Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বিধবা বিবাহ: বিস্মৃত শ্রীশচন্দ্র ও কালীমতি

বিধবা বিবাহ আইন হল। সমাজ এ আইন মেনে নিতে রাজি না। ‘একের দুইবার বিবাহ দিলে’ অন্যের একবারও বিবাহের পাত্র মেলে না– এমত কৌতুক আর শ্লেষে জেরবার বিদ্যাসাগরের কাছে বিধবার পুনর্বিবাহ দেওয়া ছিল ধর্মযুদ্ধের সামিল। এ কাজ তাঁকে করতেই হবে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখলেন, ‘মুখে বলা নয়, কাজে করা যাক’। সনাতনী সমাজের আপত্তি, বাধা, আক্রমণ উপেক্ষা করে কে আসবে বিদ্যাসাগরের পাশে, কেইবা বিধবা নারীকে বিয়ে করতে রাজি হবে! সেই কাজ করতে এগিয়ে এলেন মুর্শিদাবাদে কর্মরত জজ-পণ্ডিত শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। বিদ্যাসাগর যখন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ তখন শ্রীশচন্দ্র ওই কলেজের ছাত্র। বিদ্যাসাগরের প্রিয় ছাত্র এগিয়ে এলেন গুরুদক্ষিণা দিতে। সে-সময় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল যথেষ্ট বৈপ্লবিক কাজ।

শ্রীশচন্দ্র জানতেন, কী কঠিন সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন। তাঁর গ্রাম, তাঁর সমাজ এ বিয়ে মেনে নেবে না। তাও তিনি চললেন গ্রামের বাড়িতে মায়ের আশীর্বাদ নিতে। নিস্তরঙ্গ গ্রামজীবনে অভ্যস্ত মা সূর্যমণি ছেলের এই ম্লেচ্ছ কাজ মেনে নিতে রাজি হলেন না। বাড়ি-বার সর্বত্র দুর্নাম রটল। সনাতনীরা পেছনে লাগল। কুৎসিত ছড়া তৈরি হল তাঁর নামে। সমাজ, না সমাজ– এই ধন্দে শ্রীশচন্দ্র সাময়িক পিছু হটলেন।

বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে ১৫ অগ্রহায়ণ। বিদ্যাসাগর নিজে শ্রীশচন্দ্রের সঙ্গে কথা বলে সব ঠিক করেছেন। পাত্রী বর্ধমান জেলার পলাশডাঙা গ্রামের ব্রহ্মানন্দ মুখোপাধ্যায়ের দশ বছরের বিধবা কন্যা কালীমতি। বর্তমানে পলাশডাঙা বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী ব্লকের অন্তর্গত। বিদ্যাসাগর নিজে দেখে পাত্রী নির্বাচন করেছেন। পাত্রী খুঁজে দিতে বিদ্যাসাগরকে সাহায্য করেছিলেন পলাশডাঙায় কালীমতিদের প্রতিবেশী দুর্গাদাস চট্টোপাধ্যায়। কর্মজীবনে দুর্গাদাসবাবু ছিলেন এক আইন ব্যবসায়ী। থাকতেন কলকাতার বেলতলায়। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা ও বন্ধুত্ব ছিল। দুর্গাদাসবাবুই বিদ্যাসাগরকে এই বিধবা কন্যার হদিস দেন। চট্টোপাধ্যায় পরিবারের উত্তরসূরিরা এখনও সে কাহিনির কথা উল্লেখ করেন। গ্রামের বাসিন্দারাও বংশপরম্পরায় এমনটাই শুনে আসছেন। বিয়ের কারণে এবং নিরাপত্তার জন্য কালীমতিকে এনে রাখা হয় শান্তিপুরে। সঙ্গে আছেন মা লক্ষ্মীমণি।

এদিকে শ্রীশচন্দ্র লোকনিন্দার ভয়ে বিয়ে করতে নাচার! বিদ্যাসাগর প্রমাদ গণলেন। এখন কী হবে? কলকাতায় এবং মফস্বলে জোর গুজব বিদ্যাসাগর এবার কাবু। বিধবা বিয়ে হচ্ছে না। প্রভাকর সম্পাদক লিখলেন, ‘কোলে কাঁকে ছেলে ঝোলে, যে সকল রাঁড়ী/ তাহারা সধবা হবে, পরে শাঁকা শাড়ী।’ এমনকি ইংরেজ পরিচালিত ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকা শ্রীশচন্দ্রকে দুর্বলচিত্ত বলে ব্যঙ্গ করল। সনাতনপন্থীদের চাপে কালীমতির মা লক্ষ্মীমণি মেয়ের ওপর কলঙ্ক আরোপের দায়ে বিভ্রান্ত হলেন, কে বাঁচাবেন তাঁকে এই দুঃসহ অবস্থায়! দাবি উঠল, শ্রীশচন্দ্রের মতো নরাধমের জজ-পণ্ডিতের চাকরি করার কোনও নৈতিক অধিকার নেই। সে সময় জজ-পণ্ডিতরা ইংরেজ আদালতে হিন্দু আইনের ব্যাখ্যাকর্তার কাজ করতেন। কিছুদিন আগে যারা হিন্দুয়ানির কথা বলে শ্রীশচন্দ্রের বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে ছিলেন, তারাই এখন হিন্দুত্বের দোহাই পেড়ে শ্রীশচন্দ্রকে দুষলেন!

সবই লক্ষ্য করছিলেন শ্রীশচন্দ্র। তিনি লক্ষ্মীমণির সঙ্গে দেখা করে বিয়ের দিন ঠিক করলেন। এরপর লক্ষ্মীমণির স্বহস্তে লেখা বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র নিয়ে সোজা হাজির বিদ্যাসাগরের কাছে। ‘লক্ষ্মীমণি দেব্যাঃ’, এই নামে বিয়ের আমন্ত্রণপত্রে লেখা ছিল, ‘২৩ অগ্রহায়ণ আমার বিধবা কন্যার শুভ বিবাহ হইবেক। মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্ব্বক কলিকাতার অন্তঃপাতি সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রীটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম্ম সম্পন্ন করিবেন, পত্র দ্বারা নিমন্ত্রণ করিলাম। ইতি তারিখ ২১শে অগ্রহায়ণ শকাব্দ: ১৭৭৮’।

২৩ অগ্রহায়ণ, ইংরেজি ৭ ডিসেম্বর, ১৮৫৬ আধুনিক বাংলার ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। ওইদিন সন্ধেবেলায় রামগোপাল ঘোষের বাড়ি থেকে বরবেশে শ্রীশচন্দ্র এলেন সুকিয়া স্ট্রিটে রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে। এখানেই পাত্রী-সম্প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বরযাত্রী হয়ে এলেন রামগোপাল নিজে, বন্ধু হরচন্দ্র ঘোষ, শম্ভুনাথ পণ্ডিত, দ্বারকানাথ মিত্র। বিয়ের কোনও অনুষ্ঠানই বাদ গেল না। মন্ত্রপাঠ, কন্যা-সম্প্রদান, উলুধ্বনি, দ্বারষষ্ঠী, স্ত্রী আচার, ঝাঁটা প্রণাম, নাক মলা, কান মলা সবই হল। এরপর ভূরিভোজ। বিদ্যাসাগর একাই দশ হাজার টাকা খরচ করলেন। বিরুদ্ধবাদীরা ঝামেলা পাকাতে পারে বলে যথেষ্ট পুলিশ মোতায়েন ছিল বরের যাতায়াতের পথে। কলকাতায় সেদিন ও পরের ক’দিন খবর একটাই– ধর্মনাশী বিদ্যেসাগর ও তাঁর শিষ্য শ্রীশচন্দ্র।

এমন সাহসী, পথনির্দেশক কাজ করলেন শ্রীশচন্দ্র, যা তখন কেউ স্বপ্নেও ভাবতে চাইতেন না। ছলের কলের অভাব নেই, প্রবাদ যে কতটা তার প্রমাণ মিলল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। শ্রীশচন্দ্র নাকি আরও বড় কোনও প্রাপ্তির লোভে এই বিয়ে করেছেন! এই প্রাপ্তি অন্যের ক্ষেত্রেও ছিল, তারা এল না কেন, সে প্রশ্ন কিন্তু উঠল না!

শ্রীশচন্দ্র এক বিস্মৃতপুরুষ। বিদ্যাসাগরের জীবনীকাররা শ্রীশচন্দ্রের জন্য তিন-চার লাইনের বেশি বরাদ্দ করেননি! আর কালীমতি! কেই বা তার খোঁজ রেখেছে! অথচ বাংলার নারীমুক্তি আন্দোলনে অনুঘটকের কাজ করেছিলেন এঁরা। বিদ্যাসাগরকে চরম লাঞ্চনা, বিদ্রুপ থেকে রক্ষা করেছিলেন শ্রীশচন্দ্র। বিধবা বিবাহ করে তিনি শোরগোল তুলেছিলেন বদ্ধ জলাশয়ের মতো বাঙালি সমাজে। তাঁকে কেন্দ্র করে বাঙালি সমাজ উদ্বেল হয়ে উঠেছিল। অথচ আজ তিনি বিস্মৃত। তাঁর জন্মস্থানেও কেউ তাঁকে মনে রাখেনি। তাঁর পৈতৃক ভিটেতেই তিনি আজ অপাঙক্তেয়।

উত্তর চব্বিশ পরগনার গোবরডাঙ্গার খাঁটুরা গ্রামের চণ্ডীতলায় ১৮৩১ সালে শ্রীশচন্দ্রের জন্ম হয়। তৎকালীন যুগের বিশিষ্ট কথক রামধন তর্কবাগীশের কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন শ্রীশচন্দ্র। মা সূর্যমণি দেবী। দাদার নাম ছিল গণেশচন্দ্র। সুখময়ী ছিল বোনের নাম। কথক রামধন ছিলেন সে যুগের তুলনায় অনেক অগ্রসর। খাঁটুরার পণ্ডিত ভগবান বিদ্যালঙ্কারের টোলে ব্যাকরণ ও সাহিত্য পাঠ শেষ করে শ্রীশচন্দ্র কলকাতায় আসেন। কলকাতায় তাঁদের নিজস্ব বাসস্থান ছিল।

তিনি সংস্কৃত কলেজের ছাত্র শ্রেণিতে ভর্তি হন। মেধাবী ছাত্র শ্রীশচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চোখে পড়েন। বিদ্যাসাগর তখন কলেজের অধ্যক্ষ। সে সময় কলেজের অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন, ভরতচন্দ্র শিরোমণি, প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশ, তারানাথ তর্কবাচস্পতি প্রমুখ যশস্বী অধ্যাপক। এঁদের সাহচর্যে ও শিক্ষায় শ্রীশচন্দ্র কলেজের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। বিদ্যাসাগরের ভাই দীনবন্ধু ন্যায়রত্ন ছিলেন শ্রীশচন্দ্রের সহপাঠী বন্ধু। বৃত্তি পরীক্ষায় শ্রীশচন্দ্র সর্বোচ্চ ফল করলে বিদ্যাসাগর তাঁকে নিজে হাতে পুরস্কার তুলে দেন। কলেজে পড়ার সময় থেকেই বিদ্যাসাগরের সমাজ হিতৈষণা ব্রত শ্রীশচন্দ্রকে প্রভাবিত করেছিল। কলেজে পড়াকালীন সংস্কারমুক্ত প্রগতিশীল যুবকে পরিণত হন তিনি।

কৃতী ছাত্র ছিলেন শ্রীশচন্দ্র। তাই শিক্ষা শেষ করে সংস্কৃত কলেজেই তিনি ‘প্রথম সেক্রেটারি’-র দায়িত্ব পান এবং অচিরেই সাহিত্যের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এই সময়েই তিনি বিদ্যাসাগরে সাহচর্য পান। শিক্ষক বিদ্যাসাগর হয়ে ওঠেন যুবক শ্রীশচন্দ্রের সহকর্মী, বন্ধুস্থানীয় অগ্রজ। পাশ্চাত্য শিক্ষা ও দেশীয় শিক্ষার টানাপোড়েনে এ সময় বাংলায় দুটি বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এরা পাশ্চাত্যবাদী হিউম্যানিস্ট ও ক্লাসিকাল হিউম্যানিস্ট নামে পরিচিত ছিলেন। শেষোক্ত দলের সেনাপতি ছিলেন বিদ্যাসাগর। এই গোষ্ঠীর অন্যতম মুখ ছিলেন শ্রীশচন্দ্র। যে কোনও সংস্কারকেই এঁরা দেখতেন দেশের জল মাটি বাতাসের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। কোন উগ্রতাই আখেরে ফল দেয় না, তা বুঝতেন নিজেদের অবস্থান থেকেই।

বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনের ঘোর সমর্থক ছিলেন শ্রীশচন্দ্র। সনাতনধর্মীরা প্রবল বাধা দিলেও বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়ে যায়। বস্তুত এর পরই শ্রীশচন্দ্র বাঙালি সমাজের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। আইন পাশ হওয়ার কয়েকমাসের মধ্যে বিদ্যাসাগর এমন কোনও মুক্তমনা যুবক খুঁজে পেলেন না, যিনি বিধবা বিবাহ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। নব্যবঙ্গীয়রা এক্ষেত্রে তাঁকে বেশ খানিকটা হতাশই করেছিল। অবশ্য দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় এর আগে রেজিস্ট্রি বিবাহ করে শোরগোল তুলেছিলেন।

সংস্কৃত কলেজের চাকরি ছেড়ে এই সময় শ্রীশচন্দ্র জজ-পণ্ডিতের চাকরি নিয়ে মুর্শিদাবাদে। কলকাতা থেকে অনেকদূরের পথ মুর্শিদাবাদ। সুবে বাংলার রাজধানীতে বসে শ্রীশচন্দ্র লক্ষ্য করছিলেন সব কিছুই। বিদ্যাসাগরের অনুরোধ গেল তাঁর কাছে, বিধবা বিবাহ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। শ্রীশচন্দ্র কোনওকালেই বাক্যবাগীশ ছিলেন না। কথায় নয় কাজে করে দেখাতে হবে। একবাক্যে তিনি বিদ্যাসাগরের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান।

তিনি জানতেন এই কাজ কতটা কঠিন। কিন্তু বিদ্যাসাগর বলেছেন যে! শ্রীশচন্দ্র গেলেন খাঁটুরায় গ্রামের বাড়িতে মায়ের আশীর্বাদ নিতে। মা রাজি নন। সমাজ তো নয়ই! এদিকে কথা দিয়েছেন। বিয়ের তোড়জোড় চলছে কলকাতায়। বিয়ের দিন পর্যন্ত ধার্য হয়ে গেছে। নানা কথা উঠছে চারপাশে। বিরুদ্ধবাদীরা বসে নেই। শ্রীশচন্দ্র বিয়ে করবেন না বলে গুজব উঠল। কাগজে শুরু হল নানা গল্প- কথা। এর পরের ইতিহাস আমাদের জানা। বিধবার বিয়ে হল। শ্রীশচন্দ্র ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। কথায় নয়, কাজে। বিদ্যাসাগরের মান রাখলেন শ্রীশচন্দ্র। পরে দীনবন্ধু মিত্র তাঁর ‘সুরধনী’ কাব্যে শ্রীশচন্দ্র সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘সাহিত্য-সবিতা শ্রীশ সুমিষ্ট পাঠক/ বিধবা সধবা করা পথ প্রদর্শক’।

বিদ্যাসাগরের অনুরোধে তৎকালীন বাংলার ছোটলাট হ্যালিডে সাহেব শ্রীশ চন্দ্রকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগ করেন। তখনকার সমাজ শ্রীশচন্দ্রকে পরিত্যাগ করলেও কালীমতিকে নিয়ে তিনি সুখেই দিন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। কালীমতি পড়লেন কঠিন অসুখে। কোনও চিকিৎসাই তাকে সুস্থ করতে পারল না। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই কালীমতি কোনও সন্তান না রেখে মারা গেলেন। রেখে গেলেন বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী উদাহরণ।

পত্নী-বিয়োগে কিছুটা মুষড়ে পড়েন শ্রীশচন্দ্র। সমাজের চাপ ছিল। এদিকে বিধবা বিবাহ তেমন কোনও সাড়া ফেলল না। অথচ এই বিয়ের জন্য কত নিন্দা এবং ত্যাগ স্বীকার করেছেন।

বন্ধুরা অনেক দূরের মানুষ, বিদ্যাসাগর নানান কাজে ব্যস্ত। কিছুটা আপস করে সমাজে ফিরলেন শ্রীশচন্দ্র। প্রায়শ্চিত্ত করে পুনরায় সমাজভুক্ত হলেন। এই কাজ তিনি করেছিলেন অনুতপ্ত হয়ে নয়, সমাজে দাঁড়াবার মতো স্থান করে নিতে। এমন সঙ্কট-সময়েও তিনি বিদ্যসাগরের অনুরোধে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে ভার্সেলিন শহরে টাকা পাঠান।

১৮৭০ সালে বর্তমান উত্তর চব্বিশ পরগনার ‘গোবরডাঙ্গা’, তাঁর জন্মভিটে পৌরসভা হলে তিনি এর প্রথম চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। গোবরডাঙ্গা-খাঁটুরা ছিল বসিরহাট মহকুমার সঙ্গে যুক্ত। বসিরহাট যাওয়া-আসার অসুবিধা, কষ্ট ও অর্থখরচের জন্য তাঁর চেষ্টায় বারাসতে মহকুমা স্থাপিত হয় এবং গোবরডাঙ্গা তার সঙ্গে যুক্ত হয়। গোবরডাঙ্গায় রেলপথ স্থাপনেও শ্রীশচন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। আনুমানিক ১৩০০ বঙ্গাব্দে শ্রীশচন্দ্রের মৃত্যু হয়। শেষজীবনে মায়ের নামে এক শিবমন্দির বানান তিনি। এখনও সেই স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে শ্রীশচন্দ্রের লেখা কথা, ‘সূর্যমণিরগ্রজনুঃ রামধন গেহিনী/ শ্রীশজননীশ যুগমত্র সমতিষ্ঠিপৎ’। শোনা যায়, শ্লোক রচনা করে তিনি বিদ্যাসাগরের কাছে পাঠিয়েছিলেন সংশোধনের জন্য। বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, ‘শ্রীশের রচনা আর দেখিতে হইবে না’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × five =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »