Search
Generic filters
Search
Generic filters

লেবেদেফ এবং ও তাঁর সংস্কৃত শিক্ষক জগন্নাথ বিদ্যাপঞ্চানন

একজনের নাম গোলকনাথ, অন্যজনের নাম জগন্নাথ। এই দুই নাথ-এর ছত্রছায়ায় একজন রুশ পরিব্রাজক হয়ে উঠলেন ভারতচর্চার অগ্রগণ্য পথিকৃৎ। শুধু তাই নয়, সেই রুশ নাগরিক লেবেদেফের হাত ধরে বাংলা তথা ভারত পেল প্রথম ইউরোপীয় ধাঁচের প্রসেনিয়াম থিয়েটার। গোলকনাথের কথা তবুও দুই বাংলার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির উৎসাহীজনেরা কম-বেশি জানেন। তিনি ছিলেন লেবেদেফের বাংলা শিক্ষক। অথচ লেবেদেফের সংস্কৃত শিক্ষকের কথা রয়ে গিয়েছে বিস্মৃতির অতলে। কে সেই সংস্কৃত পণ্ডিত? কী তাঁর পরিচয়? কোথায় ছিল তাঁদের বাস? ‘বাংলা থিয়েটারের জনক’ লেবেদেফের সেই শিক্ষাগুরুর কথা জানার আগে সংক্ষেপে জেনে রাখা দরকার লেবেদেফের বর্ণময় জীবনের কথা।

তাঁর পুরো নাম হেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেডেফ বা গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেডেফ। তিনিই প্রথম রাশিয়ান এবং ইউরোপীয় ভারতবিদ, ভারতে ইউরোপীয় ধাঁচের প্রসেনিয়াম থিয়েটার তথা বাংলা থিয়েটারের জনক এবং পুরনো কলকাতার স্বনামধন্য সঙ্গীতশিল্পী। একাধারে অভিযাত্রী, ভাষাবিদ ও অনুবাদক লেবেদেফের জন্ম ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরের ইয়ারোস্লাভ শহরে। পরে সপরিবারে চলে আসেন সেন্ট পিটার্সবার্গে। লেবেদেভ নিজের প্রচেষ্টায় ইংরেজি, ফরাসি এবং জার্মান ভাষা শেখেন। সেন্ট পিটার্সবার্গে লেবেদেভ প্রথমে স্থায়ী রাশিয়ান থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা ফায়োদর ভলকভের সঙ্গে পরিচিত হন ও ভলকভের থিয়েটারে অভিনয়েও অংশ নেন। লেবেদেফ ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত বেহালাবাদক এবং একটি বাদ্যযন্ত্রীদলের সদস্য হিসাবে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় যান। তারপর একদিন সেই দল থেকে পালিয়ে গোটা ইউরোপ চষে বেড়ান এবং বেহালাবাদক হিসেবে কিছুকাল জীবন অতিবাহিত করেন। ইত্যবসরে বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীতসাধক মোৎজার্টের সঙ্গেও তাঁর বন্ধুত্ব হয়।

১৭৮২-তে প্যারিস হয়ে লন্ডন চলে যান লেবেদেফ। সেখানে বছর চারেক কাটিয়ে ব্রিটিশ সামরিক ব্যান্ডের সদস্য হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘রডনি’ নামক জাহাজে চড়ে ১৭৮৫-র ১৫ আগস্ট মাদ্রাজে পা রাখেন। মাদ্রাজে দু’বছর কাটিয়ে ১৭৮৭-র আগস্টে আসেন কলকাতায়। পরবর্তী দশবছর কলকাতাই হয়ে ওঠে তাঁর ঘরবাড়ি। পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সঙ্গে ভারতীয় সঙ্গীতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। শেখেন বাংলা, সংস্কৃত, হিন্দি প্রভৃতি ভারতীয় ভাষাও। তৎকালীন ডোমতলায় নিজস্ব প্রেক্ষাগৃহে ১৭৯৫-এর ২৭ নভেম্বর এবং ১৭৯৬-এর ২১ মার্চ দুটি বাংলা অনুবাদ নাটক পরিবেশন করেন। ১০ জন পুরুষ ও ৩ জন মহিলা অভিনেত্রী নিয়ে মঞ্চস্থ হয় সে নাটক। এবং রচিত হয় ইতিহাস। তখন শুধুই ইংরেজি থিয়েটারের চল। চক্রান্ত করে লেবেডেফকে ভিটেছাড়া করা হয়। মামলা লড়েন। কাজ হয় না। অসুস্থ হন। ব্যবসার চেষ্টায় নানা জায়গায় দরবার করেন। ব্যর্থ হয়ে কলকাতা ছাড়েন ১৭৯৭-এর ১০ ডিসেম্বর। পাড়ি দেন লন্ডনের উদ্দেশে। মাঝপথে আফ্রিকাতেও কাটান কিছুদিন। ১৮০১-এর মে মাসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে উৎসর্গীকৃত তাঁর ব্যাকরণগ্রন্থটি মুদ্রিত হওয়ার আগেই তিনি লন্ডনে পৌঁছন। তারপর ফিরে যান স্বদেশে। সম্ভবত বিয়ে করেননি। ১৮১৭-র ১৫ জুলাই ৭১ বছর বয়সে প্রয়াণ ঘটে ভারতীয় সংস্কৃতির এই উৎসাহী পুরুষের।

লেবেদেফের ‘বাংলা থিয়েটারের জনক’ হয়ে ওঠার পেছনে তাঁর বাংলা শিক্ষক গোলকনাথ দাসের অবদান অনস্বীকার্য। তখন কলকাতা শহরে এসে জনৈক রুশ চিকিৎসকের সাহায্যে স্থানীয় সমাজে সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে সুনাম কুড়েচ্ছিলেন লেবেদেফ। কিন্তু বাঙালি সমাজের আরও গভীরে যেতে হলে, তাঁকে শিখতে হবে বাংলাভাষা। পেয়ে গেলেন স্কুলশিক্ষক গোলকনাথ দাসকে। তাঁর কাছেই শিখতে শুরু করলেন বাংলা এবং ক্রমে ব্রতী হলেন নাট্যসাধনায়। গোলকনাথের সঙ্গে তাঁর চুক্তি হল, গোলক তাঁকে শেখাবেন বাংলা। বিনিময়ে লেবেদেফ তাঁকে শেখাবেন বেহালা। শেখাবেন পাশ্চাত্য সঙ্গীত। লেবেদেফ তাঁর বইতে লিখছেন: ‘‘…আমি ‘দি ডিসগাইস’ এবং ‘লাভ ইজ দ্য বেস্ট ডক্টর’ নামে দুটি ইংরেজি নাটক বাংলায় অনুবাদ করি। লক্ষ্য করি, এদেশের লোকজন উপদেশমূলক গুরুগম্ভীর আলোচনার চেয়ে হালকা ঠাট্টা-তামাশা বেশি পছন্দ করেন। তাই চৌকিদার, চোর, উকিল, গোমস্তা প্রভৃতি চরিত্রের সন্নিবেশ রয়েছে এমন দুটি নাটকই বেছে নিই। অনুবাদ শেষ করে কয়েকজন নামজাদা পণ্ডিতকে ডাকি, তাঁদের সামনে নাটকদু’টি পঠিত হয়। নাটকের কোন কোন অংশ তাঁদের মনে ধরেছে, সেসব লক্ষ্য করি খুব মন দিয়ে।… পণ্ডিতেরা যখন বলেন, কোনও অসুবিধা নেই, তখন আমার শিক্ষক গোলকনাথ দাস প্রস্তাব দেন, আমি যদি নাটকদুটি অভিনয় করানোর বিষয়ে রাজি থাকি তা হলে প্রয়োজনীয় অভিনেতা এবং অভিনেত্রী তিনি যোগাড় করে দিতে পারেন। তাঁর এই প্রস্তাবে তো আমি হাতে চাঁদ পেয়ে যাই এবং কালবিলম্ব না করে গভর্নর জেনারেল জন সোর-এর কাছে আবেদন রাখি, আমাকে নাট্যশালা খোলার লাইসেন্স মঞ্জুর করা হোক। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সে আবেদন মঞ্জুর করেন।’’

এই গোলকনাথ দাসই তাঁকে সংস্কৃত শিখতে উৎসাহ দিলেন। গোলকনাথ লেবেদেফকে পরামর্শ দিলেন: ‘‘সংস্কৃত অক্ষর পরিচয়টা সেরে ফেলুন। কারণ প্রাচ্য বিজ্ঞান ও জ্ঞান ভাণ্ডারের চাবিকাঠি এর কাছেই আছে।’’ তদানীন্তন বঙ্গদেশের নামজাদা সংস্কৃত পণ্ডিত, জগন্নাথ বিদ্যাপঞ্চানন ভট্টাচার্যর কাছে সংস্কৃতের পাঠ নেওয়ার জন্য গেলেন লেবেদেফ। লেবেদেফ নিজে অবশ্যও জগন্নাথ বিদ্যাপঞ্চাননের নাম লিখেছেন, ‘‘জগন-মোহন-বিদ্যে পঞ্চানন ভট্টাচার্য’’। পণ্ডিত জগন্নাথ বিদ্যাপঞ্চানন ছিলেন উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙা-সংলগ্ন মাটিকুমড়োর বাসিন্দা। মাটিকুমড়ো তখন ছিল প্রসিদ্ধ কুশদহ অঞ্চলের অংশ। জগন্নাথ বিদ্যাপঞ্চানন ছাড়াও আর-এক জগন্নাথের কাছেও অধ্যয়ন করেন লেবেদেফ। এই জগন্নাথ হুগলির ত্রিবেণীর লোক। তাঁর নাম জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন। তাঁকে লেবেদেফ উল্লেখ করেছেন ‘‘জগন্নাথ তর্ক’’ নামে। জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের জন্ম ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে। তিনি প্রয়াত হন ১৮০৭-এর ১৯ অক্টোবর। প্রখ্যাত ইংরেজ ভাষাতাত্ত্বিক স্যার উইলিয়াম জোন্সও জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের সান্নিধ্যে এসেছেন। গভর্নর জেনারেল জন সোর এবং লেবেদেফের অন্যান্য বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষকরা তাঁকে উৎসাহিত করলেন বাংলা, সংস্কৃত, হিন্দি প্রভৃতি ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে। লেবেদেফ সেই সময়কার চালু রীতি অনুযায়ী দুই জগন্নাথের মতো বিখ্যাত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের কাছেই শিখলেন ‘‘ব্রাহ্মণীয় রীতি, অভিধান, ব্যাকরণ, পাটিগণিত, ক্যালেন্ডার ও অন্যান্য বিষয়’’।

জগন্নাথ বিদ্যাপঞ্চাননের পুরো নাম জগন্নাথ বিদ্যাপঞ্চানন ভট্টাচার্য। তিনি তৎকালীন বাংলার চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত কুশদহের মাটিকোমড়া গ্রামের বিখ্যাত পণ্ডিত রামভদ্র ন্যায়ালঙ্কারের বংশধর তথা প্রসিদ্ধ পণ্ডিত রামশরণ ন্যায়বাচস্পতির দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন। স্মৃতিশাস্ত্রে জগন্নাথ বিদ্যাপঞ্চাননের বিশেষ বুৎপত্তি ছিল। এবং ধর্মশাস্ত্র সম্বন্ধে তাঁর ব্যবস্থা বলতে গেলে ছিল অকাট্য। জগন্নাথের চার পুত্রও ছিলেন, এঁরা হলেন রামচন্দ্র শিরোমণি, অমৃতলাল ভট্টাচার্য, রামকমল চূড়ামণি এবং তারিণীচরণ ভট্টাচার্য। এখানে বলা ভাল, জগন্নাথের পূর্বপুরুষ রামভদ্র ন্যায়ালঙ্কারের পিতামহ প্রথম শ্রীকর আচার্য ছিলেন নবদ্বীপের স্মৃতিশাস্ত্রের পণ্ডিত। রামভদ্র ন্যায়ালঙ্কারের পিতা শ্রীনাথ আচার্য ছিলেন ষোড়শ শতকের প্রখ্যাত পণ্ডিত শ্রীচৈতন্যের সমসাময়িক স্মার্ত রঘুনন্দনের গুরু। অনেকগুলি স্মৃতি ও টীকার বই লিখে খুবই যশস্বী হয়েছিলেন শ্রীনাথ আচার্য। বাবার মতো রামভদ্রও বিপুল পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। বিখ্যাত নৈয়ায়িক রামভদ্র জীমূতবাহনকৃত দায়ভাগের টীকাকারও ছিলেন। সতেরো শতকের কুশদহ বা কুশদ্বীপ পরগনায় তিনটি প্রধান পণ্ডিত-স্থান ছিল— মাটিকুমড়া, গৈপুর ও খাঁটুরা। রামভদ্র ন্যায়ালঙ্কার মাটিকুমড়ার পুতিটুণ্ড-বংশীয় ছিলেন। খাঁটুরার পণ্ডিতদের মধ্যে রামরুদ্র ন্যায়বাচস্পতি ও গৌরমণি ন্যায়ালঙ্কারের নামও বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তবে রামভদ্র নদীয়ার নৈয়ায়িক গদাধর ভট্টাচার্যের সমকালীন ছিলেন। তখন তাঁদের নামে জনশ্রুতি ছিল— ‘‘নদের গদা, কুশদহের ভদা’’।

শিক্ষাগুরুদের প্রতি লেবেদেফের ছিল অটুট শ্রদ্ধা এবং পরবর্তীতে তিনি লিখলেন: ‘‘আমি সংস্কৃত বা দেবনাগরী যাই বলুন, সেসব ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করলাম, এই সংস্কৃত বা দেবনগরীর হাত ধরেই বাংলা ভাষা ও ক্রিয়া ও একই সঙ্গে চালু ভাষা ‘মুরিশ’ যা শুধু সমগ্র ভারতেই নয়— এমনকি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া যাযাবররাও— ভারতীয় উপজাতি থেকেই যাদের সৃষ্টি— তারাও ব্যবহার করে— তাও শিখতে পারলাম। এমনকি ব্রাহ্মণদের সুপ্রাচীন ক্রিয়াপদ্ধতি তাদের পূজার্চনা ও চালু অভ্যাসগুলির ওপরেও আমার এক বোধ তৈরি হল।’’ আসলে, শুধু সংস্কৃত পাঠই নয়, ভারত সম্পর্কে লেবেদেফের চোখ খুলে দিয়েছিলেন জগন্নাথ বিদ্যাপঞ্চানন। লেবেদেফ ভারতকে ভুলে যাননি কোনওদিন। ভারত থেকে ফেরার সময় লেবেদেফের সঙ্গে থাকা পাণ্ডুলিপিগুলির সন্ধান পাওয়া যায়, তাঁর মৃত্যুর প্রায় উনিশ বছর পর। সেগুলি হল— সংস্কৃত অভিধান ‘অমরকোষ’, সংস্কৃত ভাষায় রচিত ‘হিতোপদেশ’, হিন্দিতে রচিত ‘মধুমালতীজৈত প্রসঙ্গকথা’ এবং নিজের হাতে লেখা চারটি পঞ্জিকা ও আরও কিছু বই। এছাড়াও তিনি প্রচুর খসড়া পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন। তার মধ্যে ছিল, ‘বাংলা–রুশ শব্দকোষ’ (অসম্পূর্ণ), ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ (অসম্পূর্ণ), ‘‘ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর কাব্য’-র প্রথম অংশের রুশ অনুবাদ’’, ‘আফ্রিকার দিনপঞ্জী’ ‘কলকাতায় ১৭৯৭-তে লেখা আত্মজীবনীমূলক রচনা’, ‘ভারতীয় পাটিগণিতের ওপর লেখা বই’ ইত্যাদি।

ভারত-প্রেমিক লেবেদেফ স্মরণীয়, তাঁর কীর্তিসমূহ রাশিয়ায় সংরক্ষিত রয়েছে। অথচ লেবেদেফের ভারত-বিদ্যার সোপান বাঙালি পণ্ডিত জগন্নাথ বিদ্যাপঞ্চাননকেই ভুলে গিয়েছে তাঁর স্বদেশ ও স্বজাতি।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

দেখুন, সংস্কৃত পণ্ডিত জগন্নাথ বিদ্যাপঞ্চানন ভট্টাচার্যকে নিয়ে প্রথম ও একমাত্র তথ্যচিত্র।

3 Responses

  1. লেবেদেফ চর্চার একেবারে অনালোচিত দিকগুলি উঠে এলো।তথ্যচিত্রটি উপরি পাওনা।লেখকের জন্য কোন ধন্যবাদই যথেষ্ট নয়!

  2. অসাধারণ লেখা শ্যামলেশ, কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। আরও লেখা পড়তে চাই।

  3. তথ্যসমৃদ্ধ রচনা। অজানা বিষয়। উপস্থাপনা চমৎকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + one =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »