তান যেন শিক্ষার আলোয় বড়ো হতে পারে।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচয় করিয়ে দেন ‘প্রতিমা’ গল্পের ‘বুড়া মিস্ত্রি কুমারীশ-এর সঙ্গে— “শীর্ণ খর্বাকৃতি মানুষ কুমারীশ, হাত-পাগুলি পুতুল-নাচের পুতুলের মতো সরু এবং তেমনি দ্রুত ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে নড়ে। আর চলেও সে তেমনি খর গতিতে।” একজন শিল্পী যখন প্রতিমার গায়ে মাটি বসান, তখন তাঁর চোখে জ্বলজ্বল করে সন্তানের মতো আবেগ। কাপড়ে-শাড়িতে লেগে থাকা মাটির গন্ধ জানিয়ে দেয়, গড়ার দায়িত্ব তাঁদের। তাঁদের কাছে প্রতিমা নির্মাণ শুধু কাজ নয়, ভক্তি, বিশ্বাস, আর মাটির ছোঁয়ায় তৈরি ভালবাসা। অনেকেই বলেন, “মা দুর্গা আমায় আশীর্বাদ দিন, যেন আমি তাঁকে ঠিকমতো ফুটিয়ে তুলতে পারি”। এই কথাটার মধ্যে যে আত্মনিবেদন আছে, তা বোঝা যায় শুধু মাটির ঘ্রাণে ভেজা সেই কুঁড়েঘরে।
আজ যখন আমরা প্রতিমা দেখে ছবি তুলি, আলোয় মোড়া মণ্ডপে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি— তখন একটা মুহূর্ত সময় নিয়ে ভাবি সেই হাতগুলোর কথা, যাদের কঠোর শ্রমে ফুটে উঠেছে মা দুর্গার রূপ। প্রতিমা শিল্পী ও তাঁর সহকারীরা কেবল শিল্পী নন— তাঁরা বাংলা সংস্কৃতির মাটির মায়া।

চিত্র: গুগল

Advertisement

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − seventeen =

Recent Posts

প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারী: এক দৈবী আখর

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

Read More »
তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

মাতৃভাষা: অবিনাশী হৃৎস্পন্দন ও বিশ্বজনীন উত্তরাধিকার

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব একটি আলো আছে, সে নিজের দীপ্তিতেই ভাস্বর। পৃথিবীতে আজ প্রায় সাত হাজার ভাষা আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শতাব্দীর শেষে তার অর্ধেকেরও বেশি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য সত্যিই বেদনাদায়ক। একটি ভাষার মৃত্যু মানে কেবল কিছু শব্দের মৃত্যু নয়— সে মানে একটি জগৎদর্শনের অবলুপ্তি, একটি জাতির স্মৃতির চিরকালীন বিনাশ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক বহুমাত্রিক। নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসা, তাকে চর্চায় রাখা, তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর তার সাথে অন্য সমস্ত ভাষার প্রতি আরও বেশি করে শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শংকর: বিচিত্র বিষয় ও আখ্যানের কথাকার

শংকরের জনপ্রিয়তার একটি কারণ যদি হয় সাবলীল ও সহজ গতিচ্ছন্দময় ভাষা, অন্য আরেকটি কারণ হল, নিজ সময়কে করপুটে ধারণ করা। তার সঙ্গে মিশেছে আমাদের পরিকীর্ণ জগতের বহুকিছু, আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে, অথচ আমরা এ-পর্যন্ত যার হদিশ পাইনি, তাকে পাঠকের দরবারে এনে হাজির করা। ১৯৫৫-তে যে উপন্যাসটি দিয়ে বাংলা-সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব, সেই ‘কত অজানারে’ হাইকোর্টের জীবনযাপন, সেখানকার আসামি-ফরিয়াদি, উকিল-ব্যারিস্টার প্রমুখের চিত্র। লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা এটি। তিনি প্রথম জীবনে হাইকোর্টের সঙ্গে চাকরিসূত্রে যুক্ত ছিলেন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত/ রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা/ আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর/ কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি/ তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়/ ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি/ অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা/ তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।

Read More »
সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »