Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

লালন ও বাঙালির যুক্তি-তর্ক

হিন্দু-মুসলমান সবার জন্য বৈষ্ণবরা তাদের হরিসভা উন্মুক্ত করে রাখেন। ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার শরিফের উরসে হিন্দুদের বসবার ব্যবস্থা থাকে। বায়েজিদ বোস্তামি ও হযরত শাহজালালের মাজার প্রাঙ্গণে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই মানত করেন, শিরনি দেন। লালনের আখড়ায় ধর্মেবর্ণের ভেদ থাকে না। ইতিহাস ঘেঁটে, পুঁথি-পাঁচালির জীর্ণ পাতা উলটিয়ে জানা যায়, বাঙালি চিরকাল ধর্মপ্রাণ, তবে ধর্মান্ধ নয়। ধর্মের প্রাত্যহিক আচার-আচরণ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে, কিন্তু জীবনকে তুচ্ছ ভাবে না। জীবন ও অস্তিত্বের জন্য যা দরকারি মনে করে, তা-ই গ্রহণ ও পালন করে। হোক তা ধর্মের আচার-স্পিরিটের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিংবা অসঙ্গতিপূর্ণ। জীবন ও জীবিকার জন্য বাঙালি অন্য দেশের ধর্ম নিয়েছে, ভাষা নিয়েছে, কিন্তু অন্তরের অন্তস্তল থেকে উৎসারিত মানবধর্ম ত্যাগ করেনি। বাঙালির ধর্ম আসলে স্বনির্মিত ধর্ম। এজন্যে বাংলার জলহাওয়ায় কট্টর শরিয়তি ইসলাম তেমন শেকড় গাড়তে পারেনি। এখানে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করেছেন সত্যপীর, পাঁচপীর, পাঁচগাজী, মানিকপীররা। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মানত-শিরনি দিয়েছেন সত্যপীরের দরগায়। মুসলমানের সত্যপীর হিন্দুর কাছে হয়ে ওঠেন সত্যনারায়ণ। তাই নিরন্ন-বিপন্ন, বিপর্যস্ত, শোষিত হিন্দু-মুসলমান বাঁচার তাগিদে বলেছেন:
‘হিন্দুর দেবতা তিনি মুসলমানের পীর।/ দুইকুলে সেবা লয় হইয়া জাহির।’

সত্যপীর বা সত্যনারায়ণ পারলৌকিক মুক্তিদানের বা পাপ-পুণ্যের দেবতা নন। তিনি জাগতিক মঙ্গলবিধানের লৌকিক দেবতা। রোগ-বালাই, বিপদ-আপদ থেকে মুক্তির জন্য তাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়। লোকমানস-প্রসূত এই পীরের অনুসারীরা সাধারণত সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক ও পীড়িত। কিন্তু যুক্তিবাদী, জিজ্ঞাসু ও ইহজাগতিক। রাজনৈতিক পরিভাষায় আমরা যাকে ধর্মনিরপেক্ষতা বা অসাম্প্রদায়িকতা বলি, তা নিয়ে কয়েকশো বছর আগেই এদেশের পীর-সাধক, ভাবুকরা চিন্তা করেছেন। জাতগোত্রহীন মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনের কথা ভেবেছেন। মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি চণ্ডীদাস বলেছিলেন: ‘শুন’হ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ চণ্ডীদাসের সমসাময়িক চৈতন্যদেবও উচ্চবর্ণ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ ত্যাগ করে প্রেমভক্তিবাদী মানবধর্ম প্রচার করেছেন। এই মানবধর্মে উদ্বুদ্ধ হয়ে চণ্ডাল, মুচি, নমঃশূদ্র ছাড়াও বহু মুসলমান তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মুসলমান সুফি দরবেশরাও ইসলামের সাম্য-মৈত্রীর বাণী প্রচার করতে গিয়ে মূলত প্রেম ও মানবিকতার বাণী প্রচার করেছেন। অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রেম ও মানবতার বাণী সবচেয়ে বেশি করে প্রচার করেছেন লালন এবং বাংলার বাউল সাধকরা। মানবপ্রেমী লালন ফকির বলেছেন:
‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে/ সেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান/ জাতি গোত্র নাহি রবে।’

লালনের অনেক গানেই বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। দারিদ্র্যপীড়িত নির্জন-নিভৃত পল্লিতে বসবাস করেও তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন যেখানে ধর্মের নামে ভেদাভেদ ও শোষণ বঞ্চণার কোনও জায়গা নেই। সমতা ও ন্যায়বিচারের কথা তিনি গানে গানেই ব্যক্ত করতে চেয়েছেন। গানের হাতিয়ার দিয়েই তিনি সাম্প্রদায়িক প্রজাপীড়ক রাজন্যবর্গকে বিনাশ করতে চেয়েছেন। লালনের মতো বঙ্গবন্ধুও বলেছেন:
‘২৫ বছর আমরা দেখেছি ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানি এই বাংলাদেশের মাটিতে চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না।’

শুধু লালন না, এ ভূখণ্ডের সুফি-সাধক, রাষ্ট্রচিন্তক থেকে কবিরা পর্যন্ত প্রায় সকলেই মানবিকতা, মনুষ্যত্ব অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান গেয়েছেন। ‘শুন’হ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’— আধুনিক হিউম্যানিজমের সারসত্য মধ্যযুগের চণ্ডীদাস এই ঘোষণার মধ্যেই নিহিত আছে। যারা গড়পড়তা ধর্ম এবং ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন তারা হয়তো এই ঘোষণার সঙ্গে একমত পোষণ করতে পারবেন না। কিন্তু তাঁরাও মানুষকে বড় করে দেখেছেন। ইউরোপের তখনকার হিউম্যানিস্টরা যে অর্থে হিউম্যানিস্ট সেই অর্থে চৈতন্যদেব, চণ্ডীদাস থেকে লালন, হাছন ও অন্যান্য মরমীরাও হিউম্যানিস্ট। উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বাংলার গ্রামীণ জীবনভাবনা ও ধর্মচেতনা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে লালন, কুবির গোঁসাই, মদন বাউলদের মতো মরমী সাধক ও বাউলদের ভাবসমৃদ্ধ ও তত্ত্বাশ্রয়ী গানের মাধ্যমে। এসব গানের স্রষ্টারা অধিকাংশই ছিলেন নিরক্ষর, অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক এবং সামাজিকভাবে দীর্ণ। কিন্তু সর্বতোভাবে তার্কিক ও দার্শনিক। ধর্মের নানা দিক নিয়ে এঁরা তর্ক করেছেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, সেকালে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা যেমন তর্ক করতেন, মুসলমান মৌলভীরাও তর্কযুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন। তেমনই লালন এবং অন্য ভাবুক, সাধকরাও তর্কযুদ্ধে মেতে উঠতেন আখড়া-আশ্রমে, গানের মাহফিলে কিংবা সাধুসঙ্গে। তর্ক করতে গিয়ে এক আসরে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বাউল সম্রাট লালন বলেছেন:
‘সুন্নত দিলে হয় মুসলমান/ নারীর তবে কী হয় বিধান—/ বামুন চিনি পৈতায় প্রমাণ/ বামনী চিনি কী প্রকারে।’

ভেবে বিস্মিত হই যে, লালনের মত এক নিরক্ষর, গেঁয়ো বাউল এমন ক্ষুরধার যুক্তি, দর্শনসমৃদ্ধ ভাবনা পেলেন কোথায়? কোন গুরু তাঁকে এসব শেখালেন? তিনি তাঁর ভাবনাগুলি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সাবলীলভাবে গানের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। গানের মধ্য দিয়ে তিনি কেবল বর্ণাশ্রম প্রথা সম্পর্কে প্রশ্ন করেননি, সাহসিকতার সঙ্গে প্রশ্ন করেছেন, হিন্দু-মুসলমানের ধর্মবিশ্বাসের নানাদিক নিয়েও।

লালনের জন্ম মধ্যযুগ ছুঁয়ে যাওয়া ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দ ধরা হলে, তাঁকে রামমোহন-বিদ্যাসাগরদের সমসাময়িক বলা চলে। অথচ এই নিরক্ষর সাধকের সঙ্গে সে সময়ের কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নবজাগৃতির পুরোধাদের কতই না ফারাক! লালন যেসময়ে হিন্দু-মুসলমানের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা, সম্প্রীতি ও ধর্মসমন্বয়ের কথা চিন্তা করেছেন, সেই একই সময়ে রামমোহন-দেবেন্দ্রনাথ-কেশব সেনরা তাঁদের সংস্কার আন্দোলন হিন্দুদের গণ্ডির মধ্যেই সীমিত রেখেছেন। অন্যদিকে ওহাবি-ফরায়েজি ও সৈয়দ আহমেদের ‘তরিকা ই মহম্মদীয়’ আন্দোলনের প্রয়াস ছিল কেবল মুসলমান সমাজকে বিশুদ্ধ ইসলামের পথে ফিরিয়ে আনার মধ্যে পরিসীমিত। কোনও পক্ষই সেইভাবে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়কে এক ময়দানে মিলিত করতে চাননি। কিন্তু লালন ও লালন-উত্তর লোকায়তবাদী মরমী সাধকরা নিম্নবর্গের কৃষিজীবী সমাজকে কেবল কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, শাস্ত্রাচারের পথ থেকে নিবৃত্তই করেননি, তাদের মধ্যে মানবপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক ভাবনাও জাগিয়ে তুলেছেন। আসলে আঠারো-উনিশ শতকে বাংলার লোকায়ত সাধক, কবি ও পদকর্তাদের মধ্যে ধর্মসমন্বয়ের বিস্ময়কর উদ্যোগ লক্ষ করা গেছে। ধর্মান্তকরণের প্রবল ঝোড়ো হাওয়া আর সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প মাখানো প্রতিবেশে দাঁড়িয়ে কুবির গোঁসাই গেয়েছেন:
‘অগণনায় বর্ণ লেখা/ রাধাকৃষ্ণ, যিশুখ্রিস্ট খোদাআল্লা এক।’

গীতিকার জালালুদ্দিন বলেছেন:
‘করিম কিষণ হরি হযরত লীলার ছলে ঘোরে/ ভাবে ডুবে খুঁজে দেখ/ ভেদাভদ কিছু নাই রে।’

লালনও ধর্মসমন্বয় চেতনায় শাণিত হয়ে উচ্চকণ্ঠে বলেছেন:
‘সে তো ও নিষ্ঠুর কালা/ নাইকো তার বিচ্ছেদজ্বালা।/ আমার চক্ষু বুঁজে জপমালা/ লা-শারিকাল্লা সে কালা।’

এঁদের গানের ভাবৈশ্বর্য, ধ্বনিমাধুর্য ও যুক্তির বুনোট অনবদ্য। বাংলার লোকায়ত সাধকদের এই উদার ভেদবুদ্ধিহীন, মানবিক ভাবনা উচ্চবর্গীয় সমাজ মেনে নেয়নি। যেখানে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি ও সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে, সেখানেই সমাজের শক্তিমানরা রুষ্ট, ক্ষুব্ধ হয়েছে। কিন্তু ধর্ম ও সংস্কৃতির সমন্বয়বাদী স্রোতটি ঠেকাতে পারেনি। গ্রামের সহজ সরল সাধারণ মানুষ আজও ধর্ম মানার ক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় আচার-আচরণ বড় করে না-দেখে, আবেগকে বড় করে দেখেছেন। বাংলার লোকসমাজের কাছে নাস্তিকতা বা ধর্মবিরোধিতা প্রাধান্য পায়নি, প্রাধান্য পেয়েছে মানবিক অধ্যাত্মবাদ। মওলানা-মৌলভী-পুরোহিতদের চেয়ে এরা মান্য করেন পির-মুরশিদ, গুরু-গোঁসাইদের— যাঁরা শাস্ত্রের ধর্মের চেয়ে আত্মা ও অন্তরের ধর্মকে বড় করে দেখেন। রাজনৈতিক ভাঙাগড়া, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ির মধ্যেও আজও নিরক্ষর, গ্রামীণ গায়কের হৃদয়ছোঁয়া গানে অখণ্ড মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, সমন্বয়বাদী দর্শনের মর্মকথা শুনতে পাওয়া যায়:
‘মরুতে এলেন মোহাম্মদ/ মথুরাতে গেলেন শ্যাম—/ ইমাম খেলেন রসুল/ লীলা খেলেন ঘনশ্যাম,/ মা আয়েশা পাগল হলেন/ নবির প্রেমে মদিনায়/ বাঁশির সুরে পাগল হয়ে/ রাধা চলে যমুনায়/ একই মায়ের দুটি সন্তান/ হিন্দু আর মুসলমান/ একই কুলে জন্ম মোদের/ একই বুকে দুগ্ধপান।/ দেখে আয় ভাই হিন্দু মুসলিম/ মদিনা আর মথুরায়/ দুই রাখালে যুক্তি ক’রে/ গরু আর বকরি চরায়।’ (সুধীর চক্রবর্তী: ‘ব্রাত্য লোকায়ত লালন’। রচনা সমগ্র। কলকাতা বইমেলা ২০১০, পৃ: ৩৩০।)

এমন স্বচ্ছ, সহজ গান আমাদের আত্মাকে তৃপ্ত তো করে, সেই সঙ্গে এই গানে আমরা খুঁজে পাই সবাইকে নিয়ে এক সঙ্গে বেঁচে থাকার সাহস ও মানুষকে ভালবাসার সহজ যুক্তি। মনের গহনে প্রশ্ন জাগে, এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, এই যুক্তি তাঁরা কোথা থেকে পেলেন? এর উৎসই বা কী? বাংলার প্রকৃতির বিপুল ঐশ্বর্যই কি তাঁদের এই উদার মানবিক ভাবনার রস ও রসদ যুগিয়েছে? বাংলার ভূগোল কি বাঙালিকে ধর্মসহিষ্ণু করে তুলেছে? না কি তাঁদের জিজ্ঞাসু মন? হয়তো সেই কারণে লালন, দুদ্দু শাহ ও মদন বাউলের আমাদের অন্দর থেকে অন্তরে প্রবেশ করেছেন। আর এ কারণে বোধহয় পহেলা বৈশাখ, বর্ষাবরণ, নবান্ন উৎসব, পৌষ পার্বণ, বসন্ত উৎসব ইত্যাদি ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলি বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমান জোরেসোরেই উদযাপন করছে। মৌলভী-মওলানারা এগুলিকে হিন্দুয়ানি কৃত্য বলে ফতোয়া দিলেও জনমানুষ সেটা গ্রহণ করছে না।

সত্যি বলতে কী, মানুষকে প্রকৃতিলগ্ন হয়ে বেঁচে থাকতে হয়। প্রকৃতিময়তার মধ্যে তাকে পালন করতে ধর্মের নানা সব কৃত্যাচার। প্রকৃতির মধ্যেই সে তার ঈশ্বরকে আবিষ্কার করে। আল্লাহকে খোঁজে। বাঙালিকেও প্রকৃতির রূপ-অরূপের লীলার মধ্যে বাঁচতে হয়, ধর্ম পালন করতে হয়। নবান্ন বাঙালি মুসলমানের কাছে কেবলই একটি লোকজ উৎসব, কোনও ধর্মীয় কৃত্যাচার নয়। ঘট-লক্ষ্মীতে মুসলমান বিশ্বাস করে না, কিন্তু ধান-লক্ষ্মী তার মধ্যে এক ভিন্নমাত্রিক অনুভব জাগিয়ে তোলে। হেমন্তের একগুচ্ছ পাকা ধানের শীষ তার কাছে অর্ঘ্য দাবি করে, কারণ ভাত খেয়ে সে বেঁচে থাকে। জীবন ও অস্তিত্বের জন্যই বাঙালিকে ধর্মসহিষ্ণু, মানবিক ও সমন্বয়বাদী হতে হয়েছে। জীবন যেখানে মেলাতে চায় কিংবা মিলিয়ে রেখেছে, সেখানে ধর্মকে তো সহিষ্ণু হতেই হবে। যুক্তিবাদী-ধর্মনিষ্ঠ বাঙালির কাছে জীবনই সত্য, মৃত্যু নয়। তার কাছে ‘এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি।’ জীবনকে তাৎপর্যমণ্ডিত করতেই তার সকল সাধনা, সকল প্রয়াস। জীবনকে পত্র-পুষ্পে পুষ্পিত করতেই বাঙালি উদার, অসাম্প্রদায়িক ও সমন্বয়বাদী হয়েছে।

এস এম সুলতান একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেন:
‘‘হিন্দু মুসলমান সবাই বৈষ্ণব পদাবলী লিখত। কৃত্তিবাস, বিদ্যাপতি, আফজল খাঁ, মালাধর বসু— এঁরা সবাই রাজকবি। এঁরা বৈষ্ণব পদ লিখেছেন। মুসলমানরাও লিখেছে, মুসলমানদের ওই এক ইউসুফ-জুলেখা লেখা হয়েছে। এগুলো বেসিক্যালি সব সেক্যুলার বই। রামায়ণ ছিল কাব্য, ওটাকে ধর্মগ্রন্থ করেছে সামন্তপ্রভুরা, ওরাই সব ডিভিসন করেছে।… বাঙালির কোনো অলি-দরবেশ নাই, তোমরা তো অলি হতে পারবে না, তাই আল্লাহ আল্লাহ করো। সুলতানরা সব শিখিয়ে দিল, হিন্দুদের বলল, সন্ন্যাস তোমাদের দ্বারা সম্ভব হবে না তাই তুমি হরিনাম জপ করো, জ্ঞান পাবে। এখন হরিনাম কী? ষোল নাম, বত্রিশ অক্ষর। হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ— হরে রাম হরে রাম। (রাম, কৃষ্ণ) সব বাংলার বাইরের, বাংলার সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক নাই। বাঙালি মূলত ত্যাগী, সংযমী, সত্যবাদী, অতিথিপরায়ণ। আমাদের মধ্যে অনেক বড়মাপের অ্যাবসোলিউট থিংকার তৈরি হয়েছে, সেক্যুলার থিংকার। কালিদাস, বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জয়দেব, তারপর ওই মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল। বিদ্যাসাগর আরেকজন বড় মানুষ। মধুসূদনের মেঘনাদ কাব্য, তিলোত্তমাসম্ভব, শর্মিষ্ঠা এগুলো রিলিজিয়াস মোটিফ নিয়ে লেখা হলেও ওগুলো আসলে অসাম্প্রদায়িক।’’ (শাহাদুজ্জামান: ‘কথা পরম্পরা’। পাঠক সমাবেশ, ঢাকা। দ্বি-স, ফেব্রুয়ারি, ২০০৭। পৃ: ২৮)

লালনকেও বড় মাপের থিংকার এবং সর্বধর্মের মিলনসাধক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তিনিও সবাইকে নিয়ে বাঁচতে, লড়তে ও মরতে চেয়েছেন।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine − six =

Recent Posts

প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারী: এক দৈবী আখর

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

Read More »
তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

মাতৃভাষা: অবিনাশী হৃৎস্পন্দন ও বিশ্বজনীন উত্তরাধিকার

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব একটি আলো আছে, সে নিজের দীপ্তিতেই ভাস্বর। পৃথিবীতে আজ প্রায় সাত হাজার ভাষা আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শতাব্দীর শেষে তার অর্ধেকেরও বেশি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য সত্যিই বেদনাদায়ক। একটি ভাষার মৃত্যু মানে কেবল কিছু শব্দের মৃত্যু নয়— সে মানে একটি জগৎদর্শনের অবলুপ্তি, একটি জাতির স্মৃতির চিরকালীন বিনাশ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক বহুমাত্রিক। নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসা, তাকে চর্চায় রাখা, তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর তার সাথে অন্য সমস্ত ভাষার প্রতি আরও বেশি করে শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শংকর: বিচিত্র বিষয় ও আখ্যানের কথাকার

শংকরের জনপ্রিয়তার একটি কারণ যদি হয় সাবলীল ও সহজ গতিচ্ছন্দময় ভাষা, অন্য আরেকটি কারণ হল, নিজ সময়কে করপুটে ধারণ করা। তার সঙ্গে মিশেছে আমাদের পরিকীর্ণ জগতের বহুকিছু, আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে, অথচ আমরা এ-পর্যন্ত যার হদিশ পাইনি, তাকে পাঠকের দরবারে এনে হাজির করা। ১৯৫৫-তে যে উপন্যাসটি দিয়ে বাংলা-সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব, সেই ‘কত অজানারে’ হাইকোর্টের জীবনযাপন, সেখানকার আসামি-ফরিয়াদি, উকিল-ব্যারিস্টার প্রমুখের চিত্র। লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা এটি। তিনি প্রথম জীবনে হাইকোর্টের সঙ্গে চাকরিসূত্রে যুক্ত ছিলেন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত/ রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা/ আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর/ কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি/ তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়/ ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি/ অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা/ তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।

Read More »
সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »