Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বিধবা বিবাহ: বিস্মৃত শ্রীশচন্দ্র ও কালীমতি

বিধবা বিবাহ আইন হল। সমাজ এ আইন মেনে নিতে রাজি না। ‘একের দুইবার বিবাহ দিলে’ অন্যের একবারও বিবাহের পাত্র মেলে না– এমত কৌতুক আর শ্লেষে জেরবার বিদ্যাসাগরের কাছে বিধবার পুনর্বিবাহ দেওয়া ছিল ধর্মযুদ্ধের সামিল। এ কাজ তাঁকে করতেই হবে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখলেন, ‘মুখে বলা নয়, কাজে করা যাক’। সনাতনী সমাজের আপত্তি, বাধা, আক্রমণ উপেক্ষা করে কে আসবে বিদ্যাসাগরের পাশে, কেইবা বিধবা নারীকে বিয়ে করতে রাজি হবে! সেই কাজ করতে এগিয়ে এলেন মুর্শিদাবাদে কর্মরত জজ-পণ্ডিত শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। বিদ্যাসাগর যখন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ তখন শ্রীশচন্দ্র ওই কলেজের ছাত্র। বিদ্যাসাগরের প্রিয় ছাত্র এগিয়ে এলেন গুরুদক্ষিণা দিতে। সে-সময় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল যথেষ্ট বৈপ্লবিক কাজ।

শ্রীশচন্দ্র জানতেন, কী কঠিন সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন। তাঁর গ্রাম, তাঁর সমাজ এ বিয়ে মেনে নেবে না। তাও তিনি চললেন গ্রামের বাড়িতে মায়ের আশীর্বাদ নিতে। নিস্তরঙ্গ গ্রামজীবনে অভ্যস্ত মা সূর্যমণি ছেলের এই ম্লেচ্ছ কাজ মেনে নিতে রাজি হলেন না। বাড়ি-বার সর্বত্র দুর্নাম রটল। সনাতনীরা পেছনে লাগল। কুৎসিত ছড়া তৈরি হল তাঁর নামে। সমাজ, না সমাজ– এই ধন্দে শ্রীশচন্দ্র সাময়িক পিছু হটলেন।

বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে ১৫ অগ্রহায়ণ। বিদ্যাসাগর নিজে শ্রীশচন্দ্রের সঙ্গে কথা বলে সব ঠিক করেছেন। পাত্রী বর্ধমান জেলার পলাশডাঙা গ্রামের ব্রহ্মানন্দ মুখোপাধ্যায়ের দশ বছরের বিধবা কন্যা কালীমতি। বর্তমানে পলাশডাঙা বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী ব্লকের অন্তর্গত। বিদ্যাসাগর নিজে দেখে পাত্রী নির্বাচন করেছেন। পাত্রী খুঁজে দিতে বিদ্যাসাগরকে সাহায্য করেছিলেন পলাশডাঙায় কালীমতিদের প্রতিবেশী দুর্গাদাস চট্টোপাধ্যায়। কর্মজীবনে দুর্গাদাসবাবু ছিলেন এক আইন ব্যবসায়ী। থাকতেন কলকাতার বেলতলায়। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা ও বন্ধুত্ব ছিল। দুর্গাদাসবাবুই বিদ্যাসাগরকে এই বিধবা কন্যার হদিস দেন। চট্টোপাধ্যায় পরিবারের উত্তরসূরিরা এখনও সে কাহিনির কথা উল্লেখ করেন। গ্রামের বাসিন্দারাও বংশপরম্পরায় এমনটাই শুনে আসছেন। বিয়ের কারণে এবং নিরাপত্তার জন্য কালীমতিকে এনে রাখা হয় শান্তিপুরে। সঙ্গে আছেন মা লক্ষ্মীমণি।

এদিকে শ্রীশচন্দ্র লোকনিন্দার ভয়ে বিয়ে করতে নাচার! বিদ্যাসাগর প্রমাদ গণলেন। এখন কী হবে? কলকাতায় এবং মফস্বলে জোর গুজব বিদ্যাসাগর এবার কাবু। বিধবা বিয়ে হচ্ছে না। প্রভাকর সম্পাদক লিখলেন, ‘কোলে কাঁকে ছেলে ঝোলে, যে সকল রাঁড়ী/ তাহারা সধবা হবে, পরে শাঁকা শাড়ী।’ এমনকি ইংরেজ পরিচালিত ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকা শ্রীশচন্দ্রকে দুর্বলচিত্ত বলে ব্যঙ্গ করল। সনাতনপন্থীদের চাপে কালীমতির মা লক্ষ্মীমণি মেয়ের ওপর কলঙ্ক আরোপের দায়ে বিভ্রান্ত হলেন, কে বাঁচাবেন তাঁকে এই দুঃসহ অবস্থায়! দাবি উঠল, শ্রীশচন্দ্রের মতো নরাধমের জজ-পণ্ডিতের চাকরি করার কোনও নৈতিক অধিকার নেই। সে সময় জজ-পণ্ডিতরা ইংরেজ আদালতে হিন্দু আইনের ব্যাখ্যাকর্তার কাজ করতেন। কিছুদিন আগে যারা হিন্দুয়ানির কথা বলে শ্রীশচন্দ্রের বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে ছিলেন, তারাই এখন হিন্দুত্বের দোহাই পেড়ে শ্রীশচন্দ্রকে দুষলেন!

সবই লক্ষ্য করছিলেন শ্রীশচন্দ্র। তিনি লক্ষ্মীমণির সঙ্গে দেখা করে বিয়ের দিন ঠিক করলেন। এরপর লক্ষ্মীমণির স্বহস্তে লেখা বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র নিয়ে সোজা হাজির বিদ্যাসাগরের কাছে। ‘লক্ষ্মীমণি দেব্যাঃ’, এই নামে বিয়ের আমন্ত্রণপত্রে লেখা ছিল, ‘২৩ অগ্রহায়ণ আমার বিধবা কন্যার শুভ বিবাহ হইবেক। মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্ব্বক কলিকাতার অন্তঃপাতি সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রীটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম্ম সম্পন্ন করিবেন, পত্র দ্বারা নিমন্ত্রণ করিলাম। ইতি তারিখ ২১শে অগ্রহায়ণ শকাব্দ: ১৭৭৮’।

২৩ অগ্রহায়ণ, ইংরেজি ৭ ডিসেম্বর, ১৮৫৬ আধুনিক বাংলার ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। ওইদিন সন্ধেবেলায় রামগোপাল ঘোষের বাড়ি থেকে বরবেশে শ্রীশচন্দ্র এলেন সুকিয়া স্ট্রিটে রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে। এখানেই পাত্রী-সম্প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বরযাত্রী হয়ে এলেন রামগোপাল নিজে, বন্ধু হরচন্দ্র ঘোষ, শম্ভুনাথ পণ্ডিত, দ্বারকানাথ মিত্র। বিয়ের কোনও অনুষ্ঠানই বাদ গেল না। মন্ত্রপাঠ, কন্যা-সম্প্রদান, উলুধ্বনি, দ্বারষষ্ঠী, স্ত্রী আচার, ঝাঁটা প্রণাম, নাক মলা, কান মলা সবই হল। এরপর ভূরিভোজ। বিদ্যাসাগর একাই দশ হাজার টাকা খরচ করলেন। বিরুদ্ধবাদীরা ঝামেলা পাকাতে পারে বলে যথেষ্ট পুলিশ মোতায়েন ছিল বরের যাতায়াতের পথে। কলকাতায় সেদিন ও পরের ক’দিন খবর একটাই– ধর্মনাশী বিদ্যেসাগর ও তাঁর শিষ্য শ্রীশচন্দ্র।

এমন সাহসী, পথনির্দেশক কাজ করলেন শ্রীশচন্দ্র, যা তখন কেউ স্বপ্নেও ভাবতে চাইতেন না। ছলের কলের অভাব নেই, প্রবাদ যে কতটা তার প্রমাণ মিলল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। শ্রীশচন্দ্র নাকি আরও বড় কোনও প্রাপ্তির লোভে এই বিয়ে করেছেন! এই প্রাপ্তি অন্যের ক্ষেত্রেও ছিল, তারা এল না কেন, সে প্রশ্ন কিন্তু উঠল না!

শ্রীশচন্দ্র এক বিস্মৃতপুরুষ। বিদ্যাসাগরের জীবনীকাররা শ্রীশচন্দ্রের জন্য তিন-চার লাইনের বেশি বরাদ্দ করেননি! আর কালীমতি! কেই বা তার খোঁজ রেখেছে! অথচ বাংলার নারীমুক্তি আন্দোলনে অনুঘটকের কাজ করেছিলেন এঁরা। বিদ্যাসাগরকে চরম লাঞ্চনা, বিদ্রুপ থেকে রক্ষা করেছিলেন শ্রীশচন্দ্র। বিধবা বিবাহ করে তিনি শোরগোল তুলেছিলেন বদ্ধ জলাশয়ের মতো বাঙালি সমাজে। তাঁকে কেন্দ্র করে বাঙালি সমাজ উদ্বেল হয়ে উঠেছিল। অথচ আজ তিনি বিস্মৃত। তাঁর জন্মস্থানেও কেউ তাঁকে মনে রাখেনি। তাঁর পৈতৃক ভিটেতেই তিনি আজ অপাঙক্তেয়।

উত্তর চব্বিশ পরগনার গোবরডাঙ্গার খাঁটুরা গ্রামের চণ্ডীতলায় ১৮৩১ সালে শ্রীশচন্দ্রের জন্ম হয়। তৎকালীন যুগের বিশিষ্ট কথক রামধন তর্কবাগীশের কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন শ্রীশচন্দ্র। মা সূর্যমণি দেবী। দাদার নাম ছিল গণেশচন্দ্র। সুখময়ী ছিল বোনের নাম। কথক রামধন ছিলেন সে যুগের তুলনায় অনেক অগ্রসর। খাঁটুরার পণ্ডিত ভগবান বিদ্যালঙ্কারের টোলে ব্যাকরণ ও সাহিত্য পাঠ শেষ করে শ্রীশচন্দ্র কলকাতায় আসেন। কলকাতায় তাঁদের নিজস্ব বাসস্থান ছিল।

তিনি সংস্কৃত কলেজের ছাত্র শ্রেণিতে ভর্তি হন। মেধাবী ছাত্র শ্রীশচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চোখে পড়েন। বিদ্যাসাগর তখন কলেজের অধ্যক্ষ। সে সময় কলেজের অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন, ভরতচন্দ্র শিরোমণি, প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশ, তারানাথ তর্কবাচস্পতি প্রমুখ যশস্বী অধ্যাপক। এঁদের সাহচর্যে ও শিক্ষায় শ্রীশচন্দ্র কলেজের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। বিদ্যাসাগরের ভাই দীনবন্ধু ন্যায়রত্ন ছিলেন শ্রীশচন্দ্রের সহপাঠী বন্ধু। বৃত্তি পরীক্ষায় শ্রীশচন্দ্র সর্বোচ্চ ফল করলে বিদ্যাসাগর তাঁকে নিজে হাতে পুরস্কার তুলে দেন। কলেজে পড়ার সময় থেকেই বিদ্যাসাগরের সমাজ হিতৈষণা ব্রত শ্রীশচন্দ্রকে প্রভাবিত করেছিল। কলেজে পড়াকালীন সংস্কারমুক্ত প্রগতিশীল যুবকে পরিণত হন তিনি।

Advertisement

কৃতী ছাত্র ছিলেন শ্রীশচন্দ্র। তাই শিক্ষা শেষ করে সংস্কৃত কলেজেই তিনি ‘প্রথম সেক্রেটারি’-র দায়িত্ব পান এবং অচিরেই সাহিত্যের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এই সময়েই তিনি বিদ্যাসাগরে সাহচর্য পান। শিক্ষক বিদ্যাসাগর হয়ে ওঠেন যুবক শ্রীশচন্দ্রের সহকর্মী, বন্ধুস্থানীয় অগ্রজ। পাশ্চাত্য শিক্ষা ও দেশীয় শিক্ষার টানাপোড়েনে এ সময় বাংলায় দুটি বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এরা পাশ্চাত্যবাদী হিউম্যানিস্ট ও ক্লাসিকাল হিউম্যানিস্ট নামে পরিচিত ছিলেন। শেষোক্ত দলের সেনাপতি ছিলেন বিদ্যাসাগর। এই গোষ্ঠীর অন্যতম মুখ ছিলেন শ্রীশচন্দ্র। যে কোনও সংস্কারকেই এঁরা দেখতেন দেশের জল মাটি বাতাসের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। কোন উগ্রতাই আখেরে ফল দেয় না, তা বুঝতেন নিজেদের অবস্থান থেকেই।

বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনের ঘোর সমর্থক ছিলেন শ্রীশচন্দ্র। সনাতনধর্মীরা প্রবল বাধা দিলেও বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়ে যায়। বস্তুত এর পরই শ্রীশচন্দ্র বাঙালি সমাজের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। আইন পাশ হওয়ার কয়েকমাসের মধ্যে বিদ্যাসাগর এমন কোনও মুক্তমনা যুবক খুঁজে পেলেন না, যিনি বিধবা বিবাহ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। নব্যবঙ্গীয়রা এক্ষেত্রে তাঁকে বেশ খানিকটা হতাশই করেছিল। অবশ্য দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় এর আগে রেজিস্ট্রি বিবাহ করে শোরগোল তুলেছিলেন।

সংস্কৃত কলেজের চাকরি ছেড়ে এই সময় শ্রীশচন্দ্র জজ-পণ্ডিতের চাকরি নিয়ে মুর্শিদাবাদে। কলকাতা থেকে অনেকদূরের পথ মুর্শিদাবাদ। সুবে বাংলার রাজধানীতে বসে শ্রীশচন্দ্র লক্ষ্য করছিলেন সব কিছুই। বিদ্যাসাগরের অনুরোধ গেল তাঁর কাছে, বিধবা বিবাহ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। শ্রীশচন্দ্র কোনওকালেই বাক্যবাগীশ ছিলেন না। কথায় নয় কাজে করে দেখাতে হবে। একবাক্যে তিনি বিদ্যাসাগরের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান।

তিনি জানতেন এই কাজ কতটা কঠিন। কিন্তু বিদ্যাসাগর বলেছেন যে! শ্রীশচন্দ্র গেলেন খাঁটুরায় গ্রামের বাড়িতে মায়ের আশীর্বাদ নিতে। মা রাজি নন। সমাজ তো নয়ই! এদিকে কথা দিয়েছেন। বিয়ের তোড়জোড় চলছে কলকাতায়। বিয়ের দিন পর্যন্ত ধার্য হয়ে গেছে। নানা কথা উঠছে চারপাশে। বিরুদ্ধবাদীরা বসে নেই। শ্রীশচন্দ্র বিয়ে করবেন না বলে গুজব উঠল। কাগজে শুরু হল নানা গল্প- কথা। এর পরের ইতিহাস আমাদের জানা। বিধবার বিয়ে হল। শ্রীশচন্দ্র ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। কথায় নয়, কাজে। বিদ্যাসাগরের মান রাখলেন শ্রীশচন্দ্র। পরে দীনবন্ধু মিত্র তাঁর ‘সুরধনী’ কাব্যে শ্রীশচন্দ্র সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘সাহিত্য-সবিতা শ্রীশ সুমিষ্ট পাঠক/ বিধবা সধবা করা পথ প্রদর্শক’।

বিদ্যাসাগরের অনুরোধে তৎকালীন বাংলার ছোটলাট হ্যালিডে সাহেব শ্রীশ চন্দ্রকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগ করেন। তখনকার সমাজ শ্রীশচন্দ্রকে পরিত্যাগ করলেও কালীমতিকে নিয়ে তিনি সুখেই দিন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। কালীমতি পড়লেন কঠিন অসুখে। কোনও চিকিৎসাই তাকে সুস্থ করতে পারল না। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই কালীমতি কোনও সন্তান না রেখে মারা গেলেন। রেখে গেলেন বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী উদাহরণ।

পত্নী-বিয়োগে কিছুটা মুষড়ে পড়েন শ্রীশচন্দ্র। সমাজের চাপ ছিল। এদিকে বিধবা বিবাহ তেমন কোনও সাড়া ফেলল না। অথচ এই বিয়ের জন্য কত নিন্দা এবং ত্যাগ স্বীকার করেছেন।

বন্ধুরা অনেক দূরের মানুষ, বিদ্যাসাগর নানান কাজে ব্যস্ত। কিছুটা আপস করে সমাজে ফিরলেন শ্রীশচন্দ্র। প্রায়শ্চিত্ত করে পুনরায় সমাজভুক্ত হলেন। এই কাজ তিনি করেছিলেন অনুতপ্ত হয়ে নয়, সমাজে দাঁড়াবার মতো স্থান করে নিতে। এমন সঙ্কট-সময়েও তিনি বিদ্যসাগরের অনুরোধে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে ভার্সেলিন শহরে টাকা পাঠান।

১৮৭০ সালে বর্তমান উত্তর চব্বিশ পরগনার ‘গোবরডাঙ্গা’, তাঁর জন্মভিটে পৌরসভা হলে তিনি এর প্রথম চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। গোবরডাঙ্গা-খাঁটুরা ছিল বসিরহাট মহকুমার সঙ্গে যুক্ত। বসিরহাট যাওয়া-আসার অসুবিধা, কষ্ট ও অর্থখরচের জন্য তাঁর চেষ্টায় বারাসতে মহকুমা স্থাপিত হয় এবং গোবরডাঙ্গা তার সঙ্গে যুক্ত হয়। গোবরডাঙ্গায় রেলপথ স্থাপনেও শ্রীশচন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। আনুমানিক ১৩০০ বঙ্গাব্দে শ্রীশচন্দ্রের মৃত্যু হয়। শেষজীবনে মায়ের নামে এক শিবমন্দির বানান তিনি। এখনও সেই স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে শ্রীশচন্দ্রের লেখা কথা, ‘সূর্যমণিরগ্রজনুঃ রামধন গেহিনী/ শ্রীশজননীশ যুগমত্র সমতিষ্ঠিপৎ’। শোনা যায়, শ্লোক রচনা করে তিনি বিদ্যাসাগরের কাছে পাঠিয়েছিলেন সংশোধনের জন্য। বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, ‘শ্রীশের রচনা আর দেখিতে হইবে না’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

six + four =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »