নচিকেতা হে
মানুষ বাড়ি বানায় বসবাস করার জন্য। একটা ঘর, বারান্দা, রান্নার জায়গা আর শৌচালয়। তাতেই মানুষ বাস করতে পারে। মানুষ বলতে একক মানুষ। মানুষ একা থাকতে চায় না। নিজেকে দেখানোর জন্য বা অন্য মানুষ থেকে প্রাপ্যটা নেওয়ার জন্য সে মানুষ খোঁজে। সংসার হয়। তখন শোওয়ার ঘর, বারান্দা, রান্নাঘর, শৌচালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় ঠাকুরঘর। মানুষ যখন দুই হয়, স্বাভাবিকভাবে তার পরিজন বাড়ে, তখন বাড়ি আরও বড় হয়। একটা অতিথি নিবাস হয়। আত্মজনেরা আসে, মানুষটাকে দেখে। পরিশ্রমী, সৎ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। বাক্যটা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষটা দ্রষ্টব্য হয়। অনেকে তাঁকে দেখতে চায়, কেউ কেউ দেখতে আসে। বাড়িটার সঙ্গে একটা বসার ঘর বা আপ্যায়নের জন্য ঘর যুক্ত হয়।
তখন বাড়িটায় বারান্দা, শোয়ার ঘর, রান্নাঘর, ঠাকুরঘর, অতিথি ঘর, বসার ঘর, শৌচালয়। দিন যায় সংসারে মানুষ বাড়ে। শিশু জন্মায়, নতুন অতিথিকে লালন-পালন করতে করতে তার জন্য একটা পড়ার ঘর করতে হয়। কারণ সবার মুখের ওপর তো পড়াশুনা করা যায় না। এসব না করে মানুষটা পারে না। কেমন যেন যন্ত্রের মতন মনে হয় নিজেকে। একদিন বাড়িটার চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখে, একটা মানুষের কত প্রয়োজন। বাড়িটা দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে বেড়েই চলেছে। মানুষটা ভাবতে থাকে আরও কত প্রয়োজন হতে পারে।
[২]
সে যখন বাড়ি করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন এখানে কোনও বাড়ি ছিল না। একদিন লোকজন নিয়ে এসে নিজের কেনা জমিটার চারটে কোণ আবিষ্কার করল। সূর্য তখনও আদিত্য হয়ে ওঠেনি। সেই আলোয় সে আবিষ্কার করল, তাঁর জমিতে অন্যরা বসবাস করছে। লোকগুলো বলল, ‘বাবু, সাফ করি?’ সবার হাতে অস্ত্র প্রস্তুত, রোদ অস্ত্রগুলোকে উস্কাচ্ছে। মানুষটার মায়া হল। দু’হাত তুলে সবাইকে অপেক্ষা করতে বলল। কত রকমের লতা-গুল্ম জমিটার বুকের লোমগুলো খামচে ধরে শুয়ে আছে, যেন বাবার বুকে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। সে ছাড়া সবাই লতা-গুল্মগুলো পায়ে ডলছিল। তাদের তর সইছিল না। মানুষটা বলল, ‘এসব না কেটে হয় না?’ কথাটা শুনে লোকগুলো হেসে উঠেছিল, না কাটলে জায়গা পাচ্ছি কোথায়? পরিষ্কার হবে, মাপ হবে তারপর তো ঘরের কথা। মানুষটা কোনও উত্তর করতে পারেনি, মুখ দিয়ে বেরুল, ‘ওঁসহ না ববতু’। হে ব্রহ্ম-পুরুষোত্তম আমাদের সহভাবে রক্ষা করুন।
লোকগুলো তাঁর কথার কী বুঝল কে জানে, ওকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বলল, ‘নকশা অনুযায়ী বাড়ি করতে গেলে দুটো বড়গাছে হাত দিতে হবে।’ হাত দেওয়া মানে যে একদম কেটে ফেলা, সেটা মানুষটা বুঝতে পারেনি। মানুষগুলো হাত দিয়ে, কাটারি দিয়ে এমনকি কোদাল দিয়েও যেভাবে লতা-গুল্ম ছিঁড়ছিল। মনে মনে মানুষটা দেখছিল, বুকের সন্তান তুলে নেওয়া হচ্ছে। মন শরীর বশে থাকছিল না। শরীরের মধ্যে অশান্তিটা ঠিক বুঝতে পারছিল না। কখনও মনে হচ্ছে বমি হবে, কখনও মনে হচ্ছে, মাথাটা মনে হয় ঘুরছে। সূর্য ধীরে ধীরে মার্তণ্ড হয়েছেন। মনে হচ্ছে অন্যায় হচ্ছে, কিন্তু ওদের কথা অনুযায়ী অন্যায়টা না করলে বাড়ি তো বানানো যাবে না। যখন জমিটা কিনেছিল, তখন এইসব লতা-গুল্ম কিচ্ছু ছিল না। তারপর বর্ষা গেল, শরৎ গেল, হেমন্ত এল। তাই মানুষটা স্বপ্ন পুঁততে এসেছিল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও কী করবে বুঝতে পারছিল না। এগুলোই তো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, কখনও সব্জি কখনও ওষধি। আমরা চিনি না তাই গোড়া সমেত তুলে পরিষ্কার করি। হয়ত কোনও পাখি মুখে একটা বীজ নিয়ে এসেছে। তাই এইসব লতা-গুল্ম জন্মেছে। আমাদের অজ্ঞতা ও প্রয়োজন একে অপরকে গিলছে।
সে লোকজনদের না বলে পালিয়ে এল। বাড়ি এসেও সুস্থ থাকতে পারল না। কোনওমতে রাতটা শেষ হতেই দৌড়ে এল। দূর থেকে দেখে মনে হল একজন লোমহীন পুরুষ উদোল-গায়ে শুয়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখল বড় বড় দুটো গাছ সাফ-সুতরো জমিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে।
পরিষ্কার জমিতে বড় বড় দুটো গাছকে শুয়ে থাকতে দেখে নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল। পায়ের নিচের ভেজা মাটি থেকে ধোঁয়া উঠছে, ছোট ছোট ডাল, পাতা, গুল্মসকল নিজের এলাকার বাইরে ডাঁই করা। জমিটার ঠিক মাঝখানে বড় বড় দুটো প্রাণহীন দেহ পড়ে আছে। গতকালও এরা জীবিত ছিল। আততায়ীর হাতে প্রাণ গেল। এইসব আততায়ীদের সুপারি দিয়েছে সে নিজে। চারদিক দেখল, কেউ কোথাও নেই। পাণ্ডববর্জিত দেশে লোক থাকার তো কথা নয়। তবু লোকটার লজ্জা হল। কান্নাও পেল। কাঁদতে কাঁদতে নিজেই হেসে ফেলল, সে বাড়ি করতে চাইছে, কারণ সে একটু আরামে থাকবে। আরাম মানে সে জানে না। কতটা দূরে গেলে নিশ্চিন্তে থাকা যাবে বা কতটা হাঁটলে পরে আরাম পাওয়া যাবে।
একটা বাড়ি বানাতে গিয়ে ঈশ্বরের সৃষ্ট কত প্রাণ গেল। একটু সুখের জন্য কত প্রাণ ঘরছাড়া হল। দরকার কী বাড়ি করার? অনেক প্রাণ দুঃখ পেয়েছে, এত দুঃখ দিয়ে কি আরামে থাকা যাবে বা কেউ থাকতে পেরেছে? মন কিছুতেই শান্ত হয় না। ফাঁকা জমিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মানুষটা চারদিক দেখতে থাকে। বহুদূর পর্যন্ত অনাবাদি জমি। বড় বড় ঘাস, গুল্ম লতা গজিয়েছে। মাটির ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এমন কিছু প্রাণ দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও অসংখ্য প্রাণ মাটির ভিতরে এবং এইসব গাছপালার গায়ে লেপ্টে আছে, যাদের দেখা যাচ্ছে না।
লোক-লস্করের ডাকে সম্বিত ফেরে। তারা সমস্বরে বলে, ‘বাবু নমস্কার।’
মানুষটাও বলতে চেয়েছিল নমস্কার, কিন্তু পারেনি। ওদের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়েছিল। দেখছিল, খুব সাধারণ চেহারা, হয়ত রোজ কাজ হয় না বা কাজ হলেও রোজগার প্রয়োজনের তুলনায় কম। একজন মানুষ নিশ্চিন্তে জীবন-যাপন করলে যে ছবি মুখে ফুটে ওঠে, সেটার খামতি আছে। অথবা পুরো ব্যাপারটাই উল্টো হতে পারে। কারণ লোকগুলো মানুষটার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করছে বলে ওদের কোনওকিছুই ভাল লাগছে না।
এই লোকগুলোও তো সারাদিন অসংখ্য প্রাণ বধ করে রাতে ঘরে বসে ধর্মালোচনা করে। যদি নাও করে, ওরা কি জানে প্রতিদিন এই কাজ করতে গিয়ে ওরা কত প্রাণী মারছে, কত প্রাণকে বেঘর করছে? মানুষটা কোনও কথা বলতে পারে না। শূন্যদৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওদের মধ্যে একজন বলে, ‘বাবু গাছওয়ালাকে খবর দেওয়া হয়েছে, ও আসলে দরদাম করে নেবেন। কাঠের কিন্তু দাম এখন অনেক।’
[৩]
এই পর্যন্ত পড়ে কৃষ্ণেন্দু লেখাটার প্রথমে যায়। লেখকের নামটা যেন কী মনে করতে পারে না। লেখকের নামের জায়গায় লেখা আছে, ‘জনৈক মানুষ’। বইটির নাম ‘আত্মজিজ্ঞাসা’। কৃষ্ণেন্দু ভেবেছিল, একজন মানুষ যদি আত্মজিজ্ঞাসা বিষয়ক বিস্তারিত লিখে থাকেন, সেটা তো ভালই, কারণ সব সুস্থ মানুষই তো আত্মজিজ্ঞাসা করে চলেছে।
সুচরিতা আজ দু’বছর হল চলে গেছে। সুচরিতা কখনও ভাবেনি সবাইকে ছেড়ে সে আগেই চলে যাবে। কখনও মরার কথা উঠলে ও বলত, ‘আমার মা, দিদিমা, ঠাকুমা সবাই বিধবা হয়েছে, বৈধব্যযোগ আমার রক্তে, তোমার চিন্তা নেই, আমি তোমার পরে যাব।’ কথাটা মাঝে মাঝেই যে হোত না এমন নয়, প্রথম প্রথম কৃষ্ণেন্দু বকত, ‘এরকম কথা বলা উচিত নয়। কারণ এটাই একসময়ে প্রার্থনা হয়ে যাবে। দেবতার গ্রাস কবিতার মতো, আমি না মরলেও আমাকে মরতে হবে। কারণ তোমার যে বৈধব্যযোগ আছে। এখন থেকেই বিধবার অভিনয় শুরু করে দাও।’
এই কথায় সুচরিতা রেগে গেছিল, অভিনয় বলছ কেন? যদি বয়স হিসেবে ধরা যায়, তাহলে তো স্ত্রীদের পরেই মরতে হবে। স্বামীর পরে মৃত্যু মানেই তো বিধবা হওয়া।
কৃষ্ণেন্দু শুধু ওপর-নীচ মাথা নেড়েছিল।
তখনও অর্ঘ্য আসেনি। একদিন রাতে মৃত্যু নিয়ে প্রচুর কথা হল। মানুষ কেন মরে, মরে কী হয়। সুচরিতা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্রী হলেও এই বিষয় নিয়ে চর্চা করে, সেটা বোঝা যায়। ও বলেছিল, মানুষের পুনর্জন্ম হয় কিনা জানি না, যদি হয়, আমার কাছে এসো। আমি ঠিক চিনতে পারব।
কী করে?
তোমার ডান হাতের জড়ুলটা দেখে।
ওটা যদি না থাকে?
থাকবে, থাকবে, কারণ দাতাদের চিহ্নিত করেই ভগবান এই পৃথিবীতে পাঠান।
তোমাকে আমি খুঁজব কী করে?
আমার নাম ধরে ডাকবে।
তোমার পরের জন্মের নাম আমি জানব কী করে?
কেন বরাবরই তো আমার নাম শকুন্তলা।
এবার তো সুচরিতা।
না গো, আমার আসল নাম শকুন্তলা, পরে নাম পাল্টে হয়েছি সুচরিতা। ব্যাপারটা মজার, শুনবে?
কৃষ্ণেন্দু মাথা নাড়ে, শুনব।
সুচরিতা বলতে থাকে, সব মনে নেই, মনে থাকার কথাও নয়। এসব যে বয়সে হয়েছে, সেটা নিতান্ত বালিকাবেলা। তবে সব আমার শোনা। ঠাকুর্দা যে বছর স্কুল থেকে অবসর নেন, সেই সময়ে আমার জন্ম। আমার দাদারা ঠাকুর্দার কোলে সেইরকম উঠতে পারেনি, যেটা আমি পেরেছি। তিনি অবসর নেওয়ার পর আর কিছু করেননি। এমনকি সকাল-বিকেল যে অবৈতনিক কোচিং চালাতেন, সেটাও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। উনি নাকি বলতেন, ‘পঁয়তাল্লিশ বছর মাস্টারি করলে মানুষ গাধা হয়ে যায়। গাধা কি আর পড়াতে পারে?’ আমি জন্মাবার পর আমাকে আর বাড়ির বাগান নিয়ে পড়েছিলেন। ঠাকুমা বা মা কারও কাছে আমাকে ছাড়তে চাইতেন না। এইসব নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করলেও, জীবনে যা যা করেননি আমার জন্য সেসব করতেন। আমি একটু বড় হতেই, বড় বলতে ছ’-সাত মাস হতেই আমাকে কোলে নিয়ে বাগানে যেতেন। তিনি আমার নাম দিয়েছিলেন ‘বনবিবি’। নামটা মা-ঠাকুমা কারও পছন্দ ছিল না। ঠাকুমা বারবার বলতেন, ‘তুমি এই নামে ডাকবে না। আমার ভয় করে।’ ঠাকুর্দা হাসতেন, মজা করতেন। নামটায় ঠাকুমার কেন ভয় করত সেটাও জানতে চাইতেন না। ঠাকুর্দার ইচ্ছা ছিল ওইটাই আমার ভাল নাম হোক, বনবিবি নামেই স্কুলে ভর্তি হই।
প্রায় জন্মের থেকে মাটির কথা, সারের কথা, গাছের কাছাকাছি থেকে বুনো গন্ধ আমার খুব ভাল লাগত। অমি নিজে যখন হাঁটতে পারি, একা একা চলে যেতাম বাগানে। ফুলের গাছে, আম-জাম কাঁঠালের কাছে গিয়ে গল্প করতাম। ঠাকুরদা দূর থেকে দেখতেন। শুনেছি মা, ঠাকুমা, বাবা এমনকি পিসিরাও শুধুমাত্র গাছের সঙ্গে আমার কথোপকথন শোনার জন্য এসে আমাদের বাড়িতে থাকত। ছোট পিসাই একটা ভিডিও করেছিল। যেহেতু তাতে কোনও কথা নেই, শুধু মুখের আওয়াজ আছে। তাই কারওর বেশিদিন ভাল লাগেনি। হয়ত ছোটপিসির কাছে এখনও সেটা আছে। আমার গাছ ভাল লাগে। জানো, গাছের একটা সুন্দর স্বভাব আছে, গাছ কাউকে আক্রমণ করে না। দুঃখ দেয় না। অথচ দেখো কত ছোট পিঁপড়ে, মশা, জোঁক সুযোগ পেলেই আক্রমণ করে। কখনও শুনেছ গাছ সুযোগ নিয়েছে? আর-একটা গুণের কথা বলতে ভুলে গেছি, গাছ প্রতিশ্রুতি দেয় না, লোভ দেখায় না। তুমি ভালবাসলে তোমাকেও ভালবাসবে।
কৃষ্ণেন্দু হেসে ফেলে, গাছ মানুষকে ভালবাসে?
তুমি সেই গল্পটা শোনোনি?
কোন গল্প?
ভালবাসার গল্প! বলব?
কৃষ্ণেন্দু মাথা নাড়ে।
একটি শিশু সারাদিন চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে একদিন উল্টে গেল। বাবা সকাল হলেই কাজে চলে যায়। মা একা। মা বুঝতে পারলেন, ছেলের প্রতি আরও নজর দিতে হবে। কয়েকদিনের মধ্যেই সে হামাগুড়ি দেওয়া শুরু করল। আর খাটে রাখা যাবে না। মা ওকে নিচে নামিয়ে দিলেন। সে হামাগুড়ি দিয়ে ঘরময় ঘোরে। মা নিজের কাজ করেন। কিন্তু রান্নাঘরে, বাথরুমে যেতে পারেন না। ওকে তো একা রেখে যাওয়া যায় না!
শিশুটি হাঁটতে শেখে। বাবার খুব আনন্দ ছেলে হাঁটছে। তিনি মুখে হাঁটি হাঁটি পা পা বলেন। ছেলে হাঁটে বাবা পাশাপাশি থাকেন। যদি পড়ে যায়! কখনও বাবা হাত ধরে হাঁটান।
বাবা অফিস গেলে মা রান্নাঘরে যেতে পারেন না, বাথরুমে যেতে পারেন না। ছেলেকে কার কাছে রাখবেন? রান্নাঘরে আগুন জ্বলে, বটি, কাটারি এসব থাকে। বাথরুম ঘরের বাইরে। ঘরের মধ্যে একা শিশুকে রাখা যায় না। একদিন কী প্রয়োজনে মা ওকে কোলে নিয়ে রান্নাঘরে গেলেন। কাজটা করার জন্য উঠোনের আমগাছটার সঙ্গে একটা দড়ি বেঁধে অন্যপ্রান্তটা শিশুর কোমরে আটকে দিলেন। এই গাছের গোড়ায় শুইয়ে রোদ্দুরে ওকে তেল মাখাতেন মা। আজকে তার সঙ্গে বেঁধে দিলেন। শিশু মুক্ত বাতাসে মনের আনন্দে গাছের চারদিকে ঘোরে। মাও নিশ্চিন্ত মনে নিজের কাজ করেন।
পরদিন থেকে এটাই শিশুর জগৎ হল। মা ওকে গাছের সঙ্গে বেঁধে সব কাজ সারেন। শিশুটি গাছের সঙ্গে খেলে, গাছের সঙ্গে কথা বলে। নিজের বই গাছকে পড়ায়, নিজের খাবার গাছকে খাওয়ার জন্য দেয়।
আস্তে আস্তে শিশুটি বড় হয়। স্কুলের খবর গাছকে দেয়, গাছের থেকে পাখিদের খবর নেয়।
স্কুল ছেড়ে কলেজ যায়।
কলেজ পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়।
তারপর আর পাঁচজনের মতো বেকার হয়ে যায়। কী করবে, কোনও কাজ নেই, সারাদিন গাছের গোড়ায় বসে ফুঁকফুঁক করে বিড়ি টানে। সেই দেখে গাছ জিজ্ঞাসা করে তোমার কোনও কাজ নেই?
সে মাথা নেড়ে বলে না।
ব্যবসা করবে?
পুঁজি কোথায় পাব?
পুঁজি লাগবে না।
তাহলে ব্যবসা কী করে হবে?
সেটাই বলছি। গাছ একটু সময়ের জন্য দম নেয়, আমার দেহে যত ফল আছে তুমি নিয়ে যাও। বাজারে বিক্রি করো। তাতে তোমার লাভ হবে। পুঁজি তৈরি হবে। যুবকটি গাছে উঠে কাঁচা-পাকা এমনকি কুশিগুলিও নামিয়ে আনে। গাছ সেই দেখে হাসে কিন্তু কিছু বলে না।
তারপর বহুদিন গাছের কাছে আসে না। গাছ চিন্তা করে ব্যবসায় লাভ হল না লোকসান হল? জানবে কী করে সে তো আসে না। এখানেও থাকে না।
বেশ কিছুদিন বাদে যুবকটি এল।
গাছ ওকে দেখে পরপর প্রশ্ন করে ফেলল, কেমন আছ? কোথায় আছ? আসো না কেন?
পরপর প্রশ্ন আসায় যুবক একটু থতমত হয়েছিল। সামলে নিয়ে বলল, ভাল আছি।
গাছ বলল, না না, তুমি সত্য কথা বলছ না। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে না ভাল আছ। আমাকে সত্যি কথা বলো, তোমার কী হয়েছে?
যুবকটি বলল, ব্যবসায় কোনও অসুবিধা নেই। তোমার থেকে যত ফল নিয়ে গেছিলাম, সেগুলো বিক্রি করে পুঁজি তৈরি হয়েছে। আমি এখন আর এ বাড়িতে থাকি না। এখানে জায়গার অভাব। একটা ঘর বানাতে হবে। সবাই বলছে সংসার করতে। কিন্তু আমার নিজস্ব ঘর নেই। ঘর না বানালে বিয়ে করতে পারছি না।
গাছ হেসে ফেলল, এটা নিয়ে এত চিন্তা করার কী আছে। আমার ডালপালা কেটে নিয়ে যাও একটা ঘর হয়ে যাবে। তারপর বিবাহ করো।
যুবকটি কালক্ষেপ না করে সমস্ত ডালপালা কেটে নিল। পড়ে থাকল ক্রিকেট স্টাম্পের মতো একটা মোটা গাছ। লোকে তো গাছটাকে আর খুঁজে পাচ্ছে না। কারণ গাছ তো নেই। দাঁড়িয়ে আছে একটা গাছের গুঁড়ি। অন্যদিকে গাছ ভাবে, আমাকে লোকে নাইবা চিনতে পারুক, কী আসে যায়। কিন্তু আমার বন্ধু তো ঘর বানিয়ে বিবাহ করে আনন্দে আছে!
যুবকটি আসে না।
অনেক দিন আসে না।
একদিন সন্ধেবেলা এক প্রৌঢ় ফুঁকফুঁক করে বিড়ি টানছিল আর ঘনঘন মাথা নাড়ছিল।
গাছ প্রথমে বুঝতে পারেনি। অনেকদিন দেখেনি তো। বুঝতে পেরেই জিজ্ঞাসা করল, বন্ধু কেমন আছ?
সে বলল, খুব খারাপ।
কেন ব্যবসা চলছে না? তোমার কি শরীর খারাপ? তোমার পরিবার ভাল আছে তো?
প্রৌঢ় মানুষটি বলল, তুমি কেমন আছ?
গাছ হাসল কোনও কথা বলল না।
কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপ করে বসে ছিল।
তারপর প্রৌঢ় বলল, এখানে আর ব্যবসা নেই। দূরে কোথাও যেতে পারলে ভাল হোত। কিন্তু আমি তো যেতে পারছি না। আমার তো নৌকা নেই।
এটা কোনও সমস্যা হোল? তুমি আমার দেহকে লম্বচ্ছেদ করো। তাহলে আশাকরি একটা নৌকা হয়ে যাবে। তুমি বাণিজ্য করতে পারবে।
প্রৌঢ় সময় নষ্ট না করে গাছকে লম্বচ্ছেদ করে নৌকা বানিয়ে ফেলল। তারপর নদীতে ভেসে পড়ল।
গাছ বসে থাকে। দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। যুগ যায়। অর্ধেক লম্বচ্ছেদ হয়ে গাছ দাঁড়িয়ে থাকে। বন্ধুর খোঁজ পায় না। যত লোক গাছের গোড়ায় আসে। গাছ তাদের জিজ্ঞাসা করে, আমার গায়ের রঙের কোনও নৌকা দেখেছ? সেই নৌকার সদাগর ভাল আছে তো?
গাছটা শুধু জানতে চায় মানুষটা ভাল আছে তো?
[৪]
সুচরিতার কথা শুনতে শুনতে কৃষ্ণেন্দু ভাবছিল শ্রীমৎ অনির্বাণজীর কথা, তিনি চিঠিতে একজনকে লিখেছিলেন, “একটা বড় সমস্যা হল, রূপকে রসে উত্তীর্ণ করা। রূপ আর রস দুয়ের মধ্যে আছে ক্রিয়া। এই ক্রিয়া যদি নিম্মগা হয়– আর তা হয় রূপেরই আকর্ষণে, তাহলে একটা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সে যেন একটা অন্ধকার সমুদ্রে তলিয়া যাওয়া। কিন্তু উজানে আরেকটা সমুদ্র আছে আলোর। সে হল রসের সমুদ্র। তাতে ক্ষোভ নাই, আছে অনাহত নির্মল প্রসন্নতার একটা ব্যাপ্তি– তাকে বুঝি আনন্দও বলা চলে না। অনুভবের ব্যাপ্তি দিয়ে এই প্রসন্নতাকে অধিগত করে নিশ্চুপ হয়ে যেতে হবে। আর তখন আকাশে কমলের রূপ আপনি ছড়িয়ে পড়বে। তোমার কোনও কাজ নাই দেখে যাওয়া ছাড়া।’’
কৃষ্ণেন্দুর সত্যি কোনও কাজ নেই, দেখে যাওয়া ছাড়া।
সুচরিতা ওকে চুপচাপ দেখে জিজ্ঞাসা করল, তোমার মন কি অন্য কিছু ভাবছে? কেমন যেন আনমনা লাগছে!
না, না, তুমি বলতে থাকো, আমি তো তোমার কথাই শুনছি।
ঠাকুরদা আমাকে যখন স্কুলে ভর্তি করলেন, সবাই ভেবেছিল বনবিবি নামটাই দিয়ে দেবেন। তিনি ভর্তি করালেন শকুন্তলা নামে। নামটা সবার পছন্দ, তবে মা একদিন বাবাকে বলেছিল, ‘নামে যদি কাজ হয়, তাহলে তোমার মেয়ের কপালে দুঃখ আছে। বর চিনতে পারবে না। দুষ্মন্তর মতো বাপের বাড়ি ফেলে রেখে দেবে। আমার বাপু নামটা শোনা ইস্তক বুকটা ঢিপ্ ঢিপ্ করছে।’
তখন তো ব্যাপারটা বুঝিনি। তবে নতুন একটা নাম শুনেছি ‘দুষ্মন্ত’। তবে মা’র আপত্তিতে বাবা কান দেননি। তিনি না শোনার মতো শুনেছেন এবং কোনও মন্তব্য না করে চুপ থেকেছেন। মা হয়ত কথাটা আর কাউকে বলেছিল, একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় ঠাকুরদা মা’কে নাম বিষয়ে কিছু বলেছিলেন। মা’র গলার আওয়াজ পেয়েছি বলে আমার মনে নেই। তবে এইজন্য আমার নাম পাল্টায়নি। নাম পাল্টানোর আরেকটা কারণ আছে। সেই কারণটা অমোঘ।
স্কুলে যাচ্ছি, নতুন নতুন বন্ধু হচ্ছে। একে অপরকে নাম বলছি। আমার নামটা শুনে প্রায় প্রত্যেকেই বলছে, তোর নামটা কী কঠিন। এতবড় নামে ডাকা যায়? অত শিশুকন্যার মধ্যে কেউ একজন বলে উঠেছিল, তোকে ‘শকুন’ বলে ডাকব। আস্তে আস্তে ক্লাশ ওয়ান-এ তে সবাই আমাকে শকুন বলে ডাকতে লাগল। এমনকি ক্লাশটিচারও রোলকল করার পর কিছু জিজ্ঞাসা করুন বা কোনও কারণে নাম ধরে ডাকতে গেলে আর শকুন্তলা বলে ডাকেন না। শকুন বলে ডাকছেন। একথা আমি বাড়িতে বলিনি। বলার প্রয়োজন আছে বলেও তখন মনে হয়নি। নতুন বন্ধুরা যে নামেই ডাকুক, কেউই পাত্তা দেয় না। তবে এখন বুঝি, রূপকথায় কীভাবে মানুষ পাল্টে যায়।
ঠাকুরদা শখ করে নাম দিয়েছিলেন, শকুন্তলা। মানুষের মুখে মুখে হয়ে গেলাম শকু্ন। রোজ সকালে আমাকে নিয়ে স্কুলে দিয়ে আসতেন আবার ছুটির সময় নিয়ে আসতেন। তিনিই নোটিশ করেন, বন্ধুরা আমাকে শকুন বলে ডাকছে। তিনি ধৃতিকে জিজ্ঞেসা করেছিলেন, দিদিভাই, তোমরা ওকে শকুন বলে কেন ডাকো?
ওর নামটা বড় এবং শক্ত তাই ছোট করে নিয়েছি।
ঠাকুরদা ওর কথায় বিস্মিত হলেও কিছু বলেননি। তবে বাড়ি ফিরে সবাইকে সমস্যার কথা বলেছিলেন। সবাই জেনেছিল এ বিষয়ে তার দুশ্চিন্তার কথা।
সেই রাতে বাবা আমাকে খুব আদর করে বলেছিল, তুমি তো জানো শকুন পাখির খুব বুদ্ধি! অনেক দূরের জিনিস দেখতে পায়। ওদের সংখ্যাও ক্রমশ কমে যাচ্ছে। বলা যেতে পারে, প্রায় লুপ্ত হয়ে বসেছে। যেমন উটপাখি আর দেখা যায় না। হয়ত একদিন আসবে তখন শকুন পাখিও আর দেখা যাবে না।
বাবার সব কথার উত্তরে আমি নাকি বলেছিলাম, শকুন তো অনেক দূরের জিনিস দেখতে পায়।
বাবা মাথা নেড়ে বলেছিল, ঠিক বলেছ।
কৃষ্ণেন্দু জিজ্ঞাসা করেছিল, নামটা পাল্টাল কী করে?
তার কিছুদিনের মধ্যেই স্কুলের খাতায় আমার নাম হল সুচরিতা।
[৫]
ডাক্তার পার্থ কাঞ্জিলাল একদিন জানিয়ে দিলেন, ওর রোগটা আর কিছু নয়, ‘কর্কট রোগ’। উপসর্গ দেখে বা বমির রং দেখে সুচরিতা বুঝতে পারেনি। তবে ডাক্তারবাবু কৃষ্ণেন্দুকে বলেছিলেন, চেপে রেখে লাভ হবে না। ওনাকেও তো প্রস্তুতি নিতে হবে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। কৃষ্ণেন্দু নিজে জানায়নি বা জানাতে চায়নি। তবে ওর একটা বিস্ময় ছিল, এই কারণে যে, রিপোর্টগুলো একবারের জন্যেও দেখতে চায়নি। ও কি জানত বা বুঝতে পেরেছিল এক ভয়ানক কঠিন রোগে ও আক্রান্ত? তাই রিপোর্টগুলো আসলেই বলত, তুমি দেখেছ তো? ফাইলে রেখে দাও। অথচ বাড়ির কারও কিছু হলে সমস্ত রিপোর্ট ওকে দেখাতে হোত। বাংলার একজন দিদিমণি একজন জুনিয়র ডাক্তারের কাজ করে দিতে পারত। ওষুধপত্র এমনকি ডাক্তার-কবিরাজের কথাও বলে দিতে পারত।
ডাক্তার কাঞ্জিলাল কথাটা বলার পর ও মাথা নিচু করে বসেছিল। ওর কোলের ওপর টপ টপ করে চোখের জল পড়ছিল। ডাক্তারবাবু কৃষ্ণেন্দুকে চোখের ঈশারায় বললেন, যাতে এই মুহূর্তে ওকে বিরক্ত করা নাহয়।
বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থেকে ঘুম ভাঙার মতো হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর কৃষ্ণেন্দুর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, তুমি জিতে গেলে।
কৃষ্ণেন্দু কোনও কথা বলেনি।
ডাক্তার কাঞ্জিলাল ওদের খুব ভালবাসেন বলেই জিজ্ঞাসা করে ফেলেছিলন, ব্যাপারটা কী হল?
ভেবেছিল উত্তর দেবে না। সুচরিতা উঠে দাঁড়ানোর ফলে চেম্বারের ভিতর বসে থাকা আর দু’জনও উঠে দাঁড়িয়েছে। সুচরিতা কোনও কথা বলছে না দেখে কৃষ্ণেন্দু বলল, ও সব সময়ে প্রার্থনা করত, আমি যেন আগে যাই। আমার ঘাড়ে ও অর্ঘ্যকে রেখে যেতে চায় না।
কথাটা শেষ হতেই সুচরিতা বলল, আসি ডাক্তারবাবু।
তারপর গটগট করে চেম্বার ছেড়ে বাইরে এসেছিল।
[৬]
চেম্বার থেকে বেরিয়ে ও গাড়িতে উঠে বসেছিল। সাধারণত ডাক্তারের ফিস বা ওষুধপত্র ও বুঝে নিতে চায়। কৃষ্ণেন্দুর ওপর নির্ভর করে না। সেদিন ওই বিষয়ে কোনও কথা বলেনি। প্রয়োজনও ছিল না। কারণ ডাক্তার কাঞ্জিলাল সেদিন কিছু নিতে চাননি এবং ওষুধের কোনও কথা ওঠেনি।
গাড়িতে উঠে কৃষ্ণেন্দু দেখে সুচরিতা চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। নিশ্চয়ই অর্ঘ্য আর কৃষ্ণেন্দুর কথাই ভাবছে। ছাপ্পান্ন বছর বয়সী শরীরটাকে কর্কট-মহারাজ ভালবেসেছেন। ও রুমাল দিয়ে বার বার চোখ মুছছে। কৃষ্ণেন্দুর ভিতরটা গোঙরাচ্ছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে চেপে রেখে আলতো করে ডান হাতটা ওর কাঁধে রাখল। সুচরিতা ঈশারায় বলল, কিছু হয়নি।
বাড়ি আসার পথে এই আধঘণ্টায় কেউ কোনও কথা বলেনি, কৃষ্ণেন্দু হাতটাও সরায়নি। সুচরিতাও আপত্তি করেনি।
[৭]
কৃষ্ণেন্দু ‘আত্মজিজ্ঞাসা’ পড়তে শুরু করল– মানুষটা মাটির দিকে তাকিয়ে ছিল। ঘাস পাতা পরিষ্কার হওয়ার পর মাটির যে রং, দেখা যাচ্ছে সেটা পরিচিত নয়, অনেকটা তামাটে এবং ভিজে। একটা কাজের লোক বলে উঠল, বাবু এখন কোথাও শুকনো মাটি পাবেন না। সব জায়গায় ভিজে গেছে। তলার জল বোধহয় বাড়ছে।
মানুষটা কোনওদিকে না তাকিয়ে নিজের খাতায় লিখছে, soil is the mixture of clay, sand, slit and organic matter. It has two parts: one solid and the other the water and air part. The solid part has two components; an inorganic part of silica, sand, slit and clay (almost 95-97%) and an Organic part which is 2 to 3%. In ideal soil, there should be 50% solid (4-5 percent organic and 45% inorganic matter) and 25% ail and 25% percent water. এই মাটিতে কী কী আছে? মা বলতেন, মাটিতে স্নেহ থাকা চাই। তবে সব সুন্দর হয়। আদৌ সেগুলো আছে? অথবা বিজ্ঞানে স্নেহকে কী বলে?
মানুষটা লোকটার দিকে তাকাল, ঠিকই তো বলেছে লোকটা, পৃথিবীর প্রায় সমস্ত গ্লেসিয়ার গলে যাচ্ছে। মানুষটা নিজেও উনিশ বছরের ব্যবধানে গোমুখ গিয়েছিল। গঙ্গোত্রী থেকে হাঁটা শুরু করে মানুষটা অবাক হয়ে গেছিল। গঙ্গার আওয়াজ নেই। জলের আওয়াজে পাশের লোকের সঙ্গে কথা বলা যেত না। অথচ আজ কোনও আওয়াজ নেই। মনেই হচ্ছে না গঙ্গার পাশ দিয়ে হাঁটছি। মানুষটা চিরবাসায় গিয়ে বসে পড়েছিল।প্রথমে ভেবেছিল, আর যাবে না। সিদ্ধান্ত যখন প্রায় পাকা, হঠাৎই মনে হল মা অসুস্থ হয়েছেন ঠিক আছে, মায়ের মুখটা একবার দেখে যাব না? তাই আবার উঠেছিল, ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে লালবাবার আশ্রমে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সে রাত থেকে গেছিল। পরদিন ভোরে গোমুখে গিয়ে যা দেখেছিল, তাতে বসে বসে কাঁদা ছাড়া অন্যকিছু আসে না। মানুষটা অবাক হয়ে দেখছিল গ্লেসিয়ারের অবস্থা কী করুণ। কাঁদতে কাঁদতে লালবাবার আশ্রমে ফিরে এসেছিল।
[৮]
বাড়িতে আসতেই সুচরিতা প্রায় লাফিয়ে নেমে গেল। বমি বা বড় বাইরের বেগ দিলে লোকে যে রকম করে। কৃষ্ণেন্দু ভাবল বাথরুম থেকে ঘরে গিয়ে হয়ত মুষড়ে পড়বে। তবে যদি কাঁদে তাতে হাল্কা হবে। সংবাদটা তো ওর পক্ষে ভয়ংকর। কৃষ্ণেন্দু গাড়ি গ্যারেজে রেখে বাইরে আসতেই চোখে পড়ল গাছগুলো ধুলোয় ঢাকা পড়েছে। সুচরিতা দেখলে আবার দুঃখ পাবে। কয়েকদিন ধরে ওকে নিয়ে বিভিন্নরকম টেস্ট করতে যাওয়া, অর্ঘ্যর দেখভাল করা, বাড়ির অন্যান্য কাজ করতে করতে, বিভিন্নরকম চিন্তা মাথায় আসছে। মন হচ্ছে মনটা বশে নেই। কোনওদিকে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। রাস্তার পাশে বাড়ি, সামনে পিছনে সামান্য একটু জায়গা, ওইটুকু মাটি সুচরিতার চাই। ও তো আসলে বনবিবি, ও গাছ লাগাবে। যিনি প্লান বানিয়েছিলেন, তাঁকে একটা কথাই ও বলেছিল, সামনে পিছনে যেন গাছ লাগাতে পারি। ও নিজে হাতে কিছু করতে পারে না। সময়ের অভাব। প্রতি সপ্তাহে গাছওয়ালা আসে। গাছ লাগায়, সার দেয়, জল দেয়, আগাছা পরিষ্কার করে। এমনকি ধুলো পড়লে গাছগুলো ধুয়ে দিয়ে যায়। হয়তো এর মধ্যে মাধব মালি ঘুরে গেছে। কৃষ্ণেন্দুর সাথে দেখা হয়নি। গাছগুলোকে দেখে নিজের অস্বস্তি হচ্ছিল। ঘরের কিছু সদস্যকে না খাইয়ে রাখার মতো। লজ্জা থেকে নিস্কৃতি পেতে রতনলালকে বলেছিল, গাছগুলো একটু ধুয়ে দেবে? ড্রাইভারের সিট থেকে নিচে নেমে রতনলাল বলে কেন দেব না? ও তো জানে গাছগুলো ম্যাডামের প্রাণ। দ্বিতীয়ত বইয়ে পড়েছিল, গাছের গায়ে ধুলো থাকলে গাছ রান্না করতে পারে না। গাছের খাওয়া হবে না। তা হলে তো ম্যাডামও খাবেন না। সেটা কেই বা চায়! রতনলাল পাইপ দিয়ে জল ঢেলে গাছগুলোকে চান করিয়ে দেয়। গাছগুলো ঝকমকে হয়ে ওঠে। মনে হয় এখুনি কথা বলবে। রতনলাল তাকিয়ে থাকে। গাছ যে এত সুন্দর হয় ও জানত না।কোনওদিন ভাল করে দেখার ইচ্ছা জাগেনি। ছোটবেলা থেকে শহরে মানুষ, স্যারের স্কুলে ক্লাশ নাইন পর্যন্ত পড়া তারপর ড্রাইভারি শিখে স্যারের কাছে, সেও তো অনেকদিন হয়ে গেল। রতনলাল গাড়িটাও ধুয়ে নিল। গাড়ি বাগান ধুয়ে সাফ করার পর ভাবল স্যার কি আজ আর বেরুবেন? জিজ্ঞাসা না করে গাড়ি ধোয়া হল, যদি কোথাও যেতে হয় ভিজে গাড়িটায় ধুলো জড়িয়ে যাবে। এইসব ভাবতে ভাবতে চোখে পড়ল, সকালের বর্তমান এখনও বারান্দায় পড়ে আছে। রতনলাল তার জায়গায় বসে বাংলা খবরের কাগজটা পড়তে লাগল।
[৯]
কৃষ্ণেন্দু রতনলালকে গাছে জল দিতে বলে সোজা নিজের ঘরে যায়। ঘরের পর্দ্দা সরিয়ে কৃষ্ণেন্দু অবাক, সুচরিতা চারদিকের দরজা জানালা খুলে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বিবস্ত্রা দাঁড়িয়ে আছে। ও তাড়াতাড়ি দরজা জানালা বন্ধ করে। সেই আওয়াজে সুচরিতা সম্বিত ফিরে পায়, তাড়তাড়ি নিজেকে ঢেকে নেয়। কৃষ্ণেন্দু দেখে সুচরিতা কাঁদছে না, যে ভয়টা ও পেয়েছিল বা আশঙ্কা করেছিল, সেটা হয়নি। কৃষ্ণেন্দুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভেঙে পড়ল।
বেশ কিছুক্ষণ কৃষ্ণেন্দু কোনও কথা বলেনি। ঘরের ভিতর কোনও আলো নেই। চারদিক অন্ধকার। বাইরেও কোনও আলো নেই। আবছা আঁধার। সুচরিতা মুখে কিছু বলে না। কেঁদেই চলে।
কৃষ্ণেন্দু বুঝে উঠতে পারে না কী করবে? একবার ভাবে ওকে কাঁদতে দেওয়া উচিত, তাতে ওর মনটা পরিষ্কার হবে। আবার ভাবে বন্ধ না করে দিলে তো এটা চলতেই থাকবে। রোগ হলেই কান্নাকাটির কিছু নেই। রোগ তো নিরাময় হয়। তাই আস্তে আস্তে বলল, কান্নাকাটি করে কোনও লাভ নেই। নিরাময়ের পথ খুঁজতে হবে। পাগলামি করছ কেন? ভাবো, এখন কী করা উচিত সেটা ভাবো। দরজা জানলা খুলে তুমি কী করছিলে?
দেখতে চেষ্টা করছিলাম।
কী?
কর্কট-মহারাজ কোনপথে আমার শরীরে বাসা বাঁধলেন?
কৃষ্ণেন্দু হেসে ফেলে, মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে, ছেলেমানুষ।
সুচরিতা অবলম্বন ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, যাই অর্ঘ্যকে দেখে আসি।
[১০]
অর্ঘ্য ওদের একমাত্র সন্তান।
পুত্রের জন্ম হওয়ার আগেই গুরুজী নাম রেখেছিলেন, অর্ঘ্য। নাম প্রস্তুত ছিল। তাবৎ চন্দ্র-সূর্য উপস্থিত ছিল। সুচরিতার সন্তান আসছে। আত্মীয় পরিজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই অপেক্ষা করছে। ওকে একটু আগেই লেবার রুমে নিয়ে গেছে। ডাক্তারবাবুও বলেছেন চিন্তার কোনও কারণ নেই। তবু নিকটজনের উদ্বেগ যায় না।
বেশ কিছুক্ষণ পরে কয়েকজন সিনিয়র ডাক্তার ও নার্স লেবার রুমে ঢুকে যায়। প্রথমে সন্দেহটা হয়নি। তারপর যখন হসপিটাল ডিরেক্টর নিজে আসেন লেবার রুমে। কৃষ্ণেন্দু একটু চিন্তিত হয়। সে জিজ্ঞাসা করে ফেলে, স্যার কিছু হয়েছে?
হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন করছেন?
আপনারা সবাই আসছেন, তাই।
এটা আমাদের রুটিন জব। ডাক্তারবাবু এখুনি বেরুবেন, তিনি সব বলবেন।
একজন একজন করে প্রায় সব স্টাফ চলে গেলেও শিশু বা তার মা এবং ডাক্তারবাবু বাইরে আসেননি।
ডাক্তারবাবু বাইরে এসে বলেন, বেবি অ্যান্ড মাদার ওকে বাট… বলে কৃষ্ণেন্দুর দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, আপনিই দেখে নিন।
কৃষ্ণেন্দু একা লেবার রুমে ঢুকে দেখে সুচরিতার পাশে বেবিকটে সাদা কাপড়ে মোড়া তার শিশুপুত্র। হাত-পা দেখা যাচ্ছে না। সিস্টারকে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি কাপড় সরিয়ে দেখালেন। শিশুর সমস্ত অঙ্গ নির্মাণ হয়েছে, শুধু হাতদুটো আর পা-দুটো নেই। দুটো বগল আর কুঁচকির কাছে সব লেপা-পোঁছা। তাকিয়ে থাকতে পারছিল না কৃষ্ণেন্দু, সিস্টারকে ইশারায় বলল, ঢাকা দিয়ে দিন। ঢাকা দিতে দিতে সিস্টার বলল, সন্তান দেখে সুচরিতা অজ্ঞান হয়ে গেছিল। প্রতিটি মা সুস্থ সন্তান প্রসব করে আনন্দ পান, ওর সন্তান জীবন্মৃত। যে দৃষ্টিতে ও কৃষ্ণেন্দুকে দেখছিল, যেন বলতে চাইছে, ‘ক্ষমা করো।’
কৃষ্ণেন্দু বুঝতে পারছে না, এত বড় বড় সব ডাক্তারেরা কিছুই বুঝতে পারল না। প্রতিটি ভিজিটে বলে গেল, সব ঠিক আছে। শিশু যে স্বাভাবিক ছন্দে বাড়ছে না, এটা বুঝতে পারল না। কী লাভ নামী-দামি ডাক্তার দেখিয়ে? যারা বুঝতে পারে না শিশু স্বাভাবিক ছন্দে নেই।
সুচরিতার কাছে গিয়ে হাতটা ধরে। দু’চোখ বেয়ে জল গড়াচ্ছে ওর। কৃষ্ণেন্দু শুধু মাথা নাড়ে কোনও কথা বলে না। সন্তান তো একজনের দ্বারা নির্মাণ হয় না। দায় যদি থাকে তবে দু’জনেরই আছে। মুখে না বললেও চোখে চোখে হয়ত এসব কথাই বলে। হঠাৎ মনে হয় আরেকবার দেখি, ঠিক দেখেছিলাম তো? মাথা থেকে পুরুষাঙ্গ পর্যন্ত একটা সদ্যজাত শিশুর যা থাকে সব আছে, নেই শুধু হাত আর পা। কিম্ আশ্চর্যম্। ভগবানের অপার করুণায় মানুষ পুত্রসন্তানের মুখ দেখে, ভগবান শ্রীমুখ দিয়েছেন, হাত-পা দেননি।
কৃষ্ণেন্দু লেবার রুমের বাইরে আসে। সবাই অপেক্ষা করছে। ও কিছু বলার আগেই সবাই বুঝতে পারে কিছু একটা হয়েছে। সবাই একসাথে জিজ্ঞাসা করে উঠেছে, কী হয়েছে, সবাই ভাল তো?
কৃষ্ণেন্দু মাথা নেড়ে বলে, সবাই ভাল, তবে হাত-পা নেই।
আর কিছু বলতে পারেনি, ধপ্ করে মেঝেতে বসে পড়েছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। খুব চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু সবার সামনে লজ্জায় সেটাও করতে পারছে না। ওর আর সুচরিতার একটা পুত্রসন্তান হয়েছে যার হাত-পা নেই। মনে হচ্ছে সমগ্র পৃথিবীটা মাথার ওপর ভেঙে পড়েছে।
সবাই একে একে লেবার রুমে যাচ্ছে আর ফিরে আসছে। মুখে কোনও মন্তব্য করছে না। কেউ কৃষ্ণেন্দুর মাথায়, কেউ পিঠে হাত দিয়ে সমবেদনা জানাচ্ছে। কেউই বুঝতে পারছে না, এটা কী হল? কী করে হল?
[১১]
সবাই ছেলে দেখে বাইরে আসার পর কৃষ্ণেন্দু আবার লেবার রুমে ঢোকে। সুচরিতা তখনও কাঁদছে। সিস্টাররা কিছু ওকে বলেছিল, কৃষ্ণেন্দুকে ঢুকতে দেখে চুপ করে গেল। ও ঢুকতেই সুচরিতা বলল, আমি বাড়ি যাব।
ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞাসা করেছ?
না। আমি বাড়ি যাব।
ওদের তো একটা নিয়ম আছে চিকিৎসার। তুমি বললেই হবে?
তুমি একবার বলো!
সুস্থ না হয়ে বাড়ি যাবে কেন?
ওকে নিয়ে আমি হাসপাতালে থাকব না।
ওকে বাড়িতে নিয়ে যাবে তো?
কেন নেব না?
আমি বলতে চাইছি, ডাক্তারবাবু তোমাকে ছাড়লেও, ওকে এখনই ছাড়বেন তো?
তুমি জিজ্ঞাসা করো। সেরকম হলে রিকোয়েস্ট করো।
কৃষ্ণেন্দু সিস্টারদের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ওকে এখন কেবিনে দেবেন তো?
তারা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই জিজ্ঞাসা করেছিল, কতক্ষণ পরে দেখা করতে পারব?
ঘণ্টা খানেক।
তারপর সুচরিতার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলে আমি আসছি। ততক্ষণ…
[১২]
অর্ঘ্যের জন্মের তিনদিন পর হাসপাতাল থেকে ছুটি পাওয়া গেল। সুচরিতা হাসপাতালে থাকতে না চাইলেও ডাক্তারবাবুরা ছাড়তে পারেন না। কারণ প্রসূতি এবং নবজাতক যতক্ষণ পর্যন্ত না সুস্থ বোধ করছে, ততক্ষণ ছাড়া যায় না। ক্লিনিক্যালি আনফিট কাউকে হাসপাতাল ডিসচার্জ করে না।
বাড়ি আসার পর দু’জনে বুঝতে চাইছিল ব্যাপারটা কী হল! সন্তান হয় না একরকম, মৃত সন্তান প্রসব হয় একরকম, কিন্তু ভগবান এ কী সন্তান দিলেন, যার সব আছে শুধু হাত-পা নেই। রাতে সুচরিতা প্রশ্ন করেছিল, কেন এমন হল বল তো?
জানি না।
লোকে বলে, মা-বাবার মতো ছেলেমেয়েরা হয়। আমাদের তো হাত-পা আছে, ওর হল না কেন?
কী করে বলব?
তুমি এড়িয়ে যাচ্ছ। তোমার-আমার ছেলে হয়েছে, তুমি কোনও দায়িত্বই নিচ্ছ না।
আমি তো ফেলে আসিনি।
সে কথা বলিনি।
তা হলে?
এমন কেন হল?
আমার জ্ঞানের মধ্যে হলে ঠিক বলতাম।
তা হলে কে বলতে পারবে?
জানি না।
তুমি এখন কিছুই জানো না। সব দায় আমার?
আমি জানি বলতে মহাভারতের গল্পটা।
কোন গল্পটা?
তুমি এখন শুনবে?
বলো, শুনি।
বিচিত্রবীর্যের কোনও সন্তান হয় না। অন্যদিকে গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম বিবাহ করবেন না এবং সিংহাসনেও বসবেন না। তখন স্থির হয় মহর্ষি বেদব্যাসের বীর্য অম্বে, অম্বা এবং অম্বালিকার গর্ভে প্রতিস্থাপন করা হবে। তখন তো স্পার্ম ব্যাঙ্ক ছিল না। তাই মহর্ষি বেদব্যাস নিজেই প্রতিস্থাপন করেছিলেন। সেই সময়ে মহর্ষির চেহারা দেখে ভয়ে যিনি চোখ বুজেছিলেন, তাঁর সন্তান হয় অন্ধ, অর্থাৎ ধৃতরাষ্ট্র, দ্বিতীয়জন ওনার বিশাল ও ভয়ানক রূপ দেখে ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছিলেন, তাঁর সন্তান পাণ্ডু আর যিনি স্বাভাবিক ছিলেন, তাঁর পুত্র বিদুর।
এর সঙ্গে আমাদের কী যোগ?
হয়ত ওই সময়ে আমরাও অন্যকিছু ভেবেছি বা এরকম কিছু ভেবেছি।
[১৩]
কৃষ্ণেন্দু আর সুচরিতা বাড়িতে নতুন অতিথির জন্য সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল। সেইভাবেই অর্ঘ্যকে বাড়িতে আনা হল। অর্ঘ্য শুয়ে শুয়ে বড় হবে। সুচরিতা মা হয়েছে, কৃষ্ণেন্দু বাবা হয়েছে। তাদের ছেলে বাড়িময় দৌড়বে না, খেলবে না। বাড়ি করার সময় মিস্ত্রিদের বলেছিল, ‘বাড়িতে কোথাও উঁচুনিচু রাখবেন না, যাতে শিশুদের কোনও অসুবিধা না হয়, সেটা মাথায় রাখবেন।’ বাড়ির নকশা বানাবার সময় বলেছিল, আমার একটা প্রস্তাব আছে, আমাদের জমিটা তো আয়তক্ষেত্র, বাড়িটার সব ঘরে যেন আলো-হাওয়া থাকে। না হলে শিশুদের বিকাশে কিছু ঘাটতি থেকে যায়। ভদ্রলোক বলেছিলেন, ‘বাচ্চার বয়স কত?’
‘বাচ্চা’ শব্দটায় ওদের দু’জনের খুব আপত্তি, মানুষের সন্তানকে কেন বাচ্চা বলা হবে, সে তো শিশু। শিশু আর বাচ্চার মধ্যে তফাৎটা অনেকেই জানে না, জানতে চায়ও না। দু’জনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বলেছিল, ‘এখনও কোনও শিশু আসেনি।’ তিনি শুনে বলেছিলেন, ও আচ্ছা, মাথায় রাখব।
সেই বাড়িতে অর্ঘ্যকে আনার পর দু’জনে দু’জনের দিকে তাকিয়েছিল অনেকক্ষণ। শিশু ঘরে এল, সে দৌড়বে না, খেলবে না, কিছু ভাঙবে না। দিন রাত শুয়ে থাকবে। শুয়ে শুয়ে কথা বলবে। দু’জনে চার হাত শক্ত করে ধরেছিল। কেউ কোনও কথা বলেনি। কতক্ষণ বসেছিল জানে না। অর্ঘ্যের কান্নার আওয়াজে ওদের সম্বিত এসেছিল।
[১৪]
যে কেউ পড়তে চাইলেই বলে পড়াব। আগে ছাত্রের পরীক্ষা নিত, পরিবার সম্বন্ধ জানতে চাইত। এখন এসব কিছু জিজ্ঞাসা করে না। বেহালা থেকে দমদম যেতে হলেও কোনও আপত্তি নেই। সারাদিন বাইরে বাইরে টিউশান করে। বাড়িতে থাকতে চায় না। সুচরিতা জিজ্ঞাসা করে, এত টিউশান নিচ্ছ কেন? বাড়িতেও তো একটু থাকতে পারো?’
কৃষ্ণেন্দু বলে, ‘ওর জন্য টাকা জমাচ্ছি। ওর তো অনেক টাকা প্রয়োজন হবে। কেউ তো খালি হাতে ওর জন্য কিছু করবে না। তাই যতটা পারি রেখে যাই।’
সুচরিতা বুঝতে পারে কৃষ্ণেন্দু এড়িয়ে যাচ্ছে। বাড়ি থাকতে চাইছে না। যে কৃষ্ণেন্দু বিয়ের আগে লিখেছিল, “শুধু শিবের জন্যই উমার তপস্যা নয়, উমার জন্যও তার প্রেমের যোগ্য হবার জন্যও শিবের তপস্যা। শিব গাছ থেকে পড়ে না।” অথচ আজকাল সংসার থেকে পালিয়ে যেতে চাইছে। ও কার কাছ থেকে পালাতে চাইছে, সুচরিতা না অর্ঘ্য? ও নিজে ছাড়া দুটোই তো মানুষ, অবশ্য অনেকেই অর্ঘ্যকে মানুষ বলে না, কেউ বলে অর্ধমানব, কেউ বলে হাত-পা নেই সে তো লুলা। সুচরিতা একজন লুলার মা। এই পৃথিবীতে কেউ বিজ্ঞানীর মা, কেই ক্রিকেটারের মা, কেউ সাহিত্যিকের মা, কেউ মন্ত্রীর মা, কেউ সুন্দরের মা, কেউ চোরের মা, কেউ ডাকাতের মা। ও লুলার মা। একটা পরিচয় তো হবেই।
খবরটা ছড়িয়ে পড়তে সময় নেয়নি। তখন তো টিভির এমন রমরমা হয়নি। কিন্তু খবরের কাগজওয়ালারা পিছন ছাড়েনি। খবরের কাগজ থেকে বাজার, বাজার থেকে সার্কাসের ময়দানে সুচরিতা পৌঁছে গেল।
একদিন ফোনে প্রস্তাব এল, ছেলেটাকে দিয়ে দিন।
কেন? দেব কেন?
আপনি তো কষ্ট পাচ্ছেন, মানসিক এবং শারীরিক, আরও পাবেন। তাই বলছিলাম…
আপনি কে বলছেন?
আপনার একজন শুভানুধ্যায়ী।
নামটা বলুন।
ছেলেটাকে আমাদের দিয়ে দিন, আমরা নিয়ে যাব। এগ্রিমেন্ট করেই নিয়ে যাব। বছরে তিনমাস আপনাদের কাছে থাকবে। বাকি ন’মাস আমরা নিয়ে ঘুরব।
কোথায় ঘুরবেন?
ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায়। একটু থেমে লোকটা বলল, চাইলে আপনারাও আসতে পারেন।
ওকে দেখিয়ে আপনারা উপার্জন করবেন?
ঠিক কথা বলেছেন। তবে আমরা পুরোটা নেব না। এগ্রিমেন্ট হবে আধাআধি অর্থাৎ ফিফটি-ফিফটি।
কৃষ্ণেন্দু আর কথা বলতে পারেনি। ভিতরটা কীরকম গোলাচ্ছিল। ও ফোনটা রেখে দিয়েছিল।
কথাটা সুচরিতা আজও জানে না। মিনিট পনেরো পর আবার ফোনটা আসে।
কৃষ্ণেন্দু সব শুনে বলেছিল, প্রস্তাবটা ভাল।
তা হলে এগ্রিমেন্টে সই করুন।
ছেলেকে দেখিয়ে টাকা আয় করব?
অসুবিধে কোথায়? ছেলের ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেবেন।
ওর ভবিষ্যৎ আছে?
অবশ্যই আছে। মানুষ হয়ে জন্মেছে, ভবিষ্যৎ নেই? এটা আপনি কী বলছেন মাস্টারমশাই?
কৃষ্ণেন্দু বলে, এখন রাখি পরে কথা বলা যাবে।
মনে মনে ভাবে সমস্ত খবর ওরা নিয়ে রেখেছে।
[১৫]
দু’জনের স্কুলের সবাই জেনে গেছে, ওদের ছেলের হাত-পা নেই। আজকালের মতো তখন তো সবার হাতে মোবাইল ছিল না, তা হলে ভাইরাল হয়ে যেত। কৃষ্ণেন্দু ভাবে ভাইরাল হোক বা সংবাদমাধ্যমে ছবি প্রকাশিত হোক তার তো কিছু যায় আসে না। সে জন্মদাতা পিতা, তার কোথায় খামতি সেটা সে জানে না বা জানার কোনও সুযোগও তার নেই। মহাভারত-রামায়ণ-পুরাণের কোথায় কী আছে বা দোষটা নিজের না সুচরিতার সেটা বিচার করার থেকেও বড় বিচার ছেলেটার কী হবে? ছেলেটা কতদিন এইভাবে থাকতে পারবে?
প্রাথমিক ধাক্কাটা সুচরিতা সামলে নিয়েছে। স্কুলে প্রথম প্রথম রোজ প্রশ্ন থাকত, ছেলে কেমন আছে?
ও বলত, ভাল।
আস্তে আস্তে ছেলের প্রসঙ্গ ওঠে না বললেই হয়। তবে সহকর্মী মন্দিরা প্রস্তাব দিয়েছিল, সুচরিতা আরেকবার চেষ্টা করলে হয় না!
কী চেষ্টা করব?
সন্তানের!
কেন?
সবার কাছে প্রমাণ করা যে, আমিও সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে পারি।
বাড়ির কাজের মাসি খুব সকালে আসত। ফলে অর্ঘ্য সম্বন্ধে শুনলেও নিজে চোখে দেখেনি। প্রায় মাসখানেকের মাথায় একদিন দেখে ফেলে। চিৎকার করে বলে ওঠে, বৌদি এটা ছেলে নয়, অপদেবতা। তোমাদের বাড়ি অপদেবতা ভর করেছে। এবং সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয় আর কাজ করবে না। শুধু তাই নয়, ঝি মহল্লায় মাসি রটিয়ে দেয় মাস্টারদের বাড়িতে অপদেবতা বাসা বেঁধেছে। কেউ কাজ করতে চায় না। কেউ না তো একজনও না। সেই থেকে কোনও কাজের লোক নেই।
সারাদিনের নার্স একজন থাকেন। তিনি আবার আয়া নন, নার্সেস সেন্টার থেকে আসেন। ইউনিফর্ম পরেই কাজ করেন। ওকে খাওয়ান, কথা বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন, কিন্তু কোলে নিতে পারেন না। তিনি মনে করেন, শিশুর হাত না থাকলে তাকে কোলে নেওয়া যায় না। এমনকি শিশু হাত-পা না ছুড়লে নাকি হজমও হয় না।
সেই ভদ্রমহিলাও মাঝে মাঝে বলতেন, দাদা আমাকে ছেড়ে দিন। দুপুরবেলা চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেলে ওকে দেখলে খুব ভয় লাগে।
কেন ভয় লাগে?
বলতে পারব না।
সব মানুষকে দেখলেই ভয় লাগে?
ও তো মানুষ নয় দাদা!
তা হলে ও কী?
ও অন্যকিছু।
অন্যকিছু কী?
বলতে পারব না।
ওকে দেখলে ভয় লাগে? একটা শিশুর মধ্যে ভয়ংকর কী আছে?
এতকথা জিজ্ঞাসা করবেন না।
আপনি সত্যি কাজ করবেন না? অথবা অতিরিক্ত কিছু চাইছেন?
কিছু চাই না। একটু থেমে নার্সটা বলেছিল, অর্ঘ্য যদি বেঁচে থাকে, তা হলে আপনাদের দুর্ভোগ বাড়বে।
কথাটা বুঝলাম না।
স্যার আর কিছু জিজ্ঞাসা করবেন না।
মেয়েটা সেদিন ওর ব্যাগ গুছিয়ে চলে গেছিল। যাওয়ার সময়ে বলেছিল, আজকের টাকাটা দেবেন না, কাজ না করেই তো চলে যাচ্ছি।
তখন অর্ঘ্যর বয়স ছ’মাস।
[১৬]
আত্মজিজ্ঞাসায় মানুষটা খাতা-পেন্সিল বের করে কাজের লোকদের জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা জমিটা পরিষ্কার করতে গিয়ে আমরা কতগুলো ব্যাঙ পেয়েছি?
একটাও না।
কতগুলো কেঁচো পেয়েছি?
চোখে পড়েনি।
কতগুলো সাপ বা সাপের খোল দেখেছি?
দেখিনি।
বড় যে দুটো গাছ কাটা হল, তার কোটরে কোনও প্রাণী ছিল?
গাছদুটোয় কোনও কোটর ছিল না।
জমিতে গর্ত খুঁড়ে আমরা যে জল পেয়েছি, তার স্বাদ কী রকম?
পরীক্ষা করা হয়নি।
কেন?
কে মুখে দেবে?
একজন এগিয়ে এসে বলল, আমি নেমেছিলাম, কটু, অস্বস্তিকর ও বিস্বাদ।
মানুষটা আর প্রশ্ন করেনি। তারপর খাতায় লিখেছিল, ব্যাঙ না থাকায় এখানে অনেক অনেক ছোট প্রাণ দিব্য আছে অথবা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। এখানে মশা হবে। কারণ ব্যাঙ নেই। কেঁচো নেই, জমিতে কোনও সারপদার্থ নেই। সাপ নেই মানে সাপের খাদ্য নেই। এমনকি এখানে বড় গাছের কোটরে থাকার প্রাণী নেই। তাই কোটর তৈরি হয়নি।
মানুষটার চারদিকে যারা কাজ করছিল, তাদের ডাকল। তারা ভেবেছিল হয়ত পরিকল্পনা পাল্টেছে বা অন্যকিছু, বড়লোকদের এসব হয়। তারা ঘনঘন মত পরিবর্তন করে। হাত না ধুয়েই সবাই এসে সামনে দাঁড়াল।মানুষটা জিজ্ঞাসা করল, তোমরা যেখানে থাক, সেখানে ব্যাঙ আছে? সাপ আছে? কেঁচো, কেন্নো আছে?
প্রশ্নটা শুনে উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো অবাক হয়ে গেছিল। এ আবার কী প্রশ্ন? এসব প্রশ্ন মানুষ করতে পারে? মনে মনে হাসলেও মুখে কিছু না বলে সবাই মাথা নাড়ল। মানুষটাও অবাক হয়ে একসঙ্গে এতগুলো স্প্রিং দেওয়া পুতুল দেখল। এদের ভঙ্গিমায় মানুষটা অবাক হয়েছিল। এদের তো কেউ বলে দেয়নি, এরা কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ল কেন? প্রথমে ভেবেছিল, জিজ্ঞাসা করবে, তোমরা কথা বলছ না কেন?কিন্তু একটা গল্প মনে পড়ায় ওদের বলল, তোমরা কাজে যাও।
লোকগুলো কাজে যাওয়ার আগে হাতজোড় করে নমস্কার করে গেল।
মানুষটা লিখছে, এটা ভগবানের গল্প।
সেবার গঙ্গোত্রী থেকে ফেরার খুব বৃষ্টি পড়ছিল। রাস্তা ভেঙে গেছে, ধস নেমেছে। কোনও গাড়ি নিচে নামছে না। বাসস্ট্যান্ড ভর্তি লোক, কেউই নামতে পারবে না। আমরা না নেমে আসলে হরিদ্বার থেকে ট্রেন ধরতে পারব না। ঘোরাঘুরি করছি। একটা লোক কাছে এসে হিন্দিতে বলল, বাবু উত্তরকাশী যাবেন?
কী করে যাব? রাস্তা তো বন্ধ।
আমি আপনাকে নিয়ে যাব।
আমার সঙ্গে আরও দু’জন আছে।
কোনও অসুবিধা নেই, গাড়িতে উঠে পড়ুন।
ওটা তো সব্জির গাড়ি।
সব্জির ওপর বসে পড়ুন।
আমরা রাজি হয়ে গেলাম।
গাড়ি নিচে নামতে শুরু করতেই লোকটা বলল, আপনারা এখানে আসেন কেন?
ঘুরতে আসি।
ভগবানকে পাওয়ার জন্য আসেন না?
কোনও কথা বলছি না। গাড়ি চলছে। লোকটা বলল, আপনরা সবাই খুব চালাক। শহরের লোকেরা সত্যি চালাক হয়।
পাহাড়ের লোকেরা বুঝি বোকা?
আসলে পাহাড়ের লোকেরা ভগবানকে নকল করতে পারে না। তাই তারা বোকা।
কথাটা বুঝলাম না।
আপনারা তো জানেন, ভগবান সবচেয়ে চালাক, না হলে এত বড় পৃথিবী চালচ্ছেন কী করে?
এই প্রশ্নের উত্তর তো আমাদের কাছে নেই। আমরা ওর উত্তরের অপেক্ষায় আছি। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর ও আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, একটু ঢেলে নেব?
ব্যাপারটা না বুঝেই আমরা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিলাম। ও পায়ের কাছ থেকে একটা বোতল তুলে দু’ঢোঁক মেরে দিল। আমরা কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। আশ্চর্যের ব্যাপার, বোতলটার মুখ খোলা ছিল। এই পাহাড়ি রাস্তায় কী অদ্ভুত কায়দায় মুখ খোলা বোতলে পানীয় থাকছে। বোতলটার মুখ আটকাল না, রেখে দিল। হাতের চেটো দিয়ে মুখটা মুছে বলল, এখনও ভাবছেন?
আমরা চুপ হয়ে আছি।
লোকটা বলল, সবাই ভগবানকে পুজো চড়ায় ঠিক? বড়লোকেরা দামি কাপড়, প্রচুর দামি মিষ্টি, ফল, পূজারীকে মোটা দক্ষিণা দেয়, ভগবান দেখেন। ঠিক! গরিব লোক খুব সাধারণ জিনিস দেয়, একটা বা দুটো লাড্ডু দেয়, সামান্য দক্ষিণা দেয়। ভগবান দেখেন। ঠিক! কেউ মানত করে, কেউ কোনও কারণে কাঁদে, কেউ উচ্ছ্বসিত হয়ে আনন্দ করে। ভগবান দেখেন। ঠিক! তিনি হাসেন না, কাঁদেন না বা তথাস্তুও বলেন না। যেরকম ছিলেন, সেরকম দাঁড়িয়ে থাকেন। ঠিক! ভগবানের কোনও পরিবর্তন হয় না। ঠিক!
মুখ দিয়ে বেরিয়েছে, ঠিক।
দেখলেন তো স্যার, ভগবানকে দেখে মানুষ চালাক হয়ে যাচ্ছে। তাই কথা বলতে চায় না। সবাই ভগবানের কাছে আসে চালাক হওয়ার জন্য। অন্য কিছুর জন্য আসে না।
[১৭]
কৃষ্ণেন্দু আর সুচরিতার মধ্যে আগের মতো কথা হয় না। যেদিন সুচরিতা খবরটা দিয়েছিল, কৃষ্ণেন্দুর মনে একটা বাক্য উঠে এসেছিল, আমিও পারি। খুব আনন্দ হয়েছিল। আনন্দে মাটিতে পা পড়ছিল না। সর্বপ্রথম গুরুদেবকে খবরটা দিয়েছিল। তিনি শুনেই বলেছিলেন, আনন্দে থাকো, ভাল বই পড়ো, মন ভাল রাখতে হবে কারণ নতুন কুমারসম্ভব নির্মাণ করতে হবে।
গুরুদেবকে কৃষ্ণেন্দু নিজেদের কথোপকথন বলে। তিনি মাথা নিচু করে শোনেন। সদ্যোজাত শিশু সম্বন্ধে কোনও মন্তব্য করেন না। শুধু বলেন, পৃথিবীতে আমরা সবাই সেবা করতে এসেছি, তিনি যে কোনওভাবে বা পদ্ধতিতে আমাদের সেবা নেন। দ্বিতীয়ত তুমি যে গল্প সুচরিতাকে করেছ, এ বিষয়ে বিবাহের আগে তোমাকে বলেছি। আসলে কি জানো, এক ভেঙে দুই হয়েছেন আবার সেই দুই বহু মিথুনে ভেঙে পড়েছেন। এরই নাম জগৎ। জগৎ থেকে আবার উড়িয়ে যেতে হবে সেই একে। এই একই আবার চরম ও পরম তত্ত্ব– যেখানে আমি আমার শক্তির সঙ্গে শিবরূপে নিত্যসামরসে যুক্ত। এই সামরসই আনন্দ– যার একটি মিলন প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে স্ত্রী-পুরুষের স্থূল মিলনে। মিলনে তারা আনন্দ পায়– তার একটা যান্ত্রিক দিক আছে। যেমন আহার নিদ্রা যান্ত্রিক। তেমনি মৈথুনও যান্ত্রিক। খেয়ে সুখ, ঘুমিয়ে সুখ, মৈথুনেও সুখ। এই জীবন পশুর জীবন। আবার এ সবই দিব্য হয়ে ওঠে যদি আত্মঃজ্যোতি এসে পড়ে তাদের ওপর। আহার তখন আত্মায় আহূতি। নিদ্রা সমাধি আর মৈথুনের স্থান অধিকার করে ভালবাসা। ভালবাসায় দুয়ে একই হয়ে আছে। আর সেই অদ্বৈতের আনন্দই নিজেকে বহুগুণিত করে চলেছে। সৃষ্টিজোড়া মিথুন-লীলায় তটস্থ থেকে দেখতে ভাল লাগে না? দেখি এক শিব এক শক্তি ঘটে ঘটে বহু হয়ে বিলাস করে চলেছেন। রামকৃষ্ণ সঙ্গমাসক্ত নরনারীদের মধ্যে তা-ই দেখে আনন্দে সমাধিস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ভৈরবী তখন বলেছিলেন, ‘বাবা, তুমি আনন্দাসনে সিদ্ধ হয়েছ। এরপর আর কোনও সাধনা নাই।’
যা হয়ে গেল, তা ভালই হল। মানুষ অবস্থার দাস নয়, অবস্থা তার দাসী, ইন্ধনকে সে আগুন করতে পারে– এ বীর্য তারই আছে, পশুর নেই।
[১৮]
দীর্ঘদিন কাজের লোক পাওয়া যাচ্ছে না। পুরুষ বা মহিলা কেউই কাজ করতে রাজি হচ্ছে না। বিশেষ করে গ্রামীণ মানুষেরা সবাই অর্ঘ্যকে দেখে অপদেবতার কথা উচ্চারণ করছে। অন্যদিকে শহরের যে সব মানুষ নিয়মিত এইসব কাজ করেন, তারা যে আসছিলেন না, তাও নয়। এমনও হয়েছে টাকা-পয়সা, ছুটি ইত্যাদি নিয়ে সব কথা হয়ে গিয়েছে। সে তার ভোটার কার্ডের ফটোকপিও দিয়ে দিয়েছে। পুলিশের নির্দেশ অনুযায়ী সারাদিনের লোক রাখলে বিশদে চুক্তি করতে হবে এবং সব পুলিশকে জানাতে হবে। সব শোনার পর বলেছে, স্যার একটা কথা কিন্তু চুক্তিতে লিখবেন, আপনার ছেলের মৃত্যুর জন্য কিন্তু আমি দায়ী থাকব না।
ও মরবে কেন?
না স্যার! এইসব শিশুরা বেশিদিন বাঁচে না।
কী করে জানলে? আগে কোথাও করেছ?
না।
তা হলে?
আমার মনে হচ্ছে। আচ্ছা স্যার, আপনারা দু’জনে স্কুলে চলে যাবেন। আমার উপর জিমেদারি থাকবে। যদি কিছু হয়ে যায়!
ওর তো শরীর খারাপ নয়।
কী বলছেন স্যার! যার হাত-পা নেই, তার শরীর ভাল?
না, মানে!
বাচ্চার শরীর যদি ভাল থাকত, তা হলে আপনি এত টাকা দিয়ে লোক রাখতেন? আপনি কি বোকা?
ওর যদি কিছু হয়, তার জন্য তোমাকে দায়ী করব কেন?
না স্যার, এই কথাগুলো লেখা থাকতে হবে।
কেউ কি নিজের সন্তানের কথা লিখতে পারে?
তা হলে স্যার আপনি অন্য লোক দেখুন। এটা রিস্কি কাজ। আপনি বুঝবেন, তবু লিখবেন না।
[১৯]
কৃষ্ণেন্দুর স্কুলের সবাই অর্ঘ্যর জন্মের আগে বলেছিল, ছেলে হবে, বাড়ি আনুন। তারপর অন্নপ্রাশনটা কিন্তু জমিয়ে করবেন। আপনরা ওই ক্যাটারারকে ডাকবেন। আমরা একটু আনন্দ করব আর কী।
সুচরিতার সহকর্মীরা বলেছিল, লক্ষণ বলছে তোর ছেলে হবে। তোকে আমরা স্কুলে সাধ দিলাম। অন্নপ্রাশনটা একটু বড় করে করিস। তোরা তো ডি আই জি লোক।
সুচরিতা ডি আই জি শব্দটায় একটু চমকে গেছিল। ওর তো দু’জনেই স্কুলে পড়ায়, পুলিশ বা মিলিটারির লোক নয়। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মন্দিরা বলেছিল, ডি, আই, জি মানে ডাবল ইনকাম গ্রুপ।
কণিকাদি বলেছিলেন, ‘দেখ সুচরিতা, ছেলে বা মেয়ে যাই হোক, সুস্থ হোক এই প্রার্থনা। তোরা ভাল থাকিস।’
তারপর থেকে সুচরিতা আর স্কুলে যায়নি।
যেদিন অর্ঘ্য জন্মায়, নার্সিংহোমে স্কুলের সবাই এসেছিল। তারা বিকেলে ভিজিটিং আওয়ার্সে অর্ঘ্যকে না দেখলেও সুচরিতার সঙ্গে দেখা করেছে, কথা বলেছে।
কৃষ্ণেন্দু লক্ষ্য করেছে, ইদানীং সবাই তাকে কীরকম করুণার চোখে দেখছে। একজন বীর্যহীন মানুষ বা অপদার্থ।; স্কুলের দারোয়ান বিহারের মতিহারির দ্বারিকাপ্রসাদের ছ’-ছ’টি সন্তান। তার বৌ গ্রামে থাকে, প্রত্যেকটি শিশুই সুস্থ জন্মেছে। তারা শুধু সুস্থ নয়, স্বাভাবিক। দ্বারিকাপ্রসাদ একদিন বলেছিল, বাবু ছোটমুখে একটা কথা বলব?
বলো।
বাবু অপদেবতা আপনাকে ভর করেছে। আপনি কীরকম স্বাভাবিক নেই।
কী করে বুঝলে?
আপনি অন্যরকম হয়ে গেছেন।
এখন বাবা হয়েছি। বলে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, পাল্টাব না?
না স্যার, আপনার গ্রহ খারাপ চলছে। ম্যাডামকে নিয়ে কোনও ভাল জ্যোতিষের কাছে যান, গ্রহের প্রতিকার করুন।
করে কী হবে?
পরেরটা ভাল হবে।
দ্বারিকাপ্রসাদের নজরে এসেছে সে স্বাভাবিক নেই। তা হলে হয়তো আরও অনেকের নজরে এসেছে। একথা সত্যি একটা সদা-সর্বদা মাথার মধ্যে ঘোরে, ‘এইরকম অপরিণত একটা সন্তান জন্মাল কী করে? ডাক্তাররা কিছুই বুঝতে পারল না?’
স্টাফরুমে গিয়ে সুদেবকে জিজ্ঞাসা করে, আমার কিছু পরিবর্তন হয়েছে?
হ্যাঁ, চেহারাটা খারাপ হয়েছে। হঠাৎ এই প্রশ্ন করছিস!
অনেকেই বলছে, আমি নাকি পাল্টে গেছি।
স্বাভাবিক।
কেন?
এত বড় একটা বিপর্যয় তো সবাই বুঝতে পারে না। যার হয় সে বোঝে।
না, মানে!
না মানে আবার কী? আমি বুঝিনি ছোটবোনের কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের সময়ে? তুই তো সব জানিস।
কৃষ্ণেন্দু আর কথা বলে না। ওর স্বাভাবিক ছন্দের পতন হয়েছে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আসলে মাথা থেকে সুচরিতা আর অর্ঘ্যের মুখদুটো মুহূর্তের জন্যও সরাতে পারছে না। ফলে নিজে বুঝতে পারছে, যা করতে চাইছে, তা হয়ে উঠছে না। বা বলা যেতে পারে ধ্যান দিতে পারছে না। নিজেই বুঝতে পারছে, কাজে ধ্যান দিলে এই সমস্ত কিছু ভুলে যেতে পারবে। অথচ কিছুতেই হয়ে উঠছে না। সুদেবের পাশে বসেই সিদ্ধান্ত নিল, এই মুহূর্ত থেকে স্বাভাবিক হতে হবে।
অন্যদিকে সুচরিতা যখনই শিশুদের দেখে, ওর মনে একটা কথাই বারবার ধাক্বা মারে, অর্ঘ্য কোনওদিন স্কুলে যেতে পারল না। দুষ্টুমি করতে পারল না, কারও সঙ্গে মারামারি করল না। লোকে নালিশ জানাতে এল না। মনে আছে কৃষ্ণেন্দুর ভাগ্নের বিয়ের দিন দুপুরবেলা সবাই মিলে আড্ডা হচ্ছে, হঠাৎ বড়ভাগ্নির ছেলে রাজা কাঁদতে কাঁদতে ওর কোলে এসে বসে। ও চমকে যায়। কাঁদছে কেন ওর প্রিয় নাতি? জিজ্ঞাসা করে, কী হয়েছে?
গুলু মেরেছে।
তুমি আমার নাতি হয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসেছ? সে কাঁদবে তুমি হাসবে তবে আমার নাতি।
রাজা উঠে দাঁড়ায় ওর কোল থেকে। পাশ থেকে ডলি বলে, মেজমামু গুলু আমার ছেলে।
কৃষ্ণেন্দু কোনওদিকে না তাকিয়ে বলল, আমি হেরে যাওয়া পছন্দ করি না। মেরে আসতে হবে। মার খেয়ে আসলে হবে না।
আজ কৃষ্ণেন্দু বলতে পারছে না, নয় বলার সুযোগই নেই, আমার ছেলে মার খেয়ে আসবে না, মেরে আসবে। ডলি কি সেদিন অভিশাপ দিয়েছিল? যাতে কোনওদিন একথাটা কৃষ্ণেন্দু না বলতে পারে!
এইসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে প্রতিদিন কান্না গলার কাছে দলা পাকায়। হয়ত মনের ভিতরের নিম্নচাপ তৈরি হয়, পুরনো মুখগুলো ধরা পড়ে। সবাই সান্ত্বনা দিতে চায়, কেউ কেউ স্পর্শ করে কিছুটা অস্বস্তি নিজের মধ্যে নিয়ে নেয়। সুচরিতা বুঝতে পারে সবাই সমব্যথী, কিন্তু কারও কিছু করার নেই।
প্রতিটি ক্লাশে হাজিরা খাতা নিয়ে চেয়ারে বসতেই সুচরিতা দেখতে পায় অসংখ্য শিশুকন্যা তার সামনে ফুলের মতো ফুটে আছে। মনে মনে পড়ানোর কথা স্থির করে এলেও শিশুকন্যাদের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এদের মায়েরা কত ভাগ্যবতী, এরা কত সুন্দর, এরা কার আশীর্বাদ পেয়েছিল বা এদের মায়েরা গর্ভাবস্থায় কী এমন করেছিল, যা সে করেনি?
প্রায় প্রতিটি ক্লাশেই তার ভুল হচ্ছে, সে কী পড়াতে এসেছে, কোনওদিনই সে বই খুলে পড়ায় না। মনেই করতে পারছে না, কী পড়াতে এসেছে? বেশ কিছুক্ষণ সময় নানা কথা ভাবতে ভাবতে চলে যাচ্ছে। অনেক সময়ে ছাত্রীরা কথা বললে সম্বিত আসছে যে, সে ক্লাশে আছে, পড়াতে এসেছে। একদিন ক্লাশ নাইনের অরিত্রিকা জিজ্ঞাসা করেছিল, ম্যাম, আপনার কি শরীর খারাপ?
না, না, চল শুরু করি।
[২০]
প্রথম প্রথম আত্মীয়-স্বজনরা আসত। নানারকম গল্পগুজব করত, অনেকক্ষণ থাকলেও অর্ঘ্যকে দেখতে চাইত না। সামনের ঘরে বসে, কেউ কেউ যে দুপুরে খেত না এমন নয়, তারা সারাদিন থাকলেও ওই ঘরে যেত না। সেইসব মানুষের আসাটাও ধীরে ধীরে কমে গেল। অনেকেই মুখে সান্ত্বনা দিত, মনে মনে বা অন্য কারও কাছে বলত, এরকম সন্তান হওয়ার থেকে না হওয়া ভাল। সেসব নিয়ে ওরা মাথা ঘামায়নি।
এবারও হয়ত মাথা ঘামাত না। ওর লক্ষ্য করেছে আত্মীয়-স্বজনরা ওদের থেকে কাজের লোকদের সঙ্গে বেশি কথা বলে এবং তার কিছুদিনের মধ্যেই মানুষটা কাজ ছেড়ে চলে যায়। লোকগুলো একই কথা বলে, ‘কাল রাতে বাড়ি গিয়ে ঘুমাতে পারিনি। অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখেছি। ভয়ে লোম খাড়া হয়ে উঠছে। আমি আর কাজ করব না।’ তার মানে এই নয় আত্মীয়-স্বজনরা এসে লোক তাড়ায়, আসলে এমন সব আলোচনা করে সহজ-সরল মানুষগুলো ভয় পেয়ে যায়। থাকতে চায় না। ওদের দু’জনের একটাই প্রশ্ন, যা বলার আমাদের বললেই তো পারে!
প্রতিবার সিদ্ধান্ত নেয়, কেউ এলে বলে দেওয়া হবে, আমাদের বাড়ির সহকারীদের সঙ্গে কথা বলবেন না। কিন্তু কাউকেই বলা হয় না। কেমনভাবে জানি সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করতে কিছুতেই পারছে না।
তপন নামে একটা ছেলে বারুইপুর থেকে আসে। ড্রাইভার রতনলালের কীরকম আত্মীয়, সে সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কাজ করে, বেতন দশহাজার টাকা। অর্ঘ্যের থেকে বয়সে বছর তিনেকের ছোট, খুব ভালবেসে যত্নসহকারে সেবাযত্ন করে। ওর মধ্যে একটা মাতৃভাব আছে, যেমন সাধুদের মধ্যে থাকে। ও যে শুধু অর্ঘ্যের কাজ করত এমন নয়, কৃষ্ণেন্দু-সুচরিতাকেও প্রয়োজনমতো সেবা করে। কৃষ্ণেন্দুর জুতো পালিশ করে দেওয়া, লন্ড্রি থেকে জামা-কাপড় আনা বা টুকটাক দোকানে যাওয়া, এমনকি সুচরিতা বাড়ি, বসার ঘরে কোনও অতিথি এসেছে, তাদের চা-জলখাবার গুছিয়ে দেয়। ব্যাপারটা খুব সহজ-সরল হয়ে গেছে। ওর ব্যবহার দেখে কেউ কেউ বলে, দেখো কোথাও নিশ্চয়ই ঝাড়ছে। আজকালকার দিনে এত ভাল লোক ভাবা যায় না। অবশ্য সেরকম কোনও ঘটনার আঁচ ওরা দু’জন পায়নি। ও প্রায় বছর ছয়েক কাজ করছে। এত দীর্ঘদিন কেউ কাজ করেনি। একদিন বিকেলে কৃষ্ণেন্দু উচ্চমাধ্যমিকের খাতা দেখছিল, ও পাশে এসে দাঁড়াল, এরকম প্রায়ই দাঁড়ায়, ও মুখ তুলে তাকালে ‘দাদা ফুচকা খেতে চাইছে’ বা ‘বাইরে যেতে চাইছে’, ‘এই শব্দটার মানে দাদা জানতে চাইছে’। কৃষ্ণেন্দু ভেবেছিল, ওই রকম কিছু একটা বলবে। মুখ তুলে অন্য দৃশ্য দেখল, তপন মাটির দিকে তাকিয়ে আছে, মুখটাও ম্লান। প্রথমে মনে হয়েছিল অর্ঘ্যর আঠারো বছর হল, ও টিভি, খবরের কাগজ এবং বই থেকে অনেক কিছু জেনেছে। অনেক সময়ে নিজের সিদ্ধান্তের কথা বলে বা মতামত দেয়, যা চট করে প্রত্যাশা করা যায় না। হয়ত তপনের সঙ্গে কোনও বিষয়ে মতের মিল হয়নি। তপনকে প্রায়ই ও তাড়িয়ে দেয়। ওর কথায় সায় না দিলেই বাবু সবাইকে নির্বাসনে পাঠাতে চান। তারপর বলে, বাবা তপনকে ফোন করো, ও মনে হয় রাগ করেছে।
কেন রাগ করেছে কেন?
দুপুরে বকেছি।
ও তোমার জন্য এত করে, তাও তুমি ওকে কেন বকতে গেলে!
মা স্কুলে যাওয়ার সময়ে দেখা করতে এসেছিল। সবুজ রঙের শাড়ি-ব্লাউজে মা’কে এত সুন্দর লাগছিল, তোমায় কী বলব। অনেক সুন্দরীকে মা এখনও হার মানাতে পারে। বলেছিলাম, মা একটু দাঁড়াও, তোমায় দেখি।মায়ের তাড়া ছিল, স্কুল যেতে হবে। তপন চাইছিল না মা দাঁড়াক। মা’কে দেখতে দেখতে আমার মাথায় একটা প্রশ্ন এল, মানুষ সবুজের সঙ্গে সবুজ থাকলে ম্যাচিং বলে। অথচ দেখো প্রকৃতি সবুজগাছে সব রঙের ফুল-ফল এক করে সাজিয়ে দিয়েছে আমাদের জন্য। লোকে দেখতে যাচ্ছে লবটুলিয়া, মুঘলগার্ডেন আরও কত আছে। কেউ তো কোথাও লেখেনি বা বলেনি ম্যাচ করেনি। মা কেন সবুজের সঙ্গে লাল ব্লাউজ পরেনি? মা বলেছিল, ‘উত্তরটা জানা নেই, স্কুল থেকে এসে বলবে।’
মা’কে গাড়িতে তুলে দিয়ে এসে তপন বলল, ‘বাইরে যাওয়ার সময় প্রশ্ন করতে নেই।’ প্রথমত, আমার মা’কে আমি কখন প্রশ্ন করব, সেটাও তপন বলে দেবে? এটা হয়? দ্বিতীয়ত আমার মনে তখনই প্রশ্নটা এল, কখন করব যদি ভুলে যাই। আর দেখো আমি তো লিখতেও পারি না। কোনওটাই তপন বুঝতে চাইল না। সবুজ শাড়ির সঙ্গে লাল ব্লাউজ শুনে ও হাসছিল। তুমি জানালা দিয়ে তাকাও, জবাফুল, অপরাজিতাফুল, গাঁদাফুল, সুন্দর লাগছে না বলো!
কৃষ্ণেন্দু বলেছিল, সবার চোখ এক রকম হয় না। তাই তারা বচসা করে। তখন চুপ করে যেতে হয়।
আরেকদিন ছোটমাছ গোটা খেতে গিয়ে কাঁটা বিঁধেছিল। তপন বারণ করেছিল খেতে। ও ফাজলামি করে বলেছিল, ‘ধড়-মুণ্ডু এক সঙ্গে খাব।’ তারপর অস্বস্তি, কিছুতেই কাঁটা যায় না। তপনের কোনও পদ্ধতিই কাজে আসে না। তপনের একটাই দোষ, বলে ফেলেছিল ‘চুপচাপ শুয়ে থাকো ঠিক হয়ে যাবে।’ এই প্রথম ও স্বীকার করেছিল, একজন হাত-পাওয়ালা মানুষের যা হয়, ওর মতো প্রতিবন্ধী কি সেটা সইতে পারে? না এটা একটা বিচার হল?
আরও অনেক কথা তপনকে বলেছিল, তপন সেসব ওদের বলেনি। রতনলাল হয়ত কিছু জানে বা সবই জানে। কারণ এইসব কথা তো আলোচনার। মাছের কাঁটা গলায় না বিঁধলে বাবু স্বীকার করতেন না তিনি প্রতিবন্ধী।
কৃষ্ণেন্দু খাতাটা রেখে ওর দিকে তাকাতেই, তপন বলেছিল, আমি এ মাসে কাজটা ছেড়ে দেব।
কোথাও কাজ পেয়েছিস?
না।
তা হলে?
আমার ভাল লাগছে না।
কেন ভাল লাগছে না?
এমনি।
আচ্ছা তোর মা স্কুল থেকে আসুক, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে!
অতক্ষণ থাকা যাবে না।
আমি যদি স্কুলে যেতাম?
আমিও চলে যেতাম।
দাদাকে ফেলে?
দাদাই তো আমাকে রাখবে না।
কেন?
আমি চোর।
কে বলল?
দাদা।
কৃষ্ণেন্দু তপনের হাতটা ধরে অর্ঘ্যর ঘরে যায়। ইচ্ছা করেই তপনকে আগে ঢোকায়। তপনকে দেখে অর্ঘ্য চিৎকার করে ওঠে, তুই আবার এসেছিস?
কী হয়েছে অর্ঘ্য ? চিৎকার করছ কেন?
ও চোর, ওকে তাড়িয়ে দাও।
কী চুরি করেছে?
অনেক, অনেক, অনেক কিছু … বলতে বলতে অর্ঘ্য হাঁপিয়ে ওঠে। তারপর কেঁদে ফেলে। আসলে এটা একটা কায়দা। সব মানুষই নিজের মতো করে পথ তৈরি করে নেয়। কৃষ্ণেন্দু কথা বাড়ায় না। তপনকে নিয়ে নিজের ঘরে আসে, ‘তুই বোস। তোর মা আসুক।’
প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার সময়ে সুচরিতা কিছু না কিছু মুখরোচক খাবার নিয়ে আসে। অর্ঘ্য পনির ভাজা ভালবাসে, ওর নিজেরও পছন্দ। বাড়ি ফিরে দেখে তপন দরজা খুলছে কিন্তু গম্ভীর মুখ। অন্যান্য দিনের মতো হাত বাড়িয়ে বলে না, ‘ব্যাগটা দাও।’ দরজা খুলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। সুচরিতা অনুমান করে কিছু একটা হয়েছে, তাই জামাকাপড় না বদলেই অর্ঘ্যর কাছে যায়। মা’কে দেখে ও আবার চিৎকার করে ওঠে, ওকে তাড়িয়ে দাও, ও চোর।
ও কী চুরি করেছে?
অনেক, অনেক কিছু … বলে গোঙাতে থাকে।
একটা অন্তত বল, আমি মিলিয়ে দেখি।
বলব?
বলছি তো বলতে।
‘মা।’
সুচরিতা আওয়াজ করে হেসে ওঠে, কোনওদিন ও ভাবেনি এইরকম একটা সমস্যা তৈরি হতে পারে। তপন ওকে ‘মা’ বলে ডাকে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে। শুধুমাত্র নিজের স্বার্থে দু’জন মাস্টারমশাই একটা ছেলেকে মূর্খ করে রাখল। এতবড় শাস্তির পরেও দু’জনে একটা কথা নিয়ে আলোচনা করে। ছেলেটার প্রতি অন্যায় হচ্ছে। তপনকে এই ঘন অন্ধকার থেকে উদ্ধারের কোনও উপায়ও ওর মাথায় আসে না। ছেলেটা সব অর্থেই ভাল। কৃষ্ণেন্দু আর সুচরিতা ভালবাসে, নিজেদের স্বার্থেই ভালবাসে। ওকে অর্ঘ্য সহ্য করতে পারছে না।
সুচরিতা ছেলের মাথায় হাত বোলায়, ঠান্ডা হও বাবা। একটা যুতসই উত্তর মাথায় আসছিল না। আঠারো বছরের ছেলেরা কোথায় পৌঁছে গেছে, আর ও ঘরে শুয়ে শুয়ে অন্য লোকের পড়া শুনছে। বাকি সব টিভি থেকে। বর্ণপরিচয় হয়েছে, মুখের কাছে বই ধরলে পড়তে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ে পড়তে চায় না। তাই প্রাচীনতম পদ্ধতি শ্রুতিই ওর জন্য প্রয়োগ করা হয়েছে। অন্য কোনও পদ্ধতির কথা ওরা ভাবেনি। আজ যেমন ‘মা’ চুরি হয়ে গেছে, এটা ঢুকেছে। যতক্ষণ না পরিষ্কার হবে, এটাই চলতে থাকবে। একটু ঠান্ডা হতেই সুচরিতা বলল, ও তো তোর ছোটভাই!
কে বলল?
আমি বলছি।
ও তো তপন মিত্র!
তাতে কী?
তোমার ছেলে হলে ও তপন বাসু হোত!
আমি কী লিখি? সুচরিতা মিত্র বাসু তো? তোকে বাবারটা দিয়েছি, ওকে আমারটা।
কথাটা শুনে একটু চুপ করে। চোখ বুজে বসে থাকে। বোধহয় পছন্দ হয়নি। সুচরিতার সন্দেহ হয়। জিজ্ঞাসা করে, পনির ভাজা এনেছি, পাঠাই?
ওকে দিয়ে পাঠিয়ো না।
কেন?
ও আমাকে একদিন খুন করবে।
কেন খুন করবে? বড়ভাইকে কেউ খুন করে?
টাকার জন্য মানুষ সবকিছু করতে পারে।
সুচরিতা অনেকক্ষণ চোখ বুজে বসে থাকে, কথা বলতে পারে না।
[২১]
সেইরাতে কৃষ্ণেন্দু আর সুচরিতা মুখোমুখি বসেছিল। এতদিন সমস্যা ছিল বা বলা যেতে পারে জীবন-যাপন নানাবিধ সমস্যা নিয়ে নির্বাহ করতে হচ্ছিল, যেটা স্বাভাবিক। আঠারো বছর তো একটা-আধটা দিন নয়। অর্ঘ্যর কোনও সমস্যা নেই। সাধারণ জিনিস ও বোঝে না।পরিশ্রম কী জিনিস ও বুঝতে পারে না। ও তো অন্য যুবকদের মতো নয়। ওর কাছে আঠারো বছর কখনও ভয়ংকর নয়। ওর বুদ্ধি বা চিন্তাধারা সরল নয়।সুচরিতা ভাবত ও পৃথিবী দেখেনি, অনেকের সঙ্গে মেশেনি, ওর মনের ভিতরে প্যাঁচ তৈরি হয়নি। আজ বুঝল, ও আর সাধারণের মতোই। দ্বিতীয়ত এই বিশেষ মানুষরা সবসময়ে নিজের সুরক্ষা নিয়ে ভাবে। নিজেকে সব সময়ে অরক্ষিত মনে করে। এখানে বুদ্ধিমান লোকের ভাবনা ফুটে উঠছে। সুচরিতা বকবক করতে থাকে, কৃষ্ণেন্দু চুপচাপ শোনে। কিছু বলে না। বলার তো কিছু নেই। প্রতিবন্ধী পুত্র জন্মানো যদি পাপ হয়, কর্মফল হয়, তা হলে প্রায়শ্চিত্ত তো করতেই হবে। সেটাই তো করে চলেছে। সুচরিতা অনেকক্ষণ পর থেমে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কিছু বললে না?
কী বলব বুঝতে পারছি না। ওকে কি কাউন্সেলিং করাতে হবে?
মনে হয় তার দরকার হবে না।
তপনের সঙ্গে ও আজ মোটেই ভাল ব্যবহার করেনি।
আমারও খুব খারাপ লাগছিল। তবে তপন যেই শুনেছে, ‘মা’ চুরি হয়েছে, আর দাঁড়ায়নি হাসতে হাসতে রান্নাঘরে গেছে চা বানাতে।
তপন আর অর্ঘ্যর খুনসুটিতে কৃষ্ণেন্দু ভুলে গেছিল সুচরিতাকে ডাক্তার দেখাতে হবে। গত দু’দিন ধরে ও বারবার বমি করছে। কালচে বমি হওয়ার পর সুচরিতা বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতে চাইছে। মনে পড়তেই জিজ্ঞাসা করে, আর বমি হয়নি তো?
হয়েছে।
কখন?
সকালে খুব ভোরে, আর স্কুলে টিফিনের ঠিক আগে।
বলোনি তো!
কখন বলি বলো তো!
চলো, আজই ডাক্তার দেখাব।
ভয় পেয়ো না আমি মরব না। মেয়েমানুষ কই মাছের জান। ভয় পাচ্ছ কেন?
কৃষ্ণেন্দু সন্ধেবেলা ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে।
[২২]
সেই রাতে কৃষ্ণেন্দু আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয়। মানুষটা ওকে দেখে হাসতে থাকে। প্রতিদিন আত্মজিজ্ঞাসার লোকটা পাল্টে যায়। লোকগুলোকে দেখলে মনে হয় পরিচিত, কিন্তু কারও পরিচয় আবিষ্কার করতে পারেনি। সবার হাতে খাতাটা একই থাকে। আজ খুব চেনা চেনা লাগছে। লোকটা নির্লজ্জের মতো হাসছে, মনে হয় কৃষ্ণেন্দুকে তাচ্ছিল্য করছে। ও নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, হাসছেন কেন?
আপনাকে দেখে।
আমি কি জোকার?
জোকার-কৌতুকাভিনেতার প্রয়োজন এখন আর নেই ।
মানে?
মানুষ সব ভূমিকায় অভিনয় করছে।
আপনার কথাটা ঠিক বুঝলাম না।
আপনাকে দেখলে হাসি পায়।
কেন?
জোকাররা যা বলে সেগুলো পারে না। অন্য খেলোয়াড়দের ব্যর্থ নকল করে।
এসব কথা বলছেন কেন?
আপনি ইকুউলিব্রিয়াম বোঝেন? নিউটনের ল’ বোঝেন? অবশ্য আপনি তো ছাত্র পড়ান, বুঝমানের ভাব তো আপনাকে রাখতেই হবে। আসলে বোঝেন না।
কথাটা বুঝলাম না।
ভাল করে ভাবুন, পরে কথা হবে।
পরে কেন? আজই হোক।
আজ সব বলে দিলে কাল তো আর ডাকবেন না। আত্মজিজ্ঞাসার পাতা খুলবেন না।
কৃষ্ণেন্দু আত্মজিজ্ঞাসার পাতা বন্ধ করে দেয়। বোঝার চেষ্টা করে সে ইকুউলিব্রিয়াম বোঝে কি না বা শব্দটার প্রকৃত অর্থ কী? সাম্যাবস্থা বলে কিছু হয়?
[২৩]
ডাক্তারবাবু রোগের কথা জানিয়ে দেওয়ার পর থেকে সুচরিতা ভিতরে ভিতরে ভাঙতে থাকে, কোনও কিছুতেই স্পৃহা নেই। সেই যে গল্পে আছে, চাষি দুপুরে মাঠ থেকে এসেছে, দাওয়ায় বসে তেল মাখছে পুকুরে স্নান করতে যাবে। হঠাৎ কানে আসে পাশের ঠাকুরবাড়িতে ঘণ্টা-শাঁখ বাজছে। তেল মাখতে মাখতে বউকে জিজ্ঞাসা করে, ‘হ্যাঁরে বউ, ঠাকুরবাড়িতে আজ কীসের পুজো?’ বউ বলে, ‘ওমা তুমি জানো না? বড়ঠাকুর সন্ন্যাস নেবেন, তাই পুজো-আচ্চা, লোকজন খাওয়ানো এসব হচ্ছে।’ চাষি বলে, ‘তাই নাকি, সন্ন্যাস নিতে গেলে এত কিছু করতে হয়। এই দ্যাখ, আমি চল্লুম!’ গামছাটা কাঁধে নিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে গেল।
ওর ভাবটাও সেইরকম, আমি চল্লুম।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠেনি। বেলা ৯টার সময়ে মন্দিরাকে ফোন করে জানায়, আজ স্কুলে যাব না, শরীর ভীষণ খারাপ।’
কেন যাবে না?
ভাল লাগছে না।
তোমার শরীরে কর্কট-মহারাজ বাসা বেঁধেছে এটা তো এমন নয় যে খুব গাড়িয়ে গেছে, সেরে যেতে পারে। তোমার সেই পত্রিকা-সম্পাদক বন্ধু, রেলে চাকরি করত, কী যেন পত্রিকাটার নাম, দধিচি না দুর্জয়। তিনি তো সুস্থ হয়ে গেছেন। অসুখ হলে চিকিৎসা করাতে হবে। এরকম সব বন্ধ করে দিলে চলবে কী করে?
আজ ভাল লাগছে না।
দ্বিতীয়ত আরেকবার অন্য কোথাও পরীক্ষা করানো যেতে পারে! সেই পরীক্ষায় অন্য রিপোর্ট আসতে পারে। ডাক্তার কাঞ্জিলাল যখন সন্দেহ করেছেন, তখন নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। তবু মানুষের তো ভুল হয়। অবশ্য এসব কথা শুনতে সুচরিতার ভাল লাগে লাগে না। ও সব শুনে হাসে, কথা বলে না।
এখন আর ও সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠে না। সারাদিন প্রায় শুয়েই থাকে। একদিন দুপুরে নিজের ফুলের বাগানে পায়চারি করতে করতে দু’বার বমি হয়। অর্ঘ্য জানলা দিয়ে দেখতে পায় মা বমি করছে। তপনকে পাঠায়। তপন দৌড়ে যায়। সুচরিতার চারদিকে কালো রঙের তরল ছড়িয়ে আছে। ওকে ধরে ঘরে নিয়ে আসে। পরিষ্কার করে শুইয়ে দেয়। কৃষ্ণেন্দু স্কুল থেকে এসে শুনে সামান্য বকাবকি করে। সুচরিতা শুধু হাসে।
এই ঘটনার তৃতীয় দিনে অর্ঘ্য জানলা দিয়ে আবিষ্কার করে, গাছগুলো কী রকম পাল্টে গেছে। সেদিন ও কিছু বলেনি। পরদিন আরও শুকনো হয়েছে গাছগুলো। পাতা ঝরে গেছে। সাত-আটটা গাছ কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সেদিন ও ভয় পেয়ে গেছিল। মা তো ওইখানেই বমি করেছিল। গাছগুলো শুকিয়ে গেল কেন? মা’কে কিছু বলেনি। বাবা ফিরতেই ও শুধু বলেছিল, ‘বাবা, সব শুকিয়ে যাচ্ছে।’
কী শুকিয়ে যাচ্ছে?
গাছগুলো।
কোথায়?
যেখানে মা বমি করেছিল।
জানালা দিয়ে দেখে কৃষ্ণেন্দুর শান্তি হয়নি। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে তপনকে নিয়ে সরেজমিনে দেখে নিল। তারপর দু’জনকে অনুরোধ করল, মা’কে জানাস না।
সুচরিতা দেখেছিল, অতগুলো গাছ মরে গেছে। একদিন সবাই ওঠার আগে নিজেই গিয়ে উপড়ে ফেলেছিল গাছের কঙ্কালগুলোকে। জায়গাটা এখন সাফ-সুতরো করা। এটা নিয়ে কেউ কোনও কথা বলেনি। ও ভেবেছিল কেউ খেয়াল করেনি। এরপর ও আর স্কুলে যেতে চাইত না। সারাদিন শুয়ে থাকে। ওর কিছুই ভাল লাগে না। ওর সহকর্মীরা আসে, আত্মীয়-স্বজনরা আসে। ও মুখ চাপা দিয়ে কথা বলে, উঠে বসে, কিন্তু বিছানা থেকে নামে না। কারণ ওর মনে হয়েছে, ও বিষ ছড়াচ্ছে।
একদিন কৃষ্ণেন্দু জিজ্ঞাসা করে, বিছানা থেকে নামছ না কেন?
সুযোগ দিচ্ছি।
কাকে?
কর্কট-মহারাজকে।
কীসের সুযোগ?
তাড়াতাড়ি যাতে গলে যেতে পারি।
এরকম শর্ত তো ছিল না।
আমি হেরে গেছি কৃষ্ণেন্দু।
এসব ছেলেমানুষী না করে স্কুলে যাও, শিশুদের সঙ্গে থাকো। মন আর শরীর তাতে ভাল থাকবে।
আমি পারব না।
কেন পারবে না?
সবার সামনে গিয়ে আর দাঁড়াতে পারব না।
কেন? না দাঁড়ানোর কী হয়েছে?
আমার শ্বাস-প্রশ্বাসে বিষ, স্পর্শে বিষ– এসব কথা বললে কি স্কুলে যাওয়া যাবে?
বলবে কেন? চুপ থাকবে!
সচেতন মানুষ চুপ থাকতে পারে?
আমাদের কি অন্য কোনও উপায় আছে?
সুচরিতা আর কথা বলে না। চোখদুটো ছলছল করে ওঠে। কৃষ্ণেন্দু পড়ার ঘরে যায়।
[২৪]
অর্ঘ্যর জন্মের প্রায় বছরদুয়েক বাদে সুচরিতা ডা. জয়ন্ত চক্রবর্তীর কছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিল। ডাক্তারবাবু ওকে দেখে ভেবেছিলেন, ও বুঝি আবার কনসিভ করেছে। চেম্বারে ঢুকতেই বললেন, একা এসেছেন?মাস্টারমশাই আসেননি! শুয়ে পড়ুন, দেখে নিই, তারপরে কথা বলব।
স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় ডাক্তারের উল্টোদিকের চেয়ারে বসে বলেছিল, শোয়ার মতো কিছু হয়নি।
তা হলে?
আমার একটা কথা জানার আছে।
বলুন।
আপনি সেদিন সত্যি কথা বলেননি কেন?
কোন দিন?
আপনি তো জানতেন আমার ছেলের হাত-পা তৈরি হয়নি!
ডাক্তারবাবু কোনও কথা বলেননি। ওর দিকে শক্ত হয়ে তাকিয়ে ছিলেন।
আপনি তো জানতেন ও স্বাভাবিক হয়নি!
ডাক্তারবাবু ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালেন।
আমাদের বলেননি কেন?
ডাক্তারবাবু কলিংবেল টিপলেন। মেয়েটি চেম্বারে ঢুকতেই বললেন, ওনাকে একগ্লাস জল দাও।
আমাদের অন্ধকারে কেন রাখলেন?
ডাক্তার চক্রবর্তী দাঁতে দাঁত চেপে বসেছিলেন। মেয়েটি চেম্বারে ঢুকতেই বললেন, তুমি ওনার পাশের চেয়ারটায় বসো। মেয়েটির পুরনো অভিজ্ঞতা থেকে সুচরিতাকে স্পর্শ করে বসেছিল।
আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না।
আপনাকে সব কথা বলিনি একথা ঠিক। তার কারণ একজন ডাক্তার শুধুমাত্র রুগির দেহের চিকিৎসা করে না। মনের চিকিৎসাটাও করতে হয়। মন সুস্থ না হলে শরীর সুস্থ হয় না। এর সঙ্গে সমাজের কথাটাও ভাবতে হয়।
আপনার কথাটা বুঝলাম না।
এই চেম্বারে মা হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে যত মহিলা আসেন, সবার সামাজিক অবস্থান এক নয়। আমাদের প্রথম কাজ মা এবং শিশুকে সুস্থ রাখা। এই সুস্থতা শারীরিক। দ্বিতীয়ত মায়ের এবং পরিজনদের মন ভাল রাখা।তৃতীয় ধাপে সবাইকে একই পথ্য বলা হয় না, সবার পক্ষে সেটা সম্ভব নয়, তাই আর্থিক এবং সামাজিক অবস্থানের উপর পথ্য ও অন্যান্য উপদেশ নির্বাচন করতে হয়। এটাই আমাদের প্রাথমিক কাজ।
আমাকে তো একবার বলতে পারতেন!
আপনাকে কেন, সমস্ত শিক্ষিত মায়েদের আমি এটা পড়াই। দেখুন, এটা আপনাকে পড়াইনি? বলে ডাক্তারবাবু ল্যামিনেশন করা একটা কাগজ ওর সামনে রাখলেন, ‘4 no পর্যন্ত পড়ে দেখুন।’
- Fertlization happens when a sparm meets and penetrates an egg. It is also called conception. At this moment the genetic makeup is complete, including the sex of the baby. Within about three days after conception, the fertilized egg divides very fast into many cells. It passes through the fallopian tube into the uterus, where it attaches to the uterine wall. The placenta, which will nourish the baby, also starts to form.
- Development at 4 weeks : At this point the baby is developing the structures that will eventually form his face and neck. The heart and blood vessels continue to develop. And the lungs, stomach and liver start to develop. A home pregnancy test would show positive.
- Development at 8 weeks : The baby is now a little over half an inch in size> Eyelids and ears are forming and you can see the tip of the nose. The arms and legs are well formed. The fingers and toes grow longer and more distinct.
- Development at 12 weeks : The baby measures about 2 inches and starts to make its own movements. You may start to feel the top of your uterus above your public bone. Your doctor may hear the baby’s heartbeat with special instruments. The sex organs of the baby should start to become clear.
পড়া হয়ে গেলে সুচরিতা বলল, এতে আমার উত্তর নেই।
ডাক্তার চক্রবর্তী কাগজটা ফিরত নিতে নিতে বললেন, আছে।
কোথায় আছে? আমি কি ইংরেজি বুঝি না?
১২ সপ্তাহ পর্যন্ত আপনি পড়লেন। ২০ সপ্তাহ পরে আলট্রাসাউন্ড হয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম, বেবি সুস্থ আছে। আমরা যেমন বেবির লিঙ্গ বলতে পারি না, একইভাবে আমরা অন্য কোনও কথাই জানাতে পারি না।
আমার সন্তান স্বাভাবিক নয়– শুধুমাত্র এইটুকু জানালে আমার সুবিধা হোত!
কী করতেন? ভ্রূণহত্যা?
না। মানে…
জানেন অনেক মা বলেন, ডাক্তারবাবু, ছেলে না মেয়ে আপনি তো বলবেন না, আচ্ছা গায়ের রংটা আমার থেকে কালো হবে না তো? দেখতে সুন্দর হবে তো? আপনার এই প্রশ্নটা ভ্রূণহত্যার নতুন কারণ হতে পারে।
তাই বলে প্রতিবন্ধী জন্মাবে, আপনাদের কোনও দায়িত্ব নেই?
আমাদের হাতে শিশু জন্মায়, তার কোনও লিঙ্গ নেই, সুন্দর-কুৎসিত, সাদা-কালো, অন্ধ-চক্ষুমান, আমরা এসব দেখি না। মা এবং শিশুকে সুস্থ অবস্থায় পরিজনদের হাতে তুলে দেওয়াটাই আমাদের কাজ।
আপনি কি মনে করেন না এটা একধরনের তঞ্চকতা?
ডা. চক্রবর্তী আওয়াজ করে হেসে উঠলেন। সুচরিতা একটু চমকে গেছিল। উনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘এতদিন ডাক্তার ভগবান অথবা ডাকাত ছিল, তঞ্চক শব্দটা যুক্ত হল। দিনে দিনে ১০৮ ভাল মন্দ শব্দ হয়ে যাবে।’
সুচরিতা আর কথা বাড়ায়নি।
[২৫]
আজ দু’বছর তিন মাস দশদিন কৃষ্ণেন্দু অবসর নিয়েছে। সুচরিতার এখনও তিনবছর চাকরি আছে। তা সত্বেও ও আর স্কুলে যেতে চাইছে না। খবরটা পেয়ে সহকর্মী মন্দিরা আর জয়া এসেছিল। টেলিফোন করে সুচরিতা জানিয়েছিল বা ওরা রুটিন ফোন করেছিল, তখন ও জানিয়েছে। স্কুলের পর ওরা এল। ওদের দেখে তপন জলখাবারের ব্যবস্থা করতে গেল। কৃষ্ণেন্দু দরজা থেকে ওদের দু’জনকে দেখে আর ঢুকল না। নিজের ঘরে এসে বসল। এ ঘর থেকে সুচরিতার কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। হয়ত মন্দিরা আর জয়াও কাঁদছে।
কিছুক্ষণ পর মন্দিরা আর জয়া কৃষ্ণেন্দুর ঘরে এল। মন্দিরাই বলল, দাদা, একা একা কী করছেন?
বই পড়ছি। এই কাজটা করতে তো কোনও পার্টনার লাগে না।
দাদা ভেঙে পড়বেন না। একা না থেকে ওর কাছে থাকুন। চিকিৎসায় ও ভাল হয়ে যাবে। এটা তো প্রথম স্টেজ।
জানি না ঠিক হবে কিনা! তবে সুচরিতা তো পালাতে চাইছে।
পালালে চলবে কেন?
আপনারা ওকে বোঝান। স্কুলে যেতে বলুন।
বলেছি। এতক্ষণ তো একটা কথাই জপলাম দু’জনে। আপনিও বলুন। কাজ হবে…
কথা শেষ না হতেই সুচরিতা দরজায় এসে দাঁড়াল। আজ তিনদিন পর ও বিছানা থেকে উঠল। কৃষ্ণেন্দু বলল, ভিতরে এসো।
তোমাকে একটা কথা বলতে এলাম, তুমি ওদের হাতে একটা চিঠি করে দাও, আমি আর স্কুলে যাব না।
ঠিক আছে, কিন্তু ক’দিন পরেই তো পরীক্ষা, শিশুগুলোর তো ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
বুঝতে পারছি, আমার আর ভাল লাগছে না। তোমরা বিশ্বাস করো। কথাগুলো বলে আবার গিয়ে শুয়ে পড়ল। জয়া পিছন পিছন গেছিল। ঘুরে এসে বলল, ভেঙে পড়েছে, খুব ভেঙে পড়েছে।
বেশ কিছুক্ষণ তিনজন কথা বলেনি। সবাই মাটির দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবছিল। কৃষ্ণেন্দু তপনকে বলল, চা দিলি না!
মায়ের ঘরে দিয়েছি। আপনাকে দেব?
সবারটাই এ ঘরে দে।
ওরা বলল, এখন আবার এসব কেন?
স্কুল থেকে এসেছেন, এমন তো কিছু না, খেয়ে নিন।
সুচরিতা আবার উঠে এল, মন্দিরা তোরা কিন্তু খেয়ে যাস। আর হয়ত এ বাড়িতে তোদের আসা হবে না। ভগবান তো আমাকে শুভকাজ করার সুযোগ দিলেন না, সব অশুভকর্ম দিলেন। কাউকে ডাকতে পারলাম না। সারাটাজীবন শুধু সমবেদনা নিয়ে গেলাম।
মন্দিরা উঠে গিয়ে ওকে ধরে বলে, আয়, আমাদের সঙ্গে একটু বোস।
না রে এই ঘরে ঢুকব না। কর্কট-মহারাজ যাতে ওকে স্পর্শ না করে সেইজন্যই ঢুকব না।
ঘরের তিনজন মানুষ পরস্পরের দিকে তাকায়। কর্কট কি ছোঁয়াচে রোগ? ঘরে ঢুকলেই অন্য লোকের হয়ে যাবে! ওরা হেসে ফেলে।
তোরা হাসছিস?
কর্কট কি ছোঁয়াচে?
না তো কী!
তোকে কে বলেছে?
আমি জানি।
দুর বোকা, এদিকে আয় বোস।
দীর্ঘদিন বাদে সুচরিতা কৃষ্ণেন্দুর ঘরে ঢুকল। ও বই পড়ে কিন্তু গোছায় না। তাই সমগ্র ঘরটা এলোমেলো হয়ে আছে। আগে এই ঘরটাই ওদের বেডরুম ছিল। তাই ডবলবেডের খাট এই ঘরেই রয়েছে। প্রথম প্রথম অর্ঘ্যও এই ঘরেই থাকত। তারপর লোক রাখার প্রয়োজন হতেই ওকে পাশের ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সারাদিন লোকের কাছে থাকত, বিকেল থেকে মা থাকত। তখন থেকেই কৃষ্ণেন্দু একা। আগে এত বই এ ঘরে ছিল না। এখন আর কৃষ্ণেন্দু উপরে পড়ার ঘরে যায় না। এখানে বসেই বই পড়ে। লোকজন আসলে কথা বলে। বই তো কমে না, প্রতিদিন বাড়ে। ফলে ঘরটার অবস্থাও খুব সুন্দর নয়। অসুস্থ হওয়ার পর সুচরিতা অন্য ঘরে চলে গেছে। সে ঘরে অন্য কারও প্রবেশ নিষেধ।
জলখাবারের পর তপন চা দেয়।
কৃষ্ণেন্দু ওদের বলে, চিঠিটা টাইপ করে দিই?
না দাদা এখন থাক। আমরা একটু আলোচনা করি, তারপর জানাব।
[২৬]
ওরা চলে যেতেই আত্মজিজ্ঞাসার লোকটা সামনে এল, কেমন আছেন?
ভাল।
এখন আর ‘দিব্য আছি’ বলেন না তো? তার মানে ভাল নেই।
না, সত্যি ভাল নেই।
নতুন কিছু হয়েছে?
হ্যাঁ। ঠাকুরঘরে কর্কট-মহারাজ বাসা বেঁধেছেন।
সত্যি উনি কোনও বাড়ি বাদ দিচ্ছেন না।
সুচরিতা আস্তে আস্তে আমার সামনে গলে যাবে। সেই দৃশ্যের কথা ভাবলেই…
ভাববেন না। এসব ভাবনার নয়, কর্মের। সব আমাদের কর্মের দোষ।
কী অন্যায় করেছি বলতে পারেন? আপনার খাতায় কিছু লেখা আছে?
আমি তো আপনার অতীত জানি না, পূর্বজন্ম জানি না, কী করে বলব?
জানেন, সুচরিতা শুয়ে পড়েছে। বিছানা ছাড়ছে না। ও বলছে, নিজে দাঁড়াতেও পারছে না। অথচ ডাক্তারেরা বলছেন, এই স্টেজে লোকে অফিস করে, ব্যবসা করে, স্বাভাবিক জীবন-যাপন করে। অনেকে কাউকে জানতে পর্যন্ত দেয় না। বহু মানুষ এই অবস্থা থেকে সারভাইভ করেছে। অথচ ও বিছানা থেকে উঠতে চাইছে না। আমার সব শেষ হয়ে গেছে।
মানে?
আমার পঞ্চইন্দ্রিয় কাজ করছে না।
ডাক্তার দেখান।
ডাক্তার দেখালে কিছু হবে না।
তা হলে?
আসলে প্রয়োজনহীন হয়ে পড়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। তাই ব্যবহার করছি না।
মানুষটা হেসে উঠল, এটা সম্ভব! পঞ্চইন্দ্রিয় কি নিজে বন্ধ করা যায়?
চেষ্টা করছি।
ভুল করছেন। স্বাভাবিক থাকুন। আর ভাবুন কর্মের কথা।
কোন কর্মের কথা?
যা যা করতে হবে।
ভাবার মতো ধৈর্য আর নেই। আপনি আমার অবস্থা বুঝতে পারছেন না।
তা বললে চলবে কেন? আপনার পরেও তো এই পৃথিবীতে কেউ আসবে। তার জন্য সুন্দর করে রেখে যাবেন না? একটা কথা মনে রাখবেন, ‘বীজ ছাড়া গাছ হয় না এবং গাছ ছাড়া ফল হয় না।’
আপনি কি বলতে চান, গাছটা আমি লাগিয়েছি?
নিশ্চয়ই।
আমি জানি না। আপনি জানেন?
না, আমিও জানি না।
তা হলে যে বললেন, নিশ্চয়ই।
আাপনি মাস্টারমশাই, আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন, আমরা জ্ঞান এবং অজ্ঞান দুটো শব্দ ব্যবহার করি। জ্ঞানটা মনে থাকে অজ্ঞানটা থাকে না। আপনি ভাবতে থাকুন। মনে পড়ে যাবে। আজ আসি।
[২৭]
যেদিন অর্ঘ্যকে হাসপাতাল থেকে আনা হয়েছিল, বাড়ি ভর্তি লোক। সুচরিতার মা-বাবা, দাদা-বৌদি, মন্দিরা, ওর বর রতন, জয়া, কৃষ্ণেন্দুর দিদি-জামাইবাবু, ছোট ভাইয়ের বৌ, রতনলাল, রতনলালের মা। হয়ত আরও অনেকে ছিল, কৃষ্ণেন্দুর মনে পড়ে না। দিদি এসছিল কৃষ্ণনগর থেকে, কী একটা অসুবিধা ছিল তাই তাড়াতাড়ি ফিরে গেছিল। সবাই সমবেদনা জানিয়েছিল, দু’জনকে ভালবেসেছিল। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটার ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। সবার একটা কমন প্রশ্ন ছিল, ‘কেন এমন হল?’
সুচরিতার বাবা মনে করতে পারেননি তাদের বংশে কখনও কোনও প্রতিবন্ধীর জন্ম হয়েছে কিনা। তিনি জানেন না, এমনকি শুনেছেন বলেও মনে পড়ে না। ওর মা তাঁর বাপের বাড়ির কথা কিছুই বলতে পারেন না।বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ওর দাদা বাবা-মায়ের একান্ত অনুগত হযে যায়। কৃষ্ণেন্দুর দিদির বয়স হয়েছে, স্মরণশক্তি বরাবরই কম, তিনিও কিছু বলতে পারেননি। কৃষ্ণেন্দু নিজেও জানে না তার কোনও কুলে অসুবিধা নিয়ে কেউ জন্মেছিল কিনা।
কৃষ্ণেন্দু আলোচনার বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারছিল না। যদি কেউ জন্মে নাও থাকে, তাহলেই বা কী? পৃথিবীতে সব জিনিসই প্রথম হয়। অথবা এটা সেই সব আলোচনার সময় বা স্থান নয় ! কৃষ্ণেন্দু কোনও কথা বলেনি। চুপচাপ শুনেছে। অনেকেই বলেছে , ভবিষ্যৎ নিয়ে পরে ভাবা যাবে, আগে ও সুস্থ থাকুক তারপর তো!
সুচরিতা একপাশে বসেছিল। তখন রানুর মা বাড়ির কাজ করত। সে আর রতনলালের মা সবাইকে চা-জল দিয়েছিল। ঘরে নবজাতক এলে উৎসব হয়, সবাই আনন্দ করে। সেদিন ওদের বাড়িতে একটা দয়ার সভা হয়েছিল। সবাই যেন এসেছিল, দয়া দেখাতে। কৃষ্ণেন্দু মনে করতে পারে না, কেউ অন্য একজনকে বলেছিল, ‘বাড়িতে আনল কেন? কোথাও দিয়ে আসতে পারত!’
আলোচনার মধ্যে কৃষ্ণেন্দু বারবার সুচরিতার হাতটা চেপে ধরছিল। যাতে ও কোনও কথা না বলে। একে সদ্য একটা শারীরিক ধকল গেছে। তারপর মানসিক ধকল চলছে। দুইয়ের কারণে সুচরিতা পারছিল না। মাঝেমাঝেই নেতিয়ে পড়ছিল।
সবাই চলে গেলে রতনলালের মা এসে বলেছিল, স্যার খানা পাকাই?
সুচরিতা চুপচাপ বসে কাঁদছিল। রতনলালের মা’কে কৃষ্ণেন্দু চাল-ডাল দিয়ে বলেছিল, খিচুড়ি বানাও, আর কিছু লাগবে না। রতনলালের মা’ও কাঁদছিল। চোখ মুছতে মুছতে রান্না করছিল আর বলছিল, কিষেণজী তুমনে এ ক্যায় কিয়া? কেউ কি জানে ভগবান কেন এমন করেছেন? তিনি যে রূপকল্পনা করেছেন, সেটা স্বাভাবিক নয়। তাই সবার এত চিন্তা, এত আগ্রহ, এত চোখের জল।
[২৮]
দিন পনেরো হল সুচরিতা অর্ঘ্যের সঙ্গে এক ঘরে থাকছে। কেন জানি না হঠাৎ আব্দার করল, আমি এখন থেকে অর্ঘ্যর ঘরে থাকব। কৃষ্ণেন্দু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল ওর দিকে। সুচরিতা জানে কৃষ্ণেন্দু কোনও প্রশ্ন করবে না। ও যা চাইবে তাই করে দেবে। তপন সুচরিতার ইচ্ছা অনুযায়ী সব ব্যবস্থা করে দিল। কৃষ্ণেন্দুকে এই নিয়ে কিছু বলে হয়নি, ভাবতেও হয়নি।
ঘরের দু’পাশে দু’জন মুখোমুখি শুয়ে থাকে। সারাদিন নানা কথা হয়। অর্ঘ্য সব সময় টিভি দেখতে পারে না বলে বিরক্ত হয়, মা পাশেই আছে তাই তপনকে বিরক্ত করে না। এ ঘরে ওর জিনিসপত্র আসায় অর্ঘ্য জিজ্ঞাসা করেছিল, তুমি এ ঘরে থাকবে?
ভাবছি এখন থেকে তোর পাশে থাকব।
কেন? এ ঘরে থাকবে কেন? আর ঘর নেই?
তোর অসুবিধে হবে?
প্রাইভেসি নষ্ট হবে তো!
আমি তো তোর কথা ভেবেই এলাম।
এতদিন তো আসোনি।
এতদিন তো কেউ বলেনি, ‘আমার মা চুরি হয়ে গেছে।’ তাই আসিনি, এবার এলাম।
তাই সারাক্ষণ সামনে থাকবে?
তুই পাহারা দিবি।
তোমার তপন তো আছে।
ও বোধহয় পারবে না। এবার এমন একজন আসবে চুরি করতে, কেউ ঠেকাতে পারবে না।
তপন?
তপন কেন, পৃথিবীর কোনও মানুষই তাকে হারাতে পারেনি। সে তার ইচ্ছেমতো মানুষকে চুরি করে।
তুমি কার কথা বলছ?
কর্কট-মহারাজ।
অর্ঘ্য কী বোঝে সুচরিতা অনুমান করতে পারে না। অর্ঘ্য চুপ করে যায়।
সুচরিতা বুঝতে পারে ছেলের ঘরে ও মৌরসীপাট্টা গাড়ায় ছেলের পছন্দ হয়নি। ইচ্ছেমতো টিভি দেখা যাচ্ছে না। সারাদিন দু’জনে মুখোমুখি শুয়ে থাকে। সুচরিতা একদিন বলে, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না।
জানি।
তোকে কে বলল?
তুমিই তো বললে। কর্কট-মহারাজ তোমাকে নিয়ে যাবে। একটু থেমে বলল, আচ্ছা তোমার কোন স্টেজ?
ফার্স্ট ।
তা হলে ভয় পাচ্ছ কেন? গতকাল দাদাগিরিতে একজন সারভাইভার এসেছিল। তুমি খেয়াল করোনি?
ভয় আমি পাচ্ছি না, ভয় তোদের!
ভয়ের কিছু নেই। তুমি মরে গেলে– প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হবে। তারপর বাবা মরে যাবে। তপনের সুবর্ণসুযোগ আসবে আমাকে মারার। তারপর আমাদের সব কিছু তপনের হয়ে যাবে।
খারাপ কথা ভাবছিস কেন?
ভাবনা যে পথে যায় তাই ভাবছি।
এগুলো এই সিরিয়াল আর সিনেমা দেখে তোর মাথায় ঢুকেছে।
হতে পারে।
ও তো তোর ছোটভাই, ও তোকে মারবে কেন?
সম্পদের জন্য কেউ বাবা-ভাই দেখে না।
তোর ছোটভাই পাবে না, তো অন্যলোক পাবে?
আমার হাত-পা থাকলে ও পেত?
কী হলে কী হোত এসব ভাবতে নেই। বাস্তব চিত্র ভাবতে হয়।
এখানে সবটাই বাস্তব এবং অবাস্তব।
মানে?
আমাদের তিনজনকে যে মারতে পারবে, সেই সব পাবে।
কী যা তা বকছিস?
আমি তো তোমার অপদার্থ সন্তান। তোমার ঈশ্বর তো আমাকে কিছু প্রমাণ করার সুযোগ দেননি। তাই আমার সব কিছু যা-তা।
[২৯]
আত্মজিজ্ঞাসার মানুষটাকে কৃষ্ণেন্দু জিজ্ঞাসা করল, আপনি জমি পরিষ্কার করলেন, বড় বড় দুটো গাছ কাটলেন, গর্ত খুঁড়ে তিনদিন জল ভরে রেখে দিলেন। মাটি তো উপযুক্ত ছিল, তবু বাড়ি করলেন না কেন?
আগে বলুন, কেন বাড়ি করব?
থাকবেন বলে!
কে কে থাকবে?
আপনি!
ঘর বানাবার মতো পরিস্থিতি নেই।
মানে?
আপনারা যা করে রেখেছেন।
কী করে রেখেছি?
বুঝতে পারছেন না? শত ব্যাধিতে ধরিত্রী কাতরাচ্ছে।
দেখুন সবাই অগ্রগতি চাইছে। অগ্রগতি তো অরণ্যে হয় না।
আপনি জানেন বিজ্ঞানীরা সমীক্ষা করে দেখেছেন ২০৮০-র মধ্যে সব গ্লেসিয়ার গলে যাবে। সমস্ত নদী-নালা জলে ভরে যাবে। আরও একটা ভয়ংকর খবর আছে। সমুদ্রের জল শুধু গরম হচ্ছে না, অ্যাসিডিক হয়ে যাচ্ছে। মানুষ ছাড়া সমস্ত প্রাণ কুমেরু অথবা সুমেরুর দিকে যাত্রা শুরু করেছে। রাত ও দিনের পার্থক্য কমছে। গাছপালা ও মানুষ শুধুমাত্র অ্যান্টিবায়োটিকের মারাত্মক রাসায়ানিকে বেঁচে আছে। তারপরও আপনি…
কৃষ্ণেন্দু উঠে দাঁড়ায়, আপনি যাদের কথা বলছেন, তারা বস্তুতান্ত্রিক। তারা সংখ্যা ছাড়া কিছু বোঝে না। তারা ভারতবর্ষের অধ্যাত্মবাদ বোঝে না, মুনি-ঋষিদের কথা জানে না। তাই এসব বলে বাজার তৈরি করার চেষ্টা করছে। ওরা বাজার ছাড়া কিছু চেনে?
আপনার কথাটা ঠিক, ওরা বস্তুবাদী, ওরা বাজার ছাড়া কিছু চেনে না। আপনাকে ভারতবর্ষের একটা কাহিনি বলি। আপনি স্বীকার করেন তো, গঙ্গা আমাদের প্রাণ? আপনি কি কখনও প্রত্যক্ষ করেছেন কর্কট-মহারাজ তাঁর ময়ূরপঙ্খী নাওতে প্রতিদিন অন্তত একবার উপর থেকে নিচে নেমে আসেন!
এ সব আপনি কী বলছেন? প্রমাণ আছে?
উত্তর ভারতে গত পঞ্চাশ বছরে কত লোক আক্রান্ত হয়েছে? সারা ভারতবর্ষে আক্রান্তদের ষাট শতাংশ, তাদের নোংরা জামা-কাপড় প্রতিদিন গঙ্গায় ধোয়া হচ্ছে। এমনকি মৃত মানুষটাকে সৎকারের পর তার ব্যবহৃত সব কিছু মা গঙ্গাকে উপহার দেওয়া হচ্ছে। সব ভেসে আসছে। তুমি আমি গঙ্গাজলের সঙ্গে ঘরে কী নিয়ে আসিনি? এটাও কি বস্তুবাদের কথা?
কৃষ্ণেন্দু কথা বলতে পারে না।
মানুষটা বলতে থাকে, মুনি-ঋষিরা পুকুর বা নদীতে নামার আগে জলকে প্রণাম করত। কখনও করেছ না কাউকে করতে দেখো? তোমাকে বলেছিলাম, বীজ না থাকলে গাছ হয় না। গাছ না থাকলে ফল হয় না।
ভাবুন পণ্ডিত, ভাল করে ভাবুন।
কৃষ্ণেন্দু ধপ্ করে মেঝেতে বসে পড়ে। মানুষটা তো মিথ্যা বলেনি! গঙ্গা অ্যাকশান প্লানের নামে হাজার হাজর কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষকে বোঝানো যাচ্ছে না, গঙ্গা আমাদের প্রাণ, গঙ্গা শুদ্ধ না থাকলে আমরা বাঁচব না।
ও দৌড়ে ঠাকুরঘরে যায়, গঙ্গাজলের শিশিটা ছুড়ে ফেলে দেয় বাগানে। মুখবন্ধ কাচের শিশিটা শব্দ করে ফাটে। তারপরই মাথায় হাত দিয়ে বসে, বিষ তো নিজের কাছেই রেখে দিলাম, দূর করতে তো পারলাম না।
[৩০]
বড়দির কথা শুনে সুচরিতা প্রথমে কিছু বলেনি। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়েছিল। অনেক কথার পর বলেছিল, আজ ফার্স্ট স্টেজ, কাল থেকে সেকেন্ড, তারপর ফাইনাল। তাই তো ধীরে ধীরে বাঁচার ইচ্ছাকে দমন করা। আমি আর বাঁচতে চাই না বড়দি।
বড়দি অনেক অনুরোধ করার পরও ও রাজি হয়নি, তবে বড়দিও হাল ছাড়েননি। বড়দি যাওয়ার সময়ে কৃষ্ণেন্দুকে বলেছেন, সামনের শনিবার দুপুর দুটোর সময়ে আমাদের অনুষ্ঠানটা হবে, আপনি ওকে নিয়ে যাবেন।
কৃষ্ণেন্দু জানে না নিয়ে যেতে পারবে কিনা, তবে কিছু না ভেবেই বলেছিল, আচ্ছা।
কৃষ্ণেন্দু যখন অস্ফুট স্বরে ‘আচ্ছা’ উচ্চারণ করল তখন সামনে বড়দি আর পিছনে সুচরিতা ছিল। সুচরিতা ওর আচ্ছা শুনে কোনও কথা বলেনি। একজন প্রধান শিক্ষিকার অনুরোধ রক্ষা করা উচিত মনে হয়েছিল, তাই বলেছিল আচ্ছা।
বড়দি দরজা দিয়ে বাইরে যাওয়ার সময় ওর কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, ‘যাস কিন্তু’। ও ঘাড় নাড়ল। তারপর দরজা বন্ধ করে বারান্দা দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে এল।
কৃষ্ণেন্দু দেখছিল। ও স্বাভাবিক ছন্দে হাঁটছে, কথা বলছে। শুধুমাত্র শরীরের ভাষায় একটা পরাজিত মানুষের ছাপ পড়েছে। সোজা এসে কৃষ্ণেন্দুর মুখোমুখি দাঁড়াল, ‘যাব’। শুধু শব্দটা উচ্চারণ করেই নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
অনেকদিন পরে কৃষ্ণেন্দুর চোখের দু’কোনায় জল এসেছিল। ও নড়া-চড়া করতে পারেনি। মাথাটা পুরো খালি হয়ে গেছিল। কতক্ষণ ওইভাবে দাঁড়িয়েছিল বলতে পারবে না। তবে সময়টা যে অনেকক্ষণ বুঝতে পারছিল চারদিকে দেখে। সুচরিতা না ডাকলে হয়ত সম্বিত ফিরতে আরও সময় লাগত।
তুমি একটু শুনবে?
আসছি।
তুমি রাজি হলে কেন?
তুমিও তো রাজি হয়েছ দেখলাম।
তোমার সম্মান রক্ষার্থে রাজি হলাম।
মানে?
তুমি তো বড়দির কথায় রাজি হলে।
আমি তো শুধু ‘আচ্ছা’ বলেছি।
তার মানেই তো সম্মতি দেওয়া।
তুমি কি যাবে না?
যাব।
কেন যাবে?
ছাত্রীদের কিছু কথা বলব।
তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ।
[৩১]
গঙ্গাজলের বোতলটা বাগানের মধ্যে ভেঙে ফেলে দেওয়ায় একটা অস্বস্তি কাজ করছে ভিতরে ভিতরে। সে বারবার জায়গাটায় যাচ্ছে, ভাঙা কাচের টুকরোগুলো তুলছে না, তা হলে চিহ্ন নষ্ট হয়ে যাবে। প্রকৃত জায়গাটা খুঁজে পাবে না। মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করছে, মাটির রং কি পাল্টেছে? মাটি কি আরও কালো হয়ে হয়ে গেছে? মাটি কি নরম হয়ে গেল? যে গাছগুলো আছে, সেগুলো কি আগের মতোই আছে? না একটু কৃষ্ণ হয়েছে বা নেতিয়ে পড়েছে। ও নিজের ঘরের যে জানালা দিয়ে বাগান দেখা যায়, সেই জানালাটার পর্দা সরিয়ে দিয়েছে, যতক্ষণ পারবে ঘর থেকে নজর করবে। কাছে যেতে কী রকম একটা অস্বস্তি হচ্ছে।
মনে পড়ছিল বাড়ির পশ্চিমদিকে ফ্ল্যাটবাড়িটা হওয়ার সময় পঞ্চমুখী জবা গাছটায় সিমেন্টের ছিটে এসে লেগেছিল, তার পাশেই কাশীর পেয়ারা গাছটা, সেটাও বাদ যায়নি। গাছগুলোর অবস্থা দেখে সুচরিতা খুব চেঁচামেচি করেছিল। প্রমোটরেরা কান দেয়নি। একদিন দু’জনে মিলে পাইপ দিয়ে গাছদুটোকে স্নান করানো হল। সম্পূর্ণ পরিষ্কার করা গেল না। ধীরে ধীরে গাছদুটো মরে গেল। এতদিন ওদের দিকে আঙুল তুলে বৃক্ষনিধনকারী বলত, এখন আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে চিনতে কষ্ট হয়।
[৩২]
স্কুলে ঢুকে স্টাফরুমে না গিয়ে সোজা বড়দির ঘরে গেল। চুপচাপ বসল। বড়দি দেখেই বললেন, এসেছিস, কত আনন্দ হচ্ছে। বস, আরাম করে বস। চা দিতে বলব?
ও মাথা নেড়ে না জানায়।
স্কুল আজ টিফিনের পর ছুটি হয়ে যাবে। তারপরই অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠান?
অনুষ্ঠানই তো! প্রায় পঁচিশ বছর ছাত্রীদের পড়ানোর পর তুই স্বেচ্ছাবসর নিচ্ছিস, সেটা অনুষ্ঠান করে হবে না?
সুচরিতা কোনও উত্তর করল না। রুমালটা দিয়ে মুখটা মুছল। মনে হল, কিছু একটা অস্বস্তি হচ্ছে।
একটু পরেই টিফিনের ঘণ্টা বাজল। সহকর্মীরা সংবাদটা পেয়ে একে একে আসতে শুরু করেছে। ওরা সুচরিতাকে বড়দির ঘর থেকে স্টাফরুমে নিয়ে গেছে। তাই দেখে কৃষ্ণেন্দু বলল, বড়দি আমি বাইরে গিয়ে বসি!
না স্যার, বাইরে কেন? আপনি এখানেই বসুন।
এই ভদ্রমহিলা দীর্ঘদিন ধরে হেডমিসট্রেস, প্রায় পঁচিশ বছর ধরে ওরা দেখছে। ওনার দেখার ভঙ্গিমা এবং প্রক্রিয়া অসাধারণ সুন্দর, উল্টোদিকে বসা মানুষের মুখ দেখে, কথা শুনে অনেক কিছু বলতে পারেন।বেশিরভাগ সময়ে মিলে যায়। অনেক ছাত্রী বা তাদের বাবা-মা মিথ্যা বলে কিছু করতে চায়, কিন্তু পারে না, কোথাও গিয়ে আটকে যায়।
কৃষ্ণেন্দু একদিন জিজ্ঞাসা করেছিল, কীভাবে পারেন?
উনি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, রক্তে আছে।
বুঝলাম না।
[৩৩]
আমার পিতৃকুলে আমি চতুর্থ প্রজন্ম, হেডমাস্টার। তাছাড়া আমার খুল্লপিতামহ বিখ্যাত গোয়েন্দা। একটু থেমে বলেছিলেন, আমার বাপের বাড়ি ঘোষাল, বুঝে নিন কার কথা বলছি।
পঞ্চানন ঘোষাল?
চোখ তো একদিনে তৈরি হয়নি, ধীরে ধীরে হয়েছে।
কোনও লক্ষণ দেখতে পান?
না, না, সেরকম কোনও লক্ষণ বা চিহ্ন দেখে সিদ্ধান্ত নিই না। টেবিলের ওপারে মানুষের যে অংশটা দেখতে পাই, তাতেই মনে হয় মানুষটা বা ছাত্রী মিথ্যা বলছে। দেখবেন, কেউ বিপরীতদিকে দাঁড়িয়ে সত্যি কথা বললে, মনের ভিতর একটা রিনি রিনি সুর বাজে, মিথ্যা বললে হোঁচট খায়। আমরা তো প্রাণে সপ্তসুরই বাজাতে চাই। তাই তো স্যার?
ঠিক বলেছেন।
কৃষ্ণেন্দুর মনে হয়েছিল,পর্যবেক্ষণের একটা ধাঁচা ওরা তৈরি করেছে, সেটা প্রকাশ করেন না।
বড়দি কিন্তু নিজের মনে কাজ করে চলেছেন আর মাঝে মাঝে মোবাইলে সময় দেখছেন। এর মধ্যেই দু’জনের জন্য চা এল। বড়দি বললেন, চা শেষ করেই আমরা যাব।
সুচরিতাকে কী রকম দেখলেন?
একটু ভাল। ও নিজেই আসতে চাইল?
হ্যাঁ, নিজেই এল। তবে সারাটা রাস্তা একটা কথাও বলেনি।
আপনি?
আমি কথা খুঁজে পাই না, কী বলব!
আপনি কথা বলুন, প্রচুর কথা বলুন। একদম চুপচাপ থাকবেন না। ও হয়তো পাল্টে যেতে পারে, অথবা সাহস পেতে পারে। মৃত্যু তো কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। কারণ ওর মনটা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে।অঠারো বছর ধরে ও দম বন্ধ করে আছে। বিষয়টা বুঝি, আমিও তো মা।
কৃষ্ণেন্দু চুপ করে শোনে। এসব কথার উত্তর নেই। সত্যি কথা বলতে কী, ও নিজেও অনেক কিছু জানে না। জানার প্রয়োজনও হয়নি। পৃথিবীর সব কিছু কি জানা সম্ভব? অনেকক্ষণ পর বলল, একটা অনুরোধ করব?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন স্যার।
যদি প্রয়োজন পড়ে আপনাদের ডাকব, একটু আসবেন।
এভাবে বলছেন কেন?
আসলে ভগবান তো আমাকে অন্যভাবে কথা বলার সুযোগ দেননি। অনুরোধ ছাড়া আমি কী বা করতে পারি?
স্যার, ছোটবোনকে যেভাবে বলেন, আমাকেও সেভাবে বলবেন, সঙ্কোচ করবেন না।
কৃষ্ণেন্দু কৃতজ্ঞতার সঙ্গে হাসল।
[৩৪]
অডিটোরিয়ামটা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। মঞ্চের পিছনে লেখা ‘শ্রীমতী সুচরিতা মিত্র বসুর সম্বর্ধনা’। নীল জমির ওপর সাদা দিয়ে লেখা। মঞ্চে বড় টেবিল, তাতে গোটা আটেক চেয়ার। কৃষ্ণেন্দুকে বড়দি মঞ্চে বসতে বলেছিলেন, ও নিজেই সামনের সারিতে বসেছিল। নানারকম অনুষ্ঠানের মধ্যে অনেকটা সময় কেটে গেল। বড়দি সুচরিতার নাম ঘোষণা করলেন। সুচরিতা পোডিয়ামে এসে দাঁড়াতেই ও সোজা হয়ে বসল। একটা অন্যরকম জিজ্ঞাসা মনের মধ্যে তৈরি হয়েছে, ছাত্রীদের ও কী বলতে চায়?
সুচরিতা চারদিক দেখল, তারপর খুব নরম গলায় বলল, ‘‘নমস্কার, এখানে সবাই আমার আপনজন ও প্রিয়জন। তোমাদের সবার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে, যা তোমরা চেষ্টা করলেই বা ধরিয়ে দিলেই পারবে। আমি যে বাক্যটা দিয়ে শুরু করেছিলাম, তার মধ্যে দুটো শব্দ আছে, সেই শব্দ দুটোর বিভেদ ভেঙে ফেলতে হবে। সেই শব্দদুটো কী? আপনজন ও প্রিয়জন। সব আপনজনকেই প্রিয়জন করতে হবে আর সব প্রিয়জনকে আপনজন। এর একটা সহজ পদ্ধতি আছে। পদ্ধতিটা আমরা সবাই জানি কিন্তু ব্যবহার করি না। আমরা হলাম মায়ের জাত, ভালবাসা আমাদের শরীর থেকে উৎসারিত হয়। ইংরেজিতে বলে এমিট করে। এর কারণ ধরিত্রী মা থেকে আমাদের জন্ম, প্রকৃতি মা আমাদের লালন করেন। আমরা যদি নজর করি ধরিত্রী মা’র বুকে কত ভারী ভারী বিল্ডিং, সেতু বা ইমারত গড়ে উঠছে, ওনার বুকে গর্ত করে আমরা আবর্জনা ফেলছি। কষ্ট হলেও উনি কাউকে জানতে দিচ্ছেন না, হাসিমুখে গ্রহণ করছেন। প্রকৃতি মা বারবার বারণ করা সত্বেও আমরা ভুল করছি। তিনিও সন্তানদের কিছু বলছেন না। ওনারা বলছেন না তার বড় কারণ, সবাই তাঁদের সন্তান। ঋষিরা কিন্তু বলে গেছেন, ‘ওঁ সহনাববতু’। সবাইকে নিয়ে থাকতে বলেছেন। ঋষিরা এই কাজটা করতেন বলে তারা ভাল ছিলেন। আমরা ভাল নেই, কারণ এখন বর্ষার জল ভরা মেঘ বৃষ্টি দেয় না। উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ণ হয় বা হয় না আমরা বুঝতে পারি না। খাদ্যদ্রব্য বিস্বাদ হয়ে গেছে। এর পিছনে একটাই কারণ বলে আমার মনে হয়, আমাদের শেখানো হয়নি অপরকে ভালবাসার কথা। আমি উপস্থিত সবার কাছে অনুরোধ করছি, নতুন করে ভালবাসা শুরু করুন।”
এতক্ষণ বলে একটু থামল, আঁচল দিয়ে মুখটা মুছল। তারপর বলল, ‘‘এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। আমার একমাত্র পুত্র, তার এখন আঠারো বছর বয়স, জন্ম থেকে হাত-পা নেই, হাঁটতে-চলতে পারে না। সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকে। জানলা দিয়ে আকাশ দেখে, টিভি দেখে। বাংলা-ইংরেজি-সংস্কৃত পড়তে পারে। পরিচয়টা দিলাম কারণ একজন প্রতিবন্ধীর অনুভবের কথাটা বলব। একদিন স্কুলে সবুজ শাড়ির সঙ্গে সবুজ ব্লাউজ পরে এসেছিলাম। প্রতিদিন স্কুলে আসার আগে এবং ফিরে ওর সঙ্গে দেখা করি। সেদিন ও আমাকে বলেছিল, ‘মা তুমি সবুজ শাড়ির সঙ্গে লাল ব্লাউজ কেন পরোনি, কেন হলুদ বা বেগুনি পরোনি?’ আমি বলেছিলাম, ‘সবুজের সঙ্গে সবুজই পরতে হয়, একে বলে ম্যাচিং করা।’ তার উত্তরে ও বলেছিল, ‘এই ম্যাচিংটা ভুল। প্রকৃতি সব সবুজ গাছে সব রঙের ফুল ফুটিয়েছেন। দেখে তো অমাদের আনন্দ হয়। কখনও তো বলি না মিসম্যাচ। মা তুমি একবার ভেবো।’ তোমাদের সবার কাছে অনুরোধ তোমরাও একবার ভেবো।”
একটু দম নিল, “তোমাদের সঙ্গে হয়ত আর দেখা হবে না। তোমাদের কাছে অনুরোধ, প্রকৃতি থেকে শেখো, ভুলগুলো শুধরে নাও। ভাল রেখো, ভাল থেকো। সবাইকে নমস্কার।” বলে নিজের চেয়ারের দিকে ফিরে যাচ্ছিল। আবার পোডিয়ামে ফিরে এল। মাইকটা হাতে নিয়ে বলল, ‘‘সবার কাছে ক্ষমা চাইছি, তার কারণ আমি এখানে ভালবাসা নিতে এসেছি। দ্বিতীয়ত এত জিনিস গুছিয়ে রাখার বা ব্যবহার করার ক্ষমতা আমার নেই। তা সত্বেও যদি নিয়ে যাই তা হলে আমার বৃদ্ধ স্বামীকে কষ্ট দেওয়া হবে, সেটাও স্ববিরোধিতা। বড়দি ও আমার সহকর্মীদের কাছে অনুরোধ, এই সমস্ত উপহার আমার সন্তানদের দিয়ে দেবেন। আশা করি আমার শেষ অনুরোধটা আপনারা রক্ষা করবেন। নমস্কার।”
[৩৫]
রাতে আত্মজিজ্ঞাসার লোকটা এসে হাজির, কী হে পণ্ডিত, কেমন আছেন?
ভাল।
আপনার বউ কী রকম বলল?
আপনার শেখানো কথা বলল।
বাঙালি সব বোঝে। নিজে অসুবিধায় পড়লে প্রকাশ করে।
আপনি বাঙালি নন?
সেই জন্যই তো ব্যাপারটা ভাল বুঝি। আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না, উল্টে বললেন আমার শেখানো কথা বলেছে। ফেয়ারওয়েল ভাষণটা কীরকম হল?
ভাল।
ভাল মানে?
ভাল। সুন্দর। আপনার মতো।
পণ্ডিত হাওয়া দেবেন না। বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তকে আপনি বস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টি বা বাজার ধরার সঙ্গে তুলনা করবেন না।
আপনি কেন এসেছেন খুলে বলুন তো। আপনি কি পরাজিত লোকদের কাছেই যান?
পণ্ডিত আপনার কথায় বড় হেঁয়ালি থাকে।
বসুন।
বসে কী হবে? আপনিই তো কথা বলতে চাইছেন না।
কথা বলব বলেই তো বসতে বলছি।
বলুন, আপনার কী কথা আছে?
আপনি তো শাস্ত্রজ্ঞ, অনেক কিছুর সুলুক-সন্ধান জানেন। আজ বিকেল থেকে আমি ভাবছি বা বলতে পারেন ভাবনাটা এসেছে। গুরুদেবকে টেলিফোনে বলেছি, তিনি উত্তর দেননি। আপনি দয়া করে প্রার্থনা করবেন, যাতে ছেলেটা আমার আগে মারা যায়?
আপনি কবে মারা যাবেন, ঠিক হয়ে গেছে?
কথাটা বুঝলাম না!
প্রার্থনা করার সময় তো বলতে হবে যমরাজকে, যে কৃষ্ণেন্দুবাবু অমুক দিন মারা যাবেন তার আগে ওনার ছেলেটাকে মারতে হবে।
জানি না। তবে আমি চাই ও আমার আগে যাক।
আপনি পণ্ডিত সেই বর চাইছেন, নাতির ছেলের সঙ্গে সোনার থালায় ভাত খাব।
হঠাৎ একথা বলছেন কেন?
এতদিন জানতাম মানুষ প্রার্থনা করে, ধনের জন্য, যশের জন্য, পুত্রের জন্য, আর আপনি…
আমি চাই ওর মৃত্যু হোক।
সুচরিতা জানে?
না।
আপনি একাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?
আমি সিদ্ধান্ত নিইনি, প্রার্থনা করছি, আমার জীবদ্দশায় ওর মৃত্যু হোক।
আপনি বড় নিষ্ঠুর।
সময় ও পরিস্থিতি আমাকে যা বানায়, আমি তাই হই। আপনি পারবেন আমার জন্য প্রার্থনা করতে?
যদি ‘না’ বলি।
তা হলে চলে যান।
যদি বলি, ‘প্রার্থনা করব।’
আপনি এখন যান।
আত্মজিজ্ঞাসা চলে যেতে কৃষ্ণেন্দু ওদের ঘরে উকি মেরেছিল। আলো জ্বলছে, দু’জনেই জেগে আছে। পরস্পর অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কৃষ্ণেন্দু আর এগোয়নি, নিজের ঘরে চলে এসেছে।
[৩৬]
সুচরিতার ভাষণ শোনার পর ভিতরে একটা ভয় চেপে বসেছে। আমি মরে গেলে ওর কী হবে? সারারাত ঘুম হয়নি। একটা চিন্তাই মাথার মধ্যে ঘুরছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে বহুদিন বাদে সুচরিতা ব্রেকফাস্ট টেবিলে। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। চোখ কচলে নিয়ে দেখল, সুচরিতা। ও আগের মতোই হাসল কিছু বলল না। হাসিতে কোনও অসুস্থতার লক্ষণ ছিল না। সাবলীল। মনটা ভাল হয়ে গেল। কতদিন পর এরকম একটা সুন্দর সকাল কৃষ্ণেন্দু পেল। ও গিয়ে টেবিলে বসল, তপন এসে গেছে?
কাল ও বাড়ি যায়নি।
কেন, শরীর ঠিক আছে তো?
সব ঠিক আছে, এখন থেকে ও এখানেই থাকবে, প্রতি শনিবার বিকেলে বাড়ি যাবে রবিবার আসবে।
হঠাৎ?
হঠাৎ নয়, ওকে আমি প্রস্তাবটা দিয়েছিলাম ক’দিন আগে। ও সিদ্ধান্ত নিতে একটু সময় নিয়েছে।
কৃষ্ণেন্দুর আনন্দ হয় সুচরিতা পরিবারের জন্য সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তা সত্বেও একটু অস্বস্তি হচ্ছে, কাল রাতের কথাগুলো ওরা দু’জনে কি শুনেছে?
সুচরিতাই বলল, মনটা খুব হালকা লাগছে। আজ আমি রান্না করব। তুমি ভাল করে বাজার করো। দু’রকম মাছ আর একটু পাঁঠার মাংস এনো।
কৃষ্ণেন্দু পাঁচটা ব্যাগ নেয়। তারপর সুচরিতার সামনে এসে গোনে, এক-দুই-তিন-চার-পাঁচ।
এতগুলো ব্যাগ দিয়ে কী হবে? তুমি আনতে পারবে?
ব্যাগ কম নিয়ে বাজার করলে স্ট্যাটাসটা লো হয়ে যায়।
দু’জনেই একসঙ্গে হেসে ওঠে।
[৩৭]
গুরুদেব সন্ধ্যায় ভজনের ভিড়ে কৃষ্ণেন্দুকে দেখেই কাছে ডেকেছিলেন। ভজন শেষ হতেই বললেন, আমি সব খবর পেয়েছি। সন্তান হারালে কোনও মানুষ কি সুস্থ থাকতে পারে? আমার অবস্থাটা আশাকরি বুঝতে পারছ, মা জগদম্বাকে ডাকছি। অহর্নিশ ডাকছি, ‘সবাই ভাল থাকুক, সবাই সুস্থ থাকুক।’
কৃষ্ণেন্দু খুব বিনীত স্বরে বলল, ‘আমার একটা প্রার্থনা আছে!’
প্রকাশ করতে দ্বিধা কোরো না।
আপনি জগদম্বার কাছে প্রার্থনা করুন, যাতে আমার আগে অর্ঘ্য মারা যায়!
তুমি তো প্রচুর লেখাপড়া করেছ, তুমি বিলক্ষণ জানো, মা জগদম্বা কারও প্রাণ নেন না। তিনি তো মা। তিনি প্রাণের জন্ম দেন। যিনি জন্মদাত্রী তিনি কখনও…
আমি যদি আগে মরে যাই, ওর কী হবে?
তুমি অনেককেই প্রার্থনা করতে অনুরোধ করেছ। কেউই রাজি হয়নি। কারণ তোমার আত্মজনেরা চায়, তুমি এবং সবাই সুখে থাকো, আনন্দে থাকো। একটু থেমে বলেছিলেন, প্রসাদ খেয়ে যেয়ো আর অর্ঘ্যর জন্য নিয়ে যেয়ো।
কৃষ্ণেন্দু মাথা নিচু করে বসেছিল। গুরুদেব অন্যন্য ভক্তদের সঙ্গে কথা বলছেন। ও উঠছে না। গুরুদেবের খেয়াল হতেই বললেন, তুমি প্রসাদ নিলে না?
খুব নিচু স্বরে বলল, একটা কথা ছিল।
বলো।
গতকাল একটা ঘটনা ঘটেছে।
কী ঘটনা?
রাত্রিবেলা কাজের ছেলেটা চলে যাওয়ার পর অর্ঘ্যর ঘরে গিয়ে দেখি ও চোখ বুজে শুয়ে আছে। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, চোখ বুজে শুয়ে আছ কেন?
ভাল লাগছে না।
কেন ভাল লাগছে না?
মা চুরি হয়ে গেলে কারও ভাল লাগে?
তপন মা বলে ডাকত, তাই তুমি ভয় পেয়ে তপনকে তাড়াতে চেয়েছিলে। এখন কাকে তাড়াবে?
তুমি এ ঘরে কেন এসেছ?
তোমাকে একটা প্রস্তাব দিতে এসেছি।
কীসের প্রস্তাব?
এসো আমরা দু’জনে মিলে আত্মহত্যা করি।
কেন? আমি মরব কেন?
আমি মরে গেলে তোমাকে কে দেখবে?
কেন তপন!
তপনকে ছেড়ে দিয়েছি।
আমার সঙ্গে কথা না বলে তুমি তপনকে ছেড়ে দিলে?
প্রসঙ্গ পাল্টে বলেছিলাম, এসো আমরা একসঙ্গে বিষ পান করি।
না।
কেন?
তুমি যমরাজকে ডাকো, আমাকে নিয়ে যাক। জন্ম থেকেই তো আমি মৃত। তাই মরতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আত্মহত্যা করব না।
আমি বললেই তো যমরাজ শুনবেন না।
প্রার্থনা করো। বাবরের মতো প্রার্থনা করো। না ভুল হল, তুমি যযাতির মতো প্রার্থনা করো। আমার আয়ু তোমার আয়ুর সঙ্গে যুক্ত হবে। যমরাজ শুনবেন। ঠিক শুনবেন। এই প্রস্তাবে তো আমিও রাজি। তারপর একসময়ে ওনার দূতরা এসে আমাকে নিয়ে যাবে। তুমি মুক্ত হয়ে যাবে।
কৃষ্ণেন্দু কথা বলতে পারে না কেঁদে ফেলে।
গুরুদেব পিঠে হাত রেখে বলেন, তারপর?
ধীরে ধীরে নিজের ঘরে আসি।
[৩৮]
এখন আর তপন থাকে না। সকালে আসে রাতে বাড়ি ফিরে যায়। মাঝে মাঝে ওর বিধবা মা’কে নিয়ে আসে। তপন যেগুলো পারে না সেসব উনি করে দেন। ভালবেসেই করেন। এর জন্য অতিরিক্ত কিছু নিতে চান না। কৃষ্ণেন্দুর পড়াশুনার সময়টা অনেক বেড়ে গেছে। সংসারটা ওরা মা আর ছেলে মিলে চালিয়ে দিচ্ছে। বলতে গেলে সারাদিনই পড়াশুনা করার সময় পাওয়া যাচ্ছে। সকালে বই-পত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে দুর্জয় পত্রিকাটা হাতে আসে। এই সংখ্যাতেই সুচরিতা চতুর্থ গল্পটা লিখেছিল ‘বাস্তু দেবতা’; গল্পটা শুনেই কৃষ্ণেন্দু জিজ্ঞাসা করেছিল, প্লটটা মাথায় এল কী করে? ও হেসে বলেছিল, ‘স্বপ্নে পেয়েছি।’ গল্পটা নতুন করে পড়ার ইচ্ছে হল। অর্ঘ্যকে পড়ে শোনাবে বলে খুলে বসতেই, আত্মজিজ্ঞাসা এসে হাজির, কেমন আছেন?
দিব্য আছি।
বহুদিন পরে শব্দটা শুনলাম, দিব্য আছি। কারণ?
আজ বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে সুচরিতার লেখা একটা গল্প পেলাম, গল্পটা পড়ে খুব ভাল লেগেছিল, ভেবেছিলাম হারিয়ে গেছে। আজ হাতে পেয়ে মনটা ভাল হয়ে গেছে। ছেলেকে শোনাব বলে নিয়ে এসেছি।
আমি শুনতে পারি।
আপনাকে শোনাতে পারলে আমার ভাল লাগবে। তাহলে শুরু করি? গল্পের নাম, ‘বাস্তু দেবতা।’
(ক)
লোকটা আমাদের পাড়াতেই থাকত। কোনওদিন কথা হয়নি। আলাপ হওয়ার সুযোগ হয়নি। একদিন লোকটা নিজেই এল। ঘরে ঢুকে বলল, চিনতে পারছেন?
চিনতে পারছি মানে, আপনি তো আমাদের পাড়াতেই থাকেন। প্রায়ই দেখি। এর বেশি কিছু…
দরকার পড়বে না। আমরা প্রতিবেশী এটাই যথেষ্ট।
আপনার নামটা!
ধরুন নাম নেই, একটা লোক হিসেবেই ভাবুন। কেন এভাবে ভাবব?
নাম জানতে পারলে পদবি জানবেন, তারপর পেশা, তারপর আমার ওরিজিন। তারপর আমার সম্বন্ধে একটা ধারণা এবং সেই মতো ব্যবহার। ধরে নিন আমার কোনও অতীত নেই। ভবিষ্যৎ বলতে মৃত্যু।
আমার উল্টোদিকে লোকটা বসে আছে। কেন এসেছে এখনও বলেনি। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। লোকটা বোধহয় বুঝতে পেরেছিল। দেখে মনে হয়, বেশ চালাক-চতুর। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার বাড়িটা ঠিক বুঝলাম না।
তারক করের পাশের গোলাপি বাড়িটা।
আপনার আসার কারণটা যদি…
কাজের কথা শুরু হওয়াই ভাল। আপনি বলতে পারেন, মানুষ কখন গলে যায়?
কথায় বলে, আহ্লাদে গলে যায়।
তাই বুঝি? একটু সময় নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা আহ্লাদ কখন হয়?
ঠিক বলতে পারব না।
লোকটা আর কোনও কথা না বলে দ্রুত উঠে গেল।
(খ)
দিনকয়েক বাদে লোকটা আবার এল। দরজা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়েছে। হয়ত আবার একটা প্রশ্ন নিয়ে সকালটা নষ্ট করবে। একটু আগে দুধওয়ালা গেছে, দরজাটা দেওয়া হয়নি। ও ঢুকে সোজা আমার সামনে। বাধ্য হয়ে বললাম, বসুন।
একটা প্রশ্ন আছে।
বলুন।
আমি ভগবানের একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই।
কেন?
জিজ্ঞাসা করব, মানুষ কখন গলে যায়?
সেদিন বললাম তো, আহ্লাদে গলে যায়।
আপনি জানেন না, মানুষ আরও অনেক কিছুতে গলে যায়।
যেমন?
টাকায় গলে, তাপে গলে, ভালবাসায় গলে। এগুলোর মধ্যে কোনটা ঠিক, কেউ বলতে পারে না। কে বলতে পারে বলুন তো?
আমি ঠিক জানি না।
আপনি কি জানেন?
কিছুই জানি না।
রোজ বাজারে যান?
যেতে তো হয়ই।
তা হলে ভগবানকে নিশ্চয়ই চেনেন?
দেখিনি কখনও।
আপনার কাছে এসে কোনও কাজ হয় না। কিছু জানেন না, কিছু দেখেননি। কীভাবে বেঁচে আছেন?
আমি মিথ্যা বলতে পারি না।
আপনার উচ্চাশা নেই, স্বপ্ন নেই, সাহস নেই। তাই মিথ্যা বলতে পারেন না। আচ্ছা, আজ চলি।
(গ)
আমি রোজ বাবাকে দেখি। মা’কে দেখি। এঁরা সবাই মৃত। তিন হাজার স্কোয়ার ফিটের একটা দোতলা বাড়িতে আমি একা থাকি। আমাদের বাড়ির আসবাব, থালা-বাসন এমনকি দেওয়ালের পেরেক, হুক সবাই আমার সঙ্গে কথা বলে। এগুলো স্বপ্ন নয়। যখন আমার কোনও কাজ থাকে না, ওরা কথা বলে। কে কতদিন আছে, কে কত ভার বয়েছে বা আমাদের সবকিছু কত যত্ন করে রেখেছে। এদের সঙ্গে বাবা আর মা আসে। আমরা তিনজনে অনেক কথা বলি। আসবাব, থালা-বাসন এমনকি দরজার পিছনের চুম্বকটা নিয়েও কথা হয়। মা বরাবরই কম কথা বলে। তাও আমাদের আলোচনায় যোগ দেয়। আমি, বাবা, মা কখনও বাড়ির বাইরে যাইনি। কেন যাইনি জানি না। আমাদের সামনের ঘরেই কথা শুরু এবং শেষ হয়।
ষাট বছরে এইটুকু মাত্র?
না, আরেকটু আছে।
বলুন, বলুন। বলে লোকটা সোফার ওপর পা তুলে বসল।
বললাম, খুব সাধারণ ব্যাপার। সবার জীবনেই এটা হয়। আপনি বলেছিলেন না, ভবিষ্যৎ মৃত্যু।
ও ব্যাপারটা মৃত্যু নিয়ে! খুলে বলুন তো মশাই।
জানেন, এটা প্রায়ই হয়।একদিন রাতে আমি মরে গেছি। আমার তখন খুব ভয় করছিল। নিজের লোক কেউ কাছে নেই। অনেকের কথা মনে হচ্ছিল। বন্ধু-বান্ধব, নিজের ভাই-বোন, ভাইপো-ভাইঝি, ভাগ্নে-ভাগ্নি।কিন্তু কাউকে জানাতে পারব না আমি মরে যাচ্ছি, কারণ শিয়রে শমন, মরতে তো হবেই। জানেন, যমরাজ জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “কোথায় মরবেন? ঘরে না বাইরে?” তখনও জানি না উনি কীভাবে মারবেন। তাই বলেছিলাম, ‘ঘরেই মরব।’ চারিদিক থেকে কেউ দেখতে পারবে না। আপনি তো জানেন, এখনকার প্রতিবেশী কী রকম হয়? উনি আমাকে ঘরের মধ্যেই মারলেন। আমি মরে গেলাম। তারপর যা হয়। আমি তো একা, মরে ঘরের মধ্যে পড়ে আছি। মোবাইল ফোন, ল্যান্ডলাইন ফোন বাজছে। আমি উঠে কাউকে বলতে পারছি না, আমি মরে গেছি। কেউ ভাবছে আমি অসুস্থ, কেউ ভাবছে রামকৃষ্ণ মিশনে গেছি, কেউ ভাবছে মন দিয়ে পড়াশুনা করছি। প্রথম কয়েকদিন ফোনগুলো অনেকবার বেজেছে। এতদিন পর নিজেকে নিয়ে একটু আনন্দ হয়নি একথা বলতে পারি না। সবাই যে আমাকে নিয়ে এতটা ভাবে আমি জানতাম না। তিনদিন পরে ঘটনাটা পাল্টে গেল। ঘরের মধ্যে প্রচুর আওয়াজ। ফোনের আওয়াজ তো মাঝে মাঝে থামে, এ আওয়াজ থামে না। কেউ কেউ কথা বলছে, ভাষা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে অনুভব করছিলাম, ফিনিট রেড হিট, ব্লাক হিট দিয়ে যত পোকামাকড় তাড়িয়েছি, তারা সবাই এসে জড়ো হয়েছে। তাদের এতদিনে একটা খাদ্য পাওয়া গেছে। অনেকদিনের খাদ্য…
লোকটা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আজকে এই পর্যন্ত থাক, বাকিটা পরদিন শুনব।
(ঘ)
লোকটা আমার স্বপ্নের কথা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে। পরদিন সকালে চায়ের দোকানের কালা বলল, ‘আপনি নাকি মরার স্বপ্ন দেখেন? আপনি এত ভীতু? অপুদাকে দেখুন শরীরের ভিতর ওই রকম একটা রোগ থাকা সত্বেও সবাইকে নিয়ে বেড়াতে গেল। জানত যেকোনও সময়ে মরে যাবে। কিন্তু সে কথা কাউকে বলেনি। আপনি সুস্থ লোক বলে দিলেন!’ ওর কথার উত্তর না দিয়ে লোকটাকে খুঁজছিলাম। লোকটা এই সময়ে কালার দোকানে বসে সংবাদপত্র পড়ে। আজকে দেখছি না। চারদিক তাকাচ্ছি, লোকটার দেখা নেই। বুঝতে পারছি না, লোকটার সঙ্গে কথা বলা ঠিক হচ্ছে কিনা। নাম না বলতে পারলে কেউ তো চিনতে পারবে না।জিজ্ঞাসা করা সত্বেও নামটা বলেনি। মনটা খারাপ হয়ে গেল, লোকটাকে বন্ধু ভেবেছিলাম, দেখছি তা তো নয়। বলেছিল তারক করের পাশে গোলাপি বাড়িটায় থাকে। হাঁটতে হাঁটতে তারক করের বাড়ির দিকে গেলাম। বাড়িটার দু’দিকে কোনও বাড়ি নেই। লোকেরা বলল, গোলাপি রঙের একটা বাড়ি ছিল কিন্তু…। সব পরিষ্কার, মাঠ, বড় বড় ঘাস। কবে যে বাড়িগুলো ভাঙা হল, জানতেও পারিনি। এদিকে তো আসা হয় না।লোকটা ডাহা মিথ্যুক। একবার হাতের কাছে পেলে ভাল করে শুনিয়ে দিতে হবে। আবার বাজারে গেলাম। এদিক ওদিক অনেক খুঁজলাম, সব চায়ের দোকানে, কচুরির দোকানে, কোথাও পাওয়া গেল না। বাজারের মধ্যে আমাকে ঘুরতে দেখে কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করল, কিছু খুঁজছেন বা কী চাই? কোনও কথা না বলে বাড়ি চলে এলাম।
(ঙ)
লোকটাকে স্বপ্নের কথাটা বলা ঠিক হয়নি। প্রথমত অজ্ঞাতকুলশীল, দ্বিতীয়ত প্রচণ্ড চালাক, ওর অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে। ভাগ্যিস প্রেমের স্বপ্নগুলো বলা হয়নি বা স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে স্বপ্নের কথাটা বলা হয়নি। তা হলে তো লোকটা সবাইকে জানিয়ে দিত। প্রেমের স্বপ্ন নিয়ে অনেকে অনেক জাল বুনত। নিজের পাড়ায় আমি চরিত্রহীন হয়ে যেতাম। এসব ভাবতে ভাবতে লোকটা এসে হাজির। গ্রিলের বাইরে দাঁড়িয়ে। ভেবেছিলাম আজ দরজা খুলব না। তারপরে মনে হল লোকটাকে আজ আচ্ছাসে ঝাড়ব। তাই দরজা খুললাম।
লোকটা ঘরে ঢুকেই বলল, আপনার স্বপ্নটা বিশ্লেষণ করলাম।
ওনাকে থামিয়ে দিয়ে কথা বলতে গেছিলাম। উনি বললেন, আমি শেষ করেনি, তারপর শুনব।
লোকটার কথাবার্তার মধ্যে একটা দাবিয়ে রাখার ব্যাপার আছে। তিনি বললেন, আপনি আসল স্বপ্নের কথা বলেননি।
কী করে বুঝলেন?
খবরের কাগজ আর টিভি থেকে এই স্বপ্নটা তৈরি হয়েছে। আপনি যদি এ পাড়াতেই কয়েকটা বাড়ি ঘোরেন, দেখবেন, সবাই এক স্বপ্ন দেখছে। আসলে ছেলে-মেয়ে কেউ আর নিজের বাবা-মা এবং স্বদেশ সেবা করছে না। স্বদেশ তাদের উড়ানভূমি। তারা চলে যাচ্ছে। অন্য দেশে যেতে চাইছে। সব বয়স্ক মানুষ আপনার স্বপ্নটাই দেখছে। অন্য লোকের এটা আসল স্বপ্ন হলেও আপনার ক্ষেত্রে নয়। কারণ আপনি অনেকদূর পর্যন্ত দেখেছেন, অন্যরা এতদূর পর্যন্ত যাচ্ছে না। আপনি মরার স্বপ্ন দেখতে পারেন না। কারণ আজ সকালেও আপনি গাছ ট্রিম করার জন্য পুরসভার লোকদের বকেছেন, ‘যে ডালটা মরে গেছে, সেটা নিজে থেকে পড়ে যাবে।’ জায়গামতো না ফেলার জন্য আপনি কত বকা-জখা করেছেন। প্লাস্টিক নিয়ে কথা বলছেন। তাই আমার মনে হয়েছে, আপনার আসল স্বপ্নটা বলেননি।
তারপর বললেন, আজ আপনার বন্ধু দেবাশিসের গল্পটা শোনার কথা। উনি অপেক্ষা করছেন। যাই?
আমি মাথা নাড়ি। লোকটা নিঃশব্দে বেরিয়ে যায়।
(চ)
দুপুরবেলা, প্রচণ্ড রোদ তার মধ্যে সবাই মাঠে এসে গেছে। রোদ চাই। আরও আরও রোদ চাই। ভিটামিন ডি চাই। দেহে যত রোদ লাগবে, মানুষ তত ভাল থাকবে। এই কথাটা কেউ প্রকাশ করছে না। আজকাল বে-আব্রু হওয়ার প্রতিযোগিতা হয়ত ওই জন্যই বেড়েছে। ছেলেরা-মেয়েরা সমানতালে গায়ের কাপড় খসাচ্ছে। বাঁচতে চাইছে, পোশাকের আর দরকার নেই।
লোকটা আমার কথা শুনে হেসে ফেলল, আপনি ঠিক বলেছেন, অসুস্থ লোক শরীরের জ্বালায় পোশাক ঠিক রাখতে পারছে না। কিন্তু অসুখের কথাটা কাউকে বলছে না। প্যারিস সামিট, লন্ডন সামিট, খাদ্য থেকে, বায়ু থেকে, জল থেকে দূষণ ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে মানুষ সুস্থ থাকতে চাইছে। পারছে না। সবাই বলছে করো, করো, কিন্তু করে কে?
বাধ্য হয়ে লোকটাকে বললাম, আপনি একটু চুপ করবেন!
লোকটা হাসছিল, চুপ করব না চলেই যাব। আপনার স্বপ্নটা বলুন না।
আপনি কী করে জানলেন, আমার অন্য একটা স্বপ্ন আছে?
কথা শুনলেই বোঝা যায়, কার কী স্বপ্ন। স্বল্প দৈর্ঘ্যের, বড় দৈর্ঘ্যের, এগুলো মানুষের স্বাভাবিক কথার মধ্যেই থাকে।
হঠাৎ লোকটা বলল, আজকের দিনটাও চলে গেল। বললেন না।
(ছ)
আমার এক বন্ধু বলেছিল, তার ঠাকুরদা কর্কটরোগে মারা গেছিল, তার বাবা কর্কটরোগে মারা গেছে, তার কাকা, পিসি সবাই মারা গেছে একইভাবে এবং মজার ব্যাপার সবারই গলায় রোগটা হয়েছিল। এমন কোনও বাড়ি নেই, যেখানে কর্কট দংশন করেনি। সব পরিবারে কর্কট বাসা বেঁধেছে বা সেই পরিবারের প্রিয় সদস্য হয়ে গেছে। যে যতই সাজুক, পোশাক পরুক, পোশাক খুলুক, ভিতরে ভিতরে তার ক্ষয় হচ্ছে, সে বুঝতে পারছে না। সব বাড়িতে, সব পাড়ায় কর্কট সপরিবারে দিব্য আছে। এখন এমন কোনও বাড়ি নেই, যে বাড়িতে তিনি নেই। তাঁকে ছাড়া পরিবার কল্পনা করা যায় না। সবার ইষ্ট তিনি…
কথার মধ্যেই লোকটা বলল, আপনার স্বপ্নটা এখনও বললেন না।
বললাম, একটু অসুবিধা আছে।
কী আর অসুবিধা, আমি আর আপনিই তো আছি।
বিরক্ত হয়ে বললাম, শুনুন তা হলে, রোজ প্রথমরাতে আমি স্বপ্নটা দেখি। এক অজানা সমুদ্রসৈকতে মহারাজ কর্কট একটা ছোট মঞ্চের ওপর বসে আছেন। তাঁর সামনে অগুনতি লোক। সাদা, কালো, বাদামি সব রঙের। মহারাজ বসে বসে ঝিমুচ্ছেন। মানুষের দল যত তাঁর কাছে এগোচ্ছে, বরফ গলার মতো গলে যাচ্ছে, তারপর সমুদ্রে মিশে যাচ্ছে। তিনি ফিকফিক করে হাসছেন। দলের পর দল লোক আসছে আর গলে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে আমার পরিচিত কেউ এলেই আমি চিৎকার করে বলছি, ‘ওনার কাছে যেয়ো না।’ তাতেই আমার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে।
(জ)
হঠাৎ খেয়াল হল, পা’টা ভিজে ভিজে লাগছে। পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি, ঘরে পরার স্লিপারটা ভিজে গেছে। ধুতিটা একটু উঁচু ছিল তাই ভেজেনি। কিন্তু ঘরের মধ্যে জল এল কোথা থেকে? এবার খেয়াল হল, লোকটাও তো নেই। দরজাগুলো সব বন্ধ। লোকটাও…
গল্পটা শেষ করে কৃষ্ণেন্দু পত্রিকাটা পাশে রাখতে গিয়ে দেখে জায়গাটা ভিজে, আত্মজিজ্ঞাসা নেই। ও সব সময়ে বলে যায়। না বলে হঠাৎ কখন গেল? স্লিপারটা ভাসছে। অর্ঘ্যর বিছানাটা ভিজে ন্যাতা হয়ে গেছে। অর্ঘ্যও বিছানায় নেই। ঘরের মধ্যে জল বাড়ছে। কৃষ্ণেন্দু পাদুটো তুলে চোখ বুজে চুপচাপ বসে থাকে।
চিত্রণ: ক্রিস্তিনা সাহা







