Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

পল ভেরলেনের কবিতাগুচ্ছ

অনুবাদ : দিবাকর পুরকায়স্থ

প্রদোষকাল

মূল কবিতা: crepuscule

কুয়াশায় ঢাকা দিগ্বলয়ে তখন লাল হয় চাঁদ
ঘন কুয়াশা যেখানে নাচে,
ধোঁয়ায় ঢাকা ঘুমিয়ে থাকা প্রান্তরে
যেখানে ব্যাঙ ডাকে তারস্বরে
লম্বা ঘাসের ডগাগুলো কাঁপে তিরতির করে
লিলিগুলো পাপড়ি বন্ধ করে দেয়,
দীর্ঘকায় পপলার তাদের ঘনসংবদ্ধ ভৌতিক ছায়াগুলো
এলোমেলোভাবে মেলে দেয় বহুদূরে
ঝোপঝাড়ে জ্বলে জোনাকি
রাতজাগা পেঁচাগুলো নিঃশব্দে তাদের
ভারী ডানা মেলে উড়ে যায়
বিষণ্ণতা ছেয়ে যায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে,
বিষণ্ণ সন্ধ্যাতারা বহুদূরে দেখা যায়
তখনই তো হয় প্রদোষকাল।

***

ক্লাইমেনের‌ প্রতি

মূল কবিতা: Clymène (Fêtes Galants: A Clymène)

রহস্যময় পাখিগুলো গান করে
শব্দহীন নির্বাক প্রেম করে
প্রিয়া, তোমার দুচোখে
আকাশের রং লেগে থাকে

কারণ, তোমার আশ্চর্য কণ্ঠস্বর
তোমার পাগল করা দৃষ্টি
আমার জগৎসংসার
বিব্রত করার জন্য সৃষ্টি

কারণ তোমার বিরল‌ মধুর গন্ধ
তোমার রাজহাঁসের মত বিষণ্ণতা,
আর তোমার নির্দোষ সরলতা
এবং তোমার সুবাস।

ও! তোমার সম্পূর্ণ সত্ত্বার জন্য
সুর এত তীব্র, এত তীক্ষ্ম
যেন এক দেবদূতের স্বরধ্বনি
এবং মেঘের হারানো সুগন্ধ

আছে শুধু নরম সুরের মূর্ছনা,
আর তার সাযুজ্য,
আমার লুকোনো হৃদয়কে প্রলোভিত করে
আর তাই করতে থাকুক।

***

তিন বছরের শেষে

জরাজীর্ণ দ্বার খুলে আমি যখন
আমার ছোট্ট বাগানে হাঁটতে গেলাম
তখন ভোরের সূর্য কিরণ ছড়িয়ে
সবদিক আলোকিত করেছিল
সব ফুল আলোতে জ্বলজ্বল করছিল।
কোনও কিছুই তো বদলে যায়নি
সেই কাঠের নোয়ানো মাচা,
যা বেয়ে লতানো সেই দ্রাক্ষাকুঞ্জ,
সেই বেতের চেয়ারগুলো,
সেই রুপোলি ফোয়ারা,
সেই বুড়ো পপলার গাছের পাতার মর্মরধ্বনি
গোলাপগুলো তখনও যেভাবে কাঁপত,
এখনও সেভাবে কাঁপে
দীর্ঘশির গরবিনী লিলিফুলগুলো বাতাসে দুলছিল
ওদের প্রতিটি দুষ্টু দুষ্টু খেলা
যেন‌ উঁকি দিচ্ছিল আর লুকিয়ে যাচ্ছিল
আর আমি বাগানের শেষপ্রান্তে
ভাঙাচোরা চাঙড়ের মাঝে মৃদুগন্ধী আবহাওয়ায়
ভেলডা-র* কমনীয় মর্মর মূর্তি দেখতে পেলাম।

* ভেলডা= একজন জার্মান মহিলা পুরোহিত ছিলেন, যাঁর মর্মর মূর্তি উনবিংশ শতাব্দীতে বসতবাড়ি সংলগ্ন বাগানে অনেকেই রাখতেন।

চিত্রণ: বিভাবসু

***

কবি পরিচিতি

পল ভেরলেন (Paul Verlaine, জন্ম: ৩০ মার্চ ১৮৪৪, মৃত্যু: ৮ জানুয়ারি ১৮৯৬) ফরাসি কবি। মূলত নব্য ধারার কবিতা রচনা করেছেন। তিনি শার্ল বোদলেয়ারের দ্বারা প্রভাবিত হলেও‌ তাঁর কবিতায় একটা নিজস্বতা পাওয়া যায়। বর্তমান কবিতাগুলি তাঁর বিষণ্ণতা (Poèmes Saturniens: Paysages Tristes VI, L’Heure du Berger) সিরিজের অন্তর্গত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen − 10 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »