ব্রেকিং নিউজ
ঘটনাটা নব্বই দশকের। অযোধ্যা পাহাড় তখনও ছিল গভীর বনভূমি। বৃক্ষরা কাঠের বিপণি হয়নি। তার মাঝে ছোট ছোট মনহারা আদিবাসী পল্লি। মাটির দেয়াল, খড়ের চাল, হিজলবেড়ার মধ্যে গোবর নিকোনো উঠোন। কোথাও টাঁড়, তো কোথাও নাবাল ও আবাদি জমি।
অরণ্যের ছই ঘেঁষে শ্রীবাস মাহাতোর জমিদারি আশ্রম। সেখানে তিনি দুর্গামন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন। গর্ভগৃহে মৃন্ময়ী দুর্গা, শিবলিঙ্গ, ঘি, ধূপ, প্রদীপ। শ্রীবাস মাহাতো নিজেকে একজন ঈশ্বর-পুরুষ বলে দাবি করতেন, সেলফ-স্টাইল্ড গডম্যান। বুড়াবাবার (মহাদেব) মর্ত্যের ঐশ্বরিক প্রতিনিধি। ওর চেলারা ওকে ওই-বাবা বলে ডাকে। আশ্রমের সাজিমাটি লেপা দেয়ালের ওপর হর-পার্বতীর ফ্রেস্কো ও সেলফ পোট্রেট চিত্রশিল্পীকে দিয়ে আঁকানো। দেয়ালের ওপর ওর কল্পনাপ্রসূত বাণী লেখা। যেমন— ‘বিনা অপারেশনে সন্ধ্যারে বন্ধ্যা করা’ বা ‘উলাউঠা কালাজ্বর ওই বাবা দিল বর’ ইত্যাদি। সরল গেঁয়ো লোকগুলোকে উনি দীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষা দিতেন। মনে মনে নাম নিয়ে ওর চরণকমলে কেউ মাথা ঠেকালেই প্রণামীর পরিবর্তে মিলত আশীর্বাদের মাদুলি। বাঘমুন্ডির জমিদার মহীপাল সিংদেও ছিলেন ওর বড় পৃষ্ঠপোষক, মন্দির গড়ে তুলতে সাহায্য করেছেন। মহীপাল রাজাবাবু নামেই বেশি পরিচিত।
ধানের গোলা, সবজি বাগান নিয়ে বিস্তর চাষের জমির মালিক ছিলেন ওই-বাবা। প্রায় সবই দখল করা খাসজমি। সেখানে মুখ বুঁজে খাটাখাটনি করত গুটিকয়েক তফশিলি ও আদিবাসী আশ্রমিক। কাজে কামাই নেই। গুরুগৃহের একজন ছিল ছাৎনি গ্রামের ডাইনিবুড়ি কেশরী। ওর ছোট পোলার ছা কালাজ্বরে মারা যাবার পর অপত্য পুত্ররা ডাইনি সন্দেহ করে ওকে পিটিয়ে ঘরছাড়া করেছিল। দুদিন ভয়ে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকার পর ওই-বাবার শরণাপন্ন হয়ে আশ্রমে আশ্রয় মেলে। জগৎটা ওর কাছে ছিল নিঃসীম রিক্ত।
আশ্রম লাগোয়া সবুজ বনানীতে বেশুমার শাল, কেঁদ, কুরচি, গামার, মহুয়া বন। কাঁকুরে লালমাটির একটা প্রয়োজনীয় পথ ঝোপঝাড় চিরে জঙ্গলের দিকে চলে গেছে। সেই পথ ধরে বুড়ি কেশরী জঙ্গলে গিয়েছিল হালকা হতে।
হরীতকী গাছের গোড়ায় একটি কাঁটাচুয়া কুটুর কুটুর গাছের ছাল চিবোচ্ছে। গর্তজীবী নিশাচর প্রাণীটিকে দেখে কেশরীর কপালে ভাঁজ, চিন্তার রেখা। সাধারণত এরা দিনের বেলায় বেরোয় না। কেশরীকে দেখে শজারুটা ভয়ে একটা গহ্বরে আত্মগোপন করল। পাহাড়ে জংলি জানোয়ার সাবাড় হচ্ছে নিয়মিত। সরকারের হেলদোল নেই। বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। গরিব আদিবাসীরা শজারু শিকার করে খায় শরীরে প্রোটিনের প্রয়োজনে। কেশরীর আশঙ্কা, জঙ্গলে কাঠুরেগুলোর নজরে পড়লে তখনই মেরে খাবে শজারুটিকে। কেশরীর কাছে খবরটা জানতে পেরে ওই-বাবা তক্ষুনি ওর নিজস্ব ভৃত্য কালোকুলো, দোহারা চেহারার সাঁওতাল যুবক মঙ্গল মুর্মুকে নির্দেশ দিলেন শজারুটাকে ধরে আনার।
একটা গাছের ফাঁপা গুঁড়ির গোঁড়ায় বাদামি শস্যদানার মতো শজারুর বিষ্ঠার ডাঁই। গুঁড়ির চারপাশে শাখাপ্রশাখায় বিস্তৃত অনেকগুলো গর্ত। একে একে গর্তগুলোয় কাঠি গুঁজে নাকে ধরে দেখল বুনো গন্ধ আছে কি না। এইভাবে অভিজ্ঞ মঙ্গল নিশ্চিত হল নির্দিষ্ট কোন গর্তে শজারুটার বাসা। গর্তটির মুখে ফাঁদ পেতে, অন্য গর্তে খড় পুড়িয়ে ধোঁয়া ছেড়ে মঙ্গল শজারুটাকে বিল থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করল। এরপর নুনের টোপ দিয়ে খাঁচায় ভরে সটান আশ্রমে নিয়ে এল। ছাউনি করে তৈরি হল শজারুর বিবর। গুহা থেকে মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসে শজারুটা, মানুষ দেখলেই গর্তে ঢুকে যায়। কাঁচা সবজি, নুন ওর খুব প্রিয়। কেশরী আদর করে ডাকে করালি। আরণ্যক প্রাণী আবাসিক হল। কালে কালে শজারুর গায়ে বেশ করে গত্তি লাগলে তখন ওটাকে মেরে মোচ্ছব হবে কি না সেটা ভগাই জানে!
আশ্রমে ঘুরতে আসা ভ্রামণিকরা শজারুর কাঁটা কেনে। মেয়েদের খোঁপার শ্রীবৃদ্ধি, বামুনের উপনয়নে কান ফোঁড়ানো, এমত বিভিন্ন কাজে লাগে কাঁটা। একজন ইউনানি হাকিম কাঁটা সংগ্রহ করত ওর রুগির চিকিৎসার জন্য। কেশরীর সঙ্গে একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠল শল্লকীর। ওকে সাবধানে নড়াচড়া করতে হয়। একবার অসতর্ক হওয়ায় তালুতে কাঁটা ফুঁড়ে ছিল। রক্তমুখে যন্ত্রণা। কেশরীর সোহাগের শাসন— ‘বে-লজ্জাহি ছুড়ি, তুই আজ খাতে পাবি নাই।’
খবর পেয়ে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বিট অফিসার ফণি পাঁজা আশ্রমে এসে হাতেনাতে ধরলেন শ্রীবাসকে। ফণিবাবু ফণা তুলে বললেন— ‘আগে একটা প্যাঙ্গোলিনকে হত্যা করে তার আঁশ পাচার করার কারণে তিন রাত হাজতে কাটাতে হয়েছে আপনাকে। আপনার গোয়ালঘরে মৃত হরিণশিশু ও বাড়িতে ভালুকের চামড়া পাওয়া গিয়েছিল। শুধরে যান, না হলে উচিত ব্যবস্থা হবে। হরদম ময়ূর, খট্টাস, খরগোস— যা পাচ্ছেন শিকারি পাঠিয়ে ধরে আসছেন। দেখুন, এটা বিপন্ন প্রজাতির মালায়ান স্পিসিসের শজারু, মাদী। ক্রমশ জঙ্গল থেকে এরা উধাও হচ্ছে। একে বাঁচানো দরকার। বন দফতরের লোক এসে এটাকে নিয়ে যাবে।’
মাস্টারের সাফাই— ‘জঙ্গলে এইসব প্রাণী এমনিতে মারা পড়ছে। এটাও বাঁচতে পারব্যেক না। যখন খুশি নিয়ে যান। জ্বালা নাই।’
একাডেমিক শিক্ষাবিহীন ওই-বাবা একজন সনাতনী বৈদ্য বটে। ওর হেকিমিতে উনি রীতিবহির্ভূত ওষুধের চর্চা করেন। ওর কবিরাজিতে আয়ুর্বেদ, ইউনানি, ঐতিহ্যবাহী চৈনিক পদ্ধতি ঘুলে-মিশে একাকার। আদিবাসী ও তফশিলি জনজাতি, এমনকি উচ্চবর্ণের মানুষেরও এই আজগুবি চিকিচ্ছেতেই ভরসা। জনরব ছড়িয়েছে জঙ্গলমহলে। পাশের রাজ্য থেকেও রোগীরা আসে। ভিন্ন ভিন্ন বন্যপ্রাণীর দেহাংশ শুকিয়ে হামানদিস্তায় গুঁড়ো করা হয়। বিযুক্ত ভেষজ যেমন অশ্বগন্ধা, কালমেঘ, শালপর্ণি, তুলসী, অমলতাস, শিরিষ ইত্যাদি গাছের ছাল ও পাতা জলে ধুয়ে গরমজলে সেদ্ধ করা হয়। এবার ছেঁকে নেয়া ওই ভেষজের রসে মেশানো হয় প্রাণীর দেহাংশের কণিকা। এরপর মায়ের আশীর্বাদ ও মারাং-বুরুর দোয়া, দুইয়েরই মুষ্টিযোগে তৈরি হয় ধন্বন্তরি। জঙ্গল থেকে ঔষধি গাছ সংগ্রহ ও বন্যপ্রাণী জ্যান্ত ধরে আনার দায়িত্ব সামলায় মঙ্গল। শারীরিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক রুটে অশ্বিনীকুমারের রোগনাশক বটিকা তৈরি হয়। ব্র্যান্ডের নাম ‘বুড়ো সন্ন্যাসী’। কোনও এক আরবান ইন্টেলেকচুয়াল, শ্রীবাসের সঙ্গে খেজুর করবার সময় আইকনিক ওল্ড মঙ্ক নামক রামের পাইট সাবাড় করতে করতে নামের থিমটা বিলিয়েছে।
ময়ূরপুচ্ছের ভস্ম, প্যাঙ্গোলিনের আঁশ, গিরগিটির ল্যাজ, হরিণের শিং, বনশুয়োরের দাঁত, বনমোরগের পালক, শামুখের খোল— এসব উপাদান ওর মৃতসঞ্জীবনী ওষুধ তৈরি করতে কাজে লাগে। মানসিক অবসাদ, বমি, হিক্কা, শ্বাসযন্ত্রের ব্যাধি, বন্ধ্যাত্ব, ক্যানসার, যক্ষ্মা, নানাবিধ বিকার-বৈকল্যে আক্রান্ত পীড়িতদের চিকিৎসা হয়। অনেক সময় সরল মানুষগুলো বোঝে না ওষুধের মাধ্যমে তিনি ওদের মহাপ্রস্থানের পথ বাতলে দিচ্ছেন। আদিবাসী বা জনজাতি সমাজে এই ঐতিহ্যগত ছেঁচাকোটা ওষুধ মডার্ন মেডিসিনের চেয়ে ভিন্ন। প্রকৃতিপ্রেমী জনজাতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই চিকিৎসা ওরা নিজেদের কৃষ্টিসভ্যতার অংশ হিসাবে অন্তঃস্থ করেছে।
বাস্তুতন্ত্র ভারসাম্যর টুঁটি টিপে পাহাড়ে জন্তুজানোয়ার চোরাশিকারে নির্বংশ হচ্ছে নিয়মিত। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়তে গিয়ে বিশাল অরণ্য ধ্বংস হয়েছে। অরণ্যপ্রাণীর ডেরাগুলো হাপিস। ন্যাড়া জঙ্গলে হাতি, ভালুক, বাঘ গায়েব। মাইনর ওয়াইল্ড-লাইফ কিছু রয়ে গেছে। এরাই এখন মাস্টারের রোগাপনয়নের উপকরণ।
শজারুর পরিপাকতন্ত্রে উদ্ভিদ ভিত্তিক অজীর্ণ খাদ্য পাথুরে পিণ্ডতে পরিণত হয়। পেটে গদ হয়ে থাকা পিণ্ডটি ডেঙ্গু জ্বর, বহুমূত্র, ক্যানসার রোগের প্রতিষেধক। যদিও এর নিরাময়মূলক বৈশিষ্ট্যর কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এই রক্তলাল পাথরিটি রোদে শুকিয়ে নিরুদ অবস্থায় গুঁড়ো করে শালপর্ণির রসে সিরাপ বানিয়ে রোগীকে খওয়ানো হয়। উনি চিকিৎসাপদ্ধতি বাস্তবে হাসিল করেছেন ইউনানি বিশেষজ্ঞ ডক্টর মোহম্মদ আনিসের ছাত্র ইকবাল রসুল নামে এক সার্টিফায়েড ইউনানি হাকিমের কাছ থেকে। শ্রীবাসের পরিচিত ইকবালের সাকিন পুরুলিয়ায়। ইকবাল চীন দেশে চাইনিজ মেটেরিয়া মেডিকা নামক এক কর্মশালায় যোগ দিয়ে ট্র্যাডিশনাল চাইনিজ মেডিসিন (টিসিএম) শিখে এসেছেন। ইকবালও চায় শ্রীবাসের প্রভাব-প্রতিপত্তিতে জঙ্গলমহলে এই চৈনিক পদ্ধতির চিকিৎসা ছড়িয়ে পড়ুক।
মহীপাল সিংদেও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছেন, মেটাস্ট্যাসিস হয়ে ছড়িয়ে কিছুটা। কেমোথেরাপি, অপারেশন, ডাক্তারবদ্দি, সবই হয়েছে। বাহুতে মানতের ঢিল বেঁধে একটা চান্স নিলেন ওই-বাবার টোটকার ওপর।
সিংদেওবাবুর প্রতি শ্রীবাস মাহাতো ঋণী। ওর খুঁটির জোরে শ্রীবাসের বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনের কেসটা আপাতত ঠান্ডাঘরে। ঈশ্বর-প্রেরিত শজারুটা এখন ওর হেফাজতে। ঋণ পরিশোধ করার সুযোগ সামনে।
ভাবলেন শজারুটিকে লুকিয়ে রাখা দরকার কাজ মেটা না অব্দি। ‘কেশরী এখন বাদাড়ধারে যা। সময়টা প্যাচড়া চলছে বঠে। দু’চারদিন কোনঠিন আড়ায় থাকবি সাহিটাকে নিঞয়ে।’
ফরেস্ট গার্ডরা এল শজারুটাকে নিতে। জন্তুটা নাকি আগের রাতে উধাও হয়ে জঙ্গলে লুকিয়েছে। চারদিকে নজর ঘুরিয়ে কারচুপি বুঝে ফণিবাবু মনে মনে শ্রীবাসের মা-বোনকে এক করে ফেললেন। দেহাতিদের মধ্যে ওই-বাবার বিস্তর প্রভাব। তখনকার মতো ইঞ্চি মেপে ফণিবাবু ফিরে গেলেন।
খোলা আকাশের নীচে জঙ্গল জান্তবটিকে নিয়ে রাত কাটানো মুশকিল। বুকভরা অপত্যস্নেহ। শজারু নিয়ে জঙ্গলে থাকতে কেশরীর ভয় হয়। আদিবাসী মরদগুলো কুড়াল নিয়ে জ্বালানির কাঠ নিতে জঙ্গলে ঢোকে। মাগগুলো আসে কেন্দ পাতা কুড়াতে। বাগাল গাই-বকরিগুলোকে নিয়ে ঘাস জমিনে ঘোরাঘুরি করে। একবার শজারুর হদিশ পেলে ওরা ধরে নিয়ে যাবে। সবার নজর এড়িয়ে খাঁচায় পোরা শজারুকে আড়ালে রাখা রীতিমতো চ্যালেঞ্জ।
দুপুরে একপশলা বৃষ্টি হল। আগের রাতে কেশরী কাঠ জ্বালিয়ে শুকনো পাতার আবডালে রাত কাটিয়েছে। ঘরতাড়ানি হয়ে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকার সময় একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আষাঢ়ের ভেজা মাটি, কালো আকাশ। আবার বৃষ্টি হবে। মশা আর পোকামাকড়ের রাজত্বে অগভীর বনে আগাছার ঝোপঝাড়ে রাত কাটানো বিপজ্জনক। কেশরী আশ্রমের পথে হাঁটা লাগাল। অশক্ত শরীর, খাঁচায় বন্দি আড়াই ফুটিয়া বতরুকে বয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন। কলজের ধুকপুকুনি নিয়ে নাকানিচোবানি খেতে খেতে ফিরে এল বিকেলবেলায়। সারা রাত কেশরীর চোখের পাতা এক হয়নি। মলিন দুঃখী দুঃখী চোখের দু’কোণে পিচুটি।
ওই-বাবা যৎপরোনাস্তি কুপিত কেশরীর ওপর। এবার ধরা পড়লে ওয়াইল্ডলাইফ প্রটেকশন অ্যাক্ট-এ পার্সেল হয়ে যাবেন শ্রীঘরে। লজ্জায় মাথা হেঁট হবে। একবার ভাবলেন শজারুটাকে ছেড়ে দেবেন জঙ্গলে বা বন দফতরের হেপাজতে পাঠাবেন। কিন্তু রাজাবাবুর প্রয়োজনটাও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
বিকেল জমে গোধূলি। বৃষ্টিমাথায় দুটি আগন্তুকের আবির্ভাব হল সহসা। একজন রোগা, ভাবুক ভাবুক চেহারা, মুখে দাড়ি। উনি কবি। জঙ্গল নিয়ে কবিতার বই লিখেছেন। অন্যটা সাংবাদিক, দশাসই, চেহারায় স্মার্ট। অযোধ্যা পাহাড়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কুফল বা সুফল নিয়ে স্টোরি করবে। এমন দিগ্গজ দুজনকে পেয়ে অতিথিসেবক শ্রীবাস খুশি। অচিরেই গার্হস্থ্য আশ্রমে ওদের থাকার ব্যবস্থা হল।
পাশের একচালা কুঠুরিতে শজারুটাকে কয়েদ করে রাখা। কালকের মধ্যেই কিছু একটা ব্যবস্থা হবে। হয় জঙ্গলে ছেড়ে দেবেন অথবা শজারুটাকে মারবেন রাজাবাবুর চিকিৎসার প্রয়োজনে। কেশরী ওকে পুজোর নৈবেদ্যের শসা-কলা খেতে দিয়েছে। আদর করে করালির নাকে, পায়ের নখে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। নিজের সঙ্গে এই ক্ষুদ্র জীবটার অস্তিত্বের অনেক মিল। বেঁচে থাকা না থাকা অন্যের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। কেশরী আজ খানিক বেপরোয়া। সে কোনও প্রেতাত্মা নয়, মানুষ। মঙ্গলের কাছে মহুল চাইল। মঙ্গল তখন রোজকার মৌতাতে মশগুল। ও অবাক। মহুলের জালাটা হস্তান্তর করতে করতে ওর গালি— ‘ঘর তাড়ানি মাগি ইঠিনকে মহুল্যা ঢুকাতে আসেছিস? মহুল্যা ঢুকায়, ইবার কার খাপরে ঢুকবি?’
গত দুদিন কুরকুট (পিঁপড়ের ডিম), বুনো আমলকী খেয়ে কেটেছে কেশরীর। খিদে হজম করে শুকিয়েছে তলপেট। ভুখা অন্ত্রে অগ্নিজল, ফুসফুসে বিঁড়ির বিষ ধোঁয়া। শজারুটা পিদিমের নরম আলোয় হাত-পা বের করে সারা ঘরজুড়ে ঘুরঘুর করছে। আজ আর খাবার জুটবে না। কেশরীর অনাহারে থাকা অভ্যাস আছে। কিন্তু আজ ও মরণ খিদে মারবে মদ খেয়ে।
বাইরেটা কৃষ্ণমেঘে চেরাপুঞ্জি। চালার কানা থেকে জলের ফোঁটাগুলো টুপটুপ করে ঝরছে। ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। যুবতি রাত। নেশাড়ি আবহাওয়া। দুই অভ্যাগত শ্রীবাসের সঙ্গে এমন আলাপ করছে যেন সাতপুরুষের সম্পর্ক। চুক চুক করে ইংলিশ মাল, ফস করে আরেকটা সিগারেট। সমানে চলল বাকতাল্লা। ওরা নাকি ওই-বাবার জনদরদি কার্যকলাপ ওদের স্টোরিতে হাইলাইট করবে। কাগজে বেরবে ওই-বাবার ছবি।
বাঁশবনে হাওয়ায় ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ। ঝিঁঝিঁ পোকার সিম্ফনি। বৃষ্টি ধরতেই আঁধারে জীবদ্যুতির আলো ঝিকিয়ে জোনাকিদের উড়ান। মৃত রাত জেগে উঠল প্যাঁচার ঘুৎকারে। কেমন যেন ভূতুড়ে বাতাবরণ। বাতাসে বুনো জান্তব গন্ধ, অদ্ভুত ঝুমঝুম শব্দ। শজারু যখন হাঁটে তখন ওদের ল্যাজে ওরকম শব্দ তৈরি হয়। একে অন্ধকার, তার ওপর অপরিচিত পরিবেশ। মাননীয় অতিথিরা ঘাবড়ে গেছে।
—‘মাস্টারমশায় অদ্ভুত শব্দটা কীসের?’
—‘একটা সাহিকে (শজারু) জঙ্গল থেকে আনে ঢুকাইন দিছে। ওটা পাশের ক্যুড়াটায় আছে। সাহিটা গাগাচ্ছে, আর মদ ঢুকায়ে হারামজাদি মাগিটা গোঙাচ্ছে।’
— ‘শজারু?’ একটা কৌতূহলজনিত উত্তেজনা গ্রাস করল ওদের।
এবার শজারুর অন্ত্রের পাথুরে পিণ্ড ব্যবহার করে হাতুড়ে পদ্ধতিতে রাজাবাবুর প্রস্ট্রেট ক্যানসারের নিরাময়ের টোটকা তৈরি হবে জেনে ধর্মপুত্তুররা টান টান হয়ে বসল। পত্রকারের নিভু নিভু চোখদুটো সহসা উজ্জ্বল। ইউনিক স্টোরি। অন্যদিকে বনের সবুজে অকূলে কূল পাওয়া কাব্যিক থিম পেয়ে হর্ষ ব্যক্ত করল কবি।
এবার বার্তাজীবীর ইনট্রো শুরু— ‘‘আফ্রিকা বা সাউথ আমেরিকার ব্রাজিল, হাইতি দেশগুলোর নাম শুনেছেন? ‘ভুডু’, যাকে বলে ডাকিনী বিদ্যা। তান্ত্রিকদের মতো মানুষ ঠকানো জাদুকরী কেরামতি না। মানুষের হিতে ওখানে ধর্মযাজকরা অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা করেন মরা পশুপাখির শুখা দেহাংশকে সংরক্ষণ করে। অনেকটা আপনার মতো চিকিৎসা পদ্ধতি। ওদের বিশ্বাস, মৃত প্রাণীর আত্মা রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে। অনিদ্রা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যাথা, মনে বিষণ্ণতা, ক্যানসার, এইডস ইত্যাদি নানা ধরনের অসুখের নিরাময়ে এদের প্রয়োজন। পৃথিবীর সবথেকে প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্র। আধ্যাত্মিক তন্ত্রে যাজকরা সেই আত্মাকে উজ্জীবিত করে। চীনে গণ্ডারের শিং গুঁড়ো করে মদে মিশিয়ে খাওয়ানো হয় ক্যানসার রোগের নিরাময়ের জন্য। শজারুর পাকস্থলীতে হজম না হওয়া উদ্ভিজ্জ সেলুলোজ ভেষজ তৈরিতে ব্যবহার হয়। ডেঙ্গু জ্বর, এইডস, এপিলেপ্সি ও ক্যানসারের চিকিৎসা হয়। কালোবাজারিতে এর বিরাট চাহিদা। চীনে শজারুর ব্রিডিং সেন্টার আছে। আমাদের রাজ্যে আপনি একমাত্র মেডিকো যিনি একই সাথে ডাকিনী-বিদ্যার ফুঁ মিশিয়ে চিরন্তন চৈনিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা করছেন। এই রোগমুক্তির চিকিৎসা শিখলেন কীভাবে?’’
গল্পের ঝোলঝালে সবকিছু গুলিয়ে গেল মূর্খ শ্রীবাসের। বেবাক ঘোষণা দিল কাল সকালে শজারুটার একটা গতি হবে।
সাংবাদিকটি ইতিমধ্যে পুরো অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট চেখে দেখেছেন। খরগোশ, হরিণ, সাপ, পায়রা, ইঁদুর, বাঁদর, হাঁস, যাবতীয়। হিংস্র প্রাণীরা শজারু দেখলে এড়িয়ে চলে। কিন্তু সবচেয়ে খতরনাক শিকারি মানুষের কাছে শজারুর মাংস ডেলিক্যাসি। এখানে শজারু খাওয়ার সুবর্ণসুযোগ। অন্যদিকে ভাবুক কবির দুরারোগ্য ব্যাধির মতো বড় কবি হয়ে অমর হওয়ার ভূত চেপেছে। সাপ ব্যাঙ নিয়ে প্রচুর লিখেছেন। ঠিকমতো একটা সাবজেক্ট পাচ্ছিলেন না। এবার মা সরস্বতীর একটা গাট্টা খেলেই প্রকৃতির জুজু শজারুকে নিয়ে কবিতা লিখে ফেলবেন। বহু পত্রিকার সম্পাদক ওর কবিতার অপেক্ষায়।
—‘আচ্ছা মাস্টারমশায়, শজারুটাকে যখন মারবেনই সকালে কেন? জানাজানি হলে ঝামেলায় পড়বেন। আসলে শজারু একটি বড় সাইজের ইঁদুর। ক্ষতিকারক জীব। ওদের সংস্পর্শে মানুষের জলাতঙ্ক রোগ হয়। শজারুকে আদর করা যায়, ভালবাসা যায় না।’
গুল্প শুনে মাস্টারের মাথা গুলিয়ে গেল। অতশত না বুঝে তক্ষুনি শজারুর জন্য মৃত্যুর সমন জারি করে ফেললেন।
মাতাল মঙ্গল তৈরি ছিল। আগে ও শজারু পুড়িয়ে খেয়েছে। আগে সামনের পাদুটো কাটতে হয়, পরে চিৎ করে গলায় কোপ। কাঁটা এড়িয়ে চামড়া ছাড়াতে হয় সাবধানে।
এদিকে ভুখা পেটে গুড়ে জাল দেওয়া বিষ মহুয়া সাটিয়ে কেশরীর ভোগের বাঁশি বেজে গেছে। ধমনি ফাঁপছে, রক্তচাপ কমে নাড়িঘাত দক্ষিণমুখী। মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা, উদরপীড়া, শ্বাসকষ্ট, হলুদ পিত্তবমি, কেশরী উঠতে পারছে না। গলায় গোঙ্গানি। জল চেয়েছিল। উঠে বসতে গিয়ে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পেল। ধড়ফড়ানি বকেয়া রেখে কেঠো শরীরটা নেতিয়ে পড়ে রইল মেঝেতে। তেল ফুরনোয় শেজবাতিটা দুবার দপদপ নেচে নিভে গেল। ঘরময় নিস্তব্ধতা ছেয়ে।
ঘরে ঢুকে হারিকেনের আলোয় মঙ্গল দেখল অর্ধনগ্ন কেশরী অচেতন হয়ে পড়ে আছে। ওর ঠেঁটি কাপড়ে মুখ গোঁজা শল্লকীর। আগে জবুথবু শজারুটাকে খাঁচায় পুরে ধরে আনতে কোনও বেগ পেতে হয়নি মঙ্গলের। কিন্তু এবার আর ওকে দেখে ডরাল না সাহিটা। বর্তুলাকারের বদলে সটান শরীর। মঙ্গলের দিকে এগিয়ে এল লঘু ছন্দে। রোমকূপ ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে খরধার চিক্কণ মজবুত সাদা কালো শলাকা। নেশাগ্রস্ত মঙ্গলের ঝিম ধরা মাথা। ওকে কাবু করার আগে অতর্কিতে শজারুটা কাঁটা খাঁড়িয়ে মিশাইলের মতো মঙ্গলের উলঙ্গ ঠ্যাংকে শরবিদ্ধ করল। মঙ্গল হতচকিত। থরথর কাঁপছে রাগে ও যন্ত্রণায়। কলম ঝোলা পা নিয়ে দৌড়ে গেল নিজের ঘরে। আলো-আঁধারির মধ্যে এদিক-ওদিক খুঁজে টাঙ্গি নিয়ে বেরিয়ে এল। পাগলের মতো কুঁড়েতে ঢুকে শজারুর কোমল দেহে সবেগে কোপ। একটি আঘাতই ছিল শজারুর পক্ষে এন্তার, বাকিগুলো অবান্তর। মুহূর্তে রক্তের ফিনকি। অবলার আর্তনাদ— গওক, গওক, গওক। ধড়ফড় করে উঠল শরীর, অসহ্য যন্ত্রণায় খানিকক্ষণ খাবি খেয়ে নিস্তেজ হল দেহ। চেতনা অবশ। বেহুঁশ কেশরী কিছুই টের পেল না।
ঘটনার আচমকা মোড়, মাস্টার বিচলিত। আশ্রমিকরাও হতভম্ব। কেশরী নীরবে গঙ্গা পেয়েছে। আহত প্রত্যয়ে মঙ্গল ফুঁপিয়ে হাপু গাইছে। আকস্মিকতায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জ্ঞান-গরিমার অফুরান ভাণ্ডার অতিথিদুটোর নেশা চটকে গেছে। ঘন ঘন সিগারেটে ফুঁক। খবর পেয়ে দেহ নিতে আসেনি কেশরীর পুত্ররা। জানাজানি হওয়ার আগে শজারুর লাশ গায়েব করে দিতে হবে। থম মারা বাতাবরণ। গুরুসেবকদের চোখের কোণে অশ্রুকণা। কাপড়ে ঢাকা বেওয়ারিশ কেশরী, রক্তের কাফনে মোড়া ক্ষতবিক্ষত শজারুটাকে নিয়ে গেল দহের পাড়ে বাদাড়ে পোড়ানোর জন্য। নিজেকে নিরেট বেওকুফ প্রমাণ করে শ্রীবাস মাথা আঁকড়ে পড়ে রইলেন। গুবলেট হয়ে গেল, শেয়ালবুদ্ধি অতিথিদুটোর শজারুর বার-বি-কিউ চাখা হল না।
ভোর হওয়ার আগে তারাখচা আকাশের নীচে সমাজ অন্ত্যজ এক পরিত্যক্ত পশুপ্রেমী ও এক নিরীহ প্রাণী সর্বভুক চিতার আংরায় জ্বলছে পাশাপাশি। জোড়া লাশের পোড়া বু। ভিজে ওঠে চোখ। কেশরীর শবদাহ হল আশ্রমিকদের হাতে। রাত শেষে ভোর আসে।
কালপেঁচাটা ডেকে উঠল। প্রত্যুষে মন্দিরে ঘণ্টাধ্বনি, আশ্রমগৃহীদের দুর্গা বন্দনা। ‘জয় ভগবতী দেবী নমো। জয় পাপ বিনাশিনী বহু ফলদে। জয় শম্ভুনিশম্ভু কপাল ধরে।’ চিতার ধোঁয়ায় দেবীর অকালবোধন।
ঘটনাটা ধামাচাপা পড়ে ক’দিন নির্বিঘ্নে কাটল। শজারুর পরিণতির কথা কাকপক্ষী টের পেল না। মনখারাপ করা আশ্রমিকদের বাধ্যতামূলক মুখে ছিপি।
এরপর একদিন আশ্রমে ডিজেলের হ্যাচ্চ থামিয়ে একটা অলিভ রঙের জিপ এসে থামল, খট খট বুটের শব্দ। যারা এলেন তারা খুবই চেনা। বাঘমুন্ডি থানার উর্দিধারী মেজবাবু সঙ্গে বন দফতরের ফণি পাঁজা। বন্যপ্রাণী হত্যার স্বতঃপ্রবৃত্ত তহমত লাগিয়েছে পুলিশ। কলকাতার খবরের কাগজে টাটকা খবর। অযোধ্যা পাহাড়ে শ্রীবাস মাহাতো ওরফে ওই-বাবা নিয়মিত বেআইনিভাবে বন্য জন্তু-জানোয়ার মেরে চৈনিক ফরমুলায় চিকিৎসা করেন। হালে বনদফতরের নির্দেশকে উপেক্ষা করে একটি জংলি শজারুকে হত্যা করেছেন চিনা ফরমুলায় ক্যানসারের ওষুধ বানানোর জন্য। এতে শুধু বন্যপ্রাণী নিধন হচ্ছে তা না, উদ্ভট চিকিৎসায় নিরীহ জনজাতি মানুষদেরকেও ঠকিয়ে ক্ষতি করছেন।
ছবি-সহ ব্রেকিং নিউজ ফাঁস করেছে ঝড় শেষে কেটে পড়া ওই-বাবাকে বিখ্যাত করার ঠিকা নেয়া সাংবাদিক। অচিরেই হয়তো প্রকাশ পাবে শজারু নিয়ে মজারু করা কবিতা।
অসুস্থ অবস্থাতেও রাজাবাবু চেষ্টা করেছিলেন পুলিশকে বাগে আনার। টাকা খাইয়ে বা শাসকদলের কোনও নেতাকে ধরে। চেষ্টা সফল হয়নি। কাছারিতে বেল করানোর জন্য উকিলের যুক্তি ধোপে টিকল না। জেলখানার রিম্যান্ডে পাঠান হল ওই-বাবাকে।
চিত্রণ: ধৃতিসুন্দর মণ্ডল








One Response
বাহ: , পীযুষ বাবুর এই গল্প পড়ে ,আমি মুগ্ধ। কি সাবলীল ,তাঁর লেখন শৈলী, পুরুলিয়ার স্থানীয়দের/ জনজাতিদের মুখের ভাষা, কত সুন্দর ভাবে ,উনি ,তাঁর এই লেখাতে ব্যাবহার করেছেন । এই গল্পের মাধ্যমে , লেখক আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন , কি ভাবে আমরা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে আমাদের জঙ্গল, বিরল উদ্ভিদ ও বিপন্ন প্রাণীদের ধংস করে চলেছি । পীযুষ বাবুর লেখা, ছোট বড় বহু রোমাঞ্চকর ভ্রমণকাহিনী, গল্প আমি আগেও পড়েছি,তাই নির্দিধায় বলতে পারি , উনি শব্দের কারিগর , বর্তমান বাঙলা সাহিত্য ,ওঁর কাছে চিরঋণী থাকবে। ওনাকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।